স্কুলজীবন থেকেই মাহাদী আর অভ্র একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ছিল। প্রথম শ্রেণি থেকে একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা, একসঙ্গে দুষ্টুমি, হাসি-কান্না— সবকিছুতেই তাদের বন্ধন ছিল অটুট।
রাহা যেদিন পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়, সেদিন অভ্রের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। কিন্তু তার আনন্দ যেন আকাশ ছুঁয়েছিল। সেদিন সে পুরো ক্লাসের প্রতিটি সহপাঠীকে চকলেট ও ছোট ছোট খেলনা উপহার দিয়েছিল।
হাসিমুখে সে বলেছিল,— "আজ আমার একটা ছোট্ট পরি পৃথিবীতে আসবে। তাই তোদের আগেই উপহার দিচ্ছি।"
মাহদী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "কিসের পরি?"
অভ্র শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে উত্তর দিল,
— "আমার মেজো আম্মুর পেট থেকে একটা ছোট্ট পরি হবে। আজ স্কুল ছুটি হলেই হাসপাতালে যাব, ওকে দেখতে।"
কথাটা শুনে মাহদীর কৌতূহল আর দমিয়ে রাখা গেল না। সে অনুনয়ের সুরে বলল,
— "অভ্র, আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চল না। আমিও তোর পরী টাকে একবার দেখতে চাই।"
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— "না, না! আমি কাউকে দেখাব না।"
মুহূর্তেই মাহদীর মুখ মলিন হয়ে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
— "তুই না আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু! আমার সাথেও এমন করবি?"
তারপর দুই আঙুলের ফাঁকে সামান্য ব্যবধান দেখিয়ে মিনতির ভঙ্গিতে বলল,
— "বেশি না... শুধু এইটুকু, এক ঝলক দেখব।”
শেষ পর্যন্ত মাহদীর অনুরোধের কাছে হার মানল অভ্র। হেসে বলল,
— “আচ্ছা, চল। তবে বেশি বিরক্ত করবি না।”
এরই মধ্যে অভ্রের ছোট চাচ্চু মাহদীর বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, মাহদী আজ তাদের সঙ্গেই হাসপাতালে যাবে এবং পরে নিরাপদে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে।
দুপুর বারোটায় স্কুল ছুটি হলে তারা বাড়ির গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অভ্রের মা। ছেলেকে দেখেই তিনি স্নেহভরা হাসি হাসলেন।
অভ্র দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— “আম্মু! আমার পরি কি পৃথিবীতে এসে গেছে?”
তিনি মমতাভরা চোখে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— “না বাবা, এখনও না। তবে আর বেশি দেরি নেই। তাড়াতাড়ি চলো, হাসপাতালে যাই। তোমার মেজো আম্মুও তোমাকে দেখতে চাইছে।”
অভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। গাড়িতে উঠে মাহদীর দিকে তাকিয়ে ডাক দিল,
— “কিরে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি আয়!”
মাহদীও ছুটে এসে তাদের পাশে বসল। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি ঢাকার এক নামকরা সিটি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিল।
সাথী বেগমকে আগেই অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছিল।অভ্রের আসতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল তাই
। হাসপাতালে পৌঁছে অভ্র দেখল, ওটির লাল বাতিটি তখনও জ্বলছে। অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ হয়ে উঠছিল।
হঠাৎ প্রায় বিশ মিনিট পর অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে একটি নবজাতকের তীক্ষ্ণ, সুমধুর কান্না ভেসে এলো। যা অভ্রের কোমল হৃদয়ে এক অজানা অনুভূতির সঞ্চার করল। বিস্ময় ও আনন্দে সে কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।সেই কান্নার শব্দ যেন মুহূর্তেই চারপাশের উৎকণ্ঠা দূর করে দিল। অপেক্ষমাণ সবার মুখে স্বস্তি, আনন্দ আর তৃপ্তির উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। অভ্রের চোখ দুটো উচ্ছ্বাসে জ্বলে উঠল। সে আনন্দে প্রায় লাফিয়ে বলে উঠল,
— “আমার পরি এসে গেছে!”
কিছুক্ষণ পর সাদা তোয়ালে জড়ানো নবজাতককে অপারেশন থিয়েটার থেকে বাইরে আনা হলে, অভ্র আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সবার আগে ছুটে গিয়ে উচ্ছ্বাসভরে বলে উঠল,
— "আমার পরি...! আমার পরি!"
এরপর ডাক্তারের সামনে গিয়ে শিশুসুলভ সরলতায় বলল,
— "আমার পরিটাকে আমাকে দিন না। আমি কোলে নেব।"
ছেলের এমন ব্যাকুলতা দেখে আফসানা বেগম মৃদু হেসে এগিয়ে এলেন। স্নেহময় কণ্ঠে বললেন,
— "অবশ্যই, বাবা। তুই-ই আগে কোলে নিবি।"
ডাক্তার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নবজাতকটিকে অভ্রের কোলে তুলে দিলেন।
ছোট্ট, নরম, উষ্ণ প্রাণটিকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই অভ্রের অন্তরে এক অপার্থিব প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যেন তার দুই হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছে।সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু লক্ষ্য করল, ছোট্ট প্রাণটি চোখ খুলছে না।
কৌতূহলী হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— "আম্মু... ও আমার দিকে তাকাচ্ছে না কেন?"
একটু থেমে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে শিশুসুলভ উদ্বেগে আবার বলল,
— "আমি... আমি কি দেখতে খারাপ?”
অভ্রের নিষ্পাপ প্রশ্নে চারপাশে একচিলতে হাসির ঢেউ বয়ে গেল।
আফসানা বেগম স্নেহভরে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "না বাবা, তুমি দেখতে খুব সুন্দর। ও তো এখনও খুবই ছোট। এখন ওর পৃথিবী বলতে শুধু ঘুম আর খাওয়া। তাই চোখ খুলে কারও দিকে তাকাতে পারছে না।"
কথা শেষ হতেই ছোট্ট শিশুটি সামান্য নড়েচড়ে উঠল। আধখোলা চোখের পাতা একবার কেঁপে উঠল, তারপর আবার ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই তার গোলাপি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নিষ্পাপ হাসি ফুটে উঠল—হয়তো কোনো অজানা স্বপ্নে সে তখন বিভোর।
সেই হাসিতে যেন অভ্রের হৃদয় সম্পূর্ণ গলে গেল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ছোট্ট মুখটার দিকে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন এই একটুকরো প্রাণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
তখনই তার ভিতর থেকে মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো,
একদম ফেইরী টেইদের মতো লাগছে।
অদ্ভুত এক অধিকারবোধ তার শিশুমনে জন্ম নিল। ইচ্ছে করছিল, এই ছোট্ট পরিটাকে পৃথিবীর সব চোখ থেকে আড়াল করে রাখতে। যেন শুধু সে-ই দেখবে, শুধু সে-ই আগলে রাখবে, শুধু সে-ই আদর করবে।
হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামল মাহদীর ওপর।
মাহদীও মুগ্ধ বিস্ময়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নবজাতকের দিকে। সেই দৃষ্টিটুকুই যেন অভ্রের শিশুমনে অকারণ ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দিল। বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচে অনুভূতি হলো। সে তৎক্ষণাৎ শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
অভ্রের সেই আচরণ দেখে আফসানা বেগম হেসে মাহদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "কী মাহদী, তুমি কি ওকে একটু কোলে নেবে?"
মাহদীর চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। সে সম্মতি জানাতে মুখ খুলতেই অভ্র তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
— "না!"
তারপর শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "আমার পরিকে আমি কাউকে দেব না। কেউ কোলে নেবে না। ও শুধু আমার।”
অভ্রের কথা শুনে মাহদীর মুখমণ্ডল মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। তবে তাতে অভ্রের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তার কাছে এই ছোট্ট শিশুটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সেদিনই সে স্নেহভরে ছোট্ট শিশুটির নাম রাখল— "ফেইরি টেইল।"
কারণ, তার চোখে রাহা ছিল রূপকথার রাজ্য থেকে নেমে আসা এক ক্ষুদ্র পরী— নিষ্পাপ, কোমল এবং অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর।
সময়ের স্রোত অব্যাহত রইল।
কিন্তু দিন যত গড়াতে লাগল, অভ্রের রাহাকে ঘিরে থাকা মুগ্ধতা ধীরে ধীরে এক গভীর আসক্তিতে পরিণত হতে শুরু করল। বাড়িতে থাকলে এক মুহূর্তের জন্যও সে রাহাকে চোখের আড়াল করত না। কখনো কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত, কখনো গল্প শোনাত, আবার কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
এদিকে মাহদীও আগের তুলনায় অনেক বেশি অভ্রদের বাড়িতে আসতে শুরু করল। বাহানা ছিল অভ্রের সঙ্গে দেখা করা, কিন্তু তার প্রকৃত আকর্ষণ ছিল ছোট্ট রাহা। দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত, সুযোগ পেলেই একটু কাছে যাওয়ার চেষ্টা করত।
তবে রাহাকে কোলে নেওয়ার সৌভাগ্য তার খুব একটা হতো না।আসলে কেউ তাকে বাধা দিত না— বাধা দিত অভ্র।
রাহাকে অন্য কারও কোলে দেখতে তার একেবারেই ভালো লাগত না। অদ্ভুত এক অধিকারবোধ তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। যেন রাহার হাসি, কান্না, স্পর্শ— সবকিছুর একমাত্র দাবিদার সে-ই।
বছর ঘুরতে ঘুরতে সবাই ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। দুইবছর পর
একদিন তাদের বাড়িতে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। সপরিবারে সেখানে উপস্থিত হলো মাহদীরাও।
ততদিনে রাহা টলমল পায়ে হাঁটতে শিখেছে। পুরো বাড়িজুড়ে তার ছোট্ট ছোট্ট পদচারণায় যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
অভ্র অবশ্য আগের মতোই তার ছায়াসঙ্গী। এক মুহূর্তের জন্যও রাহাকে একা ছাড়ে না। কখনো কোলে তুলে আদর করছে, কখনো দুই হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটা শেখাচ্ছে, আবার কখনো নিজের হাতেই তার ন্যাপি বদলে দিচ্ছে।
রাহার যত্ন নেওয়ার প্রতিটি কাজই যেন অভ্রের কাছে আনন্দের উৎস।
শুধু একটি কাজই সে করতে পারত না— রাহাকে খাওয়ানো।
সেই দায়িত্ব পালন করতেন সাথী বেগম। তবে অভ্রের যদি সেই সামান্য সুযোগটুকুও থাকত, তাহলে সেটিও সে কাউকে করতে দিত না। রাহার প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কান্না, প্রতিটি মুহূর্ত নিজের আগলে রাখার এক অদম্য ইচ্ছা তার ছোট্ট হৃদয়কে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
একটু আগেই যখন রাহাকে অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল, অভ্র তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
— “সব আমাকে দাও। ওকে আমি নিজেই তৈরি করে দিচ্ছি। তারপর আমিও প্তৈরী হয়ে আসব।”
বাড়ির সবাই তার কথা শুনে মৃদু হেসে উঠল। কারণ তারা জানত, রাহার ব্যাপারে অভ্রের জেদের সামনে কারও কথাই কার্যকর হয় না।
রাহাও তখন এমন এক বয়সে পৌঁছে গেছে, যেখানে অভ্রই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অভ্রকে দেখামাত্রই সে দু’হাত বাড়িয়ে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন সেই বুকই তার সবচেয়ে আপন ঠিকানা।
প্রতিদিন স্কুল ছুটি শেষে অভ্র বাড়ি ফিরলেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতো। রাহা তখন যার কোলে থাকুক না কেন, অভ্রকে দেখামাত্রই ছোট্ট দু’হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিত। কোলে ওঠার জন্য ছটফট করত, কখনো বা আধো-আধো স্বরে তাকে ডাকত।
অভ্রও এক মুহূর্ত দেরি করত না। কাঁধের স্কুলব্যাগটি যেখানেই থাকুক, ছুড়ে ফেলে সে ছুটে যেত রাহার কাছে। তারপর তাকে বুকের সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরত, যেন বহুদিন পর নিজের প্রাণের অংশকে ফিরে পেয়েছে।সেই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো কিছুই যেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকত না।
বাড়ির সবাই মুগ্ধ হয়ে তাদের এই অনন্য বন্ধনের দিকে তাকিয়ে থাকত। একটি শিশুর প্রতি এতখানি মমতা, যত্ন এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—অভ্রকে দেখেই সবাই বিস্মিত হতো। মনে হতো, রাহা যেন শুধু কোনো মেয়ে নয়; সে তার সমগ্র পৃথিবী, তার শ্বাস-প্রশ্বাস, তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রুমে এনে অভ্র রাহাকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল। চারপাশ একবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হলো—কোথাও কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।"যেন আবার কোথাও গড়িয়ে না যায় তারপর তার ছোট্ট হাতে একটি চকলেট তুলে দিয়ে বলল,
— “পরিটা ভালো হয়ে বসে থাকবে, আমি এক্ষুনি আসছি।”
রাহা আধো-আধো হাসি হেসে চকলেটটা চুষতে লাগল। ছোট্ট ঠোঁটের চুকচুক শব্দে যেন পুরো ঘরটাই আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
অভ্র দ্রুত বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নিতে শুরু করল। তবে মন তার পুরোপুরি সেখানে ছিল না। দরজাটা ইচ্ছে করেই পুরোপুরি বন্ধ করল না। কয়েক মুহূর্ত পরপর উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছিল, তার ছোট্ট পরি কী করছে।
যেন এক মুহূর্তের জন্যও তাকে চোখের আড়াল করতে রাজি নয় সে।
দ্রুত গোসল শেষ করে বাইরে এসেই যে দৃশ্যটা দেখল, তাতে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
রাহা স্থির দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। একের পর এক পলক ফেলছে। আর পুরো মুখজুড়ে চকলেট লেগে আছে—গাল, ঠোঁট, এমনকি নাকের ডগাতেও।
দৃশ্যটা এতটাই নিষ্পাপ আর মায়াময় ছিল যে, অভ্র হেসে উঠল।
এক লহমায় সে রাহাকে কোলে তুলে নিল। তারপর বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছোট্ট পরিটাকে নিজের বুক আর পেটের ওপর আলতো করে বসিয়ে দিল।
রাহা সঙ্গে সঙ্গেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই নির্মল হাসির রিনিঝিনি শব্দ যেন পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল।
অভ্র মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রাহার প্রতিটি হাসি, প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি ছোট্ট দুষ্টুমি যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হতো, এই ছোট্ট পরিটাই তার সমস্ত সুখ, সমস্ত প্রশান্তি, আর তার শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।
হাসিমুখে অভ্র মোবাইলটি হাতে তুলে নিল। প্রথমে দু’জনের একটি সেলফি তুলল, এরপর একের পর এক শুধু রাহার ছবি তুলতে লাগল। প্রতিটি ছবিতেই যেন সে তার ছোট্ট পরির নিষ্পাপ সৌন্দর্যকে যত্ন করে ধরে রাখতে চাইছিল।
ছবি তোলা শেষ করে পাশ ফিরতেই তার চোখে পড়ল, বিছানার ওপর সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা রাহার পোশাক।
টকটকে লাল রঙের একটি ফ্রক। তার সঙ্গে মানানসই ছোট্ট একজোড়া জুতা, মিলিয়ে হেয়ার ক্লিপ আর চুল বাঁধার ব্যান্ড।
অভ্র আলতো করে রাহাকে কোলে তুলে নিল। তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য দাঁড় করাতেই ছোট্ট রাহা দু’হাত বাড়িয়ে অভ্রের গাল দুটো জড়িয়ে ধরল। তারপর নিজের আধখাওয়া চকলেটটি নিষ্পাপ ভঙ্গিতে অভ্রের ঠোঁটের কাছে এগিয়ে দিল।
যেন বলতে চাইছে, "এটা তোমারও।"
অভ্র একটুও দ্বিধা করল না। হাসিমুখে চকলেটের ছোট্ট টুকরোটি মুখে নিয়ে চিবাতে চিবাতে আদুরে কণ্ঠে বলল,
— "অবশেষে আমার ফেইরি টেইলও আমাকে খাওয়াতে শিখে গেছে!"
রাহা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
এরপর অভ্র অত্যন্ত যত্ন ও ধৈর্যের সঙ্গে রাহাকে পরিষ্কার করে আনল। ধীরে ধীরে তাকে সেই লাল টকটকে ফ্রকটি পরিয়ে দিল। পায়ে পরিয়ে দিল ছোট্ট জুতাজোড়া। চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে মিলিয়ে ক্লিপ আর ব্যান্ড লাগিয়ে দিল।
সবশেষে গালে আলতো করে একটু বেবি ক্রিম মেখে দিল, ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস ছুঁইয়ে দিল।
তবে আজকের সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল অন্য।
নিজের আলমারি থেকে ছোট্ট একটি বক্স বের করল অভ্র। ভেতরে ছিল সাদা পাথর বসানো অপূর্ব এক ব্রেসলেট। অনেক দিন ধরেই সে এটি রাহার জন্য যত্ন করে রেখে দিয়েছিল।
সযত্নে ব্রেসলেটটি রাহার কোমল কবজিতে পরিয়ে দিতেই ছোট্ট হাতটি যেন আরও ঝলমল করে উঠল। আলো পড়তেই সাদা পাথরগুলো চিকচিক করে জ্বলে উঠল।
অভ্র মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে রাহার কপাল, গাল আর ছোট্ট হাতের ওপর টুপটাপ করে কয়েকটি আদরের চুমু এঁকে দিল।
তার চোখে তখন একটাই অনুভূতি—যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পরিটা আজ সত্যিই রূপকথা থেকে নেমে এসে তার সামনেই বসে আছে।
রাহাকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে রেখে অভ্রও এবার নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করল।
রাহার পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সে পরল টকটকে লাল রঙের একটি শার্ট। তার ওপর কালো কোট, কালো প্যান্ট, আর পায়ে চকচকে কালো জুতা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যত্নসহকারে চুলে জেল লাগিয়ে নিজেকে পরিপাটি করে নিল।
সবকিছু গুছিয়ে শেষ করেই সে আবার রাহার কাছে ফিরে এল।
কোলে তুলে নিতেই রাহার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে সে শক্ত করে অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় সে ফিরে পেয়েছে।
অভ্রও মৃদু হেসে রাহাকে আরও একটু বুকের কাছে টেনে নিল।আর বলল,
পারফেক্ট..
নিচে নামতেই হলরুমে উপস্থিত সবার দৃষ্টি একসঙ্গে গিয়ে থামল তাদের দু’জনের ওপর। মিলিয়ে পোশাক, অভ্রের বুকে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে থাকা রাহা—দৃশ্যটি যেন চোখে লেগে থাকার মতো।
চারপাশে এত মানুষ, এত আলো আর কোলাহল দেখে রাহা একটু চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সে আরও শক্ত করে অভ্রকে জড়িয়ে ধরল। তবে তার ঠোঁটে তখনও লেগে ছিল মিষ্টি এক টুকরো হাসি।
কারণ, সে জানত—তার সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটি তাকে আগলে রেখেছে।
অভ্রের কোলে থাকলে রাহা আর কারও কাছে যেতে চাইত না।ঠিক তখনই হাসিমুখে তাদের দিকে এগিয়ে এল মাহদী।
সে স্নেহভরে রাহার গোলাপি গাল ছুঁয়ে দিতে হাত বাড়াতেই অভ্র এক পা সরে গেল। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "উহু... মাহদী, ওকে ছোঁয়া কিন্তু অ্যালাউড না। দূর থেকে দেখতে পারিস, সেটাই অনেক।"
মাহদী ভ্রু কুঁচকে অভিমানী গলায় বলল,
— "আমি না তোর বন্ধু?"
অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— "তো?"
— "তাহলে ওকে একটু ধরতে দিবি না?"
অভ্র রাহাকে আরও শক্ত করে আগলে নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "ওকে কোলে নেওয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার ফেইরি টেইলকে ছোঁয়ার অধিকার সবার নেই।”
মাহদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় স্বরে বলল,
— “আরে, আমরা তো পরিচিত। ওকে একটু আদর করতেই ইচ্ছে করছে। এত ছোট, এত মায়াবী একটা বাচ্চা... কোলে নিলে কী-ই বা ক্ষতি হবে?”
কথাটি শেষ হতেই অভ্রের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার দৃষ্টি কঠোর হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত হলো। সে রাহাকে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের বুকে চেপে ধরল, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে তার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না।
ঠান্ডা, কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে বলল,
— “ আদর মাই ফুট? একেবারেই নয়!”
তার কণ্ঠের তীক্ষ্ণতায় আশপাশের কয়েকজনও বিস্মিত হয়ে তাদের দিকে তাকাল।
অভ্র এক পা এগিয়ে মাহদীর চোখে চোখ রেখে ফিসফিস নয়, স্পষ্ট স্বরেই বলল,
— “ভালো করে শুনে রাখ। এটা প্রথম... আর এটাই শেষ সতর্কবার্তা।আজকের পর আর কোনোদিন আমার পরির দিকে ওই চোখে তাকাবি না। ছোঁয়ার কথা তো ভাববিও না।”
এক মুহূর্ত থেমে, দৃষ্টি আরও কঠোর করে যোগ করল,
— “তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু বলেই আজ কথা বলে ছেড়ে দিলাম। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে কী হতো, সেটা কল্পনাও করতে পারবি না।”
অভ্রের কণ্ঠে রাগের চেয়ে প্রবল ছিল অধিকারবোধ। যেন রাহা তার কাছে শুধু একটি শিশু নয়—তার সমগ্র পৃথিবী, যার নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের ওপর একমাত্র অধিকার সে নিজের বলেই মনে করত।
কথাগুলো বলে অভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। রাহাকে বুকের সঙ্গে আগলে নিয়ে সে সোজা উপরে নিজের ঘরে চলে গেল।
"আফসানা বেগম নিজেও দেখলেন ছেলের কাণ্ড।মাঝে মাঝে ভাবেন, ছেলেটার এই অতিরিক্ত আগলে রাখার স্বভাবটা যেন স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।”
হঠাৎই তার মনে পড়ল—রাহার ন্যাপি বদলানোর সময় হয়ে গেছে।
অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সে রাহার ন্যাপি বদলে দিল। সবকিছু গুছিয়ে আবার আদর করে কোলে তুলে নিল। এরপর নিজেও কিছুটা ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে গেল।
ফিরে এসে দেখল, রাহা বিছানায় বসে আপনমনে ছোট্ট খেলনাগুলো নিয়ে খেলছে।ঠিক তখনই নিচ থেকে তার বাবা ডাক দিলেন।যাওয়ার আগে অভ্র একবার চারপাশটা দেখে নিল। তারপর শিফাকে ডেকে বলল,
— "আমি নিচে যাচ্ছি। মাত্র কয়েক মিনিট। তুই রাহার পাশে থাকিস, একা ছেড়ে যাস না।"
শিফা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। অভ্রও নিশ্চিন্ত হয়ে নিচে নেমে গেল।
প্রায় দশ মিনিট পর সে ঘরে ফিরে এসে দরজার সামনে দাঁড়াতেই থমকে গেল। এক মুহূর্তের মধ্যেই তার দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
মাহাদী রাহার ঠিক পাশে বসে আছে। একদৃষ্টিতে, অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে ছোট্ট পরিটার দিকে।
আর রাহা...
অপরিচিত মুখটাকে এত কাছে দেখে তার ছোট্ট মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ভয়ে সে একেবারে গুটিয়ে বসে আছে। বড় বড় চোখে মাহদীর দিকে তাকিয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্ত পরেই বুক ফেটে কান্নায় ভেঙে পড়বে।
সেই দৃশ্য দেখেই অভ্রের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
মাহাদী ধীরে ধীরে রাহার আরও কাছে এগিয়ে এল। ঠোঁটে মৃদু হাসি রেখে কোমল স্বরে বলল,
— "কী হয়েছে, লাল পরি? আমাকে দেখে মুখটা এমন গোমড়া করে ফেললে কেন?"
সে সামান্য মাথা কাত করে আবার বলল,
— "আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? কিংবা কোনো কষ্ট দিয়েছি?"
রাহা কোনো উত্তর দিল না। ভয়ে ছোট্ট শরীরটা আরও গুটিয়ে নিল। বড় বড় বিস্মিত চোখে শুধু মাহাদীর দিকেই তাকিয়ে রইল।
মাহাদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মমতামিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
— "জানো, তোমাকে আমি গত দুই বছর ধরে শুধু দূর থেকেই দেখেছি। কতবার ইচ্ছে করেছে তোমাকে একবার কোলে নিই, একটু আদর করি। কিন্তু কখনো পারিনি।"
সে হাত বাড়িয়ে বলল,
— "একবার... শুধু একবার আমার কাছে আসবে, লাল পরি?"
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অভ্র।
চোখের সামনে মাহাদীর বাড়িয়ে দেওয়া হাত দেখে তার ভেতরের সমস্ত সংযম যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দৃষ্টি আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে পাশের টেবিলে রাখা ফুলদানিটি তুলে নিয়ে মাহাদীর দিকে সজোরে ছুড়ে মারল।
মাহাদী আতঙ্কে হাত তুলে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। ফুলদানিটি তার হাতে সজোরে আঘাত করতেই ব্যথায় তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
— "আহ...!"
যন্ত্রণায় চিৎকার করে সে নিজের হাত চেপে ধরে কয়েক কদম পিছিয়ে দাঁড়াল।
ঘরের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই অভ্র ঝড়ের বেগে এগিয়ে এল। ক্রোধে তার চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত, শিরাগুলো টানটান।
সে মাহাদীর শার্টের কলার মুঠো করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— "কুত্তার বাচ্চা! এত সাহস হলো কী করে? আমার পরির দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস কোথা থেকে পেলি?"
অভ্রের বজ্রকঠিন কণ্ঠে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল।
এদিকে হঠাৎ এমন উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য দেখে রাহা ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সেই কান্না অভ্রের কানে পৌঁছাতেই তার দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে এল। সে সঙ্গে সঙ্গে মাহাদীর কলার ছেড়ে দিয়ে দ্রুত রাহার কাছে এগিয়ে গেল।
কোমল হাতে তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে তুলে নিল। এক হাতে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
তারপর গম্ভীর স্বরে ডাক দিল,
— "শিফা!"
ভাইয়ের কণ্ঠে অস্বাভাবিক কঠোরতা শুনে শিফা দৌড়ে ঘরে ঢুকল।
ঘরে ঢুকেই থমকে গেল সে। চারপাশের থমথমে পরিবেশ, মাহাদীর অবস্থা আর অভ্রের ক্রুদ্ধ মুখ দেখে সে কিছু বলার আগেই অভ্র তীব্র ক্ষোভে তার গালে একটি চড় বসিয়ে দিল।
শিফা হতভম্ব হয়ে গালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে। কাঁপা কাঁপা চোখে সে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
অভ্র তখনও প্রচণ্ড উত্তেজিত। কঠোর স্বরে বলে উঠল,
— "বেয়াদব মেয়ে! কোথায় ছিলি তুই? রাহাকে তোর কাছেই রেখে গিয়েছিলাম না? একটুখানি দায়িত্বও রাখতে পারলি না?"
তার কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, উদ্বেগ আর রাহাকে হারানোর আতঙ্কের তীব্র প্রতিধ্বনি। আর রাহা তখনও অভ্রের বুকের সঙ্গে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
শিফা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গালে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে বলল,
— "ভা... ভাইয়া... মাহাদী ভাইয়া বলেছিলেন, আম্মু নাকি আমাকে নিচে ডাকছেন। তিনি বলেছিলেন, আমি গেলেই তিনি এখানে থাকবেন। তাই... তাই আমি চলে গিয়েছিলাম।"
ভয়ের চাপে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠছিল। চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
অভ্র কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের রাগ সংযত করে রাহাকে আলতোভাবে শিফার কোলে তুলে দিল।
গম্ভীর, অনড় কণ্ঠে বলল,
— "ওকে এখনই মেজো আম্মুর কাছে নিয়ে যা। বলবি, খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।"
এক মুহূর্ত থেমে মাহাদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার বলল,
— "আর আজকের পর থেকে তোদের এই ছেলেটার আশপাশে যেন আর কখনো না দেখি।"
শিফা কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলল,
— "জি... ভাইয়া।"
এরপর রাহাকে শক্ত করে আগলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল।
অভ্র ধীর পায়ে মাহাদীর দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখেমুখে জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর অদম্য অধিকারবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হঠাৎ এক প্রবল ধাক্কায় সে মাহাদীকে বিছানার ওপর ফেলে দিল।
মাহাদী সামলে ওঠার আগেই অভ্র মেঝেতে পড়ে থাকা ভারী ফুলদানিটি তুলে নিল। দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সেটি মাথার ওপর তুলল। ক্রোধে তার বুক ওঠানামা করছিল, দৃষ্টি জ্বলছিল দাবানলের মতো।
ঘরের নিস্তব্ধতায় শুধু দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, পরমুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নিতে পারে।
—----
ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে দরজা ঠেলে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করলেন রাহার বাবা। এক ঝটকায় অভ্রকে সরিয়ে দিয়ে তিনি গর্জে উঠলেন,
— "কী করছিস তুই, অভ্র!"
হঠাৎ বাধা পেয়ে অভ্র কয়েক পা পিছিয়ে গেল। ,চোখ দুটো ভয়াবহ রক্তিম। দশ বছরের বাচ্চার এমন রাগ দেখে রাহার বাবা তো আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
— "তো আমি কী করব, মেজো চাচ্চু? এই লোকটা আমার পরির গায়ে হাত দিতে যাচ্ছিল!"
কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠল।
— "আমি আগেই ওকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছিলাম। তারপরও এত বড় দুঃসাহস দেখানোর সাহস পেল কীভাবে?"
অভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,
— "বল! আমি তোকে নিষেধ করিনি? বল!"
মাহাদী নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অভ্র আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়ল,
— "তাহলে কোন সাহসে এখানে এলি? আমার কথা অমান্য করার সাহস কে দিয়েছে তোকে?"
কথা শেষ করেই সে আবার মাহাদীর দিকে তেড়ে যেতে উদ্যত হলো।
রাহার বাবা বারবার তার পথ রোধ করলেন। দুই হাতে শক্ত করে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু অভ্র তখন ক্রোধে এতটাই উন্মত্ত যে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেখে আরমান খান অভ্রের গালে একটি জোরালো চড় বসিয়ে দিলেন।
চড়ের শব্দে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কঠোর, দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন,
— "সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস, অভ্র! রাগ থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাবি? কী করতে যাচ্ছিলি তুই? একটা ভুলের জন্য আরেকটা ভয়ংকর ভুল করে বসবি?"
অভ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকটা তখনও দ্রুত ওঠানামা করছে। মুঠো করা হাত দুটো কাঁপছে, আর চোখে এখনো দাউদাউ করে জ্বলছে ক্ষোভের আগুন।
অভ্রের কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাগে তার সমগ্র শরীর কাঁপছিল। হঠাৎই বজ্রনিনাদের মতো সে চিৎকার করে উঠল,
— "হ্যাঁ! প্রয়োজন হলে মেরেই ফেলব!"
তার চোখে তখন একরোখা উন্মত্ততার ছাপ।
— "শুধু ওকেই নয়... যে-ই আমার ফেইরি টেইলের দিকে লোভের দৃষ্টি দেবে, ওর দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে, কাউকেই আমি ছাড়ব না। কাউকেই না!"
কথাগুলো যেন এক অটল প্রতিজ্ঞার মতো উচ্চারিত হলো।
পরমুহূর্তেই সে হাতের ভারী ফুলদানিটি প্রবল শক্তিতে মেঝেতে আছড়ে ফেলল।
ঝনঝন!
বিকট শব্দে ফুলদানিটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ল। ঘরের নীরবতা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
এরপর আর কারও দিকে একবারও না তাকিয়ে অভ্র দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরে নেমে এলো এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
আরমান খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভাতিজার এমন বিস্ফোরক রাগ দেখে তিনি স্পষ্টতই বিরক্ত ও হতাশ হলেন। তাঁর কাছে বিষয়টি এতটা গুরুতর হয়ে ওঠার কথা ছিল না।
মাহাদী তো তাদের পরিবারের কাছে প্রায় আপনজনের মতোই। দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। উপরন্তু, সে অভ্রের শৈশবের বন্ধু—একসঙ্গে বড় হয়েছে, একই স্কুলে পড়েছে।
ধীরে ধীরে মাহাদীর কাছে এগিয়ে এসে আরমান খান তাঁর কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন।
অনুতপ্ত কণ্ঠে বললেন,
— "বাবা, অভ্রের পক্ষ থেকে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। ওর আচরণ একেবারেই সমীচীন হয়নি।"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
— "প্লিজ, কিছু মনে কোরো না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব, ওকে বুঝিয়ে বলব। ওকে তো চেনোই—রাগটা খুব দ্রুত মাথায় চড়ে যায়। তবে মনটা খারাপ না। আজ একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।”
আরমান খানের কথাগুলো মাহাদীর কানে গেল ঠিকই, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। তখন তার মাথার ভেতর শুধু ক্ষোভ, অপমান আর আহত আত্মসম্মানের ঝড় চলছিল।
মনে মনে সে একটা কঠিন শপথ নিল।
একদিন রাহা তারই হবে। আর সেদিন অভ্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে—যাকে এত আগলে রাখতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাকেই সে নিজের করে নিয়েছে।
তার বুকের ভেতর জমে উঠল তীব্র অভিমান।
“আমি কি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে ওর কাছে গিয়েছিলাম?”
“একটু আদর করতে চেয়েছিলাম শুধু। একটা নিষ্পাপ শিশুকে কোলে নিতে চেয়েছিলাম। এর জন্য এত অপমান, এত ঘৃণা, এত অবিশ্বাস?”
অভ্রের প্রতিটা কথাই যেন তার আত্মসম্মানে ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল।
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না মাহাদী। শক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেদিনই তাদের কয়েক বছরের বন্ধুত্বের শেষটা হয়ে গেল।
প্রথম শ্রেণি থেকে একসঙ্গে বড় হওয়া দুই বন্ধু মুহূর্তেই হয়ে গেল দুই অপরিচিত মানুষ। এরপর আর কখনো কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেনি। অভ্র তো মাহাদীর অস্তিত্বই যেন মেনে নিল না। সামনে পড়লেও চোখ তুলে তাকাত না।
সময় কিন্তু থেমে থাকেনি।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই হঠাৎ এক দুঃসংবাদ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল।
রাহার বাবা আরমান খান আর বেঁচে নেই।
খবরটা শুনে মাহাদীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার নেমে এলো। মানুষটার প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। তাই মৃত্যুর খবরটা তাকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিল।
তবে একটা বিষয় পুরো এলাকাকেই বিস্মিত করেছিল—আরমান খানের লাশ কখনোই পাওয়া যায়নি। তাহলে ঠিক কীভাবে ঘটেছিল তাঁর মৃত্যু?
কিন্তু সেই শোকের সাত দিনের মাথায় আরও একটা খবর তার কানে এলো।
অভ্রকে ইতালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খবরটা শুনে মাহাদীর বুকের ভেতর চাপা একটা তৃপ্তি কাজ করল। মনে হলো, তার পথের সবচেয়ে বড় বাধাটাই যেন সরে গেছে। বহুদিন পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু সে জানত না...
ভাগ্য চুপিচুপি তার জন্য আরও কঠিন একটা খেলা সাজিয়ে রেখেছে।
অভ্রের চলে যাওয়ায় যে আনন্দ তার মনে জন্মেছিল, সেটা বেশিদিন টিকল না।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, অভ্রের যাওয়ার কিছুদিন পর মাহাদীকেও একই দেশে—ইতালিতে পাড়ি জমাতে হয়। অথচ দূরদেশেও তাদের বহু বছরের দ্বন্দ্বের ইতি ঘটেনি।
তবে কেন তাকে হঠাৎ ইতালি যেতে হয়েছিল, সেই প্রকৃত কারণ সে জানতে পারে বহু বছর পর।
আর সেই সত্যের পাশাপাশি আরও একটি গভীর গোপন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় সে, যা তার সমগ্র জীবনকে আমূল বদলে দিতে চলেছে।
সেই সত্য তার সামনে একটিই সম্ভাবনা উন্মোচন করে—
রাহাকে আবার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
হয়তো রাহা কখনোই তাকে ক্ষমা করবে না। হয়তো তার দিকে ফিরেও তাকাবে না। তবু মাহাদীর তাতে কোনো আপত্তি নেই।
রাহা যদি তাকে না-ও দেখে...
সে তো দূর থেকেই রাহাকে দেখতে পারবে।
তার কাছে এটুকুই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
—————
বর্তমান….
একটি দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল মাহাদী। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে নিঃশব্দে একবার শরীর মোচড় দিয়ে উপুড় হয়ে ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
তার ডান হাতটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছিল। সেই কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটি নিজের দিকে টেনে নিল।
স্ক্রিন আনলক করতেই গ্যালারির ভেতর থেকে ভেসে উঠল বহু বছর আগের একটি ছবি।
ছবিটিতে ছোট্ট রাহা—টুকটুকে লাল ফ্রক পরা, মুখভরা নিষ্পাপ হাসি, চোখেমুখে একরাশ শিশুসুলভ সারল্য। ছবিটি দূর থেকে তোলা, তাই সে জানতও না, অজান্তেই কেউ তার সেই হাসিটুকু নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি করে রেখে দিচ্ছে।
মাহাদীর কাঁপতে থাকা আঙুল ধীরে ধীরে ছবিটির ওপর বুলিয়ে গেল। যেন ফোনের ঠান্ডা কাঁচ ভেদ করে সে বহু বছর আগের সেই ছোট্ট হাতটিকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চাইছে।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে ঠান্ডা মেঝেতে মিলিয়ে গেল।
তারপর বুকভাঙা, ভারী এক বিষণ্ন কণ্ঠে সে ধীরে ধীরে গুনগুন করে উঠল——
যন্ত্রণা গুলো আমাকে,
ভেতরে পোড়ায়।
ভাবতে ভাবতে তারে আমি,
চোখ বুজিয়া জড়াই ধরি।
চোখ মেলিয়া দেখি আমি,
সে যে বুকে নাই।
প্রিয়া রে, প্রিয়া রে, প্রিয়া,
শেষ লাইনটি উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রাহার শৈশবের ছবিটির ওপর। তবুও সে ছবিটিকে বুকে চেপে ধরে রইল, যেন সেটিই রাহাকে ছুঁয়ে থাকার তার শেষ অবলম্বন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………