আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ৫৯ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          আরামসে বিছানার ওপর পায়ের ওপর পা তুলে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে আছে আয়াত। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাহারি রকমের চিপসের প্যাকেট। হাতে কোল্ড ড্রিংসের গ্লাস, স্ট্রতে আলতো করে চুমুক দিতে দিতে গভীর মনোযোগে টিভির পর্দায় চোখ আটকে রেখেছে সে। চলছে My Fault মুভি।

হঠাৎ পর্দায় দেখা গেল—নায়িকা ছুটে এসে একলাফে নায়কের কোলে উঠে পড়েছে। নায়কও বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। অন্যদিকে তাদের সৎ বাবা-মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে।

দৃশ্যটা যখন আরও ঘনিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই—

টিভির পর্দা নিভে গেল।

এমন জমজমাট মুহূর্তে আচমকা টিভি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আয়াতের ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্তিতে মুখটা বাঁকিয়ে পাশে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল মাহাদীর ওপর।এক হাতে রিমোট শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মাহাদী। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি, কপালে জমে আছে রাগের ভাঁজ। দৃষ্টিটাও এমন তীক্ষ্ণ, যেন টিভির ওই দৃশ্যের সমস্ত অপরাধের দায় আয়াতেরই!

আয়াত কয়েক সেকেন্ড মাহাদীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পরিস্থিতি সামাল দিতে ঠোঁটের কোণে একখানা মেকি হাসি টেনে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল,

— “চলুন, আমরাও করি।”

মাহাদীর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো।

— “কি?”

আয়াতের ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও প্রশস্ত হলো। চোখে ফুটে উঠল দুষ্টুমির ঝিলিক।

— “ওরা যদি করতে পারে, আমরা পারব না কেন?”

কথাটা শেষ করেই আয়াত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। আচমকাই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে সোজা মাহাদীর দিকে ছুটে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল সে। মুহূর্তের মধ্যে দুই পা মাহাদীর দুই পাশে রেখে এমনভাবে তাকে আঁকড়ে ধরল, যেন এটাই তার একমাত্র কাজ!

হুট করে আয়াতের এমন আচরণে মাহাদী যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া!এমন কিছু সে কল্পনাও করেনি। বরং রুমে ঢোকার সময় তার ধারণা ছিল, আয়াত হয়তো এতক্ষণে কেঁদে-কেটে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই নিজের জামাকাপড় নিতে আর ফ্রেশ হতে রুমে এসেছিল সে। আগামীকাল আবার ভার্সিটিতে যেতে হবে। সেখান থেকে ফিরে লোকদেখানো রিসেপশনে হাজির হতে হবে—সব মিলিয়ে মাথায় এমনিতেই একগাদা চিন্তা।তার ওপর রুমে ঢুকেই আয়াতের এমন অপ্রত্যাশিত কাণ্ড!

হঠাৎ আয়াত ঝাঁপিয়ে পড়ায় মাহাদীর হাত দুটো একপ্রকার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাকে সামলে ধরল। কিন্তু আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে দুজনেই হুমড়ি খেয়ে বিছানার ওপর পড়ে গেল।আয়াত নিচে, আর তার ওপর মাহাদী।পরের মুহূর্তেই আরও অপ্রস্তুত এক ঘটনা ঘটে গেল।

মাহাদীর ঠোঁট অনিচ্ছাকৃতভাবে ছুঁয়ে গেল আয়াতের ঠোঁট।দুজনেই স্থির হয়ে একে অপরের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। চোখেমুখে একই বিস্ময়—

এটা আবার কী হয়ে গেল!
কয়েক সেকেন্ডের সেই স্তব্ধতা ভেঙে আয়াতই প্রথম মুখ খুলল। পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল,

— “আরেকটা হয়ে যাক।”

মাহাদী যেন কথাটা শুনেই সম্বিত ফিরে পেল। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে তাকাল আয়াতের দিকে।

— “নির্লজ্জ মেয়ে! তুই এত ছোট হয়েও তোর লজ্জা-শরমের বালাই নাই!”

আয়াতও বিন্দুমাত্র দমল না। বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে একেবারে নির্লজ্জ স্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে বলে উঠল,

— “লজ্জা-শরম থাকলে আপনার সন্তানের মা হবো কিভাবে, মাইজান?”

মাহাদী ধমকে উঠল,

— “চুপ! একদম চুপ!”

বলেই আয়াতের ওপর থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে তার দুই গাল দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরে কঠোর অথচ অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল,

— “জাস্ট ছয় মাস। তারপর তোকে বিদায় করে আমি ইতালি চলে যাব।”

কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না মাহাদী। নিজের কাভার্ড খুলে জামাকাপড় বের করে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কানে আসতেই আয়াতের মুখের দুষ্টুমিভরা হাসিটুকু মুহূর্তেই নিভে গেল।

মাহাদী বরাবরই পালাই-পালাই করে। তাই আয়াত এমনটা করে আরও মজা পায়।

কিন্তু প্রতিটা মেয়েরই তো বিয়ের রাত ঘিরে কত স্বপ্ন থাকে। প্রিয় মানুষটার সঙ্গে কত কথা জমে থাকে, কত না-বলা অনুভূতির আদান-প্রদান থাকে, কত ছোট ছোট মুহূর্তকে সারাজীবনের স্মৃতি করে রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকে।

অথচ আয়াতের ভাগ্যে?কিছুই হলো না।যে রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্মৃতিগুলোর একটি হওয়ার কথা ছিল, সেই রাতেই উল্টো শুনতে হলো বিচ্ছেদের কথা। ডিভোর্সের কথা।

এই মেয়েটার জন্য একসময় কত ছেলেই পাগল ছিল! কত পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল! কত স্বপ্ন, কত সম্ভাবনা সামনে অপেক্ষা করছিল!
শেষ পর্যন্ত তার কপালে জুটল কী?একটা অসম্পূর্ণ সম্পর্ক, একরাশ অপূর্ণতা আর প্রিয় মানুষটার মুখে বারবার উচ্চারিত বিদায়ের ঘোষণা।

আয়াত ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন সেই নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু পারল না।বরং অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে।তারপর আরেক ফোঁটা।আয়াত চুপচাপ বসে রইল। মুখে কোনো শব্দ নেই, অথচ নীরব চোখ দুটোই যেন তার সমস্ত অভিমান, আক্ষেপ আর অপূর্ণতার গল্প বলে দিচ্ছে।

ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে মাহাদী বেরিয়ে এল।তাকে দেখামাত্রই আয়াত দ্রুত বিছানায় শুয়ে পড়ল। এমনভাবে গা এলিয়ে দিল, যেন সে বহুক্ষণ ধরেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উদ্দেশ্য একটাই—মাহাদী যেন তাকে বিছানা থেকে নামতে বলার কোনো সুযোগই না পায়।

মাহাদীর তখন চোখেমুখে তীব্র ঘুমের ছাপ। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীরটা যেন অবসন্ন হয়ে এসেছে। আয়াতের কাছে এসে নিচু স্বরে ডাকল,

— “আয়াত...”

কোনো সাড়াশব্দ নেই।

বরং মাহাদীর কণ্ঠ কানে যেতেই আয়াত সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে এমন নিখুঁত ভান করল, যেন পৃথিবীর কোনো শব্দই তার ঘুম ভাঙাতে পারবে না।

মাহাদী কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার ডাকতে সামান্য ঝুঁকতেই—হঠাৎ আয়াত কাত থেকে চিৎ হয়ে গেল।

ঠাস!

আয়াতের পা আচমকাই সজোরে এসে মাহাদীর বাহুতে আঘাত করল। আকস্মিক ধাক্কায় মাহাদীর ভারসাম্য পুরোপুরি বিগড়ে গেল। একপাশে হেলে পড়ে যেতে যেতে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিল সে।দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এল মাহাদী। মুখে তখন বিরক্তি আর বিস্ময়ের মিশ্র ছাপ।

অথচ বিছানায় শুয়ে থাকা আয়াত?চোখ দুটো বন্ধই রেখেছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে স্পষ্ট দুষ্টু হাসি।

মাহাদী যে তার কাণ্ডটা বুঝতে পারেনি, সেটা ভেবেই মনে মনে হাসছে সে।আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মাহাদী গিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। দুটো পা সামনের টেবিলের ওপর তুলে দিয়ে শরীরটা পুরোপুরি সোফায় এলিয়ে দিল। তারপর মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই তাকে গ্রাস করে নিল।কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাহাদী গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল।
ঘরজুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা।আর বিছানায় চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকা আয়াতের ঠোঁটের কোণে তখনও লেগে রইল সেই চাপা, দুষ্টু হাসি।

—————

ভোরের প্রথম আলোর রেশ চোখের পাতায় পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল মাহাদীর। ধীরে ধীরে চোখ মেলে কয়েকবার কুঁচকে নিল সে। রাতভর একই ভঙ্গিতে সোফায় ঘুমিয়ে থাকার ফলে ঘাড়টা যেন শক্ত হয়ে গেছে। সামান্য নাড়াতেই ব্যথায় টনটন করে উঠল।
মাহাদী কপাল কুঁচকে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে নিতেই হঠাৎ টের পেল, শরীরের ওপর সুন্দর করে কমফোর্টার চাপানো। এক মুহূর্তেই বুঝে গেল—এটা কার কাজ।

নিঃশব্দে একবার বিছানার দিকে তাকাল সে। একদম নিট এন্ড ক্লিন।তারপর চোখ ঘুরিয়ে পুরো ঘরটার দিকে তাকাতেই আরও একবার থমকে গেল। গতরাতে যে ঘরটা এলোমেলো ছিল, এখন সেটা একেবারে ঝকঝকে-পরিপাটি। কোনো কিছুই যেন নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়েনি।
কিন্তু এসব নিয়ে ভাবার মতো সময় তার হাতে নেই।
হঠাৎ সামনের দেয়ালঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই মাহাদীর বুক ধক করে উঠল।

সময় দেখে মুহূর্তেই সোফা থেকে ধপ করে উঠে দাঁড়াল সে।আর মাত্র বিশ মিনিট!
ভার্সিটিতে পৌঁছাতে হলে এখনই বের হতে হবে।

মুহূর্তের মধ্যেই আয়াতের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল মাহাদী। কোথায় গেল, কী করল, ঘুমাচ্ছে নাকি উঠে গেছে—এসব নিয়ে এখন তার মাথাব্যথা করার অবকাশ নেই। সত্যি বলতে, এসব নিয়ে তার ভাবার কথাও নয়।সময় নষ্ট না করে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল সে। পেটে একফোঁটা খাবার না দিয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়ল ভার্সিটির উদ্দেশে।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই ফারহানা শিকদারের কণ্ঠ ভেসে এল,

— “আর খেয়ে তো যা! আর শোন আয়া—”

কথাটা শেষ করার আগেই মাহাদী এক মুহূর্তের জন্যও থামল না।দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল সে।পেছনে পড়ে রইল ফারহানা শিকদারের অসমাপ্ত ডাক।

—————

ক্লাসরুমে প্রবেশ করতেই মাহাদীকে দেখে একসঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে গেল।

মাহাদী সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— “Sit down.”

তার নির্দেশ পেতেই সবাই নিঃশব্দে নিজ নিজ আসনে বসে পড়ল।মাহাদী বোর্ডের দিকে ঘুরে আজকের অধ্যায়ের নাম লিখে নিল। এরপর কোন অংশ পড়াবেন, সেটাও বোর্ডে স্পষ্ট করে লিখে মার্কার নামিয়ে রাখলেন।

“স্টুডেন্টদের দিকে ফিরতেই তার চোখ যায় বাঁ পাশের একদম সামনের সারিতে বসা একটি মেয়ের দিকে।পরনে বোরকা, মুখটা মাস্কে ঢাকা—শুধু দুটো চোখই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মাহাদী শুনেছিল, নতুন একজন স্টুডেন্ট অন্য জায়গা থেকে ট্রান্সফার হয়ে আসার কথা। সম্ভবত এই মেয়েটিই সেই নতুন ছাত্রী।মাহাদীকে ক্লাসের সবাই ভীষণ ভয় পায়। তিনি ক্লাসে থাকলে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। কেউ অপ্রয়োজনীয় কথা বলার সাহস করে না, এমনকি সামান্য দুষ্টুমিও নয়। অবশ্য কঠোর ব্যক্তিত্বের আড়ালে অনেকের কাছেই তিনি গোপন ক্রাশের মানুষ। কিন্তু সেই অনুভূতি প্রকাশ করার দুঃসাহস কারও নেই।

মাহাদীর দৃষ্টি আবারও সামনের সারির মেয়েটির ওপর স্থির হলো।
কণ্ঠে সামান্য কঠোরতা মিশিয়ে বলল,

— “Hey, you…”

কিন্তু কোনো সাড়া মিলল না।
মেয়েটি যেন ডাকটা শুনতেই পায়নি—এমন ভান করে মাথা আরও নিচু করে বইয়ের পাতায় চোখ আটকে রাখল।

মাহাদীর ভ্রু কুঁচকে গেল।

পাশের ছাত্রীটি অবশেষে তাকে কনুই দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “স্যার তোমাকে ডাকছেন।”

আয়াত কোনো উত্তর দিল না।নীরবে মাথা নিচু করে বসে রইল সে।মাহাদীর কপালের ভাঁজ এবার আরও গভীর হলো।এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না মাহাদী। বিরক্তি আর রাগে কপালের শিরা ফুলে উঠল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সোজা আয়াতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কণ্ঠে কঠোর ধমক ঝরিয়ে বলল,

— “কী শুরু করেছো? তোমার পরিচয় জানতে চেয়েছি!”

সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটি মাথা তুলল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—আয়াতের চোখ গিয়ে সরাসরি আটকে গেল মাহাদীর চোখে।মাহাদী কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।চোখ দুটো...
কেমন যেন ভীষণ পরিচিত!অকারণেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল তার। কোথায় যেন এই চোখজোড়া দেখেছে সে। খুব কাছ থেকে, খুব পরিচিত কারও চোখের মতো।তবু নিজের ভাবনাকে পাত্তা না দিয়ে মাহাদী কঠোর স্বরে বলল,

— “তোমাকে ডাকছি, শুনতে পাও না? নাম কী তোমার?”

আয়াত এবার ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। একেবারে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল,

— “আমি মিসেস আইজান শিকদার মাহাদী, স্যার।”

কথাটা যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসরুমের ওপর বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল।
মাহাদী থেকে শুরু করে উপস্থিত প্রতিটি স্টুডেন্ট—সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা।

মাহাদীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

— “What...!”

আয়াতের কণ্ঠে বিন্দুমাত্র জড়তা নেই।

— “Yes, sir. The newly married wife of Aizan Shikdar Mahadi.”

মাহাদী যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। শুকনো ঢোক গিলে একবার গলা পরিষ্কার করল সে।আর মাহাদীর সেই অপ্রস্তুত মুখভঙ্গি দেখেই আয়াতের বুকের ভেতরটা গোপন আনন্দে ফুলে উঠল। এতক্ষণকার গম্ভীর মুখের আড়ালে ঠোঁটের কোণে যেন বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠতে চাইছে।

তবে সেই হাসি প্রকাশ করল না আয়াত।
বরং সঙ্গে সঙ্গেই পাশে বসা মেয়েটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে পুরো ক্লাসরুমের ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিল।কারণ ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই মাহাদীকে নিয়ে সে কম কথা শোনেনি।বিশেষ করে কয়েকজন মেয়ের তো মাহাদীকে ঘিরে রীতিমতো বাড়াবাড়ি রকমের মাতামাতি! মাহাদী ক্লাসে ঢোকার আগে চুল ঠিক করা, লিপস্টিক দেওয়া, সাজগোজ করে তৈরি হয়ে বসে থাকা—সব দেখে আয়াতের মনে হচ্ছিল, এরা যেন ক্লাস করতে নয়, নিজেদের পছন্দের মানুষটার সঙ্গে প্রেম করতে এসেছে!

আর এখন?সবার মুখ যেন দেখার মতো!

আয়াতের পরিচয় প্রকাশের মুহূর্তটা যেন পুরো ক্লাসরুমে আচমকা বোমা বিস্ফোরণের মতো অভিঘাত ফেলেছে। কারও মুখ হাঁ হয়ে গেছে, কেউ বিস্ফারিত চোখে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার অবিশ্বাসে আয়াতের দিকে।

একজন আরেকজনের কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করতে লাগল—

— “কি বলল?”

— “মাহাদী স্যারের বউ?”

— “নিউলি ম্যারিড?”

— “কিন্তু... এটা কীভাবে সম্ভব?”

মুহূর্তের মধ্যেই ক্লাসরুমের নিস্তব্ধতা রূপ নিল তীব্র কানাঘুষা আর ফিসফাসে।
আর আয়াত?সে নির্বিকার মুখে বসে রইল।
মনে মনে শুধু একটাই কথা—
এবার দেখি, কার কতটা ক্রাশ থাকে!

মাহাদী হঠাৎ গর্জে উঠল,

— “Silent!”

তার কণ্ঠের তীব্রতা মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুমের গুঞ্জনকে স্তব্ধ করে দিল। এক নিমিষে আবারও নেমে এল পিনপতন নীরবতা।
মাহাদী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। রাগে চোয়াল শক্ত করে আয়াতের হাত চেপে ধরল এবং তাকে টানতে টানতে সোজা নিজের অফিস রুমের দিকে নিয়ে গেল।দরজা পেরিয়েই আচমকা তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিতেই আয়াত হুমড়ি খেয়ে টেবিলের ওপর গিয়ে পড়ল।
আচমকা ধাক্কায় আয়াতের ভেতরেও রাগ দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। টেবিল থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ চোখে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

— “একজন স্টুডেন্টের সঙ্গে এ কেমন আচরণ, স্যার? আপনি শিক্ষক বলে যা খুশি তাই করতে পারেন নাকি? আমি কিন্তু আপনার নামে কমপ্লেইন করব!”

— “ওহ! এখন তো তোর স্যার হয়ে গেছি, তাই না? একটু আগেই যে বললি—‘তোর স্বামী আমি’!”

আয়াত ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

— “বলব না তো কী করব? আপনি নিজেই তো আমার পরিচয় জানতে চেয়েছেন। আর আপনি যখন নিজ মুখে আপনাকে আমার স্বামী হিসেবে স্বীকার করে নিলেন, তার মানে তো আমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনেই নিয়েছেন, তাই না মাইজান!”

আয়াতের এমন নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাসী জবাবে মাহাদীর মেজাজ মুহূর্তেই তেতে উঠল। প্রচণ্ড বিরক্তিতে নিজের চুল মুঠো করে টেনে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন,

— “তুই কীভাবে সকাল সকাল এখানে এলি? আর আমি এতক্ষণে কিছুই জানতে পারলাম না কেন? আমার মা জানে তো?”

— “অবশ্যই আমার শাশুড়ি আম্মু জানে। তিনিই তো আমাকে আসতে বলেছেন। একেবারে যথাযথ অনুমতি নিয়েই এসেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শাশুড়ি আম্মুকে জানিয়েছি, আজ আমার ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস। আর এটাও বলেছি—আমি আপনার ভার্সিটিতেই ভর্তি হয়েছি। আর সেই ভর্তি করিয়েছেন স্বয়ং আপনি। কেমন বুদ্ধি, বলুন তো? ভালো, তাই না? অবশ্য ভালো হলেও মুখ ফুটে প্রশংসা করবেন না—আপনার তো আবার প্রশংসা করতে গেলেই মান-সম্মান কমে যাওয়ার ভয়!”

আয়াতের কথার প্রতিটি ছত্রে যেন ইচ্ছাকৃত দুষ্টুমি আর আত্মতৃপ্তির আভা। মাহাদীর অস্বস্তিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সে অনর্গল বলে যেতে লাগল,

— “ইভান ভাইয়াই আমাকে এখানে দিয়ে গেছে। আমাদের যেদিন বিয়ে হয়েছিল, সেদিনই আমি আমার ভার্সিটিতে ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করে দিয়েছিলাম। আমি তো জানতামই, আমার এই সো-কলড স্বামী মহাশয় আমাকে ছাড়া বেশিদিন থাকতে পারবেন না!”

কথাটা বলেই নিজের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে মাহাদীর দিকে তাকাল আয়াত।

— “আর এটা ছিল আমাদের বিয়েতে আপনার জন্য আমার পক্ষ থেকে একেবারে স্পেশাল গিফট। এবার আমাকে বাসায় যেতে হবে। আবার পার্লারেও যেতে হবে। আমার সারপ্রাইজ দেওয়া শেষ। এবার থেকে কিন্তু প্রতিদিনই দেখা হবে, তাই না—স্যার?”

এক মুহূর্ত থেমে মাহাদীর দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল সে। তারপর কণ্ঠে কটাক্ষের ধার আরও বাড়িয়ে বলল,

— “আর আপনার ওইসব ছ্যাঁচড়া মেয়েদের কীভাবে সামলাবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। যার যার সমস্যা, সে নিজেই সামলাবে। আই ডোন্ট কেয়ার!”

শেষ কথাটুকু বলেই মুখে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল আয়াত।দরজার কাছে পৌঁছে আচমকাই পেছন ফিরে হাত নেড়ে বলে উঠল,

— “টাটা, স্যার!”

কথাটা শেষ করেই মাহাদীর কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে দ্রুত বেরিয়ে গেল আয়াত।
মাহাদী নিজেও কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলেন। মাথার ভেতর যেন একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্নের ভিড়। এই মেয়েটা যে এতটা ধূর্ত আর দূরদর্শী, তা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি তিনি। সামান্যতম আভাস পেলেও নিশ্চয়ই আগে থেকেই সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেন। কিন্তু এখন আর আফসোস করে কী লাভ!যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন ক্লাসে গিয়েই পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে।
নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে মাহাদী আবার ক্লাসরুমের উদ্দেশে পা বাড়ালেন।ক্লাসে ঢুকতেই চোখে পড়ল অদ্ভুত এক দৃশ্য। কয়েকজন মেয়ের চোখে অভিমানের সঙ্গে টলমল করছে জল, কেউ আবার নির্বাক দৃষ্টিতে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেন মাহাদীর আগমনেই তাদের সমস্ত প্রত্যাশার ওপর আচমকা জল ঢেলে দিয়েছে কেউ।
মাহাদী বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে ক্লাস শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ আবার আয়াতের আবির্ভাব।

ব্যাগটা ফেলে গিয়েছিল সে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোতে গিয়েও আচমকা থেমে গেল আয়াত। চোখেমুখে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা দুষ্টুমির ঝিলিক। মাথায় যেন মুহূর্তেই কোনো এক দুর্ধর্ষ বুদ্ধি খেলে গেল।পরক্ষণেই ঘুরে দাঁড়িয়ে হাতের আঙুলের ইশারায় মাহাদীকে ডাকল।মাহাদী মনে মনে বিরক্ত হলেও ক্লাসের সবার সামনে আর কোনো ভণিতা করলেন না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন তার দিকে।
আয়াতের উচ্চতার তুলনায় মাহাদী বেশ খানিকটা লম্বা। তাই আয়াত চোখের ইশারায় বলে উঠল,

— “একটু নিচু হন।”

মাহাদী সামান্য ঝুঁকে আসতেই আচমকাই টুপ করে তার কপালে একটুখানি চুমু এঁকে দিল আয়াত।তারপর নিজের দুই আঙুল চোখের দিকে তুলে প্রথমে মাহাদীর দিকে, এরপর ক্লাসের সবার দিকে ইশারা করল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল দুষ্টুমিভরা বিজয়ী হাসি।

— “সিলমোহর মেরে দিলাম আমার জিনিসের ওপর। যদিও কাগজে-কলমে এটা আমার পার্সোনাল প্রপার্টি । কিন্তু যেহেতু কিছু চুন্নিদের নজর পড়েছে, তাই সবার চোখের সামনে একটু পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলাম—জিনিসটা বুক করা হয়ে গেছে!”

এক মুহূর্ত থেমে মাহাদীর দিকে তাকিয়ে আরও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

— “আপনি আপনার ক্লাস করুন, স্যার।”

কথাটা বলেই একচিলতে রহস্যময়ী হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আয়াত বেরিয়ে গেল।
আর পুরো ক্লাসরুমজুড়ে নেমে এলো এমন এক নিস্তব্ধতা, সবাই আয়াতের কাণ্ডে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল আর যেন কেউ আচমকা সবার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। এরূপ আকস্মিক কাণ্ডে মাহাদীর গলায় হঠাৎ কাশি উঠে গেল। আয়াত নির্বিকার ভঙ্গিতে তার ব্যাগ থেকে পানির বোতলটি বের করে ডেস্কের সামনে রেখে দিল। তারপর একটুও না থেমে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
মাহাদী দ্রুত বোতলটি তুলে একনাগাড়ে কয়েক ঢোক পানি পান করে গলা পরিষ্কার করে বললেন,

— “সবাই নরমাল হও। ক্লাসে মনোযোগ দাও।”

কিন্তু সেদিন আর কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছন্দে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হলো না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আয়াতের সেই নির্লজ্জ দুষ্টুমি, বেপরোয়া কাণ্ড আর মুখের ওপর ছুড়ে দেওয়া কথাগুলো। কিছুতেই মাথা থেকে ঘটনাটা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না তিনি।ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—মেয়েটা এটা কী করে করে গেল!
রাগে-ক্ষোভে দাঁত চেপে নিজেকেই মনে মনে বললেন,

“আজ বাসায় গিয়ে মেয়েটার একেবারে খবর করে ছাড়ব।”

কোনোমতে ক্লাস শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে মাহাদী বেরিয়ে পড়লেন। গন্তব্য সোজা বাড়ি।বাড়িতে পৌঁছেই প্রথমে আয়াতকে খুঁজতে শুরু করলেন। কিন্তু তাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে মায়ের কাছে জানতে চাইতেই তিনি স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে উঠলেন,

— “মাত্রই তো পার্লারে গেল।”

— “আচ্ছা।”

মায়ের কথা শুনে মাহাদী সরে আসতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে আবার মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল,

— “তুইও রেডি হয়ে নিস। কিছুক্ষণ পরই আমরা বেরোব।”

মাহাদী আর কোনো প্রশ্ন না করে সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন,

— “আচ্ছা, মা।”

—————

এদিকে একে একে সবাই রিসোর্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়তে লাগল। শিফা, সাফা, অবন্তিকা, জারিফ, জায়ান, ইভান—সবাই ইতোমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে চলে এসেছে।

অভ্রও সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সেও এখনই বেরিয়ে যাবে। ঠিক তখনই রিসোর্টে বরাদ্দকৃত রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন আরমান খান।

তাকে দেখামাত্রই অভ্র সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেশ বড় করে সালাম দিল,

— “আসসালামু আলাইকুম, শ্বশুর আব্বা!”

তারপর মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে অভ্র বলল,

— “আগেই মেয়ের জামাইকে দেখে নিলে—এটা কি ঠিক হলো? আর মুখ দেখলে তো সালামি দিতে হয়, তাই না? তবে মনে রেখো, আমি কিন্তু একবার সালামি নেব না—তিনবার নেব। কারণ এই নিয়ে আমার তিনবার বিয়ে করা বউ হবে তোমার মেয়ে!”

অভ্রের কথায় আরমান খান হেসে উঠলেন। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভ্রও প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ল।হাসির রেশ কাটতেই আরমান খান স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,

— “অবশ্যই, আমার যা কিছু আছে, সব তো তোরই, বাজান।”

কথাটা কানে যেতেই অভ্র আচমকা থমকে গেল।
‘বাজান’—এই ডাকটা কতদিন পর শুনল সে!
একটি মাত্র সম্বোধন যেন মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা কত শত স্মৃতি, আর না-বলা অনুভূতির দরজা খুলে দিল। চোখের কোণে জমে ওঠা আবেগটুকু আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করল অভ্র।
আরমান খান আর কিছু না বলে সস্নেহে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন,

— “আয়, বাজান।”

অভ্র এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চাচ্চুর বাড়ানো বাহুর মধ্যে নিজেকে সঁপে দিল। আরমান খানও পরম মমতায় তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিছুক্ষণ পর অভ্র ভারী হয়ে আসা কণ্ঠে বলে উঠল,

— “তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, চাচ্চু। আমার পরিটাকে আমার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। আমি সারাজীবন তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকব।”

আরমান খান মৃদু হেসে অভ্রের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,

— “হোপ, জামাই মিয়া! এসব কী বলিস? তোর পরি তো তোর কাছেই যাবে। বরং আমি তোর কাছে ঋণী। আমার অনুপস্থিতিতে আমার ছোট্ট পাখিটাকে তুই যেভাবে আগলে রেখেছিস, যেভাবে বুক দিয়ে রক্ষা করেছিস—তুই ছাড়া এটা সম্ভব হতো না, বাজান।”

কথাগুলো বলতে বলতে আরমান খান মমতাভরে অভ্রের পাগড়িটা একটু ঠিক করে দিলেন। তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,

— “চল এবার। আজ কিন্তু আমি ছেলে পক্ষ। শুনলাম, সবাই নাকি বরযাত্রীর জন্য গেট ধরেছে!”

অভ্রের মুখে সঙ্গে সঙ্গে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

— “বাহ! শ্বশুর হয়ে বরযাত্রী! সেই শ্বশুর আব্বা—হ্যাটস অফ ইউ! জামাই শশুর যেখানে আপদ নাই সেখানে।"

আচ্ছা চলো যাই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp