আজ মেহুলের বিয়ে। মির্জা বাড়ি রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। চোখ ধাঁধানো সাজ, কানায় কানায় আনন্দে ভরা পরিবেশ। তবে এত সব রঙের মাঝে একমাত্র বিয়ের কনে রঙহীন। তার চোখে-মুখে নেই কোনো আলো-আনন্দের ছোঁয়া আছে একরাশ বিষন্নতা। তার সব রঙ যেন শুষে নিয়েছে শেরাজ ভাই। তার বিয়ে নিয়ে শেরাজ ভাই কত খুশি। কত আনন্দের সাথে তার বিয়ের সমস্ত কাজ করছে। কি চমৎকার দক্ষতায় সব কিছু সামলাচ্ছে, বিয়ের যাবতীয় আয়োজন, লোকজন সামলানো, অতিথিদের অভ্যর্থনা—সবকিছুতেই শেরাজের মুখে হাসি লেগে আছে, যেন জীবনের সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত এটা। মেহুল এই সব কিছু শুধু ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে দেখে। মাঝে মাঝে এসব দেখে ঠোঁটের কোণে ত্যাচ্ছিলের হাসি ফুটে উঠে। কি অবলীলায় সব ভুলে গেছে শেরাজ ভাই! যেন কিছুই হয় নি...তাদের মাঝে। অথচ সে হাজার বার চেষ্টা করেও কিছুই ভুলতে পারছে না। যত বার ভোলার প্রয়াস করেছে তত বার সবটা দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরেছে অক্টোপাসের মতো চাইলেও অক্টোপাসের আটটা পায়ের বাঁধন থেকে মুক্ত হতে পারছে না অথচ তার আজকে বিয়ে অন্য এক পুরুষের সাথে। এই সব ভাবতেই মেহুলের চোখ বেয়ে নেমে আসে নোনা জল। তার সামনেই বিছানার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নতুন কনে সাজার সব সরঞ্জাম। গাঢ় লাল বেনারসির শাড়িটা হাতে তুলে নেয় মেহুল। ছুঁয়ে দেয় শাড়ির ভারী কারুকাজ। নাকের পাটা ফুলে উঠে মেহুলের, ধরা গলায় বলে উঠে।
“লাল বেনারসি পরব, বউ সাজব, খোপায় ফুল গুঁজব, হাত ভর্তি চুড়ি পরব, চোখে কাজল পরব। কিন্তু এই সাজসজ্জা তোমার জন্য নয় শেরাজ ভাই অন্য এক পুরুষের জন্য।”
বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠে। ঠিক তখনই রুমে এসে প্রবেশ করে ইফা। মেহুলকে কাঁদতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় সে। মেহুলের কাছে ছুটে এসে বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “এই মেহুল, কি হয়েছে বোন?”
মেহুল আর নিজেকে থমিয়ে রাখতে পারল না, এক ঝটকায় ইফার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। ইফা স্তম্ভিত হয়ে যায়, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ হলো কি মেয়েটার? মেহুল কাঁপা কণ্ঠে বলল, “আপু, আমি এই বিয়েটা করব না। তুমি কিছু একটা করো প্লিজ। আমি এই বিয়েটা করলে সত্যি ম রে যাব।”
ইফা আঁতকে উঠে মেহুলকে বুকের উপর থেকে সরিয়ে মেহুলের কান্নারত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি বলছিস এসব! আর কিছুক্ষণ পরেই তোর বিয়ে। পার্লারের মেয়েরাও এসে গেছে তোকে সাজাতে... আর এখন তুই এসব বলছিস!”
মেহুল নাক টেনে বলল, “আমি... আমি... আমি শেরাজ ভাইকে ভালোবাসি আপু। শেরাজ ভাইকে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করব না।”
ইফা স্তম্ভিত হয়ে যায়। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে যেন। কি বলছে এসব এই মেয়ে? ইফা অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, “কি বলছিস তুই এসব মেহুল? মাথা ঠিক আছে তোর?”
মেহুল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, আমি শেরাজ ভাইকে ভালোবাসি। শেরাজ ভাইও আমাকে ভালোবাসে, আমি জানি। কিন্তু শেরাজ ভাই কেন এমন করছে আমি জানি না। তুমি কিছু একটা করো না আপু। আমি এই বিয়ে করলে সত্যি ম রে যাব।”
ইফা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মাথায় জট বেঁধে গেছে। কি করবে এবার সে? ইফা ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিয়ে ধীর হাতে মেহুলের চোখের জল মুছে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “শান্ত হ, মেহুল। বাড়ি ভর্তি মেহমান। এসব পাগলামো বন্ধ কর। কেউ জানতে পারলে কেলেঙ্কারি বেঁধে যাবে। আমি দেখি, কি করা যায়। পার্লারের মেয়েরা নিচে আছে, ওরা এসে তোকে সাজিয়ে দেবে। ততক্ষণে আমি ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলে আসছি।”
মেহুলের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “সত্যি বলছো শেরাজ ভাইয়ের সাথে কথা বলবে?”
ইফা মুচকি হেসে সান্ত্বনার গলায় বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু এখন আর চোখের জল ফেলবি না। চুপচাপ সাজবি ঠিক আছে?”
মেহুল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ইফা একটা শেষ দৃষ্টি মেহুলের দিকে ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
—————
ইফা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে, মাথার ভেতর শুধু মেহুলের বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কয়েকদিন ধরেই মেহুলকে অস্থির লাগছিলো তার কাছে। ভেবেছিল, হয়তো বিয়ের জন্য এমনটা হচ্ছে। কিন্তু না তার সবটাই ভুল ভাবনা ছিল। কিন্তু তার ভাবনার বাহিরে গিয়ে যে এমন কিছু শুনতে পাবে ভাবতে পারে নি। ইফা নিচে নেমে পার্লারের মেয়েদের উপরে যেতে বলে। নিজে সোজা বাড়ির বাইরে আসে। শেরাজ বাগানে আছে। ইফাও বাগানে আসে। শেরাজ বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে। ইফা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাইয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দেয়, “ভাইয়া।”
শেরাজ ঘুরে তাকায়। ইফা মিনমিনে কণ্ঠে বলল, “তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।”
শেরাজ ফোনে থাকা মানুষটিকে "পরে কথা বলছি" বলে কল কেটে দিয়ে বোনকে বলল, “কি কথা?”
ইফা ঢোক গিলে বলে, “মেহুল...”
বলেই থেমে যায়। ভয় পাচ্ছে ভাইকে কথাটা বলতে। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে মেহুলের?”
ইফা ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে দ্রুত বলে, “মেহুল কান্না করছে।”
শেরাজ অবলীলায় বলল, “মেয়েরা বিয়ের দিন একটু আধটু কান্নাকাটি করবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
ইফা ধীরে বলে, “কিন্তু ভাইয়া... এই কান্না বিয়ের জন্য না।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকায়, “তাহলে কিসের জন্য?”
ইফা ঢোক গিলে বলে, “আসলে ভাইয়া... ও বলছে তুমি নাকি ওকে ভা...”
ইফা কথাটা শেষ করার আগেই তুহিনের চিৎকার ভেসে এলো, “শেরাজ, এদিকে আয় তো একটু!”
শেরাজ ইফাকে আদেশ করে, “ঘরে যা।”
বলেই তুহিনের দিকে এগিয়ে যায়। ইফা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আসল কথাটাই তো বলা হলো না। কি যে হবে আজ? ইফা ভেবে পাচ্ছে না। মেহুলকে বুঝাতে হবে। এই বিয়ের সাথে তার দাদা ভাইয়ের সম্মান আর এই মির্জা বাড়ির সম্মান জড়িয়ে আছে। তার ভাইয়া যদি মেহুলকে ভালোবাসত তাহলে কখনই মেহুলকে অন্য কারোর সাথে নিজে থেকে বিয়ে দিতো না, কোনো না কোনো ভাবে এই বিয়েটা ভেঙে দিতো। তার ভাইকে এতটুকু চিনে সে। যে নিজের জিনিস অন্য কারোর হতে দিতো না সে নাকি ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য কারোর সাথে বিয়ে দিবে এটা অবিশ্বাসযোগ্য। এই ভালোবাসাটা হয়তো শুধুই মেহুলের তরফ থেকে তার ভাইয়ের তরফ থেকে কোনো অনুভূতি, ভালোবাসা নেই। আহা এক তরফা ভালোবাসা। খুবই ভয়ানক এক ভালোবাসা যে ভালোবাসায় শুধু আক্ষেপ আর আক্ষেপ।
—————
মেহুলের সাজ কমপ্লিট। পুরোটা সময় ধরে শুধু মেহুল ছটফট করেছে—ইফা কেন আসছে না? এত দেরি হচ্ছে কেন আসতে?
মাথায় লাল কারুকাজ করা দুপাট্টা পরতেই বউ সাজটা সম্পূর্ণ হয় মেহুলের। পার্লারের মেয়েরা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই দরজা খোলে—ইফা ভেতরে এসে ঢোকে। ইফাকে দেখেই মেহুলের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ইফার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “আপু, এত দেরি করলে কেন? শেরাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছো?”
ইফা নিশ্চুপ। সে মেহুলের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। বউ সাজে মেহুলকে অপ্সরা লাগছে যেন? চোখ ফেরানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতোটা মিষ্টি আর সিগ্ধ লাগছে দেখতে।
মেহুল কপট চেঁচিয়ে বলল, “আপু কিছু তো বলো!”
ইফা ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে সামলায়, তারপর মুচকি হেসে বলে, “খুব সুন্দর লাগছে তোকে মেহুল। ঠিক যেন রূপকথার কোনো রাজ্যের রাজকুমারী।”
মেহুল একটু বিরক্ত গলায় বলে, “আমার সৌন্দর্যের প্রশংসা বাদ দাও, আগে বলো শেরাজ ভাই কি বলল?”
ইফা থমকে যায়। মেহুলকে বুঝাতে হবে। মরীচিকার পেছনে পড়ে থাকলে চলবে না। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ইফা বলে, “মেহুল, আমার সঙ্গে আয়।”
দরজার সিটকিনি লাগিয়ে ইফা মেহুলকে বিছানায় বসায়। মেহুল কিছুটা অবাক হয় ইফার আচরণে। ইফা মেহুলের ডান হাতটা ধরে বলে, “মেহুল, আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনবি। কোনো চোখের জল ফেলবি না। চোখের জল ফেললে কিন্তু তোর এতো সুন্দর সাজটা নষ্ট হয়ে যাবে।”
মেহুল নিঃশ্বাস আটকে বলে, “কি হয়েছে, আপু?”
ইফা চোখ নামিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে বলে, “মেহুল, ভাইয়া তোকে ভালোবাসে না রে…”
মেহুল স্থব্ধ। বিমূঢ়। কাজল রাঙা ঘন পাপড়ি জোড়া নড়ে না একটুও। অবিশ্বাস্য চোখে ঠায় তাকিয়ে রয় ইফার দিকে। ধীরে ধীরে চোখের কোণায় জমে ওঠে নোনা জল, ঝাপসা হয়ে আসে ইফার মুখ। ইফা মেহুলের অবস্থা দেখে তার বাহু ধরে ঝাঁকি দিয়ে ডাকে, “মেহুল!”
মেহুল চমকে ওঠে। গাল বেয়ে নেমে আসে নোনাজল। ইফা দ্রুত উঠে গিয়ে টিস্যু এনে আলতো করে মেহুলের চোখের জল মুছে দেয়—যেন মেকআপ নষ্ট না হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইফা বলে, “কাদিস না মেহুল। ভাইয়া তোকে ভালোবাসে না। আমি জানি না, তোর আর ভাইয়ার মাঝে ঠিক কী হয়েছিল। আর আমি তা জানতেও চাই না। কিন্তু একটা কথা আমি নিশ্চিত—যদি ভাইয়া তোকে ভালোবাসত, তাহলে কখনও তোকে নিজ হাতে আসিফ ভাইয়ার সঙ্গে তোর বিয়ে দিতো না। ভাইয়া তোকে ভালোবাসলে কি কখন এমনটা করতে পারত, পারত না।”
মেহুলের নাকের পাটা বারবার ফুলে উঠছে। ধীরে কাঁপা গলায় বলে, “বাসে না, শেরাজ ভাই আমাকে ভালোবাসে না...”
ইফা তার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে শান্ত গলায় বলে, “মেহুল, সামলা নিজেকে। তুই যদি পাগলামি করিস, তাহলে কী হবে বুঝতে পারছিস? দাদা ভাই কষ্ট পাবে মেহুল তুই যদি এই বিয়েটা না করিস। হতে পারে দাদা ভাইয়ের বড় কিছু হয়েই যেতে পারে।”
মেহুল সরে আসে ইফার বুক থেকে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জলটা মুছে নেয়। দৃঢ়, কিন্তু পাগলাটে কণ্ঠে বলল, “যে আমাকে ভালোবাসে না, তার জন্য আমি কেন কাঁদবো? আমি কেন কষ্ট পাবো? আমি কি বানের জলে ভেসে এসেছি নাকি? আমি আর কাঁদবো না, নিজেকেও কষ্ট দেব না। আমি খুশি মনে বিয়েটা করব। তুমি যাও আপু, গিয়ে দেখো আমার বিয়েতে কোনো কমতি আছে কিনা। কোনো কিছুতেই যেন কমতি না থাকে! সবাইকে কবজি ডুবিয়ে খাওয়াবে, যেন প্রাণ ভরে দোয়া করে যায় আমার নতুন জীবনের জন্য।”
ইফা চিন্তিত স্বরে বলল, “মেহুল, ঠিক আছিস বোন?”
মেহুল দ্রুত গলায় মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “হুম, আমি.. আমি একদম ঠিক আছি। আচ্ছা, লামিয়ারা এসেছে? ওরা আসছে না কেন? ওরা না এলে তো আমার বিয়েটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে! ওরা নাচ-গান না করলে তো বিয়ের আসরই জমবে না! দাঁড়াও, ওদের একটা ফোন দিই—এত দেরি করছে কেন ওরা!”
এই বলে মেহুল পাগলের মতো ফোন খুঁজতে শুরু করে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা শাড়ি, গয়না সরিয়ে সরিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে ফোনটা। ইফা এক হাত মুখের ওপর চেপে ধরে মেহুলের পাগলামি দেখে যাচ্ছে। মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা একের পর এক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এতটুকু বয়সে আর কত কিছু সইবে মেয়েটা? কিন্তু এখন ইফার মনে একটাই ভয় কাজ করছে—বিয়ের পর মেহুল সুখী হবে তো? নাকি দুঃখই রয়ে যাবে ওর বাকি জীবনটা!
এমন সময় মেহুল ফোনটা খুঁজে পেয়ে বিড়বিড় করে বলে, “এই তো পেয়েছি!”
কথাটা বলে ইফার দিকে তাকিয়ে বলে, “একি তুমি এখনও এখানে বসে আছো যে? যাও নিচে যাও, গিয়ে দেখো কোথাও কোনো কমতি আছে কিনা!”
ইফা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
—————
মেহুল বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। পুরো মির্জা বাড়িটায় নজর বুলায়। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির সাথে তার। আর আজ তার এই বাড়িতে শেষ দিন। আর কিছু ঘন্টা পরেই তার বিয়ে আর একই সাথে তার মনের মৃত্যু। মেহুলের বুকের ভেতর ঝড় বইছে, এ ঝড় থামার নয়। এ ঝড় মৃত্যু পর্যন্ত রয়ে যাবে। শেরাজের কথা মনে পড়লেই গভীর একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে শুধু। কোথায় আছে মানুষটা? মেহুল বাগানের এদিক ওদিক তাকায়। মানুষের ভিড়ে শেরাজকে খুঁজে পাওয়াটা যেন দুস্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক কিছুক্ষণ পরেই মেহুলের নজর পড়ে শেরাজের উপরে। তার দিকে তাকিয়ে আছে। শেরাজকে দেখা মাত্রই নাকের পাটা ফুলে উঠে মেহুলের। কণ্ঠ নালি কেঁপে উঠছে, ভেতর থেকে কান্নাটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। মেহুল শুকনো ঢোক গিলে আটকে নেয় ভেতরের কান্নাটা। কেন কাঁদবে সে কার জন্য কাঁদবে যে তাকে ভালোবাসে না তার জন্য কাঁদবে! কাঁদবে না সে আর চোখের জল ফেলবে না। তার চোখের পানি এতটাও তুচ্ছ না। তার ইমোশন নিয়ে খেলা করার জন্য কোনো দিন শেরাজ ভাইকে সে ক্ষমা করবে না কোনো দিন না। মেহুল তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নজর সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে লামিয়াদের গলা ভেসে আসে। মেহুলের বান্ধবীরা এসেছে। মেহুল ওদের কন্ঠে শুনে রুমের ভেতরে চলে যায়। মেহুল বেলকনি থেকে চলে যেতেই শেরাজ মাথা নিচু করে ঠোঁট প্রশস্ত করে হেসে চোখ বন্ধ করে নেয়। ভেসে ওঠে মেহুলের বধূ সাজ। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি, কারুকাজ করা ঘোমটা, মাথায় টিকলি, নাকে নথ, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক—সব মিলিয়ে এক অপার সৌন্দর্য। শেরাজ চোখ মেলে তাকায়। তার ঠোঁটের কোণে হাসি, চোখে দহনের আগুন। নিজেই নিজের সাথে বিড়বিড় করে বলে ওঠে।
“তোর এই সাজসজ্জা শুধুই আমার জন্য হবে মেহুল শুধুই আমার জন্য।”
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে। প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে চোখের সামনে ধরে—বিকাশ ফোন দিচ্ছে। কল রিসিভ করে কানে ফোন রেখে শেরাজ বলে, “হুম, বল।”
ওপাশ থেকে বিকাশের কণ্ঠ ভেসে আসে, “স্যার, কাজ কমপ্লিট।”
শেরাজ ঠোঁট বাকা করে এক তীক্ষ্ণ হাসি দিয়ে বলে, “গুড। আমি আসছি।”
—————
বদ্ধ ঘর। চারদিকে একধরনের স্যাতস্যাতে গন্ধ বিরাজ করছে। বাতাস ভারী, নেই কোনো প্রাণ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঘরের মাঝখানে পুরনো কাঠের একটা চেয়ারে বাঁধা আছে এক যুবক। তার পরনে লাল শেরওয়ানি। নিঃস্পন্দ দেহটা একটু একটু করে নাড়াচাড়া করতে শুরু করে—হাতের আঙুল নড়ে ওঠে, ফিরতে থাকে তার জ্ঞান। মিটিমিটি চোখে তাকায় চারপাশে। ক্লান্ত চোখে পুরো ঘরটায় নজর বুলায়। দিনের আলো বাইরে থাকলেও এই ঘরের ভেতরে আলোর প্রতিফলন আসা যেন আলোর জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরে জানলা, দরজা বন্ধ থাকার কারণে। যুবকটি উঠে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু হাত-পা বাঁধা। নড়াচড়া করা কোনো উপায় নেই। মাথা ঝিমঝিম করছে। কোথায় আছে সে? এ কেমন অজানা, ভীতিকর জায়গা। ঘরে ছড়িয়ে থাকা গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠছে যকোনো সময় বমি করে দিতে পারে। যুবকটি গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।
“কে আছে এখানে? আমাকে কেন ধরে এনেছো এখানে? আমায় ছেড়ে দাও... আমার একটু পরেই বিয়ে! প্লিজ, আমায় যেতে দাও...। আমি কী ক্ষতি করেছি তোমাদের? আমায় যেতে দাও!”
·
·
·
চলবে..................................................................................