অপরাহ্নের নিষিদ্ধ অনুভূতি - পর্ব ২২ - ইসরাত তন্বী - ধারাবাহিক গল্প


          বড়ো একটা কাঠের দরজার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে রোহিশ এবং তন্ময়ী। কিছুক্ষণ আগেই 'ডুবইস প্যালেসে' এসে পৌঁছেছে সকলে। এতক্ষণে ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছিল সবার সাথে। এলিয়ানা, ডুবইস আর্থারকে খারাপ লাগেনি তন্ময়ীর নিকট। মানুষ গুলো হয়তোবা ভালো। এখন আস্তে ধীরে চিনে নিবে সকলকে‌। আদৌতে তারা কতটুকু ভালো। এক দেখায় তো আর সবাইকে চেনা সম্ভব নয়। পশু চেনা সম্ভব হলেও মানুষকে অসম্ভব। আর সেই ভুল তন্ময়ী নিজেও কখনো করবে না। তবে অদ্ভুতভাবে রিদাহ মেয়েটার সাথে ওর এখনো কথা হয়নি। তন্ময়ী খেয়াল করেছে ওকে দেখলেই মেয়েটা কেমন যেন পালাই পালাই ভাব ধরছে। কিন্তু কেন? এর উত্তর আপাতত তন্ময়ীর জানা নেই। তবে ঠিক জেনে যাবে‌। শুধু সময়ের অপেক্ষা। আসার সময় বাবার সাথে আর কোনো কথা হয়নি তন্ময়ীর। মেয়েটার মনটা অজানা এক কারণে বাবা নামক মানুষটার উপর অভিমান করে বসেছে। অবশ্য তখন কথা বলার সুযোগ ও ছিল না। এই দানবটা সেই সুযোগটুকুও দেয়নি। মনে আকাশসম ক্ষোভ পুষে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।

ভাবনার মাঝেই সম্মুখে থাকা দরজাটা শব্দ তুলে খুলে গেল। ভেতর থেকে হুড়মুড়িয়ে ভেসে এলো কাঁচা ফুলের মন জুড়ানো মৃদু সুবাস। খুব একটা ঝাঁঝালো নয়। তবুও তা নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই তন্ময়ীর শরীর জ্বালা করে উঠল। ভেতরে ফুল দিয়ে সম্ভবত ফার্স্ট নাইট ডেকোরেশন করা হয়েছে। আর এই ভাবনাটাই রৌহিশের প্রতি ঘৃণা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলো। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করতে প্রচেষ্টা চালাল। 

ওকে এক আনার গুরুত্ব না দিয়েই জুতো জোড়ার দ্বারা ঠকঠক শব্দ তুলে ভেতরে চলে গেল রৌহিশ। কিন্তু নিজের জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে রইল তন্ময়ী। নড়ল না এক পাও। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। তাকিয়ে রইল আঁধারে নিমজ্জিত ঘরটার দিকে। তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে আসা আলোর ঝলকানিতে আঁখি জোড়া বুজে নিলো।‌ সময় নিয়ে খুলতেই দেখল ঘরটা এখন আলোতে পরিপূর্ণ। অন্ধকারের অস্তিত্ব ফিকে হয়ে এসেছে‌ আলোর সম্মুখে। এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে প্রবেশ করল। দরজার ওপাশে পা দিতেই শরীর জুড়ে একটা ঝাঁকুনি খেলে গেল। তবে তা সহনীয় পর্যায়ে থাকায় তন্ময়ী বিষয়টা তেমন উপলব্ধি করতে পারল না। কিন্তু মনগহীনে একটা অস্থিরতা ঠিক অনুভব করল। 

ঘরজুড়ে দৃষ্টি ভাসমান হতেই কপালের ভাঁজ দৃঢ় হলো। ভ্রু কুঁচকে সহস্রাধিক ফুল দিয়ে সাজানো বেডটার দিকে তাকিয়ে রইল। রোজের পরিবর্তে টিউলিপ? তাও ব্ল্যাক টিউলিপ? রুম জুড়ে শত শত ছোট্ট ক্যান্ডেল জ্বলছে। আর ফুল হিসেবে কেবল ব্ল্যাক টিউলিপ। এমন অদ্ভুত ডেকোরেশনে তন্ময়ী ভীষণ অবাক হলো বৈকি! রৌহিশ আলমিরার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছিল। আড়চোখে তন্ময়ীর দিকে তাকাল। হাসল অল্প স্বল্প। তন্ময়ী পায়ে পায়ে হেঁটে বেডের সম্মুখে এগিয়ে গেল। একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই খেয়াল করল বেডের চারপাশে টাঙানো টিউলিপ গুলো দিয়ে কিছু একটা লেখা আছে। পড়ার চেষ্টা করল। চারপাশে ঘুরে ঘুরে অবশেষে পড়তে সক্ষম ও হলো। বিড়বিড় করে আওড়াল,

"My Black Tulip"

তক্ষুনি পিছনে কারোর উপস্থিতি অনুভব করল। এবং ঘাড়ে নাসারন্ধ্র নিঃসৃত শীতল হাওয়া। শিরশির করে উঠল প্রতিটা শিরা উপশিরা। তন্ময়ী ঘাড় বাঁকিয়ে পিছনে তাকাল। রৌহিশের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। না পেলো ভয় আর না পেলো লজ্জা। ওগুলো ওর চরিত্রের বিপরীত। রৌহিশ আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

"ইয়েস, ইউ আর মাই ব্ল্যাক টিউলিপ মিসেস ডুবইস রৌনক।"

"আপনার জঘন্য মিথ্যা ভালোবাসার জালে ফাঁসাতে চাইছেন?" থমথমে কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল তন্ময়ী। রৌহিশ নেত্র যুগল ছোট ছোট করে একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই ওর মতো করেই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল,

"তুমি ফাঁসবে?"

"আমাকে আর পাঁচটা মেয়ের সাথে গুলিয়ে ফেললে জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ওখানেই করবেন মিস্টার ডুবইস রৌহিশ রৌনক।"

"এত ঘৃণা?" বাম ভ্রু তুলে জানতে চাইল রৌহিশ। অধরে লেপ্টে আছে এক চিলতে বক্র হাসি।

"আমার মনের মাঝে অযত্নে থাকা সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি আপনি। আর এইসবের মানে কী রৌহিশ?" ইশারায় সাজানো ঘরটা দেখিয়ে বলল তন্ময়ী।

"কৈফিয়ত চাইছ আমার কাছে? মনে একটু ভয়ডর ঢুকাও হার্ট। তবে এই ছোট্ট সম্বোধনটা ভালো লেগেছে আমার।"

"লিসেন আমি আমার বাবাকে খুব ভালো করেই চিনি। এমন হুটহাট সিদ্ধান্ত আমাকে না বলে বাবা কখনোই নিবে না। এখানে কোনো একটা ঘাপলা তো আছেই। হতে পারে আপনি বাবাকে থ্রেট দিয়ে এমনটা করিয়েছেন। আর এর পিছনে থাকা সত্যটা আমি ঠিক বের করে ফেলব। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি। এখন আপনি যদি ভাবেন আমাকে জোর পূর্বক বিয়ে করে আমার উপর আপনার হুকুম জারি করবেন, আপনার কথামত আমাকে চলতে হবে। তাহলে আপনার ধারণা ভুল রৌহিশ। আমি আমার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমি না এই সম্পর্ক মানি আর না এই বিয়ে। আই জাস্ট হেইট ইউ। দূরে থাকবেন আমার থেকে।"

এক নিঃশ্বাসে সবটা বলে থামল মেয়েটা। রৌহিশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল। কেবল অধরপল্লব এক সাইডে প্রসারিত হলো। এই মেয়ে আসলেই ধানিলঙ্কা। এক্ষুনি এমন ব্যবহার! যদি কখনো সত্যিটা জানতে পারে তখন কী করবে? তন্ময়ী ততক্ষণে সরে রৌহিশের মুখোমুখি দাড়িয়েছে। দুজনের মাঝে দুই হাত মতো দুরত্ব বিদ্যমান। রৌহিশ নাটকীয় সুরে বলল,

"বাড়াবাড়ি ভাবনা, বাড়াবাড়ি কাজকর্ম অ্যান্ড.." একটু থামল। শরীর জুড়ে দৃষ্টি ভেসে চলল। দুষ্টু হাসল, "বাড়াবাড়ি রকমের সৌন্দর্য। তোমার সবকিছুই একটু বেশিই বাড়াবাড়ি টাইপের হার্ট। বাট আই এনজয় ইট।"

"নিজের নজর সামলান ডুবইস রৌহিশ রৌনক।" হিসহিসিয়ে উঠল তন্ময়ী। রাগে গজগজ করছে।যার দরুন শরীর মৃদু কাঁপছে। সবটাই লক্ষ্য করল রৌহিশ। তবুও ত্যাড়া প্রশ্ন ছুড়তে পিছপা হলো না।

"না হলে?"

"চোখদুটো আমার হাতে থাকবে।"

"হাউ রিডিকিউলাস হার্ট! বিয়ে করা বউ তুমি আমার। আমি চাইলে সব..." মুখের কথা শেষ করতে দিলো না তন্ময়ী। ছিনিয়ে নিয়ে নিজে দ্বিগুণ রেগে বলল,

"এই বিয়ের কোনো মূল্য নেই আমার কাছে। তাই ওইসব দুঃস্বপ্নেও ভাববেন না।"

"কোন সব?" কথাটা বলেই এক চোখ টিপলো রৌহিশ। তন্ময়ীর রাগের পারদ একশতে তুলে দেওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করল,

"বিচ! ইউ....." 

বিশ্রী এক গালি ছুঁড়তে নিচ্ছিল মেয়েটা। কী দুঃসাহস! কিন্তু মুখনিঃসৃত কথাগুলো শেষ করতে পারল না। কণ্ঠনালীতে আটকে গেল। ঝড়ের গতিতে ছিটকে পড়ল কোথাও একটা। পর মুহূর্তেই নিজেকে নরম বিছানা অনুভব করল। এবং পরপরই শরীরের উপর আরও একটা শরীরের অস্তিত্ব। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বন্ধ আঁখি জোড়া মেলে তাকাতেই হৃৎস্পন্দন থমকাল। রৌহিশের চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে গেছে। অবহেলায় পড়ে আছে ওদের পাশেই। এই প্রথম সাক্ষাৎ হলো দুটো রহস্যময় নেত্রের সাথে। চোখের পর্দায় আরও দুটো বিরল প্রজাতির চোখ ভাসমান হলো। কী অদ্ভুত সুন্দর মণি জোড়া! আর চাহনি! ধারাল অস্ত্রের ন্যায়। মুহুর্তেই হৃদয়টা ওই দৃষ্টিতেই ক্ষতবিক্ষত হওয়া সম্ভব। এক নিমিষেই সম্পূর্ণ একজন মানবকে পড়ে ফেলার সক্ষমতা আছে ওই শাণিত দুর্বোধ্য নয়ন জোড়ার। ওই দৃষ্টি যুদ্ধক্ষেত্রে অতি সহজেই অপরপক্ষকে ঘায়েল করতে সক্ষম। বেশিক্ষণ চোখে চোখ নিবদ্ধ রাখতে পারল না তন্ময়ী। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। বুঝল মন্ত্রমুগ্ধের মতো বশীভূত করতেও সক্ষম ওই চাহনি। রৌহিশ দুআঙ্গুলের সাহায্যে নরম চোয়ালে চাপ প্রয়োগ করে মুখটা পুনরায় মুখোমুখি করে নিলো। তন্ময়ী মুখমণ্ডলে ঈষৎ চাপ অনুভব করল। পরপরই শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল ফিসফিস করে আওড়ানো বজ্রনিরেট শান্ত গলার আওয়াজ,

"মুখ সামলিয়ে মিসেস রৌনক। জিহ্বাতে লাগাম টানো। আমার মুখের উপর কেউ কথা বলুক সেটা আমার পছন্দ নয়। ত্যাড়ামি করবে ভালো কথা তবে সেটা তোমার সীমানার মধ্যে থেকে। আদারওয়াইজ জিহ্বাটা হারাবে সারা জীবনের জন্য। আই ডোন্ট লাইক ইট হার্ট। সো বি কেয়ারফুল। নেক্সট টাইম এই ভুল করো না। বাঁচার রাস্তা পাবে না। আর তোমার জন্য আমার পানিশমেন্টের ধরণ ও ইউনিক হবে। তখন ঘৃণা রাখার জায়গা পাবে না।"

মুখনিঃসৃত কথাগুলো বেনামি হাওয়ায় হারিয়ে যেতেই নিজেকে হালকা ‌অনুভব করল তন্ময়ী। রৌহিশ ওয়াশ রুমে চলে গেছে ফ্রেশ হতে। উঠে বসল ও। শরীরটা ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে কেমন শীতল হয়ে এসেছে‌। একঝলক ওয়াশ রুমের দরজার দিকে তাকাল। ভেতর থেকে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। রৌহিশের এমন কথাতে বেশখানিকটা ভয় পেয়েছে। বাবাকে ভীষণ মনে পড়ছে‌। বাবার ওই প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে একটু শান্তির ঘুম দিতে মন চাইছে। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। বাবার হাতের স্নেহের পরশ পেলে হয়তো ভালো লাগত। লোচনদ্বয় ছলছল করে উঠল মেয়েটার। বুকচিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। অস্ফুট স্বরে আওড়াল,

"বাবা, আমাকে এ কোন নরকে পাঠালে!"

—————

সময় পেরিয়েছে। তন্ময়ী ব্যালকনিতে উদাস চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে। অর্থাৎ মধ্যরজনী এখন। চারপাশ ঘন অরণ্যের দ্বারা বেষ্টিত থাকায় শশীর মন ভোলানো রুপের দেখা পাওয়া দুষ্কর। তবে মন ভালো করার মতো মারুত বয়ে চলেছে। ঝিরিঝিরি পবন ক্ষণে ক্ষণে দেহের সংস্পর্শে এসে সতেজ করে তুলছে ক্লান্ত চিত্ত, কায়া। পরম আবেশে চোখজোড়া বুজে সবটা অনুভব করছে তন্ময়ী। এখনো শরীরে জড়ানো সেই ভারী গাউন। মনের যাতনার কাছে এইসব বড়ো তুচ্ছ। তাইতো এইসবে মেয়েটার তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। আনমনে দাঁড়িয়ে কী যেন ভেবেই চলেছে। এদিকে পাক্কা একঘণ্টা সময় নিয়ে ওয়াশ রুম থেকে বের হলো রৌহিশ। শরীরে দৃশ্যমান একটা টিশার্ট এবং থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। শুভ্র রঙা টাওয়াল ধরে রাখা ডান হাতটা কপালে পড়ে থাকা চুলগুলোতে চলমান। সেই অবস্থাতেই চোখ ঘুরিয়ে ঘর জুড়ে তন্ময়ীকে খুঁজল। কিন্তু ঘরের কোথাও পেলো না। ভ্রু কুঁচকাল। কোথায় গেল মেয়েটা? একটা বড়ো শ্বাস নিলো। মিষ্টি একটা সুগন্ধ ব্যালকনি থেকে ভেসে আসছে। বুঝল ব্যালকনিতে আছে মেয়েটা। সেদিকে পা বাড়াল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই। উদাসিন মনের অধিকারী তন্ময়ীকে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। নিজের ধ্যান, জ্ঞান খুইয়ে বিভোর হয়ে আছে অন্য এক জগতে। রৌহিশের উপস্থিতি বুঝতে অপারগ মেয়েটা। অতঃপর নিজের উপস্থিতি জানান দিতেই একটু কাশল রৌহিশ। ট্রিক্সে কাজ ও হলো। মেয়েটা ধ্যান চ্যুত হয়েই পিছু ফিরল। ভীষণ নরম দেখাচ্ছে ওকে। রৌহিশকে চমকে দিয়ে নিজে থেকেই বলল,

"মানুষ দুজন কিন্তু রুম একটা। সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হচ্ছে বেড ও একটা‌। এটার সমাধান কী?" কণ্ঠস্বরটা নরম মোলায়েম শোনাল। রৌহিশের ভ্রু যুগল নিজে থেকেই গুটিয়ে এলো। আবার কী চলছে ওই ছোট্ট মস্তিষ্কে? সেকেন্ড পাঁচেক পেরোতেই অধর বাঁকিয়ে হাসল। বুঝল আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছে তন্ময়ী।

"ডিভানে ঘুমানোর অভ্যাস নেই আমার।"

"আমার আছে।" অকপটে মিথ্যা বলে দিলো তন্ময়ী।

"ওকে ফাইন। আলমিরার ডান সাইডে ড্রেস রাখা আছে তোমার। চেঞ্জ করে নাও দ্রুত। মনের সাথে শরীরকে কষ্ট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি চাই না এত দ্রুত তুমি সবদিক থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ো‌।"

কথাটা বলেই ব্যালকনিতে টাওয়ালটা মেলে দিয়ে ওখান থেকে প্রস্থান করল রৌহিশ। একেবারে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এতো রাতে কোথায় গেল কে জানে? তন্ময়ী আর এইসব নিয়ে ভাবল না। ঘরে এসে রৌহিশের কথামতো আলমিরা খুলল। অমনিই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। ওর এত এত ড্রেস এখানে কীভাবে আসল? লাগেজে তো এত ড্রেস ছিল না। ইভেন লাগেজে থাকা ড্রেসের একটাও উপস্থিত নেই এখানে। সবগুলোই নতুন। কয়েক মিনিট হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটা টিশার্ট, প্লাজো এবং টাওয়াল নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।

মেয়েটা যখন ওয়াশ রুম থেকে বেরোল তখন ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই ছুঁই। প্রথমেই নজর আটকাল বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে ফোন স্ক্রল করা রৌহিশের দিকে। পুরুষালী সৌন্দর্য যেন কয়েকগুণ বেড়েছে। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। শরীরটা ভীষণ রকমের ক্লান্ত লাগছে। এক কদম ও হাঁটতে সায় দিচ্ছে না শীর্ণ দেহ খানা। ডিভানের দিকে অগ্রসর হলো। তৎক্ষণাৎ নিগূঢ় নিস্তব্ধতা গলিয়ে ভেসে এলো রৌহিশের পুরুষালী গম্ভীর স্বর, 

"টেবিলে খাবার রাখার আছে। হালকা পাতলা খাবার সাথে পেইন কিলার খেয়ে রেস্ট নাও। বেটার ফিল করবে হার্ট।"

তন্ময়ী ডিভানে শরীর এলিয়ে দেওয়া অবস্থাতেই প্রত্যুত্তর করল, "আপাতত ইচ্ছা নেই। টায়ার্ড আমি। আচ্ছা আমার লাগেজ কোথায়?"

"মম জানে। সকালে জেনে নিও।"

"ওকে।"

ছোট্ট করে জবাব দিলো মেয়েটা। কথা বাড়াতে ভালো লাগছে না। রৌহিশ পাশ থেকে একটা বালিশ তুলে নিয়ে ডিভানের উপর ছুঁড়ে মারল। ইশারায় ওটাতে মাথা রাখতে বলল। তন্ময়ী সেটাই করল। ছেলেটা মুখে আর একটাও টু শব্দ করল না। বেড সাইড সুইচ টিপে রুমের লাইট নিভিয়ে দিলো। অন্ধকারের ছোঁয়া পেতেই এতক্ষণে নিজেদের সৌন্দর্য বর্ধন করল ক্যান্ডেল গুলো। তন্ময়ী নিভু নিভু চোখে আবছা নিয়ন আলোয় জ্বলজ্বল করতে থাকা রুমটা দেখল। মুচকি হাসল। হিংস্রতার আড়ালে থাকা নারী স্বত্ত্বাটা উঁকি ঝুঁকি দিলো। ভাবল,

"আজ একটা সুস্থ স্বাভাবিক বিয়ে হলে এই রাতটা ওর জন্য কতটা স্পেশাল হতো। অন্য মেয়েদের মতো জীবনের কোনো এক সময় ও নিজেও এই রাতটা নিয়ে কিছু সুখকর, সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সবকিছু ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে। জীবনটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। জীবনের গতিবিধি পাল্টে গেছে। এখন আর কিছুই সম্ভব নয়।"

"সবকিছুই সম্ভব। প্রয়োজন মনমানসিকতা আর ইচ্ছা।" 

এবার আর চমকাল না মেয়েটা। রৌহিশের কথার পৃষ্ঠে জবাব ও দিলো না। নিজ মনে বলল,

"এই একজীবনে এরকম মনমানসিকতা, ইচ্ছা কখনো না হোক আমার। নিজের শত্রুর প্রতি সহানুভূতি কখনো না জন্মাক।"

—————

রাত্রি প্রায় শেষপথে। অরণ্যের শেষের মাথায় বয়ে চলা নদীর পাশ ঘেঁষে পাশাপাশি বসে আছে তিয়াশ, রায়ান। নদীর পানির কলকল ধ্বনি, বাতাসের শ শ শব্দ মিলেমিশে তৈরি করেছে উপভোগ্য একটা পরিবেশ। দুজনের হাতে জলন্ত সিগারেট। যা ক্ষণে ক্ষণে পিষ্ট হচ্ছে ওষ্ঠপুটের চাপে। তিয়াশ সিগারেটে এক টান দিয়ে প্রকৃতির বুকে কালো ধোয়া ছেড়ে আলগোছে মুচকি হাসল,

"নিজের সুন্দর একটা জীবন মে রে ফেলার জন্য ভুল মানুষকে ভালোবাসায় যথেষ্ট বুঝলে রায়ান?"

"ভালোবাসায় আবার ভুল, সঠিক আছে নাকি স্যার?" পুরুষালী গলার আওয়াজ মিইয়ে এসেছে। প্রকাশ পাচ্ছে চাঁপা কষ্ট।

"আছে গো আছে। আমাদের মতো ফকিরদের কপালে ভালোবাসা জোটে না। শালার এখানেও বৈষম্য। ভাবা যায়! ভালোবাসাও নাকি শুধু বড়োলোকের দুলালের জন্য বরাদ্দ। কী আশ্চর্য! যার জন্য নিজে হলাম দেওলিয়া সে কাঁদে অন্যকে নিজের করে পাওয়ার আশায়।" 

কথাটার সুর তাচ্ছিল্য হলেও চরম একটা বাস্তবতা তুলে ধরল ছেলেটা। রায়ানের চোখদুটো ভীষণ জ্বালা করছে। কিন্তু কেন? নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারায়? নাকি নিজের মনগহীনে একটু একটু করে সযত্নে গড়ে তোলা ভালোবাসার মালিককে অন্যের জন্য চোখের জল ঝরাতে দেখে? শত প্রশ্নের জটলা মস্তিষ্কে ধারণ করেই অতীত স্মরণ হলো। কতগুলো বছর, কতশত দিন, কতসহস্র ঘন্টা পেরিয়ে গেছে সেই সাক্ষাতের। অথচ বুকপকেটে রয়ে গেছে সেই প্রথম প্রেমে পড়ার স্মৃতিখানা। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়?
·
·
·
চলবে............................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp