ছাদে ওঠার সময় সিঁড়িতে একটা নুপুর পেল তামজিদ। রুপালি রঙের। কি ভেবে সেকেন্ড দু-এক পরখ করে প্যান্টের পকেটে ঢুকালো তা। ছাদে তখন শেষ দুপুরের রোদ পরেছে। হালকা তেজি রোদ্দুরের তাপ। রেলিং ঘেঁষে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা ওই চারতলার নতুন ভাড়াটে না? ভ্রু কুঁচকে মেয়েটাকে আরেকটু ভালো ভাবে দেখলো তামজিদ। হ্যাঁ! ওই মেয়েটাই তো! এই দুপুর বেলা এখানে কি করছে? আবার মনে হচ্ছে কাঁদছেও। নাক টানছে, চোখ মুছছে, নিচে উঁকি দিয়ে কি যেন দেখছে বারবার। ফের একবার চোখ মুছে এবার রেলিং ঘেঁষে মেঝেতে বসে পরলো মেয়েটা। এই বিল্ডিংয়ের ছাদ বিরাট বড়। একপাশ জুড়ে কিসব বনজঙ্গলের মতো গাছ লাগানো। রঙ-বেরঙের ফুল দেখে নাক কুঁচকে ফেললো তামজিদ। কি বিশ্রী দেখতে! সেই বিশ্রী ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই মেয়েটা আরেকদফা মন খারাপ করলো যেন। কাঁপা কাঁপা হাতে চোখ মুছলো। গাছের জন্য কাঁদছে নাকি? গাছের জন্যও মানুষ কাঁদে? বিরক্তি ভাবটা চড়াও করে চোখমুখ আরও কুঁচকে ফেললো তামজিদ। এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার সামনাসামনি দাঁড়ালো। গম্ভীর কণ্ঠে গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ নেবার চেষ্টা করলো। তারপর প্রশ্ন ছুঁড়লো, “ভর দুপুরবেলা জ্বীনে ধরেছে? কাঁদছো কেন?”
মেরিন তৎক্ষনাৎ মাথা উঁচিয়ে তাকালো। দৈত্য মানব পাহাড় সমান উচ্চতা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ গাঢ়, চোয়াল দৃঢ়। আগের মতোই দাম্ভিক মুখশ্রী। ঘৃণায় মেরিন ঠোঁট কামড়ে ধরলো। শক্ত চোখে পলক ঝাপটালো একবার! দু’বার!
“আপনি আবার এখানে এসেছেন কেন?”
প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় তামজিদ বোধহয় সামান্য বিরক্ত হলো। তারওপর এই মেয়ে কিসের কথা বলছে সেটাও বুঝতে পারছে না। সে কিছু না বলে মেরিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাগে তিরতির করে মেয়েটার শরীর কাঁপছে। সে কি ভীষণ কঠোর দৃষ্টি! অথচ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মেরিন ভয় পাচ্ছে। প্রচন্ড ভয় দাবিয়ে রেখেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো তামজিদ। প্রশ্নের সুরে বললো, “আমি আবার এসেছি এখানে?”
“হ্যাঁ, আপনি—” কথা শেষ হলো না। কিছু একটা বুঝতে পেরে চট করে তামজিদের মুখের দিকে তাকালো মেরিন। এরপর চিলেকোঠার বন্ধ দরজার দিকে তাকালো। দরজায় তালা ঝুলানো নেই। ছিটকিনি ভেতর থেকে লাগানো। নজর ঘুরিয়ে তামজিদকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কি এই মাত্র সিঁড়ি দিয়ে ছাদে এসেছেন?”
তামজিদ মিথ্যা বললো, “নাহ্।”
“আপনার নাম কি?”
“হু? তারফান।”
মেরিন সরু চোখে তাকালো। তামজিদের কুটিল হাসি দেখে বুঝলো, লোকটা মিথ্যা বলছে। ভেতরকার রাগ, জেদ আবারও নোনা জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো যেন। মেরিন দিলো না। ঠায় বসে রইলো সেভাবেই। মোটেও চোখ তুলে তাকালো না তামজিদের দিকে। তারফান ওয়াহাজের মতো তার ভাইটাও খারাপ। খুব! খুব! খুব খারাপ! দুই ভাই মিলে মেরিনকে হেনেস্তা করার কোনো উপায় বাদ রাখছে না। কেন? সে কি করেছে ওদের? তার পিছু ছাড়ছে না কেন?
তামজিদ চিলেকোঠায় চলে যেতে নিচ্ছিল। এই মেয়েকে দেখলে তার কেন যেন বিরক্ত লাগে। দু'কদম এগিয়ে কি ভেবে দাঁড়িয়ে গেল আবার। পকেট হাতড়ে নুপুর বের করলো। সরাসরি তাকালো মেরিনের গুটিসুটি মেরে থাকা ফর্সা পা দু'টোর দিকে। বাম পায়ে একটা চিকন রুপার নুপুর আঁটসাঁট হয়ে আছে। অন্য পা খালি। অবশ্য খালি থাকারই কথা। নুপুরটা তো তামজিদের হাতে।
—————
রাতে ঘুমাতে গিয়ে মেরিনের খেয়াল হলো, তার এক পায়ে নুপুর নেই। চকচকে রুপার নুপুরটা হারিয়ে গেছে। বাবার দেওয়া উপহার হারিয়ে গেছে! কোথায় হারালো? নার্সারি থেকে আসার পথে মেরিন ঠিকঠিক দুটো নুপুরই পায়ে দেখেছিল। তবে কি ছাদে কোথাও পরে গেছে? নজর তুলে একবার ঘড়ির দিকে তাকালো মেরিন। একটা বেজে সাতাশ মিনিট। বাসার সবাই ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু মেরিনের চোখে ঘুম এলো না। ওড়না গায়ে জড়িয়ে সে বিড়াল পায়ে বেড়িয়ে এলো বাসা থেকে। মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বালালো। বলা তো যায় না, যদি সিঁড়িতেই নুপুর পেয়ে যায়?
সিঁড়িতে নুপুর পাওয়া গেল না। প্রতিটা সিঁড়িই মেরিন খুব সূক্ষ্ণটার সঙ্গে পরখ করে করে এসেছে। অথচ ফলাফল শূণ্য, ফাঁকা। ছাদে এসেও এদিক ওদিক কিছুক্ষণ নুপুর খোঁজার চেষ্টা চালালো মেরিন। তার শখের গাছগুলোর রফাদফা অবস্থা দেখে মন খারাপ করলো ক্ষীণ। একটা ফুলও গাছে নেই! তবে কি সে আর ছাদে গাছ লাগাতে পারবে না? তারফানের সঙ্গে জেদ করে হলেও মেরিন অবশ্যই গাছ লাগাতো। কিন্তু আজকে দুপুরে যা হলো— বোধ করি সেটার রেশ ধরেই তারফানকে একটু একটু ভয় পেতে শুরু করেছে মেরিন। তখন তো শুধু ছাদ থেকে টব ফেলেছিল। যে তারছেঁড়া! পরে যদি মেরিনে মাথায় টব ছুঁড়ে মারে? অথবা মেরিনকেই যদি ছাদ থেকে ফেলে দেয়?
দৈবাৎ! একটা দমকা হাওয়ায় মেরিনের গা শিরশির করে উঠলো। মনে হলো, এই মাত্র একটা বাঁদুর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। পেছন থেকে কে যেন দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে, ধুপধাপ! ধুপধাপ! মেরিন শক্ত হয়ে জমে গেল। শরীর নাড়াতে পারলো না। নিশ্বাস নিতে পারলো না। কেবল ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো মোবাইল হাতে। অনুভূত হলো, কাঁধে কারো গরম নিশ্বাস আছড়ে পরছে। কারো বুক তার পিঠে ঠেকবে ঠেকবে ভাব। তাকে আরেকটু আতঙ্কে ফেলতে সেই অজ্ঞাত জিনিসটা এবার গমগমে গলায় একেকবারে মেরিনের কানের কাছে এসে বললো, “এখানে কি?”
ভীতু মেরিন চিৎকার দিয়ে উঠলো। সরে যেতে নিলেই বেইমানি করে বসলো তার নিজ পা। নড়বড়ে হয়ে ঠাস করে পরে গেল সিমেন্টের মেঝেতে। ব্যথায় মেরিন চোখ-মুখ খিঁচে ফেললো। হাঁটুর দিকটা জ্বলছে। ছিলে গেছে বোধহয়। ডান পায়ের গোড়ালিতে বিষ ব্যথা। মচকে গেছে নাকি? উহ্! নাড়ানো যাচ্ছে না। চোখে টলমলে পানি নিয়ে সামনে তাকালো মেরিন। কোনো ভূত-প্রেত নয়, বরং তারচে’ পাষাণ্ড মানব তারফান ওয়াহাজ দাঁড়িয়ে আছে। আসলেই কি তারফান? না তামজিদ? রোধ হওয়া কণ্ঠে মেরিন জিজ্ঞেস করলো, “কে আপনি?”
তারফান উত্তর দিলো না। মেরিন ফের জিজ্ঞেস করলো, “উত্তর দিচ্ছেন না কেন? আপনি তামজিদ না তারফান?”
“তারফান।” গম্ভীর কণ্ঠ। দুপুরের মতো কুটিল হাসির ছিঁটেফোঁটা নেই। স্থির, কঠোর একটা মুখ! সেই মুখ কখনো মিথ্যা বলে না।
ব্যথায় মেরিনের চোখে পানি টলমল করছে। এই এক্ষুণি গড়াবে বলে! তারওপর বেত্তমিজ লোক তাকে পরে যেতে দেখেও ধরেনি। কি খারাপ! দয়া-মায়াহীন! রাগে মেরিন নিচু গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, “আপনি সবসময় ভূতের মতো আমাকে ভয় পাওয়ান কেন? আপনার কোন কাজে বাগড়া দিয়েছি আমি?”
তারফান সে কথার উত্তর দিলো না। মেরিন অসহায় ভঙ্গিতে নিচে পরে আছে। হাতের মোবাইল, ওইতো! রেলিংয়ের ওদিকে। ওড়না সরে গেছে, মাথার খোপা খুলে গেছে, পরনের ঢোলাঢালা সেলোয়ার বেশ খানিকটা উপরে উঠানো। অথচ এসবের কিছুই তারফান দেখলো না। তার স্থির দৃষ্টি মেরিনের অশ্রুসিক্ত চোখে। স্নিগ্ধ এক জোড়া ব্যথাতুর চোখ! কিন্তু সেই ব্যথা বোধহয় তারফানকে ছুঁতে পারলো না। সে তার মতো করেই প্রশ্ন করলো, “এত রাতে ছাদে কি? গাছ লাগাতে দেব না তোমাকে, বলেছি না?”
“কেন? গাছে কি সমস্যা? আপনি এত গাছ বিদ্বেষী কেন? গাছ ছাড়া শ্বাস নেওয়া যায় না, জানেন না?"
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্যথা ভুলে প্রতিবাদী হয়ে উঠলো মেরিন। তারফান পরোয়া করলো না। জবাব দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও না। চোয়াল শক্ত করে বললো, “যখন-তখন ছাদে আসবে না। আমার পছন্দ না।”
“ছাদ কি আপনার একার? আপনি যেমন ভাড়া দিয়ে থাকেন আমিও থাকি। সবার ইকুয়েল অধিকার আছে ছাদে।”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মেরিন একটু করে ওঠার চেষ্টা করলো। নাহ্! হচ্ছে না। উঠতে নিলেই গোড়ালির জয়েন্ট বৈদ্যুতিক ঝটকা দিচ্ছে। সে কি বিভৎস টনটনে ব্যথা!
অসহায় মেরিনের ব্যর্থ চেষ্টা তারফান কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলো। একবার হাত বাড়িয়ে মেরিনকে সাহায্য করলো না পর্যন্ত! চলে যেতে নিলেই তাড়াতাড়ি করে বলে উঠলো মেরিন, “আপনি কি ছাদে কোনো নুপুর পেয়েছেন? রুপার?”
তারফান দাঁড়িয়ে গেল। দু'পকেটে দু’হাত রেখে তাকালো মেরিনে দিকে। মেরিনের জ্বলজ্বলে পায়ের কাছটায়। ডান পা ফুলে লাল হয়ে আছে। অন্য পায়ে আড়াল থেকে অল্পসল্প উঁকিঝুঁকি মারছে চিকন কারুকাজের একটা নুপুর। তারফান ভ্রু কুঁচকালো, “তুমি এই রাতের বেলা নুপুর খুঁজতে এসেছো?”
মেরিন দ্রুত মাথা দুলালো, “হ্যাঁ! আপনি দেখেছেন?”
“নাহ্।”
মুখে না বলেও তারফান সেখান থেকে নড়লো না, কোথাও গেল না। আচমকা এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো মেরিনের সামনে। মেরিন ভয় পেল, পাওয়ারই কথা। তারফানকে তার স্বাভাবিক মনে হয় না। কেমন যেন নিজের দুনিয়াতে থাকে। তারমধ্যে এই লোক মেরিনের দিকে তাকায় জ্বলন্ত চোখে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে ফেলবে। এমন লোককে বুঝি ভয় না পেয়ে থাকা যায়? এই রাত্রিবেলা তাকে মেরে গুম করে ফেললেও তো কেউ জানবে না।
বিতৃষ্ণাময় ঢোক গিলে মেরিন কণ্ঠস্বর কঠোর করতে চাইলো, “কাছে এসেছেন কেন আপনি? আমি কিন্তু চিৎকার করবো!”
“একটু আগে করেছিলে না? কেউ এসেছে?”
মেরিন আবারও শুকনো ঢোক গিললো। তারফান তার চোখ বরাবর চেয়ে আছে। কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ চোখ। অথচ কঠিন। ভেতরকার গভীরতা পরোখ করা সম্ভব নয়। মেরিন জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিলো। কাঁপা গলায় কিছু বলতে নেবে তার আগেই ভীষণ সূক্ষ্ণ যন্ত্রণায় শরীর শিরশির করে উঠলো তার। প্রচন্ড আর্তনাদে চেঁচিয়ে উঠলো, “আধপাগল লোক! পা ধরে টানছেন কেন? পায়ে ব্যথা না?"
বলতে বলতে মেরিন অনুভব করলো, তার পায়ে আর ব্যথা নেই। গোমড়ামুখো তারফান ওয়াহাজ খুব অবলীলায় তার পায়ে নুপুর পরিয়ে দিচ্ছে। তার হারিয়ে যাওয়া নুপুর! তারফান কোত্থেকে পেল? বিস্ময়ে হতবাক মেরিন পরপর প্রশ্ন ছুঁড়লো, “আপনি এই নুপুর কোথায় পেলেন? আর আমি আমার পায়ে ব্যথা পাচ্ছি না কেন? কি করেছেন আপনি?”
নুপুর পরানো শেষে তারফান একটু নেড়েচেড়ে দেখলো মেরিনের আ’হত পা। কপাল কুঁচকে, ভীষণ বিচ্ছিরি আন্তরিকতা নিয়ে শুধালো, “পায়ে ব্যথা হচ্ছে আর?”
মেরিন মাথা নাড়ালো। হচ্ছে না। মুখে বললো, “বলছেন না কেন? নুপুর কোথায় পেয়েছেন? আর আমার পা ঠিক করলেন কিভাবে? আপনি কি ডাক্তার?”
“হ্যাঁ।”
“জি? কি হ্যাঁ?”
তারফান উঠে দাঁড়ালো। মৃদুমন্দ বাতাসে মেরিনের উড়োউড়ো চুলগুলোর দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো একবার। উত্তরে খুব সামান্য করে বললো, “আমাকে লোকে ডক্টর তারফান ওয়াহাজ নামে ডাকে, মেরিন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………