আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে - পর্ব ৭৩ - সালমা চৌধুরী - ধারাবাহিক গল্প


          মাহমুদা খানের ধমক খেয়ে মেঘ কেঁপে ওঠে, ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিয়েছে৷ মেঘ ভয় পেলেও আবিরের মনে কিঞ্চিৎ ভয় বলতে নেই। ফুপ্পির ঝা*ড়ি খেয়েও আবির কল দিয়েই যাচ্ছে। মেঘ ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে ঠিকই কিন্তু আবিরের অনাবশ্যক কলে বুকের ভেতরটা অবিচ্ছিন্নভাবে কম্পিত হচ্ছে। বাহির থেকে আলোকসজ্জার ঝলমলে আলো রুমে প্রবৃত্ত হচ্ছে। মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে বন্যার দিকে একপলক তাকালো, বন্যা গভীর ঘুমে নিমগ্ন পরপর তাকালো ফুপ্পির দিকে, ফুপ্পির ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝা যাচ্ছে ওনিও ঘুমে। মেঘ বুকের উপর ফোন চেপে অতি সন্তর্পণে বন্যার পাশ দিয়ে নেমে উদগ্রীব পায়ে বারান্দায় গিয়ে কল রিসিভ করল। আবির তৎক্ষনাৎ অনচ্ছ কন্ঠে শুধালো,
" তোর কি আমার জন্য একটু মায়াও হয় না?"

আবিরের কথা শুনে মেঘ বিহ্বল, ভড়কে গেছে কিছুটা। কপাল কুঁচকে ভারী স্বরে বলল,

" আমি কি করলাম!"

" সন্ধ্যা থেকে কেউ আমাকে একটা কল পর্যন্ত দিল না। কেউ না দিলেও তুই তো একটা কল দিতে পারতি নাকি?"

" আমি তো আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি বুঝতেই পারি নি।"

"বাহ! কি দায়িত্বশীল বউ আমার। "

মেঘ সহসা ঠোঁট বাঁকালো, সদাজাগ্রত চোখে আলোকসজ্জার লাল, নীল আলোর পানে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,

" বাসায় কখন আসছেন? খেয়েছেন?"

"কিছুক্ষণ আগে। আমার শ্বশুর বিয়েতে যে পরিমাণ জামাই আদর করেছে রাতে আর কিছু খেতে হবে না।"

"কোথায় গিয়েছিলেন?"
"এখন বলবো না। "
"আচ্ছা, ঘুমান তাহলে। "
"শুন"
"জ্বি"
"চল ছাদে যাই।"
"না।"
"কেনো?"
" আম্মুরা বলেছে বিয়ের রাতে বড় জামাইয়ের মুখ দেখতে নেই, এতে নাকি জামাইয়ের অমঙ্গল হয়।"

" ঠিক আছে, দেখলাম না মুখ। একটু কথা তো বলতে পারি। "

"আব্বাজান নিষেধ করেছেন, দেখাসাক্ষাৎ ও করা যাবে না। "

আবির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

"কেউ আমাকে কিছু বলতে পারছে না তাই তোকে কুসংস্কার বুঝাচ্ছে আর তুইও বোকার মতো সেসব মানতেছিস।"

মেঘ নিশ্চুপ, আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,

" চল না ছাদে।"

মেঘ অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,
" একটু বুঝার চেষ্টা করুন,আমি যেতে পারবো না। আপনি যেন রুমে না আসেন তারজন্য আব্বাজান ফুপ্পিকে আমার সাথে থাকতে বলেছেন। এখন আমি বের হলে খবরই আছে। আপনি ঘুমান, প্লিজ।"

আবির ঢোক গিলে ভ্রু বাঁকিয়ে আবেগতাড়িত কন্ঠে বলল,
"I miss you. I need you. Believe me, I badly want you, Sparrow."

আবিরের কন্ঠে আবেগপ্রবণ, অস্বাচ্ছন্দ্যকর কথাগুলো শুনে মেঘের গা শিউরে উঠছে। এ যাবৎ কালে আবিরকে এতটা ব্যাকুল হতে কখনো দেখেনি সে। মেঘ নিস্পৃহায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,

"আমাকে তো খুব বলতেন সহিষ্ণু হতে হবে, ধৈর্যশীল হতে হবে তাহলে আজ আপনার এই অবস্থা কেনো?এত অধৈর্য হয়ে উঠেছেন কেনো আপনি?"

" আর কত ধৈর্য ধরবো? এতদিন যাবৎ অফিসিয়াল বিয়ের অপেক্ষায় ছিলাম, করলাম তো অফিসিয়াল বিয়ে। আত্মীয় স্বজন, এলাকাবাসী সবাই জানলো তো। তাহলে এখন আমার বউ আমাকে দিচ্ছে না কেনো? মানলাম কাল অনুষ্ঠান শেষে বাসর হবে। কিন্তু দেখা তো করতে দিবে! কথা তো বলতে দিবে! আমাদের মাঝে কংক্রিটের দেয়াল সৃষ্টির কি দরকার ছিল? "

"জানি না। আমার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাবো। আপনিও ঘুমান।"

"বুকের ভেতর আগুন জ্বললে ঘুমাবো কিভাবে?"

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
" এক বোতল ঠান্ডা পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পরেন ।"

মেঘ কল কেটে রুমে চলে গেছে। আবির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বিড়বিড় করল,
" এত কাহিনী করবে জানলে কমিউনিটি সেন্টার থেকেই পালাতাম৷ "

 মেঘ ভোরবেলা উঠে আবারও ঘুমিয়েছে তাই সকালে ঘুম একটু দেরিতে ভেঙেছে। আশেপাশে বন্যা, ফুপ্পি কেউই নেই। আবিরের কথা মনে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে নিল। মেঘ আনমনেই নেট অন করে ফেসবুকে ঢুকলো। অকস্মাৎ আবিরের পোস্ট দেখে চমকে উঠল। গতকাল বিয়ের বেশকয়েকটা ছবি আবির রাতেই তার আইডি থেকে পোস্ট করে ক্যাপশন লিখেছে,

প্রিয় সহধর্মিণী,

আমার অলীক কল্পনার সঙ্গী তুমি, গোধূলি লগ্নে বাড়ি ফেরার একান্ত অভিপ্রায়। তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস। আমার শূন্য হৃদয়ের পূর্ণতা তুমি, ব্যাকুল হৃদয়ের নির্জন নির্মলা। নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে। তোমার মায়াবী মুখের পানে চেয়ে, ভুলেছি সব যাতনা আনমনে। তোমার ঠোঁটের ঐ স্নিগ্ধ হাসি দেখে, আমার হৃদয়ের অন্তরালে নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভ চলে। তুমি আমার অবসন্ন মস্তিষ্কের প্রবলতা, নব্য স্বপ্ন দেখার অদম্য স্পৃহা। তোমাকে হাসাতে চেয়ে, বহুবার কেঁদেছি আড়ালে। তুমি আমার অপেক্ষার শেষ প্রহর, ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অমূল্য পুরস্কার। তোমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় নি আমি, দিয়েছি আবিরের বউয়ের স্বীকৃতি। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব।

ইতি, 
তোমার আকাঙ্ক্ষিত স্বামী 

মেঘ ক্যাপশন পড়ে ৫ মিনিটের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ৫ মিনিট পর মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। গতকাল পার্লার থেকে সেজে যাওয়ার পর থেকে নিজেকে কেমন লাগছে সেটা দেখার সুযোগ ই পায় নি, বিয়ের ছবি পর্যন্ত দেখে নি তবে কয়েক ঘন্টায় আবিরের মুখ থেকে হাজারখানেক প্রশংসা সহ আবিরের দুর্বৃত্ত কথা শুনতে হয়েছে। সুযোগ পেলেই মেঘের কানের কাছে ফিসফিস করে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি জাহির করেছে আর মেঘ শুধু আবিরের পাগলামিই দেখে গেছে। এমনকি কবুল বলার সময় আবিরের অস্থিরতা দেখে মেঘ নির্বাক ছিল, নিষ্পলক চোখে কেবল তাকিয়েই ছিল। মিনিমাম লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আবির উচ্চশব্দে বলছিল,

"পৃথিবীর যা কিছুর বিনিময়েই হোক, আমি সবকিছু দিতে রাজি হয়েই মেঘকে বউ হিসেবে কবুল করলাম।

আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।"

যেখানে একবার কবুল করলাম কিংবা আলহামদুলিল্লাহ কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় সেখানে আবির বলেই যাচ্ছিলো। আবিরের কাণ্ড দেখে কাজী সাহেবও না হেসে পারলেন না। কাজীর মুখে হাসি দেখে আবির পরপর উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

" আমাদের বিয়ে হয়েছে তো?" 

কাজী সাহেব উঠে যেতে যেতে বললেন,
" আলহামদুলিল্লাহ, এতদিনে পরিপূর্ণ হয়েছে।"

"আলহামদুলিল্লাহ। "

কাজী চলে যেতেই আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,

"এই ভরাট মজলিসে সবাইকে সাক্ষী রেখে আমি আবির তার মেঘকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। মেঘ কি আবিরকে স্বামী হিসেবে কবুল করছে?"

মেঘ আবিরের ঝলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে মোলায়েম কন্ঠে জবাব দিয়েছিল,

" কবুল করলাম, আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।"

 আবিরের পাগলামি সেখানেই থামেনি। গতকাল বাসায় ফেরার সময় আবির হঠাৎ ই মেঘের কানে ফিসফিস করে বলছিল,

" চিরদিনের জন্য শ্বশুর বাড়িতে চলে যাচ্ছিস এবার একটু কান্না কর। মানছি একই বাড়িতে যাচ্ছিস তাই বলে কাদঁবি না?"

মেঘ ভেঙচি কেটে বলেছিল,
"আপনার যদি এতই শখ থাকে তাহলে আপনি কান্না করেন।"

প্রতিত্তোরে আবির বলেছিল,
"তুই নববধূর মতো কান্নায় ভেঙে পড়বি, নতুন জামাইদের মতো আমি তোকে সান্ত্বনা দিব। এটা আমার জীবন থেকে মিস হয়ে গেল। এক কাজ করি, চল দুজন একসঙ্গে কান্না শুরু করি।"

গতকাল আবিরের আজগুবি কথা শুনে মেঘ কপাল কুঁচকালেও আজ কথাগুলো মনে করে আনমনে হেসে ফেলল। পুনরায় ছবি দেখায় মনোযোগ দিল। নিজের পড়নের মেরুন রঙের বিয়ের বেনারসি, গা ভর্তি ভারী গহনা, মাথায় ঘোমটা সহ চোখধাঁধানো আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা দেখে মেঘ নিজেই লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে রাজোচিত শেরওয়ানিতে আবিরকে যেন রাজপুত্রের মতো লাগছে। গতকাল আবিরের অযাচিত দুষ্টামির জন্য সামনাসামনি ঠিকমতো দেখতেই পারে নি তবে আজ ছবিগুলো খুব ভালো করে দেখছে। আয়নায় দু'জনের মুখ দেখা, মেঘের কপালে আবিরের চুমু দেয়া, একে অপরের চোখে চোখ রেখে নিগূঢ় ঘোরে বন্দি থাকা, বরণের ছবি সহ আরও ২-৩ টা ছবি আপলোড করেছে। মেঘ সবগুলো ছবি দেখা শেষে কৌতূহল বশত কমেন্টস দেখতে গেল। আবিরের বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই, রাকিব, সাকিব, তানভির, মাইশা আপু সহ সবাই নিজেদের মতো অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি উস্কানিমূলক মন্তব্যও করেছে। কারো কারো মন্তব্য দেখে মেঘ বেশ বিস্মিত হচ্ছে। এরমধ্যে বন্যা আসছে। মেঘের লাজুক হাসি দেখে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,

"হাসছিস কেন? ভাইয়ার পোস্ট দেখে?"

মেঘ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
" তুই কিভাবে জানিস?"

" শুধু আমি না বাড়ির সবাই এখন ভাইয়ার পোস্ট নিয়ে গবেষণা করছে, নিচে গেলেই বুঝতে পারবি।"

মেঘ শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
" তুই খেয়েছিস?"

"না। তোকে ডাকতেই আসছিলাম, তুই ফ্রেশ হয়ে আয় একসাথে খাব।"

"আচ্ছা। "

বন্যা মীমের রুমে চলে গেছে। ইদানীং মেঘ ব্যস্ত থাকায় বন্যার মীম আর আইরিনের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। দু'জনেই তানভিরের কথা জানে তাই তানভিরের হাত থেকে বন্যাকে সবসময় প্রটেক্ট করে। ড্রয়িং রুমে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে আবির। রান্না ঘরে রান্নার আয়োজন চলছে, ইকবাল খান ছাদ থেকে নেমে আবিরকে এভাবে বসে থাকতে দেখে কিছুটা উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

"কিরে আবির, এভাবে বসে আছিস কেন?"

আবির চোখ খুলে কাকামনিকে একপলক দেখে পূর্বের অবস্থায় থেকে উত্তর দিল,

" আমার মনটা খুব খারাপ। "
 
ইকবাল খান নেমে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে শুধালেন,

" মন খারাপ কেনো? বিয়ে তো সবাই মেনেই নিয়েছে। তাহলে মন খারাপ কেনো থাকবে?"

আবির তপ্ত স্বরে বলতে শুরু করল,
" মন খারাপ থাকবে না কেন? মানুষ এলাকা ছেড়ে দু-এক বছর বাহিরে থাকলেই কথা,আচরণ, চলাফেরা সব বদলে যায় সেখানে ২০-৩০ বছর ঢাকা শহরে থেকে এখনও গ্রামের কি সব আজগুবি নিয়মনীতি পালন করছে। বিয়ের পর বউ আলাদা কেনো থাকবে? এতবছর অপেক্ষা করে, নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে, আল্লাহ র কাছে চাইতে চাইতে মেঘকে পেয়েছি, কেউ কি জানে সেটা? কিছুদিন যাবৎ এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ আমার ইমোশন নিয়ে প্রতিনিয়ত খেলতেছে তারপরও আমি চুপ করে আছি। আমি যদি ঘুনাক্ষরেও এসব টের পেতাম তাহলে মেঘকে নিয়ে আগেই পালিয়ে যেতাম। তোমরা যা করছো তা আমি কখনো ভুলবো না৷ আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।"

ইকবাল খান শীতল কন্ঠে বললেন,
" এভাবে বলছিস কেনো, একেক এলাকার একেক রীতি। একটু আধটু মেনে নিতেই হবে।"

আবির কিছু বলার আগেই পেছন থেকে আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,

" তোমার নিন্দা জানানো শেষ হলে বাহিরে আসো, কাজ আছে।"

আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির চমকে উঠে পেছনে তাকালো। আব্বুর রাগী রাগী চোখমুখ দেখে নিজের মুখ চেপে ধরল। আলী আহমদ খান কখন এসেছে আর ঠিক কতটুকু কথা শুনেছে এটা ভেবেই আঁতকে উঠছে আবির। ইকবাল খানের সাথে আবিরের ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক হওয়ায় যা ইচ্ছে বলে দিতে পারে কিন্তু আব্বুর সামনে সে যথাসাধ্য ভদ্র থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ এভাবে ধরা পড়ে যাবে সেটা কল্পনাও করতে পারে নি। আবির মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে। ইকবাল খান আলী আহমদ খানের মুখের পানে চেয়ে মলিন হাসলেন আলী আহমদ খানও নিঃশব্দে হেসে বেড়িয়ে গেছেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ নিচে নামলো। মেঘকে দেখেই রাকিব অকস্মাৎ বলে উঠল,
"এইযে ভাবি, আমার বন্ধুর ১৬ বছরের অব্যক্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে লেখা খোলা চিঠি পড়ে আপনার অনুভূতি কি?"

মেঘ শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় দিয়ে চিবুক নামিয়ে লাজুক হাসলো। রিয়া রাকিবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

" ভাইয়া সবেত প্রকাশ করেছে, মেঘকে অনুভব করার সময় দাও। বিয়ের ঘোরটা আগে কাটুক তারপর জিজ্ঞেস করো।"

" ঠিক আছে জান। তুমি যা বলবে তাই হবে৷ "

রিয়া ঠোঁট বেঁকিয়ে রাগী স্বরে বলল,
" হঠাৎ এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসছে?"

"রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে কল্পনা করে আবির যেভাবে চিঠিটা লিখছিল সেটা দেখে আমারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল তোমাকে নিয়ে একটা চিঠি লেখার। কিন্তু বিশ্বাস করো  
'তুমি ফাল্গুনের সেই রক্তিম শিমুল ফুল, আমার হৃদয়ের..'
এরপর আর কিছু ভেবেই পাচ্ছিলাম না। ৩০ মিনিট ভেবেছি, তানভিরকে নিয়ে গবেষণা করেছি কিন্তু লাইনটা আর সম্পূর্ণ করতে পারি নি। তারপর মনে হলো, কবিতা আর চিঠি লেখার থেকে সকাল সন্ধ্যা 'বাবু খাইছো?' জিজ্ঞেস করাটা খুব সহজ সমাধান। "

রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
" তুমি আসলেই একটা আনরোমান্টিক।"

রাকিব হেসে উত্তর দিল,
" বিয়ে করেছি ৬ মাস হতে চলল, এখনও আমি কত রোমান্টিক দেখেছো? তুমি বললে শিমুল ফুল না দিতে পারলেও কচুরিফুল ঠিকই দিতে পারবো। আর কি চাও? "

রিয়া রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,
" তুমি আপাতত চোখের সামনে থেকে যাও।"

"আজকাল ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। নিজের বিয়ে করা বউও বলে আমি নাকি আনরোমান্টিক। ধিক্কার জানায়। "

"কাকে ধিক্কার জানাচ্ছো?"

"নিজেকেই।"

রিয়া সহসা হাসতে শুরু করেছে, সেই সাথে মেঘও হাসছে। আবির এসে রাকিবের কাঁধে হাত রেখে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,
" কি হচ্ছে এখানে?"

আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ আড়চোখে তাকালো।আবিরকে এক পলক দেখেই লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। গতকালও এত লজ্জা পায় নি যতটা লজ্জা আজ পাচ্ছে, অবিলম্বে ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল।
রাকিবের সাথে দু একটা কথা বলে, আবির মেঘের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,

"আসসালামু আলাইকুম। "

লজ্জায় আড়ষ্ট মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। "

"শুভ সকাল, বউ।"

"শুভ সকাল। "

রাকিব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
" তোর বউ এটা আমরা সবাই জানি তাই বলে সারাদিন বউ বউ করবি?"

" ভাবছি, কিছুদিন দিনরাত এক করে শুধু বউ ই ডাকব।"

মাহমুদা খান মালিহা খানের রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে ভারী কন্ঠে বললেন,
" আবির তোর কি কোনো কাজ নেই? সকাল সকাল মেঘকে জ্বালাচ্ছিস কেনো?"

আবির কপাল কুঁচকে, ঠোঁট বেঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
" আমি কোথায় জ্বালিয়েছি? এতক্ষণ কাজ করে কেবল ই আসলাম। ফুপ্পি তোমার আমার সাথে কিসের শত্রুতা বলো তো, আব্বুর সাথে তুমিও এমন আচরণ শুরু করেছো কেনো? তোমাদের থেকে তো আমার শ্বশুরই ভালো, মেয়ে খেয়েছে কি না দেখতে আমাকে জোর করে পাঠিয়েছেন। আর তোমরা?"

মাহমুদা খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,
" ভাইজান খুব সহজে মেনে নিয়েছে তো তাই কিছু বুঝতে পারছিস না, ভাইজানের ধমক না শুনা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিস না। তাই না? তোর আচরণে কোনো কারণে ভাইজান যদি রেগে যান, বাড়ি ভর্তি মেহমানের সামনে চিৎকার চেঁচামিচি করেন বিষয়টা কি ভালো লাগবে? তার থেকে ওনি শান্ত আছেন তুইও একটু শান্ত থাক। "

"ঠিক আছে, থাকলাম শান্ত।"

আবির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
" বউ তুমি খেয়ে নেও হ্যাঁ, তোমার ফুফু শ্বাশুড়িটা ভালো না। একদম মহিলা হি*টলা*রের মতো আচরণ করছেন। আমি এখন পালায়। " 

আবির এক দৌড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে, রাকিবও হাসতে হাসতে চলে গেছে। মাহমুদা খান হেসে বললেন,
" মেঘ, খেতে বস। আমি ওদের ডেকে নিয়ে আসি।"

একটু পরেই সবাই খেতে নেমেছে। মেঘকে দেখেই জান্নাত বলে উঠল,
"তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস।"

পাশ থেকে আইরিন বলল,
" ভাবি এইটা না, আমার ঐ লাইনটা বেশি ভালো লেগেছে।
নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে।"

রিয়া মৃদুহেসে বলল,
" তোমরা শুধু শুধু মেঘকে জ্বালিয়ো না। মেঘ আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব। তুমি একদম মন খারাপ করবে না কেমন!"

ওদের দুষ্টামিতে মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই পারছে না। এরমধ্যে মালা এসে একটা চেয়ার টেনে বসলো। আইরিন মজার ছলে জিজ্ঞেস করল,

" মালা আপু, আপনার কোন ডায়লগ টা ভালো লেগেছে?"

"কিসের ডায়লগ?"

" আবির ভাইয়া মেঘ ভাবিকে নিয়ে ফেসবুকে খোলা চিঠি লিখেছে। আপনি দেখেন নি?"

মালা আইরিনকে দেখে পরপর মেঘের লজ্জামাখা আদলের পানে তাকালো। মনে মনে বিড়বিড় করল,

"আমাকে ব্লক করে রাখলে কিভাবে দেখবো।"

আইরিন আবার জিজ্ঞেস করল,
"দেখেন কি?"

মালা বিরক্ত হয়ে বলল,
" খেয়াল করি নি।"

আবারও মনে মনে বিড়বিড় করল,
" এসব আজাইরা ভালোবাসা দেখলেই শরীর টা জ্বলে। "

বউভাত উপলক্ষে মেঘ আজ অফ হোয়াইট রঙের মধ্যে গোল্ডেন স্টোনের একটা গর্জিয়াছ লেহেঙ্গা পড়েছে। আবির মেঘের সাথে ম্যাচিং করে অফ হোয়াইট রঙের স্যুট পড়েছে। বাকিরাও যে যার মতো সেজেছে। মালা আজ হুট করে একটা গর্জিয়াছ শাড়ি পড়েছে। মালার সাজ দেখে সাকিব মেকি স্বরে বলল,

"ছ্যাঁকা খেয়ে মানুষকে ঘরের দরজা বন্ধ করে সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী কাঁদতে দেখেছি অথচ তুই তা না করে নাচতে নাচতে বিয়ে খেতে চলে আসছিস। তোর কি মিনিমাম লজ্জা নেই?"

"লাজ লজ্জা ধুয়ে কি শরবত খাবো নাকি? আর একটা কথা শুনে রাখ, আমি চাইলেই আবির ভাইয়াকে বিয়ে করতে পারতাম কিন্তু আমি মেঘের মতো এত উন্মাদ না যে আমার আবির ভাইকেই লাগবে। "

সাকিব ফিক করে হেসে বলল,
"কথায় আছে, পাগলের সুখ মনে মনে। আর কি কি বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস জানাইস আমাকে। প্রয়োজনে আমি আরও কিছু এড করে দিব। আর রইল বাকি মেঘবতীর পাগলামির কথা, আবির ভাইয়া দেশে আসছেই মেঘকে পাগল করতে। ১৪ বছর তো একায় পাগলামি করে গেল। ভাইয়ার কি ইচ্ছে হয়না মেঘবতী তার জন্য একটু পাগলামি করবে, বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকবে, তাকে দেখার জন্য বা একটু কথা বলার জন্য উতলা হয়ে থাকবে, তার দিকে কেউ তাকালে অগ্নিকন্যার রূপ নিবে, মূল কথা ভাইয়াকে পাগলের মতো ভালোবাসবে। মেঘবতীর মনে প্রবল প্রমত্ততা জাগাতে ভাইয়া ই সব করেছে। তাই তোর চোখে মেঘবতী উন্মাদ হলে আবির ভাইয়া তার গুরু।"

মালা রাগে কটমট করে চলে যেতে নিলে অলক্ষিতভাবে লিমনের সাথে ধাক্কা খেল। মালা মাথায় হাত দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,
" আপনি কি চোখে দেখেন না?"

লিমন মালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল 
" মাঝে মাঝে একটু কম ই দেখি। "

মালা রাগে ফোঁস ফোঁস করে চলে গেছে। মাইশা আপু আর ওনার হাসবেন্ড আজ দুপুরেই আসছেন। আবির কল দিতে দিতে অনেক কষ্টে আপুকে রাজি করিয়েছে। মেঘ আপুকে দেখেই আহ্লাদী কন্ঠে বলল,

" আপু মনে আছে তো, বাবুকে কিন্তু সর্বপ্রথম আমার কোলে দিতে হবে।"

"হ্যাঁ গো মনে আছে। দোয়া করো, বাবু সুস্থভাবে হলে তোমার কোলেই প্রথমে দিব।"

মেঘ এক গাল হেসে বলল,
"ঠিক আছে।"

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে আনমনে হাসলো। মেঘ বিষয়টা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,

"হাসছেন কেন?"
" এমনিতেই। "
"বলুন।"
"রাতে বলব।"
"না, এখনই বলুন।"

"I love you. I want to hug you. I wanna kiss you."

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের হাতে চিমটি কেটে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
" চুপ করুন।"

" এখন তো চুপ করতেই বলবি। অফিসিয়াল বিয়ের ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে অথচ এখনও অফিসিয়াল আলিঙ্গনটায় করতে পারলাম না।"

মেঘ নিজের কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করল,
" এত নির্লজ্জ কবে হলেন আপনি?"

" তোকে বিয়ে করার পর । "

সারাদিনের অনুষ্ঠান শেষে বিকেলের দিকে অনেক আত্মীয় স্বজনই চলে গেছেন। এশা পর্যন্ত সবাই মোটামুটি ব্যস্ত ছিল। এশার নামাজ পড়ে মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান একসাথে চা খেতে বসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবির আর ইকবাল খানও এসেছেন। তানভির, সাকিব,রাকিব, আরিফ মিলে বাসরঘর সাজাচ্ছে। গতকাল তানভির বোনের পক্ষে থাকলেও আজ সে আবিরের পক্ষে। আবির নামাজ থেকে এসেই নিজের রুমে চলে গেছে। ভুল করেও কেউ যেন লাল গোলাপ না লাগায় তারজন্যই মূলত দেখতে গেছে। ফুল কিনতে যাওয়ার আগেই তানভিরদের বার বার বলে দিয়েছে ভুলেও যেন লাল গোলাপ না আনে। মিনহাজ মেঘকে লাল গোলাপ দেয়ার মতো বিশাল অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আবির সেই রাগ মিনহাজের উপর না দেখিয়ে গোলাপের উপর দেখাচ্ছে। বিয়ে উপলক্ষে আবিরের রুম সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়েছে। আবিরের শৈশব-কৈশোরের যত স্মৃতি ছিল, সব সরিয়ে একদম ফাঁকা করে দিয়েছে৷ বিয়ের ঝামেলা মিটলে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র এনে রুম সাজানো হবে। গায়ে হলুদের দিন থেকে আবির আব্বু চাচ্চুর মুখোমুখি বসে নি। অবশেষে আজ আবির আব্বুর চাচ্চুর পাশে গিয়ে বসেছে।
 
মোজাম্মেল খান চিন্তিত স্বরে বললেন,
" কিছু বলবে?"

"জ্বি।"
"বলো।"

" আপনাদের পরিকল্পনার বাহিরে আমি যে কাজগুলো করতে বলেছিলাম সেগুলোর খরচ জানতে চাচ্ছিলাম। আমি পেমেন্ট দিয়ে দিচ্ছি সম্ভব হলে রাতে বা সকালের মধ্যে পরিশোধ করে দিবেন। "

আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
" তোমার দিতে হবে না।"

" আব্বু, আমি আগেই বলে রেখেছিলাম। অন্ততপক্ষে আমার পরিকল্পনাগুলোর টোটাল পেমেন্ট আমি করব।"

মোজাম্মেল খান আস্তে করে বললেন,
" আচ্ছা তুমিই করো। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। ইমারজেন্সি সবার পেমেন্ট করে ফেলেছি। আর যারা নেয় নি তাদের কাল পরশুর মধ্যে দিয়ে দিব।"

"আমি হিসাবটা দেখতে চাচ্ছিলাম, চাচ্চু।"

" আমার কি কপাল, মেয়ের জামাই কত সুন্দর করে চাচ্চু বলে ডাকছে।"

আবির মৃদু হেসে মেকি স্বরে বলল,
"মেঘের মতো আমিও কি আব্বাজান বলে ডাকবো?"

আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান এবং ইকবাল খান তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ চারজন মিলে হিসাব করছে। এদিকে জান্নাত আর রিয়া মিলে মেঘকে সাজাচ্ছে আর বাসরের নিয়মকানুন শিখিয়ে দিচ্ছে। মেঘের মনে ভয়, লজ্জা, আতঙ্কের সাথে সাথে এক অজানা ভালোলাগাও কাজ করছে। রাত ১০ টার পর পর ওদের সাজানো শেষ হয়েছে। আবিরের নিষেধাজ্ঞা থাকায় লাল গোলাপ ছুঁয়েও দেখেনি। গাদা, বেলি, কাঠগোলাপ, ৩-৪ রঙের জারবেরা, জিনিয়া সহ যে যে ফুল পেয়েছে সব দিয়েই সাজিয়েছে। সাজানো শেষেই মেঘকে নিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর বসিয়েছে। মেঘের সামনে ফুলের পাঁপড়ি দিয়ে একটা লাভ এঁকে তাতে A আর M লিখেছে। তারপর শুরু হয়েছে দল ভাগাভাগি, কয়েকজন আবিরের পক্ষে থাকলেও বেশিরভাগই মেঘের পক্ষে। তানভির আজ আবিরের পক্ষে শুনে বন্যা রাগী রাগী মুখ করে বলল,

" আপনি দু'মুখো সাপের মতো আচরণ করছেন কেনো?"

তানভির হেসে বলল,
" বোনের বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই বোন শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। ভাগ্য ভালো আমার বোন আমার চোখের সামনে আছে। বনুর শ্বশুর বাড়ি অন্য কোথাও হলে আজকের বাসরঘর সাজানো অসম্ভব ছিল। তাছাড়া বড় ভাই হয়ে ছোট বোনের বাসর আটকানো টা তেমন শোভা পায় না।"

বন্যা আর কিছু বলে নি। এদিকে আবিরদের হিসাব নিকাশের এক পর্যায়ে মোজাম্মেল খান বললেন,
" অনেক তো হিসেব দেখলে এখন বরং যাও তুমি। "

আবির ঘাড় ঘুরিয়ে মালিহা খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
" আম্মু, তোমাদের যা যা নিয়মকানুন আছে তাড়াতাড়ি শেষ করো। আমার ঘুম পাচ্ছে। "

মোজাম্মেল খান অকস্মাৎ কাশতে শুরু করলেন।
ইকবাল খান আবিরের হাত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
"বাবা-চাচারা আছে, কথাবার্তা একটু সাবধানে বল।"

আবির ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করল,
" গত দু'রাতে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি নি। এখন বিয়ে করেছি বলে কি ঘুম পেলেও বলা যাবে না?"

আবির নিশ্চুপ দেখে মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
" বাকিগুলো সকালে দেখে নিও।"

আবির তপ্ত স্বরে বলল,
"আর কিছু দেখতে হবে না। যা লাগবে তানভিরকে বললেই হবে। "

মাহমুদা খান এসে মৃদুস্বরে বললেন,
" আবির, তুই এখন রুমে যেতে পারিস।"

আবির হঠাৎ ই কেমন যেন লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় উঠে যেতে পারছে না। আলী আহমদ খান অকস্মাৎ বকে উঠলেন,
" এত লজ্জা পেতে হবে না, যাও। "

আবির মাথা নিচু করে উঠে রুমের দিকে চলে গেছে। রুমের সামনে যথারীতি দু’দল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তানভির আবিরের দলের হওয়া স্বত্তেও ওরা জোরপূর্বক তানভিরকে রুমের ভেতরে রেখেছে। আবির দরজা থেকে উঁকি দিয়ে বিছানাটা দেখে নিল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নববধূ বিছানায় বসে আছে। আবির বাকিদের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"কি চাই?"

"তেমন কিছু না। "

রাকিব আবিরের পাশ থেকে বলে উঠল,
" আজ যত ইচ্ছে দে আমি বারণ করব না। কারণ, বাসর আমিও সাজিয়েছি তাই ভাগ আমিও পাবো। "

আবির রাকিবের দিকে তাকিয়ে হাসলো। আইরিন অকস্মাৎ বলে উঠল,
" ভাইয়া তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে আমাদের বিদায় করো।"

আবির শান্ত কন্ঠে বলল,
"তোরা কত চাস সিদ্ধান্ত নিয়ে তানভিরের কানে কানে বল।" 

আইরিন, জান্নাত, রিয়া, মীম, বন্যা ফিসফিস করে কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে তানভিরকে জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বলল,
" সিদ্ধান্ত ফাইনাল?"
"হ্যাঁ।"
"এখন সামনে থেকে সরো।"
" কেনো সরবো? আগে টাকা দিবে তারপর যাব।"

আবির তপ্ত স্বরে বলল,
"আমি যেতে বলি নি আপু, সরতে বলেছি। বউ না দেখে আমি তোমাদের কিছু দিতে পারছি না ।"

"বউ দেখে ফেললে তো শেষ ই।"

"তোমরা যেমন আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না তেমন আমিও পারছি না। আমার বউ এর জায়গায় অন্য কাউকে যে বসিয়ে রাখো নি তার কি গ্যারেন্টি আছে? তোমাদের সহজ সমাধান দিয়েছি, তোমাদের এমাউন্ট আমি না জানলেও তানভির জানে। আমার বউ ঠিকঠাক থাকলে তোমরা তোমাদের প্রাপ্য পেয়ে যাবে। আগে বউ দেখব তারপর টাকা দিব। এখন তোমরা ভেবে দেখো। "

"ঠকাবে না তো?"

" তোমরা আমাকে না ঠকালে আমিও তোমাদের ঠকাবো না। "

"ঠিক আছে। "

ওরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই আবিরকে রুমে ঢুকতে দিয়েছে। আবির রুমে ঢুকেই মেঘকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলো। মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় সালামের উত্তর দিয়েছে। এতক্ষণ যাবৎ মেঘ শান্ত থাকলেও এখন আর শান্ত থাকতে পারছে না, আবির যত কাছাকাছি আসছে মেঘের শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন তত বেড়ে যাচ্ছে, ঢোক গিলে বার বার নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। আবির কিছুটা ঝুঁকে খুব যত্নসহকারে আস্তেধীরে মেঘের ঘোমটা উঠালো, লজ্জায় রাঙা মেঘের নামানো চিবুক দেখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালো। আবির সহসা দু'আঙুলে মেঘের চিবুক উঠালো। আবিরের শক্ত হাতের কোমল স্পর্শে মেঘের শীর্ণ অধর থরথর করে কাঁপছে, হৃদয়ের তোলপাড়ে নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, ঘন ঘন পল্লব ঝাপ্টে নিভু নিভু চোখে আবিরের দিকে তাকাতেই আবির সহসা বুকের বা পাশে হাত রেখে নেশাক্ত কন্ঠে বলল,

"হায়! মাশাআল্লাহ। "

সঙ্গে সঙ্গে বিছানার উপর লাভ লেখা অংশে ধপ করে পড়ে গেছে। মীম, আদি,আইরিন কিছুটা আতঙ্কিত হলেও বাকিরা আবিরের কাণ্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। মেঘ কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে আবিরের মুখের দিকে তাকালো। আবির আচমকা কাত হয়ে মেঘের দিকে ঘুরে হাতের উপর মাথা রেখে মৃদুগামী কন্ঠে বলল,

"অবশেষে, আবিরের একান্ত চাঁদ 
আবিরের রুমে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।"

মেঘ লজ্জায় চোখ সরিয়ে করে ফেলেছে। আবির পকেটে হাত দিয়ে যতগুলো ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট পেয়েছে সব মেঘের হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে দিয়েছে। রিয়া হাসিমুখে বলল, 

" ভাইয়া আপনার চাঁদকে সারাজীবনের জন্য আপনার রুমে রেখে গেলাম। আপাতত আমাদের দিক টা একটু ভাবুন।"

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
" ওরা কিছু চাচ্ছে, দিব?"

মেঘ কিছুই বলছে না, চুপচাপ বসে নিজের হৃৎস্পন্দন গুনছে। আইরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
" এটা কিন্তু কথা ছিল না। তুমি বলেছো ভাবিকে দেখেই দিয়ে দিবে। "

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠল,
" আমি আমার বউয়ের অনুমতি ব্যতীত কিছু দিতে পারছি না, সরি। "
 
সবাই মেঘকে রিকুয়েষ্ট করছে কিন্তু মেঘ মুখ ফুটে কিছু বলতেই পারছে না। আবির মৃদু হেসে পুনরায় প্রশ্ন করল,
" কি হলো? দিয়ে দিব?"

মেঘ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

" তোমাদের এমাউন্ট কত ছিল আমি জানি না আর জানতেও চাই না। আমার বউ যেহেতু সম্মতি দিয়েছে তাই তোমরা যা চেয়েছো তার ডাবল পাবে। "

তানভিরের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
" তানভির, ওদের এমাউন্ট বুঝিয়ে দিবি।"

"জ্বি ভাইয়া।"

জান্নাত, রিয়া একসঙ্গে বলে উঠল,
"ইসস, এত বড় মিস্টেক কিভাবে করলাম। আগে জানলে আরও বেশি চাইতাম। "

আইরিন বলল,
" আমরা এখন নতুন করে এমাউন্ট চাইবো।"

আবির মুচকি হেসে বলল,
" সুযোগ একবার ই দিয়েছি সেই সুযোগ আর পাবে না। এখন সবাই যাও এখান থেকে।"

রাকিব আবিরের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলেই দৌড়ে বেড়িয়ে গেছে। বাকিরাও যে যার মতো চলে গেছে। বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বেড়িয়েছে। তানভির আগেই বেড়িয়ে গিয়েছিল, আবির দরজা বন্ধ করতে যাবে অকস্মাৎ তানভির হাজির হলো। আবির শক্ত কন্ঠে বলল,

"আবার কি?"

তানভির মেঘকে এক পলক দেখে নিল। মেঘ মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,

" ভাইয়া, আমার বোনটা কিন্তু এখনও ছোট। তোমার অনাবশ্যক ভালোবাসাকে একটু কন্ট্রোলে রেখো, প্লিজ।"
আবির ভ্রু গুটিয়ে সরাসরি তানভিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বিড়বিড় করল,
" তুই না আমার সম্বন্ধী?"

তানভির নিঃশব্দে হেসে অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,
"তুমি না আমার ভাই? তাছাড়া পুরো পৃথিবী জানে তুমি আমার বন্ধু টাইপের ভাই তাই আমার সবদিক থেকে পারমিশন আছে।"

আবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
" জ্বি ভাই, বুঝতে পেরেছি। বলছিলাম কি ভাই আপনি পারমিশন দিলে আমি আপনার বোনের সাথে একান্তে কিছুটা সময় কাটাতাম। পারমিশন দিবেন, ভাই?"

"জ্বি ভাই, আপনার জন্যই এত আয়োজন। বেস্ট অফ লাক, বাই। "

তানভির চলে যাচ্ছে, আবির মুচকি হেসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। দরজা বন্ধের শব্দে মেঘের শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠেছে, মাথা নিচু করে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো, ঠোঁটে লেগে আছে দুষ্টু হাসি। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মেঘের কাছে, আবিরের তৃপ্ত দুচোখ চকচক করছে। উৎকণ্ঠায় মেঘের চিবুক নেমে গলায় ঠেকেছে, ক্ষীণ বক্ষের তীব্র কম্পনে শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। আবির আগপাছ না ভেবেই আচমকা মেঘের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরেছে। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মেঘ চমকে উঠে, বুকের ভেতর পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, হাত-পা সহ সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। আবির অকস্মাৎ জামা-কাপড়ের উপর দিয়ে মেঘকে জড়িয়ে ধরে পেটে মুখ গুঁজল। আবিরের অবাঞ্ছিত স্পর্শে মেঘের জোড়াল বক্ষস্পন্দন আরও বেশি জোড়ালো হতে শুরু করেছে, নিরবে ঢোক গিলে এলোমেলো নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আবির ভয়ঙ্কর আবেশে আবদ্ধ, সুদীর্ঘ অবকাশের অস্ফুট প্রণয়ের অফিসিয়াল অনুমোদন পেয়েছে আজ। মেঘের শরীর থেকে আসা বিমুগ্ধকারী ঘ্রাণটা আবিরের নাসারন্ধ্রের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে, আবির এক মনে সেই ঘ্রাণটা উপলব্ধি করছে। মেঘের অভিমানে নাক ফুলানো, গায়ের তীব্র গন্ধ, দরদী স্পর্শ, আহ্লাদী কন্ঠের আবদার পূরণের পরিপূর্ণ অধিকার পেয়েছে আজ। এই মেঘ একান্ত আবিরের, পৃথিবীর আর কারো সাধ্য নেই যে আবিরের কাছ থেকে তার মেঘকে দূরে সরাবে। আজ ছোট্ট মেঘের আদুরে কন্ঠে বলা কথাগুলো আবিরের খুব মনে পড়ছে, অকস্মাৎ পেট থেকে মুখ সরিয়ে ঘাড় কিছুটা ঘুরিয়ে মেঘের অভিমুখে তাকালো। মেঘের বন্ধ চোখের পাতা আর কম্পিত অধর দেখে আবির আনমনে হেসে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল,

" তুমি আমার বহু প্রতীক্ষিত একান্ত অভিলাষ, 
হৃদয়ের মনিকোঠায় সঙ্গোপনে রাখার নির্মম প্রয়াস। আমার অবিচ্ছেদ্য প্রণয়ের উত্তাপ তুমি, 
সকাল- সন্ধ্যা সর্বনাশের কারণটাও শুধু তুমি।"

মেঘের সংকোচ কোনোভাবেই কাটছে না, চোখ খুলে আবিরের দিকে তাকাতেও পারছে না। আবির মুচকি হেসে ডাকল,

"ওগো অপরূপা, 
চেয়ে দেখো না মনোরমা। "

মেঘ কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আবিরের একের পর এক ভাবপ্রবণ কথা শুনে মেঘের অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতরে চলমান ইতস্ততা কাটিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল । আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আবির অকস্মাৎ স্ব শব্দে হেসে উঠল। আবিরের প্রাণোচ্ছল হাসি দেখে মেঘ না হেসে পারল না। আবির হাসি থামিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তপ্ত স্বরে শুধালো,
" আমাকে পেয়ে খুশি তো?"

মেঘ মাথা দুলিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
" আলহামদুলিল্লাহ, অনেক খুশি। আপনি?"

আবির আবারও মৃদু হাসলো। মেঘের কোল থেকে উঠে মুখোমুখি বসল। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরে কোমল কন্ঠে বলতে শুরু করল,

" আলহামদুলিল্লাহ আজ আমি খুব খুশি। কারণ আমার স্পেরোকে দেয়া কথা আজ পরিপূর্ণভাবে রাখতে পেরেছি। ছোট্ট স্পেরোর সেই আহ্লাদী কন্ঠে বলা কথাটা, "আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না" স্পেরো ভুলে গেলেও আমি ভুলতে পারি নি। গত ১৬ টা বছর আমি শুধু এই একটা কথার জোরেই সব বিপত্তিতে টিকে ছিলাম। আজ আমার স্পেরোকে আবারও বলতে চাই, আমি ছেড়ে যায় নি কোথাও যায় নি। তোমার আবির তোমারই আছে। তুমি সেদিন শুধু বলেছিলে, "ছেড়ে যেও না" অথচ আমি বুঝেছিলাম "তোমাকে ছেড়ে বাঁচতে পারবো না"। শেষ বিকেলে পাখিদের বাড়ি ফেরার তাড়া দেখে তুমি আবেগী কন্ঠে বলেছিলে, " ওদের মতো আমারও যদি আলাদা একটা বাড়ি থাকতো৷" আর আমি ভেবেছিলাম, "যেকোনো মূল্যেই হোক তোমাকে তোমার স্বপ্নের বাড়ি উপহার দিব" একবার খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম বলে তুমি শীতল কন্ঠে বলেছিলে, "খেলতে না গেলে তো ব্যথা পেতে না" আমি মনে মনে বলেছিলাম, " আজকের পর খেলতে যাব না" । জ্বরের ঘোরে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে তুমি বলেছিলে, "আমার কাছে থাকো" "আমিও থেকে গেলাম"। কোনো একদিন কোনোকারণে বাসায় আমাকে বকা দিচ্ছিলো দেখে তুমি সবার সামনে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলে, " আবির ভাইয়া শুধু আমার তোমরা কেউ কিছু বলতে পারবে না।" 
"আমি আবির সেদিনই তোমার হয়ে গিয়েছিলাম" 
 নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাঁচলে তোমার সাথেই বাঁচবো। "

মেঘ অবিশ্বাস্য চোখে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে, অতর্কিতেই বেড়েছে বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ। আবিরের কথাগুলো শুনে মেঘের চক্ষুদ্বয় কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ফর্সা,লাজুক আদল মুহুর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেছে, নাকের ডগায় মুক্তোর মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে। মেঘের উদ্বেজিত মনোভাব চোখে মুখে ফুটে উঠছে। যেই আবিরের প্রণয়ে আসক্ত মেঘ, সেই আবির মেঘের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল এতগুলো বছর। এটা ভেবেই মেঘের মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন শুরু হয়েছে। মেঘ অসহায় মুখ করে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
" আমি আপনাকে এতকিছু বলেছিলাম?"

আবির মেঘের দু'হাত নিজের দু গালে রেখে নিঃশ্বাস টেনে বলল,
"হুমমমমমমম"

"আমার মনে নেই কেনো?"

" কারণ তখন তুমি অনেক ছোট ছিলে। "

" আপনি কখনো বলেন নি কেনো?"

" ভালোবাসা মুখে বলে হয় না পাগলি, তোমাকে নিজ থেকে অনুভব করতে হতো। আর আমি সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম। "

মেঘ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
" আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেনো?"

" শুনতে খারাপ লাগছে?"

"কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আপনার মুখে তুই টায় মানায়। "

" অভ্যাস করো, এখন থেকে তুমিটায় বেশি শুনতে হবে।"

"কেনো?"

আবির মৃদুস্বরে বলল,
" আমার সম্বন্ধী আমাকে ভয়ঙ্করভাবে ওয়ার্নিং দিয়েছে, বিয়ের পর তোমার সাথে তুই তুকারি করলে আমার নামে মা*ম*লা দিবে। তানভিরের এসব তুই তুকারি একদম পছন্দ না, ওর সাথে কথা বললে সচরাচর তোমাকে তুই বলে সম্বোধন করি না তারপরও ভুলে যদি বলে ফেলি তখন দেখা যায় রাগে সারাদিন আমার সাথে কথায় বলে না। গতকাল রাতে আমাকে লাস্টবারের মতো ওয়ার্ন করেছে যেন কোনোভাবেই তুই না বলি। পার্সোনালি ঘরে দরজা বন্ধ করে তুই বললেও আমার সম্বন্ধী,বাবা মা, শ্বশুর- শ্বাশুড়ি কিংবা কোনো আত্মীয়ের সামনে কোনোভাবেই তুই বলতে পারবো না। "

মেঘ অভিনিবিষ্টের ন্যায় চেয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে শুধালো,
" আপনি ভাইয়াকে ভয় পান?"

"না। তোমাকে ভয় পায়। "

"মানে?"

আবির মেঘের হাত গাল থেকে নামিয়ে বুকের উপর রেখে বলতে শুরু করল,
" তোমাকে হারানোর ভয়ে আমার এইযে এইখানটা বারংবার কেঁপে উঠে। আবিরকে ধ্বংসের একমাত্র অস্ত্রই মেঘ। তানভির সহ আমার কাছের মানুষজন খুব ভালোভাবে জানে আমার জীবনে তোমার অস্তিত্ব ঠিক কতোখানি জুড়ে। আমাকে কোনোকিছুতে রাজি করাতে ব্যর্থ হলেই ইচ্ছেকৃত তোমার নাম নেয়। কারণ তারা জানে, তুমি আমার একমাত্র দূর্বলতা। এইযে তুমি কতশত কুসংস্কার মানো, কিছু হবে না জেনেও আবেগে নাচো। আমিও ঠিক তেমন, তোমার নামে কিছু শুনলে বুঝে না বুঝে রিয়েক্ট করি, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। অন্ততপক্ষে তোমাকে নিয়ে তানভিরের সাথে আমি কোনোরকম অসদ্ভাবে জড়াতে চাই না তাই ও যা বলেছে আমি মেনে নিয়েছি।"

আবিরের উৎকণ্ঠা দেখে মেঘ প্রতিনিয়ত আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মেঘ নির্বাক চোখে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে আবিরকে দেখছে। আবির কয়েক মুহুর্ত মেঘের মায়াবী আদলে চেয়ে থেকে আনমনে হেসে বলল,
" ম্যাম, এভাবে তাকিয়ে আমাকে আগেভাগেই দূর্বল করে দিবেন না। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। "

আবিরের কথায় মেঘের ভাবনার সুতো ছিঁড়েছে, কপালে ভাঁজ ফেলে মৃদুস্বরে বলল,
" কি কথা?"

"আগে নামাজ পড়ে রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করি তারপর বলবো। যাও, ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসো।"

আবির মেঘের হাত ছেড়ে বিছানা থেকে নামছে। এত কথোপকথনের ভিড়ে রিয়া আর জান্নাতের শিখিয়ে দেয়া নিয়মকানুনের কথা মেঘ ভুলেই গিয়েছিল। মেঘ ঝটপট বিছানা থেকে নেমে আবিরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে নিল কিন্তু সালাম করার আগেই আবির মেঘের দুই বাহু ধরে উঠিয়ে আলতোভাবে বুকে জড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"তোমার অবস্থান আমার পায়ে নয় হৃদয়ে। আজকের পর কোনোদিন পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার চেষ্টাও করবে না। মনে থাকবে?"

"জ্বি।"

আবির মেঘকে ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে। এদিকে মেঘ মনে মনে হাবিজাবি ভাবছে আর ব্যস্ত হাতে গহনা খুলছে। গলার একটা গহনাকে খুলতে গিয়ে চুলে টান পড়তেই মেঘ ব্যথায় 'উফফ' করে উঠেছে। আবির সহসা ফোন টেবিলের উপর রেখে মেঘের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
" কি হয়েছে?"

" চুলে টান লাগছে। "

" হাত সরাও, আমি দেখছি। "

মেঘ ভ্রু কুঁচকালো, তবে নিষেধ করল না। আবির খুব মনোযোগ দিয়ে মেঘের চুল সরিয়ে গহনা খুলে দিয়েছে। মাথায় লাগানো ক্লিপগুলো খুলতে খুলতে কর্কশ কন্ঠে বিড়বিড় করল,
" আগেই বলেছি রাতে এত সাজগোছ করতে হবে না তারপরও কেউ কথা শুনে না। "

আবিরের ঠান্ডা কন্ঠের অভিযোগে সম্বিত ফিরল মেঘের। চোখ ঘুরিয়ে আবিরকে এক পলক দেখে হালকা করে কেশে শীতল কন্ঠে ডাকল,
" আবির ভাই.."

অকস্মাৎ আবিরের সুপ্ত ক্রোধ চোখে ভেসে উঠেছে, মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
" মজা করেছি। "

আবির প্রতিত্তোরে কিছুই বলল না। মেঘ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতেই আবির চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেছে। যথারীতি দু'জন একসঙ্গে দু রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছে। নামাজ শেষ করে আবির মেঘের কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের সারাদিনের সব দুষ্টামি, খুনসুটি হঠাৎ ই পরিবর্তন হয়ে গেছে। কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আবিরের বুকের উপর মাথা থাকায় মেঘ স্পষ্টভাবে আবিরের হৃৎস্পন্দন টের পাচ্ছিল। মেঘ হঠাৎ ই তটস্থ কন্ঠে শুধালো,

" কি হয়েছে আপনার? আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?"

আবির ঘন ঘন ঢোক গিলছে, মেঘকে বিছানার পাশে বসিয়ে আবির ফ্লোরে বসল । মেঘ ব্যাকুল কন্ঠে বার বার প্রশ্ন করছে, আবির উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। আবির আচমকা বসা থেকে উঠে ওয়ারড্রব থেকে একটা ছোট বক্স বের করল। 'Abir' নাম লেখা একটা ডিজাইনিং লকেট বের করে মেঘের গলায় পড়িয়ে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বলল,

" এটা বাসর রাতের গিফট।"

মেঘ তৎক্ষনাৎ লাফিয়ে উঠে বালিশের নিচ থেকে একটা ঘড়ির বক্স বের করে আবিরকে দিয়ে বলল,
" এটা আপনার জন্য। "

আবির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
" বাসর রাতে গিফট দিতে হয় এটা তোমাকে কে বলেছে?"

"রিয়া আপু , জান্নাত আপু তাছাড়া আমার বান্ধবীরাও বলেছে। "

"আর কি কি বলেছে? "

" আরও অনেক কিছু ।"

আবির ভ্রু গুটিয়ে ধীর হস্তে কপাল চাপড়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
" ইসস! আমার বউটাকে ওরাই নষ্ট করছে।"

মেঘ ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,
" মোটেই না।"

আবির ঘড়িটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
" পড়িয়ে দাও।"

"এখন?"

"হুমমমম।"

মেঘ ঘড়িটা পড়িয়ে দিয়ে আহ্লাদী কন্ঠে শুধালো,
"পছন্দ হয়েছে?"

" হুমমমমমমম। আমার একমাত্র বউয়ের দেয়া গিফট পছন্দ তো হবেই। "

আবির তপ্ত স্বরে ফের বলল,
"তোমার জন্য আরও সারপ্রাইজ আছে।"

"কি?"

আবির একটা অ্যালবাম বের করে মেঘের হাতে দিল। অ্যালবামের সর্বপ্রথম ছবিটা আবির আর মেঘের বিয়ের। দু'জন পাশাপাশি বসা, মেঘ ঘাড় কাত করে আবিরের বাইসেপে রেখেছে আবির মেঘের মাথায় উপর নিজের মাথা কাত করে রেখেছে। দু'জনের এক হাত সামনের দিকে । আবিরের হাতের তালুতে মেহেদী দিয়ে লেখা 'মেঘের আবির' আর মেঘের হাতে লেখা 'আবিরের মেঘ'। মেঘ ছবিটা দেখে মৃদু হেসে অ্যালবাম খুলেছে। মেঘের জন্মের পর আবিরের প্রথম কোলে নেয়ার ছবি, মেঘের ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বয়স থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত আবিরের সাথে যতছবি ছিল সবই অ্যালবামে আছে। মেঘ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছবিগুলো দেখছে, আবির পাশে দাঁড়িয়ে ছবিগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে। ছোটবেলার ছবিগুলো ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে সংগ্রহ করা। কোন ছবি কখন, কি অবস্থায় কাকে দিয়ে উঠিয়েছিল সবই আজ নির্দ্বিধায় বলছে। মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখছে আর আবিরকে দেখছে। মাঝখানে ৯ বছরের একসাথে ছবি না থাকলেও লাস্ট ২ বছরের ছবিতেই তার উসুল তুলে ফেলেছে। যার মধ্যে হাতে গুনা কয়েকটা ছবি মেঘ নিজের ইচ্ছেতে তুলেছিল বাকি সব আবিরের পার্সোনাল ফটোগ্রাফার তুলে দিয়েছে। অ্যালবাম দেখা শেষ হতেই মেঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,

"রাগ করেছো?"

মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে চেয়ে আছে। আবির নিরেট কন্ঠে বলল, 

" রাগ করো না, প্লিজ। এটা দেখে রেগে গেলে পরের গুলো তো বলতেই পারব না।"

" পরে কি?"

আবির একটা চাবির গোছা মেঘের হাতে দিয়ে বলতে শুরু করল,
" আজ থেকে এই চাবির গোছাটা তোমার। এখানে আমার রুমের প্রতিটা তালাবদ্ধ জিনিসের চাবির পাশাপাশি আমার অফিসের সব চাবি আছে। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী তাই আজ থেকে আর কোনো লুকোচুরি নয়। আমার যা কিছু আছে সবকিছুতে তোমার অধিকার আছে।"

মেঘ আজ হতবিহ্বল। যে আবির নিজের জিনিসপত্র কখনো কাউকে ছুঁতে দেয় না, রুমে ঢুকতে দেয় না, সব কিছুতে তালা দিয়ে রাখে সে আজ নিজের হাতে সব দায়িত্ব মেঘকে দিয়ে দিচ্ছে। আবিরের এত পরিবর্তন মেঘ স্তব্ধ চোখে কেবল দেখেই যাচ্ছে। আবির অকস্মাৎ মেঘের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আচমকা ধপ করে মেঘের পায়ের কাছে বসে পরেছে, আবিরের গায়ে যেন পা না লাগে তারজন্য মেঘ সঙ্গে সঙ্গে পা সরিয়ে থমথমে কন্ঠে শুধালো, 

"কি হয়েছে আপনার?"

আবির পেছন থেকে একটা সুন্দর গিফট বক্স বের করে মেঘের হাতে দিল। মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

" কি এটাতে?"

"দেখো।"

বক্স খুলতেই ২ টা ব্যাংক চেক চোখে পরেছে, মেঘ এমাউন্টও ঠিকমতো খেয়াল করে নি। কৌতূহল বশত চেক তুলে বিস্ময় সমেত তাকালো । বক্সে স্বর্ণের বেশ কিছু গহনা। মেঘ বার বার আবিরের দিকে তাকাচ্ছে, আবিরের ঠোঁটে মলিন হাসি। মেঘ গহনা গুলো তুলে বিছানার পাশে রাখছে। কাগজের মতো কিছু লাল ফিতা দিয়ে প্যাঁচানো দেখে মেঘ স্বাভাবিকভাবে খুলতে নিল, খুলতেই দেখল এটা একটা দলিল। কিছুটা পড়ার পড় বুঝতে পারলো কোনো একটা জায়গা আবির মেঘের নামে করে দিয়েছে। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

" এসবের মানে কি?"

আবির মুচকি হেসে বলল,
" Sparrow's Dreamhouse তোমার বাড়ি, একান্তই তোমার। সেখানে আমার কোনো অধিকার নেই।"

মেঘ কিঞ্চিৎ রাগী স্বরে বলল,
" অধিকার যদি না ই থাকবে তাহলে আমার বাড়ি আপনি আমাকে না জানিয়ে কেনো করেছেন? আগে আমাকে বললেন না কেনো?"

" শুরুতে জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।"

"কেনো?"

" সময় টা ছিল ডিসেম্বর মাস, মাইশা আপুর বিয়ে থেকে মালার কারণে তোমাকে জোর করে নিয়ে আসছিলাম। আমি অফিস থেকে এসে তোমাকে সময় নিয়ে বুঝাতে চেয়েছিলাম মালার সাথে আমার কিছুই নেই অথচ তুমি আমার আসা পর্যন্ত জাস্ট ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলে না। আমাকে গুরুত্ব না দিয়ে মিনহাজদের গুরুত্ব দিয়েছিলে। তারজন্য তোমার প্রতি অভিমান হয়েছিল। সেই অভিমান তোমার আব্বুর কথায় জেদে পরিণত হয়েছিল। ওনার মেয়েকে রাণীর মতো রাখতে গেলে আগে রাণীর স্বপ্নগুলো পূরণ করা জরুরি ছিল। সেই রাতেই ৩-৪ দিনের জন্য চলে গেলাম, দিনরাত এক করে সবকিছু রেডি করে আসছি। যেদিন বাসার কাজ শুরু করব তার আগের দিন থেকে আপনাকে এতমতে রিকুয়েষ্ট করলাম কিন্তু তুমি এতটায় জেদি যে কোনোভাবেই যেতে রাজি হলে না। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েও দিতে পারলাম না তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাসার কাজ পুরোপুরি শেষ করেই জানাবো।"

মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
" ইশশ! মিস করলাম।"

"বাকিগুলো দেখে শেষ করো।"

মেঘ আবারও বক্স হাতে নিল। কিছু চিরকুট, আবিরের অফিসের কিছু ডকুমেন্টসের সাথে কয়েকটা ৫০০ আর ১০০০ টাকার বান্ডিল। এত এত টাকার বান্ডিল দেখে মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

"এত টাকা কার?"

আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
"তোমার। "

"মানে? এত টাকা দিয়ে আমি কি করব?"

" এগুলো সব কাবিনের।"

মেঘ ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,
" আমি যতদূর শুনেছি, কাবিন বউয়ের পরিবার অথবা বউয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী দিতে হয়। আমি বউ হয়ে বলছি, আমার কাবিনের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে চেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ আপনাকে পেয়ে গেছি। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আপনার এত এত গিফট, টাকা, ব্যাংক চেক এসবের কোনো কিছুই চাই না। বিয়েতে কাবিন যদি আবশ্যক হয় তবে আমি কাবিন হিসেবে আপনাকে চাইব, আমৃত্যু শুধু আপনাকেই চাইব।"

মেঘের দুচোখ ছলছল করছে, নিজেকে সংযত করতে তাড়িত শ্বাস টানলো। আবির দুর্বোধ্য নেত্রে মেঘের মায়াবী আননে চেয়ে আছে। অল্পতে লজ্জায় আড়ষ্ট হওয়া মেয়েটার অদম্য কন্ঠের আকাঙ্ক্ষা শুনে আবির শীতল চোখে চেয়ে মুচকি হাসলো। মেঘ এতক্ষণ কি বলেছে নিজেও জানে না, আবিরের অন্যরকম চাহনিতে কিছুটা লজ্জা পেয়েছে। আবির চোখমুখ গুটিয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো,

" যা দিয়েছি সবকিছু সহ আবির যদি তোমার হয় তাহলে কাবিন নিয়ে কি তোমার আর কোনো আপত্তি আছে?"

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে ঠোঁট ফুলিয়ে নিষ্পাপ কন্ঠে বলে উঠল,
" আমার আবির হলেই হবে।"

আবির ভ্রু উঠাতেই মেঘ থতমত খেয়ে বলল,
" সরি সরি সরি, আপনাকে হলেই হবে। "

"আমি তো তোমার ই। বাকি যা দিয়েছি ঐ সবও তোমার। এগুলোর পর কাবিন হিসেবে তোমার কি আমার কাছে আর কিছু চাওয়ার আছে? "

মেঘ সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,
" আমার আর কিছুই লাগবে না।"

"মনে কষ্ট থাকবে না তো?"

মেঘ একগাল হেসে বলল,
" আমার মনে কষ্টের ছিটেফোঁটাও নেই কারণ আপনাকে পেয়ে গেছি যে।"

আবির অনুগ্র হেসে টেবিলের উপরে রাখা একটা বই থেকে কাগজ এনে মেঘের হাতে দিল। তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়েই মেঘ জিজ্ঞেস করল,

" কি এগুলো?"

"পড়ো।"

মেঘ বিড়বিড় করে পড়ছে, কিছুটা পড়তেই বুঝতে পারলো এটা কাবিননামার কপি। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে নিচে তাকালো। বরের স্বাক্ষরের জায়গায় 'সাজ্জাদুল খান আবির' লেখা আর কন্যার স্বাক্ষরের জায়গায় 'মাহদিবা খান মেঘ' বিবাহ রেজিস্ট্রী করার তারিখ: ০৩/০২/২০-- যা আজ থেকে আরও তিন বছর আগের। এটা দেখে মেঘ বিস্তীর্ণ চোখে তাকিয়ে এক হাতে নিজের মুখ চেপে ধরেছে। মেঘের হাত থরথর করে কাঁপছে, কান দিয়ে গরম হাওয়া বের হচ্ছে, মস্তিষ্কে বিদ্যমান স্নায়ুগুলো ধপধপ করে কাঁপছে, বুকের ভেতরটা দুরু দুরু কেঁপেই চলেছে, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মেঘ শশব্যস্ত চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে মেঘকে দেখছে আর নিজের বুকে হাত রেখে অনুচ্চ স্বরে দোয়া পড়ছে। মেঘের গলায় আটকানো নিঃশ্বাস টা অতি সন্তর্পণে বেড়িয়ে আসছে, মুখ ফুলিয়ে শ্বাস টেনে জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে থমথমে কন্ঠে প্রশ্ন করল,

" এগুলো কি সত্যি? "

আবির ঢোক গিলে ধীরস্থির কন্ঠে বলল,
"হুমমমমমমম। আইনের চোখে আমাদের বিয়ের তিনবছর পূর্ণ হয়ে গেছে, গতকাল চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছি। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, তুমি আমারই। কেউ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। কেউ যদি আমার সাথে ঝামেলা করতেও চাইতো, আমি সরাসরি কাবিননামা দেখিয়ে দিতাম।"

মেঘ ভাবনাচিন্তা ছাড়াই আচমকা বলে উঠল,
" এটা কিভাবে সম্ভব?"

আবির শক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,
" আমি দেশ ছাড়ার মাসখানেক আগে তানভিরকে তোমার ব্যাপারে সব বলেছিলাম। সে আমার আবেগ, অনুভূতি দেখে প্রথমদিকে মেনে নিলেও পরবর্তীতে ওর মনে কিছুটা খটকা সৃষ্টি হয়েছিল কারণ শত হলেও সে তোমার আপন ভাই। তোমার প্রতি তার দায়িত্ব, ভালোবাসা অন্য লেবেলের যেটা আমার প্রতি হাজার থাকলেও তোমার সমান নয়। বলতে গেলে তানভির, আমি দুজনেই তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক। মজার ছলেই হোক কিংবা গভীর চিন্তা থেকেই, তানভির একদিন হুট করে বলে বসে, 

" ভাইয়া, তুমি বনুকে এখন পছন্দ করো মানলাম, আমি ওকে দেখেও রাখলাম কিন্তু ৭ বছর পর তোমার মন মানসিকতা যে এরকম থাকবে তার কি গ্যারেন্টি আছে? তখন যদি বনুর প্রতি এখনকার মতো অনুভূতি না থাকে?"

তানভিরের কথা শুনে আমার মনে চিন্তন জাগে৷ আমি নিজেও কখনো সেভাবে ভেবে দেখি নি তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম তোমাকে বিয়ে করব। কেনো সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি নিজেও জানি না শুধু মনে হয়েছিল তানভির যা বলেছে একদম ঠিক বলেছে। তানভির মজার ছলে বললেও আমি দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছিলাম না। তানভিরকে জানানোর পর সে খুব রিকুয়েষ্ট করেছে যেন বিয়ের ঝামেলা না করি, ও এমনিতেই এসব বলেছিল আরও অনেককিছু। আমার মাথায় তখন কিছুই ঢুকছিল না, আমার কাছের বন্ধুর বাবা কাজী তাই তৎক্ষনাৎ খোঁজ নিলাম। তোমার বয়স অনেক কম ছিল, তখন তোমার আমার প্রতি তীব্র ঘৃণাও ছিল সব মিলিয়ে তখন বিয়ে সম্ভব ছিল না৷ তাছাড়াও কিছু নিয়মনীতি ছিল যার কারণে আংকেল কোনোভাবেই রাজি হয়তেছিল না৷ কিন্তু তখন আমার একটায় জেদ ছিল যেভাবেই হোক বিয়ে আমার করতেই হবে। আংকেলকে বিস্তারিত বুঝিয়ে খুব কষ্টে রাজি করিয়ে, রাকিব, তানভির আর সুজনের উপস্থিতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে দেশ ছাড়ি।"

আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলতে শুরু করল,
" বিশ্বাস করো, আমি তখন কোনোকিছু ভাবি নি, এতকিছু বুঝি নি। শুধু বুঝেছিলাম তোমাকে আমার লাগবে সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক। মস্তিষ্কে শুধু একটা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তোমাকে বৈধতার চাদরে মোড়ানো। পাওয়া না পাওয়ার মাঝে আমি তখন বাস্তবিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভবিষ্যতে কি হবে বা হতে পারে সব ভুলে গিয়েছিলাম। বিয়ে পরিপূর্ণ হবে না জেনেও আবেগের তাড়নায় বিয়ে করেছিলাম৷"

নিশ্চুপ মেঘ এবার মুখ খুলল। কিছুটা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল,
" আমার সাইন কে দিয়েছিল?"

"তুমি। "

"কিভাবে? আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না।"

"মনে আছে তানভির একদিন ঘুরতে নিয়ে তোমাকে বিয়ের কথা বলেছিল?"

"হ্যাঁ, মনে আছে৷ আমাকে এমন ই একটা কাগজে সাইন করতে বলেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কিসের কাগজ? ভাইয়া বলেছিল বিয়ের। আমি তখন সেভাবে গুরুত্ব ই দেয় নি, ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে।"

আবির কপাল গুটিয়ে জানতে চাইল,
" কেনো আমার নাম বলেছিল মনে নেই?"

"হ্যাঁ, এটাও মনে আছে। বিয়ের কথা বলায় আমি যখন হাসছিলাম তখন ভাইয়া জিজ্ঞেস করছিল আমাকে যার তার কাছে বিয়ে দিলে আমার আপত্তি আছে কি না। আমিও সুন্দর করে বলেছিলাম, কোনো আপত্তি নেই তুমি যাকে বলবা তাকেই বিয়ে করে নিব। আমার সত্যি ই তখন কোনো আপত্তি ছিল না কারণ তখন আমার জীবনে আপনি ছিলেন না। আমার চোখে আমার ভাই ই সবার সেরা ছিল, সে যা বলতো আমি সবকিছু মেনে নিতাম। ভাইয়া তখন আপনাকে বিয়ে করার কথা বলেছিল আর আমি ভাইয়ার কথায় আপনাকে বিয়ে করতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে তাই যা বলেছিল সবেতেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে সাইনও করে দিয়েছিলাম। তারপর ভাইয়ার সাথে এ বিষয়ে আমার আর কোনোদিন কথা হয় নি। ভাইয়া কিছু বলে নি আর আমি তো সেই ঘটনা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। "

আবির মলিন হেসে বলল,
" ঐদিন ই তোমার আমার সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তানভিরের সাথে সাথে সেখানে কাজী সাহেব, সুজনরাও উপস্থিত ছিল তাছাড়া ফোনে আমিও ছিলাম।"

মেঘ হা হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল,

" আমি সাইন করায় দিনই তোমাকে বউ হিসেবে কবুল করেছিলাম কিন্তু তোমারটা বাকি ছিল। তোমাকে বিস্তারিত বুঝানোর পরিস্থিতি ছিল না তাই তানভির যেভাবে পেরেছে ম্যানেজ করেছে। আমার কথা ছিল, যেহেতু তোমার সাথে তখন মানসিক বা শারীরিক কোনো সম্পর্কে আমি জড়াবো না তাই শুধু আইনী কাজ টা সম্পন্ন করে রাখবো। বাসায় এসে যেভাবেই হোক তোমাকে পটিয়ে, বাসার সবার অনুমতি নিয়ে তোমাকে বিয়ে করব। আমি নির্বোধ ছিলাম কারণ আমি তখনও আবেগে গা ভাসাচ্ছিলাম। আমাদের বিয়ে আইনী ভাবে নিবন্ধিত হয়ে গিয়েছিল, আমার এত বছরের ভালোবাসাকে আইনী স্বীকৃতি দিতে পেরে মনে সুখের হাওয়া বইছিল। আমার আকাশে বাতাসে বিয়ের আমেজ ছিল কিন্তু সেই আমেজ বেশিদিন থাকলো না। মাস তিনেকের মধ্যে ফুপ্পির কথা জানতে পারি আর তখনই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তানভিরের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ভীত হয়ে আমি আইনী স্বীকৃতির জন্য জোরাজোরি করেছিলাম কিন্তু ফুপ্পির কথা শুনে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে ফুপ্পির প্রেমের সম্পর্ক জেনেও মানে নি সেখানে আমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। আমার বিয়েটা কোন লেবেলের অপরাধের কাতারে পড়বে সেটা ভেবেই আঁতকে উঠছিলাম। এত বছরে নিজের মনে জমে থাকা স্বপ্নগুলোকে পিণ্ডীভূত করে যে কাঁচের বাড়িটা বানিয়েছিলাম সেই বাড়িটা মনের ভেতরে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। নিজের সাজানো স্বপ্ন ভাঙার সাথে সাথে ভেঙেছিল তোমাকে দেখার সব আকাঙ্ক্ষা। নিজের আক্ষেপে নিজেই পুড়ছিলাম। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় কিন্তু শেষ সময়েও তোমাকে দেয়া কথাটা আমার কানে বাজছিলো, "আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না" সেই আদুরে আনন আমাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে এনেছিল। শুধুমাত্র তোমার কথা ভেবে নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করছিলাম, কিন্তু বুকে ছিল আকাশ সমান ভয়। বাসায় বিয়ের কথা জানলে তোলপাড় শুরু হবে এটা খুব ভালোই বুঝেছিলাম, তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকার যোগ্যতাও আমার ছিল কিন্তু তুমিই যে আমার ছিলে না। তুমি এমনিতেই ৭-৮ বছর যাবৎ আমার সাথে কথা বলছিলে না। ঐ অবস্থায় কোনোক্রমে যদি শুনতে পারতে যে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে তখন আব্বু চাচ্চু কি করতো জানি না কিন্তু তুমি হয় আমাকে খু*ন করতে, নয়তো নিজে সু*ই*সাই*ড করতে আর না হয় লাস্ট অপশন ছিল ডি*ভো*র্স। তোমার জেদকে আমি বরাবর ই ভয় পায়, তখনও খুব ভয় পেয়েছিলাম। তুমি ভুলক্রমে কিছু বললেও সেটা তুমি করেই ছাড়তে৷ বাসায় ফিরে ৩ মাস কিংবা ৬ মাসের মধ্যে বিয়ে করার স্বপ্ন আড়ালেই হারিয়ে গেল। সেই থেকে আমার আতঙ্ক শুরু হলো, তানভির, রাকিব দু'জনকে খুব জোর করে বললাম ভুল করেও যেন বিয়ের টপিক না উঠায়, বিয়ের কথা যেন মন থেকে ভুলে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ৬ মাস আগে দেশে ফিরলাম, তখন সব ভুলে তোমাকে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করলাম। প্রতিনিয়ত নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে তোমাকে অনুভব করাতে লাগলাম। আলহামদুলিল্লাহ বছরখানেকের মধ্যে আমি সফলও হয়ে গেলাম। আমার এক্সিডেন্টের পর তোমার আবেগ জড়ানো কথাগুলো শুনে তোমার ভালোবাসার পুরোপুরি নিশ্চয়তা পেয়েছিলাম। বাসার পরিস্থিতি, তোমার পরিস্থিতি দেখে তখন দ্বিতীয়বার উপলব্ধি করেছিলাম আমি আবেগের বশে ঠিক কত বড় ভুলটা করেছিলাম। আম্মুর বার বার জানতে চাওয়া, আমার কোনো পছন্দ আছে কি না, আব্বুর একই প্রশ্ন পরোক্ষভাবে জিজ্ঞেস করা সেই সাথে তোমার অতিরিক্ত যত্নে আমি পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিলাম৷ তখন বুঝেছিলাম, আমার বাবা মা আমাকে খুব ভালোবাসে, তাদের ইচ্ছাশক্তি এতটায় প্রবল যে আমি চাইলে তারা পৃথিবীর সবকিছু আমার সামনে হাজির করতে পারে সেখানে তোমাকে আমার সাথে বিয়ে দেয়া তেমন কোনো বিষয় ই না। বরং তোমাকে চাইলে আব্বু আম্মু খুশিই হতো। কিন্তু ওনারা তো জানতো না যে আমি ওনাদের হৃদয় আগেই ভেঙে ফেলেছি আর না তুমি কিছু জানতে। ঐ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার বিয়ের কথা বলাটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না আর না সম্ভব ছিল বিয়ের ঘটনা লুকিয়ে নতুন করে বিয়ে করা। তাছাড়া তখনও তোমার স্বপ্নের বাড়ি গিফট করা বাকি, তোমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাটাও বাকি ছিল। গত রমজানের আগে হুট সবার সামনে একদিন আমার বিয়ের কথা উঠল, তোমার আব্বু আগুনে ঘি ঢালার মতো কোথাকার কোন মেয়ের কথা বলল। আমি মেজাজ হারিয়ে বললাম ১ বছর বিয়েই করব না। আমি তাদের কিভাবে বুঝাতাম আমি যে তোমাকে বিয়ে করে ফেলেছি। তারপর রাকিবের বিয়ে ঠিক হলো, তখনও আব্বু আমাকে কথা শুনালো। এমনকি আমার নিজেরও খারাপ লাগছিল কারণ আমি যখন থেকে তোমাকে ভালোবাসি তারপর থেকেই বলছিলাম আমি যেভাবেই হোক রাকিবের আগে বিয়ে করব৷ বিয়ে করেও ছিলাম কিন্তু কাউকে বলতে পারছিলাম। আবেগ আর কষ্টগুলো নিজের ভেতর চাপিয়ে রাখতে রাখতে আর পারছিলাম না। রাকিবের গায়ে হলুদের রাতে ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটা কথায় বলছিলাম,

'আমি ভুল করেছি, খুব বড় ভুল করেছি। সেই ভুলের শাস্তিস্বরূপ মেঘকে আমার থেকে কেড়ে নিও না। আমি মেঘকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।'

ফুপ্পি নিরূপায় ছিল, আমার কান্না দেখে তবুও কয়েকবার আব্বুকে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারে নি। তারপর শুরু হলো তোমার আব্বুর ছেলে দেখা, বাধ্য হয়ে বাসায় রাগারাগি করলাম। তোমার বাসার কাজ শেষ করতে প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়ে দেশের বাহিরে গেলাম। বিয়ের কথা বাসায় বলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার পুরোপুরি টার্গেট ছিল ১ তারিখ তোমাকে প্রপোজ করবো, রাতে বাসায় বিয়ের কথা বলব, বাসায় মানলে ২ তারিখ ধুমধাম করে গায়ে হলুদ হবে, না মানলে তোমাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়বো। মাঝখান থেকে তুমি ৩ দিন আগে প্রপোজ করতে বের হয়ে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিলে। তবে যাই হোক রবের কাছে হাজারো শুকরিয়া যে কোনো ঝামেলা ছাড়ায় তোমাকে পেয়ে গেছি।"

মেঘ হতবিহবল, পাথরের মতো বসে আবিরের মুখের পানে চেয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করা বা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আবির দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল। মেঘের হাত থেকে কাগজ নিতে নিতে মেঘের মসৃণ গালে চুমু খেয়ে হঠাৎ ই পুরু কন্ঠে বলে উঠল,

" বউ, আমি তোমাকে ৫ মিনিট দিচ্ছি। এরমধ্যে টাশকি খাওয়া মুড থেকে বেড়িয়ে রোমান্টিক মুডে আসো। আমার বুকের ভেতর প্রেম ভালোবাসা ফুটন্ত গরম পানির মতো টগবগ করতেছে। তুমি রোমান্টিক মুডে না আসলে আমার অন্তর পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তুমি কি তাই চাও?"

মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিঃশব্দে হেসে চোখ টিপলো। আবিরের নির্লজ্জ মার্কা কথা আর কাণ্ড দেখে মেঘ না পারতেও কিঞ্চিৎ হাসল।

★★★

সকালে নাস্তার টেবিলে আবির আর মেঘ ব্যতীত সকলেই উপস্থিত, বন্যাও আজ সবার সাথে খেতে বসেছে। ইকবাল খান ধীর কন্ঠে শুধালো,
"আবির আর মেঘ কি এখনও উঠে নি?"

মালিহা খান মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
" মীম, দেখে আয় তো।"

মীম সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল। আবিরের রুমের দরজায় ডাকতে গিয়ে খেয়াল করল দরজা খোলা, রুমে মেঘ আবির কেউ নেই। মীম রুমের ভেতরে ঢুকে ভালোভাবে দেখল। সহসা বাহিরে এসে উচ্চস্বরে বলল,
" ভাইয়া, আপু কেউ ই রুমে নেই।"

আলী আহমদ খান সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের দিকে তাকালেন। তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,

" আমি সত্যিই কিছু জানি না। "
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp