আড়মোড়া ভেঙে, ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই রাহার চোখ আটকে গেল— তার ঠিক সামনেই ডিভানে পা তুলে বসে থাকা অভ্রের দিকে।
অভ্রের সেই রক্তাভ চাহনি দেখে ভয়ে রাহার বুক কেঁপে উঠল। নিজের অজান্তেই সে গায়ে জড়ানো পাতলা কম্বলটি আরও শক্ত করে বুকের কাছে টেনে নিল। সকালবেলায় অভ্র ভাইয়ের এমন ভয়ংকর রূপের কারণ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না সে।
সামনের টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সিগারেটের খালি দশটি প্যাকেট। পাশে পড়ে আছে কয়েকটি নামীদামি ড্রিঙ্কসের বোতল—যেন রাতভর চলেছে কোনো অস্থিরতার নীরব উৎসব। এখনো অভ্রের এক হাতে জ্বলছে আধখাওয়া সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, অথচ তার নজর একচুলও সরছে না রাহার ওপর থেকে।
কিছুক্ষণ পরই নিচ থেকে ডাক ভেসে এলো।
অভ্র যেন এতক্ষণ ধরেই সেই ডাকটির অপেক্ষায় ছিল। মুহূর্তেই তার স্থির হয়ে থাকা শরীর নড়ে উঠল।
ধীর পায়ে উঠে রাহার সামনে এসে দাঁড়াতেই রাহা অজান্তেই নিজেকে আরও গুটিয়ে নিল। বুকের ভেতর অকারণে ধুকপুক শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কেন অভ্র ভাই এমন আচরণ করছে, কিংবা সে-ই বা কী অপরাধ করেছে—কিছুই বুঝতে পারছে না রাহা।
কাঁপা গলায় কিছু বলতে উদ্যত হতেই—
হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাসটি তুলে নিয়ে রাহার মুখ বরাবর ছুড়ে মারল অভ্র।
পানি ছিটকে রাহার মুখে পড়ল,
আর গ্লাসটি সামনে ছুড়ে মারতেই ঝনঝন শব্দে সেটি পাশেই আছড়ে পড়ল। চমকে রাহা ধড়ফড় করে উঠল। মুহূর্তেই ঘুমের শেষ আবেশটুকুও তার চোখ থেকে মিলিয়ে গেল। ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল রাহার চোখ। কয়েক মুহূর্ত সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল অভ্রের দিকে—তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গেই অভ্র একহাতে রাহার কোমর জড়িয়ে তাকে অনায়াসে কাঁধে তুলে নিল। রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভ্র দৃঢ় পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
অভ্রের কাঁধে ঝুলে থাকা অবস্থায় রাহা লজ্জায় কুঁকড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। বারবার নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও অভ্রের শক্ত বাহুর বাঁধন থেকে একটুও নড়তে পারছে না।
সেখানে আরমান খানও উপস্থিত ছিলেন।
মেয়েকে অভ্রের কাঁধে এমন অবস্থায় দেখে তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। নীরবে সেখান থেকে সরে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে অভ্রের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “শ্বশুর আব্বা, এ কেমন মেয়ে পয়দা করেছে? কাজের সময় এলেই যে একেবারে সেন্সলেস হয়ে যায়!”
কথাটা কানে যেতেই আরমান খানের পা দুটো মাঝপথেই থেমে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালেন তিনি।
এদিকে অভ্র রাহাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে একেবারে সোফার ওপর বসিয়ে দিল। রাহা তখনও লজ্জা আর বিব্রততায় মাথা নিচু করে বসে আছে।
আরমান খান এবার দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এলেন অভ্রের দিকে।
ভ্রু কুঁচকে কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলেন—
— “মানে?”
— “তুমিও এখন নিজের মেয়ের মতো ‘মানে, মানে’ করছ!”
অভ্র ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে বলল—
— “ওহ, সরি! ভুলেই তো গিয়েছিলাম—ওটাও তো তোমারই প্রোডাক্ট!”
কথাটা শুনে আরমান খানের কপালে যেন মুহূর্তেই ভাঁজ পড়ে গেল।
অভ্র থামল না। বরং আরও নির্লজ্জ ভঙ্গিতে গলা ঝেড়ে বলল—
— “কিন্তু কথা হলো, আমার মেজো আম্মুটা তোমাকে সহ্য করে কীভাবে, সেটাই তো আমার মাথায় ঢোকে না! হায় কপাল! তুমিও আবার কাজের সময় সেন্সলেস-টেন্সলেস হয়ে যাওনা তো?”
আরমান খান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। রাগে চোখ কটমট করে ধমকে উঠলেন—
— “অভ্র! আমি তোর শ্বশুর হই, হতচ্ছাড়া! মুখে লাগাম টান!”
অভ্র চোখ তুলে তাকিয়ে জিহ্বা দিয়ে পুরো মুখ ঘুরিয়ে ভ্রুগুলো উঁচু করে মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে, অসম্ভব দীর্ঘ করে টেনে বলল—
— “এহহহহহহহহহ্...! কচু টানব!
আগে শোনো—এগুলো খাইয়ে তোমার মেয়েকে সাত দিনের মধ্যে সুস্থ-সবল করে তুলবে বলে দিলাম!"
কথাটা স্পষ্টভাবে জানিয়ে অভ্র এবার রাহার দিকে ফিরল। চোখ সরু করে তার দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলে উঠল—
— “আর তুইও শোন, এই দেড়ব্যাটারি শরীর নিয়ে আবার যদি আমার সামনে হাজির হোস, একদম তুলে আছাড় মারব! পরের বার কিন্তু একটুও ছাড়ব না। অজ্ঞান হয়ে গেলেও জ্ঞান ফিরিয়ে কাজ শেষ করে তবে ছাড়ব। দরকার হলে আগেভাগেই ডাক্তার রেডি করে রাখব। ফাজিল মেয়ে!”
ধমকটা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না অভ্র। গম্ভীর মুখে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
অভ্র চোখের আড়াল হতেই একে একে সবাই ড্রইংরুমে ঢুকল।
আর ঢুকেই—সবাই যেন বাকরুদ্ধ!
ড্রইংরুমের চারপাশে স্তূপ হয়ে আছে রাশি রাশি ফল, ডিম, দুধ আর নানা ধরনের খাবার। দৃশ্যটা দেখে কারও মুখে কোনো কথা নেই।
এত ফল শেষ পর্যন্ত খাবে কে?
রাহাও একবার একেকজনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে সামনে সাজিয়ে রাখা ফলের স্তূপের দিকে দৃষ্টি ফেরাল।
এখনো বাইরে থেকে কয়েক ট্রে ভর্তি ফল ঘরে ঢোকানো হচ্ছে!
রাহা নির্বাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু এখন অভ্রের এই কাণ্ড দেখে সবার একটাই প্রশ্ন—
এতসব খাবার শেষ পর্যন্ত খাবে কে?
সবার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
অভ্রের হঠাৎ হলোটা কী?আর এতসব কাণ্ডেরই বা মানে কী?
একসময় সবার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি একযোগে গিয়ে থামল রাহার ওপর। কারণ এই রহস্যের উত্তর একমাত্র রাহার কাছেই আছে।
রাহা মুহূর্তেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে নখ খুঁটতে খুঁটতে কাঁদো-কাঁদো মুখে অসহায় স্বরে বলে উঠল—
— “আমি কিছু জানি না... আমি কিছু জানি না!”
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। এক লাফে উঠে সোজা দৌড়!
রাহার এমন আচরণে সবাই হতবাক হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। কারও মুখে কথা নেই। সবার চোখেমুখে একই প্রশ্ন—
জামাই-বউ দুটোর আসলে হলোটা কী?
ইভান, আয়াতসহ তার বাবা-মা, সানাকে নিয়ে সকাল সকালই রওনা হয়ে গেছে। অবন্তিকা আর সাফাও নিজেদের কাজে বেরিয়ে পড়েছে।
আর এতক্ষণ রাহা অভ্রের ঘরে ছিল বলেই কেউ সাহস করে ওপরে ওঠেনি।
এদিকে রাহা এক দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দিল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে গিয়ে বিছানার ওপর বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকার পরই হঠাৎ রাতের একেকটা দৃশ্য…
অভ্রের মাতাল করা চাহনি... তার দিকে এগিয়ে আসা সেই অচেনা অভ্রের অবয়ব।
রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।একে একে রাতের সব ঘটনা যেন জীবন্ত হয়ে ফিরে এলো তার মনে।
—————
ফ্ল্যাশব্যাক…..
বাইরে তখনও প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। ঝোড়ো বাতাসের দাপটে জানালার কপাট বারবার কেঁপে উঠছে, আর মুষলধারে বৃষ্টির শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে।
চিলেকোঠার নিস্তব্ধ ঘরে রাহাকে আলতো করে বিছানায় বসানোর পর ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো অভ্র।
অজানা এক আশঙ্কা আর হিমশীতল ঠান্ডায় রাহার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। বুকের ভেতরটা যেন অকারণেই বারবার ধুকপুক করে উঠছে।
রাহা পিছিয়ে যাচ্ছে আর অভ্র এগিয়ে যাচ্ছে। এসময় গিয়ে রাহার পিঠ ঠেকে গেল রং ওঠা দেয়ালের সঙ্গে।
অভ্র একটা বাঁকা হাসি দিয়ে রাহার পা খপ করে ধরে দিল এক টান। এত জোরে টান দেওয়ায় রাহা মুহূর্তেই একদম অভ্রের সামনাসামনি এসে গেল।
রাহা খুব জোর জোরে হাঁপাচ্ছে। অভ্র ধীরে ঝুঁকে রাহার কানের লতিতে জমে থাকা পানির ক্ষুদ্র ফোঁটাটি নিজের ঠোঁটের স্পর্শে মুছে নিল। পরক্ষণেই সেখানে রেখে দিল এক মৃদু চুম্বন।
রাহার শ্বাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।অজান্তেই অভ্রের কোমরের দুই পাশের শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে। রাহার সেই অসহায় আঁকড়ে ধরা যেন অভ্রের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতাকে আরও উসকে দিল।
পরক্ষণেই অভ্র তার হাত তুলে এক টানে রাহার গলা থেকে ওড়নাটা সরিয়ে নিচে ফেলে দিল।
রাহার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, অথচ ভয়ে কোনো শব্দই যেন বের হতে চাইছে না। গলার কাছে এসে কথাগুলো বারবার আটকে যাচ্ছে।
তবুও প্রাণপণে নিজেকে সামলে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে উঠল—
— “আমি ভয় পাচ্ছি, অভ্র ভাই... আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। দয়া করে... রুমে চলুন।”
অভ্র আস্তে আস্তে রাহার মুখের কাছে ঝুঁকে তার ঠোঁট বরাবর নিজের ঠোঁট এগিয়ে এনে নিচু, ভারী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— “আমি থাকতে তোর কিসের ভয়, প্লিজ জান? আজ আমাকে আটকাস না। নইলে সত্যিই আমি মরে যাব। আর একটু পর এমনি ঠান্ডা কমে যাবে।”
কথাগুলো বলেই নিজের পরনে থাকা শার্টটা এক টানে খুলে ছুড়ে ফেলল অভ্র।
অভ্রের এমন আচরণে রাহা যেন মুহূর্তেই নির্বাক হয়ে গেল। কী বলবে, কী করবে—কিছুই যেন তার মাথায় আসছে না। ঠোঁট কাঁপছে, সাথে শরীরজুড়ে কেবল থরথর কম্পন।
অভ্রকে শার্টবিহীন অবস্থায় দেখে রাহা সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখ সরিয়ে নিতেই অভ্র হাত বাড়িয়ে তার চোয়াল ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল।
চোখে তুলে গম্ভীর স্বরে বলল—
— “স্বামী হই তোর। তুই দেখবি না তো কে দেখবে? তাকা আমার চোখের দিকে।”
অভ্রের হাত তখনও রাহার থুতনিতে। তার আঙুলের দৃঢ় স্পর্শে রাহার মাথা সামান্য উঁচু হয়ে আছে। অথচ রাহা ভয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
রাহা চোখ মেলছে না দেখে অভ্রের কণ্ঠ মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল। এক ধমক দিল—
— “তাকা বলছি!”
সঙ্গে সঙ্গেই রাহা চোখ মেলে তাকাল।
রাহার চোখজোড়াও ততক্ষণে লালচে আভা ধারণ করেছে। পাপড়ির ডগায় জমে থাকা স্বচ্ছ অশ্রুবিন্দুগুলো অভ্রের চাহনিকে যেন অদৃশ্য এক আকর্ষণে টেনে নিচ্ছিল।
সেই আকর্ষণ উপেক্ষা করতে না পেরে অভ্রও সাড়া দিল। ধীরে ঝুঁকে রাহার দুই চোখের পাতাজুড়ে একের পর এক কোমল চুম্বন এঁকে দিতে লাগল—যতক্ষণ না পাপড়িতে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।
ঠিক তখনই অভ্রের নজর গিয়ে থামল রাহার কাঁধে। ভেজা সাদা চুড়িদারের ফাঁকে কালো ফিতেটি স্পষ্ট হয়ে জ্বলজ্বল করছে। মুহূর্তেই অভ্রের চোখে এক গভীর তীক্ষ্ণতা ফুটে উঠল। এক মৃদু টানে রাহার কাঁধ থেকে ভেজা কাপড়টি সামান্য সরিয়ে সে সেখানে মুখ গুঁজে দিল।
রাহা আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। অস্বস্তি আর প্রবল অনুভূতির চাপে সে অভ্রের ঘাড় আঁকড়ে ধরে সেখানে নিজের নখ বসিয়ে দিল।
তাতে অভ্রের সামান্য সংযম টলে গেলেও, সে থামল না। কারণ ততক্ষণে সে যেন সম্পূর্ণভাবে এক ভিন্ন এক গভীর অনুভূতির ঘোরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।
অভ্রের প্রতিটি স্পর্শে রাহার ধনুকের মতো বাঁকানো শরীর বারবার শিউরে উঠে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ভয়, অস্বস্তি এবং তীব্র আবেগ—সবকিছু যেন একসঙ্গে তার ওপর চেপে বসেছিল।
বাইরের ঝড়ের শব্দও তখন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। জানালার কপাটের কাঁপুনি, বজ্রপাতের ঝলকের সঙ্গে রাহার বুকের ভেতরের অস্থিরতাও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল।
— “অভ্র ভাই...”
কাঁপা কণ্ঠে রাহা ডাক দিল।
কিন্তু অভ্র যেন সেই ডাক শুনেও শুনল না।
রাহা দুর্বল হাতে অভ্রের বুক ঠেলে নিজেকে একটু সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। অথচ শরীরে তখন আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই। চোখের সামনে হঠাৎ সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
রাহা কয়েকবার চোখের পাতা ফেলল, কিন্তু ঝাপসা ভাবটা কাটল না।
— “অভ্র ভাই... আমার... কেমন যেন লাগছে...”
কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে এল।
অভ্র তখনই থমকে গেল।
রাহার মুখের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল—রাহার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, শরীরটাও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
— “জান?”
অভ্র দ্রুত তাকে সামলে ধরল।
কিন্তু তার আগেই রাহার মাথা ধীরে ধীরে অভ্রের কাঁধে হেলে পড়ল।
— “রাহা!”
অভ্রের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ। কোনো সাড়া নেই।
রাহার চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে অভ্রের বাহুর ওপর ঢলে পড়েছে।
হঠাৎ যেন নিজের ধ্যান ভেঙে বাস্তবে ফিরে এল।
— “ওহ্ শিট...!”
কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে উঠল অভ্র।এক মুহূর্তের জন্য অভ্র যেন পাথর হয়ে গেল।তারপর তড়িঘড়ি করে রাহাকে নিজের বাহুতে নিয়ে নিল। এক হাত গালে রেখে চাপড়াতে চাপড়াতে বলে উঠল,
— “জান... চোখ খুল।”
কাঁধ ধরে আলতো করে ঝাঁকিয়ে দিল সে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অভ্রের বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত আগের সমস্ত আবেশ যেন এক নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। তার জায়গা নিল তীব্র আতঙ্ক।
— “রাহা!”
বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আর সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল রাহা—অভ্রের ডাকে যার কোনো সাড়া নেই।
অভ্র দ্রুত রাহার কপালে হাত রাখল। তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। ভেজা পোশাক থেকে তখনও টুপটাপ করে পানি ঝরছে। অভ্রের চোখে-মুখে এবার স্পষ্ট অপরাধবোধ ফুটে উঠল।
— “আমি কী করছিলাম...?”
নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে বিছানা থেকে রাহাকে কোলে তুলে নিল অভ্র। এরপর দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
ভেজা পোশাকে এভাবে থাকলে রাহার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে—এটা বুঝতে তার একটুও সময় লাগল না। অভ্র আলমারি খুলে রাহার জন্য শুকনো পোশাক বের করল। এরপর তার ভেজা পোশাক পরিবর্তন করে তাকে শুকনো ও আরামদায়ক পোশাক পরিয়ে দিল। তোয়ালে দিয়ে চুলের ভেজাভাবও যতটা সম্ভব মুছে দিল। তারপর দ্রুত কম্বল টেনে তার শরীর ভালোভাবে ঢেকে দিল।
অভ্র কিছুক্ষণ নীরবে রাহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রাহার ফ্যাকাশে মুখ দেখে তার বুকের ভেতরটা আবারও মোচড় দিয়ে উঠল।
— “জান...”
তার কণ্ঠ এবার আগের মতো কঠোর নয়, বরং অস্বাভাবিকভাবে নরম।
রাহার কপাল থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল অভ্র।
— “আমাকে একবার চোখ মেলে দেখো... প্লিজ।”
কোনো সাড়া নেই।
অভ্র বিছানার পাশে বসে পড়ল।
তারপর রাহার নিস্তেজ হাতটি নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখল।
বাইরে তখনও ঝড়-বৃষ্টি চলছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে অভ্রের কাছে বাইরের পৃথিবীর কোনো শব্দই যেন পৌঁছাচ্ছিল না।
তার সমস্ত মনোযোগ কেবল রাহার দিকেই নিবদ্ধ।
—————
বর্তমান...
ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অভ্র। অভ্রকে দেখামাত্রই রাহা ছিটকে উঠে বসল। কিছু করার আগেই যেভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, সেটা মনে পড়তেই রাহার খুবই হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু অভ্রের দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে রেখেছে।
অভ্র দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে উঠল,
— “রাহা! দিস ইজ ইয়োর লাস্ট টাইম চান্স। নিজেকে তৈরি কর আমার জন্য। এমন পাঠকাঠির মতো শরীর নিয়ে আবার সামনে আসবি তো, সিরিয়াসলি, লাত্থি খাবি! গলার হাড়গুলো একদম বেড়িয়ে এসেছে।”
রাহা বিরক্ত হয়ে বলল—
— “এটাকে বিউটি বোন বলে। বুঝেছেন? এটা মেয়েদের সৌন্দর্য!”
অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “তোর ওই বিউটি বোনের শালিরে উষ্টা!”
— “এহ!”
— “আবারও মুখে মুখে তর্ক করছিস? বেয়াদব নারী!”
একটু থেমে অভ্র ভ্রু তুলে বলল—
— “এবার থেকে আমি যা বলব, চুপচাপ শুনবি।”
রাহা নিচু স্বরে বলল—
— “না।”
অভ্র বিরক্ত হয়ে বলল—
— “সিরিয়াসলি, রাহা? আবার শুরু করলি?”
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে জবাব দিল—
— “হ্যাঁ, করলাম। কী করবেন?”
অভ্র কয়েক সেকেন্ড কটমট করে তাকিয়ে থেকে দাঁত চেপে বলল—
— “দাঁড়া... দেখাচ্ছি মজা!”
কথাটা শুনেই রাহার চোখ কপালে উঠে গেল।
— “এহ! না না, লাগবে না!”
বলেই ধাম করে উঠে দাঁড়াল রাহা।
এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা ওয়াশরুমের দিকে দৌড়!
অভ্র হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড সেদিকেই তাকিয়ে রইল।তারপর বিরক্ত হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল—
— “এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি যে কোথায় যাই!”
মাহাদী কল ধরতেই অভ্রের উদ্ভট গাওয়া গান শুনে বিরক্ত হয়ে বলল—
— “তুই এসব কবে থেকে গাস? ইয়াক?”
অভ্র হেসে বলল—
— “সবই আবার বউয়ের দয়া, বুঝেছিস? কাল রাতের এফেক্ট। আর তুই তো আমাকে ভুলেই গেছিস।”
অভ্র মাহাদীকে আরেকটু জ্বালানোর জন্য আবারও বলতে শুরু করল—
·
·
·
চলবে……………………………………………………