আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৫৮ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
— “ভাই, এটা পাবলিক প্লেস!”

এমন সময় বাধা পেয়ে অভ্রের মেজাজ যেন মুহূর্তেই তেতে উঠল। চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ করলো, কয়েক সেকেন্ড নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পরক্ষণেই এতক্ষণকার সংযমের বাঁধ ভেঙে গিয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভে গর্জে উঠল,

— “তোর পাবলিক প্লেসের ক্ষেতায় আগুন, শালা! আমার বোনকেও এত সহজে দেব না। যা—এখান থেকে!আমার রোমান্সের গুষ্টির ষষ্ঠী করে দিয়েছে”।

ইভান তো ভালোর জন্যই কথাটা বলেছিল। কিন্তু তার সামান্য একটা কথায় যে অভ্র এভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।

ইভান হতভম্ব হয়ে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলবে এখন—কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না। শেষমেশ অসহায়ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে সেখান থেকে সরে গেল।

এদিকে অভ্র রাহাকে উঠিয়ে বলল,

— “চল, ড্রেস চেঞ্জ করবি।”

রাহা অবাক হয়ে বলে উঠল,

— “মাত্রই তো পরলাম, অভ্র ভাই! আপুকে হলুদ দিয়ে এসেই খুলে ফেলব।”

— “ঠিক আছে, আমি আবিরকে ডাকি। তুই ওর সঙ্গে যা।”

রাহা কপাল কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,

— “ছিঃ! কী সব বলছেন!”

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

— “তো আর কী বলব? আমার জন্য শাড়ি পরেছিস, আমি দেখেছি। শেষ কথা।”

রাহা অসহায় গলায় মিনতি করল,

— “প্লিজ, অভ্র ভাই। কতক্ষণ আর লাগবে?”

কথাটা বলেই দাঁড়িয়ে থাকা অভ্রের পায়ের ওপর নিজের পা রেখে সামান্য উঁচু হয়ে তার গালে আলতো করে একটি চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “প্লিজ, অভ্র ভাই...”

রাহার এমন আবদারে অভ্রের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সেই সুযোগে তাকে আরেকটু কাছে টেনে নিয়ে বলল,

— “ঠিক আছে, কিন্তু!”

রাহা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,

— “কিন্তু?”

অভ্রের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট দুষ্টুমির সুর,

— “তোর শাড়ি আমি খুলে দেব।”

রাহা লজ্জায় একেবারে চুপ করে গেল। কোনো জবাব না দিয়ে শুধু চোখ নামিয়ে রাখল।
অভ্রও আর কিছু না বলে রাহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।

আয়াতের দৃষ্টি গিয়ে থামল দুজনের ওপর। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সে ইশারায় তাদের পাশে এসে বসতে বলল।প্রথমে রাহা আয়াতকে হলুদ লাগিয়ে দিল। এরপর অভ্র এগিয়ে এলো।আয়াতের গালে হলুদ মাখাতে মাখাতে অভ্র শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

— “আমার বিশ্বাস, তুমি সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। একদিন তুমি সুখী হবে—এই দোয়াই রইল। আর তোমার এই ত্যাগ... আমি কোনোদিন ভুলব না, আয়াত।”

এদিকে হলুদের অনুষ্ঠানও শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এলাকার কিছু মানুষ এখনো আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠে হলুদ মাখাচ্ছে। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, কোলাহল আর উৎসবের আমেজ। আর একপাশে মহিলারা দল বেঁধে জারি গান পরিবেশন করছে।

মাইনুদ্দিন মির্জা আর ইভান আয়োজনের কোনো কমতি রাখেনি। অতিথিদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের প্রতিটি খুঁটিনাটি—সবকিছুতেই ছিল যত্ন, আন্তরিকতা এবং পরিপূর্ণতার ছাপ।
যদিও মেয়ের ওপর অভিমান আর রাগ এখনো মাইনুদ্দিন মির্জার মনে জমাট বেঁধে আছে, তবুও সে তার একমাত্র মেয়ে। কুমিল্লার মানুষ তারা শুধু ইতিহাস-ঐতিহ্যের শহর নয়, এখানকার মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তাও এই মাটির এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। অতিথি এলে তাকে আপন করে নেওয়া, আপ্যায়ন করা আর যত্ন-আদরে ভরিয়ে দেওয়া—এসব এখানকার মানুষের সহজাত সংস্কৃতিরই অংশ।

যে শহর একদিকে ময়নামতি-শালবন বিহারের প্রাচীন ইতিহাস বুকে ধারণ করে, অন্যদিকে রসমালাইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী স্বাদের মাধ্যমে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পরিচিতি পেয়েছে—সেই কুমিল্লার কোনো পারিবারিক আয়োজনে আন্তরিকতার ছাপ থাকা স্বাভাবিক।
আর আজকের এই আয়োজনেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। যেখানে যা ছিল সব আনা হয়েছে হলুদে।

বাবার রাগ যতই প্রবল হোক না কেন, মেয়ের বিশেষ দিনের আয়োজনে ভালোবাসার স্থানটি তার চেয়েও বহুগুণ বড়।

—————

এদিকে অভ্র আর রাহার হলুদ দেয় শেষ হলে বাড়ির দিকে এগোতেই রাহার চোখে পড়ল—অভ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে। মেয়েটা অভ্রের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকাই নাক কাছে নিয়ে তার গায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে উঠে,

— “উফ! ক্যায়া চিজ হ্যায়!”

মুহূর্তেই রাহার মুখটা ফুলে উঠল। বিন্দুমাত্র দেরি না করে সে অভ্রকে নিজের পাশ থেকে সরিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— “ইয়ে মেরা চিজ হ্যায়!”

তারপর চোখ রাঙিয়ে বলল,

— “ওদিকে তাকা, নির্লজ্জ মেয়ে! আর একবার এভাবে তাকালে একদম চোখ তুলে ফেলব!”

কথাগুলো এমন হুঙ্কার দিয়ে বলল যে আশপাশের কয়েকজনও চমকে তাকাল।

অভ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। তার পুতুলটা যে প্রয়োজনে বেশ ভালোই কথা বলতে পারে, সেটা আজ আবারও প্রমাণ হয়ে গেল।

অন্যদিকে সেই বেহায়া মেয়েটার দৃষ্টি তখনও অভ্রের মুখেই আটকে আছে। রাহার ধমকেও যেন তার বিশেষ কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই; বরং অভ্রের হাসিটাই তার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

অভ্রের সেই হাসি চোখে পড়তেই রাহার রাগ যেন আচমকাই থমকে গেল। অভিমানে ভরা চোখে অভ্রের দিকে একবার তাকিয়ে সে আর কিছু না বলে সামনের দিকে হাঁটা ধরল।

অভ্রও পিছু পিছু এগিয়ে এলো। রাহার মুখের অবস্থা দেখে মাথায় হাত দিয়ে কপাল চুলকে অসহায় গলায় বলে উঠল,

— “তুই না যা বলার বললি! তাহলে এখনও রেগে আছিস কেন, জান?”

রাহা মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর স্বরে জবাব দিল,

— “আপনি হাসছিলেন কেন?”

অভ্র ভ্রু তুলে বলল,

— “হাসতেও পারব না?”

— “না।”

— “কেন?”

রাহা এবার অভিমান মেশানো গলায় বলল,

— “আমার সামনে ছাড়া কারও সামনে হাসবেন না।”

অভ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

রাহা ঠোঁট ফুলিয়ে যোগ করল,

— “মেয়েরা তাকিয়ে থাকে।”

অভ্রের ঠোঁটের কোণে আবারও মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

— “ওহ্... এই ব্যাপার!”

এদিকে রাহা আর কোনো জবাব না দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অভিমানে মুখটা এখনো গম্ভীর। নিজের হাতের চুড়িগুলো একে একে খুলতে খুলতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই বিড়বিড় করে কথা বলতে লাগল।

অভ্র আরেকটু এগিয়ে এসে একটানে রাহাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। আচমকাই তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দিল।আকস্মিক এমন কাণ্ডে রাহার পুরো শরীর শিউরে উঠল। হাতে থাকা অবশিষ্ট চুড়িগুলোও অসতর্কতায় মেঝেতে পড়ে গেল। মুহূর্তেই ঝনঝন শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো ঘর।

ঠিক তখনই হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল।

নিমেষেই চারপাশ ডুবে গেল ঘন অন্ধকারে। জানালা দিয়ে আসা রাতের কোমল চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ঘরটাকে রূপালি আভায় ভরিয়ে তুলল।
অভ্র যেন সেই মুহূর্তে চারপাশের সবকিছু ভুলে গেল। রাহার ঘাড়ের কাছে মুখ রেখে গভীরভাবে তার পরিচিত ঘ্রাণ টেনে নিল। মনে হলো, এই পরিচিত সুবাসটুকু ছাড়া যেন তার নিঃশ্বাসই অসম্পূর্ণ।রাহার ঘাড়ের কাছে মুখ রেখে, আলতো করে নাক ঘষতে ঘষতে মুগ্ধ, মাতাল কণ্ঠে বলে উঠল,

— “তোর শরীরের এই ঘ্রাণের সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো কিছুর তুলনা হয় না। এই মাতাল করা সুবাস নেওয়ার নেশা... আমার কোনোদিন শেষ হবে না,জান”

তার কণ্ঠের সেই নিচু সুর আর চাঁদের নরম আলোয় মুহূর্তটা যেন আরও গভীর, আরও আবেশময় হয়ে উঠল।কথাগুলো বলেই অভ্র ধীরে ধীরে গুনগুন করে বলে উঠল,

রাতের ই আধারে অজানা ছোয়া
মায়াবী চোখে কি মায়া
যেন গোধুলী আবেশ মাখা
কি নেশা ছড়ালে
কি মায়ায় জড়ালে
কি নেশা ছড়ালে
কি মায়ায় জড়ালে__

—————

বরযাত্রীর সাজে এসে হাজির হয়েছে মাহাদী। সঙ্গে জারিফ, জায়ান আর মাহাদীর আরও কয়েকজন আত্মীয়স্বজন। রাহার অনুরোধেই অবন্তিকা আর সাফাকেও সঙ্গে করে আনা হয়েছে।আজকের এই আয়োজনে অভ্র দাঁড়িয়েছে মেয়েপক্ষের হয়ে। গেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে সে বরযাত্রীর পথ আটকে দিয়েছে।

সামনে মাহাদী। আর ঠিক তার বিপরীতে অভ্র।
দুজনের চোখাচোখিতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে গেটের সামনে জমে উঠল টানটান উত্তেজনা।
মেয়েপক্ষের হয়ে অভ্র একটুও নরম না হয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

— “গেট খুলতে হলে এক লাখ টাকা দিতে হবে।”

মাহাদী ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— “এক লাখ?”

অভ্র নির্বিকার।

— “হ্যাঁ। কমানোর কোনো সুযোগ নেই।”

পাশ থেকে জারিফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

— “টাকা কি গাছে ফল নাকি, বস? চাইলেই পেড়ে হাতে দিয়ে দেব? এক লাখ টাকা মুখের কথা না!”

অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দিল,

— “তাহলে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দর-কষাকষি করছিস কেন? টাকা দিতে না পারলে বরযাত্রী নিয়ে ফিরে যা।”

জায়ান হেসে ফেলল।

— “ভাই, বিয়ে করতে এসেছি, মনে হচ্ছে টেন্ডার জমা দিতে এসেছি!”

অবন্তিকা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সাফার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “শোন, আমার মনে হয় এক লাখ টাকা দেওয়ার চেয়ে অভ্র ভাইকে একবার ‘জামাইবাবু’ বলে ডাকলেই গেট খুলে দিতে পারে!”

সাফা চোখ বড় বড় করে তাকাতেই অবন্তিকা আরও হাসি মুখে যোগ করল,

— “না হলে একটা কাজ কর—মাহাদী ভাইকে গেটের ভেতর ঢুকিয়ে দাও। তারপর বরযাত্রী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকুক। বর তো মূল সম্পদ, বাকিরা তো শুধু আজাইরা,!”
বলেই জারিফের দিকের তাকালো।

জারিফ কথাটা শুনে হো হো করে হেসে উঠল।

অভ্র চোখ কুঁচকে অবন্তিকার দিকে তাকাল।

— “তুই চুপ করবি?”

অবন্তিকা সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।

— “আচ্ছা, চুপ! 

অভ্রও ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে মাহাদীর দিকে তাকাল।

— “যাই হোক, । আগে টাকা বের কর।”

মাহাদী অভ্রের কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় বলে উঠল,

— “এই বিয়ে না হলে আমি বাঁচি। চলে যাই তাহলে?”

অভ্র মুচকি হেসে জবাব দিল,

— “তোর বাঁচা-বাঁচির দিন শেষ, মাহাদী।”

কথাটা শুনে মাহাদী বিরক্ত মুখে অভ্রের দিকে তাকাল। তারপর আচমকাই জোরে বলে উঠল,

— “আয়াতের জামাই তো অনেক কিপ্টা! আমি তো শুনেছিলাম অনেক বড়লোক!”

কথাটা শুনে আশপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।মাহাদীও আর কথা না বাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর পকেট থেকে চেকবুক বের করে একটা চেক ছিঁড়ে অভ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল।

— “এই নে। সংখ্যাটা বসিয়ে নিস।”

অভ্র চেকটার দিকে একবার তাকিয়েই হাত সরিয়ে নিল।

— “চেক চলবে না।”

মাহাদী অবাক হয়ে বলল,

— “কেন?”

অভ্র গম্ভীর মুখে জবাব দিল,

— “ক্যাশ দিতে হবে।”

মাহাদী হতাশ হয়ে নিজের পকেট হাতড়ে দেখল। তারপর অসহায় মুখে বলল,

— “ক্যাশ আছে পঞ্চাশ হাজার।”

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— “তাহলে পঞ্চাশ হাজারই দে।”

জারিফ অবাক হয়ে তাকাল।

— “এই না একটু আগে বললেন এক লাখের নিচে কোনো সুযোগ নেই?”

অভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

— “দরদাম করতে করতে বাজারদর কমে গেছে।”

জায়ান আবারও হেসে উঠল।

মাহাদী বাধ্য হয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা বের করে অভ্রের হাতে ধরিয়ে দিল।

অভ্র টাকা গুনে সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

— “ঠিক আছে। গেট খোলা যাবে।”

অভ্র সরে দাঁড়িয়ে গেটের পথ ছেড়ে দিল।

— “যা, জামাই। তোর ভাগ্য ভালো, আজকে মেয়েপক্ষের আমি আছি।”

মাহাদী চোখ পাকিয়ে বলল,

— “সর এখান থেকে!”

—————

নিজের ঘরের জানালা দিয়ে এতক্ষণ ধরে বাইরে ঘটে যাওয়া প্রতিটি দৃশ্য নিঃশব্দে অবলোকন করছিল আয়াত।

ঠোঁটের কোণে একটুখানি তাচ্ছিল্যভরা হাসি টেনে ধীরে ধীরে গিয়ে বসল নিজের বিছানায়। আজই তাকে তার বাবা-মা, ভাই—সবাইকে, নিজের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। যে বাড়িটাকে এতদিন নিজের বলে জেনেছে, সেই নিজের বাড়িতেই এবার নিজেকে একজন আগন্তুকের মতো মনে হবে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই শিউরে উঠল তার শরীর। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রুর নোনতা আবরণ।

আর তার জামাইও কিনা এই বিয়েটাকেই মানতে নারাজ!এতটা কষ্ট একটা মেয়ে আর কতটা বুকের ভেতর চেপে রাখতে পারে?

তবুও ভেঙে পড়লে চলবে না। এই লড়াই তাকে লড়তেই হবে। নিজের অধিকারটুকু ছিনিয়ে নিতে হলে যত কঠিন পথই পাড়ি দিতে হোক, সে পিছপা হবে না।মেয়েদের জীবনে বিয়ে তো বারবার আসে না। প্রথমবারের মতো তো আর হয় না!

মনে মনে কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে নিজেকেই যেন শক্ত করে তুলল আয়াত। মহাদীর মন সে জয় করেই ছাড়বে—যেভাবেই হোক। 
নিজেকে এভাবেই মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিল সে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল রাহা, অবন্তিকা, সাফা আর শিফা।
তাদের দেখামাত্রই আয়াতের মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।

রাহা এগিয়ে এসে আনন্দভরা কণ্ঠে বলল,

— “আপু, আমি কিন্তু ভীষণ খুশি! তুমি এখন থেকে ঢাকাতেই থাকবে।”

রাহার কথায় সঙ্গে থাকা অবন্তিকা, সাফা আর শিফাও মাথা নাড়ল।

— “চলো, তোমাকে নিয়ে যেতে হবে।”

কথাটা কানে যেতেই আয়াত নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।একেকটি পদক্ষেপ যেন তার বুকের ভেতর থেকে একেক মুঠো করে স্মৃতি, মায়া আর আপনজনের টান নিংড়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই বাড়ির প্রতিটি কোণেই যে তার শৈশব, হাসি-কান্না, অজস্র স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। আজ সেসবই পেছনে ফেলে তাকে চলে যেতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একসময় থেমে গেল আয়াত।

দৃষ্টি আটকে গেল পিলারের পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা তার মায়ের দিকে।আফরোজা বেগমের মুখজুড়ে অভিমানের কঠিন ছাপ স্পষ্ট। অথচ সেই অভিমানের আড়ালেও মায়ের চোখ দুটো যেন নিঃশব্দে বলে দিচ্ছে অন্য এক গল্প—সেখানে জমে আছে অগাধ মায়া, চাপা কান্না আর মেয়েকে হারিয়ে ফেলার অসহ্য যন্ত্রণা।

এক মুহূর্তের জন্য আয়াতের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।কিন্তু পরক্ষণেই নিজের আবেগকে নির্মমভাবে দমন করে চোখ সরিয়ে নিল সে। কাঁপা আঙুলে নিজের ঘোমটাটা আরও বড় করে টেনে মুখ আড়াল করে নিল। যেন মায়ের চোখের দিকে আর একবার তাকালেই এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর শক্ত করে বাঁধা সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে যাবে।

তারপর ধীর পায়ে আবারও এগিয়ে যেতে থাকল।

এদিকে মেয়ের চলে যাওয়ার দৃশ্যটা চোখের সামনে সহ্য করতে না পেরে আফরোজা বেগম আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না যেন মুহূর্তেই বাঁধভাঙা স্রোতের মতো বেরিয়ে এলো। ছুটে নিজের ঘরে ঢুকেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।

যতই অভিমান থাকুক, যতই রাগ জমে থাকুক—মায়ের মন কি আর সন্তানের বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারে?

আজকের পর থেকে এই মেয়েটাই তো আর প্রতিদিন তার চোখের সামনে থাকবে না। ইচ্ছে করলেই ছুটে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন না। ঘরজুড়ে থাকবে আয়াতের অনুপস্থিতি, অথচ প্রতিটি কোণ তাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে—তার মেয়েটা আর এই বাড়িতে নেই।

—————

স্টেজে গিয়ে দুজনকে মুখোমুখি বসানো হলো। তাদের মাঝখানে বড় করে ফুলের মালা ও তাজা ফুলের ঝালর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সুন্দর এক আড়াল।কাজী সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। চারপাশের কোলাহল মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে এলো। উপস্থিত সবাই গভীর মনোযোগে কাজী সাহেবের প্রতিটি কথা শুনতে লাগলেন।

অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
কাজী সাহেবের প্রশ্নের জবাবে আয়াত স্পষ্ট কণ্ঠে কবুল বলল। এরপর মাহাদীও সম্মতি জানাল। প্রয়োজনীয় সবকিছু সম্পন্ন করে দুজনই সবার সামনে এই বিয়েতে নিজেদের সম্মতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল।

এই আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেই হঠাৎ উঠল নতুন এক আবদার।এবার নাকি মাহাদীকে সবার সামনে আয়াতের কপালে চুমু দিতে হবে!
যদিও বড়রা এতক্ষণে সরে গিয়েছে।

কথাটা শুনতেই মাহাদীর মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হয়ে গেল। দৃষ্টিতে স্পষ্ট ফুটে উঠল বিরক্তি আর অনীহা। চারপাশের উৎসাহ, ঠাট্টা কিংবা জোরাজুরি—কোনোটাই তার সিদ্ধান্ত টলাতে পারল না।মাথা নেড়ে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিল মাহাদী,

— “না। আমি এটি করতে পারব না।”

তার কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। বিয়েতে সম্মতি জানালেও সবার সামনে আয়াতের কপালে চুমু দেওয়ার বিষয়টি সে একেবারেই গ্রহণ করল না।

মাহাদীর এমন অনড় অস্বীকৃতি শুনে জারিফ আর চুপ করে থাকতে পারল না। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে বলে উঠল,

— “যান, যান! করুন! এমন সুযোগ কি আর বারবার আসে? সুযোগ পেয়েছেন, কাজে লাগান!”

একটু থেমে অবন্তিকার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলে উঠল,

— “আর আমরা তো সেটাও পাই না! কপালটাই পোড়া!”

অবন্তিকা কথাটা স্পষ্ট শুনেও না শোনার ভান করে নির্বিকার মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। জারিফের সঙ্গে কথা বাড়ালেই যে মুহূর্তের মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক বেঁধে যাবে, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। তাই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করল।

অন্যদিকে রাহা আর অভ্রও বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছিল। ইচ্ছে করলেই তারা এগিয়ে যেতে পারত, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই দূরত্ব বজায় রাখল। তারা চায়নি তাদের উপস্থিতি বা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপে মাহাদী কিংবা আয়াত অপ্রস্তুত বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ুক।তাই দূর থেকেই দুজনের প্রতিটি মুহূর্তের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে রইল তারা।

অবশেষে এসে পড়ল সেই প্রতীক্ষিত অথচ নির্মম বিদায়ের পালা।

একে একে সবাই আয়াতকে বিদায় জানাতে এগিয়ে এলো। কেউ শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরল, কেউ মাথায় হাত রেখে দোয়া করল, আবার কেউ নতুন জীবনে কীভাবে চলবে, কীভাবে সংসার সামলাবে, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এসব নিয়ে একের পর এক মূল্যবান পরামর্শ দিতে লাগল।প্রত্যেকটি কথাই যেন আয়াতের বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগকে আরও ভারী করে তুলছিল।

সবশেষে এগিয়ে এলেন আয়াতের মা, আফরোজা বেগম।মেয়েকে সামনে দেখেই এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে রাখা আবেগের বাঁধ আর টিকল না। মা-মেয়ে একে অপরকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতেই দুজনের বুকফাটা কান্না বেরিয়ে এলো।কেউ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।
মেয়ের কান্না মায়ের কান্নাকে আরও তীব্র করে তুলল, আর মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখ দেখে আয়াতও ভেঙে পড়ল আরও বেশি। তাদের সেই হৃদয়বিদারক কান্নায় মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল চারপাশের পরিবেশ। উপস্থিত অনেকের চোখও অজান্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।

এমন সময় মাইনুদ্দিন মির্জা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন।

তিনি মাহাদীর হাতটি দৃঢ়ভাবে ধরে নিজের দিকে টেনে নিলেন। এরপর আয়াতের হাতটি এগিয়ে এনে আলতো করে মাহাদীর হাতের ওপর রেখে গম্ভীর অথচ আবেগমথিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— “যেহেতু তোমরা একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছ, বিয়েটাও সম্পন্ন হয়েছে। এখন তোমরা দুজনই এক হালাল বন্ধনে আবদ্ধ। এই সম্পর্কের মর্যাদা সবসময় রক্ষা করবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকবে, বাবা। একে অপরকে কখনো একা ছেড়ে দিও না।”

মাইনুদ্দিন মির্জার কথাগুলো যেন সবার অন্তরে আঁচড় কাটল।

আয়াতের হাতটি যখন মাহাদীর হাতের ওপর এসে স্থির হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদীর দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও নেমে গেল দুটি হাতের দিকে।

মাত্র এক মুহূর্ত।
কিন্তু সেই ক্ষণিকের স্পর্শেই যেন তার ভেতরের কোথাও অদৃশ্য এক কম্পন জেগে উঠল। অচেনা কোনো অনুভূতি নিঃশব্দে এসে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ল। মাহাদী নিজেও বুঝতে পারল না—কেন হঠাৎ বুকের ভেতরটা এমন অস্বস্তিকরভাবে নড়েচড়ে উঠল।

পরক্ষণেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
অবশেষে সবাই মিলে তাদের গাড়িতে তুলে দিল।
গাড়ির দরজা বন্ধ হলো। মুহূর্ত পরেই ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়ি ছুটে চলল ঢাকার উদ্দেশ্যে।

পেছনে পড়ে রইল পরিচিত বাড়ি, আপনজন আর অগণিত স্মৃতি।

সেদিনই সবাই ঢাকায় ফিরে এলো। কারণ পরবর্তী দিনে অভ্র আর রাহার বিয়ের অনুষ্ঠান রয়েছে, আর সেসব আয়োজনের প্রতিটিতেই পরিবারের সবার উপস্থিত থাকা জরুরি।

ইভানও তাদের সঙ্গেই ঢাকায় এলো।

শুধু মাইনুদ্দিন মির্জা আর আফরোজা বেগম থেকে গেলেন। তারা পরদিন সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

—————

পুরোটা রাস্তা জুড়ে আয়াত আর মাহাদী দুজনেই দুদিকে মুখ করে নীরবে বসে ছিল। আয়াতের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল জানালার ওপারে ছুটে চলা পরিচিত পথগুলোর দিকে। একসময় যে রাস্তাগুলো তার নিত্যদিনের চেনা ছিল, আজ সেগুলোকেই কেমন যেন পর মনে হচ্ছে। চোখের সামনে একে একে পেছনে ফেলে আসছিল পরিচিত মোড়, গলি আর চেনা দৃশ্যগুলো। আবার কবে এই কুমিল্লার মাটিতে পা রাখা হবে—তা হয়তো আয়াত নিজেও জানে না।

দুজনের নীরবতার আবরণ ছিন্ন হলো মাহাদীর ফোনে ভেসে ওঠা রিংটোনে। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল, তার মা ফোন করেছে। কলটি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একের পর এক প্রশ্ন ছুটে এলো—কোথায় আছে, আর কতক্ষণ লাগবে, কখন পৌঁছাবে।

মাহাদী শান্ত গলায় উত্তর দিল,

— “আর প্রায় বিশমিনিট লাগবে।”

কথা শেষ করে ফোনটা পাশের সিটে রেখে দিল সে। তারপর অন্যমনস্কভাবে সামনের ড্রাইভিং সিটের আয়নায় চোখ পড়তেই হঠাৎ দৃষ্টি স্থিরগেল মাহাদীর। আয়াতের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় নেমে আসছে অশ্রু। মুখটা জানালার দিকে ফেরানো, বাতাসে কপালের চুলগুলো উড়ছে।অথচ সেই মুখের প্রতিটি রেখায় স্পষ্ট হয়ে আছে বুকের ভেতর জমে থাকা বিচ্ছেদের অসহ্য ভার।

দৃশ্যটা দেখে মাহাদীর বুকেও অজান্তেই একরাশ অস্বস্তি এসে ভর করল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থেকে শেষমেশ কিছুটা বিরক্তি মেশানো গলায় বলে উঠল,

— “এতই যখন কাঁদছিস, তাহলে চল, তোকে বাসায় নামিয়ে দিই।”

কথাটা কানে যেতেই আয়াত হাতের পিঠ দিয়ে দ্রুত চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর গালটা সামান্য বাঁকা করে, চোখ সরু করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল মাহাদীর দিকে।

ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গমিশ্রিত স্বরে বলে উঠল,

— “নিজের বাসায়ই তো যাচ্ছি… তাও নিজের আসামী”

কথাটা বলতে গিয়েই হঠাৎ থেমে গেল আয়াত। নিজের জিহ্বায় আলতো করে কামড় দিয়ে মুহূর্তেই কথাটা শুধরে নিয়ে বলল,

— “থুরি! থুরি! স্বামীর সাথে।”

আয়াতের শেষ কথাটি যেন মাহাদীর ধৈর্যের শেষ সীমায় আঘাত করল। মুহূর্তেই তার মুখের অভিব্যক্তি কঠোর হয়ে উঠল। বিরক্তি ও ক্ষোভে কণ্ঠ ভারী করে সে বলে উঠল,

— “নির্লজ্জ মেয়ে! তোকে আমি কোনোদিনই আমার স্ত্রী হিসেবে মেনে নেব না।”

মাহাদীর এমন তীব্র প্রতিক্রিয়াতেও আয়াতের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ হলো না। বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে, স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে বলল,

— “আপনাকে কে স্বামী মানবে?”যেই না চেহারা, নাম রাখছে পেয়ারা!”

কথাটি বলেই মুখ ভেংচি কেটে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল আয়াত।

মাহাদী কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল,

— “মানে?”

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত গম্ভীর ভান করে বলল,

— “ভার্সিটির প্রফেসর হয়েছেন, আমাকে প্রশ্ন করছেন—এটা কি ঠিক, স্যার?”

মাহাদীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রাগ সংবরণ করতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,

— “জাস্ট শাট আপ!”

তারপর ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল,

— “তুই আমার চেহারা নিয়ে কথা বলার সাহস পেলি কোথা থেকে?”

আয়াত এবারও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে, মুখে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,

— “যার মনে যা, ফাল দা উঠে তা।”

কথাটি শুনে মাহাদীর রাগ যেন আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। চোখমুখ কঠিন করে সে আয়াতের দিকে এগিয়ে আসতেই—

হঠাৎই গাড়িটি প্রচণ্ড শব্দে ব্রেক কষে থেমে গেল।
আয়াত সামান্য ঝাঁকুনি খেয়ে সামনের দিকে হেলে পড়ল। মাহাদীও থেমে গিয়ে একবার তার দিকে, তারপর গাড়ির সামনের দিকে তাকাল। তারা পৌঁছে গেছে।জানালার বাইরে তাকাতেই আয়াত দেখতে পেল—বাড়ির সামনে তার শাশুড়ি দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু দাঁড়িয়েই নেই, বউকে ঘরে তোলার জন্য যেন সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অপেক্ষা করছেন।

মাহাদীও মুহূর্তেই নিজের রাগ সংযত করে মুখের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক করে নিল। তারপর আয়াতের দিকে ফিরে নিচু অথচ কঠোর স্বরে বলে উঠল,

— “নিজেকে ঠিকঠাক করে নে। আর শোন—মায়ের সামনে ভালোভাবে থাকবি। আমার মা যেন কোনোভাবেই কষ্ট না পান।”

কিন্তু পরক্ষণেই আয়াতের মুখে আবার সেই দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল।

— “আচ্ছা… আইজান! দূর, নামটা কেন বলছি!”

নিজেই নিজের কথায় খিলখিল করে হেসে সংশোধন করল,

— “হবে তো মাইজান! মানে… আমারজান!”

তারপর মাহাদীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,

— “কী কিউট, তাই না?”

এক মুহূর্ত থেমে আবারও পরম আনন্দে ঘোষণা করল,

— “এখন থেকে এটাই ডাকব—মাইজান!”

কথাটা বলেই আয়াত নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মাহাদী কিছু একটা বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আর বলতে পারল না। শুধু বিরক্ত দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

পরক্ষণেই মাহাদী নিজেও গাড়ি থেকে নেমে এসে আয়াতের পাশে দাঁড়াল।

তার মা তখন সমস্ত নিয়মকানুন মেনে ফুল ছিটিয়ে, বরণ করে একমাত্র ছেলের নববধূকে ধীরে ধীরে গেট পর্যন্ত নিয়ে এলেন। বাড়ির পরিবেশজুড়ে তখন উৎসবের আমেজ, অথচ মাহাদীর মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

এবার এলো নতুন বউকে কোলে তুলে উপরে নিয়ে যাওয়ার পালা।

কিন্তু মাহাদী আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে,

— “আমি পারব না। পা ব্যথা করছে।”

ছেলের এমন অজুহাত শুনে তার মা যেন রীতিমতো বিরক্তিতে ফুঁসে উঠলেন। ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— “এটা আবার কেমন কথা? বউকে কোলে তুলে নেবে, আর এমন জোয়ান ছেলের নাকি পা ব্যথা! মেয়েটা তো পঞ্চাশ কেজিও হবে না!”

মায়ের ধমকে মাহাদী মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইল।পরিস্থিতি সামাল দিতে অভ্র তখন বুদ্ধি খাটিয়ে আশপাশে তাকিয়ে একজন ছেলেকে দেখিয়ে বলল,

— “তাহলে আমি ওই ছেলেটাকে বলি, আয়াতকে উপরে দিয়ে আসতে।”

কথাটা বলেই অভ্র ছেলেটাকে ডাক দিল। ডাক শুনে ছেলেটিও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো।

অভ্র মজা করে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— “নতুন জামাইয়ের নাকি জোর নাই! ইয়ে..মানে পায়ে। তুই যা, নতুন বউটাকে কোলে করে উপরে দিয়ে আয়।”

ছেলেটি কথাটা শুনেই বেশ উৎসাহের সঙ্গে আয়াতের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই মাহাদীর মায়ের কঠোর, রাগান্বিত মুখ চোখে পড়তেই ছেলেটির পা যেন মাটিতেই গেঁথে গেল।

মাহাদীও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

— “এই! স্টপ!”

ছেলেটি থেমে গেল।

মাহাদী দাঁত চেপে অভ্রের দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে তারপর বিরক্ত গলায় বলল,

— “সর। আমি নিচ্ছি।”

কথাটা বলেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আয়াতের দিকে এগিয়ে গেল মাহাদী।।

কথাটা শুনে অভ্র আর আয়াত একে অপরের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একই রকম বাঁকা, দুষ্টুমিভরা হাসি—যেন মাহাদীকে জব্দ করার এই সুযোগটা তারা দুজনেই বেশ উপভোগ করছে।

তারপর মাহাদী আয়াতকে কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার হাতলে হাত দিতেই বুঝল—দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

মুহূর্তেই তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল।

দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,

— “ধেত্তেরি! বা*লের জিন্দেগি!”

কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের দুর্ভাগ্যের হিসাব কষতে কষতে আবারও বিড়বিড় করল,

— “না পাইলাম মনের মানুষ, না হলো মনমতো বিয়ে… আর এখন ঘরের দরজাটাও বন্ধ!”

এদিকে মাহাদীর কোলে থাকা আয়াত ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। মাহাদীকে এভাবে একের পর এক বিপাকে পড়তে দেখে তার ভেতরে যেন দুষ্টুমির ঢেউ উঠছে।

হঠাৎ—

ফট করে দরজাটা খুলে গেল।
দরজা খুলতেই মাহাদীর চোখ আটকে গেল একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাহার ওপর। তার পাশেই শিফা, সাফা আর অবন্তিকা—চারজনই এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন মাহাদীর ঘরে প্রবেশের পথ আটকে রাখাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

মাহাদী এক পা ভেতরে রাখতেই রাহা সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে পথ আটকাল।

— “এক মিনিট! আগে টাকা দেন।”

মাহাদী ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— “আবার টাকা? তোরা কতবার টাকা নিবে?”

রাহা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,

— “যতবার লাগবে, ততবারই দেবেন, দুলাভাই!”

মাহাদী অসহায়ের মতো চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এদিকে আয়াত এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। রাহার ‘দুলাভাই’ সম্বোধন শুনে তার গাল দুটো লজ্জায় হালকা রাঙা হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে সে আস্তে করে বলে উঠল,

— “হতে চেয়েছিল জামাই…”

একটু থেমে চোখ তুলে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে যোগ করল,

— “শেষমেশ হয়ে গেল দুলাভাই।”

কথাটা শেষ হতেই চারপাশে হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল, আর মাহাদীর মুখটা মুহূর্তেই এমন গম্ভীর হয়ে গেল—যেন এই বাড়িতে পা রাখার আগেই তার সর্বনাশের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে গেছে।
মাহাদীর মুখ রাগে কঠিন হয়ে উঠল। আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে সে ঠাস করে আয়াতকে মাটিতে দাঁড় করিয়ে দিল। এরপর দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,

— “বা*লের ঘরে যাব… ধুর!”

মাহাদীর এমন রাগান্বিত প্রস্থান দেখে রাহা হেসে উঠল। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে পেছন থেকে বলে উঠল,

— “যাব বাবা, দুলাভাই তো চলেই গেল! এবার টাকা দেবে কে?”

শিফা আর অবন্তিকা একসঙ্গে বলে উঠল,

— “তাহলে ভাবিই দেবে!”

সাফাও সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল,

— “একদম ঠিক!”

এরপর সবাই একসঙ্গে আয়াতের দিকে তাকিয়ে সমস্বরে বলল,

— “নতুন ভাবি, তুমি টাকা দেবে!”

আয়াত চোখ কপালে তুলে বিস্মিত হয়ে বলল,

— “এটা আবার কেমন নিয়ম? যার টাকা, সে দেবে। আমি কেন দিতে যাব?”

রাহা দুষ্টু হাসি হেসে বলল,

— “তাহলে তোমার জামাইকে ডাকো।”

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে মাহাদী যে দিকে চলে গেছে সেদিকে তাকাল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,

— “সে আরো ভাগতে পারলে বাঁচে!”

ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক নারীকণ্ঠের মৃদু হাসি।
সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাতেই দেখা গেল—মাহাদীর মা, মিসেস ফারহানা শিকদার, হাতে টাকা নিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসছেন।

তাকে দেখামাত্রই আয়াতের মুখের দুষ্টুমি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে একেবারে চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাহা, শিফা, সাফা ও অবন্তিকাও আর কোনো কথা বলল না।মিসেস ফারহানা শিকদার নিচে মাহাদীকে রাগান্বিত অবস্থায় দেখেছিলেন। ছেলে রাগে হনহন করে ওপরে চলে যাওয়ার পর তিনি উপরে এসে দেখেন—রাহারা সবাই দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি বুঝতে তার আর বাকি রইল না। তাই দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে টাকা নিয়ে এসেছেন।

এসেই স্নেহমিশ্রিত অথচ মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বললেন,

— “আমার ছেলের বউকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস—এটা কিন্তু ঠিক করিসনি, রাহা মা।”

রাহা সঙ্গে সঙ্গে মৃদু হেসে বলল,

— “ইয়ে… আন্টি! দুলাভাই এত কিপটে কেন, সেটাই তো ভাবছি! তাই ভাবিকে আটকিয়ে রেখেছি।”

ফারহানা শিকদার হেসে হাতে থাকা টাকাগুলো এগিয়ে দিয়ে বললেন,

— “এই নে, তোদের গিফট।”

রাহা তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে বলল,

— “না না, আন্টি! লাগবে না। আমরা তো শুধু মজা করছিলাম।”

ফারহানা শিকদার স্নেহভরে মাথা নেড়ে বললেন,

— “না মা, এটা তোদের নিতেই হবে। আমি খুশি হয়েই দিয়েছি।”

আয়াত এতক্ষণ নীরবে সবকিছু দেখছিল। এবার সে মৃদু মাথা নেড়ে ইশারা করল—নিয়ে নিতে।
আয়াতকে রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা বেরিয়ে গেলো।

—————

রাতের প্রায় তৃতীয় প্রহর।
মাহাদী ঘরের দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই আচমকাই থমকে দাঁড়াল।চোখ দুটো বিস্ময়ে যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম।

ঘরের ভেতর যা দেখল, তার জন্য মানসিকভাবে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp