পরদিন,
তাবাসসুম শাফানের সাথে শপিং করতে এসেছে। শাফান ওকে এ দোকান থেকে ও দোকানে নিয়ে যাচ্ছে। এটা ওটা দেখতে বলছে, কিন্তু তাবাসসুমের সেদিকে মনোযোগ নেই। সে ভেবে যাচ্ছে কাল রাতের দেওয়া মেসেজটার কথা। মেসেজটা দেখার পর তাবাসসুম কতবার ওই নাম্বারে মেসেজ করলো কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া এলো না। একসময় নাম্বারটা থেকে তাকে ব্লক করে দেওয়া হলো। কিন্তু কে এমন মেসেজ দিবে তাকে? আর মেসেজ দেওয়ার পর ব্লকই বা করবে কেন? তাবাসসুম অর্ধেক রাত মেসেজটার কথাই ভেবেছে। একটা সময় এসে ওর মস্তিষ্ক বলে উঠলো রুশান এই মেসেজটা করেছে। কিন্তু না পরক্ষণেই মন ঘোর বিরোধিতা করে বলল,' রুশান এসব মেসেজ করবে কেন তাকে?' কোনো মানেই হয়না।
“কি ভাবছিস বলতো? তুই তো কিছু দেখছিস ই না।”
সহসা শাফানের কথায় ধ্যান ভাঙল তাবাসসুমের। শাফানের পানে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল—
“দেখছি তো।”
“কোথায় দেখছিস?”
শাফান বের করা শাড়িগুলো তাবাসসুমকে দেখিয়ে বলল—
“দেখতো কোনোগুলো পছন্দ হয়?”
তাবাসসুম মাথা নাড়িয়ে শাড়িগুলো দেখল। একটা মেরুন রঙের শাড়ি ব্যতীত ওর আর কোনো শাড়ি পছনন্দ হলোনা। শাফান তাবাসসুমের পছন্দ করা শাড়িটা দোকানদারকে প্যাক করে দিতে বলল।
“আরেহ্! আপনি দেখলেন না শাড়িটা?”
শাফান তাবাসসুমের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তুই দেখেছিস না তাতেই হবে।”
তাবাসসুম আর কিছু বললো না। এমনিতে তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তেমন। শাফান এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখছে। সহসাই ওর চোখ আটকে গেল একটা শাড়িতে। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। দোকানদার একজনকে শাড়িটক দেখিয়ে পাশে রেখে দিচ্ছিল। শাফান লোকটাকে শাড়িটা দেখাতে বলল। লোকটা শাড়িটা শাফানের দিকে এগিয়ে দিলো৷ তাবাসসুম শাড়িটা দেখে বলল—
“কি সুন্দর শাড়িটা!”
“এই শাড়িটা ওকে খুব সুন্দর মানাবে।”
অতঃপর দোকানীকে বলল—
“এই শাড়িটাও প্যাক করে দিন।”
শাড়িসহ অন্যান্য সব শপিং করে শাফান তাবাসসুমকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে আসলো৷ তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। কিছুই খাওয়া হয়নি দুজনের। ক্ষিদেয় তাবাসসুমের পেটেও ইদুর দৌড়াচ্ছিল। তবে ক্ষিদের থেকে পিপাসাই বেশি পেয়েছে। শাফান তাবাসসুমকে বলল—
“কি খাবি?”
তাবাসসুম তড়িঘড়ি করে বলল—
“আপাতত আমার ঠান্ডা কিছু পান করার জন্য হলেই চলবে।”
শাফান ওয়েটারকে ডেকে ঠান্ডা পানীয় অর্ডার করলো প্রথমে। ঠান্ডা খেয়ে তাবাসসুম নিজের মন মতো খাবার অর্ডার করলো৷ তার পছন্দমতো। অতঃপর খেয়ে দুজনই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলো। বের হয়ে দুজনই ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে লাগলো। শাফান হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায় বলল—
“ঘুরতে যাবি?”
তাবাসসুম শাফানের পানে তাকিয়ে বলল,
“কোথায়?”
“আমি যেখানে নিয়ে যাই। যাবি?”
তাবাসসুম না ভেবেই আনন্দমনে বলল—
“হ্যাঁ যাবো। চলুন।”
শাফান হাসল তাবাসসুমের আনন্দিত মুখশ্রী দেখে।
—————
তাবাসসুম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। তার সামনে একটা নৌকা। শুধু নৌকা না, নৌকা পুরোটা সাজানো হয়েছে পদ্মফুল দিয়ে৷ কি সুন্দর দেখাচ্ছে। তাবাসসুম আসার থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সময়টা এখন পড়ন্ত বিকেল। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। শাফিন এবার তাবাসসুমের হাত ধরে বলল—
“চল নৌকায়।”
তাবাসসুম মাথা নাড়ালো। এটা ছোট্ট একটা ঝিল। গোল। যার চারপাশে রক্তপদ্ম ফুটে রয়েছে৷ মাঝখানে একটু ফাঁকা রাখা নৌকাটা চলাচলের জন্য। তাবাসসুম এতদিন এখানে রইল অথচ এত সুন্দর জায়গার হদিস পেল না এখনো? আর শাফান ভাইও তো তাকে বলেননি।
তাবাসসুম শাফানের হাত ধরে নৌকায় উঠে বসল। মুহূর্তেই নৌকাটা টলতে শুরু করলো। তাবাসসুম বোধহয় আনন্দ পেল। আনন্দে খিলখিল করে হেসে উঠল। শাফান তাকিয়ে রইল সেই হাসির পানে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে।
তাবাসসুম ঝিল থেকে বেশ কয়েকটা পদ্ম তুলে নিজের কোলে রাখলো। শাফান তাকিয়ে তাকিয়ে তাবাসসুমের কর্মকান্ড দেখল কেবল৷ কিছুক্ষণ অতিক্রম হতে শাফান সহসা বলে উঠল—
“সূর্যাস্ত দেখবি?”
তাবাসসুম অবাক হয়ে মাথা নাড়ালো। শাফান তাবাসসুমকে নিজের সামনে এনে বসিয়ে হাত দ্বারা সামনের দিকে ইশারা করে বলল—
“ওদিকে তাকিয়ে থাক। একটু পরেই সূর্য ডুববে।”
তাবাসসুম তাকিয়ে রইল। সূর্য তখন রক্তিম। আস্তে আস্তে সে ডুবছে পশ্চিমে। তাবাসসুম ও অবাক চোখে দেখছে। সূর্য যখন অর্ধেক ডুবন্ত, তাবাসসুম তখন মুখে হাত চেপে ধরল আনন্দে। কখনো এভাবে সূর্যান্ত দেখেনি সে। চারপাশের পদ্মের সমাহার। সেই পদ্মগুলোর মাঝে পদ্মে সজ্জিত নৌকার মাঝে বসে সে সূর্যাস্ত দেখবে। কখনো ভাবেনি। আর শাফান ভাই এখানে না আনলে তো কখনো দেখাও হতো না। সে তো একটা ধন্যবাদ প্রাপ্ত।
সূর্য যখন সম্পূর্ণ ডুবন্ত। তাবাসসুম তখন শাফানের পানে তাকালো। তার চোখে-মুখে আনন্দের ঝলক। শাফান ভ্রু নাচাল। হেসে বলল—
“কেমন লাগলো?”
“ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ধন্যবাদ শাফান ভাই। এত সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। আমি কিন্তু এবার থেকে মাঝে মাঝেই এখানে আসবো। সূর্যাস্ত দেখবো এসে।”
“নিয়ে আসবো আমি। এখন চল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।”
শাফান উঠে দাঁড়াতে তাবাসসুমও উঠে দাঁড়ালো। শাফান নৌকা থেকে নেমে তাবাসসুমের হাত ধরে নামালো। তাবাসসুম চারপাশে আবার চোখ বুলালো। এখন ঝোপঝাড়ে কতগুলো জোনাকি পোকা দেখা যাচ্ছে। তাবাসসুম সেগুলোর দিকেও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে আসলো,
“কি সুন্দর! মনোমুগ্ধকর!”
কিন্তু তৎক্ষনাৎ ফোনের মেসেজ টোনের শব্দে তাবাসসুমের ধ্যান ভাঙল। ফোন অন করে দেখল কালকের রাতের সেই নাম্বার থেকে মেসেজ। তাতে লেখা—
“তুমি কেবলই আমার সামনে এভাবে মুগ্ধ হবে বসন্ত কন্যা। অন্য কারো সামনে না। অন্য কারো সামনে এভাবে মুগ্ধ হওয়া তোমার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। আমি সইতে পারিনা।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………