মৌনচন্দ্রা - পর্ব ০৩ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          ভীষণ খুদা লেগেছে আমার। আমার গোটা জীবনে এতটা ক্ষুদার্ত আমি কখনো হইনি। স্টেশনের পাশের একটা ভাতের হোটেল থেকে দুই প্লেট ভাত, মাংস, ডাল, সবজি সব খেয়ে নিলাম। আশেপাশের মানুষেরা যে নিজের খাওয়া ফেলে আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে, তা বেশ টের পেলাম। তবে পাত্তা দিলাম না। পেটে খিদে ও বুকে যন্ত্রণা নিয়ে মস্তিষ্ক কাজ করে না, দু'চোখ সামনে এগোনোর রাস্তা পায় না। 

শোহানের জন্য যে আমার কেমন অনুভূতি ছিল, তা সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে না পারলেও, এখন বেশ বুঝি। একুশ দিনে প্রেম-ভালোবাসা হয় ঠিকই, তবে মায়ায় জড়ানো সম্ভব নয়। যেই মুহূর্তে জানতে পারলাম, সে আমাকে তো চিট করেছে.. আমার সাথে নিজের স্ত্রীকেও চিট করেছে—সেই মুহূর্তে তাকে মন থেকে ফেলে দিতে সক্ষমতা রেখেছি আমি। আর আজ তো সে বহুদূরের এক মানুষ.. নাহ.. এক নিকৃষ্ট জানোয়ার। 

অন্যকে নিজের চেয়েও বেশি কষ্টে দেখলে আমাদের ব্যথা কমে যায়। কথাটার যথার্থ প্রমাণ পেয়েছিলাম ওইদিনই। আমি দেখলাম একটা নারীকে, যে তার নিজের স্বামীর কাছে প্রতিনিয়ত ঠকে যাচ্ছে। তারপর আমার ব্যথা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। আমার তো একুশ দিনের প্রেমিক ছিল মাত্র! 

খাওয়া শেষে টিকিট কেটে আমি ট্রেইনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাতের ট্রেইন। এগারোটা নাগাদ আসবে। আমি একা একটা মেয়ে হয়ে এর আগে কখনো এতদূর জার্নি করিনি। অন্যসময় রাত নয়টার ওপর বাসার বাইরে থাকতে ভয় পেতাম। আর আজ আমি তিনশত কিলোমিটার দূরে নির্ভয়ে বসে রেইললাইনের দিকে তাকিয়ে আছি। অবশেষে ট্রেইন এলো, আমি নিজের কাঁধব্যাগটা নিয়ে উঠে পড়লাম ভীড় ঠেলে। 

চিত্রলেখা এক্সপ্রেস! ঢাকা অভিমুখে যাত্রা। সিট নম্বর ১২ বি। জানালার পাশের সিট। আমি নির্নিমেষ চোখে জানালার বাইরের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজে হারাচ্ছিলাম। আচমকা হাতের স্যামসাং গ্যালাক্সি A5 ফোনটা নৈঃশব্দ্যে বেজে উঠল ভাইব্রেট করে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে নামটা, “খালামণি!”

আমি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে খালামণি চিন্তিত স্বরে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন,
-“কী ব্যাপার? কোথায় আছিস তুই? কতগুলো কল করেছি? তোর বাপ যে এমন বেআক্কেলের মতো কাজ করবে, তা কে জানত? আমি দুপুরে ঘটনা জেনে বিকেলের মধ্যেই তোর বাড়িতে চলে এসেছি। কিন্তু তোকে পাচ্ছি না। কোথায় আছিস? বল।”
-“খালামণি, আমি চট্টগ্রামে।”
-“চট্টগ্রামে? মানে? কেন? তুই ওখানে কার কাছে গেছিস? আরু? কোনো বিপদে পড়েছিস, মা? কণ্ঠ অমন শুকনো কেন?”
-“তুমি চিন্তা কোরো না, আমি ঢাকা ফিরছি। ট্রেইনে এখন। তোমার বাড়িতেই আসব।”
-“আচ্ছা, সাবধানে আয়, মা। আমি স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে রাখবো।”
-“খালামণি, আমি এখন রাখি?”
-“আচ্ছা।”

আমি কল কেটে পাশের সিটে দুপুরের সেই মুখটাকে দেখে আঁতকে উঠলাম। চোখ বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞেস করলাম,
-“আপনি এখানে কেন?”

সে আমাকে পালটা প্রশ্ন করল,
-“আপনি এখানে কেন?”

আমি থতমত খেয়ে উত্তর দিলাম, 
-“ঢাকা যাচ্ছি, তাই। আপনি?”
-“আমিও ঢাকা যাচ্ছি।”
-“কিন্তু আমার পাশের সিটেই? এতটা কাকতালীয় কীভাবে?”

লোকটা এ পর্যায়ে অদ্ভুতভাবে তাকাল,
-“কাকতালীয়? হাইওয়েতে ওই ট্রাক এক্সিডেন্টের সময় ড্রাইভারকে একটা স্কুটিতে উঠিয়ে দিয়ে আসতে আসতে দেখি আপনি উধাও।”

মিনমিনে স্বরে বললাম,
-“আপনি বলে যাননি।”
-“আমি বলেছি একটু ওয়েট করতে, আপনি শোনেননি।”

তাহলে তখন এটুকুই বলেছিল? শুনলাম আমি। বুঝলাম। মাথা নাড়লাম আলগোছে। তারপর বললাম,
-“ওও আচ্ছা।”

সে জানাল,
-“বাবার জন্য বাড়ি আসা লেগেছিল। কিন্তু ছুটি নেই। এক্সাম চলছে। তাই ঢাকা ফিরছি। এরমধ্যে খিদে লাগায় ওই হোটেলে ঢুকেছিলাম। দেখলাম একুশ দিনের ক্ষুদার্ত ব্যক্তির মতো ডানে বামে না তাকিয়ে খেয়ে যাচ্ছেন।”

আবারও একুশ! বড়ো দুঃখী মনে তাকিয়ে রইলাম। সে তার মধ্যেই বলে গেল,
-“আমি যে আপনার সামনের টেবিলেই বসেছিলাম, আপনি সেটুকুও দেখেননি। টিকিট কাটার লাইনেও আপনার পিছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইনফ্যাক্ট আপনি যে পিলারের ওইখানে বসে ছিলেন, ওইখানে আমিও বসে ছিলাম।”

আমার এবার নিজের ওপর হাসিই পেল। তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি খুব! যা হচ্ছে, তা তো স্বাভাবিক না। যা হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। কী হওয়ার কথা, তাও জানি না। আমি সম্ভবত পাগল হয়ে গেছি। আনমনে তাকালাম জানালার বাইরে। টানা আটাশ ঘন্টা পর অবশেষে একটু হাসলাম। 

সে বলল,
-“আমি যদি একটু ফ্লার্ট করি, আপনি কি কিছু মনে করবেন?”

কী অনুমতি রে বাবা! এবার শব্দ করে হেসে উঠলাম আমি,
-“না, নিশ্চয়ই করুন। সুন্দরের প্রশংসা করা উচিত।”
-“নিজেকে সুন্দরী দাবি করছেন?”
-“এখানে দাবি করার কিছু নেই। আমি আমার মায়ের মতো হয়েছি। আর আমার মা অসম্ভব সুন্দরী একজন মানুষ ছিলেন।”
-“ছিলেন?”
-“জি, উনি জীবিত নেই। দুই বছর আগে মারা গেছেন। স্ট্রোক করে। কিছুদিন ধরেই আমাকে বলছিলেন, শরীর খারাপ। আমি গুরুত্ব দেইনি। এরপর একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি মাকে লিভিং রুমের ফ্লোরে শুইয়ে রাখা হয়েছে।”

আমার কথা শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠল,
-“কষ্ট দিয়ে ফেললাম?”

স্মিত হাসলাম,
-“না। মৃত্যু সহজ বিষয়, এটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া উচিত। আপনার নাম কী?”

সে তারপর নিজের নাম জানাল, 
-“নাওয়াজ। আপনি?”
-“আরাধ্যা..”

তারপর আরও টুকিটাকি দুটো কথা শেষে দুইজন আবারও গায়ে জড়িয়ে নিলাম চির-অপরিচিতির চাদরটা। বুকের ভেতর থেকে বেরোতে লাগল দীর্ঘশ্বাস যত। জানি না কেন, জানালার বাইরে তাকিয়ে টের পেলাম, “রাতের ট্রেইনগুলো সবসময় কিছু রেখে যায়। চিনে ফেলার মতো নীরবতা, ভুলে যাওয়ার মতো চাওয়া...”

সে রাতে ঘটল আরেকটা ঘটনা। আখাউড়া স্টেশনের কাছাকাছি এসে আমাদের ট্রেইনটা এক্সিডেন্ট করল। প্রথমে যখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, তখন টের পাচ্ছিলাম—একটা শক্ত হাত আমার একটা হাত চেপে ধরেছে, আবারও কেউ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে.. মনে হচ্ছিল এমনটা আগেও হয়েছে, হুবহু এরকমটাই ঘটেছে। এমনই সংঘাতময় পরিস্থিতি, এমনই মৃত্যুভয়, এমনই রাত-দুপুর আর এমনই মায়াভরা দুইচোখ! ডেজ্যা-ভু...

অল্পস্বল্প ইনজ্যুরড হলাম আমি। অনেকে আহত হলো, নিহতের সংখ্যাও বেশ বড়ো। চারপাশে চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্না! হঠাৎ ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার পর চকিতে আমার ডানপাশে তাকালাম। আর পাশের মানুষটা? তাকে খুঁজে পেলাম না কোথাও। অকস্মাৎ ঘূর্ণিঝড়ের সাথে তাল মিলিয়ে যে লোকটা খানিক স্বস্তি হিসেবে এসেছিল, সে ঝড়ুয়া বাতাসের সাথেই একসময় মিশে গেল, হারিয়ে গেল... 
·
·
·
চলবে…………………………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp