তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো - পর্ব ১৫ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          বাঘের অনুপস্থিতিতে শিকারি বাঘের গুহায় গিয়ে যেমন রোমাঞ্চিত বোধ করে কলরবের অনুপস্থিতিতে তার বাথরুমে গোসল করাটাও নিহিনের কাছে প্রায় সমান রোমাঞ্চকর। গোসল করতে ঢোকার সময় কল্প কোত্থেকে একটা টাওয়াল এনে দিলো। নিহিন বলল,

“বাথরুমে তো টাওয়াল আছে দেখলাম।”

“ওটা তো পাপ্পার। এটা কারোর না, তুমি এটা নাও।”

কল্পর দেওয়া টাওয়াল আর কলরবের একটু আগে গোসল করে যাওয়া ভেজা টাওয়াল দুটোই এখন পাশাপাশি রাখা। কলরবের টাওয়ালটাই উঠিয়ে নিল নিহিন। আবার ভাবলো, পরপুরুষের টাওয়াল ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছে, মাথাটা কি একদমই গেল! পরক্ষণেই আবার ভাবলো, ধুর কী হবে এত কিছু ভেবে, যা ভালো লাগছে তাই ভাল। ভালো লাগায় কোনো পাপ নেই।

টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতেই কেমন একটা পুরুষ পুরুষ গন্ধ পেল। অদ্ভুত অচেনা এক ভালোলাগায় ভরে গেল নিহিন।

গোসল করে বের হতেই কল্প দৌড়ে এলো। ওকে দেখেই নিহিনের মুখে হাসি ফুটে উঠল, নিহিনকে হাসতে দেখে কল্পও হাসল। চুল মুছতে মুছতে নিহিন ভাবল, একটু কাজল লাগালে হয়, কলরবের ভালো লাগবে। ব্যাগ থেকে কাজল বের করতে গিয়েই কল্পর জন্য আনা চকলেটগুলো চোখে পড়ল। বের করে কল্পকে দিতেই খুশিতে লাফিয়ে উঠল। বলল,

“আমার জন্য? ইয়ে!”

আয়নার সামনে গিয়ে এক চোখে কাজল লাগাতেই দেখতে পেল পাশে বসে দেখছে কল্প। দেখতে দেখতে একদম বাঁকা হয়ে পড়েই যাচ্ছিল। নিহিন ওর এ অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। কল্পও দাঁত বের করে হাসল। নিহিন জিজ্ঞেস করল,

“হাসছ কেন?”

“তুমি হাসছ তাই। তুমি সাজছো তাই না?”

“হ্যাঁ তো।”

“আচ্ছা এটা কী লাগাচ্ছ চোখে?”

“এটা কাজল।”

“ও এটাকেই কাজল বলে?”

“হুম।”

“এটা লাগালে ব্যথা লাগে না?”

“না তো!”

“আচ্ছা তাহলে লাগাও।”

কাজল লাগিয়ে খাটের উপর ওঠে বসল নিহিন। কল্প আরো কাছে নিহিনের একদম সামনে এসে বলল,

“তুমি একদম আমার মায়ের মতো দেখতে।”

নিহিন প্রথমে কিছু বলতে পারল না। এরপর মুখটা স্বাভাবিক রেখে বলল, “হ্যাঁ অনেকটা মিল আছে।”

ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল নিহিন। তারপর কল্প কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবে? মা কখনো ধরেনি। জানো স্কুল ছুটির পর সবাই দৌড়ে গিয়ে ওদের মাকে জড়িয়ে ধরে, আর আমি দাদাভাইয়ের সাথে বাসায় চলে আসি, আমার মন খারাপ দেখে দাদাভাই আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে চায়। চকলেট আইসক্রিম কিনে দিতে চায়, আমার তখন ওসব কিছু ভালো লাগে না।”

চোখ ছলছল করছে কল্পর। নিহিন ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। আর নিহিনের কান্না দেখে কল্পও কেঁদে ফেলল। মা ও সন্তান দুজনে দুজনার পরিপূরক। এইটুকু একটা বাচ্চা এত কষ্ট নিয়ে এত হাসি মুখে থাকে কী করে বুঝে পেল না নিহিন। ইচ্ছে করছে এই যে ধরেছে, এভাবেই ধরে থাকুক। নিহিন কান্না থামাতে পারছে না…কী অদ্ভুত ব্যাপার, এত কষ্ট কেন হচ্ছে এ বাচ্চাটার জন্য। কল্প তো আসলে ওর কেউ না।

শওকত সাহেব ও কলরব বেল না বাজিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকল ফ্ল্যাটে। নিজের রুমে ঢুকে এ দৃশ্য দেখে হতবাক কলরব। নিহিন কল্প দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। কিন্তু কেন? কলরবকে দেখে নিহিন দেওয়ালে টাঙানো নিজের ছবিটার দিকে তাকাল। নিহিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে কলরবও তাকাল।
·
·
·
চলবে...................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp