মেঘবন - পর্ব ০৭ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          আজ গগন রবি বিহীন। মেঘ সদস্যরা সফেদ রঙ পালটে ধূসর রঙে আচ্ছাদি হয়েছে। সে কি মেঘে মেঘে গর্জন, হর্তাল! গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজে বাজ পরছে। সকাল থেকে বৃষ্টি হবে হবে বলেও হচ্ছে না। সারা শহর কেমন আলো-আঁধারে ঢাকা। মেরিন বিল্ডিংয়ের নিচে নেমেই ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আজ বের হতে তার একদমই মন সায় দিচ্ছে না। বৃষ্টি হবে, এসময় ঘরে শুয়ে বসে না থেকে কার বাহিরে বের হতে ইচ্ছে করবে? না বের হয়েও অবশ্য উপায় নেই। পরশু থেকে গলার টনসিল বেড়েছে। বলা বারণ, একসঙ্গে দুটো আইসক্রিমের বক্স খাওয়ার দরুণই এই দশা। গলার ডান পাশ হালকা ফুলে ব্যথায় টইটুম্বুর। কিচ্ছু খাওয়া যাচ্ছে না। খেলেই গলায় আটকে আটকে যায়। মেরিনের দাদা সবসময় একটা কথা বলতেন, “জিহ্বার শরম না থাকলে রোগ-বালাই কখনো পিছু ছাড়ে না।”

আরেকদফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এদিক-ওদিক তাকালো মেরিন। নাহ্! রিকশার দেখা নেই। এমনিতে তো যখন প্রয়োজন নেই তখন মৌমাছির ঝাকের ন্যায় ভনভন করে এরা। প্রয়োজনের সময় এলেই ফুরুৎ! 
ইখতিয়ার আদিল সেসময় কোথায় যেন যাচ্ছিল। বিল্ডিং থেকে নেমে রাস্তার ধারে মেরিনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ব্যস্ত পা অচিরেই থমকালো। মেরিন তখনো তাকে দেখেনি। সে মুখে মিটিমিটি হাসি এঁটে এগিয়ে আসলো, “কোথায় যাচ্ছো মেরিন?”

মেরিন একবার আড়চোখে তাকালো। মুখভর্তি ঘন দাঁড়ির পারদে ইখতিয়ারের হাসি তেমন ঠাওর করা যাচ্ছে না। সুন্দর মুখখানায় শালীনতার অভাব। মাথার চুল ইয়া লম্বা লম্বা। বনমানুষ! বিরবিরিয়ে কথাটা বলে মেরিন উত্তর দিলো, “ডাক্তারের কাছে, ভাইয়া।”

এ বিল্ডিংয়ে আসার পর মেরিন এই প্রথম ইখতিয়ারকে কোনো সম্বোধন নিয়ে ডাকলো। তার এই আজ্ঞে, সম্মান ইখতিয়ারের বোধহয় পছন্দ হলো না৷ জ্বলজ্বলে তারার ন্যায় হাসতে থাকা ঠোঁটের হাসি চট করে মিলিয়ে গেল। চোখ-মুখ কুঁচকে মেরিনের দিকে তাকালো সে, “আমাকে তোমার ভাইয়ার মতো লাগে মেরিন?”

মেরিন বলতে চাইলো, “না, আপনাকে আমার রাস্তার বখাটের মতো লাগে।” অথচ অকপটে বললো, “আপনি আমার বয়সে বড়, ভাইয়া। আপনাকে ভাইয়া ডাকবো না তো কি ডাকবো?”

ইখতিয়ারের উত্তর দেবার আগেই একটা রিকশা এদিকে আসতে দেখলো মেরিন। হাত উঁচিয়ে ডাকলো, এড্রেস বললো। এখান থেকে এখানের পথ! প্রায় পনেরো-বিশ মিনিটের রাস্তা। অথচ ভাড়া চাইছে আকাশচুম্বী। রিকশাটা চলে গেল। মেরিন হতাশ নজরে চেয়ে চেয়ে দেখলো তা। ইখতিয়ার বললো, “আমার বাইক আছে। বাইকে যাবে?”

মেরিন এক বাক্যে উত্তর দিলো, “না।”
“কেন?”
“আপনার কি আর কাজ নেই?”

গালের ঘন দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ইখতিয়ার জবাব দিলো, “আছে। বিশাল কাজের স্তুপ আছে। আমি এখন যাচ্ছিলাম চুল-দাঁড়ি কাটতে। তার আগে এক বন্ধুর বাসায় যেতে হতো। ওকে কিছু টাকা ধার দেবার ছিল। ওহ্! তার আগে আরেকটা কাজ আছে। দেড়ি করে ঘুম থেকে উঠায় মা নাস্তা খেতে দেয়নি। হোটেলে গিয়ে ডিম ভাজি আর পরোটা খাবো।”

মেরিন মনোযোগ দিয়ে শুনলো, বুঝলো। আশ্চর্য চোখে ইখতিয়ারের দিকে চেয়ে তুচ্ছ সুরে বললো, “আপনি একটা অসভ্য!”
“ভুল! আমরা আদিল বংশ। খানদানি বংশ।”

মেরিন মুখ ভেঙ্গালো, “জীবনেও এমন বংশের নাম শুনিনি।”
“চুপ! তুমি বংশের কি বুঝবে? আমার মা, বাপ, ভাই, দূরদূরান্তের কিছু আত্মীয় সবাই আদিল বংশের। এটা একটা ইউনিক বংশ।”

মনে মনে ঠোঁট বাঁকিয়ে মেরিন ইখতিয়ার আদিলকে ভেঙ্গালো, “ইউনিক বংশ!” মুখে শুধালো, “আপনার মা কি বিয়ের পর সারনেইম পাল্টেছে?”

ইখতিয়ার দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে বললো, “নাতো!”
“তাহলে উনি আদিল কিভাবে হন?”
“আমার মা আমার আব্বুর চাচাতো বোন।”

হাত ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে ফাঁকা রাস্তাটার দিকে তাকালো মেরিন। এদিকটায় রিকশা আর পাওয়া যাবে না। সামনে এগোতে এগোতে শুধালো, “আপনিও আপনার ইউনিক বংশের চাচাতো বোনকে বিয়ে করে ফেলুন। মধুর অতীত পুনরাবৃত্তি হবে।”

ইখতিয়ার মেরিনের পিছু পিছু হাঁটছে। ইয়া লম্বা লম্বা পা ফেলে। মেরিন ইখতিয়ারের দিকে না তাকিয়েও লোকটার উদাস দীর্ঘশ্বাস, মন খারাপের রেশ কণ্ঠের জের ধরেই পরিমাপ করলো, “আমার কোনো চাচাতো বোন নেই মেরিন।”

কি শুকনো আর্তনাদ! মন খারাপের জাঁতাকলে পিষে যাওয়া স্নিগ্ধ, সতেজ মন! মেরিনের একটু খারাপই লাগলো। সেও ইখতিয়ারের মতো মন খারাপ নিয়ে বললো, “মনে কষ্ট নেবেন না, ভাইয়া। সবাই সব কিছু পায় না।”

সর্বোচ্চ স্বান্তনার পাঠ চুকিয়ে রিকশা ডাক দিলো মেরিন। মধ্যবয়সী রিকশা চালক। এবারও দাম চওড়া চাইছে। মেরিন আর দিরুক্তি করলো না। রিকশায় উঠে বসলো। আপাতত এখান থেকে যেতে পারলেই বাঁচে!

—————

রিকশা থেকে নামার পরপরই শুরু হলো গগন কাঁপানো বৃষ্টি। ইংরেজি প্রবাদ বাক্যের ‘cats and dogs’। এই অদ্ভুত নামের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টির কি সম্পর্ক— মেরিন জানে না। আপাতত প্রবল বৃষ্টির মাঝে এই অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে গবেষণাও করা যাচ্ছে না। সময় নেই। ব্যাগে ছাতা থাকলেও মেরিন বের করলো না। এখান থেকে এখানেই তো! দৌড় দিলেই হবে। অথচ দৌড়ে ভেতরে আসতে গিয়ে মেরিন ভিঁজে গেল। কাকভেঁজার একটু কম, আধভেঁজা।
ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন মেরিনের বাবা, ননী সাহেব। মেরিন অতশত ডাক্তারের নাম-ধাম দেখেনি। 

নামকরা হাসপাতালের আনাচে-কানাচে আধুনিকতায় ঝলমল করছে। একটু দেড়ি করে এসেছিল বিধায় বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। খানিকবাদে পিয়নের ডাক পরলো, “সিরিয়াল নম্বর ২০, মেরিন খন্দকার। বামপাশের কেবিনে যান। ডাক্তার অপেক্ষা করছেন।”

হাসপাতালের পুরো আগা-গোড়া এসির চাদরে মোড়ানো। হিম তাপমাত্রায় মেরিনের রীতিমতো কাঁপুনি হচ্ছে। ভেঁজা কাপড় অল্প শুকিয়েছে। গায়ের সঙ্গে এঁটে চুলকাচ্ছে খুব। একহাতে ওড়না টেনেটুনে ঠিক করলো সে। কেবিনে ঢোকার আগে ভেড়ানো দরজায় একবার টোকা দিলো, “আসতে পারি?”

ভেতর থেকে গম্ভীর, ভরাট পুরুষালী উত্তর, “আসুন।”

কণ্ঠস্বর বড্ড পরিচিত। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এসির বাতাসে আরেকদফা ঠান্ডায় কাঁপলো মেরিন। চেরায়ে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে শরীরের কাঁপুনি যেন আরেকটু দাম বাড়ালো, আরেকটু শিহরিত হলো। হাসপাতালের নীল পোশাকে এপ্রোন জড়িয়ে রাখা। চুল সামান্য এলোমেলো। টেবিলের ওপর ফাইলের গুটিকয়েক স্তুপ৷ একপাশে অ্যাপেল ব্রেন্ডের কম্পিউটার, কি-বোর্ড, মাউস! হাতের কালো রঙের বল পেন দিয়ে কি যেন লিখছে। খাঁড়া নাকে সবসময়কার মতো দাম্ভিকতা নিয়ে শুধালো, “দাঁড়িয়ে কেন?”
“হু?”

বার কয়েক পলক ঝাপটে এগিয়ে গেল মেরিন। চেয়ার টেনে বসলো। এবার যেন তারফানের চেহারা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিলো। উহু! তরফান না তামজিদ? টেবিলে গর্ব নিয়ে স্থান পাওয়া নেইমপ্লেটটার দিলো তাকালো মেরিন। সোনালী কালিতে খাঁজ কেটে লিখা, “TARFAN WAHAZ”।
হাতের কাজ শেষ করে চোখ তুলে তাকালো তারফান। চোখের সূক্ষ্ণ দৃষ্টে মেরিনকে পরখ করতেই আপনাআপনি কপালে শত শত বলিরেখার ভাঁজ ফেললো। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো, “কি জন্য এসেছো?”

হাতে থাকা রিপোর্ট তারফানের দিকে ঠেলে দিলো মেরিন। মুখে কিছু বললো না। সে এখনো এই আকস্মিক সাক্ষাৎ মেনে নিতে পারছে না।
তারফান আড়চোখে একবার দেখলো রিপোর্ট-টা। পাশের মাঝারি টেবিলে প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম রাখা। এই যেমন নাইফ, সেভলন, তুলা, ওটি গ্লাভস, সাদা পরিষ্কার টাওয়াল আরও কত কি! পাশ ঝুঁকে সেখান থেকে একটা সাদা তোয়ালে নিয়ে মেরিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “ছাতা নেই সাথে?”
“আছে।” মৃদু গলায় কথাটা বলে বাড়িয়ে রাখা তোয়ালেটা নিলো মেরিন। চুল অনেকটাই ভিঁজে আছে। মোছা দরকার। কিন্তু তারফানের সামনে কিভাবে মুছবে? দ্বিধা কাজ করছে খুব।

তারফান আবারও একই প্রশ্ন করলো, “কি জন্য এসেছো?”
“রিপোর্টে আছে।”
“মুখে বলো।”

বলতে বলতে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ইন্টেক পানির বোতল বের করলো তারফান। ডাকনা খুললো। বোতলটা মেরিনকে দিয়ে বললো, “খাও, মেরিন। এক ঢোকে পুরোটা শেষ করবে।”

এত্ত বড় বোতল! এক ঢোকে খাওয়া যায়? আদৌ সম্ভব? তারফানের মতো পাহাড়ের পক্ষে সম্ভব হয়তো। মেরিন পারবে না। অল্প চুমুকে শুকনো গলাটা ভেঁজালো মেরিন। বললো, “আমার টনসিলে ব্যথা করছে।”
“ভালো! ছাতা থাকা সত্ত্বেও ঢং করে ভিঁজলে ব্যথা অবশ্যই হবে।… ঠান্ডা কিছু খেয়েছিলে?”

মেরিন মিনমিনে স্বরে উত্তর দিলো, “পরশু আইসক্রিম খেয়েছিলাম।”

তারফান খুব স্পষ্ট একটা নিশ্বাস ফেললো। ওইযে? তাচ্ছিল্য করে মানুষ ফেলে না? ওমন! এসির রিমোট চেপে তাপমাত্রা বাড়াতে বাড়াতে বললো, “বসে না থেকে চুল মুছো। ফাস্ট!”

এ পর্যায়ে ভ্রু কুঁচকে সরু চোখে তাকালো মেরিন। আসার পর থেকে এই লোক একের পর এক আদেশ দিয়েই যাচ্ছে। কি আশ্চর্য! কেন? মেরিন চুল মুছলো না, কথা শুনলো না। তাকিয়ে তাকিয়ে তারফানকে দেখলো। বান্দা অবশেষে হাতে রিপোর্ট উঠিয়েছে। গভীর মনোযোগে কি যেন দেখে বললো, “এগুলো অনেক আগের রিপোর্ট। এগুলোতে চলবে না। গর্দভের মতো এসব নিয়ে এসেছো কেন? হু?" একটু থেমে বললো, "আবার নতুন করে টেস্ট করাতে হবে। তার আগে, দেখি…”

আচমকা টেবিলের ওপর ঝুঁকে মেরিনের গলার ফুলো পাশ’টা হাতের চার আঙুলে ছুঁয়ে দিলো তারফান। আলতো স্পর্শে হঠাৎই চাপ প্রয়োগ করে বললো, “ব্যথা পাচ্ছো?”

মেরিন চোখ-মুখ খিঁচে ফেললো, “হ্যাঁ।” পরপরই রাগী স্বরে বললো, “এমন পাষাণের মতো ব্যথার জায়গায় গুতো দিচ্ছেন কেন? কি সমস্যা?”

তারফান উত্তর দিলো না। হাত সরিয়ে ঠিক হয়ে বসলো আবার। হাতে কলম নিয়ে কিসব লিখতে লিখতে বললো, “ঔষধগুলো নিয়ম মেনে খাবে। যত দ্রুত সম্ভব টেস্ট করিয়ে আবার আমার কাছে আসবে। ততদিনে ব্যথা চলে গেলে ভালো। নয়তো…”
মেরিন ভয়ে ভয়ে শুধালো, “নয়তো? নয়তো কি? অপারেশন করাতে হবে?”

তারফান গভীর নজরে তাকালো। মেরিনের হালকা কাঁপা ঠোঁটের অস্থিরতা দেখলো। পিটপিট চোখের ভীতি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটু। তবে সামান্য। এই দু সেকেন্ডের জন্য। 

“এখন যাও। টেস্ট করিয়ে আবার আসবে।”

মেরিন গেল না। আবারও বললো, “আপনি কিন্তু উত্তর দিচ্ছেন না!”
“কিসের উত্তর?”
“ওইযে, অপারেশন করাতে হবে কি-না!”
“হতেও পারেন।”

মেরিন মুখ মলিন করে বললো, “আপনি আমাকে শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছেন কেন?”
উত্তরে এবার প্রকাশ্যে হাসলো তারফান। দীর্ঘ হাসির দরুণ তার চোখও হাসলো। মেরিনের মোটেও ভালো লাগলো না সেই হাসি। তারফান লহু স্বরে বললো, “তুমি এমনিতেও ভীতু, মেরিন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp