অভিমানিনী - পর্ব ১৬ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          আমার আর দিতিয়ার বিয়ের পর থেকে আমি প্রতিদিন ড্রিংক করে অনেক রাতে বাসায় ফিরতাম। হসপিটালে অনেক ভুল করতে লাগলাম, তাই চাকরি ছেড়ে দিলাম। অফুরন্ত সময়, সারাদিন যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যেতাম। রাত হলে কোনোদিন ফিরতাম কোনোদিন ফিরতাম না। আমাদের বিয়ের প্রায় ৩ মাস পরের ঘটনা…

সেদিন রাত ১টার সময় ড্রিংক করে বাসায় ফিরলাম। ফিরে দেখি দিতিয়া খাবার নিয়ে বসে আছে। আমি নিশ্চিত ও নিশ্চয়ই কারো কাছে শুনেছে যে মানসী এই কাজটা করত। হয়তো মা বলেছে কিংবা অনন্যা। আর মানসীও বলতে পারে ওকে বিশ্বাস নেই। আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি মানসী যা যা করত দিতিয়াও ইদানীং ঠিক তাই তাই করে। এসবের কোনো মানে হয়? মানসী হওয়া কি এতই সোজা!”

আমি না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। দিতিয়া এসে বলল,

“শুয়ে পড়লে যে? খাবে না?”

“নাহ।”

“কেন?”

আমি ওর দিকে ঘুরে বললাম,

“তোমার কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে?”

“না না তা কেন? আমি না খেয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

“আমি কখনো বলেছি আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকতে?”

ও কিছু বলল না, চুপ করে রইল। আমি বললাম,

“শোন দিতিয়া, আমি তোমাকে আগেও বলেছি আমার জন্য কখনো অপেক্ষা করবে না। আমি একটানা ৩/৪ দিন বাড়ি ফিরিনি এমন অনেক হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে, তখনো কি এভাবে ৩/৪ দিন না খেয়ে বসে থাকবে?”

দিতিয়া আর কিছু বলল না। একটু পর আমি বললাম,

“লাইটটা বন্ধ করে দাও চোখে লাগছে।”

ও লাইট বন্ধ করে দিল। আমি ঘুমানোর অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কোনো লাভ হলো না। বারবার মানসীর কথা মনে পড়তে লাগল। প্রতিদিন রাতে মেয়েটা কতই না আহ্লাদ করত! সারাদিন খুব বড়দের মতো ভাব করত। আর রাতে আমার কাছে এলে বাচ্চা হয়ে যেত। আমি একটু আদর করলেই গলে পড়ত। ওর সাথে সেসব মধুর মুহূর্তের কথা একটার পর একটা মনে পড়তে লাগল। আর তাই মানসীকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সেটা আর কোনোদিনও সম্ভব না ভাবতেই বুকের ভেতরটায় নিঃশ্বাস আটকে যেতে লাগল। পকেট খালি হয়ে যাওয়ায় সেদিন বেশি ড্রিংক করতে পারিনি অথচ অনেক বেশি ড্রিংক করা উচিত ছিল, যাতে কোনো চেতনাই না থাকে। তা তো হলোই না উল্টো চেতনা জাগ্রত হয়ে গেল!

অনেকক্ষণ পর উল্টো দিকে ফিরতেই আবছা আলোয় দেখলাম দিতিয়া দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। মেয়েটা ঘুমায়নি কেন এখনো? তারপর খেয়াল করলাম ও নীরবে কাঁদছে। উফ! বিরক্তির সীমা রইল না আমার। এতদিন যে ছিল সেও কাঁদত, আর এখন যে এসেছে সেও কাঁদছে। এত কাঁদে কীভাবে মেয়েরা? অসহ্য! পানির কল যেন চোখে লাগানোই থাকে। বেড সুইচ দিয়ে লাইট জ্বালালাম। চমকে উঠল দিতিয়া। আমি বললাম,

“কাঁদছ কেন?”

ও কোনো কথা বলল না। অন্যদিকে ফিরে চোখ মুছে নিল। আমি বললাম, “সমস্যা কি তোমার? কথার জবাব দাও না কেন?”

ও কী বলবে ভেবে পেল না। খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। কোনোরকমে বলল, “না কাঁদছি না, আমার ঘুম আসছিল না তাই এখানে বসেছিলাম।”

আমি হাত তুলে বললাম,

“একটা চড় মারব মিথ্যে বললে। এত কান্না আসে কোত্থেকে? সব বলেছিলাম না বিয়ের আগে? তাও তো লাফাতে লাফাতে বিয়ে করলে।”

ও কেঁপে উঠল। ভয়ের ছাপ ওর চেহারায় ফুটে উঠল। আমি হাত নামিয়ে নিলাম। তারপর বললাম,

“আমার ঘরে বসে ন্যাকা কান্না কাঁদলে চলবে না। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কাঁদো যাও।”

ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই রইল। আমার রাগ আরো বেড়ে গেল। বললাম,

“এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে। যাও বলছি।”

ও বলল,

“সরি।”

আমি ওর সরিকে পাত্তা না দিয়ে ওর বাহু ধরে ওকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর আবার লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলাম সব স্বাভাবিক। দিতিয়া যে সারারাত ঘরের বাইরে ছিল সেটা কি বাড়ির কেউ টের পায়নি? টের পেলেই বা আমার কি! কিন্তু আমার খারাপ লাগতে লাগল। দিতিয়ার তো কোনো দোষ নেই। মেয়েটার বাবা- মা ছিল না। চাচার বাড়িতে কত কষ্টই না করেছে। এখানে এসে নিজের বাবা-মার মতো বাবা-মা পেয়েছে বটে কিন্তু যার হাত ধরে এ বাড়িতে ঢুকেছে তাকেই পায়নি। আর কখনো পাবেও না। কিন্তু তা বলে কাল রাতের মতো এত অমানুষিক ব্যবহার করা উচিৎ হয়নি। আমি অন্যের রাগ ওর ওপর ঝেড়েছি, তাও খুব বিশ্রীভাবে। কাজটা খুব খারাপ হয়েছে।

বিকালবেলা আমি বের হব তাই রেডি হচ্ছিলাম। ও কী জন্য যেন ঘরে এল।

আমি বললাম,

“দিতিয়া শোনো…”

ও খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

“হ্যাঁ বলো।”

“কাল রাতের ব্যবহারের জন্য সরি।”

“তুমি ড্রাংক ছিলে, আমি কিছু মনে করিনি।”

“নাহ, কালই বরং আমি ড্রাংক ছিলাম না।

“আমি বুঝি তোমার কষ্টটা। বিশ্বাস করো আমি কিছু মনে করিনি।”

এই কথার পর আমার আরো লজ্জা লাগতে লাগল। আমি কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে এত খারাপ ব্যবহার করিনি। আর কাল কী করলাম! তাও এমন একজনের সাথে যে আমার সমস্যাগুলো বুঝতে পারে। আমি কিন্তু ওর সমস্যা বুঝতে পারিনি। হাস্যকর হলেও আরেকটা সত্যি কথা হলো আমি এরপরেও ওর সাথে আরো অনেক অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি, আর ও নির্বিকার ছিল।

কী লিখতে গিয়ে কী লিখছি! দিতিয়ার সাপোর্ট আর ত্যাগের কথা অন্য কোনোদিন লেখা যাবে। না লিখলেও তো হবে না। ও তো আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু আজ যে কথা লিখবো বলে ঠিক করেছি সেটাই লিখব।

দিতিয়াকে সরি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মা দরজায় দাঁড়িয়ে এক মহিলাকে বলছে,

“তুই এখন যা। আমি নিজে গিয়ে তোর সাথে দেখা করব, তখন তোরা যা বলবি সব শুনব…প্লিজ।”

ওই মহিলা বলছিল,

“না, আজকে আমি তোর কোনো কথাই শুনবো না। আজ আমি নীরবের সাথে দেখা করবই।”

আমি খুব অবাক হলাম। আমার সাথে দেখা করতে এসেছে উনি? কিন্তু আমি তো ওনাকে চিনিই না। মা বলল,

“প্লিজ, তোর সব কথাই তো আমি শুনেছি। তাহলে তুই কেন তোর কথা রাখছিস না? তুই চলে যা শ্যামা প্লিজ।”

মহিলা বলল,

“তোর বাসায় থাকার জন্য আমি আসিনি। কাজ শেষ করেই চলে যাব। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিস না কেন? এ কেমন ব্যবহার?”

এবার আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম,

“কী হচ্ছে এখানে? মা, উনি কে? আমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে, কী ব্যাপার?”

আমাকে দেখে মায়ের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মাকে ঠেলে মহিলা ভেতরে ঢুকে বলল,

“তোমার সাথে আমার একটু দরকার আছে। বাসার অন্যদেরও অবশ্য লাগবে। তুমি বাসার সবাইকে একটু ডাকবে?”

সেদিন শুক্রবার ছিল। বাবা অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে, তাছাড়া সবাই বাসায়ই ছিল। আমাকেও ডাকতে হলো না। উনি নিজেই ভেতরে ঢুকে সবাইকে ডেকে নিল। সবাইকে নিয়ে ড্রইংরুমে বসে বলল,

“আজ আমি তোমাদেরকে একটা গল্প বলব, আমার নিজের জীবনের গল্প!”
·
·
·
চলবে.........................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp