“শেহজাদী, আমাদের পালাতে হবে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। আপনি যদি সাহায্য করেন তবে আমি আপনাকে বাঁচাতে পারবো”
রুমেলিয়া বিস্মিত হলো না খুব একটা। হুসনাতকে দেখতে যেমন-ই মনে হোক না কেন, সে যে বুদ্ধিমতী সেই আঁচ পূর্বেই পেয়েছে রুমেলিয়া। তাবিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা এতোটা সহজ নয়। হুসনাত শুধু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নি। নিজের প্রাণ রক্ষা করে এসেছে তাবিয়া এবং ইরহানের থেকে। ইরহানের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে মাত দেওয়ার মত ক্ষুরধার বুদ্ধিমান কেউ এই সাম্রাজ্যে নেই। অথচ মেয়েটা প্রতিনিয়ত তার সাথে সাপসিঁড়ি খেলায় মত্ত। সুতরাং তার মস্তিষ্ক যে জংপড়া নয়, সেটা আন্দাজ করা খুব কঠিন নয়। কিন্তু রুমেলিয়ার মস্তিষ্কে প্রথম যে চিন্তা হানা দিল তা হলো সেই দুর্গম দূর্গে নিরস্ত্র হুসনাত কি করে তাকে বাঁচাবে। হুসনাত যে ছুরি চালাতে পারে না, ঘোড়া চালাতে পারে না, মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে থাকে সে কি করে রুমেলিয়ার প্রাণ বাঁচাবে? রুমেলিয়ার এখনো মনে আছে মেয়েটি তাবিয়াকে ভীষণ ভয় পায়। একবার ভুল ক্রমে গোসলের পানি অধিক গরম হয়ে গিয়েছিলো। রুমেলিয়ার শুভ্রবদন লাল হয়ে গিয়েছিলো। সে তখন কুর্নিশ করে আকুতি করেছিলো, যেন তাকে হত্যা না করা হয়। শিকারের দিনও ঘোড়ায় চড়তে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলো মেয়েটি। যখন রুমেলিয়া এবং মাকবুল শিকার করছিলো মেয়েটি রক্ত দেখে মুখ কুঁচকাচ্ছিলো। তাহলে এই মেয়ে কি করে তাকে বাঁচাবে? রুমেলিয়া কিছু বলতে পারলো না। দুজন লোক খাবার নিয়ে এসেছে। হাতের শেকল খোলা হয়েছে। এখন তাদের সামনেই খেতে হবে। হুসনাত তখন ভারী স্বরে বললো,
“আমি খাব না এই খাবার”
রুমেলিয়া ভীত চোখে তাকিয়ে আছে। প্রহরী দুজন হুসনাতের কথা শুনতেই বিদ্রুপ টেনে হাসলো, টিটকারী করে বললো,
“শেহজাদীর কি এখানে মোরগ পোলাও চাই?”
রুমেলিয়া বুঝতে পারলো এখানে সবাই হুসনাতকেই শেহজাদী ভাবছে। আর তাকে তার দাসী। এর কারণ তাদের পোশাক। হুসনাতের গায়ে শেহজাদীর পোশাক। হুসনাত সেই ভুলধারণাকেই আরোও বাস্তবায়িত করার চেষ্টায় লিপ্ত। শেহজাদীর মুখে এমন শুকনো রুটি আর খেঁজুর রচবে না এটাই তো স্বাভাবিক। শেহজাদী বদমেজাজের অধিকারী হবে। রুমেলিয়া চুপ করে দেখতে লাগলো হুসনাতের অভিনয়। মেয়েটি হুট করেই নিখুঁত অভিনেতা হয়ে গেলো। তার বসার ভঙ্গিমা, দৃষ্টির ধাঁর কিংবা হোক কথা বলার ভঙ্গি কিছুই দাসের মত নয়। যেন কোনো শেহজাদী সে। হুসনাত গম্ভীর স্বরে বললো,
“তোমাদের ঔদ্ধত্য চারদিন সহ্য করেছি, কিন্তু আর নয়। যাও নিজের দলনেতাকে বলো আমার জন্য মানুষের খাবার যোগাড় করতে। মনে রেখো আমি তাবরেজের শেহজাদী। আমার কিছু হলে আমার সাথে তোমরাও জাহান্নামে যাবে”
তার কণ্ঠের ধারে কিছুটা বিচলিত হলো যে প্রহরীরা। তারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছিলো। সেই সুযোগে হুসনাত নিজের কোমড়ের কাপড়ের ভাঁজ থেকে বের করে কিছু একটা রুমেলিয়ার খাবারে মিশালো। একটা স্বচ্ছ কাঁচের বোতলের স্বচ্ছ দ্রবণ। রুমেলিয়ার দিকে চাইতেই সে বললো,
“আপনি খাবারটা খান শেহজাদী। ভয় নেই, ওটা বিষ নয়”
রুমেলিয়া দ্বিধান্বিত, সন্দিহান। এদিকে প্রহরীদের একজন প্রস্থান করলো লামকে শেহজাদীর বার্তা দিতে। মশাল জ্বলছে ক্ষীণ। ঘরে কেবল রুমেলিয়া, হুসনাত এবং একজন প্রহরী। রুমেলিয়া এক টুকরো রুটি মুখে দিতেই তার পেট মুচড়ে উঠলো। গড়গড় করে বমি করে দিলো সে। প্রহরী তার বমি করা দেখে ঘাবড়ে গেলো। তার অমনোযোগী এবং ঘাবড়ানো দশার সুযোগে খাবারের প্লেট দিয়েই সজোরে মাথায় আঘাত করলো হুসনাত। আঘাতটা অনেক জোরে ছিলো বলেই প্রহরী সাথে সাথেই জ্ঞান হারাল। হুসনাত রুমেলিয়ার হাতখানা ধরে বললো,
“আমাদের পালাতে হবে শেহজাদী। এখনই পালাতে হবে”
বমি করার দরুন রুমেলিয়ার শরীরখানা দুর্বল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। হুসনাত তাকে সাথে সাথেই আরেকটি দ্রবণ খাওয়ালো। মেয়েটি তার কোমড়ের কাপড়ের ভাঁজে ঠিক কি কি এনেছে কে জানে? তবে এই দ্রবণটা খাওয়ার পর যেন একটু বমিভাব কমলো রুমেলিয়ার। হুসনাত বললো,
“কিছুক্ষণ দূর্বল লাগবে, একটু পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের কাছে সময় নেই শেহজাদী। দ্রুত আমাদের পালাতে হবে”
অনেক কষ্টে দাঁড়ালো রুমেলিয়া। হুসনাতের কাঁধে ভর করে সে হাটতে লাগলো। অবশেষে চারদিন বাদে বন্দি, নির্জন, অন্ধকার ঘর থেকে মুক্তি পেলো সে।
*****
খোরাম্মাবাদের দূর্গের প্রধান ফটকে প্রবেশ করেছে একজন প্রহরীর লাশ সমেত ঘোড়া। প্রহরীটি সীমান্তের। তাকে হত্যা করে, তার পিঠে বিদ্ধ তলোয়ারে ফরমান পাঠানো হয়েছে। ফরমানে লেখা,
“শেহজাদীর মুক্তিপণ এসফাইন। এসফাইন আলীউদ্দিন মোহাম্মদের ছিলো, থাকবে”
ফরমান আসার পর থেকেই সবার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। এতোটা সময় নানা শত্রুর কথা চিন্তা করা হয়েছিলো। কিন্তু এই কথাটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো সবার। সুলতান মালেক শাহ কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন ফরমানের দিকে। কতটা সাহস হলে কেউ নাকের নিচ থেকে শেহজাদীকে অপহরণ করতে পারে? নিশ্চিত পুরো পরিকল্পনাটা বহু আগের। তাই দরবারে ডাকা হলো এই শিকার উৎসবের মুল আয়োজন ইখতিয়ারকে। ইখতিয়ার উজির আবদালীর উজির মন্ডলীর একজন। আবদালীর অতি নিকট একজন। আবদালীর বড় পুত্র শাহনেওয়াজের স্ত্রীর ভাই। তার দায়িত্বে ছিলো সম্পূর্ণ আয়োজন। অথচ এই আয়োজনের মধ্যে এমন ষড়যন্ত্র। শেহজাদীকে অপহরণ না হয়ে সুলতানের উপর আক্রমণও হতে পারতো? সে গাফিলতি করেছে। অথচ সেই জড়িত এসবে। আলীউদ্দিনের একমাত্র মেয়ে তার স্ত্রী। শ্বশুরের বদলা এবং নিজের শ্যালককে সহযোগীতা দুই-ই সে করতে পারে। ইখতিয়ার যখন উপস্থিত হলো দরবারে, তাকে দেখা গেলো ভীত, সঙ্কিত। মালেক শাহর মেঘের মত গম্ভীর কণ্ঠ গুঞ্জলো,
“দায়িত্ব যত বড়, সাবধানতা তত বেশী হওয়া উচিত ছিলো। শিকার উৎসবের আয়োজনের দায়ভার আপনার ছিলো ইখতিয়ার, আপনার দায়িত্বে আমার কন্যা কি করে অপহরণ হলো? তাও আপনার আত্মীয় করেছে এই কাজ। কি উত্তর আছে আপনার কাছে?”
“হুজুর আমি কিছু করি নি। আমি সত্যি কিছু করি নি। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি যেন কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়”
“তাহলে আমার রক্ষীকে হত্যা করে আমার কন্যাকে ওরা দেবার সাহস পেলো কি করে? আমার সীমান্তের প্রহরীকে মেরে আমাকে হুমকি দেয়! আমি ওর গর্দান কেটে ফেলবো। তার পূর্বে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে”
আতংকিত হলো ইখতিয়ার। সে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। কিন্তু মালেক শাহর দয়া হলো না। তার নির্দেশে দরবারেই এক কোপে গর্দান কেটে ফেলা হলো ইখতিয়ারের। ইরহান সেখানেই উপস্থিত ছিলো। অথচ তার মুখে কোনো হাসির রেশ দেখা গেলো না। সে বেরিয়ে গেলো দরবার থেকে।
****
তাবিয়া কেমন উন্মাদ হয়ে গেছে। তার কন্যা কি বেঁচে আছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে কিছুই সে জানে না। রুমেলিয়াকে সে তার ছয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে অধিক স্নেহ করে। সেই কন্যাকেই কেউ দাবার গুটির মত ব্যবহার করছে। চারদিন হয়ে গেছে অথচ এখনো তাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। অপহরণকারী যদি রুমেলিয়াকে নির্যাতন করে? তাকে মেরে ফেলে? নিজেকে মোটেই শান্ত করতে পারছে না তাবিয়া। হামিদা যখন তার জন্য খাবার নিয়ে এলো, সে খাবার ফেলে দিলো। বললো,
“তোর এখন মনে হয় আমার গলা থেকে খাবার নামবে? আমার রুমেলিয়া কেমন আছে? খেয়েছে কি না আমি কিছুই জানতে পারছি না আর তুই কি না আমার সামনে পঞ্চভোগ নিয়ে এসেছিস?”
হামিদা অহেতুক তার রোষের সম্মুখীন হলো। তবে সে হাসি মুখেই তাবিয়ার রাগ সহ্য করলো। কিন্তু মনে মনে খুব খুশি হলো যে রুমেলিয়া অপহরণ হয়েছে। তার খুশি দ্বিগুন হয়ে গিয়েছে যখন জানতে পারলো হুসনাত রুমেলিয়ার সাথেই অপহৃত হয়েছে। সে একটাই দোয়া করছে, যে তাদের কাটা লাশ আসে এই দূর্গতে।
*****
উমার মানচিত্র বিছিয়েছে। নকশাতে খোরাম্মাবাদের আশেপাশে ঠিক কোথায় কোথায় প্রাচীন, অব্যবহৃত দূর্গ থাকা সম্ভব সেই খোঁজ সে করছে। অবশেষে বেশ কয়টা দূর্গকে সে বাছাই করেছে। সব স্থানে টুকরি টুকরি সৈন্য পাঠানো হয়েছে। সেও একটি সৈন্যদলের নেতৃত্ব করবে। দ্রুততর রুমেলিয়াকে খুঁজে বের করা জরুরি। এর মধ্যেই তার ঘরে প্রবেশ করলো ইরহান। সে গম্ভীর স্বরে বললো,
“শুনেছি আগামীকাল আপনি শিরাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন?”
“হ্যা, ঠিক শুনেছো। আমি যাচ্ছি ওখানে”
“আমি আপনার কাছে একটি আর্জি করতে চাই”
“কি?”
“আগামীকাল শিরাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা আমার নেতৃত্বে হোক”
উমার অবাক হলো। ইরহান রুমেলিয়াকে খুব ভালোবাসে কথাটা বলা যাবে না। সৎ ভাইবোন তারা এতটুকুই। ইরহান যে অনুসন্ধানের মধ্যে আগ্রহ দেখাবে সেটাও যেন অকল্পনীয় ছিলো। উমার তবুও কিছু শুধালো না। নিস্পন্দ চোখে তাকিয়ে রইলো ইরহানের দিকে।
******
হুদ খুব অবাক হলো নিজের মনিবের কাজে। খোরাম্মাবাদে এমন কিছু হবে সেটা পূর্বপরিকল্পিত ছিলো। লাম হঠকারী। সে তার পিতার হত্যার বদলা নিতে মরিয়া হয়ে রাজপরিবারের উপর আক্রমণ করবে বিষয়টা খুব আগ থেকেই জানা ছিলো ইরহানের। এই আক্রমণের সুবাদে ইখতিয়ারকে শাস্তি দেওয়া হবে, এটা পরিকল্পিত ছিলো। আবদালীর কাছের লোকগুলো একটু একটু করে সরে যাবে এমনটাই কাম্য ছিলো। অথচ তার মনিব প্রসন্ন নয়। বরং তাকে বিচলিত লাগছে। অন্তর্দ্বন্দ্বে যেন ভুগছে সে। যখন থেকে শুনেছে রুমেলিয়ার সাথে হুসনাতকেও অপহরণ করা হয়েছে তখন থেকেই ইরহানের মেজাজ, মর্জি কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না হুদের। ইরহান এখন শিরাজ যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অথচ তার এখন নিশ্চিন্তে তার খাসকামরাতে বিশ্রাম করার কথা। হুদ অনেক সাহস নিয়ে শুধিয়েই বসলো,
“হুজুর কি কোনো কারণে উত্তেজিত?”
ইরহান শান্ত দৃষ্টিতে চাইলো। তার নির্জীব চোখের ধারে হুদের দৃষ্টি নুঁইয়ে গেলো। ইরহান গম্ভীর, ভারী স্বরে বললো,
“এই প্রথম জয়ের স্বাদ বিস্বাদ লাগছে”
****
দূর্গে প্রহরীর অভাব নেই। সকলের দৃষ্টির অগোচরে বের হবার সুযোগ খুব ক্ষীণ। তবুও চেষ্টা চালালো হুসনাত এবং রুমেলিয়া। ভাঙ্গা, পরিত্যক্ত দূর্গের চারিপাশে জঙ্গল। উলটো পাশে সাগর। পালানোর উপায় হয় জঙ্গল দিয়ে নয় সাগরে ঝাঁপিয়ে। রাত হয়ে গিয়েছে। সৈন্যরা ক্লান্ত কিছুটা। হুসনাত রুমেলিয়ার উদ্দেশ্যে বললো,
“শেহজাদী আমাদের একটি ঘোড়া প্রয়োজন। আমি ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো, আপনি যেকোনো একজন সৈন্যের ঘোড়া নিয়ে পালিয়ে যাবেন। ওরা শেহজাদীকে চায়, তার দাসীকে নয়”
রুমেলিয়ার শরীর এখনো দূর্বল। চারদিনের ক্ষুধার্ত শরীর তারউপর বমি করাতে শরীর একেবারেই যেন চলতে চাইছে না। সে নির্ঘাত ধরা পরে যাবে। তখন তাদের অবস্থা আরোও ভয়ানক হতে পারে। কিন্তু বাঁচার জন্য এতোটুকু করা যেতেই পারে। হুসনাতের দেওয়ার দ্রবণের কারণে সে একটু শক্তি সঞ্চয় করলো। দূর্গের একটি ভাঙ্গা অংশ থেকে একটি গাছের অংশ নিচের দিকে গিয়েছে। হুসনাত একটি লতাকে শক্ত করে রুমেলিয়ার কোমড়ে বেঁধে দিলো। বললো,
“শেহজাদী, আমাদের পালানোর একটাই উপায়। এখান থেকে লাফ দিতে হবে”
“কিন্তু হাত পায়ে চোট লাগবে”
“প্রধান ফটকে এখন প্রহরী। এদিকটায় কোনো মানুষ দেখছি না। তারা হয়তো এখন নিজেদের পালা বদল করছে। এখন-ই সুযোগ”
“দূর্গে কোনো গোপন রাস্তা আছে হয়তো”
“কিন্তু এতে ধরা পরে যেতে হবে। সময় খুব কম”
ইতোমধ্যেই হুসনাত এবং রুমেলিয়ার পালানোর খবর ছড়িয়ে গেছে। তাই হন্য হয়ে তারা খুঁজতে শুরু করেছে দুজনকে। তাদের কণ্ঠ কানে আসতেই রুমেলিয়া কিছু না ভেবেই ঝাপ দিলো। হুসনাত যখন লাফ দিবে তখনই একজন দেখে ফেললো তাদের, চিৎকার করে উঠলো,
“শেহজাদী পালাচ্ছে”
অমনি লাম এবং তার সৈন্যরা সজাগ হয়ে গেলো। দূর্গ থেকে নিচে নেমেই হুসনাত রুমেলিয়াকে ইশারা করলো যেন ফটকের দিকে ছুটে। আর হুসনাত ছুটলো জঙলের দিকে। হুসনাতকে শেহজাদী ভেবে লাম এবং তার সৈন্যরা জঙ্গলের পথেই রওনা দিলো ঘোড়া সমেত। সবাই যখন হুসনাতকে ধাওয়া করতে ছুটেছ সেই ফাঁকে সকলের আড়ালে রুমেলিয়া একটি প্রহরীকে পরাস্থ করে তার ঘোড়ায় ছুড়ে নগরীর দিকে ছুটলো। লামের সৈন্যদের নাকের নিচ থেকে রুমেলিয়া পালিয়ে গেলো। কারণ দাসীর পেছনে ধাওয়া করে সময় নষ্ট কে করবে?
****
নিঝুম জঙ্গল। মোটা গাছের ছায়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লাম এবং তার সৈন্যদের হাতে মশাল। মশালের আলোও এই আঁধারকে কাটাতে পারছে না। পাতার ফাঁক থেকে চুয়ে পড়ছে মেঘহীন আকাশের রুপালি জ্যোৎস্না। বন্য পশুর ডাক শোনা যাচ্ছে। লামের সাথের সৈনিক বললো,
“হুজুর, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। শেহজাদী ক্লান্ত, চারদিনের ক্ষুধার্ত। খুব দূরে যাওয়া সম্ভব নয়”
লাম রোষমিশ্রিত স্বরে বললো,
“ওর গর্দান আর আমার তলোয়ারের মধ্যে বেশি দূরত্ব নেই। একটা তলোয়ারের এক আঘাত আর ওর শেষ নিঃশ্বাস। যেমনভাবে আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, আল্লাহর কসম এই জঙ্গলে ঠিক সেভাবেই হত্যা হবে শেহজাদী। এসফাইন তখন আমার হবে”
পিনপতন নিরবতা, শুধু ঘোরার খুর এবং পাতার সংঘর্ষ। বাতাসও ভারী হয়ে গেছে। সতেরো জোড়া চোখ খুঁজছে একটি মেয়েকে। সোনালী জামা পড়া মেয়েটি। এর মধ্যেই একজন একটি গাছের গুড়িতে বিঁধে থাকা সোনালি চকচকে কাপড়ের অংশ দেখতে পায়। সে আশেপাশেই আছে। লুকিয়ে আছে। সে লামের উদ্দেশ্যে বলে,
“হুজুর এদিকে। এই যে ছেঁড়া কাপড়”
সবার দৃষ্টি সেদিকে যেতেই পেছন থেকে আর্তনাদ শুনতে পেলো। আর্তনাদের স্বর অনুসরণ করে পেছনে তাকাতেই দেখলো ঘোড়ার উপর উবু করে থাকা একজন প্রহরীর নিথর লাশ। সাথে সাথেই উত্তেজনা ঘিরে ধরলো যেন সবাইকে। নিজ নিজ তলোয়ার বের করলো তারা। এর মধ্যেই আরেকজনের গলায় এসে বিধলো একটি ধাঁরালো ছুরি। সাথে সাথেই ঘোড়া থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলো আরেকজন প্রহরীর লাশ। কেউ কিছু বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে, কেউ পেছন থেকে আক্রমণ করছে। তবে কি সুলতানের সৈন্যরা চলে এসেছে? মশালের আলোয় এই অন্ধকার জঙ্গলে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এরমধ্যেই একটি কালো ছায়া যেন দেখতে পেলো লাম। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই ঘোড়ার পায়ে কেউ আক্রমণ করে বসলো। অমনি ঘোড়া সহ মাটিতে পড়ে গেলো সে। নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াতেই দেখলো আরো তীক্ষ্ণ তলোয়ারের আঘাতে আরোও তিনজনের শির গড়াচ্ছে। রক্ত ছিটকে পড়লো লামের মুখে। উষ্ণ, তীক্ষ্ণ গন্ধ। সামনে তাকাতে দেখলো এক রমনী দাঁড়ানো। যে সে রমনী নয়। তার শরীর রক্তেস্নাত। চুল খোলা। দু হাতে নগ্ন তলোয়ার। ঠোঁটে কেমন উন্মাদ হাসি। চোখের দৃষ্টিতে ভয়ংকর প্রলয়ের আগামবার্তা। হুট করেই যেন শিরদাঁড়া কেঁপে উঠলো লামের। তার সৈনিকরা ধেয়ে গেলো আক্রমণ করতে। হুসনাত তার বা হাতের তলোয়ার ঘোড়ার পায়ে আক্রমণ করতেই ঘোড়া সমেত সৈনিক পড়ে গেলো। একই সাথে সে ডান হাত ঘুরিয়ে আঘাত করলো আরেক সৈনিকের মুখ বরাবর। আর মুখমন্ডল দ্বিখন্ডিত হলো। রক্তের লহর বইলো। লাম থমকে গেলো হুসনাতের আক্রমণে। কোনো সালতানাদের শেহজাদী এমন তলোয়ারবাজি জানার কথা নয়। এ কোনো সাধারণ তলোয়ারবাজি নয়, রীতিমত যোদ্ধার ন্যায় আক্রমণ। বাতাসের ন্যায় তীব্র গতি। চোখের পলকে সে আক্রমণ করছে। নির্দয়ের মত সৈন্যের বুকের তলোয়ার বিদ্ধ করছে সে। লাম নিজেকে সামলালো। আক্রমণ না করলে বাঁচা সম্ভব নয়। এখানে কোনো নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই। এখানে সব যোদ্ধা। তলোয়ারের আওয়াজ আর আর্তনাদে খন্ডিত হলো নীরবতা। লাম নিজের সকল শক্তি লাগিয়ে দিলো। কিন্তু হুসনাতের ক্ষিপ্রতার সাথে পারলো না। তার পায়ে আঘাত করেই বাঘিনীর মতো সে তাকে মাটিতে ফেলে বুকে বসে পড়লো। মশালের আগুণ তখন শুকনো পাতায় লেগে বিশাল অগ্নিকুন্ডের সৃষ্টি হলো। সেই অগ্নিকুন্ডের আলোয় লাম দেখতে পেলো একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ। কোনো মায়ার ছোয়া নেই, শুধু শিকারের তৃষ্ণা যেন সেই চোখে। রক্তাক্ত বদন হাপাচ্ছে। তার তলোয়ার গেঁথে আছে লামের বা হাতে। লাম ভয়ার্ত স্বরে শুধালো,
“কে তুমি?”
ঠোঁট চিরে পৈশাচিক হাসি উন্মোচিত হলো। হুসনাত তীক্ষ্ণ স্বরে বললো,
“তোদের যম”
বলেই “আল্লাহু আকবার” বলে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিলো ঠিক লামের বক্ষমাঝে। আর সেখানেই লাম মৃত্যবরণ করলো। হুসনাত কোনো ভাবে উঠে দাঁড়ালো। তার হাত, পিঠ থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। লড়াইয়ের সময় কেঁটে গেছে। এক পলক দেখলো মাটির দিকে। জঙ্গল জ্বলছে। সেই সাথে নিথর লাশগুলোও জ্বলছে। হুসনাত আকাশ পানে চাইলো। বিষন্ন স্বরে বললো,
“আপনি কবে ফিরবেন? আপনার অপেক্ষায় এই অথর্ব এখনো বেঁচে আছে। যেদিন নাসির সুলতান ফিরবেন, এই দাসী সেদিন মুক্ত”
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………