আয়না খুব ছোটবেলা থেকেই একা চলতে শিখেছে। মা যখন তাকে রেখে গৃহস্থের কাজে ব্যস্ত থাকত, সে তখন নিজে নিজেই খেলতো।
বাইরে তার খেলতে যাওয়া বারণ ছিল। খুব অদ্ভুত কিছু নিয়মে তার দাদী তাদের গন্ডি বেঁধে রেখেছিল। অথচ ছেলের বউ একান্ত তার পছন্দের ছিল।
আয়নার জন্মদায়িনী আইনুন নাহার বিয়ের প্রথমদিন গুলোতেই বুঝে গিয়েছিল বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতায় স্বামীর মনঃক্ষুণ্ন থাকার কারণ তিনি নিজেই!
কালো ও বেঁটে মেয়ে স্ত্রী রুপে রফিক সরকারের জন্য এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন ছিল। শুধুমাত্র মেয়ের বাবা ধনবান হওয়ায় ও নব জামাতাকে ভবিষ্যৎ সবরকমের আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তাদের সম্পর্ক গঠিত হয়।
আয়নার দাদীর ঘর ধনধান্যে পরিপূর্ণ হলেও ছেলে ঘরবিমুখ হয়। সময় পেরোতেই তিনি ও ছেলের পথ ধরেন। আসলেই তো এমন বউ দিয়ে লাভ কি যে সোয়ামীর মন জয় করতে পারে না! তার ছেলে এখন মায়ের প্রতি ও ক্ষোভ পুষে রেখেছে। তার ওপর জন্ম দিয়েছে একটা মেয়ে।
আয়না তার বাবার প্রতি ভরসা ছোটবেলায় ছেড়ে দিয়েছিল আর মায়ের মৃত্যুর পর দুনিয়ার ওপর থেকে। তাই তো এই মুহুর্তে নিজের ওপর সে চুড়ান্ত বিরক্ত হয়। কয়দিন ধরে চিনে সে মাহিরকে? কেন আচম্বিত হলো সে!
মানুষের মন বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে দিশা বদলায়। কিছুক্ষণ পূর্বেই যা স্নিগ্ধ সমীরণ হয়ে চারপাশ মাতিয়ে তুলেছিল, পরক্ষণেই তা রুক্ষ মরুবাতাস হয়ে তপ্ত শুষ্কতায় পুড়িয়ে মারতে পারে।
আয়না ভাবতে শুরু করে এখন কি করবে সে? বাস থেকে নেমে যাবে? এই রাতে তা সম্ভব না। শহরে পৌঁছে আবার নিশিখালিতে ফিরে যাবে? কোনোদিনও না। নিশিখালি আর কখনো তার বাসস্থান হবে না। একটা হোস্টেলের সিট জোগাড় করতে হবে। পরিচিত কার সাথে কথা বলা যায় এ নিয়ে?
-আপা শুনতেছেন? ডরাইয়েন না।
আয়না চিন্তার ঘোর থেকে বের হয়ে কন্ডাকটরের দিকে তাকায়। সে বলে, আমি ফোন করছি। আমাদের আরেক বাস অন্যপথে যাবে, কিন্তু ওইখানে কিছুক্ষণ থামার কথা। দেখি কিছু খবর পাই কিনা।
-ভয় পাচ্ছি না। অনেক ধন্যবাদ।
আয়না মোটেই ঘাবড়াবে না। সে কারো উপর ভরসা করে নির্ভরশীল হয়ে থাকে না। কারোর প্রতি বিশেষ কোনো আশা রাখে না। যেকোনো পরিস্থিতি একা মোকাবেলা করতে সে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে সবসময়।
তার চেয়ে বেশি বিরক্ত ও চিন্তিত বাস কন্ডাকটরকে মনে হলো। বেচারা কয়েকটা ফোনকল করে ব্যস্ত হয়ে বলল, কথা হইছে। আপনার স্বামী ওইখানেই ছিল। মনের ভুলে বাস মিস করছে।
-এখন কি সে ওই স্টপেজ আছে?
-নাহ৷ আমাদের লোক তারে কইছে পরের বাস ধইরা ডাইরেক্ট শহরে আসতে। এই রাতে যদিও এই রুটের পাওয়া কঠিন। সকাল সকাল পাইতে পারে। রাতটা রেস্টুরেন্টে কাটায় দিলেই হয়, ওইগুলা সারারাত চলে। আপনে ঠিকানা জানলে বাড়িতে যাইয়েন গা আর নাইলে সকালে টার্মিনালে নাইমা অপেক্ষা কইরেন।
-এখন কি ওর সাথে কথা বলা যাবে?
-কেমনে যাবে! কইলাম না। ওই বাস অন্য রুটের। ছাইড়া দিসে আগেই।
আয়না কথা বাড়াল না।
—————
সময় পেড়িয়ে রাত আরো গভীর হয়। বাসের ভেতরের বাতিগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু সামনের দিকে ড্রাইভারের ড্যাশবোর্ডেরহালকা নীলচে আলো জ্বলছে। বাইরের পরিষ্কার আকাশের ফকফকা জোছনার ঝলকানি জানালা দিয়ে এসে ভেতরে পড়ছে। বাসের বেশিরভাগ যাত্রীই এখন তন্দ্রাচ্ছন্ন।
আয়না ঘুমানোর চেষ্টা করল না। সে জানালার কাঁচে হেলান দিয়ে তার সিটে চুপচাপ বসে আছে। কন্ডাকটরের কথাগুলো শোনার পর তার মনের ভেতর যে সাময়িক ঝড়টা উঠেছিল, সেটা এখন এক ধরণের নিথর স্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে।
সে ভাবল মাহির তো ঠিকই করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে একটা রেস্টুরেন্টে বসে সকালের জন্য অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ, ওটাই নিরাপদ। আয়না নিজেকে বোঝাল, কিন্তু যদি ঘটনা ভিন্ন হয়? কোনো কিছু না বললে হুট করে মাহির কেন নেমে যাবে? তার সাথে যদি আয়নার আর দেখা না হয়?
তাতেও খুব সমস্যা নেই। তখন সে না হয় অন্য ব্যবস্থা করবে। শত হলেও স্রেফ পরিস্থিতির চাপে পড়ে তারা দুজন একসাথে এই পথচলা শুরু করেছিল। মাহির নিজের পরিচিত স্থানে ফিরে এসে পথ আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে! তাতে আয়না তাতে আয়না মোটেই ভেঙ্গে পড়বে না। যেটা হয়তো আরো পরে হতো, দাম্পত্যের শুরুর ঘন্টাতেই না হয় সেই বিচ্ছেদটা হলো!
আয়না তার হ্যান্ড ব্যাগের চেইনটা টেনে হাত দিয়ে একবার সার্টিফিকেট ও জমানো টাকাগুলো ছুঁয়ে দেখল। তার জীবন তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত নিজের শরীর ছাড়া আর কারোর ওপর ভরসা করা বোকামি। সে ঠিক করল কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করে মাহিরকে না পেলে, ঢাকা পৌঁছে সে সোজা কোনো হোস্টেলে উঠবে। মাহিরের জন্য সে সারাদিন স্টেশনে অপেক্ষা করবে না। রফিক সরকারকে ফোন দিয়ে সাহায্য তো মরলেও চাইবে না। মানুষের মন বদলাতে সময় লাগে না, সে তা জানে।
রাত আনুমানিক তিনটা।
বাসটা তখন মহাসড়কের এক জনশূন্য এলাকা দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলছে। হঠাৎ বাসের পেছনে একটা তীক্ষ্ণ হর্নের শব্দ শোনা গেল। একবার, দুইবার করতে করতে একটানা হর্ন বেজে চলেছে।
প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। হাইওয়েতে ওভারটেক করার সময় এরকম হর্ন অনেকেই দেয়। কিন্তু হর্নটা থামছে না। একটা মোটরসাইকেল বাসের একদম গা ঘেঁষে চলছে আর বারবার হর্ন দিচ্ছে। আয়না জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু বাইকের হেডলাইটের তীব্র একটা আলো চোখে পড়ল।
বাসের ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল, এই ছোকরা মরণের লাইগা রাস্তায় নামছে নাকি?
বাইকটা এবার বাসের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে সামনে চলে এল। আর শুধু হর্ন নয়, বাইক চালক বারবার বাসের সামনে আড়াআড়িভাবে বাইকটা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ড্রাইভার বাধ্য হয়ে কষে ব্রেক ধরল। বাসের সব যাত্রী একটা ঝাঁকুনি খেয়ে একসাথে সামনে ঝুঁকে পড়ল। ঘুমানো যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করল।
-কি হইছে? হার্ড ব্রেক করলেন কেন?
-ডাকাত নাকি আবার মিয়া?
বাসটা রাস্তার একপাশে গোঁ গোঁ শব্দ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। কন্ডাকটর রাগে গজ গজ করতে করতে বাসের দরজা খুলল,
কোন শালার পুত রে ভাই! হাইওয়েতে বাস থামায়!
নিচে বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
সচরাচর ভাবলেশহীন আয়নাও উৎসুক হয়ে তাকাল। ব্যাগটা পায়ের কাছে লুকিয়ে ফেলল। দ্রুত কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। বাসের দরজার সিঁড়ি বেয়ে একজন হুরমুর করে ভেতরে ঢুকল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কন্ডাকটরকে পাশ কাটিয়ে লোকটা সোজা বাসের ভেতর চলে এল।
সে মাহির।
মাহিরের পরনের শার্ট ধুলোয় ধূসর হয়ে আছে। তার চুলগুলো এলোমেলো, কান আর নাক ঠান্ডায় লাল হয়ে আছে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, আর সেই নিশ্বাসগুলো শীতের বাতাসে ধোঁয়ার মতো বের হচ্ছে। পুরো বাসের মানুষ তখন চুপ। সবাই বিস্ময় নিয়ে এই ধুলোমাখা জবুথবু পুরুষটার দিকে তাকিয়ে আছে।
মাহির কারো দিকে তাকাল না। সে টলটলায়মান পায়ে সোজা হেঁটে আয়নার সিটের সামনে এসে দাঁড়াল। আয়না স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
তার চোখের পাতা যেন নড়তে ভুলে গেছে। যে মানুষটাকে সে একটু আগে নিজের লাইফ প্ল্যান থেকে প্রায় মুছে ফেলেছিল, সে এভাবে গভীর রাতে শত বিপদের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে মাঝরাস্তায় বাস থামিয়ে ফিরে আসবে, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল!
মাহির আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল, ভয় পেয়েছো আয়না?
ঠান্ডায় তার ঠোঁট যেন জমে গেছে। আয়না কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে দেখল মাহিরের হাতগুলো কাঁপছে। তেমন ভারী পোষাক ছাড়া এই কনকনে বাতাস চিরে সে এতদূর এসেছে শুধু এই একটা আশঙ্কায় যে, আয়না ভয় পাবে।
মাহির তার পাশের সিটে ধপ করে বসে পড়ল, তোমার ফোন নম্বর এক্ষুনি বলো তো? এমন বোকামি কি করে করমান। আমারটাও সেভ করে ফেলো।
কন্ডাকটর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বলল, আরে ভাই! আপনি তো ওই স্টপেজেই আছিলেন। মোটরবাইক পাইলেন কই?
মাহির মাথাটা সিটে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘক্ষণ পথে থাকায় ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়ছে। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
একজনকে অনেক রিকোয়েস্ট করে রাজি করালাম। সে তার বাইকে করে আমাকে এই পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছে। আপনারা অনেক স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
আয়না এখনো মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এখনো একটাও শব্দ উচ্চারণ করে নি সে।
আয়না লক্ষ্য করল মাহিরের শার্টের কলারটা বাতাসে উল্টে গেছে। আয়না কোনো কথা না বলে খুব ধীরে তার হাতটা বাড়িয়ে মাহিরের কলারটা ঠিক করে দিল। মাহির চোখ না খুলেই শুধু একটা শান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাসের ভেতরে আবার নীরবতা ফিরে এল, ইঞ্জিনের গর্জন শুরু হলো।
—————
সকাল সকাল টার্মিনালে পৌছে বাসের দরজা খোলার সাথে সাথেই বাইরের কোলাহল শোনা গেল। সারা রাতের সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর উত্তেজনার পর তার শরীর এখন সিসার মতো ভারী হয়ে আছে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, উঠি? চলে এসেছি।
আয়না মাথা নাড়ল। সে তার ছোট ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আগে নামল, পেছনে মাহির। বাস থেকে নিচে পা রাখতেই যান্ত্রিক শহর তাদের অভ্যর্থনা জানাল। বাসের হেল্পার ততক্ষণে বাসের নিচের স্টোরেজ থেকে তাদের ল্যাগেজগুলো বের করে রাস্তায় নামিয়ে রেখেছে।
মাহির তার ট্রাভেল ব্যাগ আর আয়নার বড়ো স্যুটকেসটা টেনে একপাশে নিল। মাহির যখন ল্যাগেজ টানছিল, আয়না খেয়াল করল মাহিরের কায়িকশ্রম কমানোর জন্য সাহায্য করতে এগিয়ে আসতেই মহাপুরুষ বিনাবাক্যে তাকে ইশারায় থামিয়ে দিল।
টার্মিনালের চারদিকে সিএনজি আর রিকশা চালকদের শোরগোল। মাহির আয়নাকে ভিড় থেকে আড়াল করে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেল।
সে একটা খালি সিএনজিকে হাত ইশারা করল। সিএনজিওয়ালা কাছে আসতেই মাহির গন্তব্য জানাল। দরদাম ঠিক হওয়ার পর মাহির নিচু হয়ে ল্যাগেজগুলো সিএনজির ভেতরের পেছনের দিকে সাবধানে ঢুকিয়ে দিল। একটা বড় স্যুটকেস আর ব্যাগ রাখার পর ভেতরের জায়গাটা বেশ ছোট হয়ে এল।
-বসো।
মাহির আয়নাকে ভেতরে যাওয়ার জায়গা করে দিয়ে বলল।
আয়না সিএনজির ভেতরে গিয়ে বসল। মাহির যখন তার পাশে বসল, সিএনজির সেই খাঁচার মতো ঘেরা জায়গাটুকুতে তাদের দূরত্ব আবার কমে এল। সিএনজি চালক মিটার চালু করতেই ভটভট শব্দে ধোঁয়া ছেড়ে সিএনজি বাস টার্মিনালের জটলা কাটিয়ে মূল রাস্তায় উঠে এল।
সকালের মিঠে রোদ সিএনজির গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আয়নার মুখে এসে পড়ল। সে জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে রইল।
শহরের ব্যস্ত রাস্তা, ফ্লাইওভার আর মানুষের ভিড় দেখে তার মনে হলো, নিশিখালি গ্রামটা যেন অন্য কোনো জন্মের গল্প। বায়ুদূষণে প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়া যায় না। অযথাই এত শব্দ দূষণ যে কানে তালা লেগে যাওয়ার মত অবস্থা! তার পরেও মানুষের শহর এত পছন্দ কেন!
মাহির পকেট থেকে তার মোবাইলটা বের করল। ফোনটা সারা রাত বন্ধ ছিল। অন করতেই টুংটাং শব্দে মেসেজ আর মিসড কলের নোটিফিকেশন আসতে শুরু করল। মাহিরের চেহারায় আবার সেই দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আড়চোখে একবার আয়নাকে দেখল, তারপর আবার জানালার বাইরে তাকাল।
—————
সিএনজি যখন গলিটায় ঢুকল, আয়না বাইরে তাকিয়ে ছিল। শহরের এই অংশটা খুব অভিজাত নয়, তবে মানুষের পদচারণায় মুখর।
দুপাশে মাঝারি উচ্চতার দালান, নিচতলায় ছোট ছোট দোকান। কোথাও লন্ড্রি, ফার্মেসী কোথাও দর্জিবাড়ি বা মুদির দোকান। রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, আর একপাশে একজন সবজি বিক্রেতা ভ্যান নিয়ে ডাক পাড়ছে। নিশিখালিতে রাস্তা মানেই ছিল জনমানবহীন মেঠোপথ, আর এখানে প্রতি কদমে মানুষ আর শব্দ।
সিএনজিটা একটা তিনতলা বাড়ির সামনে এসে থামল। আয়না গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে বাড়িটার দিকে ভালো করে তাকাল। বাড়িটা বেশ পুরনো। দেয়ালের ঘিয়ে রঙটা রোদে পুড়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে,কিছু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে। জানালার লোহার গ্রিলগুলোতে মরচে ধরেছে। কোনো জাঁকজমক নেই, তবে একটা শক্তপোক্ত ভাব আছে। বাড়ির গেটটা ভারী লোহার তৈরী। নামফলকে লেখা আহমেদ নিবাস।
মাহির ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে ল্যাগেজগুলো নামাল। স্যুটকেসটা চাকার ওপর ভর দিয়ে টেনে নিয়ে সে বলল, চলো, ভেতরে যাওয়া যাক।
সিঁড়িঘরটা কিছুটা অন্ধকার আর গুমোট। দেয়ালের একপাশে বিদ্যুতের অনেকগুলো তার জট পাকিয়ে আছে। নিচতলার বন্ধ দরজাগুলোর আড়াল থেকে প্রেশার কুকারের সিটি বাজার আওয়াজ আসছিল।
মাহির বলল, নিচতলার এ পাশে ভাড়াটিয়া থাকে।
দ্বিতীয় তলায় উঠে মাহির একটা ভারী কাঠের দরজার সামনে দাঁড়াল। কলিংবেলে চাপ দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেতর থেকে দ্রুত কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল।
দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে ষোল বা সতের বছরের একটা মেয়ে। তার পরনে সাধারণ একটা সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো পেছনে আলগা করে বাঁধা। মেয়েটির মুখে দুষ্টুমি আর চপলতা। সে মাহিরকে দেখামাত্রই প্রায় চিৎকার করে উঠল,
আরে মাহির ভাইয়া! তুমি তো জ্যান্ত আছেো দেখি! দাদী তো সারারাত তোমার টেনশনে পুরা বাড়ি মাথায় তুলছে। গডকাল সকালেই না আসার কথা? কেন দেরি হলো?আর কোথায় ঘুরতে গিয়েছিলে? তোমরা সবাই কত কত জায়গায় ঘুরো! আমাকে কোথায় নিয়ে যাও না। আম্মু তো আমাকে বন্ধুদের সাথেও যেতে দেয় না। আচ্ছা ভাইয়া ফোনটা আবার কেন অফ ছিল তোমার?
মেয়েটি কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল, যেন তার কথার ডালি সাজিয়েই রাখা ছিল। মাহির কিছুটা ক্লান্ত হাসি হাসল। মেয়েটি যখন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখন তার নজর পড়ল মাহিরের ঠিক পেছনে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আয়নার ওপর।
মুহূর্তেই মেয়েটির হাসিমুখটা থমকে গেল। তার কথাগুলো মাঝপথে আটকে চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। সে একবার আয়নার পায়ের নখ থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল, তারপর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মাহিরের দিকে তাকাল। আয়না তখন মাথা উচুঁ করে তার দিকে তাকায়। গোলাপি শাড়ির আঁচলটা টেনে তার অপর কাধে পরিপাটি করে রেখেছে। সে বুঝতে পারছিল মেয়েটির এই স্তব্ধতা তাকে দেখেই।
মেয়েটি এক কদম পিছিয়ে গিয়ে তোতলামি করে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া... এ... ইনি কে? মানে, তোমার তো একা আসার কথা ছিল। এই আপু আবার এখানে কেন?
মাহির শান্ত গলায় বলল, ভেতরে ঢুকতে দে মিনি। অনেক লম্বা জার্নি করে এসেছি।
মিনি দরজার পাশ থেকে সরছে না। সে এখনো বড় বড় চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। মিনির মনে হচ্ছিল সে কোনো সিরিয়ালের দৃশ্য দেখছে। গ্রামে বেড়াতে গিয়ে বউ দিয়ে ফেরা সেখনে কমন প্লট। তাহলে এই মেয়েটি কি মাহির ভাইয়ার বউ? ভাইয়া বিয়ে করে ফেলেছে?
নিশিখালি থেকে মাহির ভাইয়া একা ফেরার কথা ছিল, কিন্তু সে সাথে করে একটা বউ নিয়ে এসেছে এই খবরটা পুরো বাড়িতে যে কী পরিমাণ ভূমিকম্প ঘটাবে, সেটা মিনি এখনই কল্পনা করতে পারছে।
মাহির আবার বলল,
যা দাদী বা বড়ো চাচী থাকলে, একটু ডেকে নিয়ে আয়! আমরা অপেক্ষা করছি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………