---"ছাদটাকে একার সম্পত্তি পেয়েছেন? আমার গাছের ফুল ছিঁড়ে নষ্ট করছেন কেন?"
লোকটা একপলক তাকালো। হাতের বিশাল থাবায় বাকি দু'টো ফুলও ছিঁড়ে ফেলল। এক লহমায় মেরিনের সামনে এসে বললো, "আমি ছিঁড়িনি।"
পুরুষালী কণ্ঠস্বর। উচ্চতায় এত লম্বা যে মেরিনের রীতিমতো মাথা উঁচিয়ে লোকটার মুখ দেখতে হচ্ছে। তার নিজেকে এত ছোট ছোট মনে হলো! মানুষ তো নয় যেন আস্ত দৈত্য! কণ্ঠস্বরের তেজস্ক্রিয়তা নিমিষেই মিইয়ে গেল। অল্পসল্প তেজ নিয়ে হালকা গলায় মেরিন শুধালো, "আপনি ফুল ছিঁড়ে মিথ্যে বলছেন কেন?"
“তোমার কাছে মিথ্যা বলার কোনো প্রমাণ আছে?”
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল মেরিন। আচ্ছা বেত্তমিজ লোক তো! চোখের সামনে ফুল ছিঁড়ে বলছে, প্রমাণ আছে?
চোখমুখ কুঁচকে ফেলল মেরিন। লোকটাকে সে চেনে। পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠায় থাকে সে। তার সম্ভবত দুটো জমজ ভাইও আছে। থ্রিপলেটস্ বলতে যা বোঝায় আরকি। প্রায় একই দেখতে। মেরিন শুনেছে, বাকি ভাইদের চেয়ে এই লোক ফাজিল বেশি। তার পরিবার পাঁচতলার বিশাল ফ্ল্যাট নিয়ে থাকলেও এই লোক আলাদা ভাড়া নিয়ে চিলেকোঠায় থাকে।
মেরিন যথাসম্ভব কঠিন গলায় বলতে চাইলো, “দেখুন! আপনি কিন্তু…” কথা সম্পূর্ণ হলো না। লোকটা তার ভারিক্কি গলায় ফের বললো, “তারফান ওয়াহাজ।”
“জি?”
“আমার নাম।”
পিটপিট নজরে তাকাল মেরিন। লোকটা ঝুঁকে আছে। আকাশে তেছড়াভাবে সূর্য উঠেছে। সেই সূর্যের আলো তারফানের দৈত্য শরীর পেরিয়ে তাকে ছুঁতে পারছে না। মেরিনের হঠাৎ লজ্জা লাগতে শুরু করলো। কি সমস্যা এই লোকের? এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? সে হালকা কণ্ঠে বললো, “আপ–আপনার নাম জেনে আমি কি করবো?”
তারফান জবাব দিলো না। এ মেয়েটাকে কোথায় যেন দেখেছে সে! কিন্তু ঠিক কোথায়, সেটা মনে পরছে না। ভ্রু নাঁচিয়ে অচিরেই জিজ্ঞেস করলো, “এই গাছ তোমার?”
এ লোক কি গাধা? মেরিন বিরক্তমুখে বললো, ‘'অবশ্যই!”
“এখানে আর গাছ লাগাবে না।”
“আপনার কথায়?”
তারফানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বদলে শান্ত হলো। আরও খানিকটা ঝুঁকে কেমন করে যেন বললো, “হ্যাঁ, আমার কথায়।”
তারফান ওয়াহাজ লোকটা এরপর তার চিলেকোঠার ঘরে চলে গেল। ধাম শব্দে দরজা লাগাতেই চমকে উঠলো মেরিন। কোথাকার রাজা এ? এত্ত অহংকার কেন? এ বাড়িতে মেরিনরা মূলত ভাড়াই নিয়েছিল ছাদ দেখে। মেরিনের গাছগাছালির খুব সখ। আগের বাসায় ছাদ ব্যবহার করার স্বাধীনতা ছিল বলে অনেক অনেক ফুল গাছ, সবজি গাছ লাগিয়েছিল। তাই বেছে বেছে গাছ রাখতে পারবে এমন বিল্ডিংয়েই বাবাকে দিয়ে ভাড়া নিয়েছে। সেখানে এই উজবুকটা বিনা হাকডাকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো কেন? তারওপর তার এত সাধের ফুলগুলো ছিঁড়েটিড়ে কিচ্ছু রাখেনি! মেরিন ছোটবেলা থেকে নরম মনের। শান্ত, ভদ্র। তবে যা তার, তা যত্নে আগলে রাখতে জানে। সেখানে গাছের ফুলগুলোর এ অবস্থা দেখে বড্ড কান্নাই পেল তার। সিক্ত চোখে তাকালো একবার চিলেকোঠার বন্ধ দরজার দিকে। গাছ লাগাতে মানা করেছে না? মেরিন এবার থেকে আরও বেশি বেশি গাছ লাগাবে। অনেক! অনেক! অনেকগুলো গাছ!
সময়টা সকাল সাড়ে এগারোটা বোধহয়। ছাদের দুর্বিষহ ঘটনার পর মেরিন অনেকটা মন খারাপ নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। পাঁচতলায় এসে তারফান ওয়াহাজের ন্যায় আরও দুটো মানুষ দেখতেই থমকালো খুব। পিটপিট নজরে তাকালো। দুটো একই রকম দেখতে মানুষ! উহু! তিনটে! কি আজব!
তাদের দু'জনের পরনেই আকাশী রঙের শার্ট। মেরিন আরেকটু খেয়াল করতেই বুঝলো ছেলেদুটোকে আসলে আলাদা করা সম্ভব। একজনের মাথার চুল তারফানের মতো লালচে কালো। আরেকজনেরটা আশ্চর্য ভাবে কুঁচকুঁচে কালো। কালো মাথার চুলের ছেলেটা মেরিনকে দেখতে পেয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললো, “হ্যালো।”
মেরিন থতমত গলায় বললো, “হ্যালো, ভাইয়া।”
“তুমি মনে হয় নিচের তলায় থাকো, তাই না? তোমাকে দেখেছি মনে হচ্ছে! নতুন এসেছো?”
মেরিন মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো, “জি।”
“আমাদের দিকে তখন ওভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলে কেন? জীবনে দুটো ছেলে একসাথে দেখনি?” কথাটা কালো চুলের ছেলেটা বলেনি। বলেছে লালচে কালো চুলের ছেলেটা। মেরিন বিমূঢ় হয়ে দেখলো চুলের পাশাপাশি তারফানের সাথে এ ছেলের কণ্ঠস্বরও হুবহু এক! গম্ভীর, ভারি। আরেকটা মিলও আছে অবশ্য। দু'জনেই আচরণের দিক থেকে বিশ্রী রকম ম্যানারলেস! বেয়াদব দুটো!
মেরিন লজ্জায় কিছু বলতে পারছিল না। ইতিউতি করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল বারবার। কালো চুলের ছেলেটা গুঁতো দিয়ে চুপ করালো লালচে চুলের ছেলেটাকে। ইতস্তত হেসে বললো, “ওর কথায় কিছু মনে করো না তুমি। ও একটু পাগল ধরণের। তোমার নাম কি বলো? আমার নাম তালহা। ও আমার তিন মিনিটের বড় ভাই তামজিদ। আমাদের আরেকটা পাঁচ মিনিটের বড় ভাই আছে, তারফান।”
মেরিন জানে। একটু আগেই জেনে-দেখে এসেছে। ছোট্ট গলায় মেরিন নিজের নাম বললো, “আমি মেরিন খন্দকার।”
—————
বাসায় এসে সোফায় গা এলাতে না এলাতেই মা এসে বসলেন পাশে। টিভি চালু করলেন। রাতে তার ফেভারিট স্টার জলসা সিরিয়াল “তোমাকে আমি খুঁজে বের করবোই” দেখতে পারেননি। এখন সেটা রিপিট টেলিকাস্ট দিচ্ছে। টিভির পর্দায় গভীর মনোযোগ রেখে তিনি মেরিনকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছে পানি দিয়ে এলি?”
মেরিন ছোট্ট গলায় বললো, “হু।”
“বুঝি না বাপু! এই গরমে তোর এত গাছ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে হবে কেন? এসব বুড়ি মানুষের সখ।”
“বলেছে তোমাকে! সখের কোনো বয়স হয়না।”
টিভি থেকে নজর সরিয়ে মেরিনের দিকে তাকালেন টিউলিপ আক্তার। সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে? রেগে আছিস কেন?”
মেরিন মুখ গোমড়া করে রাখলো। কিছু বললো না। টিউলিপ বেগম আবার বললেন, “পাঁচতলার ভাবি আছে না? যার তিনটা জমজ ছেলে? তুই যখন ছাদে গেলি তখন ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। দুটো ফ্ল্যাট মিলিয়ে একটাতে থাকে। কি বড় আর সুন্দর বাসা! কিন্তু অদ্ভুত।”
মেরিন সোজা হয়ে বসলো। এমনিতে এসবে তার আগ্রহ কম। কিন্তু ব্যাপারটা তারফানের সাথে যুক্ত বলেই হয়তো কৌতূহল দমাতে পারলো না। প্রশ্ন ছুঁড়লো, “অদ্ভুত বলতে?”
“ডাইনিংয়ে ফ্যামিলি পিকচার টাঙানো ছিল। কিন্তু বাপের ছবি নাই। আমি কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম ওদের বাপ কি করে, কোথায়। কথা কাটিয়ে গেছে। উত্তর দেয়নি।”
“হবে হয়তো কোনো সমস্যা।”
টিউলিপ আক্তার সম্মতি জানিয়ে ফের টিভির পর্দায় মনোযোগী হলেন। মেরিন সেখানে আর বসলো না। রুমে গিয়ে বায়ান্দার চকচকে সাদা মেঝেতে বসলো। গ্রিল দিয়ে আটকানো বারান্দার নিচে উঁকি দিলেই বিশাল উঠান দেখা যায়। সেখানে কিছু ছেলে ক্রিকেট খেলছে। তারমধ্যে তারফান, তালহা আর তামজিদকেও দেখতে পেল মেরিন। আরও একজনকে অবশ্য চোখে পরলো তার। ইখতিয়ার আদিল। এ বিল্ডিংয়ের মালিকের ছেলে। তারফান ওয়াহাজ থেকে এ লোক কম চরিত্রবান না। প্রথম দেখাতেই ভ্রুঁ কুঁচকে শুধিয়েছিল, “এই! তুমি পাড়ায় পাড়ায় প্রেম করে বেড়ানো মেয়েটা না?”
দৈবাৎ! ক্রিকেট খেলার মাঝেই ইখতিয়ার তাকালো মেরিনের দিকে। তাকিয়ে হাসলো একটু। দাঁত বের করা হাসি। ইশারায় বোঝালো, “কেমন আছো?”
মেরিন দেখলো, এই লোকের দেখাদেখি এখন তারফানও তাকিয়েছে ওর দিকে। বরাবরই গম্ভীর নজর তুলে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………