“এটা তাবিয়া সুলতানের কাছে পৌছে দিবে। আমার ধারণা অতিসত্ত্বর উজির তার সাথে মোলাকাত করবেন। তাই তোমাকে তিনি ডাকবেন, প্রস্তুত থেকো”
ইরহানের পত্রটা হাতে নিলো হুসনাত। উল্টেপাল্টে দেখলো। কৌতুহল ছলকাচ্ছে চোখে মুখে। সেই কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারলো না। জিজ্ঞেস করেই ফেললো,
“সুলতানা জিজ্ঞেস করলে কি বলবো?”
“বলবে, এটা এসফাইন থেকে বায়োজিদ পাঠিয়েছেন”
ইরহান একটু থামলো। হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো,
“তুমি পড়তে পারো?”
হুসনাত মিথ্যে বললো না, আনত স্বরে বললো,
“হাকেমের কাছে শিখেছি। খুব বেশি নয়, তবে শব্দ চিনে বুঝতে পারি। যদি খুব কঠিন কিছু না হয় তবে আমার সমস্যা হয় না”
ইরহান খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না। হুসনাত বুঝতে পারলো না লোকটি তাকে এই প্রশ্নখানা কেন করলো? কি উদ্দেশ্য? আবারোও কি সন্দেহ করছে সে? হুসনাত কাঁপা স্বরে বললো,
“হুজুর কি আমাকে এখনো সন্দেহ করছেন?”
হুসনাতের প্রশ্নে ঘর কাঁপিয়ে হাসলো ইরহান। বা হাত দিয়ে হুসনাতের চিবুক ধরে নত মুখখানা তুললো। তার চোখে চোখ রেখে বললো,
“সন্দেহ আমার সঙ্গী, বিশ্বাস আমার সতীন”
“তাহলে বাঁচালেন কেন?”
“দয়া করলাম”
“এতো দয়ালু হৃদয় তো আমার মনিবের নেই বলে জানি। সে বিশ্বাসঘাতকদের গর্দান নেয়। যদি আমায় সন্দেহই করেন তবে আমিও কি সেই কাতারে পড়ি না?”
হুসনাতের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো না ইরহান, বরং তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে ফেললো মুহূর্তে। তার আঙ্গুল বিচরণ করছে হুসনাতের মুখমন্ডলে। পেলব, আরক্ত গালজোড়ায় ঠোঁট ঘষে বললো,
“তুমি চাও আমি তোমাকে বিশ্বাস করি?”
প্রশ্নটার মর্মার্থ বুঝলো যেন হুসনাত। সত্যিই তো, এই নিষ্ঠুর, নির্দয়, পাষণ্ড মানুষের বিশ্বাস পেয়েও তার লাভ কি? তার তো ভয়ে মূর্ছা যাবার কথা। এক অপ্রকৃতস্থ মানুষের কাছে সে তাকে ছুড়ে ফেলেছিলো বিনাদ্বিধায়। একটি বারও হুসনাতকে নিজের অভিমত প্রকাশের সুযোগ নেওয়া হয় নি, নিজের স্বপক্ষে অনুনয় করার জন্য সময় দেওয়া হয় নি। তার স্পর্শ, তার দয়া সবকিছুই কি বানোয়াট নয়? অবশ্যই বানোয়াট। বরঞ্চ হুসনাতের তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা উচিত, আক্রোশে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হওয়া উচিত। তার প্রতি বিদ্রোহ করা উচিত। অন্তত আত্মসম্মানবোধ তো তাই বলে। কিন্তু হুসনাতের অনুভূতিটা কেমন মলিন। হয়তো বেঁচে থাকার অতিতীব্র ইচ্ছে তার ভেতরের মানুষ প্রবৃত্তিগুলো ক্ষয়ে ফেলেছে। তার দেহের যন্ত্রণার উৎস যে মানুষটি সেই মানুষটির অনুগ্রহই না পাওয়ার আফসোস হচ্ছে। হুসনাত ম্লান স্বরে বললো,
“দাসীর সম্পদই তার আনুগত্য আর বাঁচার খোড়াক তার মনিবের বিশ্বাস আর স্নেহ”
“তুমি আমার উপপত্নীও ভুলে যাচ্ছো কেন? এটাই তো বলেছিলে পাতালঘরে”
হুসনাত একটু চমকালো। পরমুহূর্তে হাসলো। কুর্নিশ করে ইরহানের হাতে চুমু খেয়ে বললো,
“সে তো দাসীই, তাই নয় কি? আপনার উপর তো আমার কোনো অধিকার নেই”
হুসনাতের কথায় ইরহানের চোখের তীক্ষ্ণতা বাড়লো। হুসনাতের চুলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একগাছি চুল মুঠোবন্দি করে তাকে টেনে নিজের সন্নিকটে এনে শুধালো,
“তুমি এতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী? আমার উপর অধিকার চাই তোমার?”
“আপনি আমায় লজ্জা দিচ্ছেন হুজুর। আমার মত ক্ষুদ্র, পাপীষ্ট নারীর এতো স্পর্ধা নেই। আমার উদ্দেশ্য বেঁচে থাকা। সেই বোধ হবার পর থেকেই এক সংঘর্ষ করে আসছি। আমার উচ্চাকাঙ্খা শুধু বাঁচা। আমার পরিচয় আমি জানি না, না জানি আমার জন্মকূল। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় শুধু হাত বদল হয়েই আমার বাঁচা। কীটের মত এই নারী কখনোই আপনার উপর অধিকার চায় না। শুধু আপনার বিশ্বাস চায়”
ইরহানের চোখে মুখে বিরক্তি ফুঁটে উঠলো। কৃষ্ণ মুখখানা শক্ত হয়ে গেলো। তার গায়ের সাথে মিশে থাকা এই লাস্যময়ী নারীর স্বচ্ছ চোখ তার কাছে দূর্বোধ্য লাগছে। মেয়েটি অনেককিছু বলছে কিন্তু কথাগুলোর গাম্ভীর্য অনুভূত হচ্ছে না। অথচ গতরাতে তার টলমলে চোখজোড়া দেখে এতো ভীত লাগছিলো কেন? সেই চোখে বেঁচে থাকার জন্য অসীম আকুলতা দেখেছিলো ইরহান। সেই দাসীকে তখন মনে হয়েছিলো রক্তমাংসের মানুষ। তার মধ্যেও ভয়, দুঃখ, কষ্ট দলা পাকিয়ে থাকে। ইরহানের দৃষ্টি এখনো হুসনাতের দৃষ্টিতে বাঁধা, সে শীতল স্বরে বললো,
“আমার স্পর্শে তোমার শরীর ঝলসে উঠে, কি ভাবো আমি বুঝতে পারি না?”
হুসনাত চোখ বড় বড় করে তাকায় ইরহানের দিকে। ইরহানের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। হুসনাত চোখ সরিয়ে নেয়। ইতস্তত স্বরে বলে,
“আমি এখনো আনাড়ি হুজুর, ধীরে ধীরে সয়ে যাবে। আপনি যদি বলেন এখনো আমি আপনার সেবা করতে পারি”
বলেই নিজের জামার ফিতেতে হাত দিলো হুসনাত। অবুঝ মেয়ের মতো ফিতেখাতা খুলে ফেললো। ফলে উন্মুক্ত হলো তার প্রহারে জর্জরিত দাগময় শুভ্র শরীরখানা। ইরহান হাসলো। হুসনাতের মোলায়েম কেশ আঙ্গুলের ফাঁকে পেঁচাতে পেঁচাতে বললো,
“কোনটা সয়ে যাবে? আমার নিষ্ঠুরতা নাকি আমার স্পর্শ?”
“দুটোই”
“মৃত্যুকে এতো ভয় পাও অথচ আগুণ নিয়ে খেলছো। আমি তোমাকে বোকা ভাববো নাকি অতি চালাক? আচ্ছা, তুমি ছোরা চালাতে পারো না? অবুঝ বাচ্চাও বাঁচার তাগিদে চোখমুখ বেঁধে ছুরি চালিয়ে দেয়। তুমি কেন কিছু কর নি?”
হুসনাত মাথা নত করে ফেললো। নিন্মোষ্ঠ কাঁমড়ে ধরে বসে রইলো সে। ইরহানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকে দেখছে নিঁখুত ভাবে। আড়ষ্ট স্বরে হুসনাত উত্তর দিলো,
“অস্ত্র চালাতে পারি না আমি, ভয়ে হাত থেকে ফস্কে গিয়েছিলো। পড়ে আর তোলার সুযোগ পাই নি”
ইরহান কি বিশ্বাস করলো? হয়তো করে নি। মানুষটির সন্দিহান দৃষ্টির আভাস পেলো সে। ইরহান তাকে ছেড়ে দিলো। হাতের ইশারায় তাকে যেতে আদেশ করলো। তার চোখে মুখে তীব্র বিরক্তির ছাপ লক্ষ করলো হুসনাত। হুসনাত নিজের জামাখানা পড়ে ফেললো। চিঠিখানা খুব সাবধানে জামায় বাঁধলো। আবারো চুমু খেলো সে ইরহানের কাফতানে। তারপর কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। ইরহান তার যাবার পানে চেয়ে রইলো নিলীন চোখে। ।
১৮.
তাওয়াইফের ঘুঙুরের আওয়াজে নিমগ্ন মহলের মেহফিল। আবু সাঈদ এবং তার খাস সহোচররা মদিরা এবং আরকের নেশায় বুদ হয়ে উপভোগ করছে সেই নাচ। সদূর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে গণিক এবং গায়ক এসেছে এই তাবরেজ শহরে। এই তাওয়াইফশালায় আবু সাঈদের দৈনন্দিন যাতায়ত। মাঝে মাঝে রাত এখানেই কাটায় সে। আবু সাঈদের এই মদের নেশা এবং নারী নেশা নিয়ে প্রচুর আপত্তিকর রটনা প্রচলিত থাকলে সেগুলো ঢপে টিকে না তার নানাজানের জন্য। নানাজান সুলতান মেহমুদের থেকে দেওয়ানখানায় আছেন। যুদ্ধও করেছেন তার সাথে। সেজন্য বর্তমান সুলতান মালেক শাহও তাকে সমীহ করেন। সেই সাথে তাবিয়ার ক্ষুরধার বুদ্ধিও সুলতানকে বহুবার সহায়তা করেছে। সেকারণেই তাবিয়ার পাঁচ পুত্র হাজারো অন্যায়ের পরও বেঁচে যায়।
ভারত থেকে আগত তাওয়াইফ সাইবা খুব গুণী শিল্পী। তার নাচের ভঙ্গিমা ব্যতিক্রম। তার হাতের মুদ্রা খুব আকর্ষণীয়। আবু সাইদ বিমগ্ন হয়ে তাকে দেখছে। মেয়েটির নাচ পরিবেশনের পর চলে যেতে নিলে তাকে বাঁধা দিলো আবু সাঈদ। হাতের ইশারায় বসতে বললো। সাইবা বসলো। তার আরক্ত শ্যামা মুখখানা নত হয়ে আছে। আবু সাঈদ নিজের আভূষণ থেকে একটি মুক্তার মালা ছুড়লো। সাইবা সেই মালাখানা হাতে নিয়ে কুর্নিশ করে বললো,
“ধন্যবাদ হুজুর, এই বাদী যে আপনার মনোরঞ্জনের খোঁড়াক হতে পেরেছে এই অনেক”
“এই মালা তোমার কাছে খুব তুচ্ছ সাইবা। তোমার গুণে মুগ্ধ হয়ে আমি তোমাকে বর দিচ্ছি। নিজের সীমা অতিক্রম না করে তুমি চাইতে পারো যেকোনো কিছু”
সাইবার চোখ চকচক করে উঠলো। সে বললো,
“এই খাদিম আপনাকে একটি কবিতা শোনাতে চায় হুজুর”
“কবিতা?”
“জি, আপনার জন্যই লেখা। বড়ই কাঁচা লেখা”
“যদি আমার পছন্দ না হয়?”
সাইবার মুখখানা আশাহত দেখালো। আবু সাঈদের মন আজ খুব আনন্দিত। তাই রুপসীকে মুর্ছিত করার ইচ্ছে হলো না। মৃদু হেসে বললো,
“শুনি তোমার অপরিপক্ক কবিতা”
সাইবা ফারসী ভাষায় একটি কবিতা আওড়ালো, যা বাংলা করলে হয়,
“আপনার অদম্য ইচ্ছায় জেগে ওঠে অগ্নিপথ —
স্বপ্ন নয়, বাস্তব
শত্রুর শির হয় নত
এই জনতা সাক্ষী আপনার বীরতার,
যার সম্মুখে নত হয় প্রতিটি ঝড়।
আপনার পদশব্দে ঝরে পড়ে অন্ধকার,
আলোড়নে ভাসে নগর
হে শেহজাদা, আপনার অগ্নিরাশিতে জেগে ওঠে নতুন প্রভাত,
বিপদ আসুক বা বাধার ঢেউ, আপনি আঁকেন নতুন ভোরের পাঠ”
আবু সাঈদ নিজ প্রশংসা মিশ্রিত কবিতা শুনে মন গদগদ হয়ে উঠেছিলো। সাইবাকে সে তার পান্নার আংটিটাও দেয় উপহার হিসেবে। সে শেহজাদা তাই খুব একটা ক্ষমতা নেই তার। তবে সে তার তাওয়াইফ মহলে ঘোষণা করলো,
“সাইবার কোনো অযত্ন যেন না করা হয়। আজ থেকে ও কেবল আমার খেদমতেই নিজের গুণের পদর্শণ করবে”
এ ভারি অন্যায় আবদার! কিন্তু এই মহলের প্রধান তা মাথা পেতে নিলো। শেহজাদাকে রুষ্ট করতে চায় না সে। এর মধ্যেই মেহফিল খন্ডন করলেন সুলতানা তাবিয়া। এখানে তার আগমণ দেখে সবাই শিউরে গেলো। সে এসেই নিজের ছেলের সামনে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়ালো। সুলতানার প্রকোপে সবাই স্থান ত্যাগ করলো। আবু সাঈদ মায়ের সামনে নড়বড়ে পা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মেরুদন্ড সোজা করতে পারছে না। নেশায় তার মস্তিষ্ক এখন নিশ্চল। তাবিয়া কুপিত স্বরে শুধালো,
“তুমি আলীউদ্দিনকে হত্যা করার অনুমতি চেয়েছো?”
আবু সাঈদ উত্তর দিলো না। তাবিয়ার রাগ বাড়লো হু হু করে। সে ছেলের বাহু ধরে শুধালো,
“আমাকে একটি বার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনীয়তাবোধ করো নি কেন তুমি?”
“আমি ক্লান্ত আম্মা, সবকিছুতে আপনার অনুমতি কেন নিতে হবে? আমি শেহজাদা, আমার বুদ্ধি আছে”
আবু সাঈদের কথাটা শেষ হবার পূর্বেই সজোরে চড় বসিয়ে দিল তাবিয়া। কুপিত স্বরে বললো,
“তোমার বুদ্ধি আমার জানা আছে। নির্বোধ কোথাকার। তোমার ওই জংপড়া ঘটের জন্য আজ আমাদের অবস্থা যাচ্ছেতাই। তোমার ধারণা আছে আলীউদ্দিন আমাদের জন্য কতটা জরুরি? আমার সকল ব্যবসা ও দেখে। তোমার নানাজানের সকল গোপনীয়তার চাবি ও। যদি কেউ ওর খবর পেয়ে যায় তবে আমাদের অবস্থা কি হবে ধারণা আছে তোমার?”
আবু সাঈদ নিজের অপমানটা গিলে নিলো। রাগ সামলে সহজ গলায় বললো,
“এজন্যই তো ওকে খুন করতে চাই আম্মা”
“তোমার আগে যদি কেউ খুঁজে ফেলে ওকে?”
“নানাজান বাদে কেউ ওর ঠিকানা জানে না”
আবু সাঈদের মেকি আত্মবিশ্বাসে রাগে লাল হয়ে গেলো তাবিয়া তার মুখখানা চেপে ধরে বললো,
“তোমার থেকেও ক্ষিপ্র বুদ্ধির মানুষ মহলে আছে। ইরহান বা মীর বখসি কেউ যদি তোমার আগে আলীউদ্দিনকে ধরে ফেলে আমাদের সব কিছু ফাঁশ হয়ে যাবে”
“আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন আম্মা, আমি তা হতে দিবো না”
তাবিয়া নিজের ক্রোধ সামলালো। মস্তিষ্ককোষ চালাতে লাগলো। দ্রুত আলীউদ্দিনকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ইরহানের পূর্বেই করতে হবে।
****
বহুদিন বাদে রুমেলিয়ার সেবায় নিযুক্ত হলো হুসনাত। বাগানের ধার দিয়ে তার গোসলের জন্য তাজা ফুল সংগ্রহ করে সে রাজগ্রন্থাগারের সামনে থেকে যাচ্ছিলো। হঠাৎ নজরে পড়লো শান্ত শুভ্র সুকান্ত পুরুষকে। বইয়ের ভাঁজে মুখ গুজে রেখেছে। হুসনাতের খেয়াল হলো শেহজাদাকে বইখানা ফেরত দেওয়া হয় নি। গ্রন্থাগারে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই সেখানে প্রবেশ করার স্পর্ধাও দেখালো না। পিঠ ঘুরিয়ে চলে যেতে নিলেই, ডাক পড়লো,
“হুসনাত বেগম?”
চমকালো হুসনাত। পেছনে ঘুরে সালাম ঠুকলো। বিশালকার দেহটা নিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়ালো উমার। হুসনাতের মুখের কাটা দাগ আর ফোলা চোখখানা দেখে শুধালো,
“তুমি কি ব্যথা পেয়েছো?”
হুসনাত একটু বিব্রত হলো। পাতালঘরের দুঃস্বপ্নময় স্মৃতিগুলো বলতে চাইলো না। তাই জড়ানো স্বরে বললো,
“পড়ে গিয়েছিলাম সিড়ি থেকে”
উমার তার মিথ্যে ধরে ফেললো। কিন্তু বুঝতে দিলো না। সে উলটো শুধালো,
“বইখানা পড়া হয়েছে?”
হুসনাত মাথা নাড়ালো। হ্যা, পড়েছে সে। উমার হেসে শুধালো,
“বুঝতে পেরেছো?”
হুসনাত একটু ইতস্ততবোধ করলো। তার মত দাসীর পক্ষে কি এতো কঠিন বইয়ের মূলভাব বোঝা সহজ। তাই সহজ গলায় বললো,
“গল্পগুলো পড়েছি কেবল। অনেককিছুই বোধগম্য হয় নি। অনেক প্রশ্নও মনে উঁকি দিয়েছে। কিন্তু”
“কিন্তু?”
ভরাট গলায় প্রশ্ন করলো উমার। হুসনাত শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“আমার মত দাসীর কি প্রশ্ন মানায়?”
“প্রশ্ন করা সকলের অধিকার হুসনাত বেগম। এটা মানুষের জন্মগত প্রবৃত্তি। মানুষ অনুসন্ধিৎসু হবে এটাই স্বাভাবিক”
হুসনাত যেনো একটু আশকারা পেলো। তাই শুধিয়ে বসলো,
“আচ্ছা হুজুর অনুমতি দিলে একটি প্রশ্ন করি?”
“নিশ্চয়ই”
হুসনাত আনত স্বরে বললো,
“সুলতানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ, তার পরম ধর্ম ক্ষমা এবং বিনয় তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু হুজুর আমার প্রশ্নটা হলো, যদি সুলতানের সেই জনগণের উপরই কেউ অত্যাচার করে তবে তাকে কি সুলতানের ক্ষমা করা উচিত?
হুসনাতের প্রশ্নে একটু থমকালো উমার। সত্যিই তো যে জনগণ তার সম্পদ তার উপর করা অত্যাচারীকে ক্ষমা করা কি সুলতানের মানায়? হুসনাত উমারকে চিন্তিত দেখে বললো,
“ক্ষমা করবেন হুজুর। আমি আসলে আপনাকে বিরক্ত করতে চাই নি, অনুমতি দিলে প্রস্থান করতে চাই”
উমার অনুমতি দিলো। সে ভাবনার অতল গহ্বরে পড়ে গেলো যেন। এই প্রশ্নটা তাকে আলীউদ্দিনের বিষয়টাকে নিয়ে আরোও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এদিকে এক সুনয়না তাকে দেখছে নিলীন ভাবে। হামিদার চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। অন্তর পুড়ে যাচ্ছে ঈর্ষা নামক নোংরা প্রবৃত্তিতে। শেহজাদা উমারকে অন্য নারীর সাথে দেখতে এতোটা খারাপ লাগছে কেন? কি যেন বারবার উতলে উঠছে বুকের ভেতর থেকে। ক্রোধ! হিংসা! নাকি হৃদয়দহনের দাবদাহ! এই সামান্য দৃশ্যেই তার হৃদয় এতোটা ব্যথিত হচ্ছে। যখন সত্যি সত্যি এই পুরুষটি অন্য নারীকে গ্রহণ করবে, তার সাথে ঘনিষ্ঠ হবে কি করে মেনে নিবে হামিদা? পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো সে। তার পরিকল্পনা ভিন্ন। সুলতানাদের আবেগপ্রবণ হতে হয় না। আবেগ সর্বনাশের দ্বিতীয় নাম। তাই খুব সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করলো সে। সেই পরিকল্পনার বোঝা গেলো দুদিন পর। যখন হারেম তোলপাড় হলো হামিদার এককথায়, তার আংটি চুরি হয়েছে। এবং চোর আর কেউ নয় বরং হুসনাত………
·
·
·
চলবে……………………………………………………