পৌষের কুয়াশার চাদর চিরে সোনালি রোদে যখন মাহিরের ঘুম ভাঙল, তখন বাইরের রোদের তেজ বাড়ন্ত বেলার ইঙ্গিত দেয়। চোখ কচলে তাকাতেই সে এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে ঘরে একা নেই, যার থাকার তিনিও নেই বরং একদল কৌতূহলী মানুষের মাঝখানে সে যেন এক প্রদর্শনীর বস্তু।
খাটের একপাশে তিন-চারজন বাচ্চা হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, আর দরজার ওপাশে ঘোমটা টেনে মহিলারা নিচু স্বরে ফিসফাস করছেন।
খাটের কিনারায় বসে আছে এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধা। লাঠিতে ভর দিয়ে মাহিরের দিকে মুখটা এগিয়ে নিয়ে ফোকলা দাঁতে এক চিলতে রহস্যময় হাসি দিলেন তিনি। তারপর খুব নির্লজ্জভাবে বলে উঠলেন,
ওরে জামাই! আর কয় বেলা ঘুমাবা? খাবার তো জুড়ান হইয়া যাইতেছে। মুখখানা তো দেখি শুকাইয়া আমসি হইয়া আছে। বউ কি সারারাত তোমারে ঘুমাইতে দেয় নাই নাকি বাপু? চোখমুখ তো দেহি ফোলা, কিসের এত ধকল গেল শুনি? আমি কিন্তু তোমার দাদী শাউড়ি বুঝছোনি?
দাদী শাশুড়ির এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে মাহির লজ্জায় আর অস্বস্তিতে স্তব্ধ হয়ে গেল। আশপাশের মহিলারা মুখ চেপে হাসতে শুরু করলেন। মাহিরের মনে হলো এই ঘরটা এক উন্মুক্ত বাজার যেখানে তাকে নিয়ে রসালো আলোচনা চলছে।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে আইরিন ঘরে ঢুকল। ওর হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। দাদীকে আলতো করে সরিয়ে ও মাহিরের সামনে এসে দাঁড়াল। মাহিরকে দেখে ও শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
চা-টা কি এখনই খাবে, নাকি নিচে গিয়ে নাস্তার সাথে খাবে?
মাহিরের মাথাটা তখন প্রচণ্ড দপদপ করছিল। গতরাতের সেই মানসিক হাঙ্গামা, অপমান আর অনিদ্রার ধকল এখন তীব্র মাথাব্যথা হয়ে ফিরে এসেছে। ও কোনো কথা না বলে চায়ের কাপটা হাত বাড়িয়ে নিল।
দাদী আইরিনকে ধমক দিয়ে বললেন, বেততমিজ মাইয়া! জামাই কি তোর দোস্ত লাগে যে এম্নে কথা কস? সম্মান দিয়া কথা কবি। আপনে-আজ্ঞে কই তোর?
তিনি মাহিরকে বললেন, তুমি কিন্তু শাসন করবা ওরে জামাই বুঝছো? সব শিখায়া পড়ায়া নিজের মনের মতো গইড়া নিবা। আর কথা না মান্য করলে আমারে বলবা, একদম জালি বেত দিয়া সোজা কইরা দিবো।
মাহিরের একদম মনে হলো না তার পরিণীতা জালি বেতের মার খাওয়ার সম্ভাবনা শুনে বিচলিত হয়েছে বা তার ব্যবহারে কোন পরিবর্তন হবে।
-ও জামাই! রাইতে তোমারে ভালো মতোন সেবা-যত্ন করছে নি বউ? সালাম করছে নি?
মাহির আরেক দফা রাতের কথা শুনে চা মুখে দিয়ে বিষম খেল। এরা আসলে জানতে কি চাইছে!
সবাই তাতে হেসে উঠল। বেশ উল্টো জুটি মিলেছে। জামাই মশকরা শুনে লজ্জায় বিষম খাচ্ছে আর অন্যদিকে বউ মু্খে কুলুপ এঁটে দিব্যি সকাল থেকে বাড়ি-ঘর হেঁটে বেড়াচ্ছে।
আইরিন ঘরের বাকিদের দিকে ফিরে চড়া গলায় বলল, বড় দাদী তোমরা নিচে গিয়ে মেহমান সামলাও তো! তার মাথাব্যথা করছে, একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
আইরিনের ধমকে ঘরটা ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেল। ও জানালার পর্দাটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে মাহিরকে বলল,
নাস্তা নিয়ে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। নাস্তার এলাহি আয়োজন হয়েছে। খাওয়া শেষ হলে মুরুব্বিরা নাকি তোমার সাথে জরুরি কথা বলবে।
মাহির চায়ের কাপে চুমুক দেয়। আইরিন যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন মাহির খুব ধীরস্বরে ডাকল, শুনুন!
আইরিন দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাল। মাহির চায়ের কাপটা পাশে রেখে ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর স্বরে অপরাধবোধ ফুটে উঠল। সে বলল,
কাল রাতের ব্যবহারের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। পরিস্থিতি যাই হোক, আপনার ওপর ওভাবে চিৎকার করা বা রূঢ় হওয়াটা আমার একদমই উচিত হয়নি। যতো বাজে পরিস্থিতি হোক না কেন, এটা আমার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। এই পুরো ঘটনায় যদি কেউ নির্দোষ থেকে থাকে, তবে সেটা আপনি। আমি স্রেফ রাগের মাথায় সেটা ভুলে গিয়েছিলাম এবং অনেক আজেবাজে কথা শুনিয়েছি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।
আইরিন এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও হয়তো মাহিরের কাছ থেকে আর যাই হোক, এত দ্রুত এমন এক বিনম্র স্বীকারোক্তি আশা করেনি। ওর চেহারার সেই চিরচেনা কাঠিন্য কিছুটা কোমল হলো। ও কোনো পাল্টা উত্তর দিল না। ঘাড় কাত করে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
—————
খানিক বাদে মাহির ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই আরেক দফা অবাক হয়ে গেল। আসলেই এলাহি কান্ড!
ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় ভোজের আসর বসেছে। ঝুড়িভর্তি গরম লুচি,পরোটা, বাটি ঠাসা ঝুরা মাংস, খাসির পায়া, ঘন দুধের সেমাই, আর খাঁটি ঘিয়ের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। মাহিরকে দেখেই কুলসুম বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি দ্রুত টেনে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন,
বসো বাবাজি, বসো। অনেক বেলা হয়ে গেছে, খিদে লেগেছে নিশ্চয়ই?
মাহির কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসল। সে বসতে না বসতেই তার প্লেটে তিন-চারটা লুচি বেড়ে দেওয়া হলো। কুলসুম বেগমের সাথে আরও দুজন আত্মীয়া সেখানে ছিলেন। তারা মাহিরকে ঘিরে ধরলেন। একজন তোড়জোড় করে আরও এক চামচ ঝোল তুলে দিতে দিতে বললেন, শহরের মানুষের তো এসব টাটকা, ফ্রেশ সচরাচর খাওয়া হয় না। আমাদের গ্রামের মাংস একদম নরম। আবার তোমার শাশুড়ির রান্নার হাত ভালো। খেয়ে দেখো তো কেমন লাগে। আইরিন এর সিকিভাগও পারলে তোমার কপাল খুলবো।
মাহির প্লেট সামলানোর চেষ্টা করে বিনীতভাবে বলল, এতো তো আমি খেতে পারব না!
কুলসুম বেগম কানেই তুললেন না। তিনি বরং অন্য বাটি থেকে মিষ্টি সেমাই এগিয়ে দিয়ে বললেন, না না, একটুও না বললে চলবে না। নতুন জামাইয়ের প্রথম সকাল একটু পেট ভরে না খেলে আমাদের মন ভরবে না। এই যে আরও দুটো লুচি দিচ্ছি, গরম গরম খেয়ে ফেলো বাপ।
আইরিন টেবিলের এক পাশে দেয়ালের কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে সেই চেনা নির্লিপ্ত ভাব। সে দেখছিল মাহির কীভাবে অনুরোধের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়ছে। ভদ্রলোক বোধহয় না বলতে শিখেননি। মাহির একবার আড়চোখে আইরিনের দিকে তাকাল যেন মনে মনে সাহায্য চাইছে।
কিন্তু আইরিন পাল্টা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং সে যখন দেখল তার মা জোর করে মাহিরের প্লেটে আরও একটা পরোটা তুলে দিচ্ছেন, তখন তার ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল।
পুরো সময়টা জুড়ে মহিলারা মাহিরকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস আর হাসি-ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একেকজন একেকটা খাবারের বাটি এগিয়ে দিচ্ছে আর খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। সবার এই উপচে পড়া আদর আর আন্তরিকতা তাকে এক ধরণের অস্বস্তিকর কৃতজ্ঞতায় ডুবিয়ে দেয়।
খাওয়া শেষ হতেই কুলসুম বেগম তাকে হাত ধোয়ার পানি এগিয়ে দিলেন। ঠিক তখনই কোত্থেকে আইরিনের ছোট ভাইবোন আর পাড়া-পড়শির কয়েকটা বাচ্চা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল। তারা আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল। তাদের চোখেমুখে উত্তেজনা। দুলাভাইয়ের হাত ধোয়ানোর নাম করে বকশিস দাবি করল। তাদের অস্বস্তি ও ভয় কেটেছে। এখন বিয়ের স্বাভাবিক আনন্দ করতে কোনো বাঁধা নেই। বড়রা থামাতে এলে মাহির ব্যাপারটাকে প্রশ্রয় দিল। বেশ সময় নিয়ে দর-কষাকষি চলল, তারপরেও মন মতো বকশিস পেয়ে শালা-শালীদের কাছে দুলাভাই প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে।
আজ দুপুরের খাবার ও বিকেলের নাস্তা খাওয়ানোর জন্য পাড়ার পরিবার থেকে দাওয়াত আসে। রাজিবের হবু শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে খুব সামান্যই আগ্রহ ছিল তার। তাই তাদের পারিবারিক অবস্থান সম্পর্কে সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু তার জোর খাটানো শ্বশুরের বেশ সম্মান ও প্রভাব স্পষ্ট। তাই আইরিনকে তেমন পছন্দ না করলেও মাহিরের সমাদরের জন্য সবাই মুখিয়ে আছে।
হাত ধোয়া শেষ হতেই কাসিফ আর বাকিরা যখন মাহিরের হাত ধরে পাড়া বেড়াবে বলে হিড়হিড় করে সদর দরজার দিকে টানতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই বৈঠকখানার দিক থেকে ভারি পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। আফজাল মেম্বার পর্দা সরিয়ে ডাইনিং স্পেসে ঢুকলেন। তাঁদের পেছনে আরও দুই-তিনজন মুরুব্বি গোছের লোক।
মেম্বার সাহেবকে দেখেই বাচ্চাদের চঞ্চলতা নিমেষে উধাও হয়ে গেল। মাহিরের হাত ছেড়ে দিয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। আফজাল মেম্বার হাতের লাঠিটা মেঝেতে একবার ঠুকে গম্ভীর গলায় বললেন,
আরে আরে! তোমরা দেখি জামাইরে এখনই নিয়া টানাটানি শুরু করছো। ছাড়ো ওরে, ওর সাথে আমাদের কিছু দরকারি কথা আছে। গ্রাম তো সারা জীবনই দেখবে, এখন মুরুব্বিদের সাথে একটু বসুক। ভাবী চা পাঠায়েন।
মাহির শীতল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তারপর স্পষ্ট স্বরে বলল, আপনারা বসুন। এখন যেতে পারবো না। আমার কিছু কাজ আছে। আমি আধঘন্টার মধ্যে আসছি।
পিনপিন নীরবতা ছেয়ে পড়ল। আফজাল মেম্বার মুখ খুলে আবার বন্ধ করলেন। মহিলারা ঘোমটা বড় করে একটু পিছিয়ে গেলেন।
হঠাৎ সবকিছু ছাপিয়ে আইরিন খিলখিল করে হেসে উঠল। মাহির অবাক হয়ে দেখল তাকে। সে কি প্রাণোচ্ছল হাসি! নদীর তরঙ্গ যখন আলতো করে তটে আছড়ে পড়ে তেমন শ্রুতিমধুর। একগোছা রেশমি চুড়ির রিনরিন শব্দ যেমন মন কাড়বে ঠিক তেমন। এক মুহুর্তের জন্য মাহিরের অশান্ত মনকে স্থির করবে, একদম ঠিক তেমন।
কুলসুম বেগম মনে মনে দোয়া দরুদ পড়তে লাগলেন। এই মেয়েটা সংসার করবে কিভাবে? তিনি তাকে কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে থামতে বললেন এতে মেয়ের হাসির দমক আরো বেড়ে গেল। উপায় না পেয়ে পিঠে দুম করে কিল বসিয়ে দিলেন। আইরিন হাসতে হাসতেই বলল, সৎ মায়ের আসল রুপ দেখিয়ে দিলে তো! এখন কি হবে?
আফজাল মেম্বার তার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালেন। মাহিরকে বললেন, সমস্যা নাই। কাসিফ তোমার নিয়া আসবে আমার বৈঠকে। আর ভাবীরে কই মেয়েরে কাল কাল-পরশু পাঠায় দিবেন শ্বশুরবাড়ি আর আদব লেহাজের নাই কোনো ঠিক। নাম তো আপনারা আমার নষ্ট করতেছেন।
—————
আইরিন ঘরে এসে দেখল মাহির কপাল চেপে ধরে চেয়ারে বসে আছে। সে কাসিফকে ডেকে বলল, ঝান্ডু বামটা নিয়ে আয় দুলাভাইয়ের জন্য।
মাহির চোখ খুলে বলল, কি আনবে!
-ঝান্ডু বাম।
-কেন?
-মাথা ব্যথার জন্য, আর কেন আনবে?
-প্রয়োজন নেই।
-তোমার ইচ্ছা।
আইরিন খাটের অন্য পাশে পা উঠিয়ে বসল। শাড়ি গোছগাছ করে বলল, তুমি কি ঠিক ত্রিশ মিনিট পর যাবে নাকি আরো দেরি করবে?
মাহির ভ্রু কুঁচকে বলল, মানে?
-কোনো কাজ তো নেই তোমার। আমার ধারণা তাদের অপেক্ষা করানোর জন্যই এখানে বসে আছো। মেম্বার চাচাকে সবার সামনে সাইলেন্ট স্ল্যাপ দিলে আর কি। উনার প্রতি তোমার গভীর ক্ষোভ বোঝা যায় স্পষ্ট।
মাহির শীতল স্বরে বলল, ক্ষোভ না থাকলেই বরং অস্বাভাবিক হতো। কেন আপনি কি অপমানিত বোধ করছেন আমার কাজে?
-তোমার তাই মনে হলো?
মেয়েটা মাহিরকে তুমি তুমি ডেকে একদম তার মাথায় গোলমাল লাগিয়ে দিচ্ছে। কি যন্ত্রণা!
-না সম্ভবত। ইউ সীমড প্লীজড টু সী হিম অ্যাংরি অ্যান্ড স্পীচলেস।
-ইউ আর অবজারবেন্ট দেন!
-এই লোক আপনার কেমন চাচা হয়?
-পাড়ার চাচা। ক্ষমতার প্রয়োজনে চাচা। তিনি গ্রামের রাজনীতি করেন, আমার বাপ টাকা ঢালে। ইন রিটার্ন তিনি আমার বাপের ইনকাম বাড়ার ব্যবস্থা করেন। এইভাবে চলছে বছরের পর বছর।
-এবং সে আপনাকে তেমন পছন্দ করে না।
-এটা কিভাবে বুঝলে?
-তার মানে সঠিক ধরেছি?
-উত্তরটা দাও।
-প্রথমেই রাজিব কোনো সুপাত্র ছিল না। আপনাদের পারিবারিক অবস্থান জানার পরে সেই বিয়ে কেন ঠিক হয়েছিল তা নিয়ে আমি আরো কনফিউজড। এছাড়াও যেভাবে আমার সাথে হুট করে বিয়ে দিয়ে দিলো তাতে আপনার ফিউচার নিয়ে খুব বেশি কনসার্নড মনে হয়নি।
আইরিন গল্প বলার মতো করে বলল,
টাকাপয়সা বাড়লে বন্ধু বাড়ে। তেমনই আফজাল মেম্বার আর তার ফিনান্সিয়াল ব্যাকারের আচ্ছা তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। তখন তার মাথায় দায়িত্ব পড়ল রফিকে সরকারের বেয়াদব মেয়েটাকে এক মাসের মধ্যে কোনমতে বিয়ে দিতে পারলে তিনি তাকে মাথায় তুলে নাচবেন। বাকিটা আপনার সামনে।
মাহির প্রশ্ন করল না কেন আইরিনকে এভাবে বিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিল তার বাবা। আর সেই বন্দোবস্তে আইরিন-ই বা এমন উদাসীন ছিল কিভাবে। প্রশ্নগুলো তোলা রাখলো ভবিষ্যতের জন্য।
—————
আফজাল মেম্বারের বৈঠকখানায় ঢোকার পর থেকেই মাহির বুঝতে পারে তীর নিশানায় লেগেছে, প্রত্যেকের মুখ থমথম হয়ে আছে। রফিক সরকার তক্তপোশের এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন। গায়ে দামী আদ্দির চাদর, হাতে সিগারেট। তিনি নিজে কোনো কথা বলছেন না, কেবল তাঁর শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে মাহিরকে মেপে নিচ্ছেন। এই নীরবতা পুরো ঘরের ওপর একটা পাহাড়সম গাম্ভীর্য চাপিয়ে দিয়েছে।
সব কথা গুছিয়ে বলার দায়িত্ব নিয়েছেন আফজাল মেম্বার। তিনি পানের বাটা থেকে একটা পান মুখে দিয়ে কিছুটা গদগদ হাসিতে মাহিরের দিকে তাকিয়ে মুখ খুললেন, বসেন জামাই বসেন। শরীর-মন সব ঠিকঠাক আছে তো? আমাদের নিশিখালির বিলের রাজা রুই মাছ খাবেন আইজ রাতে আমার গরিবখানায়। বিলে জেলে পাঠায়ে দিছি একদম সকাল বেলা।
টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি খোলা। মেম্বার সাহেব খাতাটা মাহিরের দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে খাঁটি গ্রামীণ টানে বলতে শুরু করলেন,
শোনেন বাজান, আমার রফিক ভাইজাব মানুষটা অল্পভাষী হইতে পারেন, কিন্তু কলিজাখান বড়। উনার বড়ো মাইয়া আইরিনকে তিনি সোনার চামচ মুখে দিয়া মানুষ করছেন। তা কাল যা হওয়ার তো হইছেই, অহন আপনে আমাগো ঘরের মানুষ। জামাইরে শুরু থেকে ঠিকমতো খাতিরদারি করতে পারি নাই সেই আফসোস সারা জীবন থাকবো। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনাটা কইরা ফেলি। এই দেহেন, একখান নতুন জাপানি হোন্ডা আমার পক্ষ থেকে উপহার। আর এই যে লিস্ট পুরা ঘরের আসবাব, বিছানা-বালিশ, ঘর সাজানোর সব রেডি। আর নগদ তো তো আছেই। ওইটা দিয়া একটা জুতসই কারবার খাড়া করাইতে পারবেন। চাকরি-বাকরি ছাইড়া দিয়া নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। হাজার হোক গোলামীর চেয়ে নিজে মালিক হওয়া বেশি আরামের তাই না কন। হা হা!
রফিক সরকার এবার একবার মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে যেতে হলে এই সম্পদের বোঝাটা গ্রহণ করতেই হবে। এটা তাঁর আভিজাত্যের প্রশ্ন। আর সেই সম্পদের মেয়ে জামাইকে কাবু করা গেলে আরো ভালো হয়।
-একজন মেম্বার হয়ে যৌতুক দিতে চাইছেন?
মাহিরের চোখমুখ শক্ত দেখে মেম্বার সাহেব আবার ফোড়ন কাটলেন,
ছি ছি যৌতুক ভাইবা আবার মন কালা কইরেন না। আমাদের এই গেরামের দস্তর হইলো মাইয়া বিদায়ের সময় তারে সব সাজায়া-গুছায়া দেওয়া। রফিক সরকারের মতো শ্বশুর পাইছেন, আপনার তো কপাল খুলছে গো বাজান! কয়জন শ্বশুর সেধে জামাইরে ব্যবসার মূলধন দেয় কন?
মাহির খাতাটার ওপর দিয়ে একবার ঠান্ডা চোখে চোখ বুলালো। নগদ টাকা, হোন্ডা, ফার্নিচার এসব যেন তার আত্মসম্মানকে বিদ্রূপ করছে। তারা ভাবছে কাল রাতের দুর্ঘটনা'র একটা চড়া মূল্য চুকিয়ে তাকে কেনা সম্ভব। মাহিরের ভেতরটা জেদে টানটান হয়ে উঠল। সে খুব শান্তভাবে খাতাটা বন্ধ করে টেবিলের এক পাশে সরিয়ে দিল।
সে রফিক সরকারের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে খুব স্পষ্টভাবে কথা বলা শুরু করল। তার ভাষায় কোনো দ্বিধা ছিল না, শুধু ছিল পৌরুষদীপ্ত কাঠিন্য।
-আপনারা তো কাল রাতেই কারো মতের তোয়াক্কা না করে আইরিনকে আমার সাথে বেঁধে দিয়েছেন। আবার বলেছিলেন আমার ব্যাপারে সব খোঁজ নিয়েছেন। তখন আপনাদের মনে হয়নি সামান্য চাকরি করা ছেলে চলবে না?
যখন কবুল পড়ানো হচ্ছিল, তখন কি এই ব্যবসার কথা কেউ তুলেছিলেন? তখন তো ইজ্জত বাঁচানোই ছিল মুখ্য। এখন যেহেতু ও আমার স্ত্রী, তাই ওকে আমার সীমাবদ্ধতার ভেতরেই থাকতে হবে।
রফিক সরকার এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। মেম্বার সাহেব আকাশ থেকে পড়ে বললেন, কইলেন কী বাজান? এইগুলা তো আপনেরই পাওনা। শ্বশুর শখ কইরা দিতাছে, না কইলে তো মাইনষে হাসব।
মানুষ কি বলবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না মেম্বার চাচা। মাহির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,
আমি কোনো ব্যবসায়ী নই যে লাভ-ক্ষতির অংক করে সংসার সাজাব।
-তাইলে সারাজীবন এই ছাঁইপাশ চাকরি করতে চান? সরকারি হইলেও বুঝতাম। হুদাই জেদ কইরেন না বাজান।
-আমি একজন সাধারণ চাকুরিজীবী, একদম সাদামাটা মধ্যবিত্ত জীবন আমার। আমার যা সামর্থ্য, আইরিনকে তার মধ্যেই থাকতে হবে। আপনাদের দেওয়া হোন্ডার তেলের খরচ মেটানোর সামর্থ্য হয়তো আমার আছে, কিন্তু অন্যের দাক্ষিণ্য বয়ে বেড়ানোর ইচ্ছে বা মানসিকতা কোনোটাই আমার নেই।
সে রফিক সরকারের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থামল। তারপর একটা তীক্ষ্ণ খোঁচা দিয়ে বলল,
আমি আমার আত্মসম্মান বিক্রি করে আপনাদের মেয়েকে সুখে রাখার মিথ্যে নাটক করতে পারব না। আপনারা ওকে আমার সাথে পাঠাতে চেয়েছেন, আমি আমার দায়িত্ব মেনে নিয়েছি। কিন্তু দয়া করে আমাকে কেনার চেষ্টা করবেন না। যখন আমি যাব, আইরিন কেবল ওর নিজস্ব জিনিস নিয়ে আমার সাথে যাবে। এর বাইরে একটি সুতোও আমি আমার ঘরে তুলব না।
রফিক সরকারের পাথুরে মুখে এবার এক ধরণের অস্থিরতা দেখা গেল। এমনটা তিনি আশা করিনি। মাহিরের এই সোজাসাপ্টা কথা তার জামাতার ওপর কর্তৃত্বের আশা এক নিমিষে ধূলিসাৎ করে দিল।
মাহির দাড়িয়ে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
আপনাদের মেয়েও বাইরে দাড়িয়ে। তিনিও শুনে রাখুক আমার ঘরে কোনো রাজকীয় আয়োজন নেই। খুবই সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত আমি। কিন্তু কাউকে আঁধারে রেখে অপছন্দের জীবনে নিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই। আপনার বাবার এই দান করা সুখ-সুবিধা আমি নেব না। এখন ভেবে দেখুন, এই মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে আপনি আমার সাথে যেতে পারবেন কি না। সিদ্ধান্ত আপনার।
আফজাল মেম্বার হায়হায় করে বললেন, আরে কি কও তুমি জামাই! তুমি যেমনি রাখতো সেমনেই থাকবে সে। ডাল ভাত যা দিবা তাই খাবে।
মাহির সে কথা অগ্রাহ্য করে বলল, কি বললাম শুনলেন? সিদ্ধান্ত আপনার এবং যেন শুধু আপনারই হয়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………