অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ১১৫ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প


—————
বর্তমান...
—————
          গুমোট এক স্তব্ধতা ইন্টারোগেশন রুমটাতে। সেইসঙ্গে স্তব্ধ তরুণ দুই অফিসার। রুদ্র থেমে গেছে। তমাল নিজের রুমালটা বের করে মুছে নিল নিজের মুখটা। প্রবল উত্তেজনায় ঘেমে গেছে সে। এইছেলে কী সিনেমার গল্পটল্প শোনাচ্ছে নাকি? বাস্তবে কখনও এমন হয়? হওয়া সম্ভব? ভেতরটা কেমন শিরশির করছে ওর। ঘোর লেগে যাচ্ছে অপরাধ জগতের এই অবিশ্বাস্য কাহিনী শুনে। তুহিন একটু সময় নিল। টেবিলের ওপর কনুই দুটো রেখে চেপে ধরল নিজের মুখ। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, 'আনবিলিভএবল!'

ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হাসল রুদ্র আমের। বলল না কিছু। মিনিটখানেক চুপ থাকল সবকিছু। অতঃপর পুনরায় সোজা হয়ে বসল তুহিন। নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে বলল, 'ঘটনাটা কত তারিখের ছিল বললে?'

রুদ্র বিকারহীনভাবে জানাল, ' ৪ জানুয়ারি, ২০২১।'

তমাল ভাবল, রুদ্রর খুনের এই তাণ্ডবলীলা শুরু হয়েছিল নয় তারিখ থেকে। তারমানে আর পাঁচদিন! মাত্র পাঁচদিন! ওর চিন্তায় ছেদ ঘটিয়ে তুহিন বলল, 'সত্যিটা জানার পরেও এই কারণেই তুমি মিস প্রিয়তাকে আমের ভিলায় থাকতে অ‍্যালাও করেছিলে। কারণ তোমার ইনফরমেশন দরকার ছিল। যেটা প্রিয়তার কথোপকথন শুনেই জানা সম্ভব ছিল।ঐকটাদিন ব্যবহার করেছিলে তুমি তাকে।'

রুদ্র চোখ তুলে তাকাল। ভ্রু উঁচু করে বলল, ' ব্যবহার? হুম, বলতেই পারেন। ছলনার জবাব শুধুমাত্র ছলনাই হয়।'

তমাল পুনরায় 'হা' করে তাকাল। বিস্ময় তুহিনের চোখেও। খানিকক্ষণ আগেও যে মেয়েটাকে ঘৃণা করার কথা বলাতে এই শক্তপোক্ত মানুষটার চোখজোড়াও ছলছল করছিল, সে এখন কত অনায়াসেই না বলছে ছলনার কথা। সত্যি রুদ্র আমের এক দুর্বোধ্য চরিত্র। দুর্বোধ্য এই লোকটাকে বোঝার কোন চেষ্টা আপাতত করল না তুহিন। নিজের কাজে মন দিল। ও কিছু বলার আগেই তমাল প্রশ্ন করল, 'যদি তাই হয় তবে সেই মুহূর্তে কেন প্রিয়তাকে সবকিছু জানিয়ে দিলে তুমি? তখনও একটা ডেলিভারি বাকি ছিল। হ্যাঁ এটা ঠিকযে খেলা ততক্ষণে পাল্টে গিয়েছিল। ব্লাকহোল আর ডার্কনাইট তখন অলমোস্ট শেষ। কিন্তু শেষ মুহুর্তেওতো খেলা বদলে যেতে পারতো।'

রুদ্র পুনরায় মৃদু হাসল, ' আপনি আমার দেওয়া কিছু ইনফরমেশন মিস করে গেছেন। পরবর্তী ডিলে একসঙ্গে দুটো দলের মাল আসার কথা ছিল। ভ্লক আর্মিক্স আর গোল্ডেন কস্ট আর্মস্ থেকে। দুটো দলের সঙ্গেই ইতিমধ্যে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল আমার। তাই ওখান থেকে আসা মালের কোন তথ্য জানার জন্যে আমার আর ঐ মাইক্রোফোনের প্রয়োজন ছিলোনা।'

কী অসম্ভব চিন্তাশক্তি এই লোকের! প্লানিং-প্লটিং ছাড়া যেন একপাও চলেনা এই যুবক! তুহিন বলল, ' কিন্তু সেই চুক্তি তুমি যে শর্তে করেছিলে তাযে কত ভয়ংকর তা জানো নিশ্চয়ই। মধ্যপ্রাচ্যে বেআইনি মাল ঢোকানো! তাও এরকম সব বর্ডার আর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল-লর্ডদের পাড় করে! এমন ভয়ংকর দুঃসাহস এদেশে শেষ কবে কোন ক্রিমিনাল দেখিয়েছিল জানা নেই আমার।'

রুদ্র ঠোঁটে সেই হাসি ধরে রেখেই বলল, 'ছিলেন আরও একজন। রাশেদ আমের! আমার বাবা। এরকম অনেক সুবিধা দিয়ে বিদেশি গ্রুপ থেকে আর্মস্ বাংলাদেশে ঢুকিয়েছিলেন উনি।'

তুহিন লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ' বুঝলাম। লকেটের সত্যিটা জানার পর ঠিক কী করলেন মিস প্রিয়তা?'

রুদ্র সাবলীলভাবে জবাব দিল, 'জানি না। সেই ঘটনার পর গোটা একটা দিন ওর মুখ দেখিনি আমি।'

' ঐ একদিনে কী হল?'

' হয়েছেতো অনেক কিছুই। কী কী বলব?'

' মিস প্রিয়তাকে আর আমের ভিলায় ফিরিয়ে আনোনি তুমি?'

রুদ্র হাসল, ' আমার ফিরিয়ে নেওয়া, না নেওয়ায় কী এসে যায়? ও কবে কার বাধ্য থেকেছে? ও এক দাবানল ছিল অফিসার। নিয়ন্ত্রণহীন, বিধ্বংসী, সেচ্ছাচারী এক দাবানল। যে নিজ ইচ্ছায় জ্বলে, নিজ ইচ্ছায় ছড়ায়, নিজ ইচ্ছাতেই একদিন নিভে যায়। চিরকালের মতো। যাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা স্বয়ং রুদ্র আমেরেরও ছিলোনা।'

তমাল উৎসাহি কন্ঠে বলল, 'তারমানে সে আমের ভিলায় এসেছিল?'

প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে গেল রুদ্র। বলল, 'ও নিজের বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। মীর্জা ম্যানশন।'

' কখন?'

' আমি যাওয়ার পর।'

ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলল তুহিন, ' আবার কোথায় গিয়েছিলে তুমি?'

রুদ্র পুনরায় তাকাল তুহিনের ঠিক চোখের দিকে। তীক্ষ্ম, গভীর চোখজোড়ায় অদ্ভুত রহস্যের খেলা। যে রহস্যের কিনারায় পৌঁছতে দিনরাত খাটতে হয়েছে তুহিন আহমেদকে। রুদ্র কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, 'খেলাটাতো সবে শুরু হয়েছিল অফিসার। ওটাতো ছিল প্রথম চাল। আরও অনেকগুলো চাল তখনও বাকি।'

—————
অতীত...
—————
          সকাল দশটা বাজে। এতক্ষণের ঘোর কুয়াশা কাটিয়ে অবশেষে মৃদু রোদের আলো প্রবেশ করেছে আমের ভিলায়। থাই গ্লাস ভেদ করে সে আলোটুকু পড়ল কুহুর শিশুসুলভ নিষ্পাপ মুখে। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। ঠিক সে মুহূর্তে অনেকটা দৌড়েই ঘরে এসে প্রবেশ করল নীরব। চোখেমুখে সুন্দর এক উচ্ছ্বলতা দেখা যাচ্ছে ছেলেটার। বহুদিন পর। ভীষণ উত্তেজিতও দেখাচ্ছে ওকে। কুহুকে দেখামাত্র সেই উচ্ছ্বল মুখটার উচ্ছ্বাস যেন আরও বাড়ল। রোদ আড়াল করে কুহুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল নীরব। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে বসল বিছানায়। ওর ছায়াটুকু রোদ থেকে আড়াল করে রেখেছে কুহুর মুখ। মুখটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নীরব। প্রায় সারারাত কেঁদেছে মেয়েটা। ঘুমিয়েছে সেই ভোররাতে। আজকাল প্রায়ই কাঁদে কুহু। চারপাশের এতো অস্বাভাবিকতা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা ও। পুরোনো সেই আমের ভিলা, সেই উচ্ছ্বাসের স্মৃতি ভীষণ পীড়া দেয় ওকে। সেইসঙ্গে পরপর এতোগুলো দুর্ঘটনা! শক্তপোক্ত মানুষদেরও অবসাদগ্রস্থ করে দিতে পারে। সেখানে কুহুতো একটা সরল বাচ্চা মেয়ে। যদিও আগের আমের ভিলা দেখেনি নীরব। ও যখন এসেছিল তখন আমের ভিলা বিধ্বস্ত, নিঃস্ব! প্রিয়তাকে কিছুতেই ওখানে ছেড়ে আসতে চায়নি কুহু। কিন্তু রুদ্রর জেদের কাছে টিকবে কে? ঘর পোড়া গরু নাকি সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়। কুহুর অবস্থাও তাই। হারাতে হারাতে হারানোর ভয় জেঁকে বসেছে মেয়েটার মনে। সামান্যতেই ভয়ে গুটিয়ে যায়। কাল সারারাত কুহুকে বুকে নিয়ে, মাথায় বুলিয়ে কেবল সান্ত্বনা দিয়ে গেছে নীরব। এছাড়া আর কিছুই করার নেই ওর। পাশে থেকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া এই পরিবারটার জন্যে আর কিছুই করতে পারেনি ও।
নীরব আলতো করে হাত বুলাল কুহুর মাথায়। নরম গলায় ডাকল। দু'বার ডাকতেই চোখ খুলল কুহু। ধীরেসুস্থে উঠে বসল। নীরবকে বেশ খুশি দেখতে পেল ও। তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করল, 'কী হয়েছে?'

নীরব চোখমুখের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেল। ঠোঁটের হাসি প্রশস্ত করে বলল, 'বাবা-মা এসেছে কুহু। ওনারা মেনে নিয়েছে আমাদের বিয়েটা!'

কুহু অবাক চোখে তাকিয়ে রইল নীরবের দিকে। এসময় হঠাৎ এমন খবর কোনভাবেই আশা করেনি ও। এ যেন ঘোর অন্ধকারে এক ছটাক আলো।

••••••••••

নাঈমুর রহমান এবং তার স্ত্রী আতিফা আসার সঙ্গেসঙ্গেই নাস্তার ব্যবস্থা শুরু করেছে জ্যোতি। তা হতে হতে তাদের সঙ্গে বসার ঘরে আলাপ করছিল জাফর আর উচ্ছ্বাস। রুদ্রর নামতে একটু দেরী হয়। ভেতরে ভেতরে তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকলেও বাহিরে তা প্রকাশ করেনা। সোফায় বসে গম্ভীর আওয়াজেই কুশল বিনিময় সেড়ে নেয়। নাস্তা টেবিলে সাজাতে সাজাতে কুহুকে নিয়ে নিচে নেমে আসে নীরব। কুহু দেখামাত্রই কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে নীরবের মা। আদর করে কপালে চুমু খেয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। নাঈমুরও এতোদিন পর মাথায় হাত দিয়ে আশির্বাদ করে নতুন পুত্রবধূকে। এসেই নীরবকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটির পর্ব ফুরিয়েছে শুরুতেই। ততক্ষণে উচ্ছ্বাসও গিয়ে নাজিফাকে নিয়ে আসে। নাজিফাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আতিফা। পরিবারে হঠাৎ নতুন সদস্য, তাও গর্ভবতী! তবে তখনই কিছু বলেনা। 
খাওয়াদাওয়া শেষে বসার ঘরে বসল আমের ভিলার সকলেই। সবাইকে চা সার্ভ করা হল। চা খেতে খেতে সকলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল নাঈমুর। জাফর আমেরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ভাইজান, রাশেদ ভাইজান আমাদের মাঝে নেই। তাই আপনাকেই বলি। আগে যাই-যা ঘটেছে তা আমাদের জন্যে আকস্মিক ছিল। তাই হিট অফ দ্য মোমেন্টে আমার স্ত্রী হয়তো অনেক কথা বলে ফেলেছে। আমিও বলেছি। অনেক কিছু হয়েছে এরপর তা হওয়া উচিৎ ছিলোনা। তারজন্যে ক্ষমা চাইছি আমরা।'

আতিফাও বললেন, ' জি! কিন্তু একটাই ছেলে আমাদের। একমাত্র সন্তানও। এটা ঠিকযে ওর ওপর আমরা রাগ করেছি, বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু দিনশেষেতো ও আমাদেরই ছেলে তাই না? কতদিন দূরে রাখব? ও যদি কুহুর সঙ্গেই ভালো থাকে, আর ওর সঙ্গেই থাকবে বলে ঠিক করে তাহলে আমরা আর কতটা জোর করতে পারি? তাই সবকিছু ভুলে আমরা চাই আমাদের ছেলে আর বউকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।'

রুদ্র চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে বলল, 'হঠাৎ?'

নাঈমুর বলল, ' ঐযে বলল, একটাই সন্তান আমাদের। নিজের ছেলেকে কতদিন দূরে রাখা যায়?'

জাফর মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ' এরচেয়ে ভালো কোন খবর এইমুহুর্তে আসলে হতে পারে না। শুধু একটা কথাই বলব, ছেলে নয় রত্ন জন্ম দিয়েছেন আপনারা। এ যুগে এসে এমন ছেলে আমি দেখিনি। এমন মনের, এমন চিন্তধারার ছেলেও এই পৃথিবীতে আছে তা ওকে না দেখলে আমি জানতাম না। আমি চাই নীরব-কুহুর স্বাভাবিক সুন্দর একটা সংসার হোক। তুই কী বলিস রুদ্র?'

রুদ্র সোজা হয়ে বসে, চায়ের কাপটা রাখল টি-টেবিলে। অতঃপর তাকাল এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব আর কুহুর দিকে। তারপর আবার নাইমুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল, ' ওরা দুজন এডাল্ট। নীরব যদি চায় কুহুকে নিয়ে এখন আপনাদের সঙ্গে চলে যেতে, এবং তাতে যদি কুহুরও সম্মতি থাকে, এক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই।'

সকলের দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল নীরব-কুহুর দিকে। নীরব খানিকটা হকচকিয়ে গেল। ওর মা মোলায়েম গলায় বলল, 'কীরে এখনো রেগে থাকবি? যাবিনা মায়ের সঙ্গে বাড়ি?'

নীরব নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল দু সেকেন্ড। চোখ ঘুরিয়ে কুহুর দিকে তাকাল। কুহুর চোখ তখন ছলছল করছে। ও নীরবের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। হাতের ইশারায় বলল, ' আপনি এখন যান। আপনারা না বললেও আমি জানি এখানে কিছু ঠিক নেই। সবটা ঠিক হয়ে গেলেই আমি চলে আসব আপনার কাছে।'

লম্বা একটা শ্বাস ফেলল নীরব। নিজের বাবামায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন তোমরা মেনে নেবে আমাদের। একটু দেরী হলেও আমার বিশ্বাসটাই জিতেছে। কিন্তু এইমুহূর্তে আমি বাড়ি ফিরতে পারবনা। যখন তোমরা আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে, এই পরিবারটা আপন করে নিয়েছিল আমায়। এমুহূর্তে অনেক বড় ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ওরা। নিজের পরিবারকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে আমি কুহুকে যেতে বলতে পারবনা। আর তারচেয়েও বড় কথা, এইমুহূর্তে ওদের ছেড়ে আমিও কোথাও যাবনা। তবে সবটা স্বাভাবিক হোক কুহুকে নিয়ে ফিরে যাব আমি। খুব তাড়াতাড়ি। তবে এখন না।'

নাইমুর এবং তার স্ত্রী চমকে উঠলেন ছেলের এহেন কথায়। কুহুও অবাক হয়ে তাকাল। জাফর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ' কিন্তু বাবা, এসব ঝামেলার মধ্যে থেকে কী করবে তুমি? তারচেয়ে বরং বাবা-মায়ের কথা শোন। বাড়ি যাও। আমরাতো আছিই।'

উচ্ছ্বাসও সায় দিয়ে বলল, ' কাকা ঠিকই বলছে। আমারও মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত।'

নীরব মলিন হেসে বলল, ' কেন? আমি ঘরজামাই আছি বলে খারাপ লাগছে আপনাদের?'

জ্যোতি চ বর্গীয় ধ্বনী করে মাথা নাড়ল, ' বিষয় সেটা নয় নীরব। দেখছোইতো বাড়ির অবস্থা এখন কী। এসময় কুহুরও একটা সুস্থ পরিবেশ দরকার।'

কুহু হাত ধরে নিজের দিকে ঘোরালো নীরবকে। ইশারা করে বোঝালো, ' আপনি এসব কেন বলছন? বাবা-মা কষ্ট পাবে। ওনাদেরতো অধিকার আছে নিজের সন্তানের সঙ্গে থাকার তাইনা? আপনি যান প্লিজ। আমি বলেছিতো আমি আসব।'

নীরব জ্যোতির দিকে তাকিয়ে হাসল, ' শুনলেতো তোমাদের বোনের কথা। ও যাবেনা। তাছাড়া এই পরিবার কী আমার না? এতোদিনেও তোমরা কেউ আমাকে এই পরিবারের সদস্য ভাবতে পারোনি? তা তোমরা নাই ভাবতে পারো। কিন্তু আমি ভেবেছি। এ অবস্থায় তোমাদের ছেড়ে আমি যাচ্ছিনা। দ্যাটস্ ফাইনাল।'

কুহু চোখভর্তি জল নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল স্বামীর দিকে। এমনও ছেলে হয়? এভাবেও নিজের অর্ধাঙ্গিনীর সবকিছুকে আপন করে নেওয়া যায়? যেখানে ও জানে নিজের বাবা-মাকে কতটা ভালোবাসে ছেলেটা। তাদের ছেড়ে থাকতে কতটা কষ্ট হয় ওর। নীরব কী দিয়ে তৈরী? এতক্ষণ কেবল শুনছিল রুদ্র আমের। এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ' ওদের জোর করার প্রয়োজন নেই। ওরা যখন চাইছেনা এখন যেতে তখন ওরা এখন এখানেই থাক। আমের ভিলায় ঘর কিংবা থাকার জায়গার অভাব পড়েনি।'

রুদ্রর ঘোষণায় থমথমে নীরবতা নেমে এলো ঘরটাতে। নাইমুর এবং তার স্ত্রীও উঠে দাঁড়াল। নাইমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'ছেলে-মেয়ে যখন চাইছেনা তখন আর কী করার? তোমার স্ত্রীকে দেখছিনা যে রুদ্র? কোথায় সে?'

রুদ্র কিছু বলল না। উচ্ছ্বাস এগিয়ে এসে বলল, 'বউমণি বাইরে আছে একটু।'

আতিফা আড়চোখে নাজিফার দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, 'আর উনি? উনি কে? তোমার স্ত্রী?'

উচ্ছ্বাস হাসল। মাথা নেড়ে বলল, ' স্ত্রী নয়, তবে হবে শীঘ্রই। অনেক কাহিনী, পরে কখনও বিস্তারিত শোনাব আন্টি।'

মুখভঙ্গি সঙ্গেসঙ্গে বদলে গেল তার। যেন খুবই জঘন্য কোন কথা শুনেছেন। চোখমুখ কুঁচকে তাকালেন নাজিফার দিকে। চোখ নামিয়ে ফেলল নাজিফা। আতিফার চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয়নি ওর। আসলে আতিফা এবং নাঈমুর ছেলে, ছেলের বউকে নিতে এসেছে ঠিকই। কিন্তু তাতে তাদের চিন্তাধারার যে আহামরি কোন পরিবর্তন ঘটেছে বিষয়টা তা নয়। কিন্তু একমাত্র সন্তানকে দূরে রেখে জীবন নির্বাহও সম্ভব হচ্ছিলো না তাদের পক্ষে। কাজেই, মেনে নিচ্ছেন সবটা। তারওপর দেখছেন এই নতুন কেলেঙ্কারি। কিন্তু কী আর করার! ছেলেই যখন এসবের মধ্যেই জড়াতে তখন তাদের হাত-পাতো বাঁধা। ছেলেতো ফেলে দেওয়া যায়না।

রুদ্র বলল, 'আপনারা তাহলে থাকুন। আমাদের একটা মিটিং আছে। ইমার্জেন্সি। বের হতেই হবে।'

জাফর বিনয়ের সঙ্গে বলল, 'আপনারা দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে যাবেন। জ্যোতি ব্যবস্থা করবে।'

নাইমুরও পাল্টা বিনয় দেখিয়ে বলল, 'না, না। তার কোন প্রয়োজন নেই। আমরাও বের হব এখন। ওরা যখন যাবেইনা তখন_'

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাইমুর। নাইমের মা ছলছলে চোখ নিয়ে নীরবের কাছে গেল। ছেলের গালে হাত রেখে কেঁদে ফেলল সে। বলল, ' তাড়াতাড়ি চলে আসিস বাবা।'

নীরব মৃদু হেসে মাকে জড়িয়ে ধরল। কুহুর গালে হাত রেখে স্নেহ প্রকাশ করল সে। অতঃপর বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে ওনারা বিদায় নিলেন আমের ভিলা থেকে। রুদ্র, জাফরও সেই সঙ্গে বেরিয়ে গেল। উচ্ছ্বাস নাজিফার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ভরসা দিল। তারপর নিজেও বেরিয়ে গেল রুদ্র আর জাফরের পেছন পেছন। কুহু ছুটে চলে গেল রুমে। এখন নিশ্চয়ই আবার কাঁদবে মেয়েটা। অগত্যা নীরবকে যেতে হল মেয়েটাকে সামলাতে। নাজিফাও বিষন্নমুখে তারজন্যে বরাদ্দকৃত রুমটাতে চলে গেল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়ল জ্যোতি। কবে ঠিক হবে সবকিছু? আদোও কী কোনদিন কিছু ঠিক হবে আর?

••••••••••

গুলশান-১, নিকেতন লিংকড রোড। আকাশটা নীল। রোদের নরম আলো ছড়িয়েছে চারপাশে। রাস্তার পাশের গাছগুলোর ঝড়া পাতা যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে ল্যামপোস্টের ওপর। সেখানেই অবস্থিত আমের ফাউন্ডেশনে আজ আবার মিটিং বসেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মিটিংটায় উপস্থিত আছে সোলার গ্রুপের কিছু সদস্য। ওইপনস্ গুলো ক্লাইটদের কাছে পৌঁছনোর প্রসেসিং নিয়ে আলোচনার জন্যেই আজকের এই জরুরি মিটিং। প্রত্যেককে এরিয়া ভাগ করে দিচ্ছে রুদ্র আমের। সবার প্রথমে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকাল রুদ্র। বলল, ' তুই আর রঞ্জু মিলে পাইকারিগুলো দেখ। তিনটে জায়গায় পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিরোধী দলের বিশাল একটি গ্রুপ কিন্তু বেশ ভালো মাত্রায় চেয়েছে। AK-ই প্রায় আশিটার ওপরে। 9mm, গ্রে*নে*ড, সবই।'

উচ্ছ্বাস কৌতূহলী হয়ে বলল, 'হঠাৎ এতো?'

জাফর বলল, ' নির্বাচন সামনে। শেষমুহূর্তে বড়সর অরাজকতা করে দেশের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারলে হবে?'

হেসে ফেলল উচ্ছ্বাস, ' ওদেরই কী দোষ দেব। শা-লার বর্তমান সরকারতো পাছায় কাঠালের আঠা লাগিয়ে গদিতে বসে আছে। মাঝেমাঝে আমারই ইচ্ছা হয় পাছার নিচে একটু সরিষার তেল মেখে দিয়ে আসি। যদিও আরেকটাও কম না। সবই এক শালা।'

রুদ্র ভ্রুকুটি করে বলল, ' ঐসব আমাদের হেডেক না। যা খুশি করুক।'

জাফর বলল, 'তবে মজার ব্যপার হলো বর্তমান সরকারের ছাত্র সংগঠন আমাদের কাছ থেকেই অস্ত্র নিচ্ছে।'

উচ্ছ্বাস বলল, 'লে কলা! দু-দলকেই ধরিয়ে দিয়ে আমরা ফাটাফাটি মুভি দেখব। ভারী মজা!

রুদ্র চোখ রাঙিয়ে তাকাল। তারপর বলল, ' সেটা আমরা জানি। ওরা জানবেনা। আমাদের কাজ শুধু বিজনেস। বাকিসব জাহান্নামে গেলেও দেখার কোন প্রয়োজন নেই আমাদের। যাই হোক, এই দুটো ক্লাইন্ট ছাড়াও মোহাম্মদপুরে একটা সন্ত্রাসী দল আছে ছোট। এই তিনটে একটা একটা করে সেড়ে ফেল।'

তারপর জাফর আমেরের দিকে তাকাল রুদ্র। বলল, 'তুমি সাব-ডিলারদের টা একটু দেখো। আমি লিস্ট দিয়ে দিচ্ছি।'

এরপর আরও কজনকে খুচরো ক্রেতাদের লিস্ট আর প্রসেস বুঝিয়ে দিয়ে মিটিংটা সেদিনের মতো শেষ করল রুদ্র আমের।

মিটিং শেষে আমের ফাউন্ডেশনেই দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেয় রুদ্র, উচ্ছ্বাস এবং জাফর আমের। খাওয়া শেষে জাফর চিন্তিত কন্ঠে বলল, 'প্রিয়তা মায়ের কাছে যাবিনা আজ আর তুই?'

খাবার শেষে মাত্রই একটু সিগারেট ধরিয়েছিল রুদ্র। জাফরের কথা কপালে কুঁচকে উঠল ওর। গম্ভীর গলায় বলল, 'নাহ্। কাল যাব।'

রুদ্রর খাপছাড়া জবাবে যারপরনাই অবাক হল জাফর, 'এভাবে একা থাকবে মেয়েটা?'

সিগারেটটা মুখে গুঁজে রুদ্র বলল, ' একা কোথায়? তাসলিমা আছে, জয় আছে। বাহিরে কড়া পাহারাও আছে।'

জাফর কন্ঠে অসন্তোষ নিয়ে বলল, 'মেয়েটাকে নিয়ে ইদানিং বেশি খামখেয়ালি করছিস না তুই? কিছু হয়ে গেলে?' 

হাসল রুদ্র। নাকভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ' ওর কিছুই হবেনা।'

জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শাল তুলে নিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রুদ্রর এহেন ব্যবহারে সে খুশি নয়। কিন্তু রুদ্র তাকিয়েও দেখল না সেদিকে। উচ্ছ্বাস হতাশ চোখে তাকাশ কেবল দুজনের দিকে। সত্যিটা না জানলে বোধহয় উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াও জাফরের মতো হবে। কিন্তু এখন কিছু বলার নেই ওর। ঠিক-বেঠিক, উচিৎ-অনুচিত সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে ইদানিং ওর। গায়ে শাল জড়াতে জড়াতে জাফর বলল, 'আমি তাহলে বের হই। মালগুলো প‍ৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে।'

জাফর বের হওয়ার পর রঞ্জুকে নিয়ে উচ্ছ্বাসও বেরিয়ে গেল। সবাই বেরিয়ে যেতেই ফাঁকা হয়ে গেল আমের ফাউন্ডেশনের এই কেবিনটা। চেয়ারে হেলান দিয়ে চারপাশে তাকাল রুদ্র। চোখ গেল রাশেদ আমেরের ফাঁকা চেয়ারে। আজকাল বাবাকে ভীষণ মনে পড়ে। ইচ্ছা হয় লোকটাকে আবার একবার দেখতে, তাকে ছুঁতে। আরেকটাবার তার গম্ভীর কন্ঠের আদেশ শুনতে। চারপাশে থম ধরিয়ে দেওয়া দৃঢ় চলন দেখতে। দীর্ঘশ্বাস চেপে ছোট্ট একটা ঢোক গিলল ও। দুর্বল হলে চলবে না। কোনভাবেই না।

ঠিক তখনই বেজে উঠল কেবিনে থাকা টেলিফোনটা। ভ্রুকুটি করে তাকাল রুদ্র। এসময় কে? হাত বাড়িয়ে তুলে নিল রিসিভার। কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল, 'কে বলছেন?'

'সম্রাট তাজওয়ার।'

সম্রাটের ক্রোধে চেপে আসা কন্ঠস্বর শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল রুদ্র। বলল, ' কী সৌভাগ্য! আমার বউয়ের এক্স আমার খোঁজ নিতে কল করছে! এমন নিদর্শন দেখা মুশকিল। সত্যিই ডিজিটাল বাংলাদশ!'

রাগে দাঁত পিষল সম্রাট। টেবিলে চাপড় মেরে বলল, 'খুব ফুর্তি মনে তাইনা? খুব? ভেবেছো জিতে গেছো?'

রুদ্র ঠোঁটে হাসি রেখেই বলল, 'ভেবে সময় নষ্ট করার লোক আমি নই। রুদ্র আমের হারেনা।'

চোখ বুজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল সম্রাট। ঠান্ডা গলায় বলল, 'আমার রাণী কোথায়?'

ঠোঁটের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল রুদ্রর। চোখের চাহনী শক্ত হয়ে উঠল। শীতল গলায় বলল, ' অন্যকারো রাণীর খোঁজ রাখিনা আমি।'

হুংকার দিয়ে উঠল সম্রাট, ' রুদ্র! প্রথম মাল ছিনতাই করেছো, হুসাইন আলীকে দিয়ে অস্ত্র বদলেছো, চট্টগ্রামে কন্টেইনার থেকে মাল চুরি করেছো। এই মুহূর্তে এসব কিছু নিয়ে ভাবছিনা আমি। দল, টাকা, লাভ-লস কিচ্ছু না। আমি শুধু জানতে চাই রাণী কোথায়? চুপচাপ বলে দাও। নয়তো_'

' নয়তো?' ভ্রু উঁচু করে পাল্টা প্রশ্ন করল রুদ্র।

রাগে চোখেমুখে যেন অন্ধকার দেখল সম্রাট। ফর্সা সুর্দশন মুখটা লাল হয়ে উঠল। হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরল সম্রাট। চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠেছে। রাগে জল বেরিয়ে আসবে। টিবিলে হাত রেখে ঝুঁকল রুদ্র, 'তোমাদের রাণী এখনো অবধি ঠিকই আছে। তাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। চিন্তা করলে করতে হবে ভিন্ন কিছু নিয়ে।'

মুখভঙ্গি বদলে গেল সম্রাটের। কপালে ভাজ পড়ল। রুদ্র বলছে, 'এইযে তোমাদের এতো বড় বড় দুটো ডেলিভারি বাঞ্চাল করতে সক্ষম হলাম। কীকরে? আর তুমি এটা নিশ্চিত আমিই হুসাইন আলীকে দিয়ে মাল বদলেছি? হতেও পারে আমি ছিনটাই করেছিলামই ডিফেক্টেড মাল। তার আগে মীর্জা চেইক করেছিল না? সে যাই হোক, একটা কথা ভুলে যেওনা সম্রাট। ডার্ক নাইট কী ছিল। তোমার কী মনে হয়? শুধুমাত্র মেয়ের জন্যে তোমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে! মেয়ে যদি এতোই প্রিয় হতো আমার বাড়িতে, আমার বউ করে পাঠানোর সাহস করতোনা। যেখানে সে জানে, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি আমার কাছে কী। যে নিজের মেয়েরই আপন না সে_'

বাক্যটা সম্পন্ন করল না রুদ্র। মৃদু হাসল। সম্রাট অস্থিরভাবে দু সেকেন্ড এদিক-ওদিক তাকালো। শক্ত গলায় বলল, ' ব্রেইনওয়াশ করতে চাইছো?'

রুদ্র হেসে ফেলল আবার, ' কিছুই ওয়াশ করছিনা আমি। নিজে থেকে কল করেছো, তাই শুধু বললাম।'

বলে রিসিভার নামিয়ে ফেলল রুদ্র। কেটে দিল লাইন।

••••••••••

মাগরিবের আজানের ধ্বনি সমাপ্ত হল মাত্রই। লালচে হয়ে উঠেছে আকাশ। প্রচণ্ড ঠান্ডা। ঘন্টা দুই মীর্জা ম্যানশনে ফিরে এসেছে শওকত মীর্জা। বসার ঘরের সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে সে। ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। কপালে চিন্তার ভাজ প্রগাঢ় হচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। শুরু থেকেই ওনার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। আন্ডারওয়ার্ল্ড ছাড়তে হবে তাতো সে জানতোই। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারতো এজন্যই এতো যত্ন নিয়ে ধীরে ধীরে সাজিয়েছে সে। ব্লাকহোলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যা-ই করছিল সেটাতো কেবল এবং কেবলমাত্র রুদ্র আমেরের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে। সোলার সিস্টেমকে নিঃশ্বেষ করে দিতে। সোলার সিস্টেমতো শেষই করে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু এই রুদ্র আমের। শুয়োরটার কৈ মাছের চেয়েও শক্ত জান। কী দিয়ে তৈরী কে জানে! ঠিক কোন না কোনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে যায়। মাঝখান থেকে এখন ফেঁসে গেছে সে। হয়ে যাওয়া ডিলগুলো সম্পন্ন হওয়ার আগ অবধি আন্ডারওয়ার্ল্ড ছাড়া সম্ভব না। এজগতে বিট্রেয়ালের সাজা ভয়ংকর। দেশে এসে খুঁজে খুঁজে মারবে, গোল্ডেন কস্ট আর ভ্লক আর্মিক্স। সে মুহূর্ত কল্পনা করলেও গলা শুকিয়ে আসে তার। বয়সের রেখা বৃদ্ধি পায় চেহারায়। এতোগুলো টাকা! মাল হাতে নেই। কীভাবে সবটা সামলাবে কোনভাবেই বুঝতে পারেনা। হঠাৎ সোজা হয়ে বসল শওকত। দুহাতে মুখে জমে আসা ঘামটা মুছে ফেলল। নিজের ফোনটা বের করে কল লাগাল বর্তমান হোম মিনিস্টার কাশেম হককে। প্রথম বেজে বেজে কেটে গেল। দ্বিতীয়বার কল করতেই ধরল কাশেম হক। বলল, ' কী ব্যপার? দ্বিতীয়বারও মালসব অপনেণ্ট হাতিয়ে নিয়েছে সেই গল্প শোনাতে কল করেছো?'

শওকত বলল, ' শুনলাম দেশে চলে এসেছেন। এই মুহূর্তে আপনার সাহায্য আমার দরকার।'

কাশেম বলল, 'আমিতো আগেই বলেছি। এবারও ব্যর্থ হলে আমার পক্ষে সম্ভব না।'

রাগে দাঁতে দাঁত পিষল শওকত, 'গিলে খাবনা আপনার টাকা। দিয়ে দেব। আপাতত দরকার।'

' বোকার মতো কথা বলোনা! অন্যসময় হলে ব্যবস্থা করা যেতো। কিন্তু নির্বাচনের আগে এটা কীভাবে দেই আমি? বুঝো ব্যপারটা!'

' পার্সোনাল একাউন্ট থেকে দিন।'

' পাগল হয়ে গেছো? ফাঁস হয়ে গেলে?'

বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে উঠল শওকতের, 'এতো বছরের সম্পর্ক আমাদের! সেই যৌবন কাল থেকে আমার ছোট ভাইয়ের মতো দেখেছি তোমাকে। ভুলে যেওনা তোমাকে হাতে করে গড়েছিলাম আমিই। আজ হোমমিনিস্টার হয়েছো বলে হ্যাডাম দেখাচ্ছো? যেখানে তোমার পজিশনের সম্মান করে আমি আপনি -আগ্গে করি তুমি আমার ছোট হওয়া সত্ত্বেও!'

লম্বা শ্বাস ফেলল কাশিম। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'মীর্জা মেনশনেই আছেন নাকি?'

' হ্যাঁ।'

' কাল আসছি আমি। সরাসরি ডিসকাশন হবে। দেখি কী করা যায়।'

ছোট্ট একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল শওকত। কিছুটা হলেও সাহায্য পাওয়া যাবে। এইমুহূর্তে এটাই অনেক। ততক্ষণে মিনিস্টার কাশেম কেটে দিয়েছে কল। ফোনটা পাশে রেখে একগ্লাস পানি গেল শওকত। আহ্! শান্তি! এতক্ষণ খেলে তা নামতোনা গলা দিয়ে। আবার সোফায় হেলান দিল শওকত মীর্জা। মাথা খানিকটা হালকা হওয়ায় আরামে চোখ বুঝল। কিন্তু আরামটা সইলটা বেশিক্ষণ। বিরক্তিকর আওয়াজে আবার বেজে উঠল ফোনটা। আননোন নাম্বার। মীর্জা ফোনটা রিসিভ করে অলস কন্ঠে বলল, ' হ্যালো?'

'ভালো আছেন শশুরমশাই?'

চমকে উঠল শওকত মীর্জা। চোখ বড়বড় হয়ে গেল। সোজা হয়ে বসল দ্রুত। নাম্বারটা চোখের সামনে ধরে পরীক্ষা করল একবার। থতমত খেয়ে কানে দিয়ে বলল, 'রুদ্র!'

রুদ্র ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলল, ' বাহ্। চিনে ফেলেছেন! এইনা হলে জামাইর প্রতি শশুরের টান!'

বিস্ময় ভুলে গম্ভীর হয়ে উঠল শওকত। গম্ভীর গলায় বলল, 'কী চাই?'

' আপনার প্রাণটা।' 

শীতল গলায় রুদ্রর কথাটা শুনে মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল শওকতের। রুদ্র বলল, ' সেটা পরে! আপাতত আপনাকে একটা খবর দিতে চাই।'

' খবর?'

' হ্যাঁ। আমার বিলাভড বউ এবং আপনার সুযোগ্য কন্যা আমি কাছে বহাল তবিয়তে আছে। কাল তাকে সসম্মানে মুক্ত করে দেওয়া হবে।'

বেশ খানিকটা অবাক হয়েছে শওকত। তবে কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বলল, ' এটা জানাতেই কল করেছো?'

রুদ্র সামনে থাকা পেপার ওয়েটে চোখ দিয়ে বলল, 'হ্যাঁ। সঙ্গে আমার একমাত্র শশুরের এমন ক্রাইসিসে একটা খবর নেওয়ারও প্রয়োজন মনে হল। আত্মীয় থাকে কেন?'

চোয়াল শক্ত করে ফেলল শওকত। কাঁচাপাকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে হাত বাড়িয়ে বলল, 'নিজেই সব ঘটিয়ে নাটক করছো?'

শওকতের কথায় হাসি পেল রুদ্রর। চুপ থাকল কিছুক্ষণ। অতঃপর পেপার ওয়েটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ' আপনি শিওর আমিই সব ঘটিয়েছি? আপনাদের এতো এতো গোপন ইনফরমেশন। আমার কাছে কীকরে এলো? আপনার মেয়ের ওপর এইটুকু ভরসাতো আছে আপনার যে এটা বিশ্বাস করবেন, ও কিছু ফাঁস করেনি। তাহলে? আর হুসাইন আলী এমুহূর্তে আমার মতো নিঃস্ব কারো কথা শুনলই বা কেন? আলীর ডেরা থেকে মাল নিয়ে এসেছিলোতো ব্লাক হোল, তাই না?'

শওকত ভ্রু কুঁচকে বলল, ' কী বলতে চাইছো?'

' কিছুইনা। মনে করালাম আরকি। এজগতেতো দল বদলাতে সময় লাগেনা। সবই স্বার্থ! সেটা আপনার চেয়ে ভালো কে জানে। দলের লোক, পার্টনার। কেউই কী ভরসাযোগ্য? এই যেমন ধরুন আপনার বসার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দুজন দেহরক্ষী_' 
শওকত ঝট করে তাকাল নিজের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার দুজন সুস্বাস্থ্যবান দেহরক্ষীর দিকে। রুদ্র বলে চলেছে, 'নিজের স্বার্থে ওরাও পল্টি মারতে পারে! হয়তো হঠাৎ করেই একসময় শ্যুট করে দিল? সাবধানে থাকবেন শশুরমশাই।'

কেটে গেল লাইন। শওকতের হালকা হওয়া মাথাটা আবার ভারী হয়ে উঠল, শুকিয়ে সরু হয়ে উঠতে শুরু করল গলা। সে লম্বা দেহরক্ষীদের বলল, ' এই তোমরা এখানে কী করো? যাও, বাইরে গিয়ে দাঁড়াও! যাও!'

থতমত খেয়ে কিছু বুঝতে না পেরেই দরজা বাইরে চলে গেল দুইজন। শওকত আবার হেলান দিল সোফায়। ভারী মাথাটায় হাত দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল নিজেকে।

••••••••••

হেসে নিজের চেয়ারে হেলান দিল রুদ্র। আয়েশি ভঙ্গিতে দুই হাত রাখল মাথার পেছনে। রাশেদ আমেরের বলে যাওয়া শেষ কথা আজও কানে বাজে ওর। "সব নিয়ম ভুলে যাও, ভুলে যাও সব নীতি। শুধু তিনটে শব্দ মাথায় রাখো। সংহার! সংহার! এবং সংহার!" মৃদু আওয়াজে শিস বাজানো শুরু করল। আওয়াজটা শুনলে যেকেউ শিউরে উঠবে। কী অদ্ভুত রহস্য আর ভয়াবহতা সেই সুরে।

          ইকবাল যাওয়ার পর থেকে সোলার সিস্টেমের হিসেব-নিকেষের ব্যপারটা দেখে জাফর আমের। আসা মাল, এবং তার ক্রয়মূল্য থেকে শুরু করে বিক্রিত মাল এবং তার বিক্রয়মূল্য এবং লাভের পরিমাণ সবটাই দেখে সে। আজও আমের ফাউন্ডেশনে বসে চোখে সেই হিসেবটাই দেখছে। চোখে চশমা, দৃষ্টি মোটা খাতাটায়। রুমের কর্ণারের এক টেবিলে বসে আছে উচ্ছ্বাস। পা দুটো টেবিলের ওপর তুলে দিয়ে কোলের ওপর ল্যাপটপ নিয়ে নিজের দায়িত্বে থাকা ক্লাইন্টদের রিপোর্ট দেখছে। দুজনেই কাজ করে চলেছে সকাল ন'টা থেকে।
দশটা বাজে দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করল রুদ্র আমের। পরনে কফি রঙের ফুল হাতা গেঞ্জি আর জিন্স। চুলগুলো এলোমেলো। এমন রূপ, একপলক দেখলে যে-কেউ দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য। নিজের বরাদ্দকৃত চেয়ায়টাতে বসতে বসতে রুদ্র বলল, 'রিপোর্ট রেডি?'

চোখ তুলল জাফর। ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'রেডি।'

বলে উঠে দাঁড়াল সে। গিয়ে বসল রুদ্রর টেবিলের চেয়ারে। উচ্ছ্বাসও ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। টেবিলটাতে এসে বসল। আপাতত এই কেবিনে আর কেউ নেই। রুদ্র একটা সিগারেট ধরাল। প্রথম টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, 'শুরু করো।'

জাফর খাতাটা রাখল টেবিলের ওপর। পৃষ্ঠার নির্দিষ্ট জায়গায় কলমের ইশারা করে বলতে শুরু করল, ' পাইকারি ক্লাইন্টদের মধ্যে বিরোধী দলের ঐ টিমটাকে গতরাতে মাল সাপ্লাই দিয়ে ফেলেছে উচ্ছ্বাস। আশিটা AK 130 ( Assualt Rifale, চাইনিজ ভার্স), তিনশ 9mm পিস্তল, বারোটা LGM, বিশ হাজার গোলাবারুদ আর দেড়শ সাইলেন্সার।'

উচ্ছ্বাস ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, 'ভালোই ঝামেলা পাকাবে বলে মনে হচ্ছে নির্বাচনের আগে।'

জাফর বলল, ' হ্যাঁ সে বোঝাই যাচ্ছে। যাই হোক, AK 130 ( Assualt Rifle, চাইনিজ ভার্স) পার পিসের মূল্য জিনারেলি আটশ মার্কিন ডলার। কিন্তু আমরা বিক্রি করেছি দেড় হাজার মার্কিন ডলার। আশিটার দাম পড়ে এক লাখ বিশ হাজার মার্কিন ডলার বা এক কোটি পয়তাল্লিশ লাখ একাত্তর হাজার দুইশ টাকা। 9mm পিস্তল এর কেনা দাম আড়াইশ মার্কিন ডলার কিন্তু বেঁচা হয়েছে চারশ পঞ্চাশ মার্কিন ডলার করে। সাড়ে তিনশটার দাম পড়ে এক লাখ সাতান্ন হাজার পাঁচশ মার্কিন ডলার বা এক কোটি একানব্বই লাখ চব্বিশ হাজার সাতশ পাঁচ, যাই বলিস। LGM এর কেনা দাম তিন হাজার পাঁচশ মার্কিন ডলার, বেঁচেছি ছয় হাজার পাঁচশ করে। বারোটার দাম দাঁড়ায় গিয়ে বাহাত্তর হাজার মার্কিন ডলার দাঁড়ায় মানে সাতাশি লাখ বিয়াল্লিশ হাজার সাতশ। গোলাবারুদ বিশ হাজার রাউন্ডের দাম এমনিতে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার, বেঁচেছি নয় হাজারে, মানে হল দশ লাখ তেরানব্বই হাজার। সাইলেন্সার পার পিস একশ মার্কিন ডলার, বেঁচেছি আড়াইশ করে। পঞ্চাশটার দাম বারো হাজার পাঁচশ মার্কিন ডলার মানে পনেরো লাখ সতেরো হাজার আটশ। মোট বিক্রি হয়েছে, চার কোটি পঞ্চাশ লাখ সাতান্ন হাজার দুইশ, যেখানে কেনা মূল্য হয় দুই কোটি সাতচল্লিশ লাখ দশ হাজার তিনশ। অর্থাৎ এই মালের টাকা শোধ করলেও আমাদের লাহয় প্রায় দুই কোটি!'

চোখেমুখে বিশেষ কোন অভিব্যক্তি নেই রুদ্রর। নির্বিকারভাবে বলল, 'টাকা রিসিভ হয়েছে।'

' সঙ্গে সঙ্গে।' উত্তর দিল উচ্ছ্বাস।

' সাব-ডিলার?'

জাফর বলল, 'দুই জায়গায় হয়েছে। মোহাম্মদপুরে একটা স*ন্ত্রাসী দল, বিশটা AK-130, পঞ্চাশটা 9mm, গো*লা*বা*রুদ পাঁচ হাজার নিয়েছে, সাইলেন্সার দশটা আর LGM আটটা নিয়েছে। বিক্রি হয়েছে এক কোটি তেতাল্লিশ লাখ চল্লিশ হাজারে। এমনিতে দাম ছিল, সত্তর লাখ পঞ্চাশ হাজার। এখানে লাভ আছে বাহাত্তর লাখ নব্বই হাজার। রামপুরার এক সিন্ডিকেট AK-130 নিয়েছে পনেরোটা, 9mm পয়ত্রিশটা, গোলাবারুদ ছয় হাজার, সাইলেন্সার আটটা আর LGM পাঁচটা নিয়েছে। বিক্রি করা হয়েছে এক কোটি আট লাভ আশি হাজারে, এমনিতে দাম আটচল্লিশ লাখ ছিষট্টি হাজার। এখানে লাভ আজে একান্ন লাখ বিয়াল্লিশ হাজার আটশ।'

একটু থেমে রুদ্রর দিকে তাকাল জাফর। সে নীরবে সিগারেট টানছে। চোখজোড়া বন্ধ। অর্থাৎ বলে যাও। জাফর বলল, 'খুচড়া বিক্রির হিসেব পোলাপান এখনো দেয়নি। কাল একেবারে দেবে। যাই হোক এইটুকুতেই সাড়ে তিন কোটির লাভে আছি আমরা। আর বাকি যা আছে তার হিসেব_'

' থাক এখন! ওগুলো আমি ফিরে এসে দেখব। ততক্ষণে বাকি মালগুলোও সাপ্লাই দিয়ে টাকা তুলে ফেলো।' বলতে বলতে সিগারেটটা অ‍্যাশট্রেতে ঠেসে রাখল রুদ্র।

উচ্ছ্বাস কপাল কুঁচকে বলল, ' ফিরে এসে? যাচ্ছিস কোথায়?'

রুদ্র নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল, ' ইন্ডিয়া!' 

উচ্ছ্বাস প্রশ্ন করল না কী কাজে। বলার হলে রুদ্র আগেই বলতো সেটা জানে ও। তাই চুপ থাকল। রুদ্র উঠল চলে যাওয়ার জন্যে। জাফর খাতাটা বন্ধ করতে করতে থমথমে গলায় বলল, ' আজকাল কিছুই ঠিকঠাক বলিস না দেখি।'

রুদ্র দাঁড়িয়ে গেল। গম্ভীর চোখে দেখল জাফরকে। জাফরের চোখ খাতায় আবদ্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুদ্র। এগিয়ে গেল জাফরের দিকে। মৃদু গলায় ডাকল, 'কাকা?'

চোখ তুলল জাফর। চশমাটা খুলে কৃত্রিম হাসি দিল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ' হ্যাঁ বল?'

' আমার কালকের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছো তাই না?'

রুদ্রর কথায় চোখ নিচু করল জাফর। একটু হাসল। তারপর চোখ তুলে বলল, ' বছরের পর বছর নিজের স্ত্রী, সন্তান সব ফেলে এখানে পড়ে আছি কেন জানিস? তোদের জন্যে। এতোকাল ভাইজানের জন্যে ছিলাম,আর এখন তোর জন্যে। ভাইজানের জন্যে জান দিতে পারতাম আমি, তোর জন্যেও পারি। যা খুশি কর, কিচ্ছু বলতে হবেনা আমাকে। শুধু একটাই কথা বলব, যা করবি সাবধানে। খুব সাবধানে। তুই আমাদের শেষ ভরসা।'

বলতে বলতে চোখদুটো ছলছল করে উঠল জাফরের। কেঁপে উঠল কন্ঠস্বর। রুদ্র মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। জাফর শক্ত করে দু বাহুতে চাপড় দিল। রুদ্র উচ্ছ্বাসের দিকে একপলক ফেলে আবার জাফরের দিকে তাকিয়ে বলল, ' এখন আর আমের ভিলায় ফিরব না আমি। কাজ সেড়ে সোজা এয়ারপোর্ট যাব।'

উচ্ছ্বাস একটু অবাক হয়ে বলল, ' এখই!'

'হু।'

' না মানে ভাবির সাথে একবার_'

শক্ত চোখে একবার উচ্ছ্বাসের দিকে তাকাল রুদ্র। অতঃপর কিছু না বলে টেবিল থেকে তুলে নিল নিজের জিপের চাবিটা। বেরিয়ে গেল আমের ফাউন্ডেশন থেকে। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস চাপল উচ্ছ্বাস। সব যদি ঠিক হয়েও যায়। সোলার সিস্টেম যদি আবার দাঁড়িয়েও যায়। তারপর? তারপর কী হবে? সম্পর্কের মাঝে তৈরী হওয়া এই ভয়ংকর জটিলতা কী আদোও কখনও শেষ হবে? আর কী কিছু স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব?

••••••••••

সূর্য তখন মাথার ওপর উঠতে শুরু করেছে। তবে পৌষের সূর্য তাই ছড়িয়ে দিচ্ছে নরম রোদ। আমের ফাউন্ডেশন থেকে জীপ ঘুরিয়ে সোজা বনানী যায় রুদ্র। গ্যারেজে জীপ পার্ক করে সোজা উঠে যায় নিজের ফ্ল্যাটে। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। গেইট খুলে ভেতরে ঢুকেই দেখতে পায়, জয় বসে আছে সোফায়। হেলান দিয়ে ফোন দেখছে। রুদ্রর আগমন টের পেয়েই দ্রুত ফোন রেখে উঠে দাঁড়ায় জয়, ' স্লামালাইকুম ভাই।'

বন্ধ দরজাটার দিকে একপলক তাকিয়ে রুদ্র বলল, 'কোন ঝামেলা করেছে?'

নিজেও একবার সেই রুমের দরজায় তাকাল জয়। তারপর বলল, 'না স্যার। কোন ঝামেলা করেনি। ইনফ্যাক্ট রুম থেকেও বের হয়নি। খাবার আর ঔষধটা দিয়ে আসলে সেটাই খেয়েছে শুধু। কোন কথা বলেনি।'

রুদ্র মনে মনে খানিকটা অবাক হল। ঝামেলা ছাড়া এই মেয়ে গোটা একটা দিন ছিল! এমনতো হওয়ার কথা নয়। মনে মনে আবার কী শয়তানি বুদ্ধি আঁটছে কে জানে? রুদ্র জয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ' তোমার এখানকার ডিউটি শেষ। আমের ফাউন্ডেশনে চলে যাও। আমি থাকছিনা, কাজে সাহায্য লাগবে ওদের।'

খানিকটা সংকোচ নিয়েই জয় বলল, 'কোথায় যাবেন স্যার?'

' ইন্ডিয়া যাচ্ছি।'

জয় আর কিছু বলল না। ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল প্রিয়তার রুমের দরজার দিকে। মনটা ভালো হচ্ছেনা কিছুতেই। রাণীর সঙ্গে প্রতারণা ও খুব শখে করেছে বিষয়টতো তা না। কিন্তু কী করবে? সবটাই নিয়তি। আফসোস হয় জয়ের, যদি সবকিছু অন্যরকম হতো। অতীতে ঘটা অঘটনগুলো না ঘটতো? হয়তো ভিন্নকিছু হতো আজ। একবুক বিষাদ আর আফসোস নিয়েই চলে গেল জয়। জয় যেতেই লম্বা শ্বাস নিল রুদ্র। পাশের রুমের আলমারি খুলে একটা কালো ব্যাগ বের করল। তারপর পা বাড়াল প্রিয়তাকে যে ঘরে রেখেছে সে ঘরের দিকে।
দরজাটা খুলে সবার আগে বিছানায় তাকাল রুদ্র। দেখল ওপাশ ফিরে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে প্রিয়তা। গায়ে এখনো সেই কালো টেন-টপটাই। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। দৃষ্টি বোধহয় জানালার বাইরে, অদূরে! ছোট করে কাটা চুলগুলো পরে আছে মুখের ওপর। বাইরে থেকে আসা শীতল হাওয়াই মেদু দুলছে তা। বুকের মধ্যে কেমন চাপ অনুভব হল রুদ্রর। ও জানে প্রিয়তা অসুস্থ। একসময় এই মেয়ের সামান্য অসুস্থতা তীব্র পীড়া দিতো ওকে। অথচ আজ ওরই দেওয়া আঘাতে মেয়েটা মুষড়ে পড়ে আছে বিছানায়। দুকদম এগিয়ে গিয়ে শপিং ব্যাগটা চেয়ারে রাখল রুদ্র। এরপর বিছানার কাছে গিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকল, 'প্রিয়তা?'

প্রিয়তা চোখ ঘুরিয়ে তাকাল রুদ্রর দিকে। দরজা খোলার সময়ই ও বুঝেছিল রুদ্র এসেছে। এঘরে অনুমতি না নিয়ে অন্যকেউ ঢুকবে না। তাছাড়াও এই পুরুষের উপস্থিতি অনেক দূর থেকেও অনুভব করতে পারে প্রিয়তা। রুদ্র দেখল অপূর্ব সুন্দর চোখদুটি কেমন ক্লান্ত। প্রিয়তা ধীরেসুস্থে উঠে বসল। কাঁধের ব্যথা কমেছে অনেকটাই। তবে শরীর দুর্বল। ও রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল, ' হঠাৎ মনে পড়ল আমায়?'

রুদ্র সে প্রশ্নের উত্তর দিলোনা। প্রিয়তা হাতের বাহু ধরে টেনে নামালো বিছানা থেকে। নিজের সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে সোজা ঘোষণা করল, ' এখন থেকে তুমি মুক্ত। যেখানে খুশি যেতে পারো তুমি। আমের ভিলা ছাড়া।'

প্রিয়তা চোখমুখে কোন ভাবান্তর দেখা গেলোনা। সে শুধু তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে। রুদ্র কালো ব্যাগটা থেকে প্রথমে বের করল প্রিয়তার সেই বেরেটা। প্রিয়তার হাতে সেটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ' সব ঠিকঠাক আছে। ধরেও দেখিনি আমি।'

এরপর বের করল একটা চাবি আর একটা ফোন। সেগুলোও প্রিয়তার হাতে দিয়ে বলল, 'তোমার বাইকের চাবি। বাইকটা নিচে গ্যারেজে রাখা আছে। গেলেই পাবে। আর ঐ শপিং ব্যাগে ড্রেস আছে। বের হওয়ার সময় পড়ে নিও।' 

প্রিয়তা একপলক তাকাল চেয়ারটার দিকে। রুদ্র বলে চলেছে, 'আর হ্যাঁ, এ'কদিন আমার বাড়ি আর আমার পরিবার থেকে দূরে থাকবে। ওদের গায়ে যদি একটা আচরও লাগে। আই স্যয়ার আ'ল কি*ল ইউ।'

প্রিয়তা চোখ নামিয়ে তাকাল হাতে থাকা জিনিস তিনটের দিকে। মৃদু হাসল। ধীরেসুস্থে রাখল টি-টেবিলে। রুদ্র ঘুরে চলে যাচ্ছিল। হাত ধরে ফেলল প্রিয়তা, 'কোথায় যাচ্ছেন?'

রুদ্র দাঁড়িয়ে গেলেও পেছন ঘুরল না। শক্ত কন্ঠে বলল, ' ইজ দ্যাট ইওর বিজনেস?'

প্রিয়তা নরম গলায় বলল, ' নো, দ্যাটস্ নট। এমনিই জানতে চাইলাম।'

প্রিয়তার এই নরম গলা, দুর্বল দৃষ্টি, ফ্যাকাশে মুখ কলিজা খামচে ধরছে রুদ্রর। যার এইটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারছেনা তাকে শাস্তি কীকরে দেবে ও? সেসময় আসলে মনকে কীভাবে শক্ত করবে রুদ্র। কথাটা চিন্তা করে পেছন ঘুরে প্রিয়তার দিকে তাকাল। অথচ ভেতরে বয়ে চলা ঝড়ের বিন্দুমাত্র প্রকাশ পেলোনা চেহারায়। প্রিয়তা এগিয়ে এলো। আলতো করে জড়িয়ে ধরল রুদ্রকে। চমৎকারভাবে মুখটা গুজল রুদ্রর বুকে। নাক টেনে লম্বা শ্বাস নিয়ে স্বামীর শরীরের ঘ্রাণ গায়ে মাখল মেয়েটা। শরীর কেঁপে উঠল রুদ্রর। শুকনো ঢোক গিলল। সব পাপ-পূণ্য, ন্যায়-অন্যায়, প্রতিশোধ ভুলে ইচ্ছে করল মেয়েটাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু নিজের অসম্ভব সংযম ক্ষমতা দেখাল রুদ্র। শক্ত হাতে প্রিয়তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, ' তোমার নাটক উপভোগ করার সময় নেই এখন আমার।'

রুদ্র ঘুরল। পেছন ফিরে তাকাল না আর একবারও। ঐ ফ্ল্যাটে আরও একবার প্রিয়তাকে একা ফেলে চলে গেল সে। প্রিয়তা অনেকটা সময় তাকিয়ে রইল সেদিকে। অতঃপর ধীরেসুস্থে গেল চেয়ারটার কাছে। নির্লিপ্তভাবে হাত গলিয়ে দিল প্যাকেটটার মধ্যে। বেরিয়ে এলো একটা নেভিব্লু ফুল স্লিভস টিশার্ট আর জিন্স। চাপা শ্বাস ফেলল প্রিয়তা। রুদ্রর কাছে প্রিয়তা এখন সত্যিই অবাস্তব। টি-টেবিল থেকে ফোনটা তুলে অন করল ও। সোজা কল করল তনুজার নাম্বারে। সঙ্গেসঙ্গেই রিসিভ করল তনুজা। ব্যস্ত কন্ঠে বলল, 'ম্যাম আপনি! ফাইনালি! আপনি ঠিক আছেন ম্যাম?'

প্রিয়তা যান্ত্রিক কন্ঠে বলল, ' আছি। আজ সন্ধ্যায় মীর্জা ম্যানশনে ফিরছি আমি। জানিয়ে দাও সবাইকে।'

আর কিছু বলা বা শোনার অপেক্ষা করল না প্রিয়তা। পুনরায় বন্ধ করে দিল ফোনটা। ধীর গতিতে গা এলিয়ে দিল বিছানায়। চোখজোড়া কেমন ঘোর নিয়ে বন্ধ করল। একটু ঘুমোবে ও এখন।

••••••••••

আসরের আজান দিয়েছে আধঘন্টা আগে। সূর্য পশ্চিমে হেলে ডুবতে যাওয়ার পথে। চট্টগ্রামের তাজওয়ারদের অফিসরুমে বসে আছে করিম তাজওয়ার। গতকাল রাতেই চট্টগ্রাম এসেছে সে আর সম্রাট। আজ সকালে অফিসে এসে থম মেরে বসে আছে। ক্লাইন্টদের প্রেশার তীব্র হচ্ছে। যেকোন সময় অবস্থা ভয়ংকর হবে। আগেপিছে কিছু ভাবতে পারছেনা সে। বর্তমান যা পরিস্থিতি তা থেকে মুক্তির কোন উপায় কোনভাবেই চোখে পড়ছেনা ওর। মনে হচ্ছে খুব সময় নিয়ে, পরিকল্পনামাফিক বেছানো কোন জালে আটকে গেছে তারা। যেখান থেকে মুক্তি প্রায় অসম্ভব। এ মুহূর্তে তার হাতে কোন পলিটিক্যল পাওয়ারও নেই, যার দ্বারা সে কিছু করতে পারবে। আছে শওকত মীর্জার কাজে। বর্তমান সরকারের খুব উচ্চাসনের লোকজনের সঙ্গে ভাব আছে তার। এখন সেই ভরসা। লম্বা করে হাই তুলল করিম। সামনেই বসে ঝিমছে সাজ্জাদ আর রকি। ভ্রু কোঁচকাল করিম। বিরক্ত হয়ে বলল, 'তোরা এখানে বসে ঝিমছিস কেন? যা বলারতো বলেছি। ঢাকার খবর রাখতে থাক। এখন যা।'

একে অপরের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল ওরা দুজন। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলেই করিম বলল, 'রুমে এককাপ চা পাঠিয়ে দিস।'

করিম বাক্যটা শেষ করতে করতেই রুমৃ প্রবেশ করল সম্রাট। রাগে ফুঁসছে। ভেতরে ঢুকে চোখ গরম করে তাকাল সাজ্জাদ আর রকির দিকে। দুজনেই মানে মানে কেটে পড়ল। সম্রাট গিয়ে বসল একটা চেয়ায়ে। সজোরে টেবিলে একটা চাপড় মেরে বলল, 'এখন চা গিলবে তুমি?'

করিম বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, ' তো কী করব? তোমার মতো সারারাত বসে মদ গিলব?'

সম্রাট দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'তুমি বুঝতে পারছো অবস্থা ঠিক কতটা গুরুতর?'

' পারছি। পারলে তুমিও একটু রাণী নাম যপ করা ছাড়ো, তাহলে তুমিও বুঝবে।'

রাগ বাড়ল সম্রাটের। পেপার ওয়েটটা হাতে তুলে ছুড়ে মারল একদিকে। করিম তাজওয়ার বিরক্ত হলেন। ধমকে উঠে বললেন, 'কী সমস্যা? ঐ মেয়ের খোঁজতো পাওয়া গেছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবে বলেছে শুনলাম।'

ফোঁসফোঁস করতে করতে সম্রাট বলল, ' একটাবার কল অবধি করল না আমায়। ফোনটা অবধি অফ করে রেখেছে! ওর ফিয়ন্সে আমি বলবে কেউ? বিন্দুমাত্র লাভ, রেসপেক্ট নেই!'

এবার একটু ঠান্ডা হল করিম। অবস্থা বেগতিক। মাথা গরম করে এই মুহূর্তে ছেলেকে চটিয়ে দেওয়ার মানে নেই। এখন ঠান্ডা মাথায় আরও অনেক কাজ করতে হবে। তাজওয়ার নরম গলায় বলল, ' মাথা ঠান্ডা করো। ঢাকাতো যাচ্ছিই আবার। তখন দেখা করো ওর সাথে। এখন কাজের বিষয় ভাব।'

সম্রাট ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার নিয়ে দ্রুত হাতে জ্বালাল একটা। পায়ের ওপর পা তুলে ধীরে সুস্থে দুটো টান দিয়ে বলল, 'এখন আমাদের হাতে কিছু নেই। ক্ষমতায় যদি বর্তমান সরকার না থাকতো তাহলে কিছু হতো। কিন্তু আমাদের ভাব বলো আর সম্পর্ক বল সবটাই বিরোধী দলের সাথে। তিতা হলেও সত্যি যে এখন আমাদের মীর্জার ওপরই ভরসা রাখতে হবে। কিন্তু_'

' কিন্তু?' কপালে ভাজ পড়ল করিমের।

চেয়ার হেলান দিল সম্রাট। নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ' কিন্তু ডার্ক নাইটকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করতে পারছিনা আমি। চিন্তা করে দেখ, ভেতরের এতো গোপন তথ্য ঐ বাইনচোদ কী করে জানলো?'

করিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ' আমার কথাতো তোমার পছন্দ হবেনা। তোমার শখের রাণীর বিরুদ্ধে কথাতো হজম হয়না তোমার।'

সম্রাট সামান্য মাথা দুলিয়ে বলল, 'না বাবা! রাণী না। মীর্জা এতো সহজে কাউকে ভাগ দিতে রাজি হওয়ার কথা না। চিন্তা করে দেখো মাল চেকিং কিন্তু ওরাই করেছিল শুরুতে। ডাবল ক্রস করেনিতো? আমাদের পুরোপুরি অসহায় করে দিয়ে ওদের ওপর ডিপেন্ডেড করে ফেলতে? তারপর স্বার্থ হাসিল হলে আমাদের সরিয়ে ফেলার চিন্তা করলেও অবাক হবনা আমি। '

করিম চিন্তিত হয়ে বলল, ' সেটা ও পারবে। পলিটিক্যাল পাওয়ার পুরোটাই ওর হাতে।'

চোয়াল শক্ত করে ফেলল সম্রাট। ঝুঁকে সিগারেটটা অ‍্যাশট্রেতে চেপে ধরল। চোখে আগুন জ্বলছে ওর। ক্রোধে কেঁপে ওঠা কন্ঠে বলল, ' আমার সঙ্গে ডাবল ক্রস করা এতো সহজ না মীর্জা। এক কাজ করো। বর্তমান কাজটা ছাড়ো মীর্জার হাতেই। সাকসেসফুলি ডিল কম্প্লিট হওয়ার পরপরই ওদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।'

' কীভাবে?' করিমের চোখে কৌতূহল।
 
সম্রাট ক্রুর হেসে বলল, ' শওকত মীর্জার অপনেন্ট দলের যাদের সঙ্গেই তোমার আলাপ আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াও। মিটিং বসাও। আমিতো আছিই। এবারের নির্বাচনে সাহায্যের আশ্বাস দাও। যেসব এলাকায় ব্লাক হোলের প্রভাব আছে সেসব এলাকার বুত কন্ট্রোলিং করার প্রতিশ্রুতি দাও। ডিলের ঝামেলা মিটলেতো আমদের হাতে আ*র্মসও থাকবে। সেটার সাহায্যও পাবে ওরা। এরপর মীর্জাকে কীকরে পৃথিবী থেকে সরাতে হয় সেটা আমি দেখছি।'

করিম তাজওয়ার লম্বা শ্বাস ফেলল। চা চলে এসেছে তার। ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবল, আপাতত এরচেয়ে ভালো উপায় নেই। রাশেদ আর শওকতকে পৃথিবী থেকে সরানোর স্বাদ তার বহুদিনের। রাশেদকে ওপরে পাঠানোর বাসনা পূরণ হয়েছে। এবার বাকি শওকত মীর্জা।

••••••••••

সন্ধ্যা ছ'টা। মীর্জা ম্যানশনের বিশাল লোহার গেইটটা দৌড়ে গিয়ে খুলল দুজন প্রহরি। ভেতরে পরপর প্রবেশ করল সাদা রঙের তিনটে গাড়ি। গেইট থেকে বাংলো অবধি তৈরী হওয়া রাস্তাটা দিয়ে বাংলোর ঠিক সামনে গিয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে থামল গাড়ি তিনটে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শওকত মীর্জা, তার একমাত্র ছেলে শান মীর্জা আর ছোটভাই পলাশ। প্রথম গাড়ির ফন্ট ডোর খুলে বেরিয়ে এলো কালচে পোষাক পড়া এক লম্বা, চওড়া লোক। প্রায় দৌড়ে গিয়ে খুলল পেছনের দরজা। গাড়ি থেকে নেমে এলো কাশেম হক। দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। লোকটার বয়স পঞ্চাশ হবে। অথচ শরীর আর চেহারা দেখে কোনভাবেই তা অনুমান করা সম্ভব না। না জানলে সর্বোচ্চ চল্লিশ বলে অনুমান করতে পারবে কেউ কেউ। শরীরের পেশি, উচ্চতা আর চলনও তেমনই। বলিউড কোন তারকার মতোই যেন নিজেকে ধরে রেখেছে সে। গাড়ির দরজা খুলে বাকিরাও বেরিয়ে এলো। শওকত মীর্জা সহাস্যে এগিয়ে গেল কাশেমের দিকে। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'ওয়েলকাম ব্যাক টু মাই হাউজ মন্ত্রী সাহেব।'

কাশেম হাসল। হাসলে ডাল গালে দারুণ এক গর্ত তৈরী হয় তার। শান অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবল, এই লোকের বয়স বাড়ে নাকি কমে? জোয়ান কালেযে মারাত্মক প্লেবয় ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কাশেম হেসে বলল, 'বহুবছর পর এলাম তোমার এই বাড়িতে। ভালো লাগল মীর্জা ভাই।'

এগিয়ে এলো শান। সামান্য হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'নাইস টু মিট ইউ স্যার।'

ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল কাশেম। হাত মিলিয়ে বলল, 'তুমি শান না? বড় হয়ে গেছো দেখছি। যখন নিয়মিত যাতায়াত ছিল এ বাড়িতে তখন অনেক দেখেছি তোমাকে। পরে যখন এসেছি তখনতো তুমি ব্রিটেন ছিলে। তোমার মুখটা তোমার মায়ের মতোই সুন্দর।'

শান কেবল হাসল। এরপর পলাশ এসেও কুশল বিনিময় করল। শওকত বলল, ' ভেতরে চলুন। বাকি কথা বসে বলি?'

কাশেম হেসে বলল, ' এখন তুমি বলতে পারেন মীর্জি ভাই। আপাতত আমি মন্ত্রী নই।'

শওকত হাসল। কাশেমসহ তার এসিসটেন্ট আর প্রহরীকে নিয়ে প্রবেশ করশ মীর্জা ম্যানশনে।

••••••••••

বসার ঘরে ছোটখাটো একটা ভোজের আয়োজন করে ফেলেছে শওকত মীর্জা। কয়েক রকমের স্ন্যাকস, ফল, জুস্, ড্রিংক, চা-কফি সব। দেশের স্বনামধন্য এক মন্ত্রীর আপ্যায়ন বলে কথা। সার্ভেন্টদের ছোটাছুটি লেগে গেছে প্রায়। এতোসব ব্যবস্থা দেখে কাশেম বলল, 'ব্যস্ত হয়োনা শওকত ভাই। আমরা বরং কাজের কথা বলি। বেশি সময় নিয়ে আসিনি আমি।'

হাতের ইশারায় মেইডদের বসার ঘর ছাড়ার আদেশ দিল শওকত মীর্জা। সেখানে এখন কেবল শওকত, শান, পলাশ, কাশেম তার সহকারী এবং কাশের দেহরক্ষীগণ। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ' ফোনেতো প্রাথমিকভাবে সবটা বলেছিই তোমাকে। কী বিভৎস অবস্থা হয়েছে বুঝতেই পারছো?'

জুসের একটা গ্লাস তুলল কাশেম। ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে বলল, ' এক রুদ্র আমের আপনাদের এভাবে ঘোল খাওয়াচ্ছে? ইন্টারেস্টিং। তবে ওর বাপ যে ছিল রাশেদ আমের। সেও কম ছিলো না কিন্তু। কতবারযে কতরকম ফ্যাঁসাদে পড়েছি এই লোকের জন্যে। দে আর সামথিং এলস্!'

বিরক্ত হল শান। এই ব্যাটাকে আমেরদের প্রশংসা করতে ডাকা হয়েছে এখানে? শওকতের অবস্থাও তাই। তবুও গলায় মধু রেখেই বলল, ' এই মুহূর্তে ফিনানশিয়াল একটা হেল্প আমার দরকার। ভীষণভাবে।'

কপাল কোঁচকাল কাশেম। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল, ' হুমম সে দেখছি। তবে একটা বিষয় আগে বোঝাও, ব্লাক হোলের সঙ্গে মিলেছো ঠিক কোন দুঃখে? বিরোধী দল ক্ষমতায় যখন ছিল তখন তাদের সবচেয়ে বড় ব্যাক সাপোর্ট ছিল ঐ ব্লাক হোল। ওদের সামনে রেখেই ব্লাকহোল প্রভাববিস্তর করছিল। ওরা আমার জন্যে কতবড় হুমকি সেটা জানো? আমাদের সাপোর্টটা যেমন তোমার এই দল আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে সোলার সিস্টেম ছিল, তেমনই।'

শওকত বলল, ' সে আমি জানিনা ভেবেছো? কিন্তু সোলার সিস্টেম শেষ করার জন্যে এরচেয়ে ভালো উপায় ছিলোনা। মাথায় চড়ে বসেছিল আমেররা। কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না।'

কাশেম সোফায় হেলে পড়ে বলল, ' জানি। সোলার সিস্টেমের এই উত্থান আমাদের জন্যেও ঠিক ছিলোনা। মাঝেমাঝে সাহায্য পেলেও বেশিরভাগ সময় পথের কাঁটা হয়ে থাকতো। সামনের নির্বাচনের জন্যে তা একদমই ভালো ছিলোনা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের পাওয়ার ছাড়া পলিটিক্স কিছুই না, তাই আন্ডারওয়ার্ল্ড হাতে থাকা জরুরি। কিন্তু সোলার সিস্টেম ছিল সেচ্ছাচারী। হাতে আসছিল না। তাইতো ওদের বিনাশের জন্যে সবরকম সাহায্য করেছে আমাদের দল তোমাদের। নয়তো এতো সহজে সব হতোনা।'

শান মুখে বলল, ' তা ঠিক।' মনে মনে ভাবল রাণীর জাল পরিচয়পত্র তৈরী, অনাথআশ্রম ম্যানেজ করা, স্কুল-কলেজের ডকুমেন্ট ম্যানেজ করা, মীরার হ*ত্যাকে ধামাচাপা দেওয়া আরও অনেকরকমের গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য নেওয়া হয়েছিল সরকারি দল থেকে। ' কিন্তু এমুহুর্তে আপনার সাহায্য না হলেই নয়। বাবার ইলেকশন জেতাটা আপনার জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ তা আপনি জানেন।'

শওকত বলল, ' আর চিন্তার কিছু নেই কাশেম। একবার শুধু এসব ডিলের ঝামেলা মেটাই। সব ঠিক হোক। ঐ রুদ্র-উচ্ছ্বাস নামক যন্ত্রণা মিটুক। এরপর ব্লাকহোলকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে সময় লাগবেনা আমার।'

' আর আমিতো আছিই ধামাচাপা দিতে।' শব্দ করে হাসল কাশেম হক। 

ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে দৃঢ় পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল প্রিয়তা। বাইরে এতো গাড়ি দেখে শুরুতেই অবাক হয়েছিল ও। ভেতরে এতো লোক দেখে আরও অবাক হল। এগিয়ে আসতে আসতে চোখ বুলালো বসার ঘরের সোফায়। প্রথমে শওকত, এরপর শান, তারপর পলাশকে দেখতে পেল। কিন্তু কাশেমের দিকে চোখ পড়তেই পা থেমে গেল প্রিয়তার। স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হাতে ধরে রাখা হেলমেটটা পড়ে গেল নিচে। সেই শব্দে সকলেই তাকাল সেদিকে। শওকত উঠে দাঁড়াল। প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, ' অবশেষে এসেছো!'

শানও দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ' সেই সকালে খবর পাঠিয়েছিস। এতক্ষণ কোথায় ছিলি? ফোন বন্ধ কেন তোর?'

প্রিয়তার কানে যেন একটা শব্দও ঢুকল না। সে কেবল স্থির চোখে তাকিয়ে আছে কাশেম হকের দিকে। কাশেম হকের দৃষ্টিও প্রিয়তার দিকে স্থির। চোখে বিস্ময় কিন্তু ঠোঁটে সামান্য ক্রুর এক হাসি। কাশেম ধীর গতিতে উঠে দাঁড়াল। এক পা, এক পা করে এগিয়ে গেল প্রিয়তার দিকে। কাশেম যত এগিয়ে আসছে, ততই শক্ত হয়ে আসছে প্রিয়তার শরীর। নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। অথচ চোখদুটো স্থির হয়ে আছে লোকটার দিকেই। কাশেম ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল প্রিয়তার। চোখ এখনো বিস্ময় ছাড়েনি তার, নাতো ঠোঁটের সেই হাসি সরেছে। সে বিস্মিত চোখে একদম পা থেকে মাথা অবধি গভীর দৃষ্টিতে দেখল প্রিয়তাকে। প্রিয়তার শরীর শিরশির করে উঠল যেন। ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে শওকত আর শানও। কাশেম বিস্মিত কন্ঠে বলল, ' এটা তোমার সেই মেয়ে মীর্জা ভাই? কী যেন নাম.. হ্যাঁ প্রিয়তা।'

শান বলল, ' প্রিয়তা না। ওর নাম রাণী।'

প্রিয়তার দিকে চেয়ে থেকে হাসল কাশেম, ' হ্যাঁ জানি। কিন্তু মিতাতো প্রিয়তা আর প্রিয় বলে ডাকতো তাইনা? ঐ নামটা আমার বেশি পছন্দ হয়েছিল।'

শরীর খিচে এলো প্রিয়তার। নিঃশ্বাস গাঢ় হল। শওকতের বেশ সময় লাগল মিতা কে তা মনে করতে। মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস চাপল সে। কাশেম কুটিল হেসে একটা হাত রাখল প্রিয়তার গালে, ' বড় হয়ে গেছে। সেই ছোটবেলায় দেখতাম। এরপর দেখলাম সাত-আট বছর আগে। সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায় তাইনা?'

বলতে বলতে প্রিয়তার গাল থেকে নাম নামিয়ে কাঁধ পর্যন্ত আনল কাশেম। প্রিয়তার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে রইল কাশেমের দিকে। দাঁতেদাঁত পিষে হাতটা আস্তে করে নিয়ে গেল পেছনে রাখা বেরেটার ওপর। তারপর চোখ বুলালো চারপাশে। লম্বা, সুস্বাস্থ্যবান কয়েকজন বন্দুকধারী দাঁড়িয়ে আছে কাশেমের রক্ষার্থে। যদি ও এখন কাশেমকে শুট করে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা বন্দুকের গুলি ঝাঁঝড়া করে দেবে ওকে। কিন্তু! কাশেম এখন ওর একদম সামনে। একদম! এখান থেকে হেডশট করলে বাঁচার কোনরক কোন সম্ভাবনা নেই। মৃত্যু নিশ্চিত। এরপর? এরপর ওকে ঝাঁঝরা করে ফেললেও কিচ্ছু যায় আসেনা প্রিয়তার। বাঁচার আর কোন কারণ থাকেনা। রুদ্র ঠিক বাকিসব সামলে ঘুরে দাঁড়াবে। সফল হবে। বিশ্বাস আছে প্রিয়তার। এতবড় সুযোগ আর হাতছাড়া করবেনা ও। কাশেমের হাত এবার ঘাড় বেয়ে প্রিয়তার বাহুতে নামল। অনেকটা সুপ্ত ব্যঙ্গ করে বলল, ' সত্যিই মায়ের রূপ ছাড়িয়ে গেছে। আমাকে মনে আছে তোমার রাণী?'

প্রিয়তা দাঁত খিচে ফেলল। মনে মনে কাউন্ট-ডাউন শুরু করল ও। থ্রি, টু, ওয়া...! থামতে হল ওকে, যখন মনে পড়ল আজ ওর বেরেটা ফাঁকা। লোড করা নেই। নিজের ওপর, নিজের ভাগ্যের ওপর ভয়ংকর রাগ হল প্রিয়তার। এতোবড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল! আজকেই ফাঁকা হতে হল বেরেটাটা, আজকেই! গা ছেড়ে দিল ও। জেদে চোখে জল চলে এলো। কাশেম হাত নামিয়ে ফেলল। বেশিক্ষণ রাখলে সেটা চোখে পড়তো কটুভাবে। প্রিয়তা কাশেমের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে থেকেই বলল, 'আমি টায়ার্ড। রুমে যাচ্ছি।'

কথাটা বলে পাশ কাটিয়ে হনহনে পায়ে ওপরে উঠে এলো প্রিয়তা। ক্ষীপ্র পায়ে পৌঁছল নিজের রুমে। প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ করল দরজাটা। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেল ওয়াশরুমে। দরজাটা ধাক্কা দিয়ে লাগিয়ে একটানে খুলে ফেলল টিশার্টটা। এককোণে ছুড়ে ফেলল। ভেতরে শুধু ইনার পড়া। বেসিনের সামনে গিয়ে দুহাত রেখে ঝুঁকে পড়ল ও। নিচে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিল। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে। চমৎকার চোখজোড়া লাল হয়ে আছে, তিরতির করে কাঁপছে ঠোঁট। কাল ছাড়ল ও। হাতে পানি নিয়ে বারবার গাল থেকে হাতের বাহু অবধি ঘষতে শুরু করল। কিন্তু শান্তি পেলোনা। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডওয়াশটায় প্রেস করে একগাদা লিকুইড বের করল। তারপর ডলতে শুরু করল সেই গালে, কাঁধে, বাহুতে। আবার পানি দিল। একবার, দুবার, বারবার। অবশেষে হাঁপালো মেয়েটা। সজোরে একটা চিৎকার দিল। কষ্ট নয়, জগতসুন্দ দুচোখে তীব্র রাগ, ঘৃণা। 
ওয়াশরুমের দেয়াল ঘেষে ফ্লোরে বসে পড়ল ও। হাঁটু গুটিয়ে মাত্রাহীন দ ভঙ্গি করল। দুহাতে টেনে ধরল নিজের দুপাশের চুল। প্রচন্ড রাগে আরও এক একবার চিৎকার করল। মাথা তুলে ঠেকাল দেয়ালের সঙ্গে। চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়িয়ে নামল ওর। চোখের সামনে সাদাকালো সিনেমার মতো ভেসে উঠল নিজের ফেলে আসা জীবন। সেই জীবনের সেই বিষাক্ত কালো অধ্যায়।
.
.
.
চলবে........................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp