— "অভ্র ভাই, দয়া করে দ্রুত আসুন! সবাই অনেক আগেই ছাদে উঠে গেছে। এখন শুধু আপনিই বাকি আছেন!"
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে রাহা ব্যাকুল হয়ে অভ্রের কবজি শক্ত করে ধরে টানতে লাগল।
সেই সময় অভ্র ল্যাপটপের স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজনেস মিটিংয়ের তারিখ চূড়ান্ত করছিল। শেষবারের মতো কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করে সে ল্যাপটপটি বন্ধ করল।
— "ঠিক আছে... চল, আমার কাজ শেষ।"
বলেই সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই—
— "এই, দাঁড়ান!"
রাহার ডাকে অভ্র সঙ্গে সঙ্গে থেমে পেছন ফিরে তাকাল। কপাল সামান্য কুঁচকে হালকা বিরক্তির ভঙ্গিতে বলল,
— "আবার কী হলো? এই তো একটু আগে আমাকে তাড়াহুড়ো করিয়ে পাগল করে তুললি। এখন আবার থামাচ্ছিস কেন?"
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
— "যাব তো... কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।"
— "কী সমস্যা?"
রাহা কাতর দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— "আমি... হাঁটতে পারছি না।”
অভ্র ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।
— "ওহ... এই ব্যাপার! এত ঢং না করে সোজাসুজি বললেই তো হতো— আমার কোলে চড়তে ইচ্ছে করছে।"
রাহা ভ্রু কুঁচকে অভিমানের সুরে বলল,
— "আগে তো এত ঢং করতে হতো না। আমার বলার আগেই আপনি নিজে থেকেই কোলে তুলে নিতেন। এখন কেন জানি সবকিছু মুখে বলতে হয়!"
আরও কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই অভ্র এক ঝটকায় রাহার সরু কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের শক্ত বাহুর আশ্রয়ে তুলে নিল।
রাহা চোখ বড় বড় করে অভ্রের দিকে তাকাতেই অভ্র কপালে আলতো চুমু এঁকে স্নিগ্ধ হেসে বলল,
— "সরি, জান। আর কখনো এমন হবে না।"
কথা বলতে বলতেই অভ্র পরম যত্নে রাহাকে বুকে আগলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। ছাদের দরজার ঠিক সামনে এসে অত্যন্ত সাবধানে তাকে ধীরে ধীরে মাটিতে নামিয়ে দিল।
দরজার ওপাশেই অপেক্ষা করছিল সবাই। জারিফ, জায়ান, সাফা, অবন্তিকা, শিফা, ইভান, সানা ও আয়াত— সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল।
অভ্র আর রাহাকে একসঙ্গে ছাদে উঠতে দেখেই উপস্থিত সবার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল। এদিকে বারবিকিউয়ের আয়োজনও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগুনের তীব্র তাপ আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শিফার চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছে, আর গালেও লেগে আছে কালির ছোপ।
ঠিক তখনই ইভান এক বোতল ঠান্ডা পানি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "নিন, আগে মুখে একটু পানি দিয়ে আসুন। বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি।"
শিফা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— "না, লাগবে না। আমি পারব।"
ইভান কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই কঠিন চাহনির সামনে বিন্দুমাত্র জেদ ধরে রাখতে পারল না শিফা। চুপচাপ হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিয়ে নিল।
শিফা কয়েক কদম এগোতেই রাহা খুনসুটিভরা হাসি চেপে জোরে বলে উঠল,
— "দুলাভাইয়া... থুক্কু, ইভান ভাইয়া! আপনিও সঙ্গে যান না। আপু যদি একা গিয়ে ভয় পায়!"
রাহার কথা শুনে শিফা সংকোচে কান পর্যন্ত রাঙা হয়ে গেল। এতটুকুও দাঁড়াল না, তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে সরে গেল।
ইভানও ক্ষীণ হেসে ধীর পায়ে তার পেছন পেছন এগিয়ে গেল। কয়েক পা এগিয়ে শিফা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে গেল। হাতের বিভিন্ন জায়গায় কালো কালি আর কয়লার দাগ লেগে আছে। মুখেও কালচে ছাপ।
মনে মনে বিড়বিড় করে ভাবল,
— "ইশ! হাত-মুখ ধুতে হলে তো নিচে যেতে হবে। কিন্তু এখন আর এতটা পথ নামতে একদমই ইচ্ছে করছে না... যাব, নাকি থাক?"
কপাল কুঁচকে দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকতেই ইভান তার সামনে এসে শান্ত গলায় বলল,
— "একটু নিচু হন।"
শিফা বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল।
— "আপনি?"
ইভান নির্বিকার মুখে আবার বলল,
— "যেটা বলছি, সেটাই করুন।"
শিফা আর কোনো কথা বলল না। চুপচাপ মাথা সামান্য নিচু করতেই ইভান অত্যন্ত ও সাবধানী ভঙ্গিতে বোতল থেকে অল্প অল্প করে পানি ঢেলে তার মুখের কালির দাগগুলো ধুয়ে দিতে লাগল।তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল গভীর মমতা—যেন সামান্য অসাবধানতাও শিফার কোনো অস্বস্তির কারণ না হয়ে ওঠে।
মুখ পরিষ্কার করার পর ইভান আলতোভাবে শিফার হাত দুটোও ধুয়ে দিল। এরপর পকেট থেকে নিজের পরিষ্কার রুমাল বের করে পরম যত্নে তার ভেজা মুখ মুছে দিল।
ইভানের এমন অপ্রত্যাশিত যত্নে শিফা কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সংকোচে তার গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল আভায় রাঙিয়ে উঠল, আর চোখ দুটো লাজুক ভঙ্গিতে নিচু হয়ে এলো।
ঠিক তখনই দূর থেকে অবন্তিকার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— "এই, তোমরা দু'জন! তাড়াতাড়ি এসো, সব প্রস্তুত হয়ে গেছে!"
অবন্তিকার ডাকে দুজনেই সম্বিত ফিরে পেল। একে অপরের দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে সবার দিকে এগিয়ে গেল।
দু'জন পাশাপাশি হেঁটে সবার কাছে যেতেই রাহা বলল,
— "উফফ! মুখ ধুতে গিয়ে তোমাদের এত সময় লাগল কেন? নাকি মুখ ধোয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেমটাও একটু ধুয়ে-মুছে চকচকে করে এলে?"
কথা শেষ হতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
শিফা লাজুক রাগে চোখ রাঙিয়ে বলল,
— "রাহা! একদম বাজে কথা বলবি না।"
রাহা ভান করে ভয় পেয়ে অভ্রের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
— "অভ্র ভাই, বাঁচান! আপনার বোন আমাকে মেরে ফেলবে!"
অভ্র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "এতক্ষণ তো খুব সাহস দেখাচ্ছিলি! এখন আবার আমার পেছনে লুকাচ্ছিস কেন, গাধী?"
জারিফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "আমি কিন্তু সব নিজের চোখে দেখেছি। ইভান ভাই শুধু মুখ ধুইয়ে দেয়নি, একেবারে ভিআইপি সার্ভিস দিয়েছে!"
জায়ান হাসতে হাসতে যোগ করল,
— "আর একটু হলে গোলাপ ফুলও হাতে ধরিয়ে দিত!"
ইভান কপালে হাত ঠেকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "তোদের নিয়ে সত্যিই কিছু বলার নেই! থামো এবার।"
অবন্তিকা মুচকি হেসে বলল,
— "আচ্ছা, এবার ওদের পিছনে লাগা বন্ধ করুন সবাই। আগে খাওয়া শুরু করি। নইলে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।"
অবন্তিকা প্লেটগুলো সবার হাতে তুলে দিল। ছাদের এক কোণে গোল হয়ে বসে সবাই খাওয়া শুরু করতেই রাহার মাথায় খুনসুটিভরা একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
চোখ দুটো দুষ্টু উচ্ছ্বাসে ঝলমল করে উঠতেই সে গলা ঝেড়ে বলল,
— "শুনুন শুনুন! আজকের বারবিকিউয়ের একটা নিয়ম আছে।"
জারিফ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— "ভাবির নিয়ম মানে নিশ্চিত কারও সর্বনাশ!"
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— "একদম না। নিয়মটা খুবই সহজ। এখানে উপস্থিত প্রত্যেকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে নিজের হাতে এক টুকরো বারবিকিউ খাওয়াবে। কেউ না খাওয়ালে তার জরিমানা—দশটা চিকেন উইংস!"
জায়ান হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতিবাদ করল,
— "এটা কোনো নিয়ম হলো? এটা তো প্রকাশ্যে মানুষকে ফাঁদে ফেলা!"
সাফা হাসিমুখে বলল,
— "আমি কিন্তু নিয়মের পক্ষে। আগে দেখা যাক কে কাকে খাওয়ায়!"
রাহা চোখে দুষ্টু ঝিলিক নিয়ে বলল,
— "ঠিক আছে, শুরুটা আমি করি।”
বলেই প্লেট থেকে এক টুকরো বারবিকিউ তুলে অভ্রের সামনে ধরল। অভ্র এক মুহূর্তও দেরি না করে রাহার হাত থেকেই কামড় দিয়ে খেল।
এরপর অভ্র আরেক টুকরো বারবিকিউ তুলে রাহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "নিয়ম শুধু একপাশে মানলে হবে?"
রাহা সংকোচে চারপাশে একবার তাকাল।
— "সবাই দেখছে..."
— "দেখুক। আমার বউকে আমি খাওয়াচ্ছি, এতে সমস্যা কোথায়?"
অভ্রের নির্বিকার জবাব শুনে সবাই একসঙ্গে—
— "উউউউ...!"
বলে হইচই শুরু করে দিল।
রাহা লাজুক রাগে চোখ রাঙিয়ে ছোট্ট একটা কামড় দিতেই জারিফ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ! এত রোমান্স আর সহ্য হচ্ছে না। কেউ আমাকে একটা পানির বোতল দাও!"
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— "না, পানিতে হবে না। ওর জন্য সরাসরি অ্যাম্বুলেন্স ডাকো!"
সবাই আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
ইভান নিরবে খাওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই রাহা তার দিকে দুষ্টুমিভরা দৃষ্টিতে তাকাল।
— "ইভান ভাই... এবার কিন্তু আপনার পালা!"
ইভান মুখ তুলে শান্ত অথচ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
— "আমার পালা কেন?"
রাহা ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "কেন আবার? নিয়ম তো সবার জন্যই সমান। এখানে কেউ ছাড় পাবে না। এখন বলুন তো, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?"
প্রশ্নটি শুনে ইভান এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল। অজান্তেই তার দৃষ্টি শিফার মুখে গিয়ে থামল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড... তারপরই সে চোখ ফিরিয়ে নিল।তবে সেই ক্ষণিকের দৃষ্টিবিনিময়ও উপস্থিত কারও নজর এড়াল না।
বিষয়টি বুঝতে পেরে শিফা ইশারায় মাথা নাড়ালো
— "না... না... আমাকে এসবের মধ্যে টানবেন না।"
জারিফ সঙ্গে সঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ে বলল,
— "নাম বলার দরকার নেই ভাই! চোখই তো সব বলে দিয়েছে!"
জায়ানও সুযোগ হাতছাড়া করল না।
— "একদম ঠিক। আমরা তো একটু আগেই পুরো লাইভ টেলিকাস্ট দেখে ফেলেছি। মুখ ধোয়ানো, হাত ধোয়ানো, আবার রুমাল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেওয়া—একেবারে ভিআইপি সার্ভিস!"
অভ্র হালকা হেসে বলে উঠল,
— "তোরা কি ভুলে যাচ্ছিস, ওর বড় ভাই এখানে…”
ইভান কপালে হাত রেখে হতাশ ভঙ্গিতে বলল,
— "তোমাদের মুখে কি কোনোদিন ব্রেক লাগবে না?"
রাহা এবার প্লেট থেকে এক টুকরো বারবিকিউ তুলে ইভানের হাতে দিয়ে বলল,
— "নিন। এত লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। নিয়ম ভাঙলে কিন্তু জরিমানা দিতে হবে, আর সেই জরিমানা আমি আদায় করব!"
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
— "হ্যাঁ... হ্যাঁ... নিয়ম মানতেই হবে!"
সবার জোরাজুরিতে ইভান ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে শিফার সামনে দাঁড়াতেই শিফার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
চারপাশে একবার তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলল,
— "সবাই তাকিয়ে আছে..."
ইভান স্নিগ্ধ হাসি হেসে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
— "দেখুক। আমি তো শুধু নিয়মটাই পালন করছি।"
কথাটি বলেই সে আলতো করে বারবিকিউর টুকরোটি শিফার দিকে বাড়িয়ে দিল।
সে একবার ইভানের দিকে, তারপর আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবার দিকে তাকাল। সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারল না। সংকোচভরা ভঙ্গিতে ছোট্ট একটি কামড় দিতেই—
— "ওহহহহহ...!"
পুরো ছাদ একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠল।
জারিফ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরে বলল,
— "ইয়া আল্লাহ! এটা বারবিকিউ পার্টি না, একেবারে কাপল ফেস্টিভ্যাল!"
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
— "আমার মনে হচ্ছে, চিকেনের চেয়ে আজ রোমান্সটাই বেশি গ্রিল হচ্ছে!"
অবন্তিকা হাসিমুখে শিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এই যে ম্যাডাম, এতক্ষণ 'না না' করছিলেন, এখন কিন্তু দিব্যি খেয়ে ফেললেন!"
কথাটি শুনেই শিফা সংকোচে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। মুখ লুকিয়ে তড়িঘড়ি করে অন্যদিকে চলে গেল।
আর ইভান দাঁড়িয়ে শুধু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।
আর জারিফ খাওয়াতে গেলে অবন্তিকা হা করতে নিলেই সঙ্গে সঙ্গে জারিফ চিকেন টি সরিয়ে ফেলল। এতে অবন্তিকা ও দমে গেলো না।
শক্ত করে জারিফের হাত টেনে এনে ঠিকই খেয়ে নিলো। যখন এমন করছিল হয়তো খেয়ালই ছিলো না সবাই যে সেখানে উপস্থিত। বিষয়টা বুঝে আসতেই জিহ্বায় কামড় দিয়ে মনে মনে বলল,
"ছিঃ এটা কি করলাম"
জারিফের অবশ্য ভালই লেগেছে।
তবে সবার হাতে প্লেট থাকলেও রাহার হাতে কোনো প্লেট দেখা গেল না। কারণ, সে প্লেট নিতে গেলেই অভ্র একরকম জোর করেই নিতে দেয়নি। নিজের প্লেট থেকেই তাকে খাইয়ে দিচ্ছিল।
জায়ান হেসে হেসে বলল,
— "ভাই, আমার চিকেনটা হজম হবে তো? এত রোমান্স একসঙ্গে দেখা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর!"
রাহা লাজুক সংকোচে অভ্রের বাহুতে আলতো করে একটা চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল,
— "সব আপনার জন্য! এখন সবাই শুধু আমাকে নিয়েই মজা করছে।”
অভ্র ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে আরেক টুকরো বারবিকিউ তার মুখের সামনে ধরে বলল,
— "ওদের কাজ ওরা করুক। আমার কাজ হলো আমার বউ ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা সেটা দেখা।"
অভ্রের কথায় রাহার চোখেমুখে লাজুক তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল। খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই অবন্তিকা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
— "এবার শুরু হবে গানের কলি! সবাই প্রস্তুত?"
কথাটা শুনেই জারিফ আর জায়ান একসঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— "না ভাই! আমরা এই খেলায় নেই।"
ইভানও হেসে যোগ করল,
— "আমাদের দিয়ে গান হবে না। তোমরাই খেলো, আমরা দর্শক।"
ঠিক তখনই অভ্রের ফোনে একটি কল এলো। স্ক্রিনে নামটা দেখেই সে সবার কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে ফোন রিসিভ করল।
কয়েক মুহূর্ত কথা বলার পর অভ্র একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে গভীর স্বরে ডাকল,
— "জারিফ... জায়ান, তোরা একটু এদিকে আয়।"
দু'জন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত অভ্রের দিকে এগিয়ে গেল। অভ্রের মুখের গাম্ভীর্য দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে চায়।
এদিকে ছেলেরা সরে যেতেই রাহা, সাফা, অবন্তিকা, শিফা, সানা আর আয়াত গোল হয়ে বসল।
সাফা দু'হাত তালি দিয়ে আগ্রহভরে বলল,
— "যেহেতু ভাইয়ারা খেলবে না, তাহলে আমরাই শুরু করি!"
অবন্তিকাও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল,
— "হ্যাঁ, মেয়েরাই আজ মাঠ কাঁপাবে!"
রাহা চারপাশে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "ঠিক আছে। কিন্তু প্রথম কলিটা কে ধরবে?"
প্রশ্নটা করতেই সবাই একসঙ্গে আঙুল তুলে রাহার দিকে দেখিয়ে বলে উঠল,
— "তুই!"
রাহা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
— "আমি কেন?"
আয়াত হেসে উত্তর দিল,
— "এই খেলার আইডিয়াটাই তো তোর ছিল। তাই উদ্বোধনও তুই করবি!"
শিফা হালকা হেসে যোগ করল,
— "আর তুই না শুরু করলে আমরা কেউ শুরু করব না।"
রাহা অসহায় ভঙ্গিতে একবার সবার দিকে তাকাল, তারপর নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "আচ্ছা ঠিক আছে।"
রাহা একবার গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশে তাকাল। সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে দেখে চোখে দুষ্টু ঝিলিক খেলে গেল।
— "তাহলে শুরু করছি!”
কথাটা বলেই সে গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করল—
"আমার বাপ-মা তো বাড়িতে নাই,
রাত বারোটায় তোরে চাই..."
ওওওওওও
আমার বাপ-মা তো বাড়িতে নাই,
রাত বারোটায় তোরে চাই..."
সাফা খিলখিলিয়ে বলল,
— "শুরুটাই এমন! শেষ পর্যন্ত কী হবে আল্লাহই জানে!"
অবন্তিকা হাসতে হাসতে পেট চেপে বলল,
— "এই মেয়েকে দিয়ে ভদ্র গান শুরু হবে, এটা ভাবাটাই ভুল ছিল!"
ঠিক তখনই দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে থাকা অভ্র কথাগুলো কানে যেতেই ভ্রু কুঁচকে ফোনটা অফ করে দিল।
শিফা ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে বলল,
— "রাহা, তোর মুখে কোনো লাগাম নেই!"
রাহা কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার সুরে বলল,
— "খেলা শুরু করেছি, এখন আর ছাড় নেই। এবার যার পালা, সে ধর!"
সাফা হাসিমুখে বলল,
— "অবন্তিকা, তোর পালা!"
অবন্তিকা ভান করে গলা খাঁকারি দিল। তারপর একবার চারপাশে তাকিয়ে এমন ভাব করল, যেন খুবই সিরিয়াস একটা গান গাইতে যাচ্ছে।
সবাইও নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ করেই সে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল—
"বেলতুলি... সোলেমান লেংটা..."
দোহাই লেংটা,দোহাই লেংটা,
এক সেকেন্ড...দুই সেকেন্ড...
তারপরই সবাই একসঙ্গে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
রাহা পেট চেপে হাসতে হাসতে বলল,
— "থাম! আর একটা লাইন গাইলে পুলিশ এসে তোকে ধরে নিয়ে যাবে!"
অবন্তিকা নির্বিকার সুরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
— "গান চিনিস না, আবার সমালোচনা করিস!"
শিফা হাসতে হাসতে চোখের কোণের পানি মুছতে মুছতে বলল,
— "আমার হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যাচ্ছে!"
সানাও হাসিমুখে বলল,
— "এভাবে চললে আজ আর কেউ গান গাইতে পারবে না। শুধু হাসতেই রাত শেষ হয়ে যাবে!"
অবন্তিকা দম্ভভরা ভঙ্গিতে বলল,
— "এটাই তো আমার ট্যালেন্ট!"
সবাই এখনও অবন্তিকার গান নিয়ে হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে।
ঠিক তখনই সাফা হাত তুলে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
— "আচ্ছা আচ্ছা, এবার আমার পালা। কেউ হাসবি না কিন্তু!"
রাহা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "আগে গা, তারপর দেখা যাবে!"
সাফা গলা খাঁকারি দিয়ে নাটকীয় ঢঙে গাইতে শুরু করল—
"আমি দুঃখে মইরা যাই, আমি লজ্জায় মইরা যাই। আমার সাথে প্রেম করতে চায়, শেফালির জামাই..."
ইভান ভান করে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— "শেফালির জামাই যদি শুনে ফেলে, তাহলে কিন্তু আজ রাতেই হাজির হবে!"
রাহা খিলখিলিয়ে হেসে সাফার কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— "তুই একটা আস্ত পাগল!"
সাফা বুক ফুলিয়ে কলার উঁচু করে বলল,
— "গানের কলি মানেই একটু বিনোদন। শুধু সিরিয়াস গান হলে তো মজাই থাকে না!"
সাফার গান শেষ হতেই আবারও চারদিকে অট্টহাসির রোল পড়ে গেল। কেউ হাসতে হাসতে চোখের পানি মুছছে, আবার কেউ পেট চেপে বসে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ রাহার দৃষ্টি চলে গেল তাদের ঠিক পেছনের দিকে।আর পরের দৃশ্যটা দেখেই তার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে অভ্র, জারিফ আর জায়ান ছিল না, সেখানে কখন যে তিনজন চুপিসারে এসে ছাদের একপাশে রাখা কাঠের চৌকিতে পাশাপাশি বসে পড়েছে, তা কেউই টের পায়নি।তিনজনের মুখেই অদ্ভুত গাম্ভীর্য। কারও ঠোঁটে হাসির লেশমাত্র নেই। নীরবে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
রাহার বুকটা কেঁপে উঠল।
মাথায় প্রথমেই ভেসে উঠল— "শেষ! এতক্ষণ যা যা গান গাইলাম... সবই তাহলে শুনেছে!"
কথাটা মনে হতেই রাহা আতঙ্কভরা চোখে অভ্রের দিকে তাকাল।
পরের মুহূর্তেই—
— "ইয়া আল্লাহ...!"
বলে জোরে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল সে।
রাহার আকস্মিক আর্তচিৎকারে সাফা, অবন্তিকা, শিফা, সানা আর আয়াত সবাই চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল।
হঠাৎই দেখা গেল, কাঠের চৌকির ওপর অভ্র, জারিফ আর জায়ান পাশাপাশি শুয়ে পড়েছে। তিনজনেরই চোখ বন্ধ, শরীরে কোনো নড়াচড়া নেই। দেখে মনে হচ্ছে, যেন একসঙ্গেই অজ্ঞান হয়ে গেছে।
রাহার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— "অভ্র ভাই...!"
চিৎকার করে উঠে সে তড়িঘড়ি করে তাদের দিকে ছুটে গেল।
রাহার চিৎকার শুনে সাফা, অবন্তিকা, শিফা, সানা, আয়াত আর ইভানও আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এলো।
রাহা কাঁপা স্বরে বলে উঠল,
— "দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আয়! মনে হচ্ছে ওরা অজ্ঞান হয়ে গেছে!"
সাফা আর অবন্তিকা বিন্দুমাত্র দেরি না করে পানির বোতল আনতে দৌড় দিল।
ঠিক তখনই...
অভ্র ধীরে ধীরে একটা চোখ খুলে চারপাশে তাকাল। তারপর উঠে বসে বিরক্ত সুরে বলল,
— "এই যে, পানি লাগবে না। আগে তোদের গানগুলো বন্ধ কর।"
জারিফও উঠে বসে বুক চাপড়ে অভিনয়পূর্ণ ভঙ্গিতে বলল,
— "আমরা অজ্ঞান হইনি। আর পাঁচ মিনিট ওইসব গান শুনলে সত্যিই আমাদের জান বের হয়ে যেত!"
জায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "এগুলো গান ছিল, নাকি সরাসরি মানসিক নির্যাতন? কান দুটো এখনো ঝাঁঝরা হয়ে গেছে!"
অভ্র মাথা নেড়ে মন্তব্য করল,
— "প্রথমে ভেবেছিলাম গানের কলি খেলছিস। পরে বুঝলাম আমাদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নিচ্ছস!"
কথাটা শুনে সবাই কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল।
তারপর—
— "এইইই...!"
রাহা অভিমানে অভ্রের বাহুতে কিল মেরে বলল,
— "আপনাকে নিয়ে আমি ভয়ে শেষ! আর আপনি এসব নাটক করছেন?"
অভ্র হাসতে হাসতে নিজের মাথা বাঁচাতে লাগল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই অভ্র কপাল কুঁচকে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এই গাধী! এগুলো কী গান গাস তোরা? গান শুনে মানুষ রিল্যাক্স হয়, আর তোদের গান শুনে মনে হচ্ছিল আত্মা শরীর ছেড়ে পালানোর রাস্তা খুঁজছে!"
রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— "এত খারাপ গাইলাম?"
অভ্র গম্ভীর স্বরেই বলল,
— "খারাপ? উহু, কখনোই না! এতটাই অসাধারণ গেয়েছিস যে আর দুই মিনিট শুনলে সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। তাই ভাবলাম, আগে থেকেই শুয়ে পড়ি!"
কথাটা শুনেই সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
এবার জারিফ উঠে বসে অবন্তিকার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
— "শোন, সত্যি করে বল তো... এসব কবে থেকে গাওয়া শুরু করেছ, বিচ্ছু? আগে জানলে কানের জন্য তুলা নিয়ে আসতাম!"
অবন্তিকা চোখ পাকিয়ে বলল,
— "একদম বেশি কথা বলবেন না!"
জারিফ অভিনয়পূর্ণ ভঙ্গিতে বুক চেপে বলল,
— "আমি বেশি কথা বলছি না। আর একটু হলেই আইসিইউতে ভর্তি হতে হতো!"
এদিকে জায়ান একটাও কথা বলল না। শুধু নিবিড় দৃষ্টিতে সাফার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সেই চাহনিতে যেন স্পষ্ট লেখা—
"আমি থাকতে 'শেফালির জামাই' কেন? আমার নামটা কি একবারও মনে পড়ল না?"
জায়ানের সেই অভিমানভরা দৃষ্টি দেখে সাফা সংকোচে চোখ নামিয়ে ফেলল।
সবাই যখন শিফাকে গান ধরার জন্য একসঙ্গে জোরাজুরি করছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে প্রচণ্ড মেঘের গর্জন শোনা গেল।
শব্দটি এতটাই তীব্র ছিল যে মুহূর্তের মধ্যেই সবার হাসি-ঠাট্টা থেমে গেল।
অবন্তিকা আকাশের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— "মনে হচ্ছে, এবার আর রক্ষা নেই। প্রবল বৃষ্টি নামবে!"
কথাটি শেষ হতেই ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা পুরো ছাদজুড়ে বয়ে গেল। পরক্ষণেই টুপ... টুপ... করে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
— "আরে! দ্রুত... সব সরাও!"— জারিফ উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল।
বিন্দুমাত্র দেরি না করে সবাই যার যার মতো কাজে লেগে গেল। কেউ চেয়ার গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ বারবিকিউর চুলা, কেউ খাবারের ট্রে, আবার কেউ সাউন্ড বক্স ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
অভ্র, ইভান, জারিফ আর জায়ান ভারী জিনিসগুলো তুলে নিল। আর রাহা, শিফা, সাফা, অবন্তিকা, সানা ও আয়াত ছোটখাটো জিনিসপত্র একত্র করতে লাগল।
কিন্তু সেই ফোঁটাগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুষলধারে বর্ষণে রূপ নিল।
ছাদের একপাশে থাকা ছোট্ট চিলেকোঠার ঘরটিতে সবাই মিলে একে একে সবকিছু তুলে রাখল।
ততক্ষণে বৃষ্টির প্রবলতা আরও বেড়ে গেছে। ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে সবাইকে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল। কারও চুল বেয়ে পানি ঝরছে, কারও পোশাক ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে।
সবকিছু নিরাপদে সরিয়ে রাখার পর অবন্তিকা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— "চলো... আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানো যাবে না। আমরা পুরো ভিজে যাচ্ছি!"
সবাই দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে নিচে নামতে লাগল।কিন্তু রাহা সবার শেষে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অভ্যাসবশত সে আরেকবার পুরো ছাদে নজর বুলিয়ে নিল। কোথাও কিছু পড়ে রইল কি না, সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না—সেটাই নিশ্চিত হচ্ছিল।
ঠিক তখনই...
তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অভ্রের ওপর।
অভ্র তখনও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির পানি টুপটাপ ঝরে পড়ছে তার চুল বেয়ে। কিন্তু রাহার চোখ আটকে গেল অন্য জায়গায়।
অভ্রের চোখ।
সেই চোখ দুটোতে স্বাভাবিক দীপ্তির কোনো ছাপ ছিল না। তার বদলে সেখানে ছড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত ঘোলাটে আভা—যেন প্রিয় মানুষটিকে সামনে পেয়ে বুকের গভীরে বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য অব্যক্ত অনুভূতি আর সংযত আকাঙ্ক্ষা নীরবে চোখে ভেসে উঠেছে।
সেই দৃষ্টির গভীরতা দেখেই রাহার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অভ্রের এমন চোখ সে আগে কখনো দেখেনি। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। অজানা এক অনুভূতি ধীরে ধীরে তার মন জুড়ে বিস্তার লাভ করল।
রাহাকে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভ্র ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। শুধু আলতো করে রাহার হাতটা নিজের উষ্ণ মুঠোর মধ্যে আবদ্ধ করে তাকে নিয়ে ছাদের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
ততক্ষণে আকাশভাঙা বর্ষণ নেমেছে। ঝমঝম বৃষ্টির ধারায় কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দু'জন সম্পূর্ণ ভিজে একাকার হয়ে গেল।
চারদিকে শুধু ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ, দমকা হাওয়ার শোঁ-শোঁ আওয়াজ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেল। স্পষ্ট রয়ে গেল শুধু দু'জন মানুষ—অভ্র আর রাহা।
হঠাৎই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই অভ্র এক টানে রাহাকে নিজের বুকে টেনে নিল।
পরবর্তী মুহূর্তেই দু'হাতে তাকে আলতো করে কোলে তুলে নিল।
রাহা বিস্ময়ে অভ্রের গলায় দু'হাত জড়িয়ে ধরতেই অভ্র ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "আজ কোনো কথা নয়... শুধু এই মুহূর্তটা অনুভব কর।"
কথাটি বলেই অভ্র রাহাকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল।রাহাও আর নিজেকে আটকে রাখল না। ধীরে ধীরে অভ্রের গলা ছেড়ে দু'হাত দুইদিকে প্রসারিত করল। চোখ দুটো বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দিল। শীতল বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার মুখ, চোখ, ঠোঁট আর চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে।
সে নিজেকে অভ্রের বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল।ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নির্মল, পরিতৃপ্ত হাসি।অভ্রের বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পণ করে সে যেন সেই মুহূর্তটিকে নিজের সমগ্র সত্তা দিয়ে অনুভব করতে লাগল।
প্রতিটি ঘূর্ণনের সঙ্গে রাহার ভেজা চুল বাতাসে উড়ে এসে বারবার অভ্রের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন তাদের দু'জনকে ঘিরে রূপালি আবরণ বুনছিল।
মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।বেঁচে আছে শুধু ঝরতে থাকা বৃষ্টি, ভালোবাসা আর একই তালে স্পন্দিত দুটি হৃদয়।
রাহা চোখ বন্ধ রেখেই ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
— "ইশ... সময়টা যদি এখানেই থেমে যেত!"
অভ্র স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বলল,
— "সময়কে থামানো সম্ভব নয়, জান। তবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোর প্রতিটি মুহূর্তকে এমনই অমলিন করে রাখার জন্য আমি লড়ে যাব।”
—————
প্রবল বর্ষণ, ঝোড়ো বাতাস আর নিস্তব্ধ রাতকে সাক্ষী রেখে দু'জন যেন নিজেদের ছোট্ট এক জগতে হারিয়ে যায়; যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতির ভাষাই অনেক বেশি গভীর।
ঠিক তখনই অভ্রের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো রাহার ওপর।
মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজে রাহার সাদা চুড়িদার শরীরের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গেছে। ভেজা পোশাকের কারণে তার অবয়ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ধনুকের মতো শরীরের সকল ভাঁজ একদম স্বচ্ছ কাঁচের মতো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
তখনই অভ্র রাহাকে নামিয়ে দিল...
সেই দৃশ্য দেখে অভ্রের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ল। নিজেকে যেন এক অজানা মাদকতাময় ঘোরে আচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল তার। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় মানুষটিকে দেখে বুকের গভীরে বহুদিন ধরে সংযত হয়ে থাকা আবেগ আর আকাঙ্ক্ষাগুলো যেন ধীরে ধীরে সমস্ত সংযম ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিল।
আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সে আবারও রাহাকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে ছাদের একপাশে সেই থাকা ছোট্ট চিলেকোঠার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
রাহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন ক্রমেই দ্রুত হতে লাগল। বৃষ্টির শীতল স্পর্শে পুরো শরীর কাঁপছিল। রাহার কাঁপতে থাকা শরীর আর ভীত-সন্ত্রস্ত চোখের দিকে তাকাতেই অভ্রের বুকের ভেতরে তোলপাড় করা আবেগ যেন মুহূর্তের জন্য সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে দিতে উদ্যত হলো।
ঘরের ভেতরে ঢুকেই অভ্র অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রাহাকে কাঠের চৌকির ওপর নামিয়ে দিল।
তারপর গভীর, নিবিড় দৃষ্টিতে রাহার দিকে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বলে উঠল—
— "আজ আর আমি কোনো বারণ শুনব না, জান।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………