হাসপাতালের পাশে বিরাট এক নদী আছে। অবিরাম, অক্লান্ত বয়ে চলা স্রোতের ঢেউ, মুক্ত বাতাস। লোকে এখানে প্রিয়জন নিয়ে খেতে আসে। একান্ত সময় কাটায়। ফুচকা, চটপটির পাশে ওইযে, ছোট্ট বাক্সের মতো দোকান গাড়িতে আইসক্রিমও বিক্রি হচ্ছে। এক মুহুর্তের জন্য গলার ব্যথা ভুলে আইসক্রিম খেতে জিহ্বা নিশপিশ করছিল মেরিনের। সে বহুকষ্টে তা দমালো। তারফান নামক বেত্তমিজ লোকটা এমনিতেও তাকে ভয় পাইয়ে রেখেছে। যদি সত্যিই গলার অপারেশন করতে হয়? উহু! নাহ্! রিস্ক নেওয়া যাবে না। তবে লোকেদের ফুচকা-চটপটি খাওয়া দেখে লোভ সামলাতে পারলো না মেরিন। আইসক্রিম খেতে পারছে নাতো কি হয়েছে? সে ফুচকা খাবে। মাত্র মাত্র রিকশা নিলেও ভাড়া মিটিয়ে নেমে পরলো মেরিন। লাল রঙের আর.এফ.এলের চেয়ারে আয়েশ করে বসে বললো, “মামা, ঝাল ঝাল করে এক প্লেট ফুচকা দেন তো!”
হিমেল হাওয়া ক্ষণে ক্ষণে বইছে। ছুঁয়ে দিচ্ছে এই আকাশ, আকাশের নিচের মানুষ, গাছপালা, নদীর স্রোত! অচিন পাখির ডাক অনায়াসে কানে আসছে। একটা পাতা কোত্থেকে যেন উড়ে এসে মেরিনের হাতে পরলো। সবুজের সঙ্গে হলুদ মিশেলের একটা ছোট্ট পাতা। আকারটা ফুলের মতো। আঙুলের ভাঁজে পাতাটা নিয়ে মেরিন স্নিগ্ধ হাসলো। এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেলছিল ওমনি হঠাৎ! রাস্তার ওপারের বা'দিকের সারিতে ভীষণ চেনা একটা মুখ দেখতে পেল মেরিন। মিষ্টি রোদের আলোয় মাথার লালচে কালো চুল আগুনের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে। মেরিন ভুরু কুঁচকে ফেললো। তারফানকে তো মাত্রই হাসপাতালে দেখে এলো। এ নিশ্চয়ই তামজিদ? অবশ্যই তামজিদ। কিন্তু সাথে এ মেয়েটা কে?
ফুচকার প্লেট হাতে চার বছর বয়সী ছোকরা এগিয়ে এলো মেরিনের দিকে। চোখে মুখে স্বতঃস্ফূর্ত বিরক্তি এঁটে বললো, “কি আফা, কতক্ষণ ধইরা ডাকের? বয়রানি? প্লেট লন!”
হকচকিয়ে মেরিন প্লেট হাতে নিলো। লোভনীয় দেখতে ফুচকা। শশা, ডিম কুচির আড়ালে ভেতরের পৌর দেখা যাচ্ছে না। সাথে একটু বোম্বাই মরিচও কুঁচিকুঁচি করে ছিটিয়ে দিয়েছে। খুব ঘন তেঁতুলের টক। মেরিন চট জলদি মুখে একটা ফুচকা পুরে নিলো। জহুরি চোখে ফের তাকালো ওপাশের রাস্তায়, তামজিদের পানে।
তামজিদের পাশে বসে থাকা মেয়েটার গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা। চুলগুলো ডিজনি প্রিন্সেস রুপাঞ্জেলের মতো অনেকটা ঘন, লম্বা। বেণি করে রেখেছে। পরনে বেশ আধুনি পোশাক। মুখে হালকা-পাতলা মেকাপ। দুর্দান্ত চেহারার মেয়েটা কেমন একটু লেগে লেগে বসেছে তামজিদের সঙ্গে। ওরাও ফুচকা নিয়েছে। তামজিদ অবশ্য খাচ্ছে না। গম্ভীরমুখে মেয়েটাকে দেখছে। মেয়েটা আচমকা একটা সাহসিকতার কাজ করে ফেললো। এই ভরা রাস্তায় হুট করেই তামজিদের মুখে প্রেয়সী আদরে ফুচকা ঢুকিয়ে দিলো। মিটিমিটি হেসে কি যেন বললোও আবার। মেরিন তখন মাত্রই আট নম্বর ফুচকা মুখে পুরেছে৷ ওদের এহেন বেহিসাবি কান্ডে যারপরনাই বিষম খেল। খুকখুক করে কাঁশলো একবার, দু'বার, তিনবার!
মেরিনের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল তখন, যখন দেখলো এবার তামজিদও মেয়েটার সঙ্গে হাসছে। মেয়েটাকে সযত্নে ফুচকা খাইয়ে দিচ্ছে। কপালের ছোট ছোট চুল কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে। কি আশ্চর্য! কে এই মেয়ে? তামজিদের প্রেমিকা নয় তো? মাথায় গন্ডগোল পাকানো প্রশ্নের উত্তর না পেলেও তামজিদের নজর ঠিকঠিক মেরিনের দিকে পৌঁছে গেল। মেরিনকে দেখতে পেয়ে তার তীক্ষ্ণ ঈগল চোখ যেন এক মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে গেছে। মুখে কিঞ্চিৎ গম্ভীর ভাব আসতে গিয়েও আসছে না। বরং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বেয়াদবের ন্যায় তামজিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। তার চিরপরিচিত, জনপ্রিয় কুটিল হাসি!
প্লেটে আর মাত্র দুটো ফুচকা ছিল। মেরিন পরপর দুটোই মুখে গুঁজলো। চিবিয়ে চিবিয়ে ফুচকা দুটো দাঁতের ঘর্ষণে পিষে একাকার করে ফেললো একদম। ব্যাগ থেকে ছোট্ট পার্সব্যাগ বের করতে করতে বললো, “কত হয়েছে মামা?”
ওপাশ থেকে সেই ছোকরা উত্তর দিলো, “আমার বাপ কতা কইতে পারে না। ট্যাহা আমারে দেন। চল্লিশ হইছে।”
ভাগ্য মেরিনের সহায় ছিল বোধহয়। রিকশা তেমন খুঁজতে হয়নি। ন্যায্য দামে পেয়ে যেতেই উঠে পরলো মেরিন। হুড তোলার আগে আড়নয়নে একপলক তামজিদের পানে তাকালো। লোকটা এখনো পরীর মতো মেয়েটার তোষামোদ করছে।
—————
দুর্বিষহ তাপে সমগ্র শহর খাঁ খাঁ করছে। বজ্র মেঘের দেখা নেই। বৃষ্টি নেই। মৃদুমন্দ বাতাস নেই। ঘরের এসির পাওয়ার কমানো। তবুও গরম মিটছে না। আঁটসাঁট ভাবে হাতা কাটা গেঞ্জি শরীরের সঙ্গে জড়ানো। টিভির পর্দায় সময় চ্যানেল চলমান। দেখাচ্ছে, গতকাল সকাল বেলা ঘটে যাওয়া একটি মর্মা'ন্তিক ঘটনার সারসংক্ষেপ। ঘটনাটা ঘটেছে তালহার শুটিং স্পষ্টের সামান্য আগে। সেসময় মৌসুম বড় উৎফুল্ল ছিল। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে বাজ পরছিল একটু পর পর। তালকার ঠিক এরকমই একটা আবহাওয়ার দরকার ছিল তার নাটকের পরবর্তী দৃশ্য শুটের জন্য। কিন্তু হায়! গাড়ি দিয়ে শুটিংস্পটে যাওয়ার পূর্বেই মাঝপথে কঠিন বর্জপাত সব কিছু এলোমেলো করে দেয়। বাজটা পরেছিল ঠিক গাড়ির সামনে। ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। আচমকা চোখের সামনে তীব্র আলোর ঝলকানিতে সব ঝাপসা, অস্পষ্ট, ঘোলা। তারপর… তারপর যা হওয়ার হয়ে গেল। গাড়িতে ড্রাইভার, তালহা আর তার এসিসট্যান্ট ছিল। ভাগ্যিস নায়ক-নায়িকা পরের গাড়িগুলোতে ছিল! ওদের কিছু হয়নি বলেই এখনো শান্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছে তালহা। যদিও শতশত ঝড়-ঝাপটা তাকে সামলাতে হবে—জানে। ড্রাইভার আর তার এসিসট্যান্ট এখনো হাসপাতালে ভর্তি। অবস্থা মোটামোটি। তালহাকে এইতো সকালে ডিসচার্জ করা হয়েছে। পায়ের গোড়ালির হাড় অল্প নড়ে গেছে। কয়েকদিন রেস্ট নিলেই হবে।
পায়ে বিশাল দৈর্ঘ্যের ফ্র্যাকচার নিয়ে তালহা আপাতত সোফায় বসে আছে। বসে বসে টিফি দেখছে। মিডিয়ার লোকগুলো আস্ত পয়সা খেকো! একটা সহজ ব্যাপারকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে কি কি বানিয়ে দিয়েছে। সে নাকি নাটকের মার্কেটিংয়ের জন্য এমন দূর্ঘটনা ইচ্ছাকৃত ভাবে করেছে৷ কি অদ্ভুত! বিরক্তিতে তিক করে শব্দ করলো তালহা। মনে মনে তিন চারটে গালি দিয়েও শান্তি পেল না। পাশে বসে থাকা তারফানকে বললো, “অ্যাই! তুই এখানে কি? তোর চিলেকোঠায় যা।”
মাত্রই হাসপাতাল থেকে ফিরেছে তারফান, তামজিদ। ভাইকে দেখতেই তারফানের মূলত এখানে আসা।
সোফায় মাথা এলিয়ে তারফান ভ্রু কুঁচকালো, “বড় ভাইয়ের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে? পাছায় লাত্থি খাবি?”
তালহা সে কথার উত্তর দিল না। প্রয়োজন মনে করল না। একই সুরে বললো, “তুই কেন এসেছিস এখানে?”
“অবশ্যই তোকে দেখতে। আর কেন?”
মুহুর্তেই খেঁক করে উঠলো তালহা, “এখন কেন আসছো ভাইকে দেখতে? কিজন্য? কালকে তোমার হাসপাতালেই ভর্তি ছিলাম। একটু তো সময় পাও নাই ফুঁচি মারতে। যেয়ে একটু দেখি ভাইটা কেমন আছে! কি করছে! বেশি ব্যথা পেয়েছে কি-না! তখন তো সময় হয় নাই। এখন ঢং মারাছ আমার সাথে? তোকে আসলেই মা কুড়ায় আনছে। তুই আমার ভাই না। তামজিদ আমার ভাই।”
তারফান প্রথমে মুচকি হাসলো। এরপর দাঁত বের করে তাকালো তালহার ফুটন্ত মুখপানে। হাসি বজায় রেখে বললো, “তামজিদ তোকে দেখতে যেতে চায়নি। আমিই জোড় করে ওকে তোর কাছে পাঠিয়েছিলাম।”
তামজিদ মিটিমিটি হাসছে। তারফানের কথায় সায় দিয়ে বলে, “আসলে তোকেই মা ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে এনেছে। তুই আমাদের আপন ভাই না। আমাদের সাথে তোর কিচ্ছু মিলে না।”
তালহা ফাঁটা বেলুনের ন্যায় চুপসে গেল। মনে মনে হাজার গালমন্দ করলো ভাইদের। হুহ! কিচ্ছু মিলে না! কিন্তু আপাতত সেসব তর্কে সে আর গেল না। গলা উঁচিয়ে রজনী হায়দারকে ডাকলো, “মায়ায়ায়া! কফি দাও।”
টিভিতে তখন অন্য খবর দেখাচ্ছে। বিশিষ্ট সাংবাদিক আল-ফয়সাল হাকিম মারা গেছেন। বাসার সিলিন্ডার লিক হয়ে আগুন ধরেছিল। সেখান থেকে পুরো বাড়ি জ্বলেপু'ড়ে শেষ। শেষ সেই বাড়ির প্রতিটা মানুষ! রজনী হায়দার মাত্র মাত্রই রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন। টিভির চলমান খবরে তার পা থমকে গেল। থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরে কেমন বিষপ্রতিক্রিয়া পৃথিবী অন্ধকার করে তুললো। মাথা ঘুরালো। চোখের সামনের সবকিছু ঘোলা হলো। হাত থেকে কফির মগসহ ট্রে মেঝেতে পরে গেছে। মিষ্টি এক সুর কানে বারংবার বাজলো, ঝনঝন! ঝনঝন! পরপরই মেঝেতে বিশাল কিছু পরার ধপ শব্দ!
তিন ভাই চমকে উঠার সময় পেল না। ভয়, আতংক একসঙ্গে ঘিরে ধরায় কেমন নির্জীব তাকিয়ে রইলো এক সেকেন্ড, দু সেকেন্ড… চার সেকেন্ড! তালহা অস্পষ্ট আওয়াজ তুললো, “দৌড়ে যা তারফান! তামজিদ উবার কল দেয়!”
পায়ের ব্যথায় তালহা নড়তে পারলো না। তারফান ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিলো মাকে। সিঁড়ি দিয়ে নামলো এত দ্রুত ভাবে! মানুষ দেখলে বলতো, ছেলেটা উড়ে উড়ে যাচ্ছে।
—————
রাজনী হায়দারের হার্ট অ্যা'টাক হয়েছিল। এখন ভালো আছেন। তবে পুরোপুরি সুস্থ নন। আরও কিছুদিন হাসপাতালেই থাকতে হবে। তারফান হাসপাতালের সব ফর্মালিটি পূরণ করে বাসায় ফিরল পরেরদিন বিকালে। সারারাত জেগে থাকার দরুণ শরীর ভেঙ্গে আসছিল। ক্লান্ত চোখ, মলিন মুখশ্রী। গায়ের শার্টটা ধুলোবালি আর ঘামে বিচ্ছিরি রকম কুঁচকে আছে। ফ্যাকাসে চুল যাযাবরের চেয়ে কম নয়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নিচ্ছিল, পেছন থেকে আট বছরের একটা ছেলে দৌড়ে এলো তারফানের কাছে। কিছু বলার আগে হাঁপালো দু’মিনিট। মনে হচ্ছে যেন বহুদূর থেকে দৌড়ে এসেছে। নিশ্বাস ফেলে-নিয়ে তাড়াহুড়ো গলায় বললো, “তুমি না ডাক্তার? চলো আমার সাথে।”
নিঃসঙ্কোচ আবেদন। ছোট ছোট হাতের আঙুল ইতোমধ্যে তারফানের বিশাল হাত আঁকড়ে ধরেছে। দু'হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকটায়।
তারফান কপালে গুটি কয়েক ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন ছুঁড়লো, “কে তুমি? কোন তলা?”
“দুই তলায়। তুমি আমাকে চেন না? আমরা না সেদিনও একসঙ্গে ক্রিকেট খেললাম? ইখতিয়ার ভাইয়ার সঙ্গে? অ্যাই, তুমি সত্যিই ডাক্তার তো?”
যেন ছেলেটাকে না চিনতে পেরে তারফান বিশাল অপরাধ করে ফেলেছে। একটু আগের স্বচ্ছ মুখে আষ্টেপৃষ্ঠে আছে অসন্তোষ। তারফান কপালের ভাঁজ দৃঢ় করলো। বুঝে পেল না, না চেনার সঙ্গে ডাক্তার হওয়ার সম্পর্ক কি?
বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে ছোটখাটো একটা বাগান আছে। এ বাড়ির মালিক গাছ নিয়ে সৌখিন। মালি ভীষণ যত্নে একেকটা গাছ লাগিয়েছেন। সেই বাগানে পা রাখতেই তারফানের নিশ্বাস আটকে গেল। চারিদিকে ফুলের কড়া ঘ্রাণ মৌ মৌ করছে। সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে বিধছে ঘ্রাণটা। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। তারফান শক্ত গলায় ছেলেটাকে বললো, “এখানে নিয়ে এসেছো কেন?”
ছেলেটার নাম জুম্মু। আমতা আমতা গলায় বললো, “তুমি না ডাক্তার? আমাদের মেরিন আপু গাছ লাগাতে গিয়ে হাত কেঁটে ফেলেছে। ওইযে, ওইদিকে। তুমি মেরিন আপুর হাত ঠিক করে দিতে পারবে না?”
নিষ্পাপ চোখে টলমল করা বিশ্বাস, আশা। তারফান প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো। ফুলের ঘ্রাণে মাথা হ্যাং হয়ে আছে। চোখ ছোট ছোট করে বাগানের চারদিকে নজর বুলাতেই দেখলো, একদম মধ্যিখানের খালি জায়গাটায় হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে সুশ্রী রমণী। হাতের তালুতে বার বার ফুঁ দিচ্ছে। চোখের জল টুপটুপ। তার আশেপাশে কিছু গুড়ো গুড়ো ছেলেপেলে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তারফান এগিয়ে গেল। হাত কাঁটার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বুঝলো সুশীল রমণী সামনের নার্সারি থেকে গাঁদা গাছ এনেছেন। লাগাতে গিয়ে মাটিতে থাকা আস্ত একটা কাঁচ গেঁথে গেছে তার তালুর একপাশটায়। ক্ষ’ত নেহায়েত সল্প নয়। গভীর। র’ক্ত হাত বেয়ে বেয়ে পরছে। তারফান মেরিনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। বিনা বাক্য বেয়ে নাজুক হাত টেনে নিলো তার রুক্ষ, বিশাল হাতের মাঝে। দু'একবার হাতটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো। ছেলেপেলেদের একজনকে বললো, “কাছের ফার্মেসি থেকে সেভলন, তুলা আর ব্যান্ডেজ নিয়ে আসো। পারবে না?”
ছেলেটা মাথা দুলালো, সে পারবে।
পাশেই গাছ লাগানোর জন্য পরিষ্কার একটা প্লাস্টিকের টব ছিল। অন্য একটা ছেলে তারফান বললো, “তুমি এই টবে একটুখানি পানি নিয়ে আসো।”
পরপর আশেপাশে তাকিয়ে কি যেন খুঁজলো সে। কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেয়ে নির্লিপ্ত চিত্তে মেরিনের ওড়নার শেষভাগ টেনে নিলো। ক্ষ’ত স্থান ঘিরে বালুমাটি লেপ্টে আছে। ওড়না আঙুলে পেঁচিয়ে আস্তে আস্তে মাটিটুকু সরাতে লাগলো তারফান। কণ্ঠে গাম্ভীর্য নিয়ে শুধালো, “তুমি আকাম ছাড়া কিছু পারো না?”
মেরিনের কান্না তারফানকে দেখা মাত্রই থেমে গিয়েছিল। সে এতক্ষণ অদ্ভুত লোকটার অদ্ভুত সব কান্ড দেখছিল। তারফান বাঁকা কথা বলতেই মুখ খুললো, “আপনার তাতে কি?... উহ্!” কথাটা বলার মাঝেই ব্যথায় খানিক কুঁকিয়ে উঠলো মেরিন। বেত্তমিজ লোকটা কি ইচ্ছে করেই তার ব্যথা স্থানে খোঁচা দিলো? দিলো বোধহয়। ঠোঁটের কোণের লুকায়িত হাসি মেরিন স্পষ্ট দেখেছে। কটমট নজরে তাকালো সে, “আপনার জন্য আমার এই অবস্থা। আপনি আমাকে ছাদে গাছ লাগাতে নিষেধ না করলে আমি এখানে গাছ লাগাতে আসতাম না। আমার হাতও কাঁটতো না।”
তারফান চোখ ছোট ছোট করে বললো, “এখন এটা আমার দোষ?”
“অবশ্যই!”
“লিসেন, মেরিন! ছাদে গাছ লাগানো তুমি এখনো বন্ধ করোনি। আমি হস্পিটালে যাওয়ার পর তুমি ঠিকই ছাদে উঠো। গাছে পানি দাও। বলো মেরিন। দাও না, হু?”
মেরিন ঠোঁট কামড়ে মাথা নুয়ালো। চোখ ঘুরিয়ে বাঁচার উপায় খুঁজলো। কিন্তু নেই, উপায় নেই। ইতস্তত কণ্ঠে বললো, “আপনি জেনে গেছেন কিভাবে? আমি তো সাবধানে গিয়ে সাবধানে চলে আসি।”
ভীষণ আস্তে শোনালো কথাটা। মেরিনের পরাজিত কণ্ঠে কেমন একটা পৈশাচিক আনন্দ পেল তারফান। ফার্মাসি থেকে ব্যান্ডেজ, তুলা আর সেভলন নিয়ে ছেলেটা চলে এসেছে। প্রথমে মেরিনের কাঁটা স্থান পানি দিয়ে ধুলো সে। তারপর আস্তে আস্তে, ভীষণ যত্নে তুলায় সেভলন মাখিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করলো, ব্যান্ডেজ লাগালো। পুরোটা সময় মেরিন চোখ খিঁচে বন্ধ করে ছিল। জ্বলজ্বলে অনুভূতিতে পিষ্ট হয়ে খাঁমচে ধরেছিল তারফানের কোমড়ের শার্টের একপাশ। কি আশ্চর্য! তারফানের হাসি আজ থামছে না কেন? শার্টে থাকা মেয়েটার হাত ছাড়াতেও ইচ্ছে করছে না।
মেরিন হঠাৎ প্রশ্ন করলো, “আপনার মুখ লাল হয়ে আছে কেন?”
তারফান চোখ তুলে তাকালো। এতক্ষণ ফুলের তেজস্বী ঘ্রাণ অনুভূত হচ্ছিল না। মেরিন প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, মাথা ব্যথা শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে গেছে। নাক চুলকাচ্ছে। পরপর, প্রচন্ড জোড়ে হাঁচি দিলো তারফান, “ফুলে এলার্জি আমার।”
“আপনি নোংরা।”
তারফান বিহ্বল চোখে তাকালো, “কিহ্?”
মেরিন নাক মুখ কুঁচকে বললো, “হাঁচি দেওয়ার সময় মুখে হাত দিতে পারেন না?”
দৈবাৎ, গম্ভীর দেখালো তারফানকে। কোমড়ের শার্ট এখনো মেরিন খাঁমচে আছে। আলগোছে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। মেরিন ফের বললো, “আপনার তাহলে ফুলে সত্যি এলার্জি।”
“তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যুক?”
“না। আপনি সত্যের পুজারি।” কথাটা বলে কিছুপল ভাবলো মেরিন। এরপর বললো, “আচ্ছা! আমি আর ছাদে ফুল গাছ লাগাবো না। সবজি গাছ লাগাবো। এতে আপনার সমস্যা হবে নাতো?”
“ফুল গাছ লাগাতে পারবে। কিন্তু চিলেকোঠা থেকে দূরে।”
বলে সেখানে আর থাকলো না তারফান। দমবন্ধ পরিবেশে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। নিজ মনে বিড়বিড়ালো, “তুমি আস্ত একটা যন্ত্রণা, মেরিন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………