দাসরাজ্ঞী - পর্ব ১১ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প


“আমি আগে বলেছিলাম আমার বিশ্বাসঘাতক পছন্দ নয়”

বলেই নির্দয় ভাবে তলোয়ারখানা চালিয়ে দিলো। সাথে সাথেই ধরফরিয়ে উঠে বসলো হুসনাত। তার সমস্ত শরীর ঘামে জবজব করছে। কপালে ঘামের বিন্দুগুলো স্পষ্ট। গলা, ঘাড় ভিজে আছে। শরীর কাঁপছে। সেই সাথে হাত-পা শীতল হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না হুসনাত। তার মনে হচ্ছে কেউ ক্রুরভাবে তার গলা চেপে ধরে রেখেছে। এই প্রথম তার এতোটা ভয় লাগছে। তার পাশের বিছানাতেই আয়েশা শোয়া ছিলো। সেও গোঙ্গানির শব্দে উঠে বসলো। এখন রাত। মশালের আগুনের আঁচ কমে গেছে। খোঁজা প্রহরীদের দানবাকার ছায়া পড়ছে দেওয়ালে। হারেমের হল ঘরের মেঝেতে গণ বিছানা দাসীদের। হুসনাত এবং আয়েশার স্থানও এখানে। আয়েশা হুসনাত কম্পনরত শরীরখানা ধরে নিচু স্বরে শুধালো,
 “কি হয়েছে? তুমি ঠিক আছো তো?”

হুসনাত উত্তর দিতে পারলো না। সে এখনো নিজেকে সামলাতে পারে নি। ভয়ংকর স্বপ্নটি তাকে তাড়া করছে। মস্তিষ্ক থেকে এখন সেই স্বপ্নের প্রভাব মুছে ফেলতে পারে নি। বারবার নিজের গলা ছুঁইছে, দেখছে রাতে রক্ত কিনা। তার অস্থিরতার কারণ না জানলেও আয়েশা তাকে আগলে নিলো। শান্ত স্বরে বললো,
 “স্বপ্ন দেখেছো। খারাপ স্বপ্ন ছিলো হয়তো। এককাজ কর, দোয়া পড়ে বুকে ফু দাও”

হুসনাত কাঁপছে। বুকটা ধরফর করতেছে। গলা শুকিয়ে গেছে একেবারে। মনে হচ্ছে এখনই পানির তৃষ্ণায় বুকটা 
ফেঁটে যাবে। খুব কষ্টে বললো,
 “আয়েশা, আমাকে একটু পানি খাওয়াবে?”

আয়েশা উঠে পানি নিয়ে এলো। হুসনাত পানিটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করলো। নিজেকে শান্ত করলো। তার ঢেউ খেলানো চুলগুলো ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে। ঘামে ভিজে গেছে চুলগুলো। আয়েশা চুলগুলো ওড়না দিয়ে মুছে দিতে দিতে বললো,
 “খুব খারাপ স্বপ্ন দেখলে বুঝি?”

হুসনাত উত্তর দিলো না। তার চোখজোড়া টলমল করছে। কাঁপছে শরীর। আয়েশা তার পিঠে হালকা করে হাত বুলাতে লাগলো। হুসনাত কাঁদছে। বুকের ভেতর চাপা কষ্টগুলো যেন উতলে উঠছে। অথচ মেয়েটা সর্বদা নির্বিকার চিত্ত নিয়ে থাকে। তাকে হারেমের মেয়েরা উপহাস করলেও কিছু বলে না। হারেমের মেয়েরা নিজেদের আক্রোশ মিটায় নানাভাবে। অথচ হুসনাত থাকে নির্বিকার। মাঝে মাঝে মনে হয় হুসনাতের বুঝি অনুভূতিগুলো জড়ো। ওর মাঝে কেবল ভয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান। রাতটা বোধহয় অনেক ঘন, গভীর। হুসনাত নিঃশব্দে কাঁদছে। তাকে আগলে রেখেছে আয়েশা। কেবল কিছু দীর্ঘশ্বাসের উপস্থিতি। 

!!১৬!!

বাগানে্র লাল গোলাপগুলো নিজের অম্লান সৌন্দর্য্যে মোহিত করেছে মহলের এইদিকটা। গন্ধে ম ম করছে প্রকৃতি। রুমেলিয়া হাটছে বাগানে। এই বাগান তার প্রিয় জায়গা। তার পেছনে হুসনাতের সাথে আরেকজন দাসী। রুমেলিয়া কৃত্রিম ঝর্ণার পাশের বসার জায়গাটায় বসলো। তার সামনে কিছু খাবার পরিবেশন করলো দাসীরা। রুমেলিয়ার প্রিয় খাবার মিষ্টি। তার জন্য নতুন প্রজাতির মিষ্টি বানানো হয়েছে। গাজর দিয়ে আজকে একটা হালুয়ার মত কিছু একটা বানানো হয়েছে। শেহজাদীর ইচ্ছে সে গোলাপফুল দেখতে সে মিষ্টিটা খাবে। হুসনাত বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। তার চোখে মুখে ক্লান্তি। রুমেলিয়া তাকে শুধালো,
 “তুমি ঘুমাও নি?”
 
চমকে উঠলো হুসনাত। রুমেলিয়া উপহাস করে বললো,
 “এতো অন্যমনস্ক থাকলে আমাকে চিল তুলে নিলেও টের পারে না”
 “ক্ষমা করবেন শেহজাদী”
 “এই তোমাদের দাসীদের এক সমস্যা, কিছু বললেই ক্ষমা করবেন। এতো ক্ষমা চাও কি করে? মন থেকে চাও নাকি মুখের কথা?”

রুমেলিয়ার সাথে শাব্দিক তর্কের সামর্থ্য নেই হুসনাতের। রুমেলিয়া হাসলো। উপহাস নাকি তাচ্ছিল্য বুঝতে পারলো না। রুমেলিয়া বড্ড ব্যতিক্রমধর্মী নারী। তার বুদ্ধির ধার অনেক। সে বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না। তার প্রিয় কাজ চিত্রকর্ম এবং দাবা খেলা। প্রায় দাসীদের সে বলে উঠে, দাবা খেলবে। প্রয়োজনে তাদের দাবা খেলা শেখায়ও। রাজদরবারের খবর নিয়েও সে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু সে নারী। নারীদের কাজ কেবল হারেম সামলানো, বাচ্চা লালন পালন করা। সুলতানের হারেম সম্পর্কে খুব একটা আগ্রহ নেই রুমেলিয়ার। তার বিবাহ নিয়েও খুব একটা আগ্রহ নেই। রুমেলিয়ার মনে হয় তার জীবনটা অনর্থক। পৃথিবীকে দেওয়ার মত কিছুই নেই তার। যা আছে, যা এই পৃথিবী চায় না। রুমেলিয়া হুসনাতকে শুধালো,
 “তুমি দাবা খেলতে পারো?”
 “না শেহজাদী”
 “তোমরা এতো ম্যারম্যারে কেন বলোতো? কোনো মজাই নেই। আচ্ছা আমার বিনোদনের ব্যবস্থা কর। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে”
 “কেমন বিনোদন?”
 “কবিতা শোনাও, গান গাও। নয়তো কুস্তি কর। আচ্ছা বাদ দেও। আমি শেহজাদাদের অনুশীলনের স্থানে যাব”
 “কিন্তু সেখানে যাওয়া…”
 
রুমেলিয়া মৃদু স্বরে বলল,
 “জানি নিষিদ্ধ”

বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। তারপর হুসনাতকে শুধালো,
 “বায়োজিদ কি ফিরে এসেছে?”
 “আমি জানি না”
 “তুমি জানোটাই বা কি?”

রুমেলিয়ার মুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য ফুটে উঠলো। তখন গজগজ করতে করতে বাগানে উপস্থিত হলো তাবিয়ার দুই পুত্র। শেহজাদা আবু সাঈদ এবং শেহজাদা জালাল। শেহজাদা জালাল তাবিয়ার দ্বিতীয় পুত্র। সে আবু সাঈদের থেকে চার বছর ছোট। বোনকে দেখেই আবু সাঈদ প্রসন্ন স্বরে বললো,
 “কেমন আছো রুমেলিয়া?”

রুমেলিয়া এবং আবু সাঈদ পিঠাপিঠি। বয়সের খুব একটা পার্থক্য নেই। রুমেলিয়া মৃদু হেসে বললো,
 “আমি তো ভালো আছি ভাইজান। কিন্তু আপনি হয়তো ভালো নেই। নয়তো আমাকে খোঁজার কথা নয়”
 “আমি কি এতটাই স্বার্থপর?”
 
রুমেলিয়া হাসতে হাসতে বলল,
 “আমরা সবাই স্বার্থপর ভাইজান। বলুন আমার মতো সামান্য মানুষকে কেন খুঁজছিলেন?”

আবু সাঈদের মুখে অপ্রসন্নতা ফুটে উঠলো। রুমেলিয়া সেই অপ্রসন্নতা দেখে হাসলো। তারপর বললো,
 “রাগ করবেন না ভাইজান। মজা করছিলাম।”

বলেই নিজের দাসীদের যাবার ইশারা করলো। দাসীরা সরে গেলো। তারপর রুমেলিয়া বললো,
 “বলুন”
 “এসফাইন এখন ইরহানের দখলে। শুনেছো?”
 “শুনেছি। কিন্তু এখানে কারোর কিছু করার নেই। ইরহান ভাইজানের যুদ্ধনীতি সবচেয়ে ভিন্ন”
 “সবকিছু তার সাজানো পরিকল্পনা”
 
রুমেলিয়া হাসলো। তাচ্ছিল্যভরে বললো,
 “উমার ভাইজান ধৈর্য্যশীল, জ্ঞানী। ইরহান ভাইজান যুদ্ধনীতিতে পারদর্শী। সুলতান হবার জন্য দুটো গুণ সর্বাধিক প্রাধান্য। জ্ঞান, প্রজাবাৎসল্য নয়তো আধিপাত্য করার ক্ষমতা। সত্যি বলতে সুলতান হবার গুণ এই দুজনের মধ্যেই আছে”
 “আমি তোমার নিজের ভাই”
 “সেজন্যই উপদেশ দিব, শুধু আম্মার ছায়াতলে না দেখে নিজেকে প্রকাশ করেন। ইরহান ভাইজানের কাছে সৈন্যভার। এই সৈন্যভার নিজের করার চেষ্টা করুন। প্রজার মাঝে আপনার চাপ ভিন্ন। সেটা বদলান। উজিরদের সাথে নিজের সখ্যতা গড়ুন। ইরহান ভাইজানের সাথে শক্তির যুদ্ধে আপনি জিততে পারবেন না। আব্বা হুজুরের পছন্দের তালিকায় উঠুন। একটা দূর্গের ক্ষমতা যাওয়াতে কিছু হয় না। উমার ভাইজানদের পক্ষে আরবরা আছেন, এখন আফগান শেহজাদী বিয়ে করছেন। আপনার কাছে কেমন নানাজান। নানাজান বৃদ্ধ হয়েছেন। আব্বা হুজুর নিজের মর্জির মালিক, মনে রাখবেন সুলতানের কোনো ছেলে নেই, ভাই নেই, বাবা নেই। আব্বা হুজুর সেই নীতিতে বিশ্বাসী”
 
আবু সাঈদের কপালে চিন্তার বলিরেখা দেখা গেলো। সে চিন্তিত হয়ে পড়লো। রুমেলিয়া জানে এই ভাইটি খুব হঠকারী। তার দূরদর্শিতা গুন নেই। এই সাম্রাজ্যের পরবর্তী সুলতান হবার গুণ তার কোনো ভাইয়ের মধ্যে নেই। প্রতিটি ভাই বিলাশবহুল জীবনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তাদের নেশা মদিরা, বিলাশবহুল জীবন এবং নারী দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রুমেলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
 “এক কাজ করুন, আলাউদ্দিনকে খুঁজে বের করুন। সামনেই শিকার উৎসব। তারপর উমার ভাইজানের বিবাহ। আপনি শিকার উৎসবের পূর্বেই আলাউদ্দিনকে খুঁজে বের করুন। অন্তত আপনি যে সুলতান হবার যোগ্য সেই গুণ প্রমাণ করুন”
 “আলাউদ্দিনকে আমি কোথায় পাব?”
 “আপনি পাবেন না, কিন্তু নানাজান তার খোঁজ জানেন। উনি দিবেন না অবশ্য। কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত নিজের নিতে হয়”
 “আম্মা যদি রাগ করেন?”

আবু সাঈদের স্বরে উৎকুন্ঠা। রুমেলিয়া তাচ্ছিল্যভরে বললো,
 “সুলতানদের সিদ্ধান্ত নিজের নিতে হয় ভাইজান। আর হ্যা, আমার কিন্তু এইবার একটা বড় হরিণ চাই”

বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। আবু সাঈদ এখনো সেখানে বসে আছে। জালাল তার পাশেই বসে আছে। সে কাচুমাচু করে বললো,
 “আপা ঠিক বলছেন ভাইজান”

*****

মশালের তামাটে আলোয় ইরহানের ঘর উজ্জ্বল। ইরহান একটা চিঠিতে নিজের আংটির সিলমোহর দিয়ে হুদ কে বললো,
 “এটা দ্রুত বায়োজিদের কাছে পৌছে দেবার ব্যবস্থা কর”

এর মধ্যেই খোঁজা প্রহরী দরজায় কড়া নেড়ে বললো,
 “দাসী হুসনাত আপনার সাথে দেখা করতে চায় হুজুর”

ইরহান হুদকে ইশারা করতেই সে চিঠিটা লুকিয়ে ফেললো। হুসনাত এসেই কুর্নিশ করলো। ইরহান ধারালো চোখে তাকালো হুসনাতের দিকে। হুসনাতকে আজ রাতে ডাকে নি হুদ। বলে তার আগমণটা অনাকাঙ্খিত। ভরাট স্বরে শুধালো,
 “কিছু বলবে?”
 “হুজুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিলো”
 “বলো”
 “আজকে শেহজাদা আবু সাঈদ এসেছিলেন শেহজাদী রুমেলিয়ার কাছে। উপদেশ চাইতে। শেহজাদী তাকে উপদেশ দিয়েছেন যেন এসফাইনের প্রাদেশিক প্রধানকে খুঁজে বের করে। প্রধান উজির জানেন তার খোঁজ”

ইরহানের দৃষ্টির ধার আরোও প্রখর হলো। হুসনাত নিজ থেকে এই খবরটা তাকে জানিয়েছে ব্যপারটায় খুব অবাক হলো ইরহান। মেয়েটি তাকে সন্দেহের কোন অবকাশ রাখছে না। আবার অত্যধিক কারণ দিচ্ছে তাকে সন্দেহ করার। হুদ তাকে কিছু বলার চেষ্টা করলো। ইরহান তখন হুদের উদ্দেশ্যে বললো,
 “আজকে হুসনাত খুব মূল্যবান তথ্য দিয়েছে। সেইজন্য তাকে একটা বিশেষ উপহার দেওয়া হোক”

হুসনাতের গায়ে কাঁটা লাগলো ইরহানের কণ্ঠে। বুকের ভেতর অশনী কিছুর আভাস পেলো যেন। হুদ বাঁকা হেসে বললো,
 “চলুন হুসনাত খাতুন। আপনার জন্য বিশেষ উপহার আছে”
 
******

শেহজাদার মহলের সিঁড়ি ধরে পাতালঘরের কৃষ্ণ আঁধারে হুদের পেছন পেছন ধীর পায়ে হাটছে হুসনাত। তার বুকটা ধকধক করছে। রক্তের তীক্ষ্ণ গন্ধ নাকে আসছে। পেটটা আওড়াচ্ছে। কিন্তু শেহজাদার সিদ্ধান্তের অমতে যাওয়ার সাহস নেই। একটি ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করলো। নিগূঢ় আঁধারে কেবল মৃদু আর্তনাদ কানে আসছে। মশালটা জ্বালাতেই যখন তামাটে আলোতে উজ্জ্বল হলো ঘরটি, তখনি হুসনাতের মুখ থেকে মৃদু চিৎকার বেরিয়ে এলো। একটি অর্ধজীবন্ত মানুষ শেকলে বাঁধা। রক্তে স্নাত তার দেহ। হাত পায়ের মাংস ছিড়ে গেছে। হাড় দেখা যাচ্ছে। একটি চোখ নেই। সে কেবল নিঃশ্বাসটুকু নিচ্ছে যেন। পাজোড়া ইঁদুর কামড়াচ্ছে। মুখ খানা হা করা। সেখানে মাছিরা ভনভন করছে। দৃশ্যটা এতোটা বিভৎস। পেট মুছড়ে উঠলো হুসনাতের। সে মুখে হাত দিয়ে পালাতে উদ্ধত হতেই দুটো কৃষ্ণ হাত তাকে চেপে ধরে কানে ফিসফিসিয়ে বললো,
 “কোথায় পালাচ্ছো হুসনাত খাতুন? নিজের ভবিষ্যত দেখে কি ভয়ে পালাচ্ছো?”
·
·
·
চলবে.................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp