প্রেমদাহ - পর্ব ০৮ - মীরাতুল নিহা - ধারাবাহিক গল্প

          সুমনা ক্লান্ত পায়ে ওপরে উঠছে। হাতে কিছু নেই, চোখে- মুখে অভিমানের ধুলা। মুখ শুকনো, চোখ লালচে—তবুও শক্ত হয়ে আছে।

রাজ নেই পাশে। সকালবেলা ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফেরার সময় সুমনা পেছনে তাকিয়ে দেখেছিল রাজ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলো, কিন্তু বাড়ির দিকে আসেনি। ফিরতি পথে তাদের মধ্যে ছিলো হঠাৎ ঘোলা হওয়া আকাশের মতো এক বিস্বাদ নীরবতা। সেই নীরবতায় কিছু ভাঙে না, কিছু জোড়াও লাগে না—শুধু অস্থিরতা জমে ওঠে।

সুমনা ঘরে ঢুকে ব্যাগটা রেখে সোজা চলে যায় নিজের ঘরে। চুপচাপ বিছানায় বসে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথা ব্যথা করছে, বুকের ভেতরে এক অদৃশ্য ভার জমে আছে। তখনই বাইরে থেকে ডাক আসে।

 “সুমনা? খেতে আসো।”

শ্বাশুড়ির কণ্ঠ শুনে, সুমনা একটু কাঁপা গলায় বলে,

“ইচ্ছে করছে না খেতে।”

শ্বাশুড়ি দরজার বাইরে এসে বলে,

 “এই তো, আজ ছোটো টেংরা মাছের চচ্চড়ি করছি মা। এই মাছটা বাচ্চার জন্য খুব ভালো। একটুখানি খেয়ে নাও। আর খালি পেটেও তো থাকতে নেই।”

সুমনার মাথাটা যেন গরম হয়ে যায়। বুকের ভিতর জমে থাকা কষ্টটা ছাপিয়ে উঠে মুখে। গলা কাঁপে, তবু রেগে বলে ওঠে,

“এসব ছোটো টেংরা মাছ খাই না আমি! কখনো খাইনি! খেলে ডিমওয়ালা টেংরা খেয়েছি সবসময়!
এগুলা খেতে পারব না আমি। অভ্যাস নেই আমার! প্রতিদিন খালি এসব দিয়ে খাও! অসহ্য! আর ডাকবেন না আমাকে!”

কণ্ঠটা এত জোরে আসে যে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বাশুড়ি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যায়। কোনো উত্তর না দিয়ে সুমনা সোজা পেছন ফিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। এক হাত গর্ভে রাখা, আরেক হাত কপালে রাখে। ভেতরটা কাঁপছে। হয় ক্ষুধায়, হয় অপমানে, নয়তো ভালোবাসাহীনতার ভয়ংকর শূন্যতায়।

শ্বাশুড়ি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন সুমনার ঘরের দরজার বাইরে। তিনি ভাবতে লাগলেন
মেয়েটা এভাবে বললো? তিনি ধীরে ধীরে রান্নাঘরে ফিরে যান। মনে মনে বলতেই থাকেন,

“এই মেয়েটা তো জানতো রাজের অবস্থা, তার পরিবারের হাল। সব জেনেই তো বিয়ে করলো! কেন যেন সহ্য করতে পারে না? এই টানাটানির সংসারে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে কঠিন। ছেলেটাকে তো আমি বলেছিলাম চাকরি জুটিয়ে বিয়ে কর, বললো দ্রুত করতে হবে! চাকরির জন্য অপেক্ষা করলে হবে না। হায়, অভাব এলেই দেখা যায় ভালোবাসা জানালা ফুঁড়ে পালায়।”

সন্ধ্যা নামে ধীর ধাপে। আকাশে ভাসে মৃদু বাতাস, পাখিরা বাসায় ফেরে। ঘরের চারপাশে অন্ধকার জমে উঠছে। সুমনা তখনও খায়নি। কেউ জোর করেনি আর। তাকেও আর দরকার মনে হয়নি বলতে। পাশের টেবিলে রাখা রাজের কেনা দুটো আপেল আর একটা কলা। সেইটুকুই সে খেয়ে নেয়

রাত। ঘড়িতে দশটা পেরিয়ে গেছে। ঘর নিস্তব্ধ।দরজায় হালকা ঠকঠক শব্দ। রাজ ঘরে ঢোকে।
চোখেমুখে ক্লান্তির রেখা। চোখদুটো এক চিলতে বিষণ্ণ আলোয় ভরা। পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকেই একবার তাকায় বিছানার দিকে। সুমনা শুয়ে আছে পাশ ফিরে। অন্যদিনের মতো পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় না আজ। না কোনো কথা বললো। একদম চুপচাপ! 

রাজ একটু থেমে বলে,

“খাওনি, কিছু?”

কোনো উত্তর নেই। ঘরের কোণে জমে থাকা অভিমান যেন শব্দকে থামিয়ে দিয়েছে। রাজ ধীরে ধীরে বসে পড়ে বিছানার এক পাশে। মাথা নিচু করে, আবার বলে,

“দুপুরে ভাত কেনো খাওনি?”

সুমনা মুখ না ঘুরিয়েই বলে—

“ফল খেয়েছি। আর কিছু খাওয়ার দরকার হয়নি।”

রাজ আর কিছু বলে না। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে থাকে। উঠে গিয়ে একটা প্লেট আনে। তারপর প্যাকেট থেকে বিরিয়ানি বের করে এনে সুমনার কাছে যায়। ফের বলে,

“বিরিয়ানি খেতে চেয়েছিলে না? উঠো এনেছি!” 

সুমনা আগের ভঙ্গিতেই বলে,

“আমি খাবো, না।” 

রাজ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“খালি পেটে থাকতে নেই, অন্তত এখন!”

সুমনার একই উত্তর,

“পেট ভরাই আছে, আমার!” 
 
রাজের এবার বিরক্তি লাগলো,

“উঠে খেয়ে নাও, চুপচাপ।” 
“না!” 

বিরক্তি বদলে গিয়ে এবার পরিণত হলো রাগে। সবকিছু মিলিয়ে এই এই প্যাকেট কাচ্চির দাম নিয়েছে প্রায় চারশো টাকা! অভাবের সংসারে, এই বেকার অবস্থায় এই চারশো টাকাই রাজের কাছে এখন অনেক কিছু। টেনেটুনে চারদিনের বাজার ও হয়ে যেতো! তবুও স্ত্রী খেতে চেয়েছে বলে, কোনোমতে ধার করে এনেছে। এখন সেই খাবার বারবার না বলায় রাজেরও রাগ হচ্ছে! তার সব কষ্টই যেন বৃথা!

“শেষবারের মতন বলছি, সুমনা। উঠে খেয়ে নাও। বাচ্চাটার জন্য।” 

সুমনা আগের ভাব বজায় রেখেই প্রতিউত্তর করলো,
“আমি খাবো না, বলেই দিয়েছি।” 

এবার আর ধৈর্য্য কূলালো না রাজের। প্লেটটা ধরে সোজা জানালা দিয়ে ফেলে দিলো সবটুকু বিরিয়ানি! সুমনা আওয়াজ শুনে কেবল তাকিয়ে দেখলো। কিচ্ছু বললো না। এত্ত রাগ রাজের? খাবে না বলেছে দেখে এত রিয়েক্ট! রাজ খেয়ে নিতো! ফেলে কেনো দিলো? এতে সুমনারও রাগ বাড়ে বৈ কমে না। কিছু না বলেই সে চুপচাপ চোখ বন্ধ করলো ঘুমানোর উদ্দেশ্য! কিছুক্ষণ পর রাজও আসলো। দুজন মানুষ, এক বিছানায়, অথচ দু’জন যেন দুই প্রান্তে শুয়ে আছে। অন্যদিনের মতো আজ তার হাতে কোনো টান নেই, স্নেহের হাতের স্পর্শ নেই, সেই চেনা মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াও নেই। রাজ আজ তাকে বুকের ভেতর টেনে নেয়নি।
রাজ আজ এক চিলতে আদরও দেয়নি। এই না দেওয়া, এই দূরত্ব—তাই যেন তার ভেতরে এক বেদনার জলাভূমি তৈরি করে দেয়। সেই বিয়ের পর থেকে একমাত্র রাজের ভালোবাসাটুকুই আঁকড়ে ধরে ছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে, শুধু চুপচাপ চোখের কোণ ভিজে যায়। নিঃশব্দ ঝরনার মতো কান্না নেমে আসে। অন্তরের দুঃখ লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চোখের জল! তা তো নিজের ইচ্ছায় আসে না।
চুপচাপ, নিঃশব্দে, সুমনা কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে, বিছানার এক কোনায় সরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।ঘুমও যেন করুণা করে আসে। না হলে এই কান্নার রাত তার দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় তাকে হয়তো শেষ করে দিতো। রাজ বাতি নিভিয়ে দিলো। ঘরটা ডুবে গেল এক নিঃশেষ অন্ধকারে। অন্ধকারের ভেতরেই দুটো শরীর পাশাপাশি, অথচ কত দূরে!

—————

সুমনা জানালার পর্দা সরিয়ে সূর্যটা দেখে—তা আজ কিছুটা প্রখর! বুঝলো অনেক বেলা হয়ে গেছে।
ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই যে অনুপস্থিতি সে টের পেলো, তা রাজের। রাজ নেই! বিছানার ভাঁজ একই, শূন্যতা নয় শুধু, একধরনের খাঁ খাঁ করে যাওয়া একাকীত্ব। এরকম তো আগে কখনো হয়নি।
রাজ যত ভোরেই বের হোক, মাথায় একটা হাত বুলিয়ে যেতো। মাঝেমাঝে বুকে জড়িয়ে ধরে বলত

 “তুমি ঘুমাও, আমি আসি। কিছু লাগলে, কল দিও।”

আজ রাজও নেই, কিছুই নেই। কোনো কথা নয়, কোনো ছোঁয়া নয়, কোনো বিদায় নয়। যেনো একটা অপরিচিত সকাল, সুমনার জন্য! 

সুমনা খুব নিখুঁতভাবে বিছানা গুছিয়ে রাখে।
তার পর একে একে দিনের কাজগুলো শেষ করে চা বানায়, ওষুধ খায়, সবকিছু ঠিকঠাক, নিয়মমাফিক। মনিরা খাতুন এগিয়ে এসে একবার বলেন,
“মা, একটু ভাত খেয়ে নিও।”

সুমনা মুখ তোলে না। শুধু মাথা নাড়ে শ্বাশুড়ি থমকে দাঁড়ান। কালকের অপমান এখনো টাটকা। কিন্তু মেয়েটার নিরুত্তাপ মুখ দেখে আর কিছু বলতে পারেন না।

ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা পেরিয়ে দুইটা ছুঁই ছুঁই।
ডাক্তারের রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় ছিল বারোটার মধ্যে। সুমনা নিজে গিয়ে সব শুনেছিল—ডাক্তার বলেছেন,রিপোর্ট সময়মতো দেখাতে হবে।
রাজকে বারবার বলেছিল সে। রাজ মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিলো। সে কি ভুলে গেলো? নাকি ইচ্ছেই ছিল না তার মনে রাখতে? সুমনা রাজের নম্বরে কল দিলো। কিন্তু রাজ কল রিসিভ তো দূর বরং কেটে দিলো! সুমনা আর কল দিলো না। রাগে অভিমানে সব মিলিয়, গলা যেন শুকিয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে রুমে ফিরে আসে। হঠাৎ যেন অস্থির হয়ে পড়ে। আলমারিটা খুলে। একেকটা জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখতে থাকে আলমারির নিচে রাখা ট্রলি ব্যাগে। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, যাবতীয় কসমেটিকস সব! হাত চলে যন্ত্রের মতো, ভেতরটা—অচেনা হাহাকারে ভরা।

ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ। সুমনা তাকিয়ে দেখে ভেতরে রাজ এসেছে। সুমনার চোখদুটো এক ঝলক তাকায় তার দিকে, তারপর আবার ব্যস্ত হয়ে অগোছালো জামাটা গোছাতে। রাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

“রির্পোট ডাক্তারকে দেখিয়েছি। উনি বলেছে তোমার রক্তশূন্যতা আছে। তাছাড়া কিছুই নেই। ফল ফ্রুটস, বিশেষ করে ড্রাগন, আনার এসব ফ্রুটস খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। যাতে রক্ত হয়।”

সুমনা এবার মুখ তোলে। সোজা রাজের চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“এর জন্য দায়ী তুমিই!” 

রাজ সুমনার কথা বুঝেও, পাত্তা দেয় না। তার চোখেমুখে কেমন খুশির ঝলক। তবে সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মলিন মুখে শুধোয়, 

“তুমি কি ব্যাগ গোছাচ্ছো? কোথায় যাবে?” 
“আমি একটু পরে রওনা করবো। বাবার বাড়িতে।” 

রাজ কিছুটা হকচকিয়ে বলে উঠে। মনেই ছিলো না ব্যাপারটা! ভেবেছে সুমনা হয়ত ভুলে যাবে। রাগের মাথায় ওসব বলেছে। তাছাড়া প্রেগন্যান্সি টাইমে এরকম মুড সুয়িং হয়েই থাকে। কিন্তু ভেবেছিলো কি আর এসে দেখলো কি! যতটা খুশি নিয়ে এসেছিলো, সুমনার কথা শুনে মুখটা ততটাই আঁধার কালো হয়ে আসলো। আর কিছু বললো না, যা ভেবে ছিলো। যার জন্য সকালভর বেরিয়ে পড়া থেকে সুমনার কল কেটে দেওয়া!

“ব্যাগ গুছিয়ে রাখছো, এজন্যই?”

সুমনার নিষ্পৃহ স্বীকারোক্তি,
— “হ্যাঁ।”

রাজ গলার খুসখুস ভাব কাটিয়ে একটু সময় নিয়ে বলে,
“বেশ চলেই যখন যাবে, তখন রেডি হয়ে নাও।”

সুমনা আর কিছু না বলে। তবে সে মনেপ্রাণে আপ্রাণ ভাবে চাইছিলো রাজ একটি বার তাকে আঁটকাক। বুকের মধ্যে নিয়ে বলুক, যেতে হবে না! সব রাগ অভিমান এক নিমিষেই মুছে যাবে! কিন্তু রাজ কিছুই বললো না। উল্টো সায় দিলো! এদিকে রাজও কাল রাত থেকে এখনো সুমনার ছেলেমানুষী নিয়ে বিরক্ত! সুমনা এক পলক রাজের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টির মানে রাজ বুঝতে পারলো না। অভিমান আর রাগ এতটাই গাঢ় হয়েছে, সম্পর্কের চেয়েও যেন বেশি। কেউই মানছে না! সুমনা ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে যায়, মুখে পানি দেয়, চুল আঁচড়ায়, ওড়না জড়ায়। বোরখা পড়ে নেয়।
পথে, দুজন পাশাপাশি হাঁটে—কেউ কারো হাত ধরে না, কেউ কারো চোখে তাকায় না। দুজনে দাঁড়িয়ে থাকে গলির মোড়ে, রিকশা ধরার অপেক্ষায়। একটা কাক ডাকে, অনেক দূরের। রোদের মধ্যে গলির পিচগলা রাস্তা যেন হাঁসফাঁস করে।
রাজ একটু নিচু স্বরে বলে—

“এতদিন ধৈর্য্য ধরছো, সুমনা আর একটুখানি ধরলে ভালো হতো।”

সুমনা অবাক হয়। মুখ ঘুরিয়ে চেয়ে দেখে তার দিকে।
“মানে?”

রাজের চোখে একটুখানি আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক—
সে বলে,
 “চাকরিটা হয়ে গেছে। কাল থেকে জয়েন করতে হবে। বেতনও খারাপ না পঁচিশ হাজার। ট্রেনিংয়ের পর বাড়বে বলেছে। আগামীতেই ভালো হবে।”

সুমনার ঠোঁটে মুঁচকি হাসির রেখা দেয়। তবে আবারো মনে অভিমানের পাহাড় উঁকি দেয়। রাজ তবে একবারো বললোও না ঘরে এসে? চোখের কোণে জমে থাকা অভিমানকে লুকিয়ে রেখে বলে—

“এত ভালো খবর রাজ, এটা তো সত্যিই দারুণ!”

রাজ একটু হাসে। তারপর বলে,

 “আরো ভালো খবর দেখো? গাড়ি চলে এসেছে। তোমার আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। গরমের মধ্যে।”

সুমনার মুখ থেকে হাসি সরে যেতে চায়, তবু সে নিজেকে সামলায়। রাজ নিজেই ব্যাগ তুলে নিয়ে যায় গাড়ির কাছে। ড্রাইভারকে বলে,

— “সাবধানে নামিয়ে দিবেন। আস্তে ধীরে গাড়ি চালাবেন।”

তারপর ফিরে এসে দাঁড়ায় সুমনার সামনে। সুমনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর অভিমানী চোখে তাকিয়ে, খুব নিচু গলায়, যেন বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে ফেটে বের হয় প্রশ্নটা,

 “আমাকে নিতে কবে আসবে?”

রাজ মুখ ঘুরিয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকায়।
তার চোখে এবার ঝাপসা কিছু, নাকি কেবল রোদের ঝিলিক বোঝা যায় না।

 “নতুন চাকরি, ছুটি তেমন পাবো না। তুমি ওখানেই থেকো, যতদিন ইচ্ছে। মন ভরে, শান্তিতে। যেখানে থাকলে তোমার ভালো লাগে। তুমি যা চাইছো তাই হউক।”

সুমনা চুপ করে থাকে। তার ঠোঁট কাঁপে—কিছু বলতে চায়, গিলে ফেলে। চোখ ফেটে কান্না আসে।
সে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে, যেন রাজ সেটা না দেখে।
রাজের ঠোঁটে একটুখানি আক্ষেপের হাসি।
সুমনা গাড়িতে ওঠে। গাড়ি চলতে শুরু করে।
 রাজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। সেইখানেই।
যতক্ষণ না গাড়িটা চোখের আড়ালে যায়—
সে দাঁড়িয়ে থাকে।

 সুমনা জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে। গাড়ি ছুটে চলেছে পরিচিত শহরের দিকে।সে শুধু দেখছে বাইরে তাকিয়ে, গাছেরা পেছনে সরে যাচ্ছে, মানুষের মুখগুলো ভেসে উঠছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন রাজের মুখটাও ভেসে ছিল কিছুক্ষণ আগে। আবার মিলিয়ে গেলো। একসময় হঠাৎ কিছু মনে পড়ে, সে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে। বাবাকে কল দিয়ে জানিয়ে দেয় তার আসার কথা। কিছুক্ষণ পর, গাড়ি থামে এক জায়গায়।

সুমনা দেখেই বুঝে ফেলে—এই তার চিরপরিচিত জায়গা। বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেন বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা নরম হয়ে যায়। বাবা তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে। সোজা গিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেয়। সুমনা অবাক হয়ে চায় বাবার মুখের দিকে। সে তো কেবল আসবে বলছে, আর বাবা না জানি সেই কখন থেকে এখানে বসে আছেন
সুমনার মনটা হালকা হয়ে যায়।
রাজের কথাগুলো, অভিমান, কান্না—সব যেন ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp