মৌনচন্দ্রা - পর্ব ০৭ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          রাত ন'টা বেজে ছ' মিনিট। হঠাৎ লোডশেডিং আর অকস্মাৎ ফোন তুলে আপনাকে ফিরতি চিঠি লিখতে বসে যাওয়া। আপাতত আমি বারান্দায় বসে আছি। পরনে কালো পাড়ের ছাঁইরঙা সুতির শাড়ি, খোলা চুলগুলো মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, পানিতে ভেজাচ্ছে মেঝে। একটু আগেই শাওয়ার নিয়ে শাড়িটা পরলাম। সপ্তাহে চার-পাঁচদিন শাড়ি পরা নিজের সাথে নিজের করা একটি অলিখিত চুক্তি। আমি মানতে বাধ্য। 

দূরের কোথাও থেকে আলোকচ্ছটা বারান্দায় একদম আমার কোলের ওপর এসে পড়ছে। কোলে সঞ্জীবনী বই, লেখক নবনীতা। সম্ভবত ওনার প্রথম বই এটা। মলাটে থাকা রহস্যময়ী এই মেয়েটিকে দেখে এত পছন্দ হলো বইমেলায়, না নিয়ে পারলাম না। তবে অনাগ্রহে আর পড়া হয়নি। গতকাল ঘুর্ণিঝড়ের সেই বিশ্রী তাণ্ডবে যখন সব অশান্ত, তখন পড়া শুরু করেছিলাম। রোমান্টিক ধাঁচের বই, মন্দ লাগছে না। গতকাল ৬৫ পৃষ্ঠা পড়ে রেখেছিলাম। বাকিটা কিছুক্ষণ আগেই বারান্দার লাইট জ্বালিয়ে এখানে বসে শুরু করলাম। অথচ ইলেক্ট্রিসিটির সাথে যেন আমার আজন্ম শত্রুতা! 

এরপর অন্য কোনো লাইটও আর জ্বালাইনি, পুরো ফ্ল্যাটে এক চিলতে আলোর উৎস আমি রাখিনি। দূর হতে যা আসছে, তাতে অন্ধকারের তীব্রতাটা অনুধাবন করা ছাড়া কিছুই যাচ্ছে না। এখন যদি হুট করে কোনো অশরীরী এসে আমার পাশে দাঁড়ায়, নেহাত মন্দ হয় না। মন্দ হতো যদি দেহের অভ্যন্তরে ভয়ডর কিঞ্চিৎ অবশিষ্ট থাকত। যেহেতু ভয় নেই, সম্ভবত বলে বসব,
-“জনাব/জনাবা অশরীরী? শরীর ছাড়া চলাফেরায় কেমন লাগে? আনন্দ লাগে, তাই না? যখন খুশি, যেখানে মর্জি চলে যাওয়া যায়। কেউ দেখবে না, কেউ জাজ করবে না। কাউকে ভালো লাগলে অদৃশ্যতায় তার সহায়তা করতে পারা যায়, মন্দলাগা এলে অনায়াসে দু-চারটে থাপ্পড় মেরে ভয় পাইয়ে দু-চারমাসের নামে জ্বরাক্রান্ত করে দিয়ে আসা যায়। কী বলো?”

অশরীরী ভড়কাবে না? সে যদি আমার জাতগত সম্বন্ধীলোক হয়, তবে সামান্যও বিচলিত হবে না। অজাত, কুজাত অথবা অপজাত হলে ভড়কাবে। আমার বাড়িতে এসে থাকতে হলে জাতগত সম্বন্ধী হওয়া লাগবে, নয়তো সম্বন্ধীর ছেলে অথবা মেয়ে। অমন অজাত, কুজাত, অপজাত রাখি না। সেই হিসেবে ভড়কাবে না। বরঞ্চ স্বাভাবিক গলায় বলবে,
-“ঠিক বলেছেন, পদ্ম। আনন্দ লাগে।”

আমি খুশিতে আহ্লাদিত হয়ে বলব,
-“চা খাবে? দু-কাপ চা বানিয়ে আনো। আমার আলসেমি লাগছে।”

“জো হুকুম মহারানী” টাইপের আজ্ঞাপালনসূচক বাক্য উচ্চারণ করে সে বিদায় নেবে। ঘটনাটা এমনই হওয়ার কথা। মেজবাহ, আমি ঠিক বলছি না? 

আপনাকে এখানে একটা বিষয় বলা লাগে। ও লাইনে নিজেকে কেন পদ্ম সম্বোধন করলাম। তাই তো? আমার আপা আমাকে পদ্ম ডাকে। শুরুতে সাধারণ সম্বোধন ভাবলেও, এরপর একদিন কৌতূহলবশত আপাকে জিজ্ঞেস করি,
-“পদ্ম? বেলি কেন নয়? শাপলা কেন নয়? শেফালী কেন নয়? মাধবীলতা, অলকানন্দা, দোলনচাঁপা, টগর, পারিজাত, নয়নতারা, রজনীগন্ধা, হাসনাহেনা, জুঁই, সন্ধ্যামালতী, চন্দ্রমূখী, করবী, অপরাজিতা...... কেন নয়?”

নানান ধরনের ফুলের নাম নিলাম। ফুলের নামে ফুল হিসেবে যদি আমাকে ডাকতেই হয়, তবে কেন শুধু পদ্ম? আপা আমার এত এত কথা শুনে প্রথমে বিরক্ত হলেও, পরে হাসতে শুরু করে। তারপর বলে,
-“তোর চোখ সুন্দর। এমন চোখকে পদ্মলোচন বলা হয় আর এমন চোখের মেয়েকে পদ্মলোচনা। তাই তোকে পদ্ম ডাকি।”

বড়ো বুঝদারের মতো মাথা নাড়লাম। তবে আপা একটা ভুল কথা বলেছে। আমার চোখ সুন্দর না, আমার চোখ বিষণ্ণ। আঁধারের বুকে চন্দ্র যেমন জ্বলজ্বল করা সুন্দর লাগে, বিষণ্ণতার সাগরে ভাসতে থাকা দুঃখকে ওরা পদ্মরূপে দেখে। আমি অস্বীকার করি না, দু-চোখ ভর্তি কালো কাজলে, আমি নিজেকে পদ্মলোচনা না ভাবলেও কুহকিনী ঠিকই ভেবে বসে থাকি।

আচ্ছা মেজবাহ, জীবনের ছন্দে সুর কেন থাকে না?”

—————

এইটুকু লিখতেই আপার ডাক এলো, সে পিছে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। আপা আমাকে আলগোছে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
-“কী আদুরে দেখাচ্ছে তোকে, পদ্ম!”
-“তাই না?”
-“হ্যাঁ।”

আপা হুট করেই এভাবে আমার রুমে কোনো কারণ ছাড়া আসে না। অহেতুক কোনো কারণ হলেও তা থাকে। আমি অহেতুক কারণটা শোনারই ইচ্ছে পোষণ করলাম,
-“তুমি বলো, কী হয়েছে।”

আমার প্রশ্নে আপা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। আমি মানুষের চোখ পড়তে পারি। তারা মিথ্যে বলছে কি না সত্য, ভয় পাচ্ছে নাকি দৃঢ়—বুঝতে পারি। আপাতক্রমে যা বুঝলাম, তাতে কারণটাকে অহেতুক বলাটা আমার দোষ হয়ে গেছে। আমার হাসি কমে এসেছে। আমি চোখে চোখ রেখে শান্তগলায় জিজ্ঞেস করলাম,
-“বাবা প্রসঙ্গ?”

আপা ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। আমার চাহনি আরও শক্ত হলো,
-“বলো।”
-“ওই সুরমা...”
-“কী?”

আপা আর বলল না। আমি নিজেই জিজ্ঞেস করলাম,
-“কী হয়েছে? বাচ্চা হয়েছে?”

আপা ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কোত্থেকে জানলি?”

আমি এ পর্যায়ে হেসে ফেললাম,
-“অনুমান আপা। ভাই হয়েছে না-কি বোন হয়েছে আমার?”
-“ছেলে।”
-“আলহামদুলিল্লাহ। বাবা উত্তরাধিকারী পেয়ে গেছে। কাল মিষ্টি এনো। সুখবরে মিষ্টি মুখ করা লাগে।”

বুকের ওপর কতটা যন্ত্রণা চাপিয়ে মানুষ এমন দূর্লভ হাসে, তার অনুমান আপা করতে পারল না সম্ভবত। আমিও বুঝতে দিলাম না।
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp