আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৫১ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          মাহাদী আর তার বাবার মুখের অভিব্যক্তি তখন দেখার মতো— মুহূর্তের মধ্যেই আত্মবিশ্বাসের জায়গা দখল করে নিল বিস্ময়, চাপা আতঙ্ক।

কিন্তু আসল ঘটনা যে সবে শুরু হয়েছে—এই নির্মম সত্যটি মাহাদীর বোধগম্যতার বাইরে রয়ে গেল।

ঠিক তখনই অভ্র ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এল। জিভ দিয়ে ঠোঁট আর গালের পাশ বুলিয়ে নিল সে। ঠোঁট বেঁকে উঠল এক শীতল, তাচ্ছিল্যভরা হাসি। যে হাসি দেখলে বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। তারপর একেবারে মাহাদীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে বলল—

"আমার জিনিসে হাত দেওয়া এতই সোজা? পেলেপুষে বড় করলাম আমি, চোখে চোখে রাখলাম আমি... আর শেষে কিনা তুই নিয়ে যাবি! এত সাহস রে, মাদারবোর্ড?

'দুই দিনের বৈরাগী—ভাতেরে বলছিস অন্ন!" 

মাহাদী যে ফুটেজগুলো এতক্ষণ সবার সামনে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছিল, সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—অভ্র প্রচণ্ড ক্ষোভে ইচ্ছাকৃতভাবে রাহার বাবাকে ধাক্কা দিয়েছে।

অভ্রের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলো যেন উপস্থিত সবাইকে বহু বছর আগের এক বিস্মৃত দিনের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

—————

ফ্ল্যাশব্যাক…….

রাহার তখন বয়স ছিল মাত্র চার বছর, আর অভ্রের তেরো।

ছোট্ট রাহার প্রতি অভ্রের আকর্ষণ ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। শুরুতে তা ছিল নিছক স্নেহ, যত্ন এবং সুরক্ষার প্রবণতা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতি ধীরে ধীরে অবসেসিভ অ্যাটাচমেন্ট (Obsessive Attachment)-এ রূপ নিতে শুরু করে।

রাহার সামান্য আঘাতেও অভ্র অস্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাত। কেউ তাকে কষ্ট দিলে, কিংবা সামান্যতম অসুবিধা হলেও সে তীব্র রাগ আক্রোশে প্রতিক্রিয়া জানাত। দিন যত গড়াতে থাকে, ততই তার অধিকারবোধ, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাহাকে হারানোর আশঙ্কা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে এই অনুভূতি স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে চরম মাত্রার অবসেসিভ অ্যাটাচমেন্টে পরিণত হয়, যেখানে রাহাকে আগলে রাখাই অভ্রের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমদিকে পরিবারের সবাই বিষয়টিকে স্বাভাবিক শিশুসুলভ স্নেহ বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই তাদের সেই ধারণা ভাঙতে শুরু করল। বিশেষ করে একদিন মাহাদী সামান্য রাহার দিকে হাত বাড়াতেই অভ্র নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, যেটা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়।

সেদিনের ঘটনার পর রাহার বাবা অভ্রকে একান্তে ডেকে অনেক ধৈর্য নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, অতিরিক্ত অধিকারবোধ, অস্বাভাবিক রাগ আর এই ধরনের আচরণ ভবিষ্যতে তার মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সবশেষে তিনি শুধু একটি কথাই বলেছিলেন—

"রাহা এখনো একটা ছোট্ট শিশু, অভ্র।"

কিন্তু সেই কথাগুলো অভ্রের কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে পৌঁছায়নি।

বাড়িতে ফিরেই সে যেন বিস্ফোরিত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হলো। একের পর এক আসবাবপত্র ভাঙচুর করে নিজের জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিল। তার সেই উন্মত্ত আচরণ দেখে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রাহার বাবা গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। নিজের ভাতিজার এই অস্বাভাবিক আচরণ তাকে হতাশ, উদ্বিগ্ন এবং অসহায় করে তুলেছিল।

ঘটনার পর পরিবারের সবাই বারবার জানতে চাইলেও তিনি কাউকে কিছু বলেননি। তবে সেই দিনের পর থেকেই অভ্র তার মেজো চাচ্চুর সঙ্গে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করেনদেয়। তিনি বহুবার কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতিবারই অভ্র তাকে নির্দয়ভাবে উপেক্ষা করেছে।

কয়েকদিন পর অভ্র তার বাবা-মাকে নিয়ে চট্টগ্রামে নানার বাড়িতে যায়। তার নানা তখন মৃত্যুশয্যায়, গুরুতর অসুস্থ। পাহাড়ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত সেই বাড়িটি ছিল অপূর্ব সুন্দর—চারদিকে সবুজের সমারোহ, পাহাড়ের নীরবতা আর শীতল বাতাসে মোড়ানো এক শান্ত নিবাস। কিন্তু সেই অপরূপ সৌন্দর্যও অভ্রের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতাকে একটুও শান্ত করতে পারেনি।

চট্টগ্রামেই অভ্রের মেজো চাচ্চু আরমান খান এবং তার ছোট চাচ্চু আসান খানের আরেকটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে অভ্রের ছোট চাচ্চু প্রায়ই সেখানেই অবস্থান করতেন। অন্যদিকে, ঢাকার মূল কারখানা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতেন রাহার বাবা, আরমান খান।

সেই দিনও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। অন্যদিকে, মাহাদীর বাবা ছিলেন আসান খানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ব্যবসায়িক অংশীদার। তাই সভায় তাদের উপস্থিতিও ছিল অপরিহার্য।

আরমান খান যখন জানতে পারলেন যে তাঁর বড় ভাই চট্টগ্রামে আসছেন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—সভা শেষ হওয়ার পর সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এদিকে আফসানা বেগমও সুযোগটি হাতছাড়া করলেন না। বহুদিন পর সবাই একত্রিত হয়েছে, তাই তিনি আন্তরিকভাবে সবাইকে তাঁদের বাসায় আমন্ত্রণ জানালেন।

যেহেতু পরদিন খুব ভোরেই তাঁদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তাই রাতটি একসঙ্গে কাটিয়ে কিছুটা পারিবারিক সময় উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিল সবাই।

মিটিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে এলো। এরপর আরমান খান, আসান খান, মাহাদীর বাবা এবং মাহাদী—চারজন একসঙ্গে অভ্রের নানার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন।

কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলতেই অভ্রের দৃষ্টি প্রথমেই গিয়ে থামল মাহাদীর ওপর।

মুহূর্তের মধ্যেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হাতের আঙুলগুলো এত জোরে মুষ্টিবদ্ধ করল যে গিঁটগুলো সাদা হয়ে গেল। চোখে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল রোষের আগুন। তার সেই হিংস্র, শীতল ও রক্তচক্ষুর দৃষ্টি একদৃষ্টিতে বিদ্ধ করে রাখল মাহাদীকে—যেন পরমুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

মাহাদীর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রাহার বাবা, আরমান খান। দৃশ্যটি দেখে তিনি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুই ভাবলেন। অভ্রের বাবা এবং আফসানা বেগমের দৃষ্টিও ছেলের সেই অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে গেল না। তারা দুজনই বুঝতে পারলেন, মাহাদীকে সামনে দেখেই অভ্রের ভেতরে আবার সেই পুরোনো আক্রোশ জেগে উঠছে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আগেই আফসানা বেগম আলতো করে অভ্রের কাঁধে হাত রাখলেন। স্নেহমিশ্রিত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

— "বাবা, ভেতরে যাও।”
অভ্র তবুও একচুলও নড়ল না। পাথরের মূর্তির মতো একই স্থানে স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনও নিবদ্ধ ছিল মাহাদীর মুখে।

ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক মুচকি হাসি। আর সেই হাসিটিই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। অভ্রের ভেতরে এতক্ষণ ধরে দমিয়ে রাখা ক্রোধ মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। তার চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল, আর বুকের ভেতর রাগের এক উত্তাল ঝড় বইতে লাগল।

এদিকে একে একে সবাই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেও মাহাদী ইচ্ছে করেই সবার শেষে ধীর পায়ে এগোচ্ছিল।

সুযোগটি চোখে পড়তেই অভ্র আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। বজ্রগতিতে মাহাদীর দিকে তেড়ে যেতে উদ্যত হতেই আফসানা বেগম দ্রুত তার সামনে এসে পথরোধ করলেন। শক্ত করে ছেলের বাহু চেপে ধরে কঠোর কণ্ঠে বললেন,

— অভ্র! কী করছিস? ওরা আমাদের অতিথি। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখ।

মায়ের কণ্ঠে কঠোরতা অনুভব করতেই অভ্র থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোনো কথা না বলে বিরক্তি ও ক্ষোভে হনহন করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।

বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে মিশে যাচ্ছিল, আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। সবুজে মোড়ানো চট্টগ্রাম যেন এক জীবন্ত চিত্রপট। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্ফটিকস্বচ্ছ ঝর্ণার জল অবিরাম বয়ে চলেছে, আর চারপাশে শীতল বাতাস ও পাখির ডাক মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক মোহনীয় পরিবেশ।

কিন্তু প্রকৃতির সেই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যও অভ্রের ভেতরে জ্বলতে থাকা আগ্নেয়গিরির লাভাকে একটুও প্রশমিত করতে পারল না। সে স্থির দৃষ্টিতে ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে রইল, অথচ তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছিল শুধু জমাট বাঁধা ক্রোধ, দহন আর অদম্য অস্থিরতা।

প্রায় বহু বছর পর নানাবাড়িতে পা রাখল অভ্র। সত্যি বলতে, এবারও হয়তো তার আসা হতো না—যদি না মৃত্যুশয্যায় থাকা তার নানা শেষবারের মতো নাতিকে দেখতে চাইতেন।

কারণ অভ্রের কাছে পৃথিবীর সবকিছুর আগে ছিল তার পরি। তাকে রেখে কোথাও যেতে তার মন কখনোই সায় দিত না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত, ভারী কণ্ঠ—

— এতটাই রাগ আমার ওপর?

অভ্র কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে, দৃষ্টি সামনের পাহাড়ের দিকে স্থির রেখেই বরফশীতল কণ্ঠে বলল,

— তোমার ওপর আমার কোনো রাগ নেই, চাচ্চু।

রাহার বাবা, আরমান খান, মৃদু হেসে বললেন,

— তাহলে এত দিন ধরে একটা কথাও বলিস না কেন?

অভ্রের কণ্ঠে তখনও একই রকম নির্লিপ্ততা।

— ইচ্ছে হলে বলব।

— আর এখন ইচ্ছে না হওয়ার কারণটা?

এবার অভ্র ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে চাচ্চুর দিকে তাকাল। তার চোখের গভীরে জমে থাকা অভিমান উগরে দিলো।

— কারণটা তুমি আমার চেয়ে অনেক ভালো জানো।

আরমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে বললেন,

–"অভ্র, তুই এখনও অনেক ছোট। তোর ভালোর জন্যই তোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। একজন চাচ্চুর চেয়ে বাবা হিসেবে সেটা ছিল আমার দায়িত্ব ও অধিকার ।”

অভ্রের ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ এক হাসি দিয়ে বলল,

— দায়িত্ব তো খুব ভালোভাবেই পালন করেছ। আর কিছু বাকি আছে?

অভ্রের কথায় আরমান খানের মুখমণ্ডল মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল গভীর অসহায়ত্ব ও আক্ষেপ। এই একগুঁয়ে ছেলেটিকে আর কীভাবেই বা বোঝাবেন তিনি? এত বছরের পুরোনো একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভ্র আজও নিজের অভিমান ও ক্ষোভকে বুকে পাথরের মতো চেপে ধরে আছে।

সন্ধ্যার মনোরম পরিবেশ উপভোগ করার উদ্দেশ্যেই সবাই বাইরে বেরিয়েছিল। তবে আরমান খান খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন, মাহাদীকে অভ্রের সামনে আনলে পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই আগেভাগেই তিনি তাঁর ছোট ভাই আসান খানকে ইশারায় সব বুঝিয়ে মাহাদীকে নিয়ে অন্যদিকে ঘুরতে পাঠিয়ে দেন।

অন্যদিকে, মাহাদীর বাবার কিছু জরুরি কাজ থাকায় তিনি তাঁদের সঙ্গে যাননি। কাজ সেরে অল্প কিছু সময়ের জন্য এখানে এসেছেন—শুধু পাহাড়ি প্রকৃতির নির্মল হাওয়ায় কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমান খান এবং আফসানা বেগমও।

আরমান খান যখন ধীর পায়ে অভ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত সবাই নীরবে একটিই প্রার্থনা করছিলেন—বহু বছরের জমে থাকা এই অভিমান, দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক। সেই আশাতেই কেউ তাঁদের কথোপকথনের মাঝে বাধা দিল না। ইচ্ছাকৃতভাবেই দুজনকে একান্তে কথা বলার সুযোগ দিয়ে বাকিরা নীরবে সরে গেল।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে পরিবেশের শান্ত আবহ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। দুজনের কণ্ঠেই চাপা উত্তেজনা এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমানের স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠতে লাগল।

অভ্র চোয়াল শক্ত করে, শীতল দৃষ্টিতে বলল,

— মেজো চাচ্চু, ওকে এখানে এনেছ কেন? তুমি কি জানো না, ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই?

আরমান খান ধৈর্য হারালেন না। শান্ত, সংযত কণ্ঠে বললেন,

— দেখ অভ্র, দিন দিন তুই বড় হচ্ছিস। আর ছোট নেই। মাহাদী এমন কী অপরাধ করেছে, যার জন্য আজও তাকে এভাবে ঘৃণা করে যাচ্ছিস? ও তো তোরই সমবয়সী। পুরোনো সবকিছু ভুলে এবার স্বাভাবিক হ।

কথাগুলো বলতে বলতে তিনি স্নেহভরে অভ্রের কাঁধে হাত রাখার জন্য এক পা এগিয়ে এলেন।

কিন্তু অভ্র যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতোই হঠাৎ দু’পা পিছিয়ে গেল। তার মুখাবয়বে বিরক্তি এবং তীব্র অনীহা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আরমান খান মুহূর্তেই বিচলিত হয়ে পড়লেন। সামনে তাকিয়েই উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— অভ্র! এদিকে আয়। আর পিছাস না... পড়ে যাবি!

কিন্তু অভ্রের মুখে কোনো ভয়, দ্বিধা কিংবা উদ্বেগের ছাপ ছিল না। বরং ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের একটি রেখা ফুটে উঠল। তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে মেজো চাচ্চুর দিকে তাকিয়ে সে এক শব্দে জবাব দিল—

— তো?

— "এই ঘাড়তেরা ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা গেল না!"—বিরক্তি আর উৎকণ্ঠা মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আরমান খান।

অভ্রকে একই জায়গায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। দ্রুত এগিয়ে এসে শক্ত করে অভ্রের বাহু চেপে ধরলেন। এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে এনে দুজনের অবস্থান বদলে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে অভ্রকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দিয়ে নিজেই চলে এলেন বিপজ্জনক প্রান্তের দিকে।

কিন্তু অভ্র এই স্পর্শ মেনে নিতে পারল না। বিরক্ত হয়ে চাচ্চুর হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিতে উদ্যত হতেই সবকিছু যেন এক নিমিষে ওলটপালট হয়ে গেল।

আরমান খানের পায়ের নিচের মাটি হঠাৎই সরে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে তিনি খাদটির দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলেন। ঠিক শেষ মুহূর্তে প্রাণপণে পাশের মাটির উঁচু অংশ আঁকড়ে ধরলেন। তার পুরো শরীর তখন খাদ আর মাটির মাঝখানে ঝুলে আছে।

দৃশ্যটা চোখের সামনে ঘটতেই অভ্রের বুক কেঁপে উঠল। তার মুখের সমস্ত রাগ, জেদ আর বিদ্রূপ মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। আতঙ্কে চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। বুকফাটা, কাঁপা কণ্ঠে সে চিৎকার করে উঠল—

— "চাচ্চু...!!”

ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদীর বাবা, আরাফ শিকদার, চারপাশের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিলেন। অজান্তেই সেই ভয়াবহ ঘটনাটিও তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে গেল।

তবে ক্যামেরার ফ্রেমে যা ধরা পড়ল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। দেখে মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড ক্ষোভে অভ্র যেন আরমান খানকে ধাক্কা মেরে খাদে ফেলে দিয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে সেই মুহূর্তের দৃশ্যের ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

অন্যদিকে, অভ্র প্রাণপণ শক্তিতে আরমান খানের হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে। নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও তাকে ওপরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে তো আর এতটা শক্তিশালী নয় যে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে একা টেনে তুলতে পারবে।

তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তবুও সে এক ইঞ্চিও হাত ছাড়ল না।

আতঙ্কে কাঁপা গলায় বারবার চিৎকার করে উঠল—

— "বাবা...! মা...! কেউ আছো? প্লিজ...! চাচ্চুকে বাঁচাও!"

কিন্তু চারপাশে শুধু পাহাড়ের নীরবতা আর প্রতিধ্বনি। তার সেই আর্তচিৎকার যেন ফিরে ফিরে কেবল তার কাছেই ফিরে আসছিল।

কারণ বাকিরা তখন অনেক আগেই বাড়ির দিকে ফিরে গিয়েছিলেন।

শুধু আরাফ শিকদারই কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। পাহাড়, ঝর্ণা আর অস্তগামী সূর্যের মোহনীয় দৃশ্য তার এতটাই ভালো লেগেছিল যে, বিদায় নেওয়ার আগে কয়েকটি ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন।

অভ্রের মরিয়া চিৎকার কানে আসতেই তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়ে ছুটে এলেন ঘটনাস্থলে।

তাকে দেখেই অভ্রের বুকের ওপর থেকে যেন এক পাহাড়সম বোঝা নেমে গেল। নিভে যাওয়া আশার প্রদীপে আবার আলো জ্বলে উঠল। কাঁপা, আকুল কণ্ঠে সে বলে উঠল—

— "আঙ্কেল...! প্লিজ...! তাড়াতাড়ি...! আমার চাচ্চুকে ওপরে তুলুন...!"

মৃত্যুর দুয়ারপ্রান্তে ঝুলে থেকেও আরমান খানের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে যেন লুকিয়ে ছিল একটাই উপলব্ধি—যে ছেলেটা এতক্ষণ মুখে রাগ, অভিমান আর তাচ্ছিল্যের কথা বলছিল, সেই ছেলেটাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আজ তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে।

আরাফ শিকদার অভ্রকে এক পাশে সরে দাঁড়াতে ইশারা করে নিজেই আরমান খানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

আরমান খানও দেরি না করে তাঁর হাত দৃঢ়ভাবে ধরলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরাফ শিকদার গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,

— "অভ্র, এক মুহূর্তও দেরি কোরো না। দ্রুত তোমার বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে এসো। এদিকে আমি আরমানকে সামলানোর চেষ্টা করছি।"

এক মুহূর্তও নষ্ট না করে অভ্র দ্রুত তাদের আনতে ছুটে গেল।

অভ্র চোখের আড়ালে যেতেই আরাফ শিকদারের চোখে এক ঝলক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলে গেল। তবে পরের মুহূর্তেই তিনি আবার উৎকণ্ঠিত মুখভঙ্গি ধারণ করলেন।

এদিকে তার প্রতিটি টান এবং প্রতিটি প্রচেষ্টা দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন প্রাণপণ চেষ্টা করে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর মুখে উৎকণ্ঠা, কপালে ঘাম, চোখে ব্যর্থতার ছাপ—সবকিছুই ছিল নিখুঁত অভিনয়ের মতো বিশ্বাসযোগ্য।

একপর্যায়ে ভারসাম্য হারাতে হারাতে আরমান খান কষ্টভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— "কী করছো, পার্টনার...? আরেকটু জোর দাও... আমি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি...!"

সেই আর্তনাদ যেন মুহূর্তের জন্য সময়কেও স্থির করে দিল।

আর ঠিক তখনই...

উদ্বেগাক্রান্ত মুখাবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল রূপটি নিঃশব্দে প্রকাশ পেল। যন্ত্রণার আবরণ ধীরে ধীরে সরে গেল, আর তার জায়গায় ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শীতল, বিকৃত, হিংস্র ও কূটিল শয়তানি হাসি।

সেই হাসি কোনো মানুষের হাসি ছিল না—বরং বহু বছরের প্রতিশোধ, ঘৃণা এবং অন্ধকার ষড়যন্ত্রের নীরব বিজয়ঘোষণা।
আরাফ শিকদারের এমন রূপ দেখে রাহার বাবা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— "আপনি এমন করছেন কেন?"

— "কেমন করছি?"

— "আপনার আচরণ, ভঙ্গি—কোনোটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আপনার মানসিক অবস্থাও মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।"

আরাফ শিকদার ঠোঁটের কোণে এক শীতল, রহস্যময় হাসি টেনে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,

— "কারণ, তোর সামনে আজ স্বয়ং মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে আছে।"

রাহার বাবার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

— "মানে...!

— "হ্যাঁ। তোকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমি অনেক আগেই নিয়ে ফেলেছিলাম।যেদিন আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে রওনা দিয়েছিলাম, সেদিনই পুরো পরিকল্পনাটা মাথায় এঁকে ফেলেছিলাম। আজ এখানে আসার আগেই সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে রেখেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল–মাহাদী আর আমি তোর সঙ্গে বের হব, কিন্তু মাঝপথে আমি আর আমার ছেলে আগে নেমে যাব। এরপর পরিকল্পিত সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে তোর মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হবে।"

হঠাৎই থেমে তার ঠোঁটের কোণে আরও নিষ্ঠুর এক হাসি ফুটে উঠল।

"মানুষ যখন রাগে অন্ধ হয়, তখন শয়তানের আর বেশি কিছু করতে হয় না।”

— "তবে শেষ পর্যন্ত আর সেই ঝামেলাও করতে হলো না। ভাগ্য যেন আমার পক্ষেই ছিল। অভ্র নিজের হাতেই পুরো কাজটা আমার জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছে। আমার আর হাত নোংরা করারও প্রয়োজন পড়েনি।”

রাহার বাবা রাগ আর অবিশ্বাসে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন,

— "তুই পাগল হয়ে গেছিস নাকি, বাস্টার্ড! কীসব প্রলাপ বকছিস? আমি তোর কী ক্ষতি করেছি যে আমার প্রাণটাই নিতে চাইছিস?"

আরাফ শিকদার ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে শীতল কণ্ঠে বলল,

— "ক্ষতি? আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশটাই তুই করেছিস। মীরসরাইয়ে যে বিশাল ফ্যাক্টরিটা আমার হওয়ার কথা ছিল, যার জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি, বছরের পর বছর পরিকল্পনা করেছি, সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল—শেষ মুহূর্তে তোর ভাই 'দিচ্ছি, দিচ্ছি' বলে পুরো প্রজেক্টটাই তোর হাতে তুলে দিল। বল তো, এটা কি ন্যায় হয়েছে? আমার জায়গায় তুই থাকলে কি এটা মেনে নিতে পারতিস?"

রাহার বাবা হতবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। 

কিছুক্ষণ পর তিনি কষ্টভরা গলায় বললেন,

— "এই সামান্য সম্পত্তি আর ব্যবসার জন্য তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস? একজন নির্দোষ মানুষকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিস? লোভ তোকে মানুষ থেকে অমানুষ বানিয়ে দিয়েছে, আরাফ!"

আরাফ শিকদার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— "না... এখনও সব শেষ হয়নি। অভ্র আমার কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে। ছেলেটার জেদটা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। তবে সেই জেদই ওর মৃত্যুর কারণ হবে।"

সে চোখে হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— "ভাবছি, তোকে সরানোর পর অভ্রকেও চিরতরে শেষ করে দিই। এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে। তখন আমার পথে আর কোনো বাধাই অবশিষ্ট থাকবে না।”

রাহার বাবা রক্তচক্ষু করে গর্জে উঠলেন,

— "খবরদার! আমার অভ্রের নাম মুখেও আনবি না। আমার যদি কিছু হয়, এই ছেলেটাই তোকে ছেড়ে কথা বলবে না। ওকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ চেনে না। ও নিজের মানুষকে রক্ষা করতে নিজের জীবনটাও বাজি রাখতে দ্বিধা করবে না।"

কথা শেষ হতেই আরাফ শিকদার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

— "হা... হা... হা...! এত বিশ্বাস? ঠিক আছে, একেবারে মেরে ফেলব না। তবে এমন শাস্তি দেব, বেঁচে থেকেও প্রতিটি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করবে। তিলে তিলে ক্ষয়ে যাবে, প্রতিটি ক্ষণে নিজের অস্তিত্বকে অভিশাপ দেবে। আমার ছেলেকে মারার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাই না?"

রাহার বাবা তড়িঘড়ি করে বললেন,

— "দেখ, অভ্র এখনও ছোট। রাগের মাথায় ভুল করে ফেলেছে। ইচ্ছে করে কিছু করেনি।"

আরাফ শিকদারের চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।

— "ওর হয়ে আর সাফাই গাইতে হবে না। আমি সব জানি। আর এখন প্রমাণও আমার হাতেই আছে।"

সে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি টেনে বলল,

— "এই নে... নিজের চোখেই দেখে নে।"

ফোনের স্ক্রিনটা রাহার বাবার সামনে তুলে ধরতেই ভিডিওটি চলতে শুরু করল।

ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—প্রচণ্ড রাগে অভ্র আরাফ শিকদারকে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা খেয়ে আরাফ নিচে পড়ে যাচ্ছে। অভ্র তাকে ধরে রেখেছিল কিংবা তিনি নিচে ঝুলে ছিলেন—সেই অংশটুকুর কোনো অস্তিত্বই নেই। পুরো ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন অভ্র ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে।

আরাফ শিকদার শয়তানি হাসি হেসে বলল,

— "বলেছিলাম না? একটা ভিডিও কত সহজে সত্যিকে মিথ্যায়, আর মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে পারে। এবার দেখ, এই ভিডিও দিয়েই কীভাবে অভ্রর জীবনটা আমি ধ্বংস করে দিই।"

রাহার বাবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন,

— "মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলেই কি ভেবেছিস আমি ভেঙে পড়ব? ভুল ভাবছিস। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আমার সাহস, আমার তেজ এক বিন্দুও কমেনি।”
রাহার বাবা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

— "বাঘ মৃত্যুর মুখেও মাথা নত করে না, আরাফ। ওরা মরতে জানে, ভয় পেতে নয়।”

কথাটি শুনেই আরাফ শিকদার উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

— "ওহ্ তাই নাকি? তাহলে দেখ, সেই বাঘকে আমি কীভাবে অসহায় বিড়ালে পরিণত করি। যদি তা না পারি, তবে আমার নামও আরাফ শিকদার নয়!"

বলেই তার চোখে জ্বলে উঠল উন্মত্ত প্রতিহিংসার আগুন। কণ্ঠস্বর আরও কঠোর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল।

— "তুই মরবি। তারপর তোর ছোট ভাই। এরপর অভ্র। একে একে সবাই।"

সে ঠান্ডা হাসল।

— "শেষে তোর মেয়েটাকে আমার ছেলের বউ বানাব। তখন তোর সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক হবে আমার পরিবার।"

আরাফ ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

— "মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর হলো—সব হারিয়ে বেঁচে থাকা। অভ্রকে আমি সেই শাস্তিই দেব।ওকে আমি এমনভাবে ধ্বংস করব, যাতে সে নিজের নামটাও ভুলে যায়। ওর সম্মান, পরিচয়, ভবিষ্যৎ—সব ছাই করে দেব। ওকে এমন অসহায় করে তুলব যে নিজের বাড়িতেও তার ঠাঁই হবে না। সবাই ওকে ঘৃণার চোখে দেখবে।"

আরমান খান মরিয়া হয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— "দেখ আরাফ... আমার যা কিছু আছে—ফ্যাক্টরি, ব্যবসা,জমিজমা,সম্পত্তি—সবকিছু তোকে লিখে দেব। তবু প্লিজ, এমনটা করিস না। আমার অভ্রের কোনো ক্ষতি করিস না... আমার ছোট ভাইয়ের দিকেও হাত বাড়াবি না। আমি সব ছেড়ে দিতে রাজি আছি।"

আরাফ শিকদার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— "হুঁ! এখন প্রাণের ভয়ে এসব বলছিস। পরে সুযোগ পেলেই আবার আমার গলায় ছুরি ধরবি। আমি কি এতটাই বোকা?"

আরমান খান অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় আবার বললেন,

— "বিশ্বাস কর... আমি কথা দিচ্ছি। আমার সমস্ত সম্পত্তি তোকে দিয়ে দেব। শুধু আমার পরিবারটার কোনো ক্ষতি করিস না।"

কথাটা শেষ করারও সুযোগ পেলেন না তিনি।

আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।
ধীরে ধীরে সে মুঠিটা আলগা করে দিল।

– “আআআআ...!”

বুকফাটা সেই চিৎকারটা মুহূর্তেই পাহাড়ের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হলো।

এক পলকেই আরমান খানের দেহটা অতল অন্ধকার খাদের মধ্যে তলিয়ে গেল।
চারপাশে নেমে এলো এমন এক মৃত্যু-নীরবতা, মনে হলো প্রকৃতিও কয়েকটা মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।

তারপর…

দূর থেকে অভ্রকে আসতে দেখেই আরাফ শিকদারের চোখে মুহূর্তের জন্য বিজয়ের ঝিলিক খেলে গেল।কিন্তু পরক্ষণেই সে নিখুঁত অভিনয়ে নিজের চেহারার ভাব পাল্টে ফেলল।

ঠোঁটের পৈশাচিক হাসিটা মুছে গেল। চোখে ফুটে উঠল নকল আতঙ্ক, আর গলা দিয়ে বের হলো ভাঙা কান্না।

ঠিক তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে পৌঁছে গেল অভ্র, আমান খান ও আফসানা বেগম।
সামনে তাকিয়েই অভ্র থমকে গেল।

শুধু খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে আরাফ শিকদার।

অভ্রর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল।
ঘামে ভিজে গেছে পুরো শরীর। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। কিন্তু সামনে এসে চোখে পড়ল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।

চাচা কোথাও নেই...

খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে শুধু আরাফ শিকদার।

ঠিক তখনই যেন অভ্রর চারপাশ থমকে গেল। পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। চোখের মণি বিস্ফারিত, মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল।

পরের মুহূর্তেই তার দুই হাঁটু ভেঙে গেল।

ধপ করে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। কাঁপতে থাকা দুই চোখ স্থির হয়ে রইল সেই গভীর, অন্ধকার খাদটার দিকে…

পরিস্থিতি অনুধাবন করেই এক নিমেষে নিজের মুখোশ বদলে ফেলল আরাফ শিকদার। মুহূর্ত আগেও যার ঠোঁটে ছিল পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি, পরক্ষণেই সে বুক চাপড়ে বিলাপ শুরু করল। চোখেমুখে কৃত্রিম শোকের ছাপ ফুটিয়ে অভ্রর দিকে আঙুল তুলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

— "অভ্র...! তুমি এটা কী করলে? কেন করলে? তোমার রাগ কি এতটাই বেশি ছিল? মাহাদী তো শুধু রাহাকে ধরতে গিয়েছিল! সেই কারণেই না হয় তোমার চাচ্চু তোমাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। তাই বলে তুমি ওকে এমন ধাক্কা দিলে? তুমি কীভাবে পারলে, অভ্র? নিজের রাগের বশে তুমি একজন নির্দোষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে!"

আরাফ শিকদার এমনভাবে কথাগুলো বলছিল, যেন পুরো ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সে-ই। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দুও ছিল নিখুঁত অভিনয়ের অংশ।

এদিকে আমান খান ছুটে এসে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েই বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলেন,

— "ভাই...! আমার ভাই...!"

তিনি উন্মাদের মতো চারদিকে তাকাতে লাগলেন। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ভাঙা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,

— "এ কী সর্বনাশ হয়ে গেল! কীভাবে হলো এসব? আমি তো নিজের চোখে দেখলাম, তোরা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলি। এরই মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল কীভাবে?"

কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার আর কান্না একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি অসহায়ের মতো খাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না—নিজের ভাই আর নেই।

আফসানা বেগমও নিজেকে সামলাতেপারলেন না। তিনি ভেঙে পড়লেন। বুকফাটা কান্নায় চারদিক ভারী হয়ে উঠল। চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,

— "না...! এটা হতে পারে না। আমার ছেলে এমন কাজ কোনোদিনও করতে পারে না। আমি আমার অভ্রকে চিনি। ও রাগ করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু ইচ্ছে করে একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে না। কখনোই না...!"

আরাফ শিকদার গম্ভীর মুখ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের মোবাইল ফোনটি বের করে সবার সামনে তুলে ধরল।

— "বিশ্বাস না হলে নিজেরাই দেখুন।"

ভিডিওটি চালু হতেই সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল ফোনের স্ক্রিনে।

ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—অভ্র প্রচণ্ড রাগের মাথায় আরাফ শিকদারকে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা খেয়ে তিনি নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছেন...

ঠিক তখনই ভিডিওটি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।

পরবর্তী অংশ—যেখানে সত্যিটা লুকিয়ে ছিল, যেখানে অভ্র তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল—সেটা আর কেউ দেখতে পেল না। নিখুঁতভাবে সম্পাদিত সেই ভিডিও পুরো ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছিল, যেন সমস্ত দোষ একমাত্র অভ্ররই।

ভিডিওটি শেষ হতেই চারপাশে নেমে এলো এক দমবন্ধ করা নীরবতা।

এখন কী হবে?

রাহাকে কী বলা হবে?

সাথীকে কীভাবে এই ভয়ংকর খবর জানানো হবে?

ঘটনাটি যদি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সবাই তো অভ্রকেই দোষী ভাববে। আইনও হয়তো প্রথমে এই ভিডিওকেই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করবে। যদিও সে এখনও প্রাপ্তবয়স্ক নয়, তবুও আইনি জটিলতা, বিচার, জিজ্ঞাসাবাদ আর সমাজের নির্মম অভিযোগ—সবকিছুর ভার গিয়ে পড়বে তার কাঁধে।

আফসানা বেগমের বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল।

একদিকে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে পরিবারের ওপর নেমে আসা অকল্পনীয় বিপর্যয়।

একজন মা হয়ে তিনি কোন দিকটা সামলাবেন?

ছেলের নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন, নাকি পরিবারের এই অসহনীয় শোককে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজবেন?

এ যেন এমন এক দুঃস্বপ্ন, যেখান থেকে জেগে ওঠারও কোনো উপায় নেই।

এতক্ষণ ধরে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ, অপবাদ আর নির্মম নাটক নীরবে সহ্য করছিল অভ্র। কিন্তু আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্রোধ যেন মুহূর্তেই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো।

চারপাশে চোখ পড়তেই মাটিতে পড়ে থাকা ইটের একটি ভাঙা টুকরো তুলে নিল সে।

পরের মুহূর্তেই সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটি ছুড়ে মারল আরাফ শিকদারের কপাল লক্ষ্য করে।

ঠাস!

ইটের টুকরোটি সজোরে গিয়ে আঘাত করল তার কপালে।

— "আআআআআ...!"

বিকট আর্তচিৎকার দিয়ে কপাল চেপে ধরল আরাফ শিকদার। আঘাতের স্থানে সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো। টলতে টলতে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল সে।

এদিকে অভ্র যেন আর নিজের মধ্যে নেই। রক্তাভ চোখ, ফুলে ওঠা শিরা, ক্ষোভে কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে হিংস্র বাঘের মতো আরাফ শিকদারের দিকে তেড়ে গেল।

ঠিক তখনই আফসানা বেগম আর আমান খান ছুটে এসে দুজন মিলে শক্ত করে তাকে আটকে ধরলেন।

তবুও অভ্র ছটফট করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। ক্রোধে তার পুরো শরীর কাঁপছে।

— " ছাড়ো আমাকে! আজ এই কুত্তার বাচ্চাকে আমি জীবিত ছাড়ব না! জানোয়ার! তুই-ই আমার চাচ্চুকে মেরেছিস! তুই-ই আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলি! তুই-ই তো বলেছিলি বাবা-মাকে ডেকে আনতে! সবকিছু তুই পরিকল্পনা করে করেছিস! এখন আবার আমার ওপর মিথ্যে অপবাদ চাপাচ্ছিস? কেন? কেন এত মিথ্যে বলছিস? বল! আজ তোকে আমি ছাড়ব না!"

প্রতিটি শব্দের সঙ্গে অভ্র আরও উন্মত্ত হয়ে উঠছিল। তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে, কিন্তু সেই অশ্রুর চেয়েও ভয়ংকর ছিল তার বুকভরা ক্রোধ, অসহায়ত্ব আর প্রিয় মানুষকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা।

কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত হাতের তালু দিয়ে মুছতে মুছতে আরাফ শিকদার অসহায় ভঙ্গিতে আমান খান ও আফসানা বেগমের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

— দেখেছেন, ভাই সাহেব? দেখেছেন, ভাবি? ছেলেটা কতটা উগ্র হয়ে গেছে! এখনও ওর রাগ একটুও কমেনি। আমি তো শুধু ওনাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে উনি নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। বলুন, তখন আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম?

তার প্রতিটি শব্দে ছিল সুচারুভাবে সাজানো অসহায়ত্ব; অথচ অন্তরে সে যেন নিজের ষড়যন্ত্রের সাফল্যে উল্লসিত হচ্ছিল।

এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার শুনে অভ্রর শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, আর এক মুহূর্ত সুযোগ পেলেই সে লোকটার গলা চেপে ধরবে।

ঠিক তখনই...

ঠাস!

আমান খানের হাতের সজোর চড় এসে পড়ল অভ্রর গালে।

আঘাতের তীব্রতায় অভ্র কয়েক পা পিছিয়ে গেল। সে অবিশ্বাসে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

পরক্ষণেই বুকফাটা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

— ওই জানোয়ারটা মিথ্যে বলছে! আমি ধাক্কা দিইনি! আমি শুধু চাচ্চুর হাতটা সরাতে গিয়েছিলাম। চাচ্চু ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে নেয়। কিন্তু উনি পুরোপুরি পড়ে যাননি! আমি নিজেই ওনাকে ধরে রেখেছিলাম। বারবার এই লোকটাকে সাহায্য করতে বলেছি। ও ইচ্ছে করেই সাহায্য করেনি... ও-ই চাচ্চুকে মেরে ফেলেছে!

অভ্রর কণ্ঠে ছিল সত্যের আর্তনাদ। কিন্তু সেই সত্যকে সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণ তার হাতে ছিল না।

কারণ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।

সেখানে শুধু অভ্রর ধাক্কা দেওয়ার মুহূর্তটুকুই রয়েছে। এরপর কী ঘটেছিল, কীভাবে সে চাচ্চুকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল—সেই অংশটুকু পরিকল্পিতভাবে কেটে ফেলা হয়েছে।”

আফসানা বেগম আর আমান খান ছেলের চোখের ভাষা দেখে বুঝতে পারছিলেন, সে মিথ্যে বলছে না। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নির্মম দৃশ্য যেন তাদের বিশ্বাসকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছিল।

একদিকে সন্তানের প্রতি অগাধ আস্থা...

অন্যদিকে চোখের সামনে থাকা সেই ভিডিও—যেটি যেন অভ্রকেই অপরাধী প্রমাণ করছে।

ভেঙে পড়লেন আমান খান।

কাঁপতে কাঁপতে তিনি এগিয়ে গিয়ে আরাফ শিকদারের দুই হাত শক্ত করে ধরে অনুনয়-বিনয়ের সুরে বললেন,

— ভাই সাহেব... আমি আপনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি। দয়া করে এই ঘটনাটা কাউকে বলবেন না। একটু সময় দিন... প্লিজ।

বাবার কথা শুনে অভ্র যেন বজ্রাহত হয়ে গেল।

— বাবা! তুমি ওর কাছে মিনতি করছ কেন? আমি কিছুই করিনি! আমি নির্দোষ!

আমান খান দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর কণ্ঠে বললেন,

— তুই চুপ কর, অভ্র!

— কেন চুপ থাকব? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি! আমি সত্যি বলছি!

এবার আমান খানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।

— তোর মুখের কথায় কী হবে? মানুষ কথা নয়, প্রমাণ বিশ্বাস করে। আর প্রমাণ... প্রমাণ তো আজ তোর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে আছে!

বাবার মুখে এমন নির্মম কথা শুনে অভ্র নির্বাক হয়ে গেল।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার পায়ের নিচের মাটিটাও যেন সরে গেছে।

যেখানে পুরো পৃথিবী তাকে ভুল বুঝলেও সে বিশ্বাস করেছিল—অন্তত তার বাবা তাকে বিশ্বাস করবেন।

কিন্তু আজ...

নিজের বাবার কণ্ঠেই সে শুনল সন্দেহের রায়।

সেই মুহূর্তে অভ্রর চোখের ভেতরকার আলো যেন নিভে যেতে শুরু করল।

অভ্রর ঠোঁট কাঁপছিল। চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এসেছে। বাবার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,

— "তুমি... তুমি আমায় বিশ্বাস করো না, বাবা...?"

কথাটি উচ্চারণ করতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত বেদনা একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু।

তার কণ্ঠে ছিল না কোনো রাগ, না কোনো প্রতিবাদ—ছিল শুধু ভেঙে যাওয়া এক সন্তানের অসীম যন্ত্রণা আর প্রিয় বাবার বিশ্বাস হারানোর গভীর আর্তনাদ।

— "পুরো পৃথিবী আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেও আমি কখনো ভাবিনি, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করবে। তুমি তো জানো, আমি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করতে পারি না। তুমি-ই যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমি কার কাছে আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করব, বাবা?"

সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ভাষা যেন মুহূর্তের জন্য হারিয়ে ফেললেন আমান খান।

আমান খান চোখ বন্ধ করে গভীর এক শ্বাস নিলেন। বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবুও কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

— বিশ্বাস করি... কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু বিশ্বাস দিয়ে কিছু হবে না। এখন পরিস্থিতি আমাদের বিরুদ্ধে। তুই আর একটা কথাও বলবি না। আমাকে সবকিছু সামলাতে দে।

কথাগুলো ছিল কঠোর, কিন্তু প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসহায় বাবার অসহনীয় যন্ত্রণা।

অভ্র নির্বাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল আফসানা বেগমের দিকে।

তার চোখে তখন একটাই আকুতি—মা... অন্তত তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।

কিন্তু আফসানা বেগমও নির্বাক। চোখ বেয়ে শুধু অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতির নির্মমতা যেন তাঁর মুখের সমস্ত ভাষা কেড়ে নিয়েছে।

মায়ের সেই নীরবতা অভ্রর বুকের ভেতর শেষ আশার প্রদীপটুকুও নিভিয়ে দিল।

সে তিক্ত এক হাসি হেসে মাথা নিচু করল। তারপর অশ্রুসিক্ত চোখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,

— ঠিক আছে... যখন তোমরা কেউই আমাকে বিশ্বাস করছ না, তখন আমার নির্দোষিতা আমাকে নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে। আমি নিজেই পুলিশের কাছে যাব। আমি নিজেই সব বলব। আমি পালিয়ে বেড়ানোর মানুষ নই। যদি অপরাধী হই, শাস্তি মাথা পেতে নেব। আর যদি নির্দোষ হই, তাহলে সত্য একদিন না একদিন অবশ্যই প্রকাশ পাবে।

কথাগুলো বলার সময় অভ্রর কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল, কিন্তু তার চোখে তখন ফুটে উঠেছিল এক অদম্য দৃঢ়তা। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করার সংকল্প যেন তাকে মুহূর্তেই আরও কঠিন, আরও অটল করে তুলেছিল।

ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল পুলিশের সাইরেনের শব্দ। 
আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে আবারও ফুটে উঠল সেই চিরচেনা হাসি।
          পুলিশকে আগেই ফোন করে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন আরাফ শিকদার। অল্প সময়ের মধ্যেই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের তীক্ষ্ণ ও কর্কশ শব্দ ভেসে এলো।

সেই শব্দ কানে পৌঁছাতেই অভ্রের বাবা-মায়ের হৃদয় যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার এক শীতল স্রোত তাদের গ্রাস করল। তাদের একমাত্র সন্তান অভ্র—যে তাদের সকল স্বপ্ন, আশা এবং জীবনের প্রধান অবলম্বন। যদি এই মিথ্যা অপবাদ, কুৎসা ও ষড়যন্ত্রের জালে সে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার ভবিষ্যৎ, সম্মান ও ক্যারিয়ার মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।

আফসানা খান কাঁপা ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে এগিয়ে এসে বললেন,

— "এসব কী বলছ, বাবা? আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি... সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি।"

অন্যদিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করলেন আমান খান। তাঁর অভিজ্ঞ দৃষ্টি এক ঝলকেই বুঝে নিল—এ মুহূর্তে আবেগ নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত বিচক্ষণতা। তিনি নীরবে ইশারা করলেন, যেন অভ্রকে দ্রুত বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ এই মুহূর্তে সে এখানে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও উত্তপ্ত ও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে। উত্তেজিত জনতা, পুলিশের উপস্থিতি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কূটচালের মধ্যে সামান্য ভুলও পুরো ঘটনাকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।

অভ্র ধীর, ভারাক্রান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ঠিক সেই স্থানের দিকে, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও তার চাচ্চু দাঁড়িয়ে ছিলেন। খাদের অতল গহ্বরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। দু’চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে, অথচ মুখে নেই কোনো আর্তনাদ—নিস্তব্ধতাই যেন তার বুকভাঙা যন্ত্রণার ভাষা হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পর ভাঙা, রুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল,

— "বাবা... দ্রুত ফোর্সের ব্যবস্থা করুন। যা করা প্রয়োজন করুন... আমি আমার চাচ্চুকে চাই। তাঁকে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনুন।"

কথাগুলো বলেই যেন অভ্রের ভেতরের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

সেদিনের পর থেকেই অভ্র তার বাবা-মাকে ‘তুমি’ নয়, ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করা শুরু করল। একটি মাত্র ঘটনার অভিঘাত তার সম্পর্কের সমীকরণ, অনুভূতি এবং সম্বোধনের উষ্ণতাকেও নিঃশব্দে বদলে দিয়েছিল।

এরপর আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে সে ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। আফসানা বেগমও উৎকণ্ঠায় তার পিছু নিলেন। এই মুহূর্তে ছেলেটির মানসিক অবস্থা এতটাই বিপর্যস্ত যে, তিনি আশঙ্কা করছিলেন—কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বসে।

অন্যদিকে আমান খান একজন চেয়ারম্যান হওয়ায় প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। তিনি বিলম্ব না করে সরাসরি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে অতি দ্রুত উদ্ধারকারী বাহিনী ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল।

এদিকে পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখে মুহূর্তের জন্য আরাফ শিকদারের বুকের ভেতর অস্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কুটিল বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সে মুখে উৎকণ্ঠার মুখোশ পরে উচ্চস্বরে বলে উঠল,

— "আমার বিজনেস পার্টনার এইমাত্র খাদে পড়ে গেছেন! আপনাদের তো সব জানিয়েছি।দয়া করে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করুন। এক মুহূর্তও দেরি করবেন না!"

কথাগুলো বলেই সে একবার আমান খানের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে যেন স্পষ্ট বার্তা লুকিয়ে ছিল—কিছুক্ষণ আগের হুমকি, উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সমস্ত চিহ্ন সে মুহূর্তেই দক্ষতার সঙ্গে আড়াল করে ফেলেছে। এখন সে নিজেকেই উদ্বিগ্ন, নির্দোষ এবং অসহায় একজন সহকর্মী হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে প্রস্তুত।

পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতেই আমান খান আরাফ শিকদারকে সবার আড়ালে একপাশে ডেকে নিলেন। তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সম্মান—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। অসহায়, অনুনয়ভরা কণ্ঠে তিনি বললেন,

— "ভাই... অভ্র এখনও ছোট। রাগের মাথায় ভুল করে ফেলেছে। আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি, ভিডিওটা ডিলিট করে দিন।"

আরাফ শিকদারের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক শীতল, কুটিল হাসি।

— "বিনিময়ে আমি কী পাব?"

আমান খান কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

— "মানে?"

— "মানে খুবই সহজ। পৃথিবীতে কোনো কিছুরই মূল্য ছাড়া লেনদেন হয় না। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না, এত বড় একটা অস্ত্র আমি বিনা স্বার্থে নষ্ট করে ফেলব?"

তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— "আপনি কিছু চাইবেন, আর আমি চোখ বন্ধ করে দিয়ে দেব—এতটা বোকা আমি নই। যতই হোক, আমি আগে একজন ব্যবসায়ী... তারপর একজন শিক্ষক।"

আমান খানের চোখে ঘৃণা আর বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

— "আপনি একজন শিক্ষক হয়ে আপনার শিক্ষার্থীদেরও কি এই নীতিই শেখান? মানবতা, নৈতিকতা, বিবেক—এসব কি আপনার কাছে কেবল বইয়ের পাতায় লেখা শব্দ?"

আরাফ শিকদারের মুখের হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল।

— "আপনাকে আমাকে নীতিকথা শোনাতে বলিনি। অতিরিক্ত কথা বললে কিন্তু এই ভিডিওটা মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। তখন আপনার ছেলের সম্মান, ভবিষ্যৎ, পরিচয়—সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।"

কথাগুলো যেন আমান খানের বুকে ধারালো অস্ত্রের মতো বিদ্ধ হলো। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। সমস্ত অপমান, ক্ষোভ আর অসহায়তা নীরবে গিলে ফেললেন।

আরাফ শিকদার এবার নিজের আসল দাবিগুলো সামনে আনল।

— "প্রথম শর্ত—আপনার ছোট ভাইয়ের ব্যবসার পঞ্চাশ শতাংশ শেয়ার আমার নামে হস্তান্তর করবেন।"

অগত্যা ছেলের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর তাগিদে সেই অপমানজনক শর্তেও নীরবে সম্মতি জানালেন আমান খান।

কিন্তু এখানেই থামল না আরাফ শিকদার।

সে ঠান্ডা, হিসেবি কণ্ঠে বলল,

— "দ্বিতীয় শর্ত... রাহার বিয়ে হবে আমার ছেলে মাহাদীর সঙ্গে।"

এই কথাটি শুনে আমান খান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখে একসঙ্গে ফুটে উঠল বিস্ময়, করুণা এবং ঘৃণা। কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে আরাফ শিকদারের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর কণ্ঠে বললেন,

— "আপনি যা বলছেন, তা কি আপনি নিজেই উপলব্ধি করছেন? অভ্র রাহাকে ছাড়া নিজের জীবন কল্পনাও করতে পারে না। ওদের সম্পর্ক সম্পর্কে আপনি সবই জানেন।"

একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার বললেন,

— "তবুও আমি একটি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। আগে রাহা প্রাপ্তবয়স্ক হোক। এরপর যদি সে নিজের ইচ্ছায় মাহাদীকে বিয়ে করতে চায়, আমি কখনোই বাধা দেব না। তবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত আমি নেব না। কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে না।"

আরাফ শিকদার কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

— "ঠিক আছে... আপাতত এটুকুই যথেষ্ট। ডিল ফাইনাল।”

সারারাত উদ্ধারকারী দল, পুলিশ এবং স্থানীয় মানুষ মিলে খাদের প্রতিটি কোণা তন্নতন্ন করে খুঁজেও আরমান খানের কোনো সন্ধান পেল না। রাত যত গভীর হতে লাগল, সবার মনেও ততই বাড়তে লাগল আশঙ্কার কালো ছায়া।

কিন্তু কেউ জানত না—সেই গভীর খাদের নিচ দিয়েই চলে গেছে একটি দুর্গম, নির্জন গোপন সড়ক। বছরের পর বছর ধরে সেই পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা অবৈধ মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাচার করে।

ঠিক সেই সময় চোরাই মালভর্তি একটি ট্রাক ধীরগতিতে সেই পথ অতিক্রম করছিল।

হঠাৎই—

ধাম!

বিকট শব্দে ওপর থেকে একটি ভারী দেহ এসে সজোরে আছড়ে পড়ল ট্রাকের মালবোঝাই অংশের ওপর। আকস্মিক অভিঘাতে পুরো ট্রাক কেঁপে উঠল।

খাদে পড়ার সময় আরমান খানের মাথা ধারালো পাথরে সজোরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। সেই আঘাতে মাথা ফেটে অবিরাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল তাঁর চুল, মুখ এবং শরীর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও ক্ষীণ শ্বাসপ্রশ্বাস তখনও চলছিল।

হঠাৎ হওয়া প্রচণ্ড শব্দে ট্রাকচালক ভড়কে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিল। কী ঘটেছে বুঝতে না পেরে সে দ্রুত ট্রাকের ওপর উঠে গেল।

উপরে উঠতেই তার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।

একজন মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছেন। ট্রাকের গায়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত চারপাশ লাল করে তুলছে। তবে ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারল—লোকটির বুক এখনও খুব ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ তিনি এখনও বেঁচে আছেন।

চালক তাড়াতাড়ি তার কাছে ছুটে গেল। আরমান খান তখন উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন এবং অস্পষ্টভাবে যেন কিছু বিড়বিড় করছিলেন। লোকটি সাবধানে তাঁকে সোজা করে শুইয়ে দিল।

রক্তে ঝাপসা, নিভু-নিভু চোখদুটি কষ্ট করে একবার খুললেন আরমান খান। তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল, নিঃশ্বাস ছিন্নভিন্ন হয়ে আসছিল। ট্রাকচালক কানটা তাঁর মুখের কাছে নিয়ে যেতেই ক্ষীণ, ভাঙা স্বরে কয়েকটি শব্দ ভেসে এলো—

— "আমাকে... বাঁচান... আমার... একটা ছোট্ট মেয়ে আছে... আমাকে অভ্রকে বাঁচান... ওরা... ওরা আমাকে মেরে ফেলবে..."

এইটুকুই।

এরপরই তাঁর চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ল। তিনি গভীর অচেতনতার অতল অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন।

রক্তাক্ত, অচেতন মানুষটির অসহায় অবস্থা দেখে ট্রাকচালকের বুকটা হুহু করে উঠল। মুহূর্তের জন্য সে দ্বিধায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত মানবিকতাই জয়ী হলো। নিজের ট্রাকটি দ্রুত তাদের গোপন আস্তানায় ফিরিয়ে রেখে, কোনো ঝুঁকি না নিয়ে অন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করল। এরপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আরমান খানকে নিয়ে ছুটল চট্টগ্রামের একটি অপেক্ষাকৃত নির্জন বেসরকারি হাসপাতালে।

হাসপাতালে পৌঁছাতেই কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা রোগীর পরিচয় জানতে চাইলেন।

নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতেই ট্রাকচালক শান্ত কণ্ঠে বলল,

— "উনি... আমার বড় ভাই।"

— "নাম?"

এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে উত্তর দিল,

— "আযহার হোসেন।"

সেই পরিচয়েই হাসপাতালের কাগজপত্র সম্পন্ন করা হলো। এরপর জরুরি ভিত্তিতে শুরু হলো চিকিৎসা। একের পর এক পরীক্ষা, স্যালাইন, অক্সিজেন ও প্রাথমিক চিকিৎসা চলতে লাগল। চিকিৎসকদের পুরো দল জীবন বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলেন দায়িত্বরত চিকিৎসক। তাঁর মুখের গাম্ভীর্যই পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

গভীর, সংযত কণ্ঠে তিনি বললেন,

— "রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। অবিলম্বে রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। মস্তিষ্কেও আঘাতের লক্ষণ রয়েছে। আগামী চব্বিশঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়। এই সময়টুকুই সবচেয়ে সংকটাপন্ন।"

একটু থেমে তিনি আরও বললেন,

— "আরও একটি বড় সমস্যা রয়েছে... রোগীর রক্তের গ্রুপ O নেগেটিভ। এটি অত্যন্ত বিরল (রেয়ার) রক্তের গ্রুপ। যত দ্রুত সম্ভব এই গ্রুপের রক্ত সংগ্রহ করতে না পারলে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।"

ডাক্তারের প্রতিটি শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল ট্রাকচালকের বুকে। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝে গেল—এখন শুরু হয়েছে সময়ের সঙ্গে এক নির্মম লড়াই।

ডাক্তারের কথা শেষ হতেই ট্রাকচালক এক মুহূর্তও দেরি করল না। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

— "ডাক্তার সাহেব... আমার রক্তের গ্রুপও O নেগেটিভ। প্রয়োজন হলে আমার রক্ত নিন। যতটুকু দরকার, আমি দিতে প্রস্তুত আছি।"

কথাটি শুনেই চিকিৎসকদের মুখে আশার ক্ষীণ আলো ফুটে উঠল। আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত তার রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা হলো। সবকিছু ঠিক থাকায় সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত সংগ্রহ করে আরমান খানের শরীরে সঞ্চালন শুরু করা হলো।

রক্তদান শেষ হওয়ার পর ট্রাকচালক উৎকণ্ঠিত চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "তাহলে... উনি কি বেঁচে যাবেন?"

ডাক্তার গভীর নিশ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বললেন,

— "এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেও পারেন, আবার জটিলতাও দেখা দিতে পারে। সবকিছু নির্ভর করছে আগামী চব্বিশঘণ্টার ওপর।"

একটু থেমে তিনি আবার বললেন,

— "আরেকটি বিষয়... অনেক সময় গুরুতর মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত রোগী পরিচিত বা আপনজনের কণ্ঠস্বর, স্পর্শ কিংবা উপস্থিতিতে ইতিবাচক সাড়া দেন। তবে এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বাকি সব মহান আল্লাহর ইচ্ছা। আপনারা দোয়া করবেন।"

ডাক্তারের কথাগুলো শুনে ট্রাকচালকের বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।

একবার তার মনে হলো, সংবাদপত্র কিংবা পুলিশের মাধ্যমে এই অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা উচিত। হয়তো তাঁর পরিবার খোঁজ পেয়ে যাবে।

কিন্তু পরক্ষণেই কানে যেন আবার প্রতিধ্বনিত হলো সেই অস্পষ্ট, কাঁপা কণ্ঠ—

"আমাকে বাঁচান... আমার একটা ছোট্ট মেয়ে আমার অভ্র আছে.আর ওরা আমাকে মেরে ফেলবে..."

কথাগুলো মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। যদি সত্যিই কেউ এই মানুষটিকে হত্যা করতে চায়, তাহলে পরিচয় প্রকাশ করা মানেই হয়তো মৃত্যুকে আরও কাছে ডেকে আনা।

অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে সে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিল।

লোকটির প্রকৃত পরিচয় ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর—সবকিছু সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।

এখন একটাই লক্ষ্য—

যেভাবেই হোক মানুষটিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা।

আর সেই উদ্দেশ্যেই সে চিকিৎসকদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— "টাকার কথা একদম ভাববেন না। যত খরচই হোক, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা যেন না হয়। আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য যা যা করা দরকার, সবই করুন।”

অন্যদিকে নানার বাড়িতে ফিরেই অভ্র নিজেকে ঘরে সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ করে ফেলল। দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ করে সে নিস্তব্ধ ঘরে একা বসে ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে লাগল।

শৈশব থেকেই অভ্র ছিল তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন, বিচক্ষণ এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণে অসাধারণ দক্ষ। সামান্য অসঙ্গতিও তার দৃষ্টি এড়াত না। তাই পুরো ঘটনাটাই তার কাছে অস্বাভাবিক, পরিকল্পিত এবং রহস্যে ঘেরা বলে মনে হচ্ছিল।

কিন্তু সবকিছুর চেয়েও একটি বিষয় তার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত করছিল—

তার নিজের বাবা-মাও কি তাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না?

এই একটি প্রশ্নই বারবার তার বুকে ধারালো ছুরির মতো বিদ্ধ হচ্ছিল।

অবশেষে জমে থাকা যন্ত্রণা, ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়তা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।

প্রচণ্ড রাগে অভ্র ঘরের ভেতর যা কিছু হাতের কাছে পেল, একের পর এক ছুড়ে ভাঙচুর করতে শুরু করল। ফুলদানি, বই, টেবিল ল্যাম্প, কাচের শোপিস—মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু চুরমার হয়ে মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরজুড়ে শুধু কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ আর তার দমবন্ধ করা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

শব্দ শুনে আফসানা বেগমসহ বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এলেন। দরজায় অবিরাম ধাক্কা দিতে দিতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে লাগলেন,

— "অভ্র... বাবা, দরজাটা খোল। প্লিজ, একবার দরজাটা খোল।"

ভেতর থেকে বজ্রগর্জনের মতো চিৎকার করে উঠল অভ্র—

— "চলে যান সবাই! কেউ আমার কাছে আসবেন না। আমি কাউকে দেখতে চাই না। কেউ দরজায় ধাক্কা দেবেন না!"

তার কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান, ক্রোধ আর ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ স্পষ্ট হয়ে উঠল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নির্বাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ আর সাহস করে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।

এদিকে সারারাত ধরে উদ্ধারকারী দল, পুলিশ এবং স্থানীয় লোকজন নিরলসভাবে খাদের প্রতিটি ইঞ্চি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো মরদেহের সন্ধান পেল না। যেন মানুষটি হঠাৎ করেই পৃথিবীর বুক থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

অন্যদিকে খাদের নিচ দিয়ে যে গোপন সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চোরাই মালামাল পরিবহন করা হতো, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেই চক্রের সদস্যরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ফেলেছিল। তারা বুঝে গিয়েছিল—খুব শিগগিরই পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে তল্লাশি চালাবে।

ফলে রাত গভীর হওয়ার আগেই তারা সেখানে থাকা প্রতিটি ট্রাক ও যানবাহন দ্রুত সরিয়ে ফেলে। এরপর পুরো আস্তানাটি সম্পূর্ণ খালি করে প্রধান গেট শক্তভাবে বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই রইল না যে কয়েক ঘণ্টা আগেও সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছিল।

আর সেই কারণেই পুলিশের চোখ এড়িয়ে গেল সেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—যে সূত্রটি হয়তো আরমান খানের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ হয়ে উঠতে পারত।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা নিরলসভাবে খাদের প্রতিটি অংশ গভীরভাবে তল্লাশি চালায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান পরিচালনা করেও আরমান খানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে রাত ফুরিয়ে দিনের আলো ফুটে উঠল এবং সম্ভাব্য সব স্থান পরিদর্শন সম্পন্ন হলে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

পরদিন দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রের শিরোনামে প্রকাশিত হয়—

"বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আরমান খান, চেয়ারম্যান আমান খানের মেজো ভাই, দুর্ঘটনাবশত ভারসাম্য হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে নিখোঁজ।"

সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়—

"ঘটনার পর টানা বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।"

উদ্ধারকারী দলের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, তিনি সম্ভবত খাদের একেবারে গভীরতম অংশে ছিটকে পড়েছেন—যেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত দুর্গম, বিপজ্জনক এবং প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই অধিকাংশ মানুষ ধরে নেন, আরমান খানের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

ধীরে ধীরে গুজব, কানাঘুষা এবং অনুমানই বাস্তবতার স্থান দখল করে নেয়। সবার দৃষ্টিতে আরমান খান তখন আর কেবল একজন নিখোঁজ ব্যক্তি নন—তিনি যেন এক অঘোষিত মৃত্যুর শিকার।

পরদিন ভোর হতেই অভ্র নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। সারারাত না ঘুমানোর কারণে তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, মুখমণ্ডলে স্পষ্ট ক্লান্তি ও মানসিক বিপর্যয়ের ছাপ স্পষ্ট।

বাইরে এসেই শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে প্রথম কথাটি বলল—

— "আমি একবার সেই খাদে যেতে চাই।"

আফসানা বেগম ছেলের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

— "বাবা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, উদ্ধারকারী দল—কেউ কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। সারারাত খুঁজেও তারা কিছুই পায়নি। তুই সেখানে গিয়ে আর কী করবি?"

অভ্র কোনো আবেগ প্রকাশ না করে ঠান্ডা ও সংযত স্বরে জবাব দিল,

— "এর কৈফিয়ত আমি আপনাকে দিতে বাধ্য নই।"

ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করলেন আমান খান।

গত এক রাতের ব্যবধানে যেন তিনি কয়েক বছরের বেশি বয়স্ক হয়ে গেছেন। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, মুখমণ্ডলে অবসাদের ছাপ, আর বুকভরা শোক ও অসহনীয় যন্ত্রণার ভার তাঁকে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। নিজের ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার বেদনা, চারপাশের চাপ এবং অনিশ্চয়তা তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

ঘরে প্রবেশ করতেই অভ্রের শেষ কথাটি তাঁর কানে পৌঁছাল।

মুহূর্তের মধ্যেই জমে থাকা শোক, ক্ষোভ ও অসহায়তা বিস্ফোরিত হয়ে উঠল।

তিনি রুদ্ধ ও ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন—

— "নিজেই মানুষটাকে খাদে ফেলে দিয়ে এখন আবার সেখানে যেতে চাস? কী দেখতে চাস? নিজের কাজের পরিণতি?"

বাবার মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন জ্বলন্ত তীরের মতো অভ্রের বুকে বিদ্ধ হলো।

সে নির্বাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল এই একটিই সত্য—

তার নিজের বাবাও তাকে বিশ্বাস করলেন না।

যে মানুষটির বিশ্বাসকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মনে করত, সেই মানুষটিই আজ কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপরাধীর আসনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

সেই মুহূর্তে অভ্র অনুভব করল, বাইরের পৃথিবীর ভুল বোঝাবুঝি সহ্য করা যায়... কিন্তু নিজের বাবার অবিশ্বাস একজন সন্তানের হৃদয়কে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অভ্র আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। নিঃশব্দে বাবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল গভীর অভিমান, ভাঙা বিশ্বাস এবং অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা।

এরপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

অভ্র চলে যেতেই আফসানা বেগম নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। ক্ষোভ, কষ্ট ও মমতার মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি আমান খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— "এসব আপনি কী বললেন? ছেলেটা তো বারবার বলছে, সে কিছুই করেনি। তাহলে কেন ওকে না শুনেই দোষী সাব্যস্ত করছেন? একবারও কি ওর কথাটা বিশ্বাস করার চেষ্টা করলেন না?"

আমান খান দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠল।

— "তুমি বুঝতে পারছ না, আফসানা... আমার ভাই নেই! আমি কী জবাব দেব সাথীকে? কী বলব ওকে? বলব, আমি নিজের ভাইকেও রক্ষা করতে পারলাম না?"

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলা রুদ্ধ হয়ে এলো।

তিনি ক্লান্ত, ভেঙে পড়া শরীরটা সোফার ওপর এলিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল, এক রাতেই জীবনের সমস্ত শক্তি, সাহস ও স্থিরতা যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।

আফসানা বেগম আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত তাঁর পাশে এগিয়ে এলেন।

— "আপনার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?"

আমান খান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন,

— "প্লিজ... আমাকে একটু একা থাকতে দাও। এখন কারও সঙ্গে কথা বলার মতো শক্তি আমার নেই।"

কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আবার বললেন,

— "আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ঢাকায় ফিরে যাব। এখানে আর থাকার কোনো প্রয়োজন নেই..."

শেষ কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ছিল পরাজয়ের বেদনা, শোকের ভার এবং এক গভীর শূন্যতার প্রতিধ্বনি। যেন তিনি শুধু একজন ভাইকেই হারাননি—হারিয়েছেন নিজের ভরসা, নিজের শক্তি, নিজের একাংশ।

অভ্র অসাধারণ দৃঢ়তা ও অদম্য সাহস নিয়ে আবারও ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিল। তার চোখে তখন আর কোনো অশ্রু ছিল না—বরং ছিল সত্য উদ্ঘাটনের অটল সংকল্প।

ঘটনাস্থলে পৌঁছেই সে একজন অভিজ্ঞ অনুসন্ধানকারীর মতো চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ শুরু করল। রাস্তার কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের অতল গহ্বরের দিকে তাকাল। চোখ যতদূর যায়, ততদূর পর্যন্ত শুধু ঘন জঙ্গল, বিশাল পাথর আর মৃত্যুর মতো নীরবতা। এত গভীরে কিছুই স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব নয়।

কিন্তু অভ্রের দৃষ্টি সেখানে আটকে রইল না।

সে আশপাশের প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি পদচিহ্ন, প্রতিটি অস্বাভাবিকতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। হঠাৎই তার নজরে এলো পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিচের দিকে নেমে যাওয়া একটি সরু কাঁচা রাস্তা।

রাস্তার দিকে তাকিয়েই তার মনে প্রশ্ন জাগল—

"এই পথে কি নিয়মিত যানবাহন চলাচল করে?"

ভাবতে ভাবতেই সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রাস্তার শেষ প্রান্তে থাকা লোহার গেটটির দিকে।

গেটের সামনে পৌঁছে অভ্র থমকে দাঁড়াল।

একদিন আগেও যেখানকার গেট খোলা ছিল, সেখানে এখন মোটা লোহার নতুন তালা ঝুলছে। চারপাশ লতাপাতা ও ঝোপঝাড় দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে, যেন বহুদিন ধরেই এটি পরিত্যক্ত।

দৃশ্যটি অভ্রের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে তুলল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই সূর্যের তীক্ষ্ণ আলো কোনো কিছুর ওপর প্রতিফলিত হয়ে তার চোখে এসে লাগল।

সে নিচে তাকাতেই দেখল, গেটের একপাশে ধুলোমাখা মাটির ওপর একটি সোনালি আংটি ঝকঝক করছে।

অভ্র দ্রুত সেটি হাতে তুলে নিল।

আংটিটি দেখেই তার বুক কেঁপে উঠল।

"এটি সে হাজার মানুষের ভিড় থেকেও চিনে নিতে পারবে। এটি তার চাচ্চু আরমান খানের আংটি।”

মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।

সে নিচু হয়ে চারপাশ আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, আত্মবিশ্বাসী হাসি।

সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

— "তার মানে... চাচ্চু সরাসরি গভীর খাদে পড়েননি। তিনি এই রাস্তার দিকেই এসেছিলেন।"

তার দৃষ্টি আবার মাটির ওপর ছুটে বেড়াতে লাগল।

— "আর যদি সত্যিই এখানে পড়ে থাকেন... তাহলে এখানে রক্তের চিহ্ন থাকার কথা। কোনো না কোনো প্রমাণ অবশ্যই থেকে যাওয়ার কথা..."

এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল। তারপর চোখ খুলে তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

কারণ সে বুঝে গেছে—

এই জায়গাটাই পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রথম সূত্র।

ভাবতেই অভ্রের ঠোঁট হাসি ফুটে উঠে,
আংটিটি দৃঢ়ভাবে মুঠোয় চেপে ধরে অভ্র এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দ্রুত ছুটে বেড়াতে লাগল। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—গত রাতে কোনো অজ্ঞাত পরিচয়ের গুরুতর আহত রোগী ভর্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া।

তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে তার সজোরে ধাক্কা লাগে।

ভারসাম্য হারিয়ে অভ্র প্রায় মাটিতে পড়ে যেতে নিলে লোকটি দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে দৃঢ়ভাবে ধরে ফেলেন।

লোকটির দৃষ্টি তখন নিবিড়ভাবে স্থির হয় অভ্রের মুখে।

ছেলেটির পরনের পোশাক এলোমেলো ও ধুলো-ময়লায় বিবর্ণ। চুল সম্পূর্ণ উস্কোখুস্কো। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, গাল বসে গেছে, আর দু’চোখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে কয়েক রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার ছাপ।

মুহূর্তেই লোকটির মনে প্রশ্ন জাগে—

"একজন অল্পবয়সী ছেলের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা কেন?"

অভ্র নিজেকে সামলে নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল,

— "ধন্যবাদ, আঙ্কেল।"

এরপর আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে উদ্যত হলো।

কিন্তু লোকটি তাকে থামিয়ে শান্ত ও স্নেহময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

— "কী হয়েছে বাবা? তোমার এমন অবস্থা কেন?"

অভ্র মৃদু, মলিন একটুখানি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।

— "কিছু না, আঙ্কেল। আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।"

এইটুকু বলেই সে প্রায় দৌড়ে রিসেপশনের দিকে চলে গেল।

হাঁপাতে হাঁপাতে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

— "গত রাতে... আরমান খান নামে কোনো রোগী এখানে ভর্তি হয়েছেন?"

রিসেপশনে থাকা কর্মীরা কম্পিউটারে তথ্য যাচাই করে কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন,

— "না, এই নামে কোনো রোগী ভর্তি নেই।"

উত্তরটি শোনামাত্র অভ্রের বুকের ভেতর যেন শেষ আশার প্রদীপটুকুও নিভে গেল। পুরো শরীর হঠাৎ করেই নিস্তেজ হয়ে এলো।

সে পাশের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল। মাথা দু’হাতের মাঝে চেপে ধরে নিঃশব্দে শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।

এদিকে সেই মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিটি এতক্ষণ দূর থেকেই অভ্রের প্রতিটি আচরণ গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

অবশেষে তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অভ্রের সামনে দাঁড়ালেন।

মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি ধীরে ধীরে এসে অভ্রের পাশে বসলেন। স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

— "আরমান খান তোমার কে হন?"

অভ্র শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— "আমার চাচা।"

— "তিনি এখন কোথায়?"

অভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে উত্তর দিল,

— "জানি না..."

লোকটি কপাল কুঁচকে আবার প্রশ্ন করলেন,

— "জানি না মানে কীভাবে?"

অভ্রের গলা ভারী হয়ে এলো।

— "গত রাতে... তাঁকে হারিয়ে ফেলেছি।"

__”তোমায় নাম অভ্র..?”

__ “হ্যাঁ আপনি কীভাবে জানলেন”?

কথাটি শুনে লোকটির চোখে এক ঝলক বিস্ময় ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ নীরবে অভ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,

— "তোমার চাচার কি কোনো শত্রু ছিল?”

অভ্র বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে তাকাল।

— "মানে?"

লোকটি চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

— "চলো... আমার সঙ্গে আসো। তোমাকে কিছু দেখাতে চাই।"

অভ্র কিছুটা সতর্ক হয়ে গেল।

— "কিন্তু... আপনি কে?"

লোকটি শান্ত স্বরে জবাব দিলেন,

— "আমার নাম জয়নাল। তুমি আমাকে চিনবে না। তবে বিশ্বাস করো, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।"

অভ্র কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অজানা এক বিশ্বাসে লোকটির সঙ্গে পা মেলাল।

কিন্তু শরীর যেন আর তার সঙ্গ দিচ্ছিল না।

গত একদিনের দিনের মানসিক আঘাত, নির্ঘুম রাত এবং অবিরাম ছুটে বেড়ানোর ক্লান্তিতে তার দুই পা প্রায় অবশ হয়ে আসছিল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার জন্য অসহনীয় যন্ত্রণার সমান হয়ে উঠছিল।

দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ নির্মমভাবে তার পায়ে আঘাত করেছে। হাঁটার শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবুও নিজের সমস্ত কষ্ট উপেক্ষা করে, বুকভরা একফোঁটা আশাকে আঁকড়ে ধরে সে জয়নালের পিছু পিছু এগিয়ে চলল।

দেখে মনে হচ্ছিল, রাতভর একফোঁটা খাবারও তার পেটে পড়েনি। চোখে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমের ছোঁয়া লাগেনি। সারারাত আর সারাদিন নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, কান্না আর মানসিক যন্ত্রণায় ছেলেটির শরীর যেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপেই তার ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর টাল খাচ্ছিল; তবুও বুকভরা এক চিলতে আশাকে আঁকড়ে ধরে সে এগিয়ে চলছিল।

কিছুক্ষণ পর তারা আইসিইউর সামনে এসে দাঁড়াল।

জয়নাল ধীরে ধীরে কাচঘেরা কেবিনের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করলেন।

— "ওদিকে তাকাও..."

কিন্তু অভ্রের চোখ যেন আর উঠছিল না। বুকের ভেতর অজানা এক ভয়, আশঙ্কা আর আতঙ্ক জমাট বেঁধে ছিল। সে যেন সাহসই পাচ্ছিল না কাচের ওপাশে তাকানোর।

মনে হচ্ছিল—

যদি যাকে দেখার জন্য এতক্ষণ ছুটে বেড়াল, তিনি সেখানে না থাকেন?

আবার পরক্ষণেই আরেকটি ভয় তাকে গ্রাস করল

যদি সত্যিই তিনি থাকেন... কিন্তু এমন অবস্থায় থাকেন, যা দেখার মতো মানসিক শক্তিও তার আর অবশিষ্ট নেই?

দু'চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা ক্রমেই তীব্র হতে লাগল। তবুও কাঁপতে থাকা শরীর আর ভারী হয়ে আসা পা নিয়ে সে ধীরে ধীরে কাচের দিকে মুখ ফেরাতে শুরু করল।
অবশেষে বুকভরা সাহস সঞ্চয় করে অভ্র ধীরে ধীরে চোখ তুলে কাচের ওপাশে তাকাল।

পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

আইসিইউর বেডে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তার চাচ্চা— আরমান খান।

মুখে অক্সিজেন মাস্ক। পুরো মাথাজুড়ে মোটা ব্যান্ডেজ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে সাদা ব্যান্ডেজের আবরণ। অসংখ্য তার ও চিকিৎসা-যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত দেহটি যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক নীরব সংগ্রামে লিপ্ত।

অভ্রের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

কষ্ট, অবিশ্বাস এবং গভীর ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে ডাকল—

— "চা... চাচ্চু..."

শব্দটি ঠোঁট ছেড়ে বেরোতেই তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই জয়নাল দ্রুত তাকে ধরে ফেললেন।

অভ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে জয়নালকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদে কেঁদে উঠল।

এই কান্না পরাজয়ের ছিল না—
এটি ছিল মৃত্যুর মুখ থেকে প্রিয় মানুষটিকে জীবিত ফিরে পাওয়ার স্বস্তির কান্না।

অনেকক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে অভ্র তাড়াহুড়ো করে বলল,

— "আঙ্কেল... আপনার ফোনটা দিন। আমি বাসায় খবর দিই।"

জয়নাল তাকে থামিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,

— "তার আগে তোমার কিছু জানা দরকার।"

এরপর তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব বিস্তারিতভাবে জানালেন—কীভাবে তিনি আরমান খানকে রক্তাক্ত অবস্থায় ট্রাকের ওপর পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, এবং জ্ঞান হারানোর আগে আরমান খান কাঁপা কণ্ঠে যা যা বলেছিলেন।

জয়নালের প্রতিটি কথা শুনে অভ্রের মুখের রং বদলে গেল।মুহূর্তেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি সূত্র যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল।
সে বুঝে গেল—

এই পুরো ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এবং সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা কে, তা আর তার কাছে অজানা রইল না।

তবে প্রতিশোধের আগুন সে সেখানেই নিজের ভেতর চেপে রাখল।

না—

এখন প্রতিশোধের সময় নয়।এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার চাচ্চার সুস্থ হয়ে ওঠা।

মনে মনে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—

"চাচ্চু সুস্থ হয়ে ফিরুন। তারপর একে একে প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব। কাউকেই এক বিন্দুও ছাড় দেব না।"

প্রায় বারো ঘণ্টা পর দায়িত্বরত চিকিৎসক আইসিইউ থেকে বেরিয়ে এলেন।

উদ্বিগ্ন অভ্র দ্রুত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— "আপাতত আশঙ্কা কিছুটা কেটেছে। রোগীর শরীরে সাড়া রয়েছে। তবে মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে তিনি কোমায় আছেন। কখন জ্ঞান ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না—এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।"

ডাক্তারের কথায় অভ্রের বুক আবারও ভারী হয়ে উঠল।

সে জয়নালের দিকে ফিরে গভীর কৃতজ্ঞতায় বলল,

— "আঙ্কেল... আজ থেকে আপনি আর কোনো চোরাচালানের গাড়ি চালাবেন না। আমি আপনার জন্য একটি সম্মানজনক কাজের ব্যবস্থা করব।"

একটু থেমে সে আইসিইউর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— "আর যতদিন আমার চাচ্চা সুস্থ না হন, ততদিন তাঁর সমস্ত দায়িত্ব আপনার । তবে বাইরে কেউ তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানবে না। সবাই জানবে তিনি আপনার বড় ভাই। আপাতত চাচ্চু এই পরিচয়েই চট্টগ্রামে থাকবেন। যতদিন না তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছেন, ততদিন তাঁর পরিচয় গোপনই থাকবে।"

শেষ কথাগুলো বলার সময় অভ্রের চোখে আর কোনো অশ্রু ছিল না।

সেখানে জ্বলছিল কেবল এক অটল প্রতিজ্ঞার আগুন।

গভীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে অভ্র বলল,

— “ডাক্তারদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য জানানো হবে। চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন হবে, আমি তা বহন করব। তবে কোনো অবস্থাতেই তারা যেন এই বিষয়ে মুখ না খোলে। চাচ্চুর পরিচয় কিংবা এই ঘটনার কোনো তথ্যই বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অবহেলা না হয়—আমি সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাই।

আপাতত সবাই জানুক, চাচ্চু বেঁচে নেই। কারণ তাঁর বেঁচে থাকার খবর ফাঁস হলে যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, তারা আবারও তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করতে পারে। তাই আপাতত সবাই বিশ্বাস করুক—তিনি আর বেঁচে নেই। উপযুক্ত সময় এলে আমি নিজেই সবার সামনে পুরো সত্য প্রকাশ করব। তার আগে নয়।”

কথাগুলো শেষ করেই অভ্র জয়নালের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করল। এরপর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে দৃঢ় পদক্ষেপে হাসপাতাল ত্যাগ করল।

অভ্র চলে যাওয়ার পরও জয়নাল কিছুক্ষণ স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল।

এত অল্প বয়সে এমন অসাধারণ দূরদর্শিতা, প্রখর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও অবিচল মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় সে আগে কখনো দেখেনি। জীবনের নির্মম বাস্তবতা যেন সময়ের আগেই ছেলেটিকে পরিণত করে তুলেছে। অজান্তেই অভ্রের প্রতি তার মনে জন্ম নিল গভীর শ্রদ্ধা, অগাধ বিশ্বাস ও এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।

পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।

অভ্রের প্রতিটি নির্দেশ তার কাছে অঙ্গীকারের মতো। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে নির্দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কাজে লেগে পড়ল।

এদিকে রাতের অন্ধকার কাটতেই এক বিভীষিকাময় সংবাদ দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

খবরটি সাথী বেগমের কানে পৌঁছাতেই তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে এল এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।

সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সেই সময় বাড়িতেই উপস্থিত ছিলেন নাজিরা বেগম। তিনি তড়িঘড়ি ছুটে এসে সাথী বেগমকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে পুরো বাড়িজুড়ে নেমে এসেছে শোক, আতঙ্ক, আহাজারি ও স্তব্ধতার এক গভীর বিষণ্ন পরিবেশ। চারদিকে যেন মৃত্যু-নীরবতা নেমে এসেছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান আমান খানের মেজো ভাই আরমান খান গতরাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সভায় অংশ নিতে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। সভা শেষে তিনি বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে বের হলে একপর্যায়ে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আকস্মিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে যান।

ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসন টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।

ফলে সংশ্লিষ্ট সকলেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যান—

আরমান খান আর বেঁচে নেই।

সংবাদটি দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, গ্রামবাসী, পরিচিতজন এবং অসংখ্য সহানুভূতিশীল মানুষ একে একে চেয়ারম্যানের বাড়িতে ছুটে আসতে শুরু করলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বাড়িটি শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। চারদিকে নেমে এল এক ভারী, স্তব্ধ ও হৃদয়বিদারক শোকের আবহ, যেন প্রতিটি দেয়ালও নীরবে কান্নায় ভেঙে পড়ছে।

সাথী বেগমের মানসিক অবস্থা তখন প্রায় ভেঙে পড়ার মতো। কখনো বুক চাপড়ে বুকফাটা বিলাপে ভেঙে পড়ছেন, কখনো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে অঝোর ধারায় কাঁদছেন, আবার কখনো দু'হাত আকাশের দিকে তুলে অসহায় কণ্ঠে আর্তনাদ করে বলছেন—

— "এখন আমার কী হবে...? আমার মেয়েটার কী হবে...? হে আল্লাহ...! আমাদের ওপর এত বড় সর্বনাশ কেন করলে...? কী অপরাধ ছিল আমাদের...?"

তাঁর সেই হৃদয়বিদারক আহাজারি, অসহায় আর্তচিৎকার আর সীমাহীন মাতৃহৃদয়ের হাহাকার যেন উপস্থিত প্রত্যেকের বুক বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশ আরও শোকাচ্ছন্ন, ভারাক্রান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।

অন্যদিকে, সংবাদটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভ্র, তার বাবা-মা এবং ছোট চাচ্চুরা আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি। প্রথম উপলব্ধ জরুরি ফ্লাইটেই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যান।

চেয়ারম্যান বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছাতেই তারা দেখতে পেলেন—বাড়ির বাইরে উৎসুক জনতার ঢল নেমেছে। পুরো এলাকাজুড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ভেতরেও আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তির উপস্থিতিতে পরিবেশ হয়ে উঠেছে ভারাক্রান্ত, গম্ভীর ও শোকমগ্ন।

পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিরাপত্তারক্ষীরা পুরো বাড়িটিকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে নিয়েছে। পরিবারের সদস্য ও একান্ত ঘনিষ্ঠজনদের বাইরে কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। প্রধান ফটকের সামনেই সাধারণ মানুষকে আটকে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা।

অভ্রদের গাড়িটি চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে এসে থামতেই নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত এগিয়ে এল। তখনই তারা চারপাশে জটলা করে থাকা জনতাকে সুশৃঙ্খলভাবে সরিয়ে একটি নিরাপদ প্রবেশপথ তৈরি করল। এরপর সর্বোচ্চ সম্মান ও সতর্কতার সঙ্গে অভ্রদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই আফসানা বেগম আর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সাথী বেগমকে দৃঢ়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

পরক্ষণেই দুই নারীর বুকফাটা আহাজারি, হৃদয়বিদারক বিলাপ এবং সীমাহীন শোকের আর্তনাদে পুরো পরিবেশ আরও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। তাঁদের কান্না উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়ে গভীর শোকের ঢেউ তুলল।

অন্যদিকে, এক কোণে নিথর ও গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমান খান ও আসান খান। তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল গভীর বেদনা, অসহনীয় শোক, উৎকণ্ঠা, অসহায়ত্ব এবং এক অদৃশ্য মানসিক বিপর্যয়ের ছাপ। যেন ক্ষণিকের মধ্যেই জীবনের সমস্ত দৃঢ়তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই মাহাদীর বাবা তাঁর পুরো পরিবারসহ সেখানে উপস্থিত হলেন।

মুখে গভীর শোকের ছায়া, চোখে কৃত্রিম অশ্রুর আভা, ঠোঁটে সহানুভূতির অভিনয়—ভদ্রতা, সমবেদনা ও শোকের মুখোশটি তিনি নিখুঁতভাবে বজায় রেখেছেন। তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে উপস্থিত কারও পক্ষেই বোঝার উপায় ছিল না—এই শোকাবহ ঘটনার প্রকৃত রচয়িতা তিনিই।

মাহাদীর মা এগিয়ে এসে সাথী বেগমকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

আর মাহাদী...

সে এখনো তার বাবার পৈশাচিক ষড়যন্ত্র, নির্মম কূটচাল কিংবা সুপরিকল্পিত এই ভয়ংকর প্রহসনের সামান্যতম সত্য সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

সে এখনো বিশ্বাস করে বসে আছে—এটি নিছকই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

সে জানেই না, যাকে সে নিজের আদর্শ পিতা হিসেবে শ্রদ্ধা করে এসেছে, সেই মানুষটিই পর্দার আড়াল থেকে এই বিভীষিকাময় ঘটনার প্রতিটি দৃশ্য নির্মম নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন।

অন্যদিকে অভ্রের শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় দমিত ক্রোধ দাবানলের মতো দাউদাউ করে জ্বলছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে পাথরের মতো জমে গেছে, দাঁত কিড়মিড় করছে, দু’মুঠো হাত এতটাই শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ যে আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। রক্তাভ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে চারপাশে তাকিয়ে ছিল।

সে খুঁজছিল শুধু একজনকেই...

তার পরিকে।

হঠাৎই তার দৃষ্টি এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে গেল।

সাথী বেগমের আঁচলের আড়ালে গুটিসুটি মেরে বসে আছে ছোট্ট রাহা। দুই হাতে মায়ের শাড়ির আঁচল এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন সেটিই তার একমাত্র আশ্রয়। মায়ের বুকফাটা আহাজারি ও অঝোর কান্না দেখে শিশুটিও আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও অসহায়ত্বে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

ভয়ে তার ছোট্ট শরীরটি থরথর করে কাঁপছে।

অশ্রুসিক্ত নিষ্পাপ চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বারবার কাঁপা কণ্ঠে শুধু একটিই শব্দ উচ্চারণ করছে—

— “মা... মা...”

সেই নিষ্পাপ আর্তনাদ, সেই অসহায় কান্না অভ্রের বুকে যেন হাজারো ধারালো ছুরির মতো বিঁধে গেল।

মুহূর্তের মধ্যেই তার ভেতরে জমে থাকা দমিত ক্রোধ, সীমাহীন যন্ত্রণা ও গভীর মমতা একাকার হয়ে উঠল।

দৃশ্যটি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারল না অভ্র।

এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সে দ্রুত এগিয়ে গেল। এক নিমিষেই গভীর স্নেহে এক টানে দুই হাত বাড়িয়ে রাহাকে নিজের বুকে টেনে নিল।

রাহাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই অভ্রের মনে হলো—অসংখ্য ঝড়, রক্তক্ষয়, বিশ্বাসঘাতকতা, নির্মম বাস্তবতা এবং জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াই পেরিয়ে তার সমস্ত শান্তি, প্রশান্তি, স্বস্তি ও বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ যেন এই একজন মানুষের মধ্যেই নিহিত।

সে অত্যন্ত কোমলভাবে রাহার চোখের জল মুছে দিয়ে কপালে আলতো চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,

— "আমার পরিটা কাঁদে না... আমার জান বাচ্চা... আমি তো আছি, তাই না? তোর অভ্র ভাই থাকতে তোকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। সব ঠিক করে দেব আমি। যে-ই তোর হাসিটা কেড়ে নিতে চাইবে, তার বিরুদ্ধে পুরো পৃথিবীর সঙ্গেও লড়ে যাব। তাই আর একফোঁটাও কাঁদবি না... যতক্ষণ আমি আছি, ততক্ষণ কোনো বিপদও তোকে ছুঁয়ে যাওয়ার সাহস পাবে না।”

অভ্রের বুকে উষ্ণ ও নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে ধীরে ধীরে রাহার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না থেমে আসে। দীর্ঘ সময়ের অঝোর অশ্রু ও অবিরাম কান্নায় ক্লান্ত তার ছোট্ট চোখ দুটি একসময় আপনাআপনিই বুজে যায়। পরমুহূর্তেই সে অভ্রের বুকে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ও নির্ভার অবস্থায় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।

অভ্র এক মিনিটের জন্যও তাকে নামিয়ে রাখে না। গভীর মমতা, সীমাহীন স্নেহ ও অসীম যত্নে তাকে বুকে আগলে রেখেই ধীর পদক্ষেপে নিজের কক্ষে ফিরে যায়।

প্রায় চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় পর সে আবার তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষটিকে নিজের বুকে ফিরে পেয়েছে। এত সহজে সেই উষ্ণতা, সেই প্রশান্তি ও সেই অমূল্য সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো শক্তি তার ছিল না।

তার মনে হতে থাকে, বুকে নিবিড়ভাবে আশ্রয় নেওয়া এই ছোট্ট প্রাণটিই যেন তার সমগ্র পৃথিবী, তার অস্তিত্বের সারমর্ম, সমস্ত সুখ-শান্তি, শক্তি এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

রুমে প্রবেশ করেই অভ্র রাহাকে বুকে আগলে ধীরে ধীরে রকিং চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।

চেয়ারটি মৃদু ছন্দে দুলছিল। সেই শান্ত দোলার সঙ্গে যেন অভ্রের বুকের ওঠানামাও একাকার হয়ে গিয়েছিল। কখনো সে নিজের বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা রাহার নিষ্পাপ, শান্ত মুখখানির দিকে গভীর মমতায় তাকিয়ে থাকছিল, আবার কখনো মাথাটা চেয়ারের পেছনে এলিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে থাকছিল।

কিন্তু তার অন্তরের ভেতর তখন চলছিল এক ভয়ংকর তোলপাড়।

অসংখ্য প্রশ্ন, অগণিত সংশয়, সীমাহীন ক্ষোভ, অসহনীয় যন্ত্রণা, গভীর অপমানবোধ এবং প্রতিশোধের আগুন তার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছিল।

তবুও...

সে নীরব।

না...

এখন কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়।

প্রথমে সম্পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। চাচ্চু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজ মুখে সবকিছু প্রকাশ না করা পর্যন্ত এই ঘটনার একটি শব্দও কারও কানে পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না।

এমনকি...

নিজের বাবা-মাকেও নয়।

নিমেষে মধ্যেই অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের গভীরে জমাট বাঁধল এক অটল, অবিচল সংকল্প।

মনে মনে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল—

"যারা ক্ষণিকের জন্যও আমাকে বিশ্বাস করতে পারেনি।যারা সামান্যতম সত্য যাচাই না করেই আমাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তাদের প্রত্যেককে আমি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাব। আমার নীরবতাকে তারা দুর্বলতা ভেবেছে। অথচ এই নীরবতারও একটি ভাষা আছে, একটি প্রতিশোধ আছে। আর সেই উত্তর দেবে সময় নিজেই।"

এরপরও সে দীর্ঘক্ষণ সিলিংয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

কখন যে নির্ঘুম একদিন-একরাতের অবসাদ, অসহনীয় মানসিক চাপ, অমানুষিক ক্লান্তি আর অবিরাম লড়াইয়ের ভার তাকে নিঃশব্দে ঘুমের অতলে তলিয়ে নিয়ে গেল, সে নিজেও টের পেল না।

হঠাৎ...

দরজায় মৃদু টোকা পড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp