প্রেমদাহ - পর্ব ০৯ - মীরাতুল নিহা - ধারাবাহিক গল্প

ঘরের উঠোনে পা দিতে না দিতেই, সাথে সাথে ঘরের ভেতর থেকে মায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ—

“এতক্ষণ, লাগলো? তোর বাবা সেই কখন বলে গেছে!”

মা ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। সুমনার মুখটা একবার দেখে, আবার বুকের কাছে টেনে নেয়।

“কেমন আছিস?” 
“ভালো, মা। তুমি কেমন আছো?” 
“তুই এসেছিস, এখন আরো ভালো থাকবো।” 

সুমনা হালকা হেসে মাথা নিচু করে। এই হাসিটা যেন বড় কষ্ট চেপে রাখা হাসি, তবুও শান্তিরও একটা টান আছে তাতে। এই সময় বারান্দা থেকে দাদির চেনা কণ্ঠ। চোখের চশমা সামলে বলে,

“জামাই কই? একা আসছোস? তোর কোন আক্কেলে পোয়াতী অবস্থায় একলা পাঠাইছে?”

সুমনা দাদির দিকে তাকায়। মানুষটা মমতার মোড়কে মোড়া হলেও প্রশ্নটার মধ্যে খানিকটা ভর্ৎসনাও লুকানো। সুমনা শান্তভাবে উত্তর দেয়—

“রাজ নতুন চাকরি পেয়েছে, ছুটি পায়নি। তাই নিজেই গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছিলো।”

দাদি ভ্রু কুঁচকে, কিছুটা অবাক স্বরে বলে,

“তোর জামাই না বেকার! চাকরি পাইলো কবে?” 
“এইতো, মাস পুরো হয়নি এখনো।” 
“তা বেতন কেমন? চলব নি?”
“বেতন ভালোই দাদী। আরো বাড়বে বলেছে।” 
“যাক, ভালোই!” 

—“আচ্ছা আয় ভিতরে আয়। হাত মুখ ধুয়ে, খেয়ে তারপর বিশ্রাম নে।”

সুমনা আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে ঢুকে। জার্নি করে এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে অগোছালো চুল, চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া নিয়ে ঘরের সেই পুরনো খাটটায় চুপ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘরের জানালায় তখনো বিকেলের শেষ আলো লুকোচুরি খেলছে। বাইরে নীরবতা। ভেতরে এক নির্মল প্রশান্তি। হঠাৎ মাথায় কারো কোমল হাতের ছোঁয়া টের পেয়ে ঘুম ভাঙে সুমনার। চোখ খুলতেই দেখে, মা থালা হাতে পাশে বসে আছে। চোখেমুখে মমতার রেখা, গলায় মৃদু তিরস্কারের সুর,
“না খেয়ে থাকলে চলে? দেখ, কতক্ষণ হয়ে গেছে। তাই খাবার নিয়ে এলাম।”

সুমনার চোখ চলে যায় থালার দিকে— তার প্রিয় ইলিশ মাছের লেজা ভর্তা, ধনেপাতা ছড়ানো মাছের ঝাল ভুনা, আর মায়ের হাতের ডিমের কারি।
চোখে বিস্ময়ের দীপ্তি নিয়ে সুমনা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“এইসব কি এখন রেধেছো?”

মা হেসে গালে আদর করে বলে,

“মেয়ে কতদিন পর আসছে বাড়ি, আর আমি রাঁধবো না?” 

সুমনা তখন বালিশে মুখ গুঁজে আহ্লাদে গলে গিয়ে বলে,
—“আমায় খাইয়ে দাও না মা।”

মা হেসে হাত দিয়ে এক লোকমা তুলে মুখে দেয়।
সুমনা চুপচাপ খায়। ভাবতে থাকে, এইতো আগেরবার মা সহ দাদী সবাই তাকে কতই না কথা শোনালো! এখন চুপচাপ, কি সুন্দর মেনে নিয়েছে। কেউ কোনো কথা না, কিচ্ছু না! আরো সুমনার কত খেয়াল রাখছে। সেটা কি রাজ এখন বেকার নয় বলে? নাকি সুমনা অনেকদিন পর আসায়। বাবা মায়ের রাগের আড়ালে ভালোবাসা ঢাকা পড়ে ছিলো হয়ত! এত মাস পর মেয়েকে পেয়েছেন। নাকি কিছু করার নেই বলেই, মেনে নিয়েছেন! কিছুই বুঝতে পারলো না। তবে যত যাই হউক,সুমনা তাদের মনে কষ্ট দিয়ে অন্যায় করেছে। সেজন্য দু চার কথা তো প্রাপ্যই ছি়লো। সব ভুলে যে এখন তাকে আপন করে নিয়েছে এই বা কম কিসে?

সেই রাতে হয়তো বহুদিন পর সুমনা তৃপ্তি সহকারে খেয়ে আবার ঘুমানোর প্রস্ততি নেয়। কেনো জানি খুব ঘুম পাচ্ছে! 
হঠাৎ মনে পড়ে—
সে তো অনেকক্ষণ হলো এসেছে! এখন বাজে আটটা। রাজ নিশ্চয়ই ফোন করে, ফোনে পায়নি! 
ভরাভরা পেট নিয়েও অস্থির হয়ে উঠে পড়ে সুমনা।
তাড়াতাড়ি করে ফোন হাতে নেয়, স্ক্রিন জ্বালায়—
কোনো মিসড কল নেই! রাজ একটাও ফোন করেনি! মুহূর্তে মুখটা কালো মেঘে ছেয়ে যায়।
অভিমান জমাট বাঁধে মনে। সুমনা ঠিকমতন পৌঁছেছে কি-না সেটা জানতেও একটা কল করলো না! ফোনটা হাতেই রেখে বিছানায় এলিয়ে পড়ে সে।
চোখ দুটো ছলছল করে, কিন্তু ফোন দেওয়ার মতোও আর সাহস হয় না। অভিমানের থেকেও বড়, একরাশ কষ্ট।

ওদিকে, রাজ ফোন করতে চেয়েছিল বটে।
কিন্তু সুমনার ফোন বারবার “out of network দেখায়। একসময় অস্থির হয়ে সুমনার বাবার নম্বর খুঁজে বের করে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হয়।
সব মিলিয়ে তার মন ভীষণ ভারী হয়ে থাকে। রাজ প্রতিটি মুহূর্তে যেন অপেক্ষা করছিল, সুমনা কল করবে। একটা ছোট মেসেজ দিলেও দিবে।

 সুমনা চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের জানালায় তখন পূর্ণিমার আলো। এক ধরণের ধূসর নীরবতা চারপাশে। মাঝেমধ্যে কুকুরের হালকা ঘেউ ঘেউ, দূরের রাস্তায় দেরি করে ফেরা কোনো গাড়ির শব্দ ভেসে আসে কানে। আস্তে আস্তে চোখ বুঁজে। 
একসময় হঠাৎ করেই চোখ খুলে যায় সুমনার। আধোঘুমের ঘোরে পাশে হাত বাড়িয়ে দেখে—ফাঁকা। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফস করে বের হয়ে আসে।
অন্যদিকে অন্ধকার ঘরে, রাজ একা বসে আছে। আলো নিভানো। মোবাইল ফোন তার পাশে রাখা। স্ক্রিন নিঃসঙ্গ। ঘুম আসছে না! রাজ জানে, সুমনা অভিমান করে আছে। কিন্তু অভিমানের ও পারেও যে একটা বাস্তবতা, দায়িত্ব, একটা লড়াই আছে, সেটা কাউকে বোঝানো যায় না। নতুন চাকরি, নতুন জায়গা, নতুন টেনশন—সব মিলিয়ে তার মন ভীষণ ভারী হয়ে আঠে। সুমনার ফোন না ধরার অভিমানে সে নিজেই আর ফোন দেয়নি। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে সে যেন অপেক্ষা করছিল, সুমনা কল করবে। একটা ছোট মেসেজ দিলেও।

—————

উঠোনের গাছে পাখিদের কিচিরমিচির, ছায়ায় মিশে থাকা রোদ্দুরের আলতো চুম্বন, স্নিগ্ধ পরিবেশে ঘুম ভাঙে সুমনার মায়ের ডাকে।

“সুমনা, উঠ এবার! চা আনছি, খেয়ে মুখ ধুয়ে নাস্তা কর।”

চোখে আলস্য, তবু প্রশান্তি! সুমনা ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

“এখনো তো খুব সকাল, মা।”

হাফসা হেসে ফেলে,

“সকাল কোথায়? ঘড়ি বলছে নটা বাজে। শ্বশুরবাড়িতে নিশ্চয়ই ঘুম ভেঙে ফজরের পরই ওঠতিস? আর এখানে নটা বেজে গেলো! বলছিস সকাল!”

সুমনা মুখ লুকিয়ে নেয় বালিশে। চা হাতে মায়ের বসে থাকা দেখে, উঠে বসে সুমনা। মা ভারী কন্ঠে বলে,

“এখন তো তুই প্রেগন্যান্ট। বেশি সময় না খেয়ে থাকা যাবে না। এক্ষুনি নাস্তা করবি।”

সুমনা মাথা নাড়ায়।
“আচ্ছা বল—আজ কী রান্না করবো?” 

সুমনা ভ্রু কুঁচকে শুধোয়,
“আমি বলব?”

হাফসা গালভরা হাসি দিয়ে বলে,

“তুই যা বলবি, তাই। যতদিন আছিস, রান্নাবান্না হোক একদম তোর পছন্দমতো। ঠিকমতো খেয়াল রাখবো তোর।”

সুমনা চুপ করে তাকিয়ে থাকে মায়ের চোখে। সেখানে নিঃশর্ত ভালোবাসা, অসীম যত্ন। যেন পুরনো সেই মা, মাঝখানে কিছুই হয়নি। সব ঠিকঠাক! তারপর আস্তে করে বলে—

“তুমি যা রাঁধবে, তাই ভালো লাগবে মা। তোমার রান্না তো সবই আমার প্রিয়।”

 বউ হয়ে থাকা মেয়েটা আবার যেন একটু শিশু হয়ে উঠেছে। মায়ের আদর যত্নে।

“আচ্ছা আমি উঠি।”

হাফসা চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। সুমনা চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। এক ধরনের চেনা প্রশান্তি মিশে আছে চারপাশে। হঠাৎ করেই মনে পড়ে—
রাজ এখনো একটাও ফোন করেনি! আবার মন খারাপ হয়ে আসে। কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে বুঝিয়ে ফেলে—
“হয়তো খুব ব্যস্ত, হয়তো কল করতে পারছে না।”

তবু অভিমানের মেঘটা যেন হালকা হয়ে ঘুরপাক খায় বুকের ভিতরে। নাস্তার পর চুপচাপ বারান্দায় বসে ছিল সুমনা। হাতে ফোন, এমনিতেই ভেতরে ভেতরে অনেককিছু চেপে রাখা, তার ওপর রাজের এই নির্লিপ্ততা তাকে আরও বেশি শূন্য করে তুলেছে।রাজকে বড্ড ভালোবাসে! সবকিছু বাদ দিয়ে, সে ধীরে ফোনটা হাতে নেয়। রাজের নাম্বারে কল দেয়।
রিং হয়। পরপর এক বার দুবার! কিন্ত কেউ ধরছে না। সুমনা মনে করে—হয়তো হাত ফাঁকা নয়, হয়তো কোনো কাজে আছে, হয়তো… হয়তো কিছু একটা!
দশ মিনিট পর আবার ফোন দেয়। এইবার ফোনটা কেটে দেয় রাজ। একটা সূক্ষ্ণ বিষ যেন স্নায়ু বেয়ে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। সুমনার মন খারাপ হয়। বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে ওঠে। তবু সে কিছু বলে না। শুধু চুপচাপ বসে থাকে। তারপর মা এসে বলে,

“সারাক্ষণ শুয়ে বসলে থাকলে হয় না, হাঁটাহাঁটি করতে হয় এই সময়।¡ 

সুমনা মৃদু হাসে। মা যেন ছায়ার মতন মিশে থেকে খেয়াল রাখা শুরু করেছে। পায়ের হালকা ব্যথা, মাথায় ঝিম ধরা, সবকিছুকে অবহেলা করে সে উঠে পড়ে। উঠোনে, নারকেল গাছের ছায়া পেরিয়ে কয়েক পাক হাঁটে। তারপর আবার ফিরে এসে বসে। শান্তি পাচ্ছে না কিছুতেই। আবার ফোন দেয় রাজকে।

“দেখছো না, ফোন কেটে দিচ্ছি! এতবার ফোন দিচ্ছো কেন? সময় পেলে আমি নিজেই ব্যাক করতাম।”

সুমনার গলায় কথা আটকে যায়। মন চায় প্রশ্ন করতে—
“তোমার কি একটুও মন পড়ে না আমার কথা?”
কিন্তু রাজের কথা শুনে, মুখ দিয়ে বেরোয় না কিছুই। সে শুধু ধীরে বলে,

“স্যরি।”
তারপর ফোন কেটে দেয় নিজেই। রাজ যেন কিছু একটা বলার চেষ্টা করে—

“আমি অফিসে আছি। এখন বিজি, পরে ফোন দিবো।”

শব্দগুলো আর সুমনার কানে পৌঁছায় না। শুধু রাজের কঠিন করে বলা কথাগুলো কানে বাজছে।
চোখে জল আসে না, তবু চোখে কেমন ঝাপসা লাগে। এক সময় বারান্দার পাশে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সম্পর্কটায় কি তবে ভালোবাসা আড়াল হয়ে, দুরত্ব অভিমানই বেশি গাঢ় হলো?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp