মাই মিস্টিরিয়াস প্রিন্স - পর্ব ৭৬ - মৌমিতা মৌ - ধারাবাহিক গল্প


          রাজপ্রাসাদের নিচের সেই গোপন কক্ষ ধীরে ধীরে তমসায় ডুবে যেতে থাকে। অন্ধকার ঘিরে ফেলেছে চারপাশটাকে। কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কালো ধোঁয়া। ঘন, ভারী এবং শ্বাসরুদ্ধ করা সেই ধোঁয়ার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে দুই মানব। সায়েরিনের বলা কথাগুলো কানে পেতে শুনে মস্তিষ্কে বসিয়ে নেয়। অতঃপর সময় নিয়ে কায়েরীথ জোরালো শব্দে উচ্চারণ করতে থাকে কথাগুলো। কিছু নিষিদ্ধ বাক্য ছিল সে কথাগুলো। যেই বাক্য সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারলেই বদলে যাবে কায়েরীথের দুনিয়া ‌। আর তাই হলো।বাক্যটি তিনবার উচ্চারণ করার সাথে সাথেই নীল পাথরটি ধীরে ধীরে কায়েরীথের হাত থেকে সরে গিয়ে উপরের দিকে ভেসে উঠতে লাগল। নিঃশব্দে এবং প্রচণ্ড শক্তির আভাস নিয়ে পাথরটি চমকিত করে দেয় দুজনকে। সায়েরিন হতবাক দৃষ্টিতে উপরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকে। জীবনের প্রথমবারের মতো সে দেখছে এই অমৃত পাথরের জাগরণ। একসময় সায়েরিনের ও ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন ছিল কিন্তু এই কক্ষে সায়েরিনের প্রবেশ নিষেধ ছিল। আজ কায়েরীথের হাত ধরে সেই নিষিদ্ধ সীমা পেরিয়ে এসেছে সে।

শৈশবকালে পিতার কাছে জেনেছিল পাথরের অন্তর্জাগতিক নিয়ম। কীভাবে এই পাথরটিকে শরীরে ধারণ করতে হয় কোন উচ্চারণে জাগাতে হয় সবকিছু শিখেছিলো সে। তবে কখনো নিজে চেষ্টা করতে পারেনি। বৃহৎ অন্ধকারের মাঝে কায়েরীথ উপরে তাকিয়ে আছে। চোখে অল্প হলেও ভয় কাজ করছিল তার। এই নীল পাথরটির চমক শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলছিলো। আর অজানা প্রত্যাশা! এই পাথরটি শরীরে ধারণ করার পর সে কী পারবে নিজের ইচ্ছে পূরণ করতে? এই চিন্তাই হঠাৎ কায়েরীথের মনে ভর করে বসলো।

আচমকাই প্রবল গর্জনে পাথরটি সরাসরি বুক চিরে ঢুকে পড়ে কায়েরীথের শরীরে। ডান পাশে! বুকের ঠিক ডান পাশেই আঘাত হানে সেই পাথরটি। মুহূর্তেই পোশাক ছিঁড়ে যায়। লন্ডভন্ড হয়ে যায় চারপাশ। প্রাসাদের দেয়াল কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুলে উঠে। উন্মুক্ত বুক থেকে রক্ত না ঝরলেও ব্যথার তীব্রতায় চিৎকার করে উঠে কায়েরীথ। বুকের ডান পাশে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে সে। হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়ে হঠাৎ। সেই চিৎকার ধ্বনিত হয় দেয়াল জুড়ে। সম্পূর্ণ কক্ষ কাঁপিয়ে তোলে। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারায় কয়েরীথ। সম্পূর্ণ কক্ষ থেকে কালো ধোঁয়া গুলো নিমিষেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সায়েরিন নিজের কান চেপে ধরেছিল। সে জানতো না এতোটা ভয়ংকর পরিস্থিতি হতে পারে। সামান্য এই পাথরটি পুরো প্রাসাদ কাঁপিয়ে তুলতে পারে সে জানতো না এসব। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সায়েরিন। নিঃশব্দ তার গতি। কায়েরীথ নিথর হয়ে পড়ে আছে প্রাসাদের মেঝেতে। বুকের ডান পাশে নীল আলো ক্ষীণভাবে জ্বলছে। ঠোঁট অল্প ফাঁক হয়ে আছে। কিন্তু নিঃশ্বাসের কোনো চিহ্ন নেই, বুকের উঠানামা ও বন্ধ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। শরীরে প্রাণের স্পন্দন অনুপস্থিত। সায়েরিন ঝুঁকে কায়েরীথের হাত ছুঁয়ে দেখলো। না কোনো সাড়া নেই। সায়েরিন ভয় পেলো। মনে হতে লাগলো এক শূন্য শরীর পড়ে আছে তার সামনে।

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। সায়েরিনকে চমকে দিয়ে হঠাৎ কায়েরীথ চোখ মেলে তাকায়। তীব্র নীল আলো ঝলসে ওঠলো তার দৃষ্টিতে। সায়েরিনের হৃৎপিণ্ড আচমকাই ধ্বক করে উঠে। কেঁপে ওঠলো সে। পিছু হটে গেলো একটু। কিছু বলার আগেই কায়েরীথ ঝটকা দিয়ে ওর গলা চেপে ধরে। সায়েরিনের চোখ বড় হয়ে গেলো। সে দ্রুত দুই হাত তুলে কায়েরীথকে আটকানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কায়েরীথের সেই নতুন শক্তির কাছে সে অসহায় হয়ে পড়লো। সরানো সম্ভবপর হলো না সেই হাত।

কিছু সময়ের ব্যবধানে এক হাতে দিয়েই সায়েরিনকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো কায়েরীথ। দেয়ালের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে সায়েরিন। 
মাথার পেছন দিক থেকে তীব্র রক্তের ধারা বইতে থাকলো। চোখ বুজলো সায়েরিন। সে বুঝতেই পারলো না কত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে কিয়ৎক্ষণ আগে। 

কায়েরীথ ধীর গতিতে উঠে বসলো। তার শরীরে তৈরি হলো অদৃশ্য শক্ত কাঠামো। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসলো সায়েরিনের কাছে। সায়েরিনের মাথায় হাত চেপে ধরলো এবং শোষণ করে নিতে থাকলো তার শক্তি। কায়েরীথ আর নিজের মধ্যে নেই। তাকে সেই নীল পাথরের শক্তি নিজের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো। তাই আপাতত যা হচ্ছে এতে হুশ নেই ওর। কায়েরীথ অতঃপর বাতাসের বেগে এই কক্ষ থেকে বেরিয়ে উপরিভাগে চলে আসলো।

প্রাসাদের উপরের অংশে তখনো চলছিল চরম ধ্বংসযজ্ঞ। প্রাসাদ কেঁপে ওঠায় সাময়িক সময়ের জন্য থমকে যায় যুদ্ধ। কিন্তু সময় পেরোতেই আবার শুরু হয় হানাহানি। শত্রু বাহিনী ধীরে ধীরে আরহেনিয়ার রাজবংশের উত্তরসূরিদের একে একে ঘায়েল করতে থাকে। এমন সময় নৃশংস রূপে আবির্ভূত হয় কায়েরীথ। যাকে সামনে পায় তাকেই এক হাতে ছিটকে ফেলে। আবার কারো তলোয়ার ছিনিয়ে নিয়ে নিঃসংশয়ে হত্যা করতে থাকে। আর প্রতিটি প্রাণের বিনিময়ে কায়েরীথের ভেতরের শক্তি আরও ঘনীভূত হতে থাকে। হুডো শহরের একজন সাধারণ পুরুষ ছিল কায়েরীথ। যার শরীরে শক্তির অভাব ছিল! শত শত আঘাত ছিল। আর সেই আঘাত আর কাটা দাগ দিয়ে ভরা শরীরের ক্ষত গুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকলো। ধরা দিলো স্বচ্ছ , সুন্দর ফর্সা হলুদ দেহ।

কায়েরীথের আচরণে দুই পক্ষেই অজানা সংশয় ছড়িয়ে পড়ে। রাজা অ্যালারিক ফেইথ প্রথমে ভেবেছিলেন সম্ভবত নিজ কন্যা আরিসার বর তাদেরকে সহায়তা করতে এসেছে। কিন্তু দ্রুতই তার ভ্রান্তি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কায়েরীথের আচরণ দিশেহারা এক যোদ্ধার মতো। চেনা অচেনা বাছবিচার না করে আগুনের মতো সব গ্রাস করছে সে। সামনে এগিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে সবকিছু। অ্যালারিক ছুটে গিয়ে থামাতে চাইলেন কিন্তু কায়েরীথ তো থেমে থাকবার মানুষ নয়। সামনে দাঁড়ানো এক শক্তিমানকে দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সে এবং সময়ের ব্যবধানে ওর তলোয়ার চিঁড়ে ফেলে রাজার কোমরের দিকের অংশ। রাজার শরীর থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটে আসে। হতবাক হয়ে কোমর চেপে ধরেন তিনি। নিজের প্রাণটুকু ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু তার আগেই কায়েরীথ ছিনিয়ে নেয় তার প্রাণশক্তি। আবার ও ঘায়েল করে সেই জায়গায়। একি সাথে মাথা চেপে ধরে শুষে নেয় সকল শক্তি।

রাজকুমারী আরিসা মূহুর্তখানেক আগে শত্রুদের সাথে লড়তে লড়তে হঠাৎ এই দিকটায় এসে পড়ে। আচমকাই এই দৃশ্য দেখে তার রুহ কেঁপে ওঠে। ছুটে এসে বাবার রক্তাক্ত দেহ দেখে থমকে যায় সে। কণ্ঠ ফাটিয়ে ডাকে পিতাকে। কিন্তু ততক্ষণে রাজা চোখ বুজে ফেলেছেন। প্রাণ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। কায়েরীথ সেদিকে একবারও ফিরে তাকায় না। সে ধ্বংসের মন্ত্রে বিভোর। চোখ ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে সে। আচমকা সামনে রাজপুত্রদের দেখে তাদের ও আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে যায়। চোখের সামনে ঢুলে পড়ে যেতে থাকে একেকটি প্রাণ। সে একদিকে শেষ করে চলেছে শত্রুদের। অন্যদিকে আরহেনিয়ার বংশের শেষ আলোটুকু নিভিয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে। ধীরে ধীরে মানুষদের লুটিয়ে পরা দেখতে দেখতে একসময় প্রাসাদের সামনে থাকা বড় মাঠে গিয়ে সে শান্ত হয়। শান্ত হয়ে নিচে বসে পড়ে কায়েরীথ। তার নীল‌ মণি তখনো জ্বলজ্বল করছিল। আচমকা কেউ জাদুবলে তার দিকে তীর ছুড়ে মারলো। সেই তীর ধরে ফেললো কায়েরীথ। কিন্তু তীরের বর্ষণ থামলো না। কায়েরীথ দাঁড়িয়ে খেয়াল করলো সামনে কিছু বিপরীত পক্ষের লোক তাকে মারার জন্য এগিয়ে আসছে। কায়েরীথ তার হাতের ইশারায় সকলকে সেকেন্ডের মধ্যে দুমড়েমুচড়ে দিলো। কিন্তু চোখের পলক ফেলতেই এগিয়ে আসতে দেখা গেলো রাজকুমারীকে। রাজকুমারী তার উপর সোজা আক্রমণ করে বসলো। আরিসার তলোয়ার দূর থেকে কায়েরীথকে আঘাত করার জন্য ছুটে আসছিলো কিন্তু কায়েরীথ তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলো। 

নিজেকে বাঁচিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললো কায়েরীথ। নিচ থেকে তলোয়ার তুলে সেও রাজকুমারীকে আক্রমণ করলো। তাদের মধ্যে প্রচন্ড তলোয়ারবাজি হলো। একদিকে তো শিক্ষক যে তার শিষ্য কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অপরদিকে শিষ্য যে শুধুই প্রতিশোধ পূরণ করার জন্য শিক্ষকের শিক্ষা নিয়েছে।

রাজকুমারী আরিসা তলোয়ার ঘুরিয়ে বললো,
"লজ্জা করছে না আমার সাথে লড়াই করতে?"

কায়েরীথ আবারো আঘাত হানতে হানতে বললো,
"না। লজ্জা বিষয়টা কায়েরীথের মধ্যে ছিল ই না।"

"সেসব বাদ দিলাম। বিয়ে করতে চেয়েছ এই কারণেই? এই রাজ্যকে শেষ করে দিতে এসেছো তুমি?"

কায়েরীথ হেসে ফেললো। তার হাসির ঝংকার চারপাশে ছিটকে পড়লো। সে মাথা হেলিয়ে উন্মুক্ত বুক নিয়ে বললো,
"হ্যাঁ! এই অমৃত বস্তুটিই আমার ইচ্ছা পূরণ করেছে। আমি এসেছিলাম রাজাকে শেষ করতে। তার রাজ্য যে কতটা নরম তা বুঝিয়ে দিতে। এজন্যই তো আপনার মতো এক সুন্দরী এতো সহজেই আমার ফাঁদে পা দিয়ে ফেললো।"

আরিসা খুব দ্রুত কাছে আসলো। কায়েরীথের দুই গাল হাত রাখলো। মেয়েটার চোখ ছলছল করছিলো‌। সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো,
"প্রিন্স! আমি জানি তুমি তোমার মধ্যে নেই। শোনো আমি তোমাকে স্বাভাবিক করবো। দয়া করে সব ঠিক করে দাও। দয়া করে এই রাজ্যকে আগের মতো করে দাও। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তুমি এসব করতে পারো।এই ধ্বংসযজ্ঞ সবকিছু আমার কাছে স্বপ্ন প্রতিপন্ন হচ্ছে। আমার ভেতরটা ভয়ানকভাবে জ্বলছে, প্রিন্স। আমি কথা দিচ্ছি তুমি তোমার ন্যায্য অধিকার পাবে। হ্যাঁ তুমি এতো কিছু করার পর ও আমি তোমাকে ন্যায্য অধিকার দিতে বাধ্য হবো এই আমার প্রতিজ্ঞা। কিন্তু দয়া করে এরকম করো না। সব ঠিক করে দাও। দেখো আমাদের রাজপ্রাসাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ছে। আমার পিতা চোখের সামনে প্রাণ ত্যাগ করেছে। আমার ভাইয়েরা তোমার হাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ফেলেছে। আমার কেনো জানি এক মূহুর্তের জন্য ও বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার জন্মস্থানকে ধ্বংস করে দিলো। যাকে আমি এই স্থানে প্রবেশ করতে সহায়তা করেছিলাম , যাকে আমি রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সে ই সবকিছু ধ্বংস করে দিলো। আমার কেনো জানি কিচ্ছু বিশ্বাস হচ্ছে না।"

আরিসা ডুকরে কেঁদে উঠলো। কায়েরীথের কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে বললো,
"পারবে তুমি ঠিক করতে? পারবে সবকিছু আগের মতো করে দিতে?? করে দাও না।"

কায়েরীথের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। আচমকাই সে তলোয়ার তুলে আরিসার পেটে বসিয়ে দিলো। আরিসা থমকে গেলো। মুখ থেকে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল। আরিসা আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে তাকালো না। মুখ তুলে কায়েরীথের দু চোখে তাকালো। সেই চোখে নিজের জন্য না ছিল ভালোবাসা আর না ছিল কোনো মায়া। শুধু ছিল হিংস্রতা! ঘৃণা! প্রতিশোধ! কায়েরীথ তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো। একটান দিয়ে তলোয়ার বের করলো। আরিসার শরীর থেকে রক্ত ঝরে মাটি রক্তাক্ত করে দিলো। আরিসা কোনো প্রয়াস করলো না কায়েরীথকে মেরে ফেলার। সে প্রয়াস ও করলো না এই ধরণীতে বাঁচবার। চোখের সামনে ধরা দিলো এক সুপুরুষের ধ্বংসাত্মক ব্যক্তিত্ব যা এই তলোয়ারের ধারালো অংশ থেকেও ধারালো ভাবে আরিসাকে শেষ করে দিলো। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটালো। মাটিতে লুটিয়ে পড়লো আরিসা তার চোখ শুধু পড়ে রইলো কায়েরীথের চলে যাওয়ার দিকে। মনে মনে সে উচ্চারণ করলো,
"আমি আবার আসবো , প্রিন্স! আমি তোমাকে এই জনমে শেষ করতে পারিনি। আমি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম তোমার কাছে এসে। কিন্তু আমার পরবর্তী সত্তা তোমার সামনে কখনোই দুর্বল হবে না। তোমাকে শেষ করে দিতে আমি আবার আসবো। এই ধরণীতে আমার চলাফেরা চলতেই থাকবে যতদিন না পর্যন্ত আমার মন‌ শান্ত না হচ্ছে আমি তোমার পিছু ঘুরবো। তোমার শক্তি ছিনিয়ে নিয়ে হৃদয়বিদারক মৃত্যু দিবো যা তুমি চোখ বোজার পরেও শরীরে উপলব্ধি করতে পারবে। প্রচণ্ড ব্যথায় তুমি একবার হলেও বলবে আমাকে আরো কিছু দিন বাঁচতে দাও! 

আমি আবারো আসবো, প্রিন্স! অপেক্ষা করো।"

রাজকুমারীর চোখ বুঝে ফেলার সাথে সাথে দূরে কোথাও ফুটে উঠা সাদা গোলাপের পাপড়ি গুলো নিচে ঝরে পড়লো। তাদের ত্বক থেকে চারপাশে রক্ত ছিটকে পড়লো। রক্তাক্ত হলো সাদা গোলাপ ফুলের বাগান।

******

বাংলাদেশে টানা কয়েক দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। কালো মেঘ দেখে সকলে বলে যাচ্ছে কোনো অজানা আতঙ্কের পূর্বাভাস হয়তোবা। সেই আভাস একে একে সত্যি হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে মানুষের মরণ ঘটছে। কি হচ্ছে, কেনো হচ্ছে কেউ বুঝতে পারছে না। অনন্যা ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টিভেজা কাঁচের ওপারে তাকিয়ে বুকটা হঠাৎই কেঁপে উঠলো। আকাশের মাঝখানে বৃহৎ এক বলয় ঘুরপাক খাচ্ছে! কালো ধোঁয়ায় তৈরি এই বলয় যা নিজেই নিজের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমকে উঠছে আর গর্জে উঠছে আকাশ।

রাত গভীর। অনন্যার মা ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চোখ বুজে বুজে আসছিলো তার। ঝিমিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু আচমকা চোখ খুলে মেয়েকে উঠতে দেখে তিনি ছুটে আসলেন। মেয়ের কাঁধে আলতো হাত রেখে আশঙ্কা আর মমতার মিশ্র কণ্ঠে বললেন,
"অনন্যা!"

অনন্যা ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। পল্লবী আর দেরি না করে মেয়েকে আঁকড়ে ধরলেন। বুকের মধ্যে চেপে রাখলেন মেয়েটিকে আর কখনও হারিয়ে যাতে না যায় এই চিন্তায় ব্যস্ত তিনি। কান্না ভেজা কণ্ঠে নাক টেনে বললেন,
"আমরা কি যে ভয় পেয়েছিলাম। যাক, এখন একটু মনের শান্তি লাগছে।"

অনন্যা কিছু বলল না। একরাশ নিস্তব্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কপাল ও হাতে ব্যান্ডেজ। চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজবাঁধা হাতে তাকাল। কিন্তু আশ্চর্য! কোথাও ব্যথা নেই। শরীরও ভার মনে হচ্ছে না।

শেষবার যখন চোখ বুজেছিল তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছিল। মনে আছে হেডলাইটের আলোটা তার চোখে ঝলসে উঠেছিল। তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল সে। কোনো এক অজানা স্থানে। সেই জায়গাটা বাস্তব ছিল না। অথচ ঠিক ছুঁয়ে দেখা যাচ্ছিল সব। মনে হচ্ছিল সব ঘটনা তার চোখের সামনেই ঘটেছে। কিন্তু অনন্যা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সে আবার ফিরেছে তো ঠিকই। কিন্তু আদৌ আগের সেই সে আছে কি?

অনন্যা ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলো,
"মা! স্যার...উনি কোথায়?"
·
·
·
চলবে.......................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp