তামজিদের ডান বাহুতে একটা ক্ষ’ত দাগ আছে। বেশি গভীর না আবার কম গভীরও বলা যাচ্ছে না। চোটটা সে পেয়েছিল তিন-চার মাস আগে। সৌম্য নামক এক ছেলেকে উত্তর-মাধ্যম দেবার সময়। ছেলেটা নেহায়েত কম শক্তিশালী নয়। ধরতে যাওয়ার সময় হাতের ছুঁড়ি দিয়ে এমন আঘা'ত করলো! বাহুর ক্ষ'ত দাগে বুড়ো আঙুলে চুলকালো তামজিদ। এ ফ্ল্যাটের সবচে’ বড় ঘরটা তার। তালহা ব্যতীত অন্য কারো এখানে ঢোকার অনুমতি নেই। সেই তালিকায় রজনী হায়দারও আছেন।
ঘরের দেওয়াল সাদা-ধূসর রঙের। দেওয়ালে হিজিবিজি কিছু খবরের কাগজ, কিছু অজ্ঞাত মানুষের চকচকে ছবি কিংবা অসংখ্য এবড়োখেবড়ো লেখার স্টিকিনোট লাগানো। তিনটে ল্যাপটপ টেবিলে অযত্নে পরে আছে। বিছানায় দুটো মুঠোফোন। চাদর এলোমেলো। এলোমেলো চাদরটাকে আরেকটু এলোমেলো দেখাতে হরেক রঙের টি-শার্ট, গেঞ্জি এবং শার্টের স্তুপ অনায়াসে চোখে পরে। ডান পাশের দেওয়ালের চলটা উঠানো। বিচ্ছিরি লাগে দেখতে। দু'দিন আগে কফি খেয়েছিল। মগটা এখনো ছোট্ট টি-টেবিলের ওপর উল্টে পরে আছে। তামজিদ প্রথমে মগটা নিয়ে রান্নাঘরে রেখে এলো। এরপর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিস সরিয়ে একপাশে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। গুগলে সার্চ করলো, “নক্ষত্র তালুকদার।”
নিমিষেই ল্যাপটপের পর্দা অসংখ্য নিউজে ভরে গেল। বাংলাদেশের বিজনেসখ্যাত সম্মানিত একজন মানুষ! পাশাপাশি তার সমগ্র নাড়িনক্ষত্র রাজনীতিতে মোড়ানো। বাড়ির মধ্যমণি। দেশের জন্য আপাতত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আপন ছোট ভাই হিসেবেই মানুষ চেনে। তার মেয়ে তুবা তালুকদার। আধুনিক, শিক্ষিত একটা মেয়ে। টুকটাক বিজ্ঞাপনেও কাজ করে। কাল রাত্রি ন’টায় কোনো এক ছেলের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে খেতে দেখা গেছে তাকে। ভাগ্য ভালো তামজিদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যেকটা নিউজে তুবা তালুকদারের হাভাতের ন্যায় চাইনিজ খাওয়ার ছোট্ট ভিডিও যুক্ত করে নিউজের হ্যাডলাইন দেওয়া হয়েছে, “রাত-বিরেতে সম্মানিত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাতিজি তুবা তালুকদারকে একটা অচেনা-অজ্ঞাত ছেলের সঙ্গে দেখা গেছে। রেস্টুরেন্টে বসে তিনি সেই ছেলের সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন।”
স্ক্রীনের লেখা পড়ে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো তামজিদ। কপালে বুড়ো আঙুল ঘঁষলো। প্রচন্ড বিশ্রী এক গালি দিয়ে বললো, “নাহ্, রেস্টুরেন্টে খাইতে না গিয়া তোর পু--মা'রবো শা'লা!”
দৈবাৎ! দরজায় খটখট আওয়াজ হলো। তালহা এসেছে। একহাত ক্রাচের ওপর ভর দেওয়া আর অন্যহাতে তার প্রাণপ্রিয় কাথা, কোলবালিশ, মাথার বালিশ! বুকের সঙ্গে সেগুলো জোড়ালো ভাবে এঁটে তালহা বিরাট হামি দিয়ে বললো, “চল, তারফানের কাছে যাই। আজকে ওখানে ঘুমাবো।”
একপলক তালহার দিকে তাকিয়ে ল্যাপটপের কাজটা শেষ করলো তামজিদ। উদোম শরীর। বাহুর ক্ষ'ততে ফের একবার চুলকে বিছানা থেকে টি-শার্ট নিলো, পরলো। মুঠোফোন নিতে গিয়ে খেয়াল হলো, আরও বিশ মিনিট আগে তুবা তালুকদার থেকে মেসেজ এসেছিল। আলোচিত নিউজের জন্য সে ক্ষমা চাইছে, তামজিদকে স্যরি বলে একাকার করে ফেলছে। তামজিদ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মেয়েটা তাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলেনিতো? ঠোঁটের কুটিল হাসির ঘনত্ব বাড়িয়ে সে তুবার শেষ মেসেজের রিপ্লাই দিলো, “চিন্তা কোরো না জান। আমি আছি না? সব ঠিক করে দেব।”
অত:পর ট্রাউজারের পকেটে মোবাইল পুরে তালহাকে বললো, “চল, যাই।”
—————
সন্ধ্যাক্ষণ। সূর্য ডুবে গেছে। কাকের শেষ ডাক শোনা যাচ্ছে সেই সুদূর থেকে। ইখতিয়ার আদিল সবে ঘুম থেকে উঠেছে। ঘুমুঘুমু মুখশ্রী, টালমাটাল পায়ে হেলেদুলে এসে বসলো খাবার টেবিলের সামনে। কুশিকাঁটার একটা শুভ্র টেবিলক্লথে ফলমূল, কাঁচের জগ আর গ্লাস ছাড়া কিচ্ছু নেই… নাস্তা নেই! বাম হাতে চোখ ডলতে ডালতে ইখতিয়ার গলা উঁচিয়ে ডাকলো, “আম্মা… ও আম্মা… খানাদানা কিছু দিবা না? ক্ষিধা লাগতে তো!”
টেবিলের ওপর প্রান্তে সায়নউল্লাহ্ বসে ছিলেন। পত্রিকায় চোখ বুলানোর মাঝে ছেলের উচ্চকণ্ঠ তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটালো। চশমা গলিয়ে ছেলের দিকে দৃষ্টি তাক করলেন তিনি। মনে মনে একটা কথাই আওড়ালেন, “বেকার, চালচলনহীন, অপদার্থ!” কোন পাপের জন্য যে এমন ছেলে তার কপালে জুটেছে— তা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। বেদনার চূড়ান্ত পর্যায়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আফসোস করলেন। পরমুহুর্তে ভীষণ গম্ভীর গলায় বললেন, “এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।”
ইখতিয়ারের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, “ভদ্রলোকের বাড়ির ভবিষ্যৎ মালিক কে আব্বা? আমি! ভবিষ্যৎ ভদ্রলোক এভাবেই চিল্লায়।”
মুঠোয় থাকা খবরের কাগজ সায়নউল্লাহ্ মুচড়ে ফেললেন। ভস্ম করা চোখে চেয়ে বললেন, “তোমাকে আমি কানাকড়িও দেব না। স্বপ্ন দেখতে থাকো!”
“তুমি না দেওয়ার কে? তোমার কি আর কোনো ছেলেপেলে আছে?”
“চুপ থাকো বেয়াদব ছেলে! আমার ছেলেপেলে আছে নাকি নেই, তা জিজ্ঞেস করার তুমি কে? দরকার হলে আমি আমার সব সম্পত্তি দান করে দেব। কিন্তু তোমার মতো কুলাঙ্গারকে জীবনেও না। প্রশ্নই ওঠে না!”
দু'পা মুড়িয়ে চেয়ারে আয়েশ করে বসলো ইখতিয়ার। কনিষ্ঠ আঙুলের সাহায্যে কান চুলকালো একবার, দু'বার! মাছি তাড়ানোর ন্যায় বললো, “দেখ আব্বা, দেশে দু'একটা কুলাঙ্গার থাকা লাগে। ওইযে, রবীন্দ্রনাথের সুভা গল্প পড়োনি? ওখানে ছন্নছাড়া, বেকার প্রমথ দেশের জন্য, দশের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় তা পড়েছ? আমি হচ্ছি প্রতাপ। দেশের, দশের বিপদে আমাকে সবসময় পাওয়া যায়। আমার কোনো ব্যস্ততা নেই।”
রাগের উচ্চতা রিখটার স্কেলের মাত্রা ছাড়ালো যেন! ফর্সা মুখশ্রী ক্রোধের দাবানলে রক্তিম রঙ ধারণ করেছে। পরনে চশমা খুলে ইখতিয়ারের দিকে ছুঁড়ে মা'রলেন সায়নউল্লাহ্। চশমাটা ইখতিয়ারের কপাল ছুঁতে গিয়েও ছুঁলো না। ইখতিয়ার আদিল সেটা ধরে ফেলেছে। মুখে বাঁকা হাসি ফুঁটিয়ে বললো, “ক্রিকেট খেলি। এই সামান্য চশমা ধরতে পারবো না ভেবেছো?”
দাঁতে দাঁত চেপে সায়নউল্লাহ্ তাকিয়ে রইলেন। ইতোমধ্যের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। ভয়ং'কর দৃষ্টি, চোখের চাহনি। তবে ছেলের সঙ্গে এবার আর তর্কে গেলেন না তিনি। রান্নাঘরে কাজ করারত স্ত্রীকে বললেন, “তোমার ছেলে যদি আজ এ ঘরে খাবার পায়— আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না সাজেদা।”
ইখতিয়ার আদিলের স্বর্ণাভ কপালে বাস্তবিকই খাবার আর জুটলো না। তার মা-টা হয়েছে আরেক স্বামীভক্ত। স্বামী যা বলবে তা। অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। এই পালন করার পেছনে তার নিষ্পাপ ছেলেটা যে অভুক্ত রয়েছে সে খেয়াল নেই। হুশহ্!
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পেটে বারকয়েক হাত বুলালো ইখতিয়ার। দুপুরে খাবার খাওয়া হয়নি। পেটে ইঁদুর ডাকছে। পকেট হাতড়ে দেখলো, এক'শ টাকার মতো আছে। অনায়াসে পেটপুরে খাওয়া যাবে।
বিল্ডিংয়ের মুখ্য গেট পেরিয়ে তখন মেরিন ভেতরে ঢুকছে। মলিন চোখ, ক্লান্ত মুখশ্রী। ঘেমে-নেয়ে একাকার। ইখতিয়ার তাকে দেখে ডাকলো, “অ্যাই মেরিন!”
মেরিন দাঁড়ালো। হাসোজ্জল চেহারার ইখতিয়ারকে দেখলো রয়েসয়ে। তালহার মতো এই লোকটা সবসময় হাসিখুশি থাকে।
ইখতিয়ার হাসি হাসি মুখ নিয়েই শুধালো, “প্রেম করে এলে?”
ওমনি! মেরিনের মেজাজ বিগড়ে গেল। ইচ্ছে করলো, পাশের বেঞ্চ উঠিয়ে ইখতিয়ারের মাথায় মা'রতে। কিন্তু আফসোস, সম্ভব না। অত ভারি একটা জিনিস সে উঠাতে পারবে না। তারওপর শরীর ক্লান্ত হয়ে আছে। ডাক্তারের কাছে টেস্ট করাতে গিয়ে রক্ত-টক্ত দিয়ে এসেছে। শক্তি-বল তাই নেই বললেই চলে। ক্লান্ত গলায় মেরিন বললো, “আপনাকে একটা কথা বলছি ভাইয়া, মাইন্ডে নিবেন না। এইযে, আপনি কিছুদিন আগেই বোধহয় চুল-দাঁড়ি কাটলেন। আবার বড় হয়ে গেছে। জংলী দেখাচ্ছে। আমি বাহিরে থেকে এসেছি, অথচ ঘামের বিশ্রী গন্ধ আপনার শরীর থেকে বের হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি এইসব কারণে আপনার সাথে কোনো মেয়ে প্রেম করতে চায় না। বুড়ো বয়সে প্রেম করতে না পেরে স্ট্রেসে আছেন। মাথায় গন্ডগোল হয়েছে৷ তাই সবাইকে দেখলে আপনার প্রেম বিষয়ক প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। আপনি এক কাজ করুন, আন্টিকে বলুন আপনাকে বিয়ে দিয়ে দিতে। বউদের অলৌকিক শক্তি থাকে। আপনাকে ঠিক করে দেবে।”
সূক্ষ্ণ অপমান! উহু! স্পষ্ট, রগরগে অপমান। অথচ তবুও যেন সেটা বিচিত্র ইখতিয়ারের গায়ে লাগলো না। সে তখনো হাসছে। প্রশ্ন করছে, “আমার জংলীপনা ঠিক করে দেবে?”
মেরিন প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে উত্তর দিলো, “হ্যাঁ।”
ইখতিয়ারেত মুখের ভাবচিত্র বদলালো এবার। তীক্ষ্ণ মন খারাপের রেশ পুন:পুন: করে ভিড়লো। উদাস কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “তাতে লাভ কি মেরিন? জংলি থেকে সভ্য হলে মেয়েরা আমাকে পছন্দ করবে.. ঠিক আছে। কিন্তু তখন তো আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি ওদের সাথে প্রেম করবো কিভাবে?”
কঠিন প্রশ্ন! সেই কঠিন প্রশ্নের কূলকিনারা হন্যে হয়ে খুঁজলো ইখতিয়ার। কি যেন খুঁজে পেলোও। গলা পরিষ্কার করে, ভীষণ গাম্ভীর্যের সঙ্গে থমথমে গলায় বললো, “পরকীয়া টু মাচ হয়ে যাচ্ছে মেরিন। অন্য আইডিয়া দাও।”
মেরিন আইডিয়া দেবার সময় পেল না। তারফান মাত্রই হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। সামনে ক্রিকেট ম্যাচ। আগের ম্যাচটা দক্ষ প্লেয়ারদের অভাবে ইখতিয়ার জিততে পারেনি। দশ হাজার টাকা জলে গেছে। এবারের খেলা বিশ হাজারের। কিছুতেই তারফান, তামজিদকে না নিলে চলবে না। তারফানের দিকে এগোতে এগোতে ইখতিয়ার বললো, “তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে পরে কথা বলবো মেরিন। সামনের হোটেলে সেই সিঙ্গারা বানায়। সিঙ্গারা খেতে খেতে আলোচনা করব, কেমন?”
কিসের আলোচনা? পরোকিয়ার? মনে মনে মুখ ভেঙ্গিয়ে ওদের দিকে একপলক তাকালো মেরিন। গম্ভীর মুখে ওরা কি যেন বলছে। সে আর দাঁড়ালো না। আধো আলো, আধো অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে খেয়াল হলো, পেছন থেকে পায়ের শব্দ আসছে। কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। মেরিন পায়ের গতি বাড়ালো। অথচ লাভের লাভ কিছু হলো না। দ্বিতীয় তলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে খুব কাছ ঘেঁষে কেউ তাকে ডিঙিয়ে চলে গেল। মেরিন থমকালো, ভড়কালো। শক্ত হয়ে জমে গেল একদম। হাতের কাছটা জ্বলছে। এই মাত্র খুব জোড়ে তাকে চিমটি কাটা হয়েছে। অশ্রুজলে চোখ টলমল করলো মেরিনের। নাকে এখনো দারচিনি কাঠের সুবাস লেগে আছে। তারফান কাছে থাকলে এই সুবাসটা সে সবসময় পায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………