— "তুই কি আমার জন্য নিজের সবকিছু... এমনকি নিজের পরিবারকেও ত্যাগ করতে পারবি, ফেইরি টেইল?"
রাহা এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। অভ্রর চোখে চোখ রেখে অবিচল কণ্ঠে বলল,
— "আমি পারব, অভ্র ভাই। আপনার জন্য পৃথিবীর সবকিছু ত্যাগ করতেও আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা হবে না।"
রাহার উত্তর শুনে আরমান খানের মুখমণ্ডল ক্রোধে কঠিন হয়ে উঠল। তাঁর চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল।
তিনি বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন,
— "এত বড় দুঃসাহস! এতটা ঔদ্ধত্য তোমার, রাহা? আমার সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার সাহস তুমি কোথা থেকে পেলে? আমার কথার উপর কথা বলার স্পর্ধা কীভাবে হলো তোমার?"
রাহা দৃঢ় দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু অনমনীয় কণ্ঠে বলল,
— "অভ্র ভাই শুধু আমার ভালোবাসার মানুষ নন... তিনি আমার স্বামী। আমাদের বিয়ে বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তাহলে কোন অধিকারে আপনি আমাকে তাঁর থেকে আলাদা করার কথা বলছেন?"
আরমান খান দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র স্বরে বললেন,
— "আমি কখনোই তা মেনে নিতে পারব না। ওই বেপরোয়া, একগুঁয়ে আর অবিবেচক ছেলের হাতে আমি আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ তুলে দিতে পারি না। সে তোমাকে সুখে রাখতে পারবে না—এটা এখন আমার কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। আমি তার প্রকৃত রূপ জেনে গেছি।”
অভ্র নিঃশব্দে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো প্রতিবাদ বা ব্যাখ্যার চিহ্ন নেই; কেবল নীরব দৃষ্টিতে মাটির দিক তাকিয়ে রয়েছে। বুকের ভেতর একটিই প্রশ্ন বারবার আঘাত হানছে—
কার জন্য সে এত কিছু করল? কাকে রক্ষা করতে গিয়ে আজ সে-ই সবার চোখে অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়েছে?
রাহা যখন নিজের অধিকারের কথা দৃঢ় কণ্ঠে প্রকাশ করতে শুরু করল, তখন অভ্র আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে উপলব্ধি করছিল, এই মুহূর্তে রাহার প্রতিটি বক্তব্য তার হাজারো যুক্তির চেয়েও অধিক শক্তিশালী।
পুরো জায়গাজুড়ে নেমে এলো এক গভীর, থমথমে নীরবতা। উপস্থিত প্রত্যেকে নির্বাক দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সকলেই বুঝে গিয়েছিল, আরমান খান তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও বিচ্যুত হবেন না। তাঁর অবস্থান অনড় ও অটল।
তিনি কঠোর কণ্ঠে বারবার একই কথা উচ্চারণ করলেন—
"আমি কোনো অবস্থাতেই আমার মেয়েকে অভ্রর হাতে তুলে দেব না। আমার মেয়ের জন্য অভ্রর চেয়ে হাজার গুণ যোগ্য, প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত পাত্র খুঁজে বের করব। কিন্তু এই ছেলেকে আমি কখনোই মেনে নেব না।"
এমনকি সাথী বেগম বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও আরমান খান তাঁর কোনো কথাতেই কর্ণপাত করলেন না। ক্রোধ, অভিমান এবং ভুল ধারণা তাঁর বিচারবোধকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
অন্যদিকে রাহাও আর নীরব রইল না।আজ সে প্রথমবারের মতো নিজের পিতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করল।
— "আমি আমার স্বামীর হাত কোনোদিন ছাড়ব না। প্রয়োজনে এই বাড়ি, সব সম্পর্ক—সবকিছু ছেড়ে দেব।”
রাহার এই দৃঢ় ঘোষণায় পুরো পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। একদিকে পিতার অনমনীয় সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে মেয়ের অটল অঙ্গীকার—ক্ষণকালের মধ্যে যেনো এক নীরব সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হলো।
রাহা অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর বুকভরা কষ্ট আর অব্যক্ত অভিমান নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত, অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— "বাবা... তুমি কাকে বেপরোয়া বলছ? যে মানুষটা নিজের সুখ-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে বছরের পর বছর আমাদের আগলে রেখেছে, নিজের কষ্ট লুকিয়ে শুধু আমাদের হাসিটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে—আজ তার চরিত্র নিয়েই তুমি প্রশ্ন তুলছ? এটাই কি তোমার ন্যায়বিচার?”
রাহার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
এক মুহূর্ত থেমে গভীর শ্বাস নিল সে।
চোখের কোণে জমে থাকা শেষ অশ্রুবিন্দুটুকুও মুছে দিয়ে মৃদু হাসল।
— "ক্ষমা করে দিও, বাবা... আজ তোমার সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারলাম না। কারণ আজ আমি শুধু তোমার মেয়ে নই, আমি একজন স্ত্রীর দায়িত্বও বহন করছি। আর নিজের স্বামীকে অন্যায়ের সামনে একা দাঁড় করিয়ে রাখার মতো স্বার্থপর আমি নই।"
ধীরে ধীরে অভ্রর হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল রাহা।
— "এই মুহূর্তে আমি আমার স্বামীর হাত ধরেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।হয়তো তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না, তবু নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে বাঁচতে চাই না। তুমি সবসময় আমার বাবা ছিলে, আছো, থাকবে। কিন্তু আজ একজন স্ত্রী হিসেবে আমার স্থান আমার স্বামীর পাশেই।
রাহা অভ্রর দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিল। কাঁপতে থাকা আঙুলে তার হাত দুটি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলো। তার ঠোঁট কাঁপছিল, গলা বারবার ধরে আসছিল। বুকভর্তি অসংখ্য অনুভূতি যেন শব্দে রূপ নিতে পারছিল না।
অবশেষে ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল—
— "অভ্র ভাই... আপনাকে কী বলব, আমি সত্যিই ভাষাহীন। আপনার এই ভালোবাসা, এই ত্যাগ, এই অমূল্য উপহার আমি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্তও ভুলতে পারব না।"
কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
— "আপনি বলেছিলেন, আমাদের বিয়ের সবচেয়ে বড় উপহার একদিন আমাকে দেবেন।
আমার বাবাকে আমার জীবনে ফিরিয়ে দেওয়াই ছিল আপনার দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝলাম—আপনি আমাকে শুধু একজন স্বামী হিসেবে নয়, একজন মেয়ের হারিয়ে যাওয়া বাবাকেও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।”
রাহা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।
— "কিন্তু... শেষটা এমন হবে, আমি কখনো কল্পনাও করিনি। যে মানুষটা নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমাকে আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিল, আজ তাকেই সবার সামনে অপমানিত হতে হবে—এটা আমি কোনোদিন ভাবিনি।"
কাঁপতে কাঁপতে সে অভ্রর দুই হাত নিজের মুখের কাছে তুলে আনল। গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় হাতের পিঠে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
পরমুহূর্তেই তার উষ্ণ অশ্রুবিন্দু একের পর এক অভ্রর হাতের ওপর ঝরে পড়তে লাগল।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল—
— "I'm sorry, Obhro Bhai... truly sorry... my husband... my soulmate..."
সে অভ্রর হাত দুটি নিজের কপালে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
তারপর আবার বলল—
— "আমার জন্যই আপনাকে এত অপমান, এত কষ্ট আর এত অন্যায় সহ্য করতে হয়েছে। এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন—আপনি ছাড়া 'রাহা' অসম্পূর্ণ।আপনি ছাড়া আমি কেউ নই।”
রাহা আর কিছু বলল না। নিঃশব্দে অভ্রর হাত আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সেই স্পর্শই বলে দিচ্ছিল, তার সিদ্ধান্ত আর বদলাবে না।
রাহার চোখ আবারও অশ্রুসজল হয়ে উঠল।
— "বিশ্বাস করুন, আপনি ছাড়া আমার পৃথিবী অসম্পূর্ণ। আমারও স্বপ্ন ছিল দুই পরিবারকে একসঙ্গে নিয়ে বাঁচার, হয়তো সেই সৌভাগ্য আমাদের নেই।"
শেষবারের মতো চারপাশে একবার তাকিয়ে সে গভীর শ্বাস নিল।তারপর অভ্রর হাত আরও দৃঢ়ভাবে ধরে মৃদু স্বরে বলল—
— "চলুন, অভ্র ভাই... এবার আমরা নিজেরাই আমাদের পৃথিবী গড়ে তুলি।"
কথাটি বলেই রাহা এক মুহূর্তও পেছনে ফিরে তাকাল না। অভ্রর হাত শক্ত করে ধরে ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু অভ্র তখনও পাথরের মতো একই স্থানে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে, অথচ তার সমগ্র অস্তিত্ব নিথর।
রাহা বারবার তার হাত টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অভ্র একচুলও নড়ল না।
অবশেষে অসহায় হয়ে সে অভ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। দু'হাতে তার বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল—
— "কী হলো, অভ্র ভাই? আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলুন... আমরা এখানে আর এক মুহূর্তও থাকব না। বাবা আমাদের কখনোই মেনে নেবেন না।"
অভ্র সোজা চোখ তুলে রাহার দিকে তাকাল।
তার মুখে কোনো হাসি নেই। নেই কোনো রাগ, অভিযোগ কিংবা হতাশার ছাপও। গভীর, অদ্ভুত এক নীরবতা ছাড়া আর কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
সে কিছু বলল না।
শুধু একবার রাহার হাতের দিকে তাকাল—যে হাতটি শত বাধা উপেক্ষা করে আজও তার হাত ছেড়ে যায়নি।
উপস্থিত সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
কেউ বুঝতে পারছিল না, এই নীরবতার অর্থ কী।
ঠিক তখনই আরমান খান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
আরমান খান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর কঠোর মুখাবয়ব ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এল। চোখের গভীরে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছায়া ফুটে উঠল। তিনি একবার রাহার দিকে, একবার অভ্রর দিকে তাকালেন। দু'জনের শক্ত করে ধরা হাত দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটি হাসি ফুটে উঠল।
তারপর দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
— "ইনশাআল্লাহ, আগামী শুক্রবার আমাদের বাড়িতে দুটি বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। আপনাদের সবাইকে পুনরায় সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলাম।"
আরমান খানের কথা শুনে অভ্রের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
সেই হাসিতে ছিল বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। আজ সে বুঝল—শুধু তার ভালোবাসা নয়, রাহার ভালোবাসাও সবার সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যে মেয়েটিকে হারানোর ভয়ে সে বছরের পর বছর প্রতিটি যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করেছে, সেই রাহাই আজ সকলের সামনে তার হাত দৃঢ়ভাবে ধরে ঘোষণা করেছে—সে অভ্রর পাশেই থাকবে।
অভ্র কিছু বলল না।
কারণ আজ শব্দের আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। রাহার প্রতিটি কথা, প্রতিটি প্রতিবাদই তার নির্দোষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, এবং তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন।
কিছুক্ষণ থেমে তিনি অভ্রর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন এবং আবার বললেন—
— "বলুন তো, মেয়ে-জামাই যদি বর-কনের সাজে আমার দরজায় না আসে, তাহলে আমি কেন মেয়েকে বিদায় দেব? যতই হোক, আমার তো একটাই মেয়ে। তাকে নিতে হলে নিয়ম মেনেই বরযাত্রী নিয়ে আসতে হবে।"
কথাগুলো শেষ হতেই মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে নীরবতা নেমে এলো।যেন সময় নিজেই কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে।কেউ নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
কিছুক্ষণ আগেও যিনি কঠোর কণ্ঠে এই সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তিনিই এখন সবার সামনে বিয়ের ঘোষণা দিচ্ছেন!
আরমান খান আসলে কোনো সম্পর্ক ভাঙতে চাননি।তিনি শুধু দেখতে চেয়েছিলেন—
তার আদরের মেয়েটি ভালোবাসার মানুষটির জন্য কতদূর যেতে পারে।বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তার আছে কি না।
আর আজ রাহা সেই পরীক্ষায় শুধু উত্তীর্ণই হয়নি—
নিজের ভালোবাসাকে সর্বসমক্ষে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠিত করেছে।সব সত্য সামনে আসতেই রাহা যেন লজ্জা, অভিমান আর স্বস্তির মিশ্র অনুভূতিতে নির্বাক হয়ে গেল।
এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছে, যা যা করেছে—সবকিছু মনে পড়তেই তার মুখ রক্তিম হয়ে উঠল।মাথা নিচু করে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।
কাঁপা কণ্ঠে অভ্রর বুকের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে উঠল—
— "আমি... আমি আপনার কী, অভ্র ভাই?"
কথাটি শেষ হওয়ার আগেই অভ্র এক টানে রাহাকে নিজের প্রশস্ত বুকে জড়িয়ে নিল।
উপস্থিত শত শত মানুষের সামনে বিন্দুমাত্র সংকোচ না রেখে সে রাহার কপালে আলতো চুমু এঁকে আবেগভরা কণ্ঠে বলল—
— "তুই কী, সেটা জানিস?
তুই তো আমার সব রে পাগল।
তুই তো আমার সব..
তুই তো আমার বেঁচে থাকার...
বড় অনুভব।"
এই কথাগুলো শোনার পর রাহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
এতদিনের জমে থাকা সমস্ত অভিমান, ভয়, কষ্ট আর যন্ত্রণা অশ্রুর স্রোতে ভেসে বেরিয়ে এল।
সে অভ্রর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে প্রাণভরে কাঁদতে লাগল।
অভ্রও আজ তাকে থামাল না।কারণ এই কান্না ছিল পরাজয়ের নয়—এ ছিল সমস্ত দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির কান্না।এ ছিল ভালোবাসার জয়ের অশ্রু।
আজ কাঁদুক...প্রাণভরে কাঁদুক...
কারণ আজকের পর তার চোখে আর কষ্টের অশ্রু দেখতে চায় না অভ্র।
সে আলতো করে রাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—
— "কেঁদে নে, ফেইরি টেইল... আজ যত ইচ্ছে কেঁদে নে। কারণ আজকের পর থেকে তোর চোখের একফোঁটা কষ্টের পানিও আমি সহ্য করব না। যদি কখনো কাঁদিস... তাহলে কিন্তু তোর খবর আছে। তবে একটা কথা- শুধু বিশেষ মুহূর্তে কান্নার জন্য অনুমতি রইল।"
অভ্রর শেষ কথাটুকু শুনে রাহা কান্নার মাঝেই মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
দেখল, অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি ঝুলিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তেই রাহা সব বুঝে গেল।লজ্জায় তার গাল আরও লাল হয়ে উঠল।হালকা ধাক্কা দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বিড়বিড় করে বলল—
— "নির্লজ্জ মানুষ! ছাড়ুন আমাকে... সবাই দেখছে।"
অভ্র আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে মুচকি হেসে রইল।
চারপাশে তখন করতালি, হাসি আর আনন্দধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশ।আজ সবাই নিজের চোখে দেখল—দু'জন মানুষ একে অপরকে কতটা নিঃস্বার্থ, কতটা গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে।
অভ্রর বাবা-মায়ের চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল।আজ তাদের ছেলে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে।
যে মেয়েটিকে তারা পুত্রবধূ হিসেবে বুকে জায়গা দিয়েছেন, সেই রাহাও আজ সবার সামনে প্রমাণ করে দিয়েছে—অভ্রই তার পৃথিবী।
অন্যদিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা আরমান খান নিজের মেয়ে আর ভবিষ্যৎ জামাইকে একসঙ্গে দেখে তৃপ্তিতে ভরে উঠলেন।
মনে হচ্ছিল, ভেঙে যাওয়া সংসারের প্রতিটি ছিন্নসূত্র আবার নতুন করে জোড়া লেগেছে।
ঠিক তখনই জনতার ভিড় থেকে একজন কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করে উঠলেন—
— "আচ্ছা, আরেকটা বিয়ে কার?"
আরমান খান মৃদু হেসে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন—
— "মাহাদী আর আয়াতের।"
কথাটি শুনে ইভান এবং তার বাবা-মা বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অভ্র মুচকি হেসে বলল—
— "একটু সময় দিন। সবকিছু আমি নিজেই খুলে বলব।"
কিন্তু আরমান খান হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিলেন।
— "আজ আর কোনো প্রশ্ন নয়। আপনারা অনেক ধৈর্য ধরে এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এজন্য প্রত্যেকের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
সবাই একে একে স্থান ত্যাগ করল।
চারপাশ প্রায় ফাঁকা হয়ে এলে মাহাদী হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
— "আমি এই বিয়ে মানি না!"
কথাটা শেষ হতেই অভ্র তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ধীর পায়ে তার সামনে এগিয়ে এল।
ঠান্ডা অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল,
— "যেমন বাপ, তেমন ছেলে।"
এক মুহূর্ত থেমে মাহাদীর চোখে চোখ রেখে আবার বলল,
— "আকাম করার সময় তো খুব সাহস ছিল! তখন তো একবারও ভাবিসনি—এর পরিণতি কী হতে পারে। আয়াতকে নিয়ে যা করেছিস, সব ভুলে গেছিস নাকি?"
মাহাদীর মুখ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল।
অভ্র ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে বলল,
— "নাকি... এখানেই ভিডিওটা চালিয়ে দিব?"
কথাটা শুনে মাহাদীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রাগে তার শরীর কাঁপতে লাগল।
দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল,
— "অভ্র... তুই খুব ভালো করেই জানিস, আমি কিছু করিনি।"
অভ্র পকেট থেকে একটি পেনড্রাইভ বের করে আঙুলের ফাঁকে অনায়াস ভঙ্গিতে ঘুরাতে ঘুরাতে শয়তানি হাসল।
তারপর বিষাক্ত শান্ত স্বরে বলল,
— "সত্যিটা আমি জানি, তুইও জানিস... কিন্তু বাকিরা তো জানে না। তাই বেশি কথা বলিস না।”
অভ্রর চোখে তখন নির্মম তৃপ্তির ঝিলিক।
— "তোর বাবার মান-সম্মান তো আগেই মাটিতে মিশে গেছে... এবার পালা তোর। একটা ভিডিওই যথেষ্ট—তোর বাকি সম্মানটুকুও ধুলোয় মিশিয়ে দিতে।"
শেষ কথাটা বলে অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে এমন এক ভয়ংকর হাসি হাসল, যার সামনে মাহাদীর সমস্ত রাগ আর দম্ভ মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেল।
অভ্র ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আর একটা কথা ভালো করে কানে ঢুকিয়ে রাখ। তোদের বিয়ে কিন্তু ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। এখন আমি চাই, আয়াত আর তোর সম্মানটুকু অন্তত অক্ষুণ্ণ রেখে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হোক। কিন্তু যদি তুই নিজেই সেটা না চাস... তাহলে শেষ সম্বল হিসেবে যে সম্মানটুকু বাকি আছে, সেটুকুও আর রক্ষা করতে পারবি না।"
পেনড্রাইভটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে অভ্র আরও এক ধাপ এগিয়ে এল।
— "এতক্ষণে তোর অর্ধেক সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে। বাকি অর্ধেকটা বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে মুখ বন্ধ রাখ। বুঝেছিস, শালা?"
"এখন বাসায় যা। তোর মাকে জানিয়ে দিবি যেন ছেলের বউ ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেয়। এদিকটা আমি সামলে নিচ্ছি।”
মাহাদী রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে একবার অভ্রের দিকে তাকাল। তারপর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের দিকে বিষাক্ত দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে চলে গেল।
মাহাদীর চলে যাওয়া দেখে আয়াত মুখ ভেংচি কেটে ফিসফিস করে বলল,
— "এইবার বুঝো ঠ্যালা!"
অন্যদিকে রাহা ধীর পায়ে বাঁধনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তার অবস্থাটা সত্যিই করুণ।
অঝোর কান্নায় বাঁধনের সমস্ত সাজগোজ এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখের কাজল গাল বেয়ে নেমে এসেছে, চুল উস্কোখুস্কো, মুখের মেকআপ পুরো নষ্ট। তাকে দেখে যেন চেনারও উপায় নেই।
রাহা বুকের ওপর দুই হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
— "মাই ডিয়ার চুন্নি বাঁধন... এখনও এখানেই দাঁড়িয়ে আছিস? তোকে তো একদম মঞ্জুলিকা লাগছে! চল, তোকে কোনো হরর সিনেমায় নায়িকা বানিয়ে দিয়ে আসি। ট্রাস্ট মি... দারুণ মানাবে।"
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার বলল,
— "খুব শখ ছিল না আমার অভ্র ভাইকে বিয়ে করার? নে, এবার সেই স্বপ্ন ভুলে এই আঙ্কেলের সঙ্গে সুখের সংসার কর। জুতা মারার মতো কাজ করার পরেও তোকে জুতা মারিনি তাহলে বুঝ আমার জুতা কতটা এক্সপেন্সিভ।"
রাহার চোখে তখন তীব্র বিদ্রূপ।
— "বলেছিলাম আমাদের জীবন থেকে দূরে থাকতে শুনিসনি। এখন নিজের চোখেই দেখ—তোদের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।"
নিজের গর্বভরে বলল,
— "আমি আশফিয়া খান রাহা..."
পরক্ষণেই নিজের ভুল শুধরে হেসে উঠল।
— "উফস... সরি!”
— "মিসেস জিহাদ খান অভ্র।" কারণ আমাদের আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।এটা তো শুধু লোক দেখানো নাটক ছিল।তোদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
এবার যা। নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলোর সৎকার কর।"
বাঁধনের বাবা এতক্ষণ নীরব ছিলেন।
মেয়ের কাণ্ডকারখানায় তিনি লজ্জায় মাথা তুলতে পারছিলেন না। বহুবার বুঝিয়েছিলেন, সতর্ক করেছিলেন; কিন্তু বাঁধন কখনোই তাঁর কথা শোনেনি।
অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে এগিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি হাত বাড়াতেই বাঁধন ঝটকা মেরে সেই হাত সরিয়ে দিল।
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে হনহন করে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
যাই হোক, বিয়েটা তো আর মিথ্যা নয়।
সবার সামনে, শত মানুষের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়েছে। উপস্থিত প্রত্যেকেই এখন সেই সত্যের সাক্ষী।
এদিকে অভ্রের ম্যানেজার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কী করবেন, কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
ঠিক তখনই অভ্র তার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল।
সেই স্পর্শেই যেন মানুষটা কিছুটা সাহস ফিরে পেল।
অভ্র শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "একটা কথাই মনে রেখো... ভালোবাসার ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই। আমি বিশ্বাস করি, তুমি পারবে। কোনো ভয় পেও না। ওদের সঙ্গে যাও। আর মনে রেখো... আমি আছি, সবসময় তোমার পাশে।”
মালিকের দৃঢ় আশ্বাসে আলাউদ্দিনের বুকের ভেতর জমে থাকা অনিশ্চয়তার ভার খানিকটা হালকা হয়ে এলো। অন্তত সাহসটুকু ফিরে পেল।
গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতেই মনে মনে বিড়বিড় করে ভাবল,
"যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বাকি দায়িত্বটা তো আমাকেই পালন করতে হবে। কিন্তু এমন দুর্দান্ত জেদি আর অগ্নিমূর্তির মতো একটা মেয়েকে আমি সামলাব কীভাবে?"
ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়ে উঠল। সামনে অপেক্ষা করছে যে পথ, তা মোটেও সহজ হবে না—সেটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল।
—————
ড্রয়িংরুমে তখন উপস্থিত সবাই নীরবে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলোর রেশ যেন এখনও পুরো বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই।ভারী নীরবতার মাঝেই উপস্থিত সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন—আয়াত আর মাহাদীর বিয়ের পেছনের প্রকৃত ঘটনা কী?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………