দাসরাজ্ঞী - পর্ব ০৯ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প


 "আপনার হুজুরকে বলবেন চিন্তা না করতে। আপনার হুজুর চাইলেও আমি মা হতে পারবো না"

কথাটা হুসনাত খুব স্বাভাবিকভাবে বললো। কণ্ঠস্বরে আফসোস অথবা দুঃখের কোনো লেশ নেই। যেন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। অথচ কথাটা শুনতেই হুদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে গেলো। তার শুভ্র মুখখানা শক্ত হয়ে গেলো। কিছুসময় নীরব চেয়ে রইলো সে। হুসনাত পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই হাত ধরে বসলো সে। এতোটাই শক্ত করে ধরলো যেন এখন ই হাতটা দুভাগ হয়ে যাবে। হুসনাত ভীত নয়নে তাকালো হুদের দিকে। হুদ শান্ত শিষ্ট মানুষ। কখনো উচ্চবাচ্য করতে দেখে নি তাকে। ফলে তার এমন কাঠিন্য হতবাক করলো হুসনাতকে। হুদ তার ভীত দৃষ্টিতে উপেক্ষা করে সন্দিহান স্বরে বললো,
 “তুমি ঔষধি খাও নি”
 “এই ঔষধি আমার জন্য প্রাণনাশক হতে পারে”

কাঁপা স্বরে উত্তর দিলো হুসনাত। হুদের সন্দেহ যেন তীব্র হলো। হিমকণ্ঠে শুধালো,
 “হুজুরের আদেশ”
 “আপনার আমার কথা বিশ্বাস না হলে, হাকেমের কাছে শুধাতে পারেন”

হুদ একটুও সহজ হল না। বরং পূর্বের ন্যায় কঠিন স্বরে বললো,
 “চল। এই ঠুংকো ব্যাপারে শেহজাদাকে আমি বিরক্ত করবো না। তবে মনে রেখো, মিথ্যে কথা বললে হুদের তলোয়ার তোমার গলায় চলবে”

হুদ ইরহান আলী শাহর একান্ত বিশ্বাসী দাস। তার আনুগত্য ইরহানের প্রতি দৃঢ়। অন্তত এই কয়দিনে সেটাই লক্ষ করেছে। নিষ্ঠুর মানুষের সহোচরও নির্দয় হবে। এটা পৃথিবীর নিয়ম। হুসনাত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। স্মিত স্বরে বললো,
 “চলুন”

—————

চিকিৎসালয়ের হাকেমকে ডেকে পাঠালো হুদ। সে হুসনাতের নানাপ্রকারের পরীক্ষা করলো। পরীক্ষার একপর্যায়ে শুধালো,
 “তোমার মাসিক শেষ কবে হয়েছিলো?”
 “চার মাস আগে”
 “সবসময়-ই এমন হয়?”
 “হ্যা”

হাকেম কিছু সময় তাকে পরীক্ষা করে শুধালো,
 “তুমি কি কোনো ঔষধ খেতে? বা কোনো হাকেম দেখিয়েছো?”
 “নাহ, আমি কোনো ঔষধ খাই নি। আমার আগের মনিব হাকেম ছিলেন। উনার বদৌলতে আমি চিকিৎসা করিয়েছিলাম, তখন এই কথাটা জানতে পারি”

হাকেম পরীক্ষা শেষ করলেন। তার মুখে সূক্ষ্ণ চিন্তা। বাহিরে হুদ অপেক্ষা করছে। তার সাথে হারেমের একটি খোজা ভৃত্য। হাকেম বের হয়ে সালাম দিলেন হুদকে। হুদ শুধালো, 
 “মেয়েটি কি সত্যি সত্যি মা হতে পারবে না?”
 “সম্ভবনা খুব ক্ষীণ, না এর কাছাকাছি। তার গর্ভ অনেক দূর্বল। এমনটা সাধারণত দীর্ঘকাল জন্মনিরোধক ঔষধি খেলে হয়। অথচ মেয়েটা বলছে সে কখনো সেগুলো খায় নি”
 “তাহলে?”
 “আমার চিকিৎসাজ্ঞান বলে তার আগের মনিবেরা তাকে মারধর করতো, যেকারণেও তার প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। আঘাত পেয়েছে হয়তো”
 “হয়তো?”
 “হয়ত বলছি কারণ আমি নিশ্চিত হতে পারছি না”

হুদ কিছুসময় চুপ থেকে শুধালো,
 “তাহলে কি তাকে জন্মনিরোধক দেওয়া উচিত হবে না?”
 “না দেওয়াই ভালো। আমাদের শরীরটা বিধাতা এমন ভাবেই বানিয়েছেন, নিজের ইচ্ছেমত কিছু করতে চাইলেই প্বার্শপ্রতিক্রিয়া হবেই” 
 “ওর কি সুস্থ হবার কোনো সম্ভাবনা আছে?”
 “আমার জ্ঞান অনুসারে নেই। তবে আপনি চাইলে আমি প্রচেষ্টা চালাতে পারি”
 
হুদ সাথে সাথেই বললো,
 “প্রয়োজন নেই। বরং এমন কোনো ঔষধি প্রস্তুত করুন যেন মেয়েটি কখনোই মা না হতে পারে”
 
হাকেম অসহায় ভাবে চাইলো। মায়া হল ভেতরে বসা পুতুলের মত মেয়েটার জন্য। তার নিষ্প্রাণ চাহনী মহিলার হৃদয়টা নরম করে দিল। ফলে সে হুদকে অনুরোধের স্বরে বললো,
 “এতোটা নিষ্ঠুর হবে না হুজুর”
 “এটা শেহজাদার হুকুম”

হাকেম আর কথা বাড়ানোর সাহস করলো না। শেহজাদা ইরহান আলী শাহ এর সরাসরি বিরোধিতা করার মূর্খতা এই নগরীর কেউ করবে না। ইরহান চাইলে সুলতানের তখতও দখল করার সামর্থ্য রাখে। হাকেমের প্রাণের মায়া আছে। তাই মাথা নত করে বললো,
 “জি হুজুর”

—————

হুসনাত নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে। চিকিৎসালয়ের বাহিরের বিশাল বৃক্ষের ডালে একটি পাখির বাসা। ছোট ছোট বাদামী রঙ্গের পাখি। মা পাখি তার দুই ছোট বাচ্চা পাখির মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। হুসনাত সেই দৃশ্যটা অপলক দৃষ্টিতে দেখছে। সে যখন বুঝতে পেরেছিলো সে কখনো মা হতে পারবে না, এক অব্যক্ত দমবন্ধ করা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরেছিলো। একজন নারীর মাতৃত্বই কি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নয়? তার কোলে একটি নবজীবন বেড়ে উঠবে—এটাই কি তার শ্রেষ্ঠ আনন্দদায়ক মুহূর্ত নয়? তাহলে সৃষ্টিকর্তা কেন হুসনাতের প্রতি এতোটা কঠোর? অতঃপর ভাবে, বিধাতা তার প্রতি কঠোর নয়। তার প্রতি সদয়। যার নিজের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, সে কি করে একটি প্রাণের জীবনের সুরক্ষা করতো? এগুলো ভেবেই নিজের অন্তস্থলের অপ্রাপ্তির কটু অনুভূতিটাকে দমিয়ে রাখে হুসনাত। পৃথিবীতে সবাই সবকিছু পায় না। বিধাতা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, এটাই যথেষ্ট। হুসনাত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে গেলো জলের রেখা। হাকেম তার কাছে এসে দাঁড়ালেন। মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
 “আল্লাহ চাইলে তুমিও মা হবে”

হুসনাত চোখ মেলে চাইলো। মৃদু হাসলো। তার চোখজোড়া এখনো অশ্রুসিক্ত। ভেতর থেকে কি যেন উতলে উঠছে! খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। 

!!১৪!!

কালো রজনী। অন্ধকারের তীব্রতাকে মশালের ক্ষীণ আলোও কমাতে পারছে না। প্রধান উজির আবদালীর কাছে আলাউদ্দিনের বার্তাবাহক এসে পৌঁছেছে। আলাউদ্দিন এসফাইন ছাড়ার পূর্বে তাকে উদ্দেশ্য করেই চিঠিটা লিখেছিলো। অবশেষে বার্তাবাহক প্রাণ বাঁচিয়ে তার কাছে এসেছে। এসফাইন এখন বিদ্রোহীদের দখলে। আবদালী চিঠিটা পড়ে কিছুসময় বসেছিলো। তার চোখে মুখে চাপা আনন্দ ফুটে উঠলো যেন। তারপর চিঠিটা মশালের আগুনে পুড়িয়ে ফেললো। ঠিক সেই সময়েই রক্ষী এসে জানালো,
 “হুজুর, সুলতানা মোলাকাত করতে চান আপনার সাথে”

আবদালী রক্ষীকে বললো,
 “আমি আগামীকাল দরবারের পর তার সাথে মোলাকাত করব”

রক্ষী মাথা নত করে চলে গেলো। আবদালী মনে মনে বললো,
 “আগামীকাল দরবারে ঝড় উঠবে”

—————

রুমেলিয়ার দাসী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে হুসনাত। রুমেলিয়া রাজ্যের সবচেয়ে প্রিয় শেহজাদী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হুসনাতকে প্রথম দেখেই বলল,
 “তুমি সেই দাসী যাকে আম্মা আমার জন্য নিযুক্ত করেছে?”
 “জ্বী, শেহজাদী”

রুমেলিয়া কিছুসময় তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার দৃষ্টি রুক্ষ্ণ নয়, বরং খুব শান্ত। আচার আচরণে অন্যরকম গাম্ভীর্য্য। রুমেলিয়া অন্য একজন দাসীকে বললো,
 “আমার সিন্দুক থেকে কিছু পুরাতন পোশাক ওকে দিয়ে দাও। এটা মেহমুদ সাম্রাজ্য। আমি চাই না আমার দাসীর পোশাক এতোটা দৃষ্টিকটু হোক”

হুসনাত দাঁড়িয়ে রইলো। তার মধ্যে খুব ভাবাবেগ দেখা দিল না। শেহজাদীর পোশাকগুলো খুব দামী। দাসী তার হাতে পোশাকগুলো দিতেই হুসনাত বিনয়ী স্বরে বললো,
 “শেহজাদী, পোশাকগুলো অনেক দামী। আমার মত তুচ্ছ মানুষের কাছে এই পোশাক “কাকের গায়ে ময়ূরের পালক” এর মত লাগবে”

রুমেলিয়া হুসনাতের দিকে কিছুসময় চেয়ে রইলো। তারপর বললো,
 “এটা আমার আদেশ। এখন আমার গোসলের পানি প্রস্তুত কর”

হুসনাত মাথা নত করে পোশাকগুলো নিয়ে প্রস্থান করলো। রুমেলিয়া তার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার দাসী আফিয়া শুধালো,
 “কি ভাবছেন শেহজাদী?”
 “কিছু না”

খুব আস্তে উত্তর দিল রুমেলিয়া। কিন্তু তার দৃষ্টি সরলো না। 

—————

অবশেষে ছুটি হলো হুসনাতের। শেহজাদী ঘুমিয়ে পরেছে। কাজের কারণে সে আয়েশার খোঁজ নিতে পারে নি। আয়েশা এখনো চিকিৎসালয়ে ভর্তি। তার জখম সারে নি। চিকিৎসালয়ে যতদিন থাকবে ততদিন শান্তি। উসমা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো,
 “এগুলো কিভাবে হয়েছে?”

আয়েশা ভয়ে উত্তর দেয় নি। বলেছে স্নানাগারে পড়ে গেছে। হামিদাকে এই হারেমের প্রায় দাসীরাই ভয় পায়। হুসনাতেরও উচিত ভয় পাওয়া। জীবন তার এমনিতেই দূর্বিষহ। আরোও দূর্বিষহ করার মানে হয় না। আয়েশা তখন খাচ্ছিলো। হুসনাত এসে বসতেই সে মৃদু হাসলো। প্রফুল্ল স্বরে বললো,
 “তুমি এসেছো?”
 “হ্যা, কেমন আছো?”
 “ভালো, আমাকে কাল অথচ পরশু ছেড়ে দিবে”
 “যাক, চিন্তামুক্ত হলাম। আমি অনেক আগেই আসতাম কিন্তু শেহজাদী না ঘুমানো অবধি আমি আসতে পারছিলাম না”
 “তুমি এখন শেহজাদীর দাস, আমার সাথে দেখা হবার সুযোগ আর নেই। আচ্ছা শেহজাদী কেমন গো?”

হুসনাত মৃদু হেসে বললো,
 “অনেক সুন্দরী আর গম্ভীর”
 “শুনেছি, শেহজাদী অনেক ভালো, উদার”
 “হ্যা, উদার বটেই আমাকে উনার পুরাতন পোশাক দিয়েছেন। তোমাকে দেখাবো। তুমিও চাইলে পরতে পারো”
 
হুসনাত এবং আয়েশার কথোপকথনের মধ্যেই এক রক্ষী এসে জানালো, 
 “শেহজাদা আপনাকে ডেকেছেন”

ছন্দপতন হলো আড্ডায়। আয়েশা হুসনাতের দিকে চাইলো। হুসনাত মলিন হাসলো। আয়েশা তার হাত ধরে বললো,
 “তুমি কি প্রতিরাতেই?”
 
হুসনাত উত্তর দিলো না। আয়েশা উত্তর না পেয়ে শুধালো,
 “শেহজাদা কি তোমাকে ভালোবাসে?”
 
হুসনাত নিষ্প্রভ স্বরে বললো,
 "যেখানে আমার জীবনেরই নিশ্চয়তা নেই; সেখানে প্রেম, ভালোবাসা শব্দগুলো কেবল বিলাসিতা লাগে"

আয়েশা আর কিছু শুধালো না। হুসনাত তার মুখে হাত দিয়ে আদুরে স্বরে বললো,
 “তুমি নিজের যত্ন নিও”

—————

রাজদরবার বসেছে। সুলতান মালেক শাহর মুখ থমথমে। আবদালী তাকে এসফাইনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত করেছে। আবু সাঈদ তখন বলে উঠলো,
 “জাহাপনা, এসফাইন আমাদের সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি সর্বদাই ইরহান ভাইজানের উপর অতিরিক্ত ভরসা করেন। তার দায়িত্ব ছিলো এই বিদ্রোহ আটকানো। আমাদের কোনো প্রতিনিধি সেখানে নেই। অনুমতি দিলে আমি যেতে চাই এসফাইনে। বিদ্রোহীরা নিজেদের স্বতন্ত্র ঘোষণা করার পূর্বেই আমাদের সেখানে দখল মজবুত করতে হবে”

মালেক শাহর মুখ গম্ভীর। এর মধ্যে উমার বললো,
 “আবুসাঈদের কথাকে অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়। আমাদের সৈন্য পাঠানো উচিত এসফাইনে”

মালেক শাহ সাথে সাথেই আদেশ দিলেন,
 “শেহজাদা ইরহানকে হাজির করা হোক”

কিছুক্ষণের মধ্যেই দেহরক্ষীরা ইরহানকে রাজদরবারে নিয়ে এল। ইরহানের মাঝে কোনো উদ্বেগ লক্ষ করা গেলো না। সে ছিলো নিস্পৃহ। সুলতানকে কুর্নিশ করে বললো,
 “জাহাপনা আমাকে ডেকেছেন”
 “তোমাকে বলেছিলাম, এসফাইন যদি মেহমুদ সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয় তবে তোমার মাথাও ধরে থাকবে না”
 
ইরহান মেকি বিনয় প্রকাশ করে বললো,
 “জী জাহাপনা, কিন্তু এসফাইন তো মেহমুদ সাম্রাজ্যের বহির্ভূত হয় নি”
 “তাহলে কি উজির মিথ্যা তথ্য দিয়েছে? আলাউদ্দিনকে বিদ্রোহীরা আক্রমণ করে নি? ফলে প্রাণ বাঁচাতে সে পালায় নি?”
 “না এটা সত্য”
 “তাহলে কোনটা মিথ্যে?”
 “মিথ্যে হলো এসফাইন বিদ্রোহীদের দখলে”
 “মানে?”

ইরহান এক দফা তাকালো আবদালীর দিকে। তার ঠোঁটে উন্মোচিত হলো হাসি; যে হাসিতে মিশেছিলো অহমিকা। ইরহান দরাজ কণ্ঠে বলল,
 “এসফাইনে বিদ্রোহ থেমে গেছে। সেখানের বর্তমানের দায়িত্ব আমার সহোচর বায়োজিদ বুঝে নিয়েছে। সৈনিকের বিদ্রোহ কখনোই মেহমুদ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ছিলোই না। উজির সাহেবের গুপ্তচর হয়তো বিষয়টা বুঝতে পারেন নি। এসফাইনে বিদ্রোহ ছিলো আলাউদ্দিনের উপর। সে নগরবাসি, ব্যবসায়ীদের থেকে চড়া শুল্ক আদায় করতো। বিগত দু বছর খরা চলেছে এসফাইনে। যেকারণে খাবারের স্বল্পতা, দূর্ভিক্ষও দেখা গেছে। সে আমাদের কোষাগার থেকে জনগনের কথা বলে মুদ্রসহযোগিতা নিয়েছে কিন্তু সেই ত্রাণ কখনো এসফাইনবাসী পায় নি। এসফাইন বাসীদের জীবনযাপন অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। উপর থেকে নিজেকেই সুলতান দাবি করা। সে নিজেই এসফাইনকে স্বতন্ত্র ঘোষণা করেছিলো। এই সব স্পর্ধার পর তার বাঁচার অধিকার থাকে না। তার অন্যায়, লোভ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিলো। তাই সৈন্যরা বিদ্রোহ করেছে। আলাউদ্দিনকে আমাদের সৈন্যরা যদিও ধরতে পারে নি। তবে তার কোষাগারের অর্থ নিয়ে সে পালাতে পারে নি। তার প্রাসাদ থেকে দশ লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। বায়োজিদ এখন সেই অর্থ এসফাইনের উন্নয়নে ব্যায় করছে। উজির সাহেবের বার্তাবাহক অনেক ধীর। এতো ধীর গতিসম্পন্ন হলে তো রাজধানীতে খবর পৌছানোর পূর্বেই সাম্রাজ্য ধ্বসে যাবে”

মীর বখসি তখন কিছু চিঠি নিয়ে হাজির হলো। মালেক শাহকে সালাম দিয়ে সে চিঠিগুলো তাকে পেশ করলো। চিঠিগুলো পড়তেই ইরহানের কথার সত্যতা যাচাই হয়ে গেলো। ফলে মালেক শাহ প্রসন্ন স্বরে বললো,
 “তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙ্গো নি ইরহান”

ইরহান বাঁকা হেসে বললো,
 “আমি আপনার বিশ্বাস কখনো ভাঙবো না জাহাপনা”

আবদালী এবং আবুসাঈদের মুখশ্রীতে মেঘ মেদুর জমলো। তারা ক্ষমা চাইলো ভূল তথ্যের জন্য। ইরহান দরবার থেকে বেরিয়ে খোঁচা দিয়ে বললো,
 “নানাজানের মনটা বুঝি খুব খারাপ। এখনই মন খারাপ করবেন না। অতিসত্ত্বর আপনার জন্য উপহার আসবে”

আবদালীর বুঝতে বাকি রইলো না এই বিদ্রোহ কোনো বিদ্রোহ নয়, বরং নিজের স্থান মজবুত করার একটা চাল ছিলো ইরহানের। আলীউদ্দিনকে স্থানচ্যুত করে আবদালীর ক্ষমতা কমানোই ছিলো উদ্দেশ্য। আবদালী খুব ক্ষীণ স্বরে বললো,
 “বেশি উড়ো না। মুখ থুবড়ে পড়বে। তোমার মায়ের মত অবস্থা তোমার না হয়!”

আবদালীর এমন কটুক্তিতে মীর বখসি সাথে সাথেই বলে উঠলো,
 “উজিরের মুখে এমন ভাষ্য বেমানান। ভুলে যাচ্ছেন, আপনি রাজ্যের শেহজাদার সাথে কথা বলছেন”
 “কাকের গায়ে ময়ুরের পালক লাগালেই সে ময়ূর হয় না, মীর বখসি”

বলেই প্রস্থান করলো আবদালী এবং আবু সাঈদ। ইরহান কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। হাত নিসপিস করছে। তলোয়ারটা এই বুড়োর স্বরনালীর মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারলে হয়তো শান্তি লাগতো। 

—————

উমার রাজ দরবার থেকে সরাসরি গ্রন্থাগারে গেলো। গ্রন্থাগার এমন একটা জায়গা যেখানে সে শান্তি খুঁজে পায়। এই রাজদরবার বড্ড কান্তি দায়ক। গ্রন্থাগারে সাধারণত কেউ আসে না। এখানে উমার নিজের মত সময় ব্যয় করে। বিশাল বইয়ের তাক থেকে একটা একটা মোটা বই বের করতেই একজোড়া চোখ নজরে পড়লো। সাথে সাথেই দরাজ স্বরে শুধালো,
 “কে এখানে?”

চোখের মালিক সাথে সাথেই লুকিয়ে পড়লো। উমার আরোও গম্ভীর স্বরে বললো,
 “লুকিয়ে লাভ নেই। বেরিয়ে এসো। এটা রাজ গ্রন্থাগার। আমি প্রহরী ডাকবো। বের হও”

ফলে বাধ্য হয়ে বেরিয়ে এলো চোখের মালিকটি। পরণে খুব সাধারণ পোশাক। মাথায় কাপড়। মেয়েটি কাঁপছে মৃদু। মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। উমার গম্ভীর স্বরে শুধালো,
 “কে তুমি? রাজ গ্রন্থাগারে প্রবেশ করার অনুমতি কে দিয়েছে তোমাকে?”

অপরুপ সুন্দরী কাঁপা স্বরে উত্তর দিলো,
 “আমার নাম হুসনাত”
·
·
·
চলবে....................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp