ড্রয়িংরুমের বাতাসটা আজ অস্বাভাবিক ভারী। জানালার বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। আকাশে জমেছে মেঘ, যেন প্রকৃতিও কোনো অশুভ সত্য জানার অপেক্ষায় থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও কাক ডেকে উঠল, কর্কশ, অশান্ত এক শব্দ। ঠিক তেমনই অশান্ত হয়ে আছে জবার ভেতরটা।
সামনের টেবিলে রাখা কফির কাপের ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। অথচ জবার চোখের আগুন এখনও নিভেনি।
ধীর কণ্ঠে জবা বলল,
'আমার স্বামী পরকিয়া করছে আমার মেয়ের টিউশন টিচারের সাথে। এমনকি ওরা অগনিতবার শারিরীক সম্পর্ক করেছে। তাদের সম্পর্ক কেবল কথা বলা বা প্রেম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। খুবই নোংরামির পর্যায়ে চলছে ওদের সম্পর্ক।'
কথাটা শুনে ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তেই জমে গেল। ইশা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল,
'এসব কী বলছিস তুই জবা? ইরফান কত ভালো মানুষ। আমরা সবাই তা জানি।'
জবা হাসল। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, তাচ্ছিল্য ছিল, আর ছিল ভয়ংকর এক শীতলতা। বলল,
'ইরফান কত ভালো তা তোরা যেমন জানিস আমিও তেমন জানতাম। কিন্তু ও কতটা সেক্স অ্যাডিকটেড, পার্ভার্ট আর নারী শরীরের প্রতি ওর কী পরিমাণ লোভ তা আমিও এখন জানলাম। কিন্তু একজন মানুষ বিছানার অন্ধকারে কতটা পচে যেতে পারে, সেটা আমি এখন বুঝেছি। এগারো বছর সংসার করেও আমি মানুষটাকে চিনতে পারিনি। তোদের কী বলবো?'
ঘরের ভেতর নীরবতা আরও ঘন হলো। বাইরে হঠাৎ দমকা হাওয়া উঠল। জানালার কাঁচ কেঁপে উঠল ঝনঝন শব্দে। কেঁপে উঠল ওরা দুজনও। জবা নিচু গলায় বলল,
'ইরফান আর সিনথিয়ার অবৈধ সম্পর্ক অনেকদিনের। আর আমি সব জানি। সব প্রমাণ আমার হাতে আছে।'
জবার বান্ধবী ইশা বলল,
'তুই কীভাবে এসব জানলি? নিজ চোখে দেখেছিস?'
জবা মাথা তুলল। চোখ দুটো লালচে, অথচ স্থির। বলল,
'না নিজ চোখে সরাসরি দেখিনি আবার দেখেওছি। আগে একজন আমাকে ফেইক আইডি থেকে কিছু ছবি পাঠিয়েছে। সেখানেই প্রমাণ হয়েছে ওরা অবৈধ সম্পর্কে জড়িত।'
'কাম অন জবা। একটা ফেইক আইডির কথা তুই বিশ্বাস করে নিলি? ছবিগুলো তো ফেইকও হতে পারে।'
'তোর মনে হয় আমি ভালোভাবে তদন্ত না করে কারও কথা বিশ্বাস করব? আমি জবা চৌধুরি কোনোকিছু স্পষ্টভাবে না জেনে কিছু বলি না। ফেইক আইডির সে মহিলা কে তাও আমি জানি। আমি সব জানি। সব প্রমাণ আমার কাছে আছে।'
'তাহলে কী করবি?'
'আগে সিনথিয়াকে দেখি তারপর ইরফানকে দেখব। দুটোর এমন অবস্থা করব যে মরতে চেয়েও পারবে না। ওদের নিঃশ্বাস নেওয়াও আমি কষ্টকর করে দিব।'
—————
সিনথিয়াদের বাসার পরিবেশটা যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। সবার মুখ থমথমে। বাতাসেও চাপা উত্তেজনার গন্ধ।
সিনথিয়া মাথা নিচু করে বসে কাঁদছে। ফর্সা দুই গালে স্পষ্ট লালচে আঙুলের দাগ। চোখদুটো ফুলে গেছে কান্নায়। ফর্সা মানুষ হওয়ায় চড়ের লাল দাগ আরও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। সিনথিয়ার মা নিলুফা বেগম পরিবারের সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
'তোর মত বেশ্যাকে আমি জন্ম দিয়েছিলাম? ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে।'
সিনথিয়া কেঁপে উঠল। ওর চোখ থেকে অনর্গল পানি পড়ছে।
কিছুক্ষণ আগে,
জবা নামের এক ভদ্রমহিলা সিনথিয়াদের দরজায় নক করল। দরজা খুলল সিনথিয়ার বড়োবোন সীমা। দরজা খুলেতেই ওর নাকে দামি পারফিউম এর মিষ্টি ঘ্রাণ লাগল। জবাকে দেখে বেশ কিছুটা সময় তাকিয়ে ছিল সীমা। জবার কাপড়, গয়না, চেহারায় অাভিজাত্যের আলাদা ছাপ। দেখলেই বোঝা যায় বেশ ধনী পরিবারের লোক। দেখতে তেমন ফর্সা না, তবে বেশ মিষ্টি। প্রথম দেখায় চোখে ভালো লাগে তেমন।'
জবাকে চিনতে না পেরে সীমা বলল, 'জি কাকে চাই?'
জবা সালাম দিল, 'আসসালামু আলাইকুম।'
'ওয়ালাইকুম আসসালাম।'
'ভিতরে আসতে পারি?'
সীমা বলল, 'সরি, আপনাকে ঠিক চিনলাম না।'
'ভিতরে গিয়ে পরিচয় দি।'
সীমা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জবাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বলল, 'প্লিজ বসুন।'
জবা বসতে বসতে বলল, 'আজ তো শুক্রবার। তার উপর এখন দুপুরের পরের সময়। নিশ্চয়ই আপনাদের ঘরের সবাই ঘরেই আছেন?'
সীমা কিছুটা ভেবে বলল, 'জি আছে। কিন্তু আপনার কাকে চাই?'
'প্লিজ সবাইকে ডাকুন।'
এবার সীমা বেশ বিরক্ত হলো। বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বলল, 'আপনি তখন থেকে নিজে নিজে হুকুম করে যাচ্ছেন, কিন্তু কোনো উত্তর দিচ্ছেন না কাকে চাই? কেন এসেছেন? নিজের পরিচয়ও দেননি।'
জবা স্মিত হাসল। তারপর বলল, 'আপনার বোন সিনথিয়া আমাকে খুব ভালো করে চিনে। তাকে ডাকুন সাথে পরিবারের বাকি সবাইকেও। প্লিজ জলদি করুন। আজ আপনাদের জন্য দারুণ সারপ্রাইজ আছে। প্লিজ পরিবারের সবাইকে ডাকবেন। তবে হ্যাঁ ঘরে বাচ্চারা থাকলে তাদের ডাকবে না। আসলে বড়দের এসব কথা বাচ্চাদের শোনা ঠিক হবে না।'
সীমা মনে মনে ভাবল, 'হয়তো সিনথিয়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।'
সীমা মনে মনে বলল, 'যদি বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই আসে তাহলে তো ওর কপাল খুলে যাবে। মহিলাকে দেখলেই বোঝা যায় খুব ধনী। আমাদের গেটের সামনে দেখলাম দামি গাড়ি দাড় করানো। নিশ্চয়ই ঐ মহিলারই।'
সীমা সবাইকে ডাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই সামনের রুমে এসে হাজির হলো। সিনথিয়ার বাবা-মা, সীমা-সীমার স্বামী, বড় ভাই-ভাবি। সিনথিয়া জবাকে দেখতেই ভূত দেখার মতো চমকালো। ওর মুখটা ভয়ে চুপসে গেল। জবা, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল।
সবাই বসার পর ঘরটা যেন ধীরে ধীরে আদালতে পরিণত হলো। জবা সোফায় বসে ছিল অবিশ্বাস্য স্থিরতায়। যেন বহু আগেই কান্না শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু বিচার বাকি। সিনথিয়ার বাবা হক সাহেব জিজ্ঞেস করল, 'জি আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।'
জবা তাকে সালাম দিয়ে বলল,
'আমার নাম জবা চৌধুরি, আমার স্বামীর নাম ইরফান চৌধুরি। আমার স্বামী আর আপনার ছোটো মেয়ে সিনথিয়ার মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক চলছে। আপনার ছোটো মেয়ে আমার সতীন হওয়ার চেষ্টা করছে। সে কারণে আমিই আসলাম তাকে সতীন করে নেওয়ার প্রস্তাব দিতে।'
সবার মাথায় নিঃশব্দে বাজ পড়ল। হক সাহেব বেশ রাগান্ধিত হয়ে বলল,
'কী যা তা বলছেন এসব?'
জবা মৃদু হেসে বলল, 'উত্তেজিত হবেন না। আমি সব না জেনে আপনাদের কাছে আসিনি। আপনাদের সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই যে, আপনাদের মেয়ের নামে মিথ্যা অপবাদ দিব। আপনাদের মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন।'
সবাই সিনথিয়ার দিকে তাকাল। ও মাথা নিচু করে রইল।'
জবা হেসে বলল, 'সে কিছু বলতে পারবে না। বলার মতো মুখ তার নেই। আমিই বিস্তারিত সব বলছি। আর আমি যতক্ষণ কথা বলব ততক্ষণ দয়া করে কথার মাঝে কথা বলবেন না। কেউ আমার কথার মাঝখানে কথা বললে আমার মেজাজ খারাপ হয়। তবে কথাগুলো বলার আগে কিছু ছবি দেখাই।'
ও আইপ্যাডটা টেবিলের উপর রাখল। তারপর একে একে ছবিগুলো সামনে ধরতেই ঘরের বাতাস থেমে গেল। ছবিগুলোতে সিনথিয়া আর ইরফান খুব অন্তরঙ্গ অবস্থায় আছে। ছবিগুলোর সিনথিয়ার বাবা, বড় ভাই আর দুলাভাই একবার তাকিয়ে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পায়নি। সীমা, সিনথিয়ার ভাবি কনিকা আর নিলুফা ছবিগুলো দেখার পর তাদের ভীরমি খাবার জোগাড় হলো। ছবিগুলো এতটাই অন্তরঙ্গ যে কেউ দেখলেই তার মুখ হা হয়ে যাবে। লজ্জায় চোখ বন্ধ হয়ে আসবে।
জবা বলল,
'ছবিগুলোকে নকল ভাববেন না। কারণ ছবিগুলো আপনার মেয়ের ফোন থেকেই নেওয়া হয়েছে। তার ফোন থেকেই আমি তার এবং ইরফানের বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছি। ঘন্টার পর ঘন্টা তারা চ্যাটিং করে। গত বছর তারা দুজন কক্সবাজার পর্যন্ত ঘুরে এসেছে। দুটো ছেলে মেয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত গিয়ে কী কী করতে পারে তা নিশ্চয়ই আপনাদের বুঝিয়ে বলতে হবে না!
জবার কণ্ঠে চিৎকার ছিল না। কিন্তু সেই নীরব শীতলতাই আরও ভয়ংকর। বলল,
'আমার স্বামী ইরফান ধনী ব্যবসায়ী মানুষ। সে ব্যবসা করতে ভালোবাসে। যে কোনো বিষয়ে তার গিভ এন্ড টেইকের নিয়মে চলে। আপনার মেয়ের থেকে সে অনেককিছু পেয়েছে। ফলে আপনার মেয়েকেও অনেককিছুই দিয়েছে। আপনার মেয়ে কুইজ প্রতিযোগিতায় ল্যাপটপ জিতে, লটারিতে আইফোন জিতে, সে হাতে সাড়ে তিনলাখ টাকা দামের ঘড়ি পরেও ঘোরে। লটারিতে এতসব সত্যি জেতা যায়?
আপনাদের বিষয়ে সব খোঁজ নিয়ে যা জানলাম। মধ্যবিত্ত হলেও বেশ সম্মানী মানুষ আপনারা। বিলাসীতা করার মতো সামার্থ্য আপনাদের নেই। আচ্ছা আপনার মেয়ের দামি দামি ড্রেস দেখে কখনও জানতে চাননি কোথায় পায় সে এসব? বুঝলাম ফোন, ল্যাপটপ লটারি কিংবা প্রতিযোগিতা বলে চালিয়ে দিয়েছে। তবে আপনাদের মেয়ে যেভাবে চলাফেরা করে তাতে তাকে উচ্চবিত্ত লাগে। কখনও মনে প্রশ্ন জাগেনি যেখানে আপনারা এত সাধারণ জীবন যাবন করেন সেখানে আপনাদের মেয়ে এত বিলাসীতা কী করে করে?'
সীমা, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'তুই না বলতি ইরফান সাহেবের মেয়েকে প্রাইভেট পড়াস, মাসে দশহাজার টাকা দেয় টিউশন ফি। টিউশনির টাকা দিয়ে এসব কিনিস? তাহলে এসব করে কিনতি?'
সিনথিয়া মাথা নিচু করে রইল। জবা বলল,
'হাসালেন আপা। আমার মেয়েএবার কেজি ওয়ানে পড়ে। কেজি ওয়ানের একটা বাচ্চাকে পড়ানোর ফি দশ হাজার টাকা? কেন মানুষকে টাকায় গুতায়? আপনার বোনকে প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা দিতাম আমার মেয়েকে পড়ানোর বদৌলতে।
আপনার বোন আমার মেয়েকে পড়াতে গিয়ে আমার স্বামীকেও পড়ানো শুরু করল। তাদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক গভীর। ইতিমধ্যে তারা কতবার ফিজিক্যাল রিলেশন করেছে তার হিসাব নেই। আমার স্বামী নিশ্চয়ই ওকে বলছে বিয়ে করবে। কিন্তু ট্রাস্ট মি, ও কখনও তা করত না কিংবা করবে না। প্রথম এবং শেষ কথা সে মরার আগ পর্যন্ত আমার সাথে থাকতে বাধ্য। কারণ তার বিষয় সম্পত্তি সব আমার নামে। আমাকে ছাড়লে সে পথের ভিখারি হয়ে যাবে।
আপনাদের মেয়েকে বলুন আমি ঐ লম্পটটাকে ছেড়ে দিচ্ছি। ও ঐ ভিক্ষুকটাকে বিয়ে করে নিক। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আমার কাছে কিছু ভিডিও আছে। আমার অনুপস্থিতিতে আপনার মেয়ে আর আমার স্বামী কি কি করত তার ভিডিও রেকর্ড। একদম ঝকঝকে পিকচার কোয়ালিটির। দেখতে চাইলে দেখাতে পারি।'
জবার কথায় ঘরের প্রতিটি মানুষ যেন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, এখানে কেবল পরকিয়ার বিচার হচ্ছে না। এখানে এক নারীর বিশ্বাসভঙ্গের প্রতিশোধ শুরু হয়েছে। সিনথিয়া, জবার পা জড়িয়ে ধরে বলল, 'আপা প্লিজ এমনটা করবেন না।'
জবা, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
'আমাকে আপা নয়, ম্যাডাম ডাকো। সে অধিকার তুমি হারিয়েছো। আপা ডেকে আমার সাথে সম্পর্ক গড়ার কোনো কারণ নেই।'
ওর ঠোঁটে ধীরে ধীরে ভয়ংকর এক হাসি ফুটে উঠল। বলল,
'তুমি তো ইরফানকে খুব ভালোবাসো। তো ওকে বিয়ে করে নিও। কয়েকমাসের মধ্যে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে।
ইরফান আজ ইরফান থেকে ইরফান চৌধুরী হয়েছে আমার বাবার টাকার বদৌলতে। সেই টাকা পেয়ে আমাকে ধোকা দিবে, কিন্তু আমি তো ওকে শান্তিতে থাকতে দিব না। ওর শান্তি হারাম করার গুরু দায়িত্ব আমি কাঁধে তুলে নিলাম। ও হ্যাঁ আমার টাকায় কেনা তোমার আইফোনটি আমার কাছেই আছে। কদিন আগে তোমার ফোনটি চুরি হয়েছিল না? সেটা আমিই করিয়েছিলাম। তোমার ল্যাপটপটা প্লিজ নিয়ে আসো। দেড় লাখ টাকার ল্যাপটপ। আর গত বছর থেকে যাবত মানে গত এক বছরে ইরফান তোমার পিছনে ছয় লক্ষ নব্বই হাজার টাকা ব্যয় করেছে। হয়তো এর চেয়ে বেশি, কিন্তু ইরফান আমাকে এতটারই হিসাব দিয়েছে।
যাক সব কিছু তো হিসাব করে চলে না। আমি ইরফানের হিসাব মেনে বাকিটা ছেড়ে দিলাম। এই ছয় লক্ষ নব্বই হাজার টাকা দুই মাসের মধ্যে তুমি আমাকে ফেরত দিবে। বাকি যে টাকার হিসাব পাইনি সে টাকা তোমাকে ভিক্ষা দিলাম। এক মিনিট। তোমাকে পুরো টাকাটা দিতে হবে না। তুমি আমাকে ছয় লক্ষ দিবে। বাকি যে টাকার হিসাব পাইনি এবং সাথে নব্বই হাজার টাকা তোমার রেট। আমার স্বামীকে যে বিছানায় সুখ দিয়েছো তার রেট।
আমার টাকাটা যত জলদি পারো ফেরত দিবে। নয়তো তোমার আর ইরফানের যে ভিডিওগুলা আছে সেগুলো ডার্কওয়েব সাইটে বিক্রি করলে এর চেয়ে বেশি টাকা পাব আমি। এখন তুমি ইরফানের নামে রেপ কেস, মামলা ফামলা যা খুশি করতে পারো। ঐ কুকুরটাকে নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। কই যাও ল্যাপটপটা নিয়ে আসো?'
সিনথিয়া, জবার কথা, কণ্ঠের শীতলতা শুনে এতটাই হতভম্ব যে কী বলবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। ধরা কণ্ঠে বলল,
'গতকাল আমার ল্যাপটপটাও চুরি হয়ে গেছে।'
জবা হেসে বলল,
'নো প্রোবলেম। তুমি ল্যাপটপটার দাম দিয়ে দিও। তো তুমি আমাকে মোট টাকা দিবে সাত লক্ষ চল্লিশ হাজার।'
জবা হক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনি খুব ভালো মানুষ। আপনার সম্পর্কে সব খোঁজ নিয়েছি। আপনার বড় মেয়েটিও চমৎকার মানুষ। তবে ছোটো মেয়েটি গনিকা হলো কীভাবে? নাকি ছোটো বলে আদর দিয়ে সবসময় মাথায় তুলে রেখেছিলেন। কথাগুলো আমি বাইরে বলতে পারতাম, চিৎকার চেঁচামেচি করতে পারতাম। কিন্তু তাতে আপনার এবং আমার দুই পরিবারেরই মানহানি হতো। আপনি এবার ভেবে দেখুন মেয়েকে কী করবেন? আর আপনার মেয়ে ভাবুক কী করে আমার টাকা শোধ দিবে। আমি আর কথা বলব না। চললাম।'
জবা যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, শীতল কণ্ঠে কথাগুলো বলে তেমন নিঃশব্দেই চলে গেল।
জবার কথায় সবাই এতটা হতভম্ব যে ওর কথার পিঠে কেউ কিছুই বলতে পারল না। সবাই হতভম্ব হয়ে যার যার স্থানেই বসে রইল।
জবা চলে যেতেই নিলুফা বেগম ঝাঁপিয়ে পড়ল সিনথিয়ার উপর। ওর কাছে গিয়ে ওকে অনবরত চড় মারতে লাগত। যতক্ষণ না সীমার বর শফিক তাকে থামাল। চড় খেতে খেতে সিনথিয়ার গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।
সিনথিয়ার মা চিৎকার করে বলল, 'তোর মতো বেশ্যাকে আমি পেটে ধরেছিলাম ভাবতেই নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। তোর মতো কুলাঙ্গার আমার গর্ভে কী করে জন্ম হলো?'
সিনথিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েই রইল। চোখ থেকে অনর্গল জল পড়তে লাগল। বাসার কারও কাছে ক্ষমা চাইবার মতো কিংবা কিছু বলার মতো মুখ ওর নেই। তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে ওর মায়ের মার হজম করছিল। নিলুফাকে, শফিক থামাতেই সীমা গিয়ে ঠাস ঠাস চড় বসিয়ে দিল সিনথিয়ার গালে।
তারপর বলল,
'এর আগে তুই একটা ছেলের সাথে রিলেশনে ছিলিস তখন আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম, যাতে এসব চক্করে না পড়িস। তুই তখন আমার কথা মেনে বলেছিলি আচ্ছা প্রেম টেম করব না। তো এখন প্রেম না করে তুই ধান্ধা শুরু করেছিস? শোনো বাবা, তোমার মেয়ের অনেক কথা জেনেও আমি চুপ ছিলাম। আজ সব বলছি শোনো। বহুবছর আগে যে নিহাদ স্যার আমাকে পড়াতো, তোমার মেয়ে এখন হয়তো তার সংসারও ভাঙার পায়তারা করছে।'
সিনথিয়া অবাক হয়ে সীমার দিকে তাকাল। সীমা বলল,
'ওমন করে তাকিয়ে কী দেখছিস? ভাবছিস নিহাদ স্যারের কথা কী করে জানলাম? তোর বেস্টফ্রেন্ড হেনার সাথে কদিন আগে নিজের রুমে বসে বলছিলি না নিহাদ স্যারকে তোর চাই-ই চাই। তার জন্য যা যা করতে হয় করবি। সেদিন আড়ালে দাঁড়িয়ে তোদের সব কথা শুনেছি আমি।
তারপর নিহাদ স্যারের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি। বাবা, নিহাদ স্যার বিবাহিত, তার সংসার আছে। ফুটফুটে একটা মেয়ে তার স্ত্রী। তাদের বিয়েও হয়ছে অনেক বছর। খুব ভালো মানুষ নিহাদ স্যার এবং তার পরিবার, কিন্তু তোমার অসভ্য এ মেয়ে তার সুন্দর সংসার ভাঙতে চাইছে।'
সীমা, সিনথিয়াকে আরেকটা চড় মেরে বলল, 'হ্যাঁ রে আমাদের মধ্যে কারও চরিত্র তো এত নোংরা না। তবে তোর চরিত্র এমন পচা গুয়ের মতো কেন হলো? কার মতো হয়েছিস তুই?'
নিলুফা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'ছোটো খালার মতো ছেনাল হয়েছে। ওর ছোটো খালাকেও বাবা এ কারণে তেজ্য করেছিলেন। যৌবনকালে ছেলেদের সাথে তার ফস্টিনস্টি বেশি ছিল। পালিয়ে বিয়ে করায় বাবা তার সবকিছু থেকে ওকে বেদখল করেছিলেন। ভুলটা আমাদের, ওর এইচএসসি পরীক্ষার পর ওর ছোটো খালার কাছে যেতে দেওয়া উচিত হয়নি। তখন সেখাকে গিয়ে তিন মাস থেকে আসার পর থেকেই সরল সহজ মেয়েটা কেমন বদলে গেল। ছোটো খালার গায়ের বাতাস লেগেছিল। লোকে বলে না, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। ঐ কুত্তিটা নিশ্চয়ই কিছু তো এমন করেছে যে আমার মেয়েটা ধীরে ধীরে ওর মতো হয়ে গেল।'
সীমা বলল,
'কিরে বলল, নিহাদ স্যারের সংসার ভাঙা শেষ করেছিস নাকি এখনও কিছু করিসনি?'
সিনথিয়া চুপ করে রইল। সিন্থিয়ার ভাই সোহান বলল,
'এখন চিল্লাপাল্লা বন্ধ করে ওকে জিজ্ঞেস করো সাড়ে সাত লক্ষ টাকা কী করে দিবে? ইরফান চৌধুরির স্ত্রী যা বলে গেলেন তাতে মনে হয় মহিলা খুব ডেঞ্জারাস। সহজে ছাড়বে না।'
হক সাহেব এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার বলল, 'যে অপকর্ম করেছে তার অপকর্মের ফল সে ভোগ করবে। আজ থেকে আমার মেয়ে একটাই। ওকে বের হয়ে যেতে বলো। তারপর যা খুশি করুক, যেভাবে খুশি টাকা দিক।'
হক সাহেব উঠে নিজের রুমে চলে গেলেন। নিলুফা সিনথিয়ার মুখে একদলা থু থু ছিটিয়ে চলে গেল। সবাই যে যার মতো ওকে কথা শুনিয়ে চলে গেল।
সিনথিয়ার ভাবি ঝুমা ওর কাছে এসে বলল, 'রুমে যা। বাবার এখন মাথা গরম। রাগ পড়লে বুঝিয়ে বলব।'
ও ঝুমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। কষ্টে, অপমানে কোনো কথাই বলতে পারল না।
ঝুমা ওর কান্না দেখে মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল,
'নিজে আকাম করবে আবার ঢঙ মারিয়ে কাঁদবে। ফালতু মেয়ে। কম তো জ্বালাসনি আমাকে। আল্লাহ তার বিচার করছেন। আরও করবে। কারও সংসার ভাঙতে চাওয়া মস্তবড় গুনাহের কাজ। আর তুই তো পরকিয়া মারিয়ে ইরফান চৌধুরির সংসার ভেঙেছিস, তোর স্যার নিহাদের সংসার ভেঙেছিস কি না তা তো জানি না। আমার সংসার ভাঙার জন্যও তো কম চেষ্টা করিসনি। তোর ভাইয়ের জন্য সুন্দর মেয়ে আনতে চেয়েছিলি। তোর মা বাবা আমার মতো শ্যামলা মেয়েকে পছন্দ করেছে বলে কম জ্বালাসনি আমাকে। কথায় কথায় বলতি তোর ভাইকে আবার বিয়ে করাবি। ভাগ্যিস তোর মা-বাবা-ভাই তোর মতো না। নয়তো এতদিনে আমার সংসারও ভাঙা শেষ করতি। রাক্ষসী যেখানে যায়, যার ঘরে যায় তার সংসারে বদ নজর দেয়।'
মনের কথা মনে চেপে ঝুমা বলল,
'যা, নিজের রুমে যা। আমি দেখি বাকিদের বোঝাতে পারি কি না?'
সিনথিয়া কাঁদতে কাঁদতে রুমে চলে গেল। ঝুমা বিরক্তি প্রকাশ করে খুব খারাপ কথা বলে বলল, 'বেশ্যাগিরি করে আবার ন্যাকামি মারাচ্ছে।'
—————
জবা রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছে। ওর চাল চলনে একটা রাজকীয় আর আভিজাত্যের ছাপ বরাবরই প্রকাশ পায়। ইরফান অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ওর অপর পাশের সোফায় বসে আছে। জবা রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে বলল,
'সিনথিয়া ব্যতিত আর কোন কোন মেয়ের সাথে শুয়েছো তুমি ইরফান।'
'আর কারও সাথে না।'
'তুমি বললেই তো আমি বিশ্বাস করব না। তোমাকে বিশ্বাস করার ভুল এ জীবনে আর করছি না।'
'সত্যি বলছি। তুমি ব্যতিত আমি কাউকে ভালোবাসি না। সিনথিয়া আমাকে ট্রাপে ফেলেছে। আমি ভ্রমের মধ্যে ছিলাম।'
জবা হাসল। রক্ত হিম করে দেওয়া ঠান্ডা হাসি। ইরফান জবার এ হাসিকে চিনে। ও জানে জবা ওর সাথে এখন ভালো কিছু করবে না। ও চাইলেও জবাকে ছাড়তে পারবে না। সে পথ জবা রাখেনি। জবাকে ছাড়া মানে ও পথের ভিখারি হয়ে যাওয়া। সাথে নব্বই কোটি টাকার দেনা মাথায়। দেনাদাররা ওকে খুন করে ফেলবে। এখন যে ভাবেই হোক জবাকে মানিয়ে সাথে থাকতে হবে।
একবার সব নিজের প্ল্যান মতো হলে ও নিজেই জবাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিত। সে যতই ভালোবাসুক জবাকে। স্বার্থে আঘাত লাগলে ইরফান কাউকে ছাড় দেয় না। কিন্তু এত বছরের করা পরিকল্পনা কী ভুলে পণ্ড হলো ও বুখতে পারছে না! সিনথিয়ার সাথে ওর সম্পর্কের বিষয়টি জবা কীভাবে জানল সেটা ও বুঝতে পারছে না! এ বিষয়টা জবা জানার পর এখন ওর পরিকল্পনা আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। রাগে ইরফানের গা থরথর করে কাঁপছে। মন চাচ্ছে এখননি জবাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। ওর এখন জবাকে তোষামদ করে চলতে হবে। জবাকে আবার নিজের হাতে আনতে হবে।
ইরফান জবার হাত ধরে বলল,
'একবার ক্ষমা করে দেখো। আমি পাল্টে যাব। তোমায় আর অভিযোগ করার সুযোগ দিব না।'
জবা এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও ইরফানকে নিয়ে ভাবছে না। ইরফানকে কীভাবে শায়েস্তা করবে তা ও জানে। তবে ও ভাবছে নিহাদ সাহেবের স্ত্রী কথা কেন আমাকে ইরফান এসব খবর দিল....!
এখন আমার কথা শোনেন। যারা আমার ২০২৩ সালে লেখা "অরণ্য রোদন" উপন্যাসটি পড়েছিলেন তাদের অবশ্যই মনে আছে এই উপন্যাসের ছোটো চরিত্র জবাকে নিয়ে আমি বিস্তারিত লিখব বলেছিলাম। সময় সুযোগে সেটা লেখা হয়নি। সেই উপন্যাসই এটা। "অরণ্যে রোদন" উপন্যাস পরিবর্তিত হয়ে এখন "অমানিশায় আলো" নামে বই হয়েছে। যা মেলায় নবকথন প্রকাশনীতে স্টল নং ২৩৮,২৩৯,২৪০ -এ পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন বুকশপেপ পাওয়া যাবে। আপনারা সে বইটা সংগ্রহ করলে কথা নিহাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। আর যদি বলেন না সেটা সংগ্রহ করব না। তাহলেও সমস্যা নেই। "ভাঙা আয়নার আলো" নিজেই পরিপূর্ণ উপন্যাস হতে যাচ্ছে। এটা পড়ার জন্য অপনাদের আগের উপন্যাস না পড়লেও হবে। তবে পড়লে আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন। কারণ ঐ বইতে যা আছে তা আমি এখানে লিখব না। আর এটা কোনো সিকুয়েল না। সময়রেখা একই জাস্ট চরিত্র আর কাহিনি আলাদা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………