মৌনচন্দ্রা - পর্ব ০৮ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          আমি চিঠিটি সম্পূর্ণ করতে অর্ধপথ থেকেই আবার লিখতে লাগলাম,
ভেবেছিলাম আপনার চিঠি আসবে না। মনের ভেতর কেন যে এমন ভাবনা তৈরি হয়েছিল, আমার জানা নেই। আপনার পরে আরও কয়েকজন কলমবন্ধু হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে অবশ্য, তাদের চিঠিতে আগ্রহ পাইনি। তারা কেউ আপনার মতো করে বলেনি, জীবনটা খুবই ছোট..

আপনার চিঠির ফিরতি চিঠি লিখতে বসেছি অথচ ও চিঠির প্রশ্নগুলোর উত্তর সাজাইনি এখনও। এভাবেই লিখি। কী বলেন? আমি আপাতত বেশ এলোমেলো কথা বলছি, তাই না, মেজবাহ?
আপনি আমার বয়সে বেশ বড়ো, এভাবে ডাকা উচিত নয়। তবে নাম ধরে ডাকতে ভালো লাগছে আর নিজের ভালো লাগাকে সর্বোচ্চ প্রশ্রয় দিই আমি। এটাকে বেয়াদবি ভাবতে পারেন, কেননা আমি যথেষ্ট বেয়াদব ও উগ্র বটে।

এতক্ষণে লক্ষ করলাম, চিঠির শুরুতে না ছিল সম্বোধন, না ছিল সম্ভাষিত বাক্য। চিঠির জাত হলো? হলো তো। না হলে আবার শুরু করি? আমার এই অদ্ভুত পাগলামোতে আরেকটু হাসুন; স্বাস্থ্যের পক্ষে হাসি অত্যন্ত ভালো।

মেজবাহ,
ভালো আছেন? আমিও ভালো আছি। এদিকে প্রচণ্ড গরম ছিল, আপনাকে চিঠি লিখতে লিখতে আচমকা একটা শীতল বাতাস এমুখো করে আঁড়াআঁড়িভাবে বর্ষণ নামাল। আপাতত প্রকৃতি ঠান্ডা। আপনার ওদিকের অবস্থা বলুন।
আজ আর নয়, পরবর্তীতে আবার লিখব। ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন।
ইতি
আরাধ্যা 

হাহ্! হয়েছে? শেষ? ওকে, ফাইন! গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে এসে আবার চিঠিটা অর্ধপূর্ণ থেকে শুরু করা যাক।

একটা মজার বিষয় বলি। আপনার চিঠি পেয়ে আমি সবচেয়ে বেশি উল্লাসিত হয়েছিলাম গোটা এক স্ক্রিন সমান চিঠির আকৃতি দেখে। স্ক্রল করে দেখলাম এটা আরও বড়ো। এতটা বাচ্চামো স্বভাব চিঠির বেলাতে আমি প্রকাশ করি, ভাবতেই হাসি পায়। আমি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পড়িনি। আমার মনে হচ্ছিল, পড়লেই ফুরিয়ে যাবে। শব্দগুলো ফুরিয়ে গেলে আমি এরপর কী পড়ব? 

একটু পর পর ফোন রাখছিলাম, আবার গিয়ে দেখছিলাম। প্রথমে পড়লাম শেষের অংশ। শেষাংশে নয়, আরও আগেই হেসেছেন! ফট করে ফোনটা রাখলাম। এরপর আবার ধরলাম, "Finally I've found one of my own kind!" 
রেখে দিলাম। আবার পড়লাম। খণ্ড খণ্ড অংশ পড়লাম সারা দুপুর-বিকেল ভরে। শেষমেশ পুরোটা একত্রে পড়লাম। আপনি বেশ গুছিয়ে লিখতে জানেন, মেজবাহ।

জি, আরাধ্যা বানান একদম ঠিক লিখেছেন। ওরা অনেকে আমাকে সংক্ষেপে আরু ডাকে। আমার ভালো লাগে না। এত সুন্দর নাম আমার। কেন ছোট করা লাগবে? নামের ক্ষেত্রে আমিও খুঁতখুঁতে স্বভাবের। কারো নাম ভালো লাগলে, তার ব্যাপারে অসংখ্য ইতিবাচকতা চোখে পড়ে। হয়তো এদিক দিয়ে আমি একটু একপাক্ষিক আচরণ করি। কিন্তু আমি দোষ নেব না, আমার স্বভাবই এটা।

“উদ্যোগ বা সাহস করে কথা না বলে আজীবন মরমে মরার চাইতে বলে ফেলাই উচিত, তাই-না? নাকি যা কিছু আমার, তা শুধুই আমার হয়ে থাক হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে।”
দ্বিতীয় অপশনটা সুন্দর শোনাচ্ছে আমার জন্য। অনুভূতি অপ্রকাশিতই সুন্দর। প্রকাশ্যে এলে ভালো-খারাপ দুটো প্রভাব পড়ে। ইতিবাচক হলে আমার জন্য ভালো। যদি নেতিবাচক আসে? সে যন্ত্রণা অসহনীয়। এর চেয়ে থাক। যা কিছু আছে আমার, তা শুধুই আমার হয়ে থাক হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে।
 
জানেন, আমি মৃত্যুর সাথে খুব বাজে কিছু মুহূর্ত কাটিয়ে বাঁচবার শখ পুষেছি মনে, কীভাবে অন্য পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে আবারও এই জীবনটাকে দান করে দিই? প্রেম জিনিসটা আর হবে না। তবে সংসার হবে, দায়িত্ববোধ, সম্মান, আস্থা ও বিশ্বস্ততাকে ভিত্তি বানিয়ে আমার একটা সংসার হবে। আমি জানি, আমার ভাগ্যে স্রষ্টা একজন দারুণ মানুষ রেখেছেন।

আপনাকে একটা তথ্য দিই। এই বছর ২ আগেও আমি রাত জাগতে পারতাম না। সারাদিন মরার মতো ঘুমাতাম রাতটা জাগার জন্য। বসে বসে কফি গিলতে থাকতাম তেঁতোটা। পানি একটু পর পর মুখে ঝাপটাতাম! ইয়া আল্লাহ! রাত জাগার জন্য কত কী করতাম, অথচ পারতাম না। মনে হচ্ছে তখনকার সব দোয়া এখন এসে আমার লাইফে কবুল হচ্ছে। না ঘুমানো মুহূর্তগুলো এখন এসে ধরা দিচ্ছে। 

আমি নিজেকে চাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী বলছি দেবদাস পড়ার পর থেকে। পার্বতী চাঁদের চেয়েও বেশি অহমিকায় ডুবিয়ে রাখত নিজেকে। শেষমেশ দেবদাস তার কপালে বড়শীর ছিপ দিয়ে ক্ষত তৈরি করে দেয়। বছর খানেক আগের এক এক্সিডেন্টে কপালের ঠিক ওখানটাতেই ক্ষত হয়েছে। যেই মুখে ব্রণের একটা দাগও আমার সহ্য হতো না, সেখানে কি না... এমন বিশ্রী ধরনের অন্যায়ের পর কেন নিজেকে চাঁদের প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী বলব না, বলুন তো!

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো.. প্লিজ মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। আমি প্রচণ্ড দুঃসাহসী ও আবেগহীন মেয়েমানুষ, অনেক কিছুই পারি এমন যা আপাতদৃষ্টিতে কোনো মানুষের চিন্তারও ঊর্ধ্বে। সবচেয়ে ভালো যেটা পারি, সেটা হচ্ছে মায়ায় ফেলতে। আপনি মায়ায় পড়বেন না, অনুরোধ থাকবে। আরাধ্যারা হারিয়ে যেতে খুব ভালোভাবে জানে।

গ্রামের শিক্ষক হবেন? মন্দ বলেননি। আমার শহরের উত্তরের দিকে একটা সুন্দর গ্রাম আছে। এখানে চলে আসুন। আমি আরও একবার মাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে যাই। আপনি আমাদের কোন সাবজেক্ট পড়াবেন, স্যার? বাংলা? উঁহু, মাধ্যমিকের বাংলা পড়িয়ে মজা নেই। স্নাতকের বাংলা সুন্দর।

আপনি তবে কোনটা পড়াবেন? ইংরেজি? নাহহহহহহ, গণিত করান। আমার ম্যাথ ভীষণ ভালো লাগে। মুচকি মুচকি হাসছি। কী অদ্ভুত সুন্দর! 

আপনি আপনার চিঠিতে বলেছিলেন, গ্যেস করতে। আমি করলাম। এবং বুঝতে পারলাম—আপনার কল্পজগৎ আছে। সঙ্গীহীনতায় ভোগা নব্বইশতাংশ মানুষ কল্পনায় স্বকীয় জগৎ বানিয়ে নেয়। আপনারও আছে। আচ্ছা.. আপনি একাকি বকবক করেন? আমি করি। খুব খুব গল্প করি। সম্ভবত এত এলোমেলো সব কথা বলা নিয়ম ভেঙে এই প্রথম। আমি এরম অনেক নিয়মই এই চিঠির আলাপনে ভেঙেছি। কেননা আমি জানি, আপনার সাথে আমার বাস্তবিক সাক্ষাৎ নেই। আর এখানেই প্রশান্তি। আপনাকে যা-তা বলা যাবে। ইচ্ছে করলে উলোট-পালোট বকে হো হো করে হাসা যাবে। 

কী বিশাল চিঠি লিখেছি! বাপরে বাপ! মেজবাহ, এতটা পড়ে আপনি বিরক্ত হয়েছেন? হলে হবেন। একটু বিরক্ত হওয়াও দরকার জীবনে। আমি সম্ভবত এত বড়ো চিঠি এই প্রথম.... নাহ্ দ্বিতীয় লিখলাম। কাগজে-কলমে লিখে অভ্যস্ত আমি। অসংখ্য পৃষ্ঠার একটি চিঠি, এর চেয়েও বড়ো ছিল আমার। সেটা নিজেকে উৎসর্গ করে লেখা। ওটাকে অবশ্য চিঠি বলা যায় কি না বলতে পারছি না। A4 সাইজের অনেকগুলো কাগজ, প্রথমে অপ্রিয় আরাধ্যা, শেষে ইতি অন্তরাত্মা.... আর মাঝে নিজেকে চাপিয়ে দেওয়া নিজের তৈরি অগণিত নিয়মের এই চুক্তিনামাকে আদোতে চিঠি বলা উচিত হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না।

লিখতে শুরু করেছিলাম ন'টার দিকে, আশ্চর্য! এগারোটার বেশি বাজে। আমি আমার জীবনের দু-ঘন্টার অধিক সময় এদিকে দিয়েছি, এর মানে হলো আমি চিঠিতে সুখ পাচ্ছি। আমি আরও লিখব, কিন্তু কী লিখব? 

আচ্ছা.. এলোমেলো, অগোছালো, বাচ্চামো কাজ কারবার ও নাটকীয়তার সুরে লেখা চিঠিটা আপাতত এখানেই থামালাম। এরপর অপেক্ষা। জানি না আবার কবে, ততদিন বাঁচব কি না। জীবনের প্রতিটি দিনকে আমি এভাবে উপভোগ করি, যেন স্রষ্টা আমায় জানিয়ে দিয়েছেন এটাই আমার জীবনের শেষদিন। এতে করে অপূর্ণতার সাথে সব ছাড়ার প্রয়োজন হয় না।
মেজবাহ, আপনি ভালো থাকবেন। ওহ্! একটা কথা..

লোকে মোহাবিষ্ট হয়ে প্রেম খোঁজে,
কতিপয় সুখ যেখানে নিখোঁজ, সেখানে স্বর্গ খোঁজে।

পুনশ্চ ১: আপনার চেয়ে দ্বিগুণ বড়ো চিঠি লিখলাম।
পুনশ্চ ২: চিঠি লিখতে লিখতে উঠলাম, হাঁটলাম। অন্ধকারে পুরো ফ্ল্যাটে এমন ছাইরঙা শাড়ি পরে ঘুরঘুর করছি যেন, অশরীরী কোনো শরীরে থাকলে সজ্ঞানে নিজের শরীর ত্যাগ করে বৃক্ষের সর্বোচ্চ ডালে বাস করতে চলে যেত। বৃষ্টির প্রতি লোভ জাগছে। রাত এগারোটা, আমি ছাদের সিঁড়িতে এসে বসলাম। আজকের চিঠিটা সংক্ষিপ্ত করার সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো, এখন বৃষ্টিতে ভিজে সব দুঃখের উত্তাপকে গা থেকে ঝড়িয়ে ফেলতে না পারলে আমার জীবন ও যৌবনে আক্ষেপ থেকে যাবে। আমি যাই? 

_aradhya_
May 30, 2017 00:37 AM
Somewhere in Bangladesh 
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp