অভ্রের ঘুমটি ছিল অস্থির ও ভাঙাচোরা। অবিরাম কান্না, নির্ঘুম রাত এবং তীব্র মানসিক অবসাদে দু’চোখ ফুলে লালচে হয়ে গেছে।
অভ্র অত্যন্ত সতর্কতা ও মমতায় রাহাকে নিজের বুক থেকে আলতো করে সরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার পদক্ষেপ থেমে গেল।
আরাফ শিকদার।
এক নিমেষে অভ্রর দৃষ্টি ভয়ংকর হয়ে উঠল। সেই চোখে এমন এক নির্মম প্রখরতা ছিল, যেন এক পলকের চাহনিতে মানুষের সমস্ত মুখোশ, পাপের স্তর ভেদ করে অন্তরের অন্ধকার পর্যন্ত দেখে ফেলা যায়।
অভ্রর সেই রক্তহিম করা চাহনির সামনে কয়েক ক্ষণের জন্য আরাফ শিকদারের বুকের ভেতরও অজানা এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে এলো।
কারণ অভ্রর চোখ যেন শব্দহীন ভাষায় স্পষ্ট ঘোষণা করছিল—
“আজ তুই অভিনয়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিস... কিন্তু মনে রাখ, আগামীতে তোর সমস্ত পাপের হিসাব আমি নিজ হাতে নেব। তোর বিচার থেকে পালানোর কোনো পথ থাকবে না।”
অভ্র জিজ্ঞেস করলো…
— “কি চাস?”
আরাফ শিকদার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “রাহাকে...”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অভ্রর চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
— “রাহার দিকে এক পা এগোনোর চেষ্টা করলেই... তোকে জীবিত রাখব না।”
আরাফ শিকদারও পিছিয়ে গেল না। ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল—
— “এতটা সহজ ভেবেছিস?আমার ছেলে মাহাদীর স্ত্রী হবে রাহা। এই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।”
অভ্রর চোখের আগুন যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।
— “আমি বেঁচে থাকতে এটা কখনোই সম্ভব নয়।”
আরাফ শিকদারের মুখের হাসি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
— “তাহলে তোকে এই দুনিয়াতেই থাকতে দেব না। আর যদি খুব বেশি সাহস দেখাস... তাহলে এই ভিডিওটা এখনই নিচে গিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দেব।”
অভ্র এক পা হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে হুমকির সুরে বলল—
— “দেখা যা, তাতে আমার বা*ল ছেড়া যাবে।”
আরাফ শিকদার রাগী মুখে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই অভ্রর দিকে তাকিয়ে মনে মনে শিউরে উঠে বললেন,
‘এ কেমন ছেলে জন্ম দিয়েছে আমান খান?’
যেমন জেদ... তেমনই আগুনের মতো তেজ।’
দরজার কাছে গিয়ে থেমে আরাফ শিকদার কঠিন কণ্ঠে বলে গেল—
— “তোর ব্যবস্থা আমি করেই ছাড়ব।”
আরাফ শিকদার চলে যেতেই অভ্রর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিদ্রূপাত্মক হাসি।
— “যা করার করে নে। একবার আমার চাচ্চু সুস্থ হয়ে উঠুক। তারপর তোর হিসাবও আমি নিজ হাতে মিটিয়ে দেব, বাসটার্ড।”
—————
খান বাড়ি জুড়ে নেমে এসেছে এক অদৃশ্য শোকের ছায়া।
একসময়ের কোলাহলমুখর বাড়িটি আজ যেন নিস্তব্ধতার এক কারাগারে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এসে সমবেদনা জানিয়ে চলে গেছে; কেউ সান্ত্বনার কথা বলেছে, কেউ আবার নীরবে চোখের জল মুছে ফিরে গেছে।
কিন্তু সাথী বেগমের বুকের ভেতরের শূন্যতা কোনো সান্ত্বনাতেই পূর্ণ হওয়ার নয়।
তার অবস্থা ছিল হৃদয়বিদারক। অসহায়, বিধ্বস্ত শরীর যেন আর নিজের ভারই বহন করতে পারছে না।
নাজিরা ও আফসানা বেগম তাকে কোনোমতে ধরে উপরে নিয়ে গেলেন। যত্নসহকারে তাকে ফ্রেশ করিয়ে দিলেন। কিন্তু শরীরের ক্লান্তির চেয়েও তার মনের যন্ত্রণা ছিল বহুগুণ বেশি।
রুমে প্রবেশ করে চারপাশে একবার চোখ বুলাতেই আবারও তার ভিতরের সবকিছু যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
দেয়ালের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি আসবাবে, প্রতিটি স্মৃতির মাঝে তিনি খুঁজে পেলেন তার স্বামীর অস্তিত্ব।
পরমুহূর্তেই আবারও বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।বুক চাপড়ে অসহায় কণ্ঠে বিলাপ করে উঠলেন—
— “খোদা... এই যন্ত্রণা আমি কীভাবে সহ্য করব? চারপাশের প্রতিটি জিনিসেই আমার স্বামীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই ঘরে, এই বাড়িতে তার অস্তিত্ব ছড়িয়ে আছে। তাকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। চোখের অশ্রু যেন থামার নামই নিচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দরজা খুলে নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করল অভ্র।
ধীর পায়ে এগিয়ে মাথা নিচু করে সাথী বেগমের শিয়রে বসে রইল—এক অসহায় সন্তানের মতো।
অভ্রকে দেখামাত্রই সাথী বেগম আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না।
তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে অভ্রকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন—
— “কেন এমন হলো, অভ্র? কেন তোমার চাচ্চু আমাদের ছেড়ে চলে গেল? কেন রাহাকে একা করে চলে গেল?”
মেজো আম্মুর প্রতিটি কান্নার শব্দ যেন অভ্রর বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল।তার হাত দুটো শক্ত হয়ে মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল।
সে সব জানে...জানে, সত্যিটা অন্যরকম।
জানে, তার চাচ্চু এখনো বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে।কিন্তু এই মুহূর্তে সত্যিটা প্রকাশ করার সময় এখনো আসেনি।
কারণ সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত, সামান্য অসতর্কতা যদি তার চাচ্চুর জীবনের জন্য বিপদ ডেকে আনে—তাহলে সে নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না।
তাই বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো আর্তনাদ চেপে রেখে অভ্র শুধু নীরবে তার মেজো আম্মুর কান্না সহ্য করতে লাগল।
অভ্র শুধু শান্ত, ভারী কণ্ঠে একটি কথাই বলেছিল—
— “মেজো আম্মু... তুমি আর কান্না করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু সাথী বেগমের ভাঙা হৃদয় যেন কোনো আশ্বাসই গ্রহণ করতে পারছিল না।
অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— “কিছুই ঠিক হবে না বাবা... আমার রাহাটা যে এতিম হয়ে গেলো।”
কথাটা অভ্রর কানে পৌঁছাতেই যেন তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো।
অভ্র তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল—
— “খবরদার, মেজো আম্মু! এই কথাটা আর কোনোদিন মুখে আনবে না।
— “রাহা কোনো এতিম নয়।”
কথাটা বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল অভ্র।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ল সামনে এগিয়ে আসা মাহাদীর মায়ের দিকে।
এক নিমিষে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিল সে।
গভীর, স্থির কণ্ঠে বলল—
— “আমি আছি রাহার জন্য। আমি তার অভিভাবক। তার মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়ানোর জন্য আমি যথেষ্ট।”
একটু থেমে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
— “আর কে আছে, কে নেই... সেটা দেখার বিষয় নয়। যতদিন আমি আছি, রাহার কোনো কিছুতে অভাব হবে না।”
আফসানা খান উপলব্ধি করলেন যে অভ্রর প্রতিটি শব্দ মূলত তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।
কথাগুলোর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কঠোর সতর্কবার্তা তার দৃষ্টি এড়ায়নি।
অভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে অবস্থান করল না।
মুখে জমে থাকা অসংখ্য অনুভূতি দমন করে সে নীরবে কক্ষ ত্যাগ করল।
অভ্র চলে যেতেই ঘরের ভেতর নেমে এলো গভীর নীরবতা।
সাথী বেগমও যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
এতটুকু ছেলের মুখে এমন দৃঢ়তা, এমন অধিকারবোধ এবং রাহার প্রতি এমন কথা শুনে
—————
মাহাদীর বাবা শেষবারের মতো বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর আমান খানকে খুঁজছিলেন।
তখনই হঠাৎ তার দৃষ্টি লাইব্রেরি রুমের দিকে আটকে গেল।
সেখানে আমান খান নীরবে বসে আছেন।
দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে মাথা নিচু করে আছেন তিনি। চোখের সামনে যেন একের পর এক ঘটনা ভেসে উঠছে।
হয়তো তিনি ভাবছেন—
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে কীভাবে সবকিছু এতটা পরিবর্তিত হয়ে গেল?
যে পরিবারে ছিল আনন্দ, স্বস্তি,আজ সেই পরিবারেই নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা, অপমান এবং বিশ্বাসভঙ্গের অন্ধকার ছায়া।
ঠিক তখনই আরাফ শিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে গলা খাঁকারি দিলেন।
শব্দটি যেন আমান খানের গভীর চিন্তার জগতে আঘাত করল।ধীরে ধীরে তিনি মাথা তুলে তাকালেন।
সামনে আরাফ শিকদারকে দেখেই তার চোখে জমে থাকা ক্ষোভ ও বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কঠোর কণ্ঠে তিনি বললেন—
— “আবার কী চাই আপনার?”
আরাফ শিকদার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন—
— “তেমন কিছু না। শুধু দুটো কথা বলতে এসেছি।”
একটু থেমে নিচু অথচ হুমকিপূর্ণ স্বরে তিনি বললেন—
— “আমাদের এই সমঝোতার কথা যেন কোনোভাবেই বাইরে না যায়। এই খবর যদি ফাঁস হয়, তাহলে পরিস্থিতি কিন্তু আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।”
তারপর চোখ সরু করে যোগ করলেন—
— “আর অভ্রকে রাহার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে।”
আমান খান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
— “কীভাবে করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।”
কথাটি শুনে আমান খানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
— “অভ্র রাহাকে ছাড়ার পাত্র নয়।”
আরাফ শিকদার ও বলে উঠলেন,
— “আর তাকে না সরালে.. সেই ভিডিও আর গোপন থাকবে না।”
—”এবার কিন্তু অতিরিক্ত করছেন!”
কথাটি শুনে আরাফ শিকদারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তিনি হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— “থামুন, চেয়ারম্যান সাহেব!”
এক পা এগিয়ে এসে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললেন—
— “আর একটি বিষয় মনে রাখবেন... আপনার ছোট ভাই আসান যেন এই চুক্তির বিন্দুমাত্রও আঁচ না পান।”
কিছুক্ষণ থেমে আরও কঠোর স্বরে বললেন—
— “আর আমার ছেলে যখন ২৮ বছরে পদার্পণ করবে, তখন এই চেয়ারম্যানের আসন তার হাতে তুলে দিতে হবে।”
লাইব্রেরির ভারী নীরবতার মাঝে আরাফ শিকদারের কথাগুলো যেন বিষাক্ত প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল।
আর আমান খান শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন—কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই খেলার পেছনে আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে।
— “আমার আর কোনো চাওয়া নেই...”
আরাফ শিকদারের ঠোঁটে তখনও আত্মতুষ্টির এক স্থির হাসি ছিল।
আমান খান কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন—
— “আগে শুধু শুনেছিলাম,বিপদের সময় কিছু মানুষ নাকি নিজের স্বার্থের জন্য আপনজনের পিঠে ছুরি বসাতেও দ্বিধা করে না।”
— “আজ সেটাই নিজের চোখে দেখলাম।”
তার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠল।
— “আপনি এমন একটি কাজ করবেন, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। যাকে আপনজন ভেবেছিলাম, তার কাছ থেকেই এমন বিশ্বাসঘাতকতা পাব—এটা সত্যিই কল্পনার বাইরে ছিল।”
আরাফ শিকদার নির্বিকার রইলেন।
আমান খান গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— “যাই হোক... অভ্রকে রাহার কাছ থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা আমি করব।”
কথাটি বললেও তার চোখে চাপা কষ্ট ও অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
আরাফ শিকদার যেন নিজের জয় নিশ্চিত জেনে নিলেন।তার মুখে ফুটে উঠল এক বিজয়ীর হাসি।
ধীর পায়ে তিনি লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মনে হচ্ছিল—আজ তার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে।
শুধু তার নিজের নয়...
তার ছেলের ইচ্ছা, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সবকিছু যেন একে একে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
আর সেই বিজয়ের নেশায় তিনি বুঝতেই পারলেন না, এই খেলায় এখনো সবচেয়ে বড় চালটি বাকি।
—————
রাহা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে অভ্রর বিছানায় শুয়ে আছে।
অভ্র শাওয়ার শেষ করে ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে তোয়ালেটা রেলিংয়ে মেলে দিল।
ঠিক তখনই তার ফোনে কল আসার শব্দ ভেসে এলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—জয়নাল আংকেল।
এক মুহূর্ত দেরি না করে কল রিসিভ করল অভ্র।
— “কী অবস্থা আংকেল? আমার চাচ্চুর...?”
ওপাশ থেকে ভারী, বিষণ্ণ কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আগের মতোই বাবা... কোনো পরিবর্তন নেই।”
কথাটা শুনেই অভ্রর মুখের সমস্ত দৃঢ়তা এক মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল।
চোখের দৃষ্টি নেমে এলো নিচের দিকে। বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে ধীর কণ্ঠে বলল—
— “ঠিক আছে আংকেল। আর একটু পর আপনার অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ট্রান্সফার হয়ে যাবে। প্রতি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে অটোমেটিক চলে যাবে।”
একটু থেমে আরও আন্তরিক কণ্ঠে যোগ করল—
— “আর আপনার কাজের ব্যাপারেও আমি আমার ছোট চাচ্চুর সঙ্গে কথা বলে রেখেছি। চিন্তা করবেন না, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
ওপাশ থেকে জয়নাল আংকেলের কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “ঠিক আছে বাবা...”
কল কেটে গেল।
অভ্র কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই দরজা খুলে আমান খান রুমে প্রবেশ করলেন।
কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলেন—
— “কার সঙ্গে কথা বলছিলে?”
অভ্র অন্যদিক ঘুরেই উত্তর দিলো। চোখে ছিল অভিমান, কণ্ঠে ছিল দূরত্ব।
— “আপনাকে বলতে বাধ্য নই।”
কথাটা শুনে আমান খানের বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
তবুও শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললেন—
— “আপনি...?”
অভ্র ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল—
— “জি, আপনি।”
একটা ছোট্ট শব্দ...
কিন্তু সেই শব্দের ভেতর লুকিয়ে ছিল সন্তানের জমে থাকা অভিমান আর ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস।
আমান খান বুঝতে পারলেন।
তার ছেলে এখনো তাকে ক্ষমা করতে পারেনি।
আর তিনি এটাও জানেন—সত্যিটা বললে হয়তো অভ্রর কষ্ট আরও বেড়ে যাবে।এই ভাবনাতেই তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে উঠল।তিনি একবার চোখ তুলে রাহার দিকে তাকালেন।
আমান খান কিছুক্ষণ নীরবে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গভীর, স্থির কণ্ঠে বললেন—
— "তোমাকে পড়াশোনার জন্য এক সপ্তাহ পর তোমাকে ইতালি যেতে হবে।”
কথাটা শুনেই অভ্রর হাত থেমে গেল। চিরুনিটা মাঝ আকাশেই স্থির হয়ে রইল।
ধীরে ধীরে সে ঘুরে দাঁড়াল।
চোখে অবিশ্বাস, কণ্ঠে চাপা বিস্ময়—
— "আপনি কী বললেন?"
— "যা শুনেছ, সেটাই।"
অভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— "এই অবস্থায়... রাহাকে রেখে আমি কোথাও যাব না।"
আমান খান শান্ত স্বরেই বললেন—
— "আমি জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে জরুরি।"
— "জরুরি?" অভ্র তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি রাহার পাশে থাকা।"
আমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "রাহার দায়িত্ব আমার। সে নিরাপদ থাকবে।"
অভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
— "আপনাকে কে সেই অধিকার দিয়েছে?"
— "এখন থেকে রাহা আমার তত্ত্বাবধানে থাকবে।"
— "তত্ত্বাবধান?" অভ্র ঠান্ডা হেসে বলল, "দায়িত্ব... মাই ফুট।"
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
এরপর আমান খান কঠিন কণ্ঠে বললেন—
— "তুমি যদি না যাও, তাহলে রাহাকে তার নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।"
অভ্রর চোখ মুহূর্তেই জ্বলে উঠল।
আমান খান শেষ অস্ত্রটাও ব্যবহার করলেন—
— "আর ইভানের আম্মুও রাহাকে খুব পছন্দ করেন। ভবিষ্যতে..."
বাকিটা শেষ করতে পারলেন না।
অভ্রর চোখের আগুনই যেন সব কথা থামিয়ে দিল।
সে কিছু বলল না।
শুধু একবার ঘুমন্ত রাহার দিকে তাকাল।
মুহূর্তেই তার রাগের জায়গায় নেমে এলো অসহায় নীরবতা।
অনেকক্ষণ পর দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— "ঠিক আছে... আমি যাব।"
আমান খান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই অভ্র আবার বলল—
— "তবে আমারও দুটি শর্ত আছে।"
— "কী শর্ত?"
অভ্র ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
— "আমি ইতালি যাওয়ার সাত দিনের মধ্যে মাহাদীকেও ইতালি পাঠাতে হবে। কীভাবে করবেন, সেটা আপনার বিষয়।"
একটু থেমে আবার বলল—
— "আর আমার আঠারো বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে আমার অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা পাঠাবেন।"
আমান খান নীরবে শুনে গেলেন।
অভ্রর কণ্ঠ আরও শীতল হয়ে উঠল।
— "আঠারো বছর পূর্ণ হলে আপনার টাকারও দরকার হবে না... আপনাকেও না।"
কথাটা শুনে আমান খানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
অভ্র শেষবারের মতো বলল—
— "আর একটা কথা..."
সে চোখ সরিয়ে নিল।
— "আজ থেকে আমাকে আর ফোন করবেন না। আমিও করব না।"
ঘরজুড়ে নেমে এলো স্তব্ধ নীরবতা।
একসময় যে বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছিল অটুট বিশ্বাসের, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দেয়াল।
আর সেই দেয়ালের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষই নীরবে হারিয়ে ফেলল একে অপরকে।
—————
ঠিক সাত দিন পর অভ্রর ফ্লাইট।দেখতে দেখতে সাতটি দিন কেটে গেল।
জরুরি ভিত্তিতে তার পাসপোর্টের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে। বিদেশে গিয়ে সে তার দূরসম্পর্কের এক ফুপ্পির বাসায় থাকবে—সেই অনুযায়ী যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন আমান খান।
বাড়ির পরিবেশও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আগের মতো কান্না আর শোকের ভারী আবহ নেই, তবে হাসির শব্দও যেন হারিয়ে গেছে।
আর কিছুক্ষণ পরই অভ্র এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
ছেলেটার চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই কয়েক দিনে সে কতটা ভেঙে পড়েছে।চোখের নিচে গভীর ক্লান্তির ছাপ, মুখে নেই আগের সেই প্রাণবন্ততা।
সে নিজের ঘরে চুপচাপ রাহাকে নিয়ে বসে আছে।
ছোট্ট মুখটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
কতক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে, সেটা হয়তো অভ্র নিজেও জানে না।মনে হচ্ছে, এই কয়েক মুহূর্তেই সে রাহার পুরো অস্তিত্ব নিজের চোখে, নিজের মনে গেঁথে নিতে চাইছে।
কীভাবে থাকবে সে এই ছোট্ট প্রাণটাকে ছেড়ে?
যে মেয়েটা তার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে।হঠাৎ করেই অভ্র আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।রাহাকে শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।চোখের কোণ বেয়ে নেমে এলো জমে থাকা অশ্রু।
কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— “যারা তোকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে... তাদের প্রত্যেকটা হিসাব আমি একদিন কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেব, জান।”
অভ্রর চোখের পানি দেখে ছোট্ট রাহা তার ছোট হাত দিয়ে আলতো করে চোখ মুছে দিল।
— “কাঁদছো কেন ভাইয়া?”
অভ্র দ্রুত নিজের আবেগ লুকিয়ে ফেলল।
হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল—
— “কই পরি... কিছু না। চোখে কি যেনো পড়ল।
— “আচ্ছা পরি, বল তো...”
রাহা নিষ্পাপ চোখে তাকাল।
— “আমাকে যদি অনেক বছর না দেখিস... তাহলে কি আমাকে ভুলে যাবি?”
রাহা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল—
— “কোথায় যাবে তুমি?”
অভ্র দূরে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল—
— “অনেক দূরে...”
ছোট্ট রাহা মাথা নেড়ে বলল—
— “উঁহু... ভুলবো না।”
–”কিভাবে মনে রাখবি?”
–”আমি যে সাথে যাবো তাই।
বলেই খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
অভ্রর চোখ আবারও ভিজে উঠল। হাসতে থাকা রাহার দিক তাকিয়ে বলল,
— “সত্যি তো?”
— “হুম... সত্যি।”
চার বছরের ছোট্ট রাহা হয়তো ভবিষ্যতে এই কথাগুলো ভুলে যাবে...
কিন্তু অভ্র কখনো ভুলবে না।
এই ছোট্ট কথোপকথন, এই ছোট্ট হাতের স্পর্শ—সবকিছু আজীবন তার হৃদয়ে থেকে যাবে।
যাওয়ার সময়ও অভ্র নিজের কাপড়ের সঙ্গে রাহার ব্যবহৃত কিছু ছোট ছোট জিনিস নিয়ে যাবে।
যেগুলো তার কাছে শুধু স্মৃতি নয়, বরং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
ঠিক তখনই দরজা খুলে শিফা রুমে প্রবেশ করল।
— “ভাইয়া, আব্বু তোমাকে ডাকছে।”
কথাটা বলে শিফা বেরিয়ে যেতে নিলে অভ্র তাকে থামাল।
— “শিফা... এদিকে আয়।”
শিফা ঘুরে তাকাল।
— “বলো ভাইয়া…”
চোখের গভীরে জমে থাকা কষ্টটা লুকানোর চেষ্টা করেও পারল না। শিফার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “বড় ভাই হিসেবে তোকে একটা দায়িত্ব দিতে চাই... রাখবি বোন?”
শিফা এক মুহূর্তও দেরি না করে মৃদু হাসি দিয়ে বলল—
— “অবশ্যই ভাইয়া। তুমি শুধু বলো, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
অভ্রর গলা ভারী হয়ে এলো।
— “আমি চলে যাওয়ার পর রাহাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করবি না।”
একটু থেমে ছোট্ট রাহার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “ওর হাত কখনো ছাড়বি না। সবসময় ওর পাশে থাকবি। কোথাও গেলে... আমাকে ভিডিও কলে দেখাবি ওকে।”
শিফার চোখেও তখন কষ্টের ছাপ স্পষ্ট।
সে মাথা নেড়ে বলল—
— “আচ্ছা ভাইয়া...”
অভ্র আবারও কঠিন স্বরে বলল—
— “আর একটা কথা...”
শিফা তাকাল।
— “এই বিষয়টা যেন কেউ জানতে না পারে।”
তার কণ্ঠে ছিল অনুরোধের চেয়েও বেশি এক ধরনের অসহায়তা।
— “কেউ না।”
শিফা দৃঢ়ভাবে বলল—
— “প্রমিজ ভাইয়া। কেউ জানবে না।”
ইতালি যাওয়ার আগের দিনই অভ্র গোপনে পুরো খান বাড়িতে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ব্যবস্থা বসিয়ে দিয়েছিল। সেই সিস্টেমের লাইভ অ্যাক্সেস ছিল শুধু তার নিজের ফোন ও ব্যক্তিগত সার্ভারে। উদ্দেশ্য একটাই—দূরে থেকেও প্রতিটি মুহূর্তে রাহার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অভ্র আর কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে রাহাকে কোলে তুলে নিল।
তারপর ছোট্ট প্রাণটাকে বুকের সঙ্গে আগলে ধরে নিচে নেমে এলো।
সেদিন সাথী বেগম বাড়িতে ছিলেন না।শরীর খুব খারাপ হওয়ায় নাজিরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।এই কারণেই সাথী বেগম সেদিন বাড়িতে ফিরে এসেও অভ্রকে শেষবারের মতো দেখতে পেলেন না। কারণ তারা কেউ জানত না বিষয় টা।
বাড়ির কেয়ার টেকারদের সহায়তায় অভ্রর সব জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো।
ঠিক তখনই আফসানা বেগম এগিয়ে এলেন রাহাকে নেওয়ার জন্য।কিন্তু তিনি রাহার দিকে হাত বাড়াতেই রাহা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিল।
ছোট্ট মুখটা অভ্রর বুকে লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “আমি ভাইয়ার কাছেই থাকব।”
তারপর কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে লাগল—
— “আমি কোথাও যাব না... ভাইয়া বলেছে অনেক দূরে চলে যাবে আমাকে রেখে। আমিও ভাইয়ার সাথে যাব।”
রাহার কথা শুনে আফসানা বেগমের বুকটা ভার হয়ে উঠল।
তিনি চোখের পানি আটকে নরম কণ্ঠে বললেন—
— “কোথাও যাবে না রাহা মা। ভাইয়া একটু দূরে যাবে, আবার ফিরে আসবে। তুমি আমার কাছে এসো।”
আমান খানও এগিয়ে এসে একইভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।কিন্তু রাহা কিছুতেই রাজি হলো না।
যখন তাকে জোর করে নেওয়ার চেষ্টা করা হলো, তখন সে মরিয়া হয়ে অভ্রর গলা জড়িয়ে ধরল।
ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলো—
যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভয়টা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আর অভ্র...
সে শুধু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কারণ সে জানে, এই ছোট্ট হাতের বন্ধন ছিন্ন করেই তাকে আজ চলে যেতে হবে।
এদিকে অভ্রর চোখ দুটো ইতোমধ্যেই লাল হয়ে উঠেছে।চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু বারবার আটকে রাখার চেষ্টা করেও সে পারছে না।
রাহাকে কোলে নিয়েই গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াল সে।শেষবারের মতো ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে অভ্র ভাঙা কণ্ঠে বলল—
— “আমার জান... আমার ফেইরি টেইল... আমি কিন্তু দূরে যাচ্ছি না।”
একটু থেমে নিজের কষ্ট আড়াল করে মৃদু হাসার চেষ্টা করল।
— “এই তো... একটু যাব, আবার ফিরে আসব। তোমার জন্য অনেক চকলেট নিয়ে আসব, অনেক সুন্দর সুন্দর খেলনা নিয়ে আসব।”
কিন্তু ছোট্ট রাহা অভিমানী চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
— “লাগবে না এসব...”
অভ্র অবাক হয়ে তাকাল।
রাহা তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল—
— “আমি তোমার সাথেই খেলব।”
কথাটা শুনেই অভ্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এই ছোট্ট প্রাণটার কান্না যে সে কোনোদিন সহ্য করতে পারে না।
আজ কীভাবে তাকে রেখে যাবে?কীভাবে বোঝাবে এই ছোট্ট হৃদয়কে?
নিজের কষ্ট আড়াল করে অভ্র বলল—
— “আচ্ছা... তুমি রেডি হয়ে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
কথাটা শুনেই রাহার মুখে মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের ঝলক ফুটে উঠল।যেন তার সবচেয়ে বড় ভয়টা এক নিমিষে দূর হয়ে গেছে।
খুশিতে সে অভ্রকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
এই সুযোগে আফসানা বেগম হাত বাড়াতেই রাহা এবার আর বাঁধা দিল না।
অভ্র কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত, অথচ গভীর কষ্টভরা কণ্ঠে বলল—
— “ভালো থাকবেন।”
মাত্র দুটো শব্দ...
কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে ছিল হাজারো অভিমান, অজস্র না বলা কষ্ট।
আফসানা বেগমও জানতেন, এই মুহূর্তে তার ছেলের ভেতরটা কতটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু তিনিও যে অসহায়।চোখের কোণ থেকে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার।
ঠিক তখনই রাহা আবার ছটফট করে উঠল।
— “আমাকে জলদি রেডি করাও... আমি ভাইয়ার সাথে যাব।”
রাহার কথায় যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলেন আফসানা বেগম।তিনি আর কিছু না বলে রাহাকে নিয়ে দ্রুত বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন।
আর এই ফাঁকেই আমান খান এবং অভ্র এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
সেদিন রাহা অনেক কেঁদেছিল।
বারবার একটাই প্রশ্ন করেছিল—
— “ভাইয়া কোথায়?”
— “ভাইয়া কখন আসবে?”
প্রথম কয়েকদিন ঘুম ভাঙলেই তার ছোট্ট চোখ দুটি চারপাশে খুঁজে বেড়াত। প্রতিটি পদশব্দে সে মনে করত—হয়তো অভ্র ফিরে এসেছে। দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াত, কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে আসত।
ধীরে ধীরে প্রশ্নগুলো কমে গেল, তবে অপেক্ষাটি রয়ে গেল অটুট।
সময়ের সঙ্গে সবাই মিলে ভালোবাসা ও যত্নে তাকে আগলে রাখল। একসময় সে আবার আগের মতো হাসতে শিখল, খেলতেও শিখল। তবুও মনের গভীরে কোথাও একজন মানুষের জন্য নীরব অপেক্ষা রয়ে গেল—যার অর্থ সে নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারত না।
অন্যদিকে, এই পুরো ঘটনার কিছুই জানতেন না অভ্রর ছোট চাচ্চু আসান খান।
তাকে শুধু জানানো হয়েছিল—অভ্রর ভবিষ্যৎ ও পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
এর পেছনের প্রকৃত কারণ এবং সেই কঠিন ত্যাগের গল্প—সবই অন্ধকারের আড়ালেই রয়ে গেল।
অভ্রর ইতালি যাত্রার ঠিক সাত দিন পরই আমান খান তার পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন করলেন।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতির সঙ্গে অত্যন্ত কৌশলে আলোচনা করে নানা যুক্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাহাদীকেও ইতালিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে ফেললেন।
তখন সেই স্কুলেই নতুন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন আরাফ শিকদার। পরিস্থিতি তার অনুকূলে থাকায় তিনিও কোনো আপত্তি জানাননি।
তবে তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, এই সিদ্ধান্তের আড়ালে লুকিয়ে আছে আমান খানের বহু আগেই সাজানো এক নিখুঁত পরিকল্পনা।
এভাবেই একই দেশে পাড়ি জমাল অভ্র আর মাহাদী।
একই শিক্ষাজীবনের পথে হাঁটলেও তাদের লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অভ্র পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করল। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত আর অদম্য অধ্যবসায় অভ্রকে এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দিল। অল্প বয়সেই সে ব্যবসায়িক জগতে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। আজ অর্থ, প্রভাব কিংবা পরিচিতি—কোনোটারই অভাব নেই তার। একজন সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে তার নাম তখন অনেকের কাছেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
অন্যদিকে মাহাদী ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।সে শুধু নিজের পড়াশোনাতেই মনোযোগী ছিল।তার মেধা আর যোগ্যতার কারণে সেই একই ভার্সিটিতে পরবর্তীতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেল সে।
অদ্ভুত ব্যাপার ছিল...
একই জায়গায় থেকেও দুজনের মাঝে কখনো বন্ধুত্ব বা কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়নি।তারা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলত না।
শুধু প্রথম দিন মাহাদীকে দেখে অভ্রর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল এক রহস্যময় হাসি।
সেই হাসির অর্থ একমাত্র অভ্রই জানত।
মনে মনে বলেছিল—
‘তোর প্ল্যান সফল হয়েছে মাহাদী...’
‘রাহার থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলি, তাই না?’
‘আজ তুই নিজেই সেই দূরত্বের মধ্যে আটকে আছিস।’
অন্যদিকে মাহাদী প্রথমে তার বাবার সিদ্ধান্তে রাজি ছিল না।
কারণ অভ্র তখন দেশে নেই।সে ভেবেছিল, এই সুযোগটাই হয়তো কাজে লাগানো যায়।কিন্তু আরাফ শিকদার তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন—
যদি সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পারে, যদি বাবার কথা না শোনে, তাহলে রাহাকে পাওয়ার স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না।
বাধ্য হয়েই মাহাদী নিজেকে প্রমাণ করার পথে পা বাড়ায়।
সে জানত না...
যে প্রতিযোগিতায় সে নিজেকে বিজয়ী ভাবছে, সেই পুরো খেলাটাই আসলে অন্য কারও পরিকল্পনার অংশ।
কারণ সত্যিটা ছিল—
মাহাদীকে দূরে সরানো, তাকে যোগ্যতার পেছনে ছুটতে বাধ্য করা...
সবকিছুই ছিল অভ্র আর আমান খানের সাজানো এক নিখুঁত পরিকল্পনা।
—————
প্রায় দুই বছর কেটে গেছে।
অভ্র তখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত হয়েছে। দায়িত্ব, পরিস্থিতি আর সময় তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ একদিন শিফা তাকে একটি ভিডিও পাঠাল।
ভিডিওতে দেখা গেল, শিফাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে।ছোট্ট রাহার চোখেমুখে তখন অপার আনন্দ।
বর-কনেকে দেখে রাহা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে উঠছে—
— “আমিও বউ হব... আমিও এমন সাজব।”
ছোট্ট মেয়েটার নিষ্পাপ ইচ্ছেটা শুনে ভিডিওর ওপাশে থাকা অভ্রর বুকটা কেমন যেন করে উঠল।
সে ভিডিওটা একবার নয়...
দুইবার নয়...
অসংখ্যবার দেখল।
কমপক্ষে পঞ্চাশবারেরও বেশি।
প্রতিবারই রাহার সেই হাসিমাখা মুখ, সেই উচ্ছ্বাস আর সেই নিষ্পাপ কথাগুলো অভ্রর হৃদয়ে নতুন করে দাগ কেটে গেল।
শেষ পর্যন্ত সে নিজের মনেই এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
ধীর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— “তোর আঠারো বছর পূর্ণ হোক জান...”
একটু থেমে চোখ বন্ধ করে যোগ করল—
— “তোর এই ছোট্ট ইচ্ছেটাও আমি পূরণ করব। কথা দিলাম।”
অভ্রর ঘরের একপাশজুড়ে ছিল বিশাল স্ক্রিন।
সেই স্ক্রিনে শুধু কোনো সাধারণ ফুটেজ ছিল না...
ছিল রাহার প্রতিটি মুহূর্তের স্মৃতি।
বাড়ির মূল গেট থেকে শুরু করে করিডোর, রুম, বারান্দা—পুরো বাড়ির প্রতিটি অংশের ভিডিও নজরদারির আওতায় ছিল।
আর এর একমাত্র কারণ ছিল রাহা।
দিনের শেষে সমস্ত ব্যস্ততা শেষ করে যখন অভ্র নিজের ঘরে ফিরত, তখন তার প্রথম কাজই ছিল রাহার খবর দেখা।
কখনো দেখত ছোট্ট মেয়েটা খেলছে।কখনো দেখত হাসছে।কখনো আবার নিজের মতো করে দুষ্টুমি করছে।
আর রাহার সেই ছোট ছোট হাসিগুলো...
অজান্তেই অভ্রর কঠিন মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলত।
দূরত্ব যতই থাকুক...
রাহা ছিল অভ্রর প্রতিদিন বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।তার ছোট্ট হাসিই ছিল অভ্রর সমস্ত ক্লান্তি, একাকীত্ব আর কষ্টের একমাত্র ওষুধ।
—————
রাহার জন্মদিনের ঠিক দুই দিন আগে হঠাৎ করেই জয়নাল আংকেলের কাছ থেকে ফোন এলো।
কাঁপা কণ্ঠে তিনি জানালেন—
আরমান খান সাড়া দিচ্ছেন।
খবরটা শোনামাত্রই অভ্রর বুকের ভেতর যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভারটা এক মুহূর্তের জন্য হালকা হয়ে গেল।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না সে।
সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরার জন্য টিকিট কাটার চেষ্টা করল।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেদিনের কোনো ফ্লাইট আর পেল না।অবশেষে পরদিনের টিকিট নিশ্চিত করল।
তবে ঢাকায় নয়...
প্রথমেই গেল চট্টগ্রামে।
কারণ এতগুলো বছর পর তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার সামনে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা আর অপেক্ষা করতে চাইছিল না।
হাসপাতালে পৌঁছে জয়নাল আংকেলকে দেখামাত্রই অভ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
জয়নাল আংকেলও অভ্রকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন—
— “মাশাআল্লাহ...”
কিছুক্ষণ অভ্রর দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
যে ছেলেটাকে ছোট্ট অবস্থায় দেখেছিলেন...
আজ সেই ছেলেই কত বড় হয়ে গেছে।একদম পরিপূর্ণ যুবক।সময়ের স্রোতে কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও ভালোবাসার বন্ধনটুকু একটুও কমেনি।
অভ্র মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
— “কেমন আছেন আংকেল?”
জয়নাল আংকেল হাসার চেষ্টা করে বললেন—
— “আলহামদুলিল্লাহ বাবা... ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
অভ্র গভীর শ্বাস নিয়ে বলল—
— “ আলহামদুলিল্লাহ... ।”
একটু থেমে চোখ ভিজে উঠল তার।
— “আরও ভালো হয়ে যাব, চাচ্চু যখন নিজের মুখে কথা বলতে পারবে।”
তারপর ধীর কণ্ঠে বলল—
— “চলুন... যাওয়া যাক।”
কিছুক্ষণ পর অভ্র আর জয়নাল আংকেল আরমান খানের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
আগের তুলনায় এখন অনেকটাই সুস্থ তিনি।
নিথর, অচেতন অবস্থার সেই মানুষটি আজ ধীরে ধীরে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন।
অভ্র এগিয়ে যেতেই দেখল—
আরমান খান আধখোলা চোখে তাকানোর চেষ্টা করলেন।চোখে যেন অস্পষ্ট এক পরিচিতির ছায়া।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
অভ্রর বুকটা কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত ডাক্তারের দিকে তাকাল।
ডাক্তার শান্ত কণ্ঠে বললেন—
— “মিস্টার অভ্র, দীর্ঘদিন কোমায় থাকার কারণে শুরুতে এমন হওয়াটা স্বাভাবিক।”
— “হয়তো প্রথমদিকে পরিচিত মানুষদের চিনতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অভ্র আবেগ চেপে মাথা নাড়ল।
— “অনেক অনেক ধন্যবাদ, ডাক্তার।”
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
— “আপনাদের এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন—
— “ইটস ওকে, মিস্টার অভ্র।”
— “আপনিও তো আমাদের হাসপাতালের উন্নতির জন্য সহযোগিতা করেছেন। আপনার সাহায্যে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে।”
অভ্র কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল—
— “আমি চাচ্চুকে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই।”
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন—
— “অবশ্যই নিতে পারেন। এখন তিনি অনেকটাই স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন।”
একটু থেমে আশ্বাস দিয়ে বললেন—
— “সম্ভবত আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই তিনি আরও ভালোভাবে চোখ খুলতে পারবেন। এমনকি কথা বলার চেষ্টাও করতে পারেন।”
অভ্রর চোখে তখন দীর্ঘদিন পর এক ঝলক আশার আলো ফুটে উঠল।
সে ধীরে করে বলল—
— “এগেইন থ্যাংকস, ডাক্তার...”
কারণ আজ এত বছর পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—হয়তো এবার সত্যিই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
জয়নালের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল অভ্র।
কণ্ঠে ছিল অনুরোধ, আবার কোথাও যেন একরাশ অসহায়তাও লুকিয়ে ছিল।
— “আঙ্কেল... এবার আপনিও আমার সঙ্গে যাবেন। পুরো পরিবার নিয়ে।”
জয়নাল আংকেল মৃদু হাসলেন।
— “না বাবা... আমার এই এলাকা ছেড়ে আমি কোথায় যাব?”
অভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীর, দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— “ঠিক আছে... একেবারে চলে যেতে বলছি না।”
একটু থেমে আরমান খানের দিকে তাকাল।
— “কিন্তু চাচ্চু যতদিন না পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে, ততদিন অন্তত চলুন।”
অভ্রর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
— “কারণ এবার জানোয়ারগুলোর মুখোশ খুলে দেওয়ার পালা।আর একটা কথা আঙ্কেল... আপনাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।”
জয়নাল আংকেলের চোখেও তখন আবেগ জমে উঠল।
অবশেষে জরুরি ব্যবস্থায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আরমান খানকে ঢাকার হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো।
আগের পরিচয় গোপন রেখে একই নামে তাকে ভর্তি করা হয়।
কিন্তু হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসক যখন রোগীকে দেখতে এলেন, তখন মুহূর্তেই থমকে গেলেন।
চোখে বিস্ময়, মুখে অবিশ্বাস।
— “এটা... এটা তো বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আরমান খান!”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন তিনি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না।
— “কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?”
অভ্র তখন জয়নাল আংকেলকে ইশারা করল।
তারপর ধীরে ধীরে এতদিনের লুকিয়ে থাকা পুরো সত্যিটা খুলে বলল।
সব শুনে ডাক্তার হতবাক হয়ে গেলেন।
তার মুখে ফুটে উঠল ঘৃণা আর বিস্ময়।
— “একজন মানুষ এতটা স্বার্থপর আর লোভী কীভাবে হতে পারে?”
— “নিজের স্বার্থের জন্য কেউ কীভাবে আরেকজন মানুষকে শেষ করে দেওয়ার মতো ষড়যন্ত্র করতে পারে!”
অভ্র কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর খুব শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— “ডাক্তার... যতদিন না আমার চাচ্চু পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠছেন, এই বিষয়টা যেন আপনার ছাড়া আর কেউ জানতে না পারে।”
তার চোখে ছিল সতর্কতা।
— “একজনও না।”
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন—
— “ঠিক আছে, মিস্টার অভ্র। আমি বিষয়টা গোপন রাখব।”
অভ্র এরপর জয়নাল আংকেলকে আরমান খানের পাশে রেখে দিল।
কারণ সে জানত—
তার চাচ্চুর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই মানুষটার চেয়ে বিশ্বস্ত আর কেউ নেই।
সেদিনই বাসায় ফেরার পথে...
দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেল অভ্র আর রাহার।
আর দীর্ঘ বহু বছরের ব্যবধানের পর, অভ্রর হাতেই রাহা পেল তার জীবনের প্রথম থাপ্পড়।
সেদিন বিকেলেই একটি সুখবর এলো—আরমান খান অবশেষে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন।
খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভ্র সবকিছু ফেলে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেল।
তবে আনন্দের মাঝেও ছিল গভীর বেদনার ছাপ।
দীর্ঘদিন কোমায় থাকার কারণে আরমান খান প্রথমদিকে কাউকেই চিনতে পারছিলেন না। চারপাশের প্রতিটি মুখই তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছিল।
তবুও একটি বিষয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
অভ্রকে দেখলেই তার ভেতরে এক অজানা টান অনুভূত হতো। যেন স্মৃতি হারিয়ে গেলেও হৃদয় ঠিকই নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে চিনে নিচ্ছিল।
পরবর্তী কয়েক দিন জয়নাল ও অভ্র ধৈর্য, ভালোবাসা এবং আন্তরিক যত্নের মাধ্যমে একে একে সবকিছু তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকল। ধীরে ধীরে স্মৃতির আবরণ সরে যেতে শুরু করল। একসময় আরমান খান অতীতের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি ষড়যন্ত্র এবং প্রতিটি মুখ স্পষ্টভাবে মনে করতে সক্ষম হলেন।
এদিকে অভ্রর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার কয়েক দিন আগে মাহাদী কাকতালীয়ভাবে জানতে পারে—আরমান খান এখনো জীবিত।
কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই সে গোপনে অভ্রর প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছিল।
তবে বিষয়টি সে তার বাবা আরাফ শিকদারকে জানায়নি।
বরং মনে মনে নতুন এক ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করতে শুরু করল।
তার ধারণা ছিল, আরমান খানকে নিজের প্রভাব ও কৌশলের মাধ্যমে ব্যবহার করে সে রাহাকে নিজের করে নেওয়ার পথ তৈরি করবে।
সেই উদ্দেশ্যে সে একাধিকবার হাসপাতালে গিয়ে আরমান খানের মন বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। নানা মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও প্ররোচনামূলক কথা বলে তাকে নিজের পক্ষে আনার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেল।
কিন্তু মাহাদী জানত না...
অভ্র শুধু আরমান খানের ভাতিজাই নয়—সে ছিল তার আরেকটি প্রাণ, তার নিঃশ্বাসের মতোই আপন।
তাই মাহাদীর প্রতিটি কথা শুনে আরমান খান বাইরে থেকে নিরীহ ও নির্লিপ্ত থাকার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে সবকিছুই বুঝে নিচ্ছিলেন।
তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই মাহাদীর প্রতিটি কথায় সম্মতি জানাতেন, এমনকি এমন আচরণ করতেন যেন মাহাদী যা বলবে, তিনিও ঠিক তাই করবেন।
আর মাহাদী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলেই...
আরমান খান, অভ্র এবং জয়নাল একসঙ্গে বসে মাহাদীর সরলতা ও ব্যর্থ ষড়যন্ত্র নিয়ে প্রাণখুলে হাসতেন। মাহাদী যে নিজেই অজান্তে তাদের পরিকল্পনার দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে, সে বিষয়ে তার সামান্যতম ধারণাও ছিল না।
—————
বর্তমান...
ধীর গতিতে সামনে এগিয়ে এলেন চট্টগ্রামের সেই চিকিৎসক। তার পাশেই এসে দাঁড়ালেন জয়নাল। দু’জনই নীরবে অভ্রর দুই পাশে অবস্থান নিলেন।
উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন বাকরুদ্ধ।
এতক্ষণ যেটাকে সবাই নিছক অভিযোগ কিংবা নাটক ভেবেছিল, তা যে নির্মম বাস্তব—এবার সেটা সবার চোখের সামনেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।
চারদিকে ঘৃণা, তাচ্ছিল্য আর ধিক্কারের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
মাহাদীও স্তব্ধ হয়ে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অবিশ্বাস। সে যেন নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিল না, তার বাবা এত নিচে নামতে পারেন।
অন্যদিকে আসান খানের সারা শরীর ক্রোধে কাঁপছিল।
শুধু বহু বছরের বন্ধুত্বের কথা ভেবেই তিনি নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। অন্যথায় সেই মুহূর্তেই আরাফ শিকদারের প্রাণ কেড়ে নিতে তার এক মুহূর্তও লাগত না।
ঠিক তখনই অভ্র শান্তভাবে নিজের ফোনটি চালু করল।
পরের মুহূর্তেই বিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি ভিডিও।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেল—
আরমান খান গভীর খাদে ঝুলে আছেন, আর আরাফ শিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে তার হাত ছেড়ে দিচ্ছে।
ভিডিওটি শেষ হতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই আরাফ শিকদারের মুখমণ্ডলের সমস্ত রঙ মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল।
তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে সে চিৎকার করে উঠল—
— "এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা! সবই মিথ্যা! ভিডিওটি এডিট করা হয়েছে! আমাকে ফাঁসানোর জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে!"
উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অভ্র শুধু ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে শান্ত গলায় বলল—
— "এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়লি? আমি তো ভেবেছিলাম, আরও ভালো অভিনয় করবি।"
আরাফ শিকদার দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— "আমি কিছুই করিনি! এগুলো সবই সাজানো প্রমাণ!"
অভ্র ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
— "সত্যি? তাহলে তোর জন্য আরও একটি চমক আছে।"
কথাটি বলতেই ড্রোন পরিচালনাকারী ব্যক্তি সামনে এগিয়ে এলেন।
দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
— "ভিডিওটি আমিই ধারণ করেছি। এটি কোনো এডিট করা ফুটেজ নয়। সেদিন প্রাকৃতিক দৃশ্য ধারণ করতে গিয়েই ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে।"
এরপর সামনে এগিয়ে এলেন চট্টগ্রামের সেই চিকিৎসক।
— "আরমান খানকে আমি নিজ হাতে চিকিৎসা করেছি। তিনি কখনো মারা যাননি; দীর্ঘদিন কোমায় ছিলেন।"
সবশেষে জয়নাল সামনে এসে বললেন—
— "এই মানুষটিকে এত বছর আমি নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছি। আজ যা দেখছেন, তার প্রতিটি কথার আমি প্রত্যক্ষ সাক্ষী।"
উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তখন জয়নাল শান্ত কণ্ঠে বললেন—
— "বিদেশে যাওয়ার পর একদিন হঠাৎ অভ্রর মনে পড়ে, আরাফ শিকদার যে ভিডিওটি সেদিন দেখিয়েছিল, ভিডিওটির পেছনের অংশে ক্ষণিকের জন্য ড্রোন হাতে একজন ব্যক্তিকে দেখা গিয়েছিল। সেই সামান্য সূত্রটিকেই ভিত্তি করে অভ্র স্মৃতির ওপর নির্ভর করে লোকটির একটি স্কেচ তৈরি করে এবং তাকে শনাক্ত করার দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করে।"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন—
— "দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে আমরা সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হই। তার কাছে বহু বছর ধরে সংরক্ষিত একটি পুরোনো মেমোরি কার্ড ছিল। সেই মেমোরি কার্ড থেকেই উদ্ধার করা হয় এই অকাট্য ভিডিও প্রমাণ, যা আজ আপনাদের সামনে সত্যকে উন্মোচিত করেছে।”
একের পর এক অকাট্য প্রমাণ সামনে আসতেই আরাফ শিকদারের ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল।
কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
তার চোখ দুটো আতঙ্কে চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।
মনে হচ্ছিল, যেকোনো মূল্যে সে পালানোর পথ খুঁজছে।
কিন্তু এবার আর পালানোর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।
অভ্র তার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।
ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
— "কেমন লাগল?"
— "বলেছিলাম না... তোর প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেব?"
— "আমার সঙ্গে শত্রুতা করার এবং আমার পরিবারের দিকে হাত বাড়ানোর মূল্য একদিন তোকে দিতেই হতো।"
— "আজ থেকে তোর সব শেষ, আরাফ শিকদার।"
তার কণ্ঠে তখন প্রতিশোধের শীতল দৃঢ়তা।
— "তোকে মেরে ফেলা খুব সহজ ছিল। কিন্তু আমি চাই, তুই বেঁচে থাক। নিজের সবকিছু হারিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়বি। আর আমি নিজের চোখে দেখব—যেমন এতগুলো বছর আমার পরিবারের মানুষদের কষ্ট পেতে দেখেছি।এটাই হবে তোর সবচেয়ে বড় শাস্তি।
ঠিক তখনই উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সামনে এগিয়ে এলেন।
তিনি এতক্ষণ নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
আরাফ শিকদারের সামনে দাঁড়িয়ে হাতকড়া বের করে শান্ত অথচ কঠোর কণ্ঠে বললেন—
— "Your time is up, Mr. Shikdar."
পরক্ষণেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে উদ্যত হলো।
মাহাদীও বাবার সঙ্গে এগিয়ে যেতে চাইলে অভ্র তাকে থামিয়ে দিল।
মুচকি হেসে বলল—
— "নতুন বউ রেখে কোথায় যাচ্ছিস?"
— "তোকে তো আমি অপরাধী প্রমাণ করিনি।"
— "যা... বউকে নিয়ে শান্তিতে সংসার কর।"
ঠিক তখনই সবার সামনে এগিয়ে এলো আয়াত।
অভ্র এবার নিজের শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে সংযত হাসি দিয়ে বলল—
— "এবার তো আপনার মেয়েকে নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দাও চাচ্চু...?"
কথা শেষ করেই নিজের ঠোঁটে আলতো চাপড় মেরে হেসে উঠল।
— "উপস... সরি!"
তারপর মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলল—
— "শ্বশুর আব্বা।”
ঠিক তখনই আরমান খান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— "না..."
একটি মাত্র শব্দ।
অভ্রর ঠোঁটের হাসিও মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………