মেঘবন - পর্ব ০৯ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          তালহা হায়দায়… হায়দার! ছোটবেলা থেকে বস্তিতে বড় হওয়া। ওহ্! মাঝে একবার খুব সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে থাকার জায়গা হয়েছিল। সুখহীন ফ্ল্যাট! ছোটবেলায় বস্তিতে বড় হয়েছে বিধায় ভালো খাবার-দাবার কপালে তেমন জুটেনি। মা, দুই ভাই আর সে! ভাইরা তারা ট্রিপলেটস্। দুই ভাই পুরোপুরি এক হলেও সে ছিল ওদের চেয়ে একটু ভিন্ন, একটু অন্যরকম। চুলের রঙ থেকে চোখের চাহনি, আচার-আচরণ থেকে কথা বলার ভঙ্গি— সব অন্যরকম। বাকি ভাইদের চেয়ে একটু বোকাসোকা। কথা বলতে গেলে মুখে অবশ্যই একটা নিষ্পাপ হাসি এঁটে থাকবে। পিটপিট নজরে প্রত্যেকটা মানুষকে তার ফেরেশতা মনে হয়। ভাইরা যেখানে মায়ের কথা শুনে অচেনা কারো থেকে কিছু খেত না, সেখানে তালহাকে কেউ কিছু দিলেই সে তা চট করে পেটের গেঞ্জির ভাঁজে লুকিয়ে নিতো। লুকিয়ে লুকিয়ে খেত। আহ্! কমলা রঙের ললিপপগুলো এত মজা! এত মিষ্টিইইই! বস্তির লাগোয়া টং দোকানের জুলফার চাচা তাকে সবসময় দেয়।

ঘন কালো সন্ধ্যার একদিন মাকে না বলে, না কয়ে ললিপপ খাওয়ার ব্যাপারটা জননী জানতে পারলেন। সে কি মা-র তার! সে কি বকা! তালহার অভিমান হলো। এইটুকু হৃদয়ে কে যেন অভিমানের বিশাল পাহাড়ে আঁচড় কাটলো। চেয়ে দেখলো, ভাইরাও মায়ের তালে তাল মেলাচ্ছে। তার মা-র খাওয়া দেখে হাসছে। তালহার ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না এলো। টুপটুপ করে গাল ভিঁজিয়ে দিলো নোনা জল। তখন ঝড়বৃষ্টির মৌসুম। ক্ষণকাল বিরতী নিয়ে বৃষ্টির আগমন ঘটছে। সেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তালহা বাসা থেকে বেরিয়ে এলো। বলা যায়, পালিয়ে এলো। ওইযে? তার প্রিয় টং দোকানদার জুলফার চাচার কাছে। রাত্রি একটা দুটোর দিকে সে জায়গা মোটামোটি শুনশান হয়ে যেত। ম-দ-জু-য়ার আসর বসতো খুব সখ্যতার সঙ্গে। তালহা সেসব জানতো না। জানতো না, শুধুমাত্র মেয়েরাই শারিরীক নির্যা-তনের শিকার হয় না। নিষ্পাপ ছেলেগুলোও হয়। লিঙ্গ ভেদাভেদ? তা কি আদৌ তাদের দেখার বিষয়? একটা হলেই হয়, আয়েশ-ফুর্তি করার জন্য।

জুলফার চাচার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। বেঁটে-খাঁটো-লম্বা-চিকন-মোটা! লাল লাল চোখের, বিশ্রী ময়লাযুক্ত দাঁতের বয়স্ক লোকটা ক্রন্দনরত তালহাকে বড় আদর করে ডাকলেন, “কি হইছে বাবু? কান্দো ক্যান? লজেন্স খাবা? কাছে আসো, মজা দেই।”

তালহা রয়েসয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। পায়ের প্লাস্টার চেপে ধরে আছে৷ কুটকুটে অনুভূতি। পাশে একটা গাছের চিকন ডাল পরে আছে। সেটা নিয়ে প্লাস্টারের ফাঁকফোকরে গুঁতোতে লাগলো তালহা। তারফানকে বললো, “মাকে কখন ছাড়বি তোরা?”

তারফার ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিলো, “আর সপ্তাহখানেক।”

তাদের হাসপাতাল বিশাল বড়। সামনে মাঝারি আকারের একটা বাগান আছে। ওইতো! রোগীদের হাঁটাচলা, মুক্ত বাতাসের জন্য। মিনিট বাদে বাদে লাইট জ্বালানো থাকে সর্বক্ষণ। টিমটিমে বাতি। আকাশের চাঁদ তারচেয়েও দ্বিগুণ সময় ধরে জ্বলতে থাকে। কাছের নদী ধেয়ে সে কি স্নিগ্ধ বাতাসের আনাগোনা! ক্যান্টিন থেকে কাগজ-কাপের তিনটে কফি নিয়ে এলো তামজিদ। তালহা আর তারফানকে দিয়ে বললো, “আল-ফয়সাল মামাকে কোন হস্পিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিছু জানিস? এত দৌড়ঝাপে তো খবর নেওয়া হলো না।”

তালহা উত্তর দিলো, “টিভিতে দেখলাম সিটি হস্পিটাল। কবর বোধহয় গ্রামের বাড়িতে দিয়েছে।”

তারফান কফির কাপে চুমুক দিয়ে তামজিদকে বললো, “তোকে যে কাজ দিয়েছিলাম করেছিস?”

তামজিদ যেন বুঝেও বুঝলো না। ভ্রু তুলে শুধালো, “প্রেম করার বিষয়টা?”
“হু।”
“আপাতত করে ফেলেছি। মেয়েকে আমি কি পটাবো। নিজেই পটে গেছে। তবে যাই বলিস, চাল্লু মেয়ে। বাপের কথা সহজে বলতে চায় না। আমিও এখন অত চাপ দিচ্ছি না। কিছুদিন যাক… তুই ততদিনে প্লেন রেডি কর।”

তালহা এক চুমুকে কফি শেষ করলো। পায়ের ক্ষতটা আবার চুলকাচ্ছে। কি আশ্চর্য! গাছের ডাল দিয়ে আবারও গুতোগুতি করতে করতে শুধালো, “মেয়ের নাম কি? সুন্দর?”
“চুল লম্বা অনেক। চেহেরায় মায়া আছে। নাম কি যেন! অ্যাই তারফান? মেয়ের নামটা যেন কি?”

তারফান থমকালো, হকচকালো। হতবাক নজরে তাকালো তামজিদের দিকে। নাহ্! সে অভিনয় করছে না। বাস্তবিকই তার নাম মনে নেই। আজ নিয়ে দশদিন হচ্ছে সে মেয়েটার সঙ্গে। অথচ এখন অব্দি নামটাই আয়ত্তে রাখতে পারেনি? তারফান কাটকাট গলায় জিজ্ঞেস করলো, “তুই ওই মেয়েকে কি বলে ডাকিস?”
“কেন? বাবু, ডার্লিং?”

তারফান হতাশ নিশ্বাস ফেললো। বললো, “মেয়ের নাম তুবা তালুকদার।”

বাতাস হঠাৎ করে কমে গেছে। রাতের ভাত খেয়ে যে রোগীরা হাঁটতে এসেছিল, ফিরে যাচ্ছেন। তারফান, তামজিদ আর তালহা বসেছিল বাগান লাগোয়া শেষ সিঁড়িতে। এখানে মশা প্রচুর। ক্ষণে ক্ষণে কামড়াচ্ছে। পায়ের প্লাস্টারের যন্ত্রণার পাশাপাশি শরীরে পুনঃপুনঃ মশার কামড়ে অসহ্য হয়ে গেল তালহা। তুলকালাম চিৎকার তুললো, “ওরে… মশার বাচ্চারে…!”

—————

তারফানকে অনেকদিন হচ্ছে মেরিন আশেপাশে দেখে না। তালহা আর তামজিদকেও না। ভালোই! এ ফাঁকে সে যত ইচ্ছে ছাদে উঠতে পারে। গাছের যত্ন নিতে পারে। পানি দেয়। ফুল গাছগুলো মেরিন ছাদের শেষদিকে রেখেছে। ওদিকে অবশ্য রোদ অতো পাওয়া যায় না৷ গুমোট অন্ধকার। তাই সকাল হতেই, যখন তারফান থাকে না তখন ছাদে উঠে ফুলগাছগুলো চিলেকোঠার ওদিকটায় রাখে মেরিন। সন্ধ্যার আগে আগে গিয়ে আবার সরিয়ে রাখে। 
ঘড়িতে তখন ছ'টা। মাগরিবের আযান দিতে আর আধঘণ্টা বাকি। তারফানের নাইট ডিউটি থাকায় সে আপাতত আজ সারাদিন চিলেকোঠায় শুয়ে বসে ছিল। জানালা দিয়ে লুকোচুরি করা চোর মেরিনকেও দেখেছে। কিন্তু সামনে যায়নি। বিকাল বেলা রোদের তাপ কমতেই একটু ছাদে এসেছিল। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পরেছিল ছাদের রগরগে, ধুলোবালি মাখো মেঝেতে। বিকাল গড়ালো, গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আয়োজন হলো। সিঁড়ি দিয়ে কে যেন ধপধপ শব্দে ছাদে উঠছে। নিশ্চয়ই মেরিন খন্দকার? হ্যাঁ! মেরিন খন্দকার। তাকে এভাবে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে মেয়েটার চঞ্চল পা অচিরেই থমকালো। দেখতে দেখতে মুখমন্ডল হয়ে গেল সম্পূর্ণ লাল। কেন? ওহ! তারফানের পরনে এক ধূসর ট্র‍্যাকপ্যান্ট ছাড়া আর কিছু নেই। এজন্যই বোধহয় পিঠের দিকটায় কংক্রিট স্পষ্ট বিঁধছিল।

লজ্জায় লাল-নীল হওয়া মেরিনকে তারফান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। নিষ্প্রাণ দৃষ্টি। মেয়েটা মিনিটে মিনিটে মুখাবয়ব পালটায়। দেখতে ভালো লাগে। চলে যেতে নিলেই তারফান ডাকলো, “মেরিন…”
যেন কেমন সুরের ন্যায় ডাকলো তারফান। শেষের ‘ন’ ধ্বনি এত দীর্ঘ করে টানলো! মেরিন দাঁড়িয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। নজর মেঝেতে। অচিন মনে ভাবলো, তামজিদ আর তালহার মতোই তারফান স্বাস্থ্যবান।
তারফান শুধালো, “হাত ঠিক হয়েছে তোমার?”

আদুরে, শান্ত ডাক। কি আশ্চর্য! তারফান তাকে খোঁচা দিচ্ছে না। আড়চোখে তাকিয়ে মেরিন জবাব দিলো, “এখন ঠিক আছে।”
“তোমার গাছগুলো সরিয়ে তারপর যাও। আমার মাথা ব্যথা করছে।”
মেরিন উচ্চবাচ্য করলো, “আপনি তো দিব্যি ঠিক আছেন।”

বলতে না বলতেই বিরাট শব্দে হাঁচি দিলো তারফান। যেই সেই হাঁচি নয়, বাঘের গর্জন৷ এত বিশ্রী ভাবে হাঁচি দেয় কেন এই লোক? আস্তে দিতে পারে না? হাঁচি দেওয়ার সময় হাত আবার গুটিয়ে রাখে। নোংরা!
তারফান বললো, “এই নিয়ে ত্রিশতম হাঁচি দিলাম। তুমি তোমার গাছ সরাবে, নাকি আমি সেদিনের মতো ছাদ থেকে ফেলে দেব?”
মেরিন সংগোপনে বিড়বিড়ালো, “অসভ্য! বেত্তমিজ!” অথচ মুখে বললো, “দিচ্ছি।”

গাছ গোছাতে গোছাতে অনেকটা সময় লেগে গেল। মেরিনের গাছ তো কম নয়। মোটে পনেরোটা তার ফুলগাছই। সবজি গাছ মিলিয়ে বিশ-পঁচিশ হয়। গাছ গোছাতে গোছাতে মেরিন বারবার তারফানকে দেখছিল। লোকটা এদিকে চেয়ে নেই। সন্ধ্যা নেমে আসা আকাশের দিকে চেয়ে। হাত গুটিয়ে মাথার কাছে রেখেছে। উজ্জ্বল শ্যামরঙা পেটানো শরীর! বলিষ্ঠ! নিমিষেই মেরিনের গাল উত্তপ্ত হয়ে গেল। দু'তিনবার জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিলো-ফেললো। আচমকা একটা প্রশ্ন মাথায় আসতেই শুধালো, “আচ্ছা.. আপনার বাবা কি করেন?”
“হু?” চোখ বুজে জিজ্ঞেস করলো তারফান। মেরিন আবার বললো, “আপনার বাবা! তিনি কি করেন? আপনাদের সঙ্গে থাকেন না কেন?”
“তিনি প্রতারক ছিলেন। তাই সাথে রাখিনি।”
“জি? কি বললেন?” 

পিটপিট চোখের পাতা ফেলে তাকালো মেরিন। তারফান জবাব দিচ্ছে না। এখনো চোখ বুজে আছে। নিশ্বাস নিচ্ছে, বুক উঠা-নামা করছে। মেরিন আস্তে করে শুধালো, “আপনি ঠিক আছেন?”
“না।” স্পষ্ট উত্তর। মেরিন হকচকালো, “স্যরি।”
“কেন?”
“আমি মনে হয় ভুল কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলেছি।”
“এত দেড়ি করে বোঝার স্বভাব কেন তোমার, মেরিন?”

তারফান চোখ মেললো। জ্বলজ্বলে নজরে তাকালো। দূর থেকে আজানের শব্দ এলো তক্ষুণি। মেরিন নরম সুরে বললো, “আমি যাই…”

তারফান সঙ্গে সঙ্গে বললো, “আমি কি তোমাকে আটকে রেখেছি, হু.. মেরিন?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp