তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো - পর্ব ১৪ - মৌরি মরিয়ম - ধারাবাহিক গল্প


          নিহিন পোলাও বসিয়ে দিয়েছে এক চুলায়। অন্য চুলায় ইলিশ মাছটা তৈরি করছে পোলাওতে দেয়ার জন্য। আর কলরব ক্যাবিনেটের ওপর বসে আছে পা ঝুলিয়ে। নিহিন বলল,

“তুমি শুধু শুধু আছ এখানে, যাও তো। এই গরমের মধ্যে তোমাকে থাকতে হবে না।”

“শীতের দিনে গরম কীসের?”

“ইশ, শীত কি এখনো এসেছে নাকি? দুনিয়ার গরম। এই দেখো ঘামছ।”

“এই গরমটা তো তোমারও লাগছে, তুমিও ঘামছ।”

“আরে বাবা, রান্নাটা তো আমিই করছি, তুমি না।”

“আজ তুমি রেঁধে দিচ্ছ? এরপর তো খেতে ইচ্ছে করলে নিজেকেই রাঁধতে হবে। আমাদের বুয়ার রান্না জঘন্য আর বউ-টউও নাই, তাই শিখছি।”

“আমি রেসিপি লিখে দেবো।”

“১০ বছর দেখিনি তোমাকে। আজ একটু দেখছি, দেখতে দাওনা। এমন করছো কেন?”

একথা বলেই কলরব খেয়াল করল নিহিনের গায়ে রোদ পড়ছে, নেমে দাঁড়াল নিহিনের পাশে। এমনভাবে দাঁড়াল যাতে আর রোদ না লাগে। লজ্জা পেয়ে নিজের অজান্তেই একটু সরে গেল নিহিন। কারণ, নিহিন বুঝতেই পারল না কেন কলরব নেমে দাঁড়াল। ভাগ্যিস কাজ করছে নাহলে মারাত্মক অস্বস্তিতে পড়তে হতো। এবার কথা পালটালো,

“কী ভর্তা করব বলো তো?”

“তোমার যা মন চায়। আমরা বুভুক্ষ ব্যাচেলর পার্টি। যা রাঁধবে তাই খাবো।”

নিহিন হাসল। কলরব বলল,

“তোমার হাসিটা মারাত্মক। এত হেসো না প্লিজ।”

“ধুর তোমার যত আজেবাজে কথা।”

নিহিন এবার পোলাওয়ের মধ্যে ইলিশ মাছটা দেবে। পোলাওয়ের ঢাকনাটা সরাতে যাবে এমন সময় কলরব নিহিনের হাতটা ধরে ফেলল।

“পাগল হলে নাকি? খালি হাতে গরম ঢাকনা ধরছো?”

“ওহ, তাই তো! খেয়ালই করিনি।”

“কলরব ন্যাপকিন এগিয়ে দিলো আর হাতটাও ছেড়ে দিলো। একসময় কত ধরেছে এ হাত, কিন্তু এখন একজন দূরের মানুষের মতই দূরে থাকতে হচ্ছে, হয়তো হবেও।”

পোলাওটা হয়ে গেছে, নামিয়ে কল্পর চিংড়ি মাছ ভুনা করে ফেলল। টমেটো ভর্তা, বেগুন ভর্তা আর কালিজিরা ভর্তা রেডি করে ফেলল নিহিন। তারপর এক চুলায় ভাত বসিয়ে দিয়ে আর এক চুলায় চিকেন ফ্রাইটা ভাজতে শুরু করল। কলরব জিজ্ঞেস করল,

“নিহিন, তোমার মনে আছে যেদিন তুমি আমাকে প্রথম তোমার হাতের ইলিশ পোলাও খাইয়েছিলে সেদিন কী হয়েছিল?”

নিহিনের মনে পড়ল….

সেদিন রাত প্রায় ১ টার দিকে কলরবকে জানালা দিয়ে নিহিন বলেছিল,

“তোমার জন্য আজকে একটা স্পেশাল জিনিস আছে।”

“কী? দাও।”

“আছে, একাটা জিনিস, খুব স্পেশাল। এখান দিয়ে দেওয়া যাবে না। খেতে হলে ছাদে আসতে হবে।”

“খাওয়ার জিনিস? কিন্তু এর আগে তো যা খাইয়েছো সব জানালা দিয়েই দিয়েছ। এমন কী জিনিস যে ছাদে গিয়েই খেতে হবে!”

“আছে, বললাম না খুব স্পেশাল!”

“চুমু খাওয়াবে? সিরিয়াসলি? যাক এত দিনে পারমিশন পাওয়া গেল।” অবাক হয়ে বলল কলরব। নিহিন তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল। বলেছিল, “ছি ছি তুমি এমন কথা বলতে পারলে? আমি তো ইলিশ পোলাওয়ের কথা বলছিলাম। স্পেশাল বলেছি কারণ আমি এটা আজকেই শিখেছি, আর আজকেই প্রথম করলাম।”

“ওহ.. সরি সরি। আমি দুষ্টুমি করছিলাম বাবা, কান্নার কী আছে? আমি তো আগেই বলেছি, তুমি বড় হওয়ার আগে এসব কথা মুখেও আনবো না। আজকে একটু দুষ্টুমি করতে গিয়ে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে, রিয়েলি সরি। এই দ্যাখো কান ধরেছি।”

নিহিনের অভিমান আরো বেড়েছিল। বলেছিল,

“তুমি ইলিশ মাছ পছন্দ করো বলে আমি এটা রান্না করা শিখেছি। আর তুমি পাত্তাই দিলে না?”

“কে বলেছে পাত্তা দেইনি, খুব দিয়েছি। তুমি দ্যাখো, আমি জাস্ট ২ মিনিটে তোমাদের ছাদে আসছি।”

তারপর কলরব নিহিনদের বাসার ছাদে এসেছিল। নিহিন বক্সটা খুলতেই কলরব বলেছিল,

“চামচ কই?”

“আনিনি, আমি খাইয়ে দেবো।”

কলরব হেসে বলেছিল,

“কী সৌভাগ্য।”

নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছিল নিহিন। নিহিন কলরবের প্রশ্নের উত্তর দিলো।

“মনে থাকবে না কেন? আমি তোমাকে খাইয়ে দিয়েছিলাম।”

“সেটা তো ঠিক আছে, কিন্তু এটা বলতে এত লজ্জার কী আছে, তোমার দেখছি লজ্জা বাতিক খুব বেড়েছে।”

“মোটেও না। আমি লজ্জা পাচ্ছি না।”

“তাহলে তাকাও আমার দিকে।”

নিহিন তাকাল। কিন্তু কলরব যে কী দুষ্টু হাসি ঠোঁটে নিয়ে তাকিয়ে আছে, সে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা নিহিনের কর্ম নয়। চোখ ফিরিয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দিলো। চিকেন ফ্রাই হয়ে গেছে। চিকেনগুলো তেল থেকে উঠিয়ে নিতে নিতে বলল,

“তোমার দিকে তাকাতে গেলে আমার চিকেন ফ্রাই কয়লা হয়ে যাবে। খুব জ্বালাচ্ছ, যাও তো এখান থেকে।”

“জ্বালানোর তো কিছু দেখোইনি। ভাগ্যিস আমার বউ হওনি, হলে বুঝতে জ্বালা কাকে বলে।”

নিহিন মনে মনে বলল, ইশ যদি সৌভাগ্য হতো সে জ্বালায় জ্বলার! এসব ভাবতে ভাবতেই ফ্রাই প্যানটা নামাতে যাচ্ছিল নিহিন। আবার নিহিনের হাতটা ধরে ফেলল কলরব,

“আমার জ্বালায় জ্বলতে পারোনি বলেই কি গরম ফ্রাই প্যান ধরে হাত পুড়িয়ে জ্বলতে চাচ্ছ?”

এবার আতকে উঠল নিহিন। এই ফ্রাই প্যানাটা ধরলে খবর ছিল। কলরব আবার বলল,

“এভাবে রান্না-বান্না করো? এত বেখায়ালি! আমি না থাকলে তো দুবার হাত পুড়ত আজ।”

“একদম না। তোমার সাথে কথা বলতে গিয়েই তো অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি না থাকলে আরো তাড়াতাড়ি এবং নির্ঝঞ্ঝাটভাবে রান্না শেষ হতো আমার।”

বলেই হাসল নিহিন। তারপর খেয়াল হলো বেহায়ার মতো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। চোখ সরিয়ে নিল নিহিন।

রান্না শেষ করে ড্রইং রুমে আসতেই কলরব দেখল কল্প দাদার সাথে খেলছে। শওকত সাহেব ওদের দেখেই বললেন,

“মা ফ্যানের নিচে বসো। ইশ কত কষ্ট হলো।”

“কষ্টের কিছু নেই আংকেল, বাসায়ও রান্না করি। বাবা পছন্দ করেন। তাই আমার অভ্যাস আছে, আর ভালোও লাগে।”

কল্প এসে নিহিনের পাশে বসলো। কলরব বলল,

“বাবা, তোমরা গল্প করো। আমি গোসলটা করে আসি। নামাজের সময় তো হয়ে গেছে।”

এমন সময় কল্প বলে উঠল,

“পাপ্পা, আমি আজকে নামাজ পড়তে যাব না।”

“কেন?”

“আজ মিষ্টি আন্টির সাথে থাকব, এভরি ফ্রাইডে তো যাই।”

“আচ্ছা থাকিস।”

শওকত সাহেব ও কলরব নামাজ পড়তে যাওয়ার পর নিহিন কল্পকে বলল,

“কল্প, তুমি কিছুক্ষণ একা থাকতে পারবে বাবা?”

“হ্যাঁ পারব। কিন্তু তুমি কোথায় যাবে?”

“আমি গোসল করব তাহলে।”

কল্পর মুখে হাসি ফুটে উঠল,

“আচ্ছা, চলো আমি তোমাকে বাথরুম দেখিয়ে দিচ্ছি।”

এরপর কল্প নিহিনকে ওদের বেডরুমে নিয়ে গেল। রুমে ঢুকেই নিহিনের চোখ আটকে গেল কালো রঙের ফ্রেমে বাঁধাই করা দেওয়ালে টাঙানো বড় একটা ছবিতে। ১৫/১৬ বছর বয়সী একটা মেয়ের ছবি মাথার চুলগুলো দুটো ঝুঁটি করা। মাথাটা একপাশে হেলিয়ে দিয়ে হাসছে। অনেক চেঞ্জ এসেছে, তবু নিজেকে চিনতে কষ্ট হলো না নিহিনের। কিন্তু বুঝতে পারল না এ ছবিটা কলরব পেল কোত্থেকে? ও তো দেয়নি। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কল্প বলল,

“আমার মা। খুব সুন্দর না দেখতে?”

নিহিন কোনোরকমে বলল,

“হ্যাঁ অনেক সুন্দর। নাম কী তোমার মায়ের?”

“আমার মায়ের নাম পরি।”
·
·
·
চলবে..................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp