আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৪৭ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          হলুদের সোনালি আয়োজনে স্টেজে পাশাপাশি বসে আছে অভ্র আর রাহা। দু’জনই হলুদের রঙে সেজে উঠেছে অনিন্দ্য সৌন্দর্যে। ঠোঁটের কোণে প্রশান্ত হাসি,একে একে স্বজনেরা এগিয়ে এসে তাদের গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে দিচ্ছে, আশীর্বাদে ভরিয়ে তুলছে মুহূর্তটিকে।

হঠাৎ রাহার চোখে পড়ল, অভ্রের ঠোঁটের একপাশে সামান্য হলুদ লেগে আছে। এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। চারপাশে উপস্থিত শত মানুষের দৃষ্টি কিংবা সামাজিক সংকোচ—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে নিজের শাড়ির আঁচল বাড়িয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অভ্রের ঠোঁটের পাশের হলুদটুকু আলতো করে মুছে দিল।

তবে এই কাজটি শুধু যত্নবশত নয়—ইচ্ছে করেই করল সে। কারণ অদূরে দাঁড়ানোএকজনের দৃষ্টিতে যে অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ধরা পড়েছিল, তার জবাব রাহা শব্দে নয়, নিজের এই নিঃশব্দ স্পষ্ট অধিকারবোধেই দিয়ে দিল।

রাহার এমন আচরণ দেখে আয়াত, অবন্তিকা, সাফা ও শিফা একসঙ্গে “ওওও...!” বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল।

তাদের আনন্দে চারপাশের পরিবেশও যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বাড়ির বড়রাও দৃশ্যটি দেখে মৃদু হেসে ফেললেন। দুজনের নিঃসংকোচ ভালোবাসার প্রকাশ তাঁদেরও বেশ ভালো লেগেছে।

রাহা লজ্জায় হালকা চোখ রাঙিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। তারপর দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

অদূরে নীরবে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটি দেখছিল মাহাদী।

ঠিক তখনই পেছন থেকে এসে তার পাশে দাঁড়াল জারিফ। মাহাদীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসি হেসে গুনগুনিয়ে বলল—

"ফাইট্টা যায় ও বুকটা ফাইট্টা যায়...
বন্ধু যখন বউ লইয়া,আমার চোখের সামনে দিয়া , রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়।
ফাইট্টা যায়, ও বুকটা ফাইট্টা যায়!”

জারিফের কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই মাহাদীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অজান্তেই সে দু’হাত মুঠোবন্দি করে ফেলল। ভেতরের অস্থিরতা আড়াল করার চেষ্টা করলেও, সেটুকু জারিফের দৃষ্টি এড়াল না।

পরক্ষণেই জারিফ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে কোমর ঝুঁকিয়ে দুই হাঁটু চেপে ধরল সে, যেন হাসি আর কিছুতেই থামছে না।

মাহাদীর তীক্ষ্ণ, ধারালো দৃষ্টিতে তাকাতেই জারিফ কোনোমতে হাসি সামলে গম্ভীর মুখে বলল,

— "বলেছিলাম না, কোনো লাভ হবে না! এবার বাপ্পারাজের মতো ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে বসে থাক।”

কথা শেষ করেই সে আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতেই সামনের দিকে হাঁটা দিল।

জারিফের চলে যাওয়া দেখে মাহাদী রহস্যময় এক চিলতে হাসি টেনে শান্ত গলায় বলল,

— "দেখতেই থাক... শেষ পর্যন্ত কে বাপ্পারাজ হয়।”

অনেকক্ষণ ধরে একটানা স্টেজে বসে থাকতে থাকতে অভ্রের বিরক্তি চরমে পৌঁছে গেছে। আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না তার। তাই উঠে দাঁড়িয়েই নিচে নামতে উদ্যত হলো।

ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল মাহাদীর ওপর। সে ধীর পায়ে স্টেজের দিকেই এগিয়ে আসছে। দৃশ্যটা দেখে অভ্র উঠে দাঁড়িয়েও আবার নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।

মাহাদী স্টেজে পা রাখতেই আয়াত ইচ্ছে করেই উঠে রাহার একেবারে পাশে গিয়ে বসে পড়ল। মাহাদীকে সে একটুও বিশ্বাস করে না। তাই রাহাকে তার থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখাই যেন তার উদ্দেশ্য।

আয়াতের এমন আচরণ দেখে অভ্রের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

মাহাদীও এসে অভ্রের পাশেই বসে পড়ল।

পাশে বসতেই অভ্র তার দিকে সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

— "তোর মতো নির্লজ্জ আর একটাও নেই, বন্ধু। ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে একেবারে চোখের সামনে চলে এসেছিস! তবে ভালোই হয়েছে... সবকিছু নিজের চোখে দেখ। তোকে এভাবে দেখে আমার বুকটা বেশ ঠান্ডা লাগছে। অদ্ভুত এক শান্তি পাচ্ছি।”

রাহা আর একবারও সেদিকে তাকাচ্ছে না। সে নিজের মতো করেই সবার সঙ্গে কথা বলছে, অথচ মাহাদীর দৃষ্টি যেন তার দিক থেকেই সরছেই না।

কাঁচা ফুলের অলংকারে সজ্জিত রাহাকে আজ অপার্থিব সুন্দর লাগছিল। হলুদের আভায় রাঙা শাড়িটি তার দুধে-আলতা গায়ের রঙের সঙ্গে এমন নিখুঁতভাবে মিশে গিয়েছিল, যেন বসন্ত নিজেই মানবী রূপে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মাহাদীর সেই একদৃষ্টির দৃষ্টি অভ্রের চোখ এড়াল না।

এক মুহূর্ত দেরি না করে পাশে রাখা আলাদা বাটি থেকে একমুঠো হলুদ তুলে সে সোজা মাহাদীর মুখে মেখে দিল। চোখ, গাল, কপাল—মুহূর্তেই পুরো মুখ হলুদের রঙে মাখামাখি হয়ে গেল।

দৃশ্যটি দেখে রাহা আর আয়াত হেসে উঠল।

আয়াত এগিয়ে এসে দুষ্টুমিভরা ভঙ্গিতে বলল,

— উপস... অভ্র ভাই! মনে হচ্ছে আজ উনারই গায়ে হলুদ! এই ভাই, চলুন... মুখটা ধুয়ে আসেন!

মাহাদী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নির্বিকার মুখে স্টেজ থেকে নেমে যেতেই অভ্র আয়াতের দিকে একটি অর্থবহ ইশারা করল।

ইশারার তাৎপর্য বুঝতে আয়াতের এক মুহূর্তও লাগল না। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে মাহাদীর পিছু নিল। আর অভ্র নিচু স্বরে জানিয়ে দিল, তার একটি ছোট্ট কাজ আছে; সেটি সেরে সে ফিরে আসবে। বলেই সেও স্টেজ থেকে নেমে গেল।

মুখে লেগে থাকা হলুদ ধুয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে মাহাদী ওয়াশরুমের দিকে এগোতেই আয়াতও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। চলুন আপনাকে নিয়ে যাই।যদি আবার পরে টরে যান। বলেই ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে।

মাহাদী সেদিক তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— "No need."

আয়াত কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

— "ওকে।"

বলেই তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই অসাবধানতাবশত দু’জনের কাঁধে ধাক্কা লেগে আয়াত ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিল।

মুহূর্তের মধ্যেই মাহাদী হাত বাড়িয়ে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। আয়াত জাপটে মাহাদীর গিলা জড়িয়ে ধরলো।

ধাক্কাটি ছিল সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত।

আর সেই সুযোগটিই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাল আয়াত। মুহূর্তের মধ্যে সে এমনভাবে মাহাদীর মুখ আড়াল করে দাঁড়াল, যেন দূর থেকে দেখলে যে কারও মনে হতে পারে—দুজনের মধ্যে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো সম্পর্ক রয়েছে।

ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে অবন্তিকা দ্রুত একটি ছবি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলল।

আয়াত সামান্য মাথা কাত করে চোখের ইশারায় অবন্তিকার দিকে তাকাতেই, অবন্তিকা এক চোখ টিপে বুঝিয়ে দিল—কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

পরক্ষণেই আয়াত বিরক্তির ভান করে বলে উঠল,—"উফ! ছাড়ুন তো!"

কথাটি বলেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না; দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল।

মাহাদী বিস্মিত দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়া দেখল। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,—"অদ্ভুত মেয়ে! সাহায্যও করলাম, উল্টো কথা শুনিয়েই চলে গেল!”

মাহাদী সেখান থেকে চলে যেতেই আয়াত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। প্রায় দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে সে অবন্তিকার পাশে দাঁড়াল।

অবন্তিকা মোবাইলের স্ক্রিনটি সামনে ধরতেই ছবিটি দেখে দুজনের মুখেই দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল।

আয়াত ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—"মিশন সাকসেসফুল।"

অবন্তিকার চোখে তখন স্পষ্ট ষড়যন্ত্রের ঝিলিক।
—"এখন শুধু শেষ পদক্ষেপটাই বাকি।"

কথাটি শেষ হতেই দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসিতে ফেটে পড়ল। এরপর অভ্যাসবশত নাকের সঙ্গে নাক আলতোভাবে ঘষে নিজেদের গোপন বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দিল।
প্রথম চাল সফল হয়েছে... এবার শুরু হবে আসল খেলা।”

ঠিক তখনই অভ্র ফিরে এল।
আয়াত আর অবন্তিকার মুখের দুষ্টুমিভরা হাসি দেখে সবকিছু বুঝে ফেলল সে।

আয়াত একটাও কথা না বলে মোবাইলটা এগিয়ে দিতেই অভ্র ছবিটা একবার দেখল। পরের মুহূর্তেই জিভ দ্বারা গাল ঠেলতে ঠেলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,

—"পারফেক্ট।"

একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করেই সে মোবাইলটা ফিরিয়ে দিল।

অবন্তিকা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—"এবার?"

অভ্র শান্ত গলায় বলল,

—"এবার যা করার, আমি নিজেই করব।"

কথাটা বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সোজা রাহার দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই রাহা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— "হঠাৎ কোথায় চলে গিয়েছিলেন?"

অভ্র নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল,

— "একটু জরুরি কাজ ছিল।"

রাহা ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁক এনে বলল,

— "আপনার সারাক্ষণই এত কীসের কাজ থাকে?"

অভ্র রহস্যময় একটা হাসি হেসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আর মাত্র একটা রাত জান।

রাহা হয়তো অন্য কিছু বুঝল।
অসভ্য লোক।
বলেই অন্যদিক ঘুরে গেলো

সাফা এবার হলুদের গানের প্লেলিস্ট চালিয়ে দিতেই চারপাশ যেন আবারও প্রাণ ফিরে পেল।

অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে চলে আসায় অতিথিদের অধিকাংশই বিদায় নিয়েছেন। এখন পুরো আঙিনাজুড়ে কেবল বাড়ির আপনজনদেরই সরব উপস্থিতি।

গানের সুর কানে পৌঁছাতেই অবন্তিকা আর রাহার ভেতরের চঞ্চলতা যেন মুহূর্তেই জেগে উঠল। দু’জনের চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, আর পা যেন আপনাআপনিই তাল মিলিয়ে নাচতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠছে।

ঠিক তখনই রাহার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল অভ্রের ওপর।

অভ্র একপাশে দাঁড়িয়ে গভীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। সেই দৃষ্টি চোখে পড়তেই রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো সরু করে তার দিকে তাকাল।

পরক্ষণেই অভ্রের গম্ভীর মুখভঙ্গি নরম হয়ে ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু, আশ্বস্ত করা এক হাসি। মাথা নেড়ে ইশারা করল—

"চালিয়ে যাও।"

সেই নীরব অনুমতি পেয়ে রাহার মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল উচ্ছ্বাসের ঝলক। আনন্দে আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে সে ছুটে গিয়ে একে একে আয়াত, শিফা, অবন্তিকা আর সাফার হাত ধরে নাচের বৃত্তে টেনে আনল।

চারদিকে হাসি, উল্লাস আর হলুদের গানের তালে তালে জমে উঠল আনন্দের আসর।

আর অভ্র...

দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অভ্র। চারপাশের কোলাহল, গানের তালে নাচতে থাকা মানুষ—সবকিছু যেন তার কাছে ম্লান। তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ শুধু এক মানুষটির ওপর। অপলক দৃষ্টিতে সে তার রূপকথার পরীটাকেই দেখছিল—যে হাসছে, নাচছে, আর নিজের হাসিতে চারপাশটাকে আলোকিত করে তুলছে।

অভ্রের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—

— "তুই মানুষ, নাকি সত্যিই কোনো পরী? যতবার দেখি, ততবারই নতুন করে মুগ্ধ হই। তোকে যতই দেখি,তবু মন ভরে না।”

নাচের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই হঠাৎ অবন্তিকার মনে হলো, শাড়ির আঁচল ও কুচির ভাঁজ কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে।

কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সে নীরবে নাচের বৃত্ত থেকে সরে এসে এক পাশে দাঁড়াল। চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে শাড়ির কুচিগুলো ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যেই না কুচিগুলো গুজার জন্য শাড়িটা সরাবে 

ঠিক তখনই—

কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই জারিফ হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল।

অবন্তিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জারিফ এক হাতে শাড়ির আলগা অংশ সামলে, অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে নিজের একেবারে কাছে টেনে নিল।

আকস্মিক ঘটনায় অবন্তিকা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল, তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল।

সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,

— "আরে... কী করছেন আপনি?”

জারিফ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,

— "জাস্ট শাট আপ, বিচ্ছু!"

তার কণ্ঠের কঠোরতা যেন মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস ভারী করে তুলল। রাগে তার চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবন্তিকার দিকে তাকিয়েই গর্জে উঠল,

— "এটা কি শাড়ি ঠিক করার জায়গা? একবারও চারপাশে নজর দিয়েছেন?"

জারিফের এমন রুদ্ররূপ দেখে অবন্তিকা খানিকটা ভয় পেয়ে গেল। মুহূর্তেই চুপসে গেল সে। কোনো প্রতিবাদ না করে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাল।

তখনই তার চোখ পড়ল অল্প দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানেজমেন্টের দু'জন লোকের ওপর। তারা কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে এদিকেই তাকিয়ে আছে। জারিফ হঠাৎ সামনে চলে আসায় তাদের মুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে।

কিন্তু তারা যেন আসল দৃশ্যটাই মিস করে গেছে...

অবন্তিকা একবার অল্প দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে, জারিফের রক্তিম চোখের দিকে তাকাতেই অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলে ফেলল।

ভয়, অস্বস্তি আর অপ্রস্তুতিতে যেন তার ভাষা হারিয়ে গেছে। কী বলবে, কীভাবে নিজের অবস্থাটা ব্যাখ্যা করবে—কোনো শব্দই খুঁজে পাচ্ছে না।

জারিফের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য সে অস্থিরভাবে মোচড়াতে লাগল।

জারিফও বিষয়টি বুঝতে পেরে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। এক ঝটকায় তাকে ছেড়ে দিল।
হঠাৎ মুক্ত হয়ে যাওয়ায় অবন্তিকা সামান্য টাল খেয়ে দু-এক পা পিছিয়ে গেল। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে গভীর শ্বাস ফেলল। তবুও তার বুকের ভেতরের তীব্র ধুকপুকানি যেন কিছুতেই থামছিল না।

এইবার অবন্তিকা কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়াতেই—

জারিফ তৎক্ষণাৎ তর্জনী ঠোঁটের সামনে তুলে কঠোর স্বরে বলে উঠল,

— "শশ... একদম চুপ। একটি কথাও নয়।"

তার কণ্ঠে এমন তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা ছিল যে অবন্তিকার গলায় আটকে থাকা সব শব্দ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

জারিফ রক্তিম চোখে তার দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল,

— "ফারদার যদি আর একবারও এমন বেপরোয়া কাজ করতে দেখি... তাহলে আপনার কী অবস্থা করব, তা আপনি নিজেও কল্পনা করতে পারবেন না।"

কথাগুলো বলেই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সে। গম্ভীর মুখে ঘুরে সোজা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানেজমেন্টের লোক দুটোর দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল।

আর অবন্তিকা...

সে শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে জারিফের চলে যাওয়া দেখতে লাগল। বুকের ভেতরটা এখনও অকারণে ধুকপুক করছে, অথচ এই প্রথম সে বুঝতে পারল—জারিফের রাগের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য একরাশ যত্ন।

জারিফ এগিয়ে যেতে যেতে দুই হাতের আঙুল একসঙ্গে মটকাল। তার চোখেমুখে জমে থাকা কঠোরতা দেখে দু’জনের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ভয়ে তারা সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই—

এক ঝটকায় পেছন থেকে দু’জনের কলার চেপে ধরে মাটিতে আছড়ে ফেলল জারিফ।লোক দু'জন আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও জারিফের সামনে টিকতে পারল না।তারা দু’জন উঠে দাঁড়ানোর আগেই সে ঝুঁকে পড়ে কয়েকটি এলোপাতাড়ি ঘুষি বসিয়ে দিল। তারপর তাদের কলার মুঠো করে টেনে নিজের মুখোমুখি এনে বরফশীতল অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে বলল,

— "আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। কিন্তু এরপর যদি কোনোদিন আমার চোখের সামনে পড়িস... সেদিন তোদের শেষ দিন হবে।"

কথা শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল। ঘাড়টা একপাশে কাত করে দৃষ্টি ফেরাল অবন্তিকার দিকে।

ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবন্তিকা জারিফের চোখের সঙ্গে চোখ মিলতেই আতঙ্কে কেঁপে উঠল। তড়িঘড়ি করে শাড়ির কুচি আঁকড়ে ধরে দিলো এক দৌড়।

যেটা দেখে জারিফের ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা, শয়তানি হাসি খেলে গেল।

—————

রাহার হটাৎ মনে হলো ফ্রেশ হওয়া দরকার।
প্রকৃতির ডাক বলে কথা,

সে বারবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগল, যদি কেউ তাকে বাড়ির ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু সবার মুখেই তখন উৎসবের উচ্ছ্বাস। প্রত্যেকে নিজের মতো করে আনন্দে মেতে আছে।

রাহাকে এভাবে অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে অভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

— কাকে খুঁজছিস? আমি থাকতে আবার অন্য কাউকে খুঁজতে হয় নাকি?

রাহা এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিল,

— আপনাকেই।

অভ্র ভ্রু উঁচু করে মুচকি হেসে বলল,

— আমাকে? কেন?

— বাসায় যাব।

— কেন?

— একটু কাজ আছে।

— তোর আবার কীসের কাজ?

একই প্রশ্ন বারবার শুনে রাহার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বিরক্তিতে চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,

— বালের কাজ আমার!

অভ্র হেসে বলল,
— "চল, সেটা আমি করে দিচ্ছি।"

দু’পা এগোতেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াল না— শাড়ির ভাঁজ বারবার রাহার পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিকভাবে হাঁটতেও অসুবিধা হচ্ছে তার। এক মুহূর্তও দেরি না করে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই অভ্র দু’হাতে তাকে তুলে নিল নিজের বুকে।

হঠাৎ এমন আচরণে রাহা অভ্রের গলা জড়িয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

— "যখন-তখন শুধু কোলে তুলে নেন! কোলে নেয়ার বাহানা।”

অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু, তৃপ্তির হাসি টেনে বলল,

— "হুম... এটা কি সত্যিই শাড়ির ঝামেলা, নাকি আমার কোলে ওঠার নতুন বাহানা?"

রাহা চোখ রাঙাতেই অভ্র মৃদু হেসে তাকে আরও শক্ত করে আগলে নিল।

"অসুবিধা, সুবিধা, বাহানা, অজুহাত— এত হিসাব আমি রাখি না। তোকে কোলে নিতে আমাকে কারণ খুঁজতে হয় না। তুই আমার বউ।আর আমার জিনিসকে কখন, কীভাবে, -কোলে নেব! নাকি কাঁধে তুলে রাখব,!সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তুই এসব নিয়ে একদম নাক গলাবি না... বলে দিলাম।”

রাহা আর পাল্টা কিছু বলার সাহস পেল না। ঠোঁট ফুলিয়ে, মুখ গোমড়া করে অভ্রের বুকেই নিশ্চুপ হয়ে রইল।

অভ্রও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তাকে আগলে রেখেই সোজা রুমে নিয়ে এল। দরজার ভেতরে ঢুকেই ধীরে ধীরে তাকে মেঝেতে নামিয়ে দিল।

অভ্র মুচকি অসভ্য মার্কা হাসি টেনে বলল,

— "এবার চল, তোর ওই বালের কাজটা করে দিই।"

রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,

— "দূর হোন তো! অসভ্য লোক!"

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— "আমি আবার কী করলাম?"

রাহা বিরক্তিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "আমি ফ্রেশ হব।"

অভ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার সুরে জবাব দিল,— "তো হ। আমি কি নিষেধ করেছি?”

রাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,

— "আপনি বাইরে যান।"

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,

— "কেন যাব?"

রাহা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

— "কেন যাব মানে? আপনার সামনে আমি কীভাবে ফ্রেশ হব?"

অভ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু, আত্মতৃপ্তির হাসি টেনে এক পা এগিয়ে এল।

— "কাল থেকে যেভাবে হবে, আজ সেটার মহড়া দিয়ে রাখ।"

কথাটা শুনেই রাহার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। মুহূর্তেই লজ্জায় তার গাল দুটো রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে উঠল।

— "এমন করলে কিন্তু আমি একদমই ফ্রেশ হব না!"

অভ্র হালকা হেসে ভ্রু উঁচু করল।

— "না হলেও সমস্যা নেই। দরকার হলে সবকিছুতেই সাহায্য করে দেব। এত লজ্জা কিসের, বল তো?”

রাহা আর কোনো প্রতিউত্তর করতে পারল না। লজ্জায় তার মুখশ্রী রক্তিম আভায় ঢেকে গেছে। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

অভ্র ওর অবস্থা দেখে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু, আত্মতৃপ্তির হাসি টেনে বলল,

— "এত ঢং করছিস কেন? ছোটবেলায় তোর ন্যাপি পর্যন্ত আমি চেঞ্জ করেছি।"

রাহা যেন বজ্রাহত হয়ে চিৎকার করে উঠল,

— "মা... মানে কী!"

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

— "হুম।"

রাহা অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কানে শোনা কথাটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।

'এই লোকটা কী বলল? আমার ন্যাপি পর্যন্ত চেঞ্জ করেছে!'

লজ্জা, বিস্ময় আর অস্বস্তিতে তার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল।

— "চুপ করুন! কী সব আজেবাজে কথা বলছেন? আমি একদমই বিশ্বাস করি না!

অভ্র দুষ্টু হাসি চেপে ধীরে ধীরে বলল,

— "তাহলে তোর বাঁ পাশের উরুতে যে ছোট্ট জন্মদাগটা আছে, সেটা—"

কথাটা শেষ করার সুযোগই পেল না সে।

লজ্জায় একেবারে দিশেহারা হয়ে রাহা তড়িঘড়ি করে নিজের হাত দিয়ে অভ্রের মুখ চেপে ধরল।

— "প্লিজ! একদম চুপ করুন!"

লজ্জা, অস্বস্তি আর আতঙ্কে সে প্রায় ছটফট করতে করতে হাত-পা নাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,

— "আম্মু...!"

অভ্র ওর ছটফটানি দেখে হেসে ফেলল।

— "এই মেয়ে, আমাদের দু'জনের মাঝখানে হঠাৎ আমার শাশুড়িকে কেন টেনে আনছিস? আমাকে সামলাতে না পেরে এখন উদ্ধারকর্তা ডাকছিস নাকি?”

অভ্র হালকা হেসে রাহার মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলল,

— "হয়েছে, হয়েছে... আজকের জন্য ছেড়ে দিলাম। বাকিটা কালের জন্য তোলা থাকল। তখন কিন্তু কোনো অজুহাত, কোনো না— কিছুই শুনব না। বলে দিলাম।"

কথাটা বলেই সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই রাহা দেখল, ছোট্ট টেবিলের ওপর খাবার সাজানো। আর অভ্র চুপচাপ বসে শুধু তারই অপেক্ষা করছে।

তোয়ালে দিয়ে চুল আর মুখ মুছতে মুছতে রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— "ওহ! আমার কথাও তাহলে আপনার মনে থাকে?"

অভ্র মুচকি হেসে ওর দিকে তাকাল।

— "তোর কথা নয়, তোর প্রতিটা খুঁটিনাটিই এই অভ্রের নজরে থাকে, বেবি।"

রাহার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।

অভ্র প্লেটটা ওর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,

— "আয়, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।"

— "এত তাড়া কেন?"

— "একটু বাইরে যেতে হবে। জরুরি কাজ আছে।"

রাহার কপাল সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল।

— "এত রাতে আবার কিসের জরুরি কাজ?"

অভ্র শুধু রহস্যময় এক হাসি হেসে বলল,

— "সময় হলে সব বলব। আগে ভালো মেয়ের মতো খেয়ে নে।"

অভ্রের চোখেমুখে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে, রাহা আর কোনো প্রশ্ন করল না। চুপচাপ খাবার খেতে শুরু করল। অভ্রও ওর সঙ্গেই রাতের খাবার শেষ করল।

খাওয়া শেষ হতেই অভ্র স্নেহভরে রাহার কপালে একটুখানি চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

— "এবার ঘুমিয়ে পড়।"

রাহাও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। অভ্র বেরিয়ে যেতেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

কিন্তু ঘুম যেন তার চোখের আশেপাশেও ভিড়ল না।
কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করার পর বিরক্ত হয়ে উঠে বসল সে।

বাইরে থেকে এখনও সবার হাসি-আড্ডার শব্দ ভেসে আসছে। মনে হলো, সবাই বোধহয় এখনও বাগানেই আছে।

রাহা মনে মনে ভাবল,

"যেহেতু অভ্র নেই... একটু নিচে গিয়ে সবাইকে দেখে আসি।"

ধীর পায়ে করিডোর পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

রাহা থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল।

চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

— "আপনি...!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp