সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ - পর্ব ০৪ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প


          বাইকটা এতো দ্রুত এসেছে যে খেয়াল করতে পারে নি প্রাপ্তি। একটু হলেই বাইকটা তার উপর উঠে যেত। তাকে এমন পড়ে যেতে দেখে উপস্থিত সকলের মাঝে যেনো হাসির রোল পড়লো। বেশ মনোরঞ্জিত হয়েছে তারা। এদিকে বাইকের চালক এবং তার পেছনের ব্যক্তির কোনো হেলদোল নেই। নির্লিপ্ত, দায়সারাভাবে বাইকটা পার্ক করলো তারা। এদের প্রাপ্তি চিনে। সো কল্ড সিনিয়র ভাই আর তার চামচা। এই চামচা ভাইয়াই তাকে তেলাপোকা বলেছিলো। প্রাপ্তি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। নিজের জামা ঝেড়ে নিলো ত্বরিত গতিতে। নুহাশ বাইক থেকে নেমে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেললো। শ্বাস একেবারে গলায় আটকে আছে তার। অয়ন এতোটা জোরে বাইক চালাচ্ছিলো যে হৃদপিন্ড মুখের কাছে চলে এসেছিলো। মনে হচ্ছিলো পেছন থেকে উড়েই যাবে। কোনমতে হ্যান্ডেল ধরে বসেছিলো। আশেপাশে কি হচ্ছে সেদিকে তার নজর নেই। এদিকে অয়ন বাইকের চাবিটা পকেটে পুরে নুহাশকে ছাড়াই পা বাড়ালো ক্লাসের দিকে, ঠিক তখনই প্রাপ্তি পেছন থেকে বলে উঠলো,
 “আপনি কিছু ভুলে যাচ্ছেন”

নুহাশ এবার সামনে তাকালো। মোতালেব স্যারের ভাগ্নিকে দেখে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো। প্রাপ্তি তাকে কিছুদিন আগেই বড়মাঠে ভীষণ অপমান করেছিলো। মেয়েটির সাহস আছে এতে সন্দেহ নেই। তাই তো সে অয়নকে আটকানোর সাহস পেয়েছে। সিনিয়র দেখে ভয়ে মাথা নিচু না করে অয়নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে সে। এই সাহসের কারণ একমাত্র তার মামা। অয়ন খুব অনীহার সহিত পেছনে তাকালো। তার গাঢ় নয়ন প্রাপ্তিতে আবদ্ধ। নির্লিপ্ত স্বরে শুধালো,
 “আমাকে বলছো?”
 
তাই এই মেয়েকে ঘাটাটা বোকামি হবে। কিন্তু অয়নকে বলা হয় নি। অয়নের নির্লিপ্ততায় প্রাপ্তি কিঞ্চিত বিরক্ত হলো,
 “আপনার মাথায় সমস্যা আছে? নাকি ব্রেইনের জায়গায় ভুষি ভরা? প্রতি কথা দেখছি দু-তিন বার বলা লাগে। এই ব্রেইন নিয়ে আপনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন? হ্যা, আপনাকেই বলছি”

অয়নের দৃষ্টি সূঁচালো হলো। পকেটে হাত পুরে এগিয়ে গেলো। ফিঁচেল হাসি ঠোঁটে আঁকিয়ে শুধালো,
 “কি ভুলছি খুকি?”

অয়নের নির্লিপ্ততা প্রাপ্তিকে অবাক করছে না। বরং এই মাথাপাগল লোকটা সম্পর্কে ধারণাটা পরিষ্কার করছে। ফলে বিদ্রুপ টেনে বলল, 
 “একটু আগে যে কাজটি করেছেন সেটা তো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ করতে পারে না। সে থেকে বুঝাই যায় আপনার টপ ফ্লোরে বেশ ঝামেলা আছে। কিন্তু সিনিয়র হিসেবে সামান্য কার্টেসি থাকা উচিত। আমি ব্যাথাও পেতে পারতাম। আপনার বাইকের চাকা আমার পায়েও উঠে যেতে পারতো। তাই আমার একটা সরি প্রাপ্য। আপনি সেটা ভুলে গেছেন”

প্রাপ্তির কথায় অয়ন তীক্ষ্ণ নজরে দেখলো প্রাপ্তিকে। এলোমেলো জটলা চুল, ফাঁটা শুষ্ক মুখবিবর আর কুচকানো, ত্যানা জামা। পায়জামার এক অংশের নিচে ধুলো লেপ্টে আছে। ওড়নাটা কোনোমতে গলায় জুলছে। অয়ন তার নিচের ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হাসলো। সেই হাসিতে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য আর পরিহাস মিশ্রিত। ফলে প্রাপ্তি কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হলো। এদিকে নুহাশ ঠাস করে কপালে চাপড় বসালো। অয়ন শুধু এই মামা ভাগ্নীকে পায় বাইক দিয়ে উড়ানোর জন্য? অয়নকে কিছু বলার আগেই সে হেটে ঠিক প্রাপ্তির মুখোমুখি দাড়ালো। তাদের দূরত্ব দু ইঞ্চির। লম্বা মানুষটা একটু ঝুকলো। চোখে চোখ রেখে বলল,
 “খুকি, আমার বাইকটা আমার খুব পছন্দের। আমি নিজে সেটার যত্ন নেই, পরিষ্কার করি। ইভেন চাকাটাও না তোমার থেকে বেশি পরিষ্কার। বরং তোমার পা ওটায় লাগলে তোমাকে সরি বলতে হতো। যেহেতু লাগে নি, ইউ শুড বি গ্রেটফুল। মামলা ডিসমিস আসামী খালাস”

নুহাশের মুখ হা হয়ে গেলো। সে অয়নের এমন আচারণ নিতেই পারছে না। অয়ন মেয়েদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে না। কটু কথা বলে না। অন্তত জুনিয়রদের সাথে তো নয়। জুনিয়রদের সামনে তার গলায় থাকে মিষ্টতা। অথচ আজ যেনো সেই গলার ঝাঁঝই আলাদা। সে এতোটা কটুক্তি করছে তাও এই মেয়ের সাথে। ব্যাপারটা খারাপ হতে পারে। এই মেয়ে যে সে নয়, খাইশটা মোতালেবের ভাগ্নী। ফলে নুহাশের গলা শুকিয়ে এলো। থামাতে চাইলো অয়নকে। তখনই প্রাপ্তি বলে উঠলো,
 “আমি স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ারে কমপ্লেন করবো আপনার নামে”
 “এজ ইউ উইশ”

দায়সারা উত্তর দিলো অয়ন। এদিকে নুহাশের পেটের ভেতরে ভয়রা ব্যথা সৃষ্টি করলো। তাড়াতাড়ি অয়নকে টেনে নিলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
 “বাদ দে ভাই, এই মেয়ের সাথে লাগিস না”
 “কেন, ও কি প্রেসিডেন্টের মেয়ে নাকি? আজাইরা”

বলেই নুহাশের হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর শিশ বাজাতে বাজাতে চলে গেলো। প্রাপ্তি স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো। রাগে, অপমানে তার একরোখা বক্ষস্থল কাঁপছে। ব্রহ্মতালু জ্বলছে রীতিমত। ধীরে ধীরে অপছন্দের শীর্ষপর্যায়ে চলে যাচ্ছে এই পুরুষটি। নুহাশ তাকে বোঝানর জন্য এগিয়ে আসতেই সে একটা ভয়ানক কাজ করলো। ঝড়ের গতিতে অয়নের বাইকের চাকার মধ্যে নিজের গায়ের সর্বোচ্চ শক্তিতে কলম ঢুকিয়ে দিলো। বিকট শব্দ হলো, টায়ার ফেটে যাওয়ার। অয়ন পিছনে তাকালো শব্দ শুনে। স্তব্ধ হয়ে গেলো তার চোখ। অথচ প্রাপ্তি নির্বিকার। সে হনহন করে তার পাশ কাটিয়ে হেটে চলে গেলো। এদিকে নুহাশ আয়াতুল কুরসী পড়ে বুকে ফু দিলো কেনো যেনো মনে হলো সাংঘাতিক কিছু হবে। অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। সে কিছু বলতে গেলে নুহাশ আটকালো, বললো,
 “দোস্ত লেট হচ্ছে। চল”

অয়নের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রাপ্তি যাবার পানেই নিবদ্ধ রইলো।

***

মোতালেব সাহের বোর্ডের সামনে পড়াচ্ছেন। ক্লাসের প্রথম সামনের দরজাটি বন্ধ। তিনি সময় নিয়ে প্রচন্ড কড়া। পাঁচ মিনিট দেরি হলে তার ক্লাসে তিনি ঢুকতে দেন না। কিন্তু আজ সেই সময়টাও দেন নি। বন্ধ করে দিয়েছেন দরজা। কিন্তু পেছনের দরজাটি খোলা। নুহাশ ফিসফিসিয়ে বললো,
 “ব্যাটা ঠিক আটকায়ে দিলো। ইশ! মাত্র তিন মিনিট। এটেন্ডেন্স গেলো রে”
 “পেছনের দরজা খোলা তো”
 “তাতে কি? ধরা পড়লে রক্ষা হবে না”
 “ধরা পড়লেই না?”

 বলেই অয়ন পেছনের দরজা দিয়ে নিঃশব্দ পায়ে ঢোকার চিন্তা করলো। তার দেখাদেখি নুহাশও তাকে অনুসরণ করলো। মোতালেব তখন বোর্ডের দিকে তাকিয়ে কিছু লিখছিলেন। লেখা শেষে ছাত্রদের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলেন, চোরের মত ক্লাসে প্রবেশ করছে অয়ন এবং নুহাশ। সাথে সাথেই তিনি চটে উঠলেন,
 “হেই ইউ, কি করছো তোমরা?”

 মোতালেব সাহেবের কন্ঠ শুনতেই মাথানত করে দাঁড়িয়ে পড়লো দুজন। ভয়ে বুক কাঁপছে নুহাশের। মোতালেব সাহেবের চোয়াল কঠিন হয়ে গেলো অয়নকে দেখে। ছেলেটি তার চক্ষুশূল। পায়ের ঘটনাটা এখনো ভুলতে পারেন নি। আফসোসের ব্যাপার ভার্সিটির বাহিরের ঘটনায় ভার্সিটির ভেতরে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। এটা শিক্ষক নৈতিকতার সাথে যায় না। ফলে তিনি তক্কে তক্কে আছেন কখন অয়নকে শায়েস্তা করা যায়। যেমন এখন। অয়ন মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। সেমিস্টার কেবল শুরু। কিন্তু তার ইতিমধ্যে দুটো ক্লাস মিস হয়ে গেছে। মোতালেব সাহেব রাগী স্বরে হুংকার ছাড়লেন,
 “কার পারমিশনে রুমে প্রবেশ করছো তুমি? এটা তোমার ঘরের ডাইনিং রুম? যখন খুশি ঢুকে পড়বে? এটা আমার ক্লাস, আমার পারমিশন বাদে এই ক্লাসে আমি থাকাকালীন সময় প্রধানমন্ত্রীরও ঢোকার এখতিয়ার নেই। কি ভাবো নিজেকে? আর কয়টা বাজে আমার ক্লাসে একমিনিট লেট হলে আসার প্রয়োজনীয়তা নেই এটা তো অজানা নয়”

নুহাশ বুঝলো আজকের দিনটা ভালো নয়। প্রথমে ভাগ্নী এখন মামা। ফলে অনুনয়ের সাথে অনুরোধ করলো,
 “সরি স্যার, আর হবে না। আসলে একটা দূর্ঘটনা হয়ে গিয়েছিলো, তাই দেরি হয়ে গেছে”
 “ওহ! মহাশয় কি আবার কারোর পা ভেঙ্গেছেন?”
 “না স্যার”
 “নো এক্সকিউজ, গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস। ইউ আর লেট”

তখন অয়ন বলে উঠলো,
 “স্যার, আমরা জাস্ট তিন মিনিট লেট। একটু কন্সিডার করা যায় না?”

অয়নের নির্লিপ্ত কথাটা মোতালেবের টগবগে মেজাজে ঘি ঢাললো যেনো। প্রচন্ড ক্রোধমিশ্রিত স্বরে বললো,
 “একে দেরি করে ঢুকে মুখে মুখে তর্ক করছো”

নুহাশের আক্কেলগুড়ুম হবার যোগাড় হলো। অয়নের আজ হলো কি? প্রথমে প্রাপ্তির সাথে বাঁধালো এখন তার মামার সাথে। আজ শুধু এদের সাথে ঝগড়া লাগানোর তালেই আছে যেন। নুহাশ পাশ থেকে চিমটি কাটলো থামানোর জন্য। কিন্তু অয়নের থামার নাম নেই। অয়ন নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
 “স্যার, আমরা তো আপনাকে ডিসটার্ব করছি না। আপনি যেন ডিসটার্ব না হন, সেজন্য পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকছিলাম। আপনি আমাকে অপছন্দ করতেই পারেন, তাই বলে এভাবে রোষ দেখাবেন?”

অয়নের কথাটায় ক্লাসের শান্ত পরিবেশ গমগমে হয়ে গেলো। কানাঘুষা শুরু হলো। দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো মোতালেব সাহেবের। রাশভারী স্বরে বললেন,
 “আউট, গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস। শুধু তাই নয়। আমার ক্লাসের কোনো এটেন্ডেন্স পাবে না তুমি। পরীক্ষা কি করে দাও আমি দেখে ছাড়বো”

নুহাশ অনুনয় করে বললো,
 “সরি স্যার, আমাদের একটু সুযোগ দেন”
 “নো মিনস নো, গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস। নয়তো অয়ন শিকদারের সাথে তোমাকেও এটেন্ডেন্সে জিরো দিবো। এই আবরার পেছনের গেটটা আটকে দেও”

মোতালেবের হুংকারে একেবারে চুপসে গেলো নুহাশ। নতমস্তকে বেরিয়ে পড়লো অয়ন এবং নুহাশ। সিআর আবরার উঠে দরজা লাগিয়ে দিলো। অয়নের মুখখানা শক্ত হয়ে আছে। মোতালেবের কোর্স মোট দুটো। দুটো সাবজেক্টে এটেন্ডেন্স জিরো। অর্থাৎ এবার দুটো সাবজেক্টের পরীক্ষায় বসতে পারবে না। যার অর্থ ফেইল। মোতালেব যে তার পা ভাঙ্গার শোধ নিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নুহাশ চোখ মুখ খিঁচিয়ে বললো,
 “তোর কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে? একটু সরি বললেই তো সব মিটমাট হয়ে যেত। সকাল থেকেই দেখছি অহেতুক ঝগড়া করছিস। সমস্যা কি?”
 “সমস্যা তো এখন হবে”

অয়ন ঠান্ডা গলায় বললো। নুহাশ চমকে শুধালো,
 “কি করবি তুই?”
 “সময় হলেই দেখবি”

বলেই গটগট করে বেরিয়ে পড়লো। নুহাশ নিচের কপাল চাপড়ালো। নেহাৎ ভালো বন্ধু, নয়তো এই পাগলের পাল্লায় কখনো পড়তো না। গাল ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর পিছু নিলো অয়নের। 

***

ভার্সিটির পার্কিং এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন এবং নুহাশ। নুহাশের চোখে কৌতুহল। অয়নের মস্তিষ্কের ভেতর ঠিক কি চলছে বুঝতে পারছে না সে। ফলে বিরক্তি বাড়ছে। এতো সাসপেন্স তৈরি করার কি আছে বুঝতে পারছে না। অয়ন আশপাশ দেখল। প্রশাসনিকের ঠিক পাশেই পার্কিং। এই পার্কিং-এ রয়েছে মোতালেবের পয়ত্রিশ বছর পুরানো মোটরসাইকেল। তার শিক্ষক জীবনের সূচনার সময়ের মোটরসাইকেল। ব্যাটা এখনো বদলায় নি। নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর থেকেও বেশি স্নেহের এই মোটরসাইকেল। কারণ চাকরির শুরুর জীবনের টাকা জমিয়ে জমিয়ে কেনা। তখন তার বেতন কত ছিল? মাত্র আটশত টাকা। কতটা কষ্ট করে টাকা জমিয়েছে কেবল সেই জানে। তাই তো এখন লাখের উপর ইনকাম হওয়া সত্ত্বেও তার এই আদিমযুগের যান পরিত্যাগ করা হয় নি। সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে এই মোটর সাইকেল তার যাত্রার সাথী। তার মোটরসাইকেলের একটি নামও আছে যা ছাত্রছাত্রীরা দিয়েছে। “লালবানু” কারণ এই মোটরসাইকেলের রঙ লাল। আজ এই “লালবানু” এর ইজ্জত লুটতে এসেছে অয়ন। মনে মনে দানবী হাসি হাসলো সে। নুহাশ ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেই বাধা দিল,
 “ভাই, এমন কিছু ভুলেও করিস না। এখানে সিসি টিভি ক্যামেরা আছে। উপর থেকে এটা মোতালেবের লালবানু, দি মোতালেবের লালবানু। ও খায়ে ফেলাবে”
 “আর কি খাবে? এমনেই তো দুই সাবজেক্টে ফেল। আর সিসিটিভি? ওইটার কাজ হয়ে গেছে। তুই আশেপাশে নজর রাখ। যা করার আমি করছি”

বলেই পার্কিংএ ঢুকে পড়লো। আস্তে করে লালবানুর দু চাকার হাওয়া বের করে দিলো। হেডলাইট ভেঙ্গে দিলো নিষ্ঠুরতার সাথে। স্ক্রাচে স্ক্রাচে দগ্ধ হলো লালবানু। ফ্রন্ট মিররটা মাটিতে থাকা একটা ইট দিয়ে ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে ফেললো। বাম্পারটা ইট দিয়ে এবড়োখেবড়ো করে ফেললো। ভাগ্যিস এখন ব্যস্ত সময়। সবাই ক্লাসে ব্যস্ত। এইসময়টা এই জায়গা থাকে নিরব, জনশূণ্য। নুহাশ শুধু দোয়া পড়ছিলো আর অয়ন নিজের রাগ কমাচ্ছিলো। রাগ কমে যেতেই থেমে গেলো অয়ন। অতঃপর হাসতে হাসতে পার্কিং থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনের দিকেই যাবার জন্য পা বাড়ালো। ঠিক তখনই পথে ধাক্কা খেলো প্রাপ্তির সাথে। প্রাপ্তিকে দেখার সাথে সাথেই নুহাশ কেঁপে উঠলো। ভয়ে বুকের স্পন্দন বেড়ে গেলো। অয়নের হাসি মিলিয়ে গেলো। প্রাপ্তির সুক্ষ্ম নজর তার উপর। নুহাশ পাশ থেকে বললো,
 “অয়ন, ধরা পড়ে গেলাম নাকি?”

অয়ন নিজেকে সামলে নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন চিত্তে শুধালো,
 “কি হয়েছে?”

প্রাপ্তি হাত ঘষতে ঘষতে একবার পার্কিং এর ভেতর উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্ঠা করলো। অয়ন ঠিক তখনই ঠিক তার সামনে ঢালের মত দাঁড়ালো, ঝাঁঝালো স্বরে শুধালো,
 “কি হয়েছে? দেখে চলতে পারো না। আর এখানেই কি করো?”
 “আমি উদ্ভট শব্দ শুনলাম, কি করছিলেন আপনারা পার্কিং এ?”
 “মাটি কাটতেছিলাম, এখন কি তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি আমি কোথায় কি করছিলাম! নাকি পার্কিং এ গেছি বলেও তুমি কমপ্লেইন করবে? গো অন। যাও কমপ্লেইন কর। আমার বাইকের চাকা ফাঁটিয়ে শান্তি হয় নি না?”

অয়নের নির্লিপ্ততায় গলা শুকিয়ে গেলো নুহাশের। বুকের স্পন্দন বেড়ে গেলো হাজারগুন। অয়নের হাত টেনে চুপ করার ইশারা করলো। প্রাপ্তি কিছু বলতে যাবার আগেই পেছন থেকে রাইসার কন্ঠ কানে আসলো। সে এখন ব্যাংকে যাবে কোর্সের রেজিস্ট্রেশনের জন্য। ক্লাস হবে না এখন, তাই এখনই রেজিস্ট্রেশনটা করে ফেলতে হবে। ফলে কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না। এদিকে নুহাশ পাশ থেকে বলেই যাচ্ছে,
 “বাপ, থাম, থাইম্মা যা”
 
প্রাপ্তি কিছু বললো না। প্রখর দৃষ্টি বর্ষণের পর চলে গেলো রাইসার সাথে। অয়ন এবার নুহাশের উপর ক্ষেপে গেলো,
 “কি হইছে? বারবার চিমটি মারতেছিলি কেন? আর এই মাইয়্যারে দেইখ্যা মিনমিন করতেছিলি কেন? সব হাওয়া চলে গেছে?”
 “ভাই, এই মাইয়্যা যে সে মাইয়্যা না। এইডা মোতালেবের ভাগ্নী”
 “কিহ?”

অয়ন যেন আকাশ থেকে পড়লো। নুহাশ কাঁদো কাঁদো সুরে বলল,
 “হয়, আমগোর মার্ক তো গেছে। এই মাইয়্যা যদি আমাদের দেইখ্যা নেয় আমরা শেষ। মোতালেব তখন লালবানুর ইজ্জত হরনে আমাদের ফাঁসি দিব। ওর কলজ্জার টুকরা এই লালবানু”

অয়ন রাগী স্বরে বললো,
 “তুই আমারে আগে বলবি না”
 “কইতেছিলাম, থাম, থাম”
 “আরে থাম থাম না বইল্লা ভাগ্নী ভাগ্নী বলতি”
 “হালার পুত সুযোগ কই দিসোস তুই? হুদাই বেটির এত তেজ। ভর্তি হওয়ার পর থেকে কোনো র‍্যাগ খায় নাই বেটি। এখন তেলাপোকা যাইবো মোতালেবের কাছে আর আমাদের বারোটা বাজাইবো”

অয়নের মাথা ফাঁকা হয়ে গেলো। গলা শুকিয়ে গেলো। এই ভাগ্নীর কোনো ভরসা নেই। যদি মোতালেবকে বলে দেয় অয়ন শেষ। শুধু শেষ নয় একেবারেই ফিনিশ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp