মৌনচন্দ্রা - অন্তিম পর্ব ১৪ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

          আমার শহরে আজ ভীষণ আমেজ। কোনো এক উৎসব চলছে আপাদের ইউনিভার্সিটিতে। উঠতি বয়সী সকল তরুণ-তরুণীরা সেজেগুজে সেখানেই যাচ্ছে। আমিও আজ সাজলাম। মেরুন পাড়ের ছাঁইরঙা শাড়ি, চোখ ভর্তি কাজল ও হাতভর্তি অক্সিডাইজড জুয়েলারি... এত সেজেও আমি সেখানে গেলাম না। উলটোপথে পা বাড়ালাম স্টেশনের দিকে।

ছোট্ট একটা কাঁধব্যাগ চাপিয়ে ভোরের ট্রেইনেই ছুটে গেলাম ঢাকা, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে... মানুষ কারণে-অকারণে অনেক কিছুই করে ফেলে। আমার সদ্য নেওয়া এই পদক্ষেপটাও পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। 

আমি যখন পাহাড়তলী পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যে, আসমানে বিকেল। এই জায়গায় এর আগেও আমার আসা হয়েছে। এখানে বসেই হাপিত্যেশ করা হয়েছে। ওইযে, ওই ভাতের হোটেলে বসে কান্না চেপে খাবার খাওয়া হয়েছে। এসব তো ভুলে যাওয়া স্মৃতি নয়।

এমনই আরেক ব্যাপার আছে, যা একসময় মুখস্ত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিলাম। সেই ব্যাপারটা, যা এখনো ভুলতে পারিনি। আমি ফোন হাতে তুলে ডায়াল করে নিলাম এগারো ডিজিটের সেই বাংলালিংক নাম্বারটা। কল চাপিয়ে কানে তুললাম।

রিসিভ হলো চতুর্থ রিংয়ে। ওপাশ থেকে পুরুষালি এক সালাম এলো। মুচকি হেসে বললাম,
-“হ্যালো? আশিক ভাইয়া বলছেন?”

আশিক ইতিবাচক জবাব দিয়ে বলল, 
-“হ্যাঁ। আপনি কে?”

এই কণ্ঠ শুনে আমার আর বুকের ভেতরটা কাঁপে না, অস্থিরতায় হাঁসফাঁস করি না। এই কণ্ঠ শুনে আমার আর কান্না পায় না। কোনো ধরনের অনুভূতি আসে না। স্মিত হেসে তাকে বললাম,
-“আমি রিমি আপুর কাজিন। ফোনে কী যে হলো, আপুর নাম্বারটা পাচ্ছি না। আমাকে চিনতে পারছেন? আমি মিম!”

চিনতে না পারলেও সরাসরি মুখের ওপর কেউ বলতে পারে না সেটা। আশিকও বলতে পারবে না, সেটা আমি জানি। তাই হয়তো দুঃসাহসী পদক্ষেপগুলো ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। সে বলল,
-“হ্যাঁ, চিনেছি। আমি তো একটু ব্যস্ত আছি, মিম। তোমাকে তোমার আপার নাম্বার দিয়ে দেই, লিখো।”
-“আচ্ছা।”

গড়গড় করে আশিক রিমির নাম্বারটা আমায় দিয়ে দিলো। আমি কলটা কেটে কিছুক্ষণ স্টেশনে আনমনে বসে রইলাম। এরপর উঠলাম। খানিকটা হাঁটাহাঁটি করে আবারও বসলাম। এবার কল লাগালাম রিমিকে। 

রিমি কল রিসিভ করল না। আমি সেখানেই মিনিট দশেক বসে রইলাম। এরপর রিমি কলব্যাক করল। সে রিসিভ করতেই আমি বললাম,
-“রিমি?”
-“জি। আপনি?”
-“আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী। একটাই কথা বলার জন্য কল করেছি আপনাকে।”
-“কী?”
-“আশিককে চেনেন?”
-“হ্যাঁ, আমার স্বামী।”
-“এই চেনাতে যদি জীবন কাটিয়ে দেবেন, তবে প্রতিনিয়ত ঠকে গিয়েও ভালোই থাকবেন। আর যদি আত্মসম্মানের সাথে বাঁচতে চান, তবে চোখ-কান খোলা রাখুন। রাখছি। ভালো থাকবেন।”
-“আপনি কে?”
-“আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়া আপনাকে দেওয়ার মতো আমার দ্বিতীয় কোনো পরিচয় নেই।”
-“আপু...”

কলটা কেটে দিলাম আমি। এখন এসে মনে হচ্ছে, এই কাজটা কিন্তু সেদিন আমি রাজশাহী থেকেও করতে পারতাম। চট্টগ্রামে গিয়েছিলামটা কী করতে? বাতাস খেতে? 

ওহ নাহ! এত এত চাপের মধ্যে মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল আরও একটা বিষয়৷ প্রকৃতিতে এমনি এমনি কোনো ঘটনা ঘটে না। সবকিছুর পেছনে একটা না একটা সুস্পষ্ট কারণ থাকে। সেই কারণটা উদ্ধার করতে পারলাম না আজও...

তবে সেদিন সন্ধ্যের আগ মুহূর্তে চট্টগ্রামের আকাশ ভেঙে বর্ষণ হয়েছিল। ভারি বর্ষণ। টানা ছাব্বিশ মিনিটের বর্ষণ। আমি দু-ডানা ছড়িয়ে দিয়ে ভিজেছিলাম মাত্র আড়াই মিনিট। এরই মধ্যে কেউ একজন শক্তহাতে আমাকে টেনে ছাউনিতে নিয়ে গেছিল। কঠিন গলায় জানিয়েছিল,
-“আপনি পাগল? লোকাল প্লেসে বৃষ্টিতে ভিজছেন?”

আমার গা পুরোপুরি ভেজেনি এখনো। ব্যাগ থেকে এক সুতির ওড়না বের করে গায়ের ওপর জড়িয়ে নিতে নিতে বললাম,
-“তো কী হয়েছে? আপনার শহরে বৃষ্টিবিলাশে জরিমানা আছে নাকি?”
-“বৃষ্টিবিলাশ? এদিকে আপনি বৃষ্টিবিলাশ করছিলেন, ওদিক লোকে দৃষ্টিবিলাশ করছিল। দেখুন তাকিয়ে।”

আমি তাকিয়ে দেখলাম, আসলেই কিছু লোকের উদ্ভট দৃষ্টি আমার দিকে স্থির। চোখাচোখিতে তারা চোখ সরিয়ে নিল। খানিকটা দমে গেলাম আমি। তাকালাম আগন্তুকের দিকে।

বুক কেঁপে উঠল! এরকম জায়গায়, এরকম পরিস্থিতিতে, এরকমই দুঃখ নিয়ে, এই দুটো চোখের সামনে আমি আগেও ছিলাম। ডেজা-ভ্যু কি আমার সাথে আবারও ঘটছে? কেন এই লোকটাকে এত পরিচিত লাগছে? 

আমার প্রশ্নাত্মক গভীর চাহনিতে সে থেমে গেল। নরম হয়ে পড়ল ক্ষণিকেই। শান্ত স্বরে শুধাল,
-“এখানে কী করছেন, আরাধ্যা?”

আমার চোখ দুটো সামান্য বড়ো হলো। বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-“চেনেন? আমায়?”

সে মাথা নাড়ল ওপর-নীচ। আমি বলতে গেলাম তার নাম,
-“মে...”

সে আমার কথার মাঝখানেই বলে উঠল, 
-“নাওয়াজ। আমাদের দেখা হয়েছিল মাস দশেক আগে। এখানেই। ট্রেইনটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল.. মনে আছে? আপনি কেমন আছেন এখন?”

আমি চিনতে পারলাম এখন। স্থির হলাম। মাথা নাড়লাম আলগোছে। মলিন গলায় মৃদু হাসির সাথে বললাম,
-“ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন? আপনার মনে হয় হারিয়ে যাওয়ার রোগ আছে।”

নাওয়াজ ছোট্ট করে বললেন,
-“আমি তো ফিরে আসি। আপনাকেই পাই না।”

এটুকু বলে থামল। বিড়বিড় করে আবার বলল,
-“আপনার মনে হয় ধৈর্যটা কম, অপেক্ষা জানেন না।”

আমি শুনতে পারলাম এবং এটা সত্য। আসলেই আমি অপেক্ষা করতে পারি না। আসলেই ধৈর্যটা নেই। আমি তাকে বললাম,
-“আপনার বাড়ি এদিকে? এখানে কী করা হচ্ছে?”

নাওয়াজ বলল,
-“সাগরিকা রোডে। আম্মা একটু অসুস্থ, তো মনে হলো বাড়ি আসা প্রয়োজন। একটু আগের ট্রেইনেই এলাম। আপনি? আপনার বাড়ি তো এদিকে না।”
-“আমি এমনিই এসেছি। এখন ফিরে যাব। আটটার দিকে ট্রেইন আসবে।”

বড়ো ভদ্রলোক কিসিমের লোক নেওয়াজ, বাড়তি কোনো প্রশ্ন করল না। আমি স্মিত হেসে বললাম,
-“আপনার কি বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে?”
-“কেন বলুন তো?”
-“যদি না থাকে, আপনি কি আমার সাথে এখানে কিছুক্ষণ বসবেন? একা বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
-“আচ্ছা, আমি আছি।”
-“থ্যাংক ইউ।”
-“একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না করেন।”
-“বলুন।”
-“আপনার চোখে আসলেই কাজল খুব মানায়।”
-“ধন্যবাদ। আমি জানি সেটা।”

নাওয়াজের সাথে আমার টুকিটাকি আরও বেশ কথা হলো। সে খুব চাপা স্বাভাবের লোক। প্রয়োজনের বাইরে দুটোর বেশি কথা বলে না। একটা বললেও তাতে শব্দ কম থাকে। মেবি ভদ্রলোক খুব পড়াকু। পড়াকু লোকেরা এমন হয়ে থাকে। সংলাপের চেয়ে ব্যাখ্যায় বেশি উৎফুল্ল তারা। 

কিছুক্ষণ পর সে আমায় বলল, 
-“একটু বসুন, চা নিয়ে আসি।”
-“আচ্ছা।”

এই ফাঁকে আমি মেজবাহকে ঝটপট একটা চিঠি লিখে ফেললাম, সাথে এড করে দিলাম দুটো ছবি.. একটা বৃষ্টির আগে তোলা, অন্যটা পরে।

“মেজবাহ, 
অকস্মাৎ আপনাকে জ্বালানোর খুব ইচ্ছে জাগল। এটা একটা 'কিছু না' চিঠি। দুই মিনিটে লিখে তৃতীয় মিনিটে পাঠিয়ে দেবো। আপনি দেখবেন, চিঠি আসছে। অথচ পাবেন সামান্য ক'টা লাইন। তা-ও আবার 'কিছু না' লাইন।
মূল চিঠির অপেক্ষায় থাকুন। এই যে এত এত জ্বর নিয়ে আমি এখন রাত জেগে থাকব আপনার চিঠির অপেক্ষায়, এই দায়টা কি আপনি নেবেন? নেওয়া উচিত। 

পুনশ্চ: মেজবাহ, ভুলেও ছবি দেওয়ায় বকবেন না; আমার খারাপ লাগবে। আজ বৃষ্টিতে ভিজেছি, বুঝলেন? ছাইরঙা শাড়ি, ভেজা চুল, কানের পিঠে কৃষ্ণচূড়া ফুল আর আহ্লাদী আরাধ্যা নেচেকুদে এখানে হাজির, আপনাকে দেখাব বলে। এ নিয়ে বিস্তর গল্প মূল চিঠিতে লিখব। 

_aradhya_ 
June 11, 2017 7:30 PM
Somewhere in Bangladesh”

চিঠিটা পাঠিয়ে দিলাম। সাথে এড করে দিলাম দুটো ছবি। একটা বৃষ্টি মাখানো হাতের, অন্যটা কানে কৃষ্ণচূড়া গুঁজে তোলা শুধু চোখের ছবি। পদ্মলোচন দুটো দেখে তার জীবন ধন্য করে দেওয়ার প্রয়াসমাত্র! ভালো না?

চিঠিটা সেন্ড করতে একসাথে আমি দুটো আওয়াজ শুনতে পেলাম। কারো ফোনের নোটিফিকেশনের আওয়াজ, আর কারো গলার আওয়াজ,
-“আরাধ্যা, চা এনেছি। একা বোর হচ্ছেন? জীবনে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হওয়াও জরুরি কিন্তু...”

সেই দিন, সেই মুহূর্তে আমি খুব স্ট্রেসে ছিলাম। কিংবা পারিপার্শ্বিক সকল চাপে আমার মাথা থেকে যেসকল বিষয় বের হয়ে গেছিল, তারমধ্যে একটা হলো মেজবাহ নিজের পুরো নাম জানিয়েছিল আমাকে। তার নাম, আদ্রিয়ান নাওয়াজ মেজবাহ। 

আমি চা শেষ করে ট্রেইনে উঠে গেলাম। স্টেশনের ভীড়ে ফেলে রেখে গেলাম ওই জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখ দুটোকে। তার ঠোঁটের ভাঁজে এঁটে ছিল দূর্লভ হাসি। তার চোখের গভীরতায় কী ছিল, তা সেদিন ঠাহর করতে না পারলেও, আজ খুব পারছি। 
·
·
·
সমাপ্তি…………………………………………………………………

এই গল্পের প্রথম অংশের সমাপ্তি এখানেই। সম্পূর্ণ গল্পটি প্রকাশিত হবে বইটই অ্যাপে ইবুক আকারে, আগস্ট ২০২৫।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp