ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ০২ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          জবা আর ইরফানের একমাত্র মেয়ে জারা।ওকে পড়ানোর জন্যই একদিন এই বাড়িতে পা রেখেছিল সিনথিয়া। আর সেই দরজাটা খুলে দিয়েছিল জবা নিজেই। ভালোবাসা দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে, ছোটোবোনের মতো আদর দিয়ে।
আজ ভাবলে জবার বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। নিজের হাতে দুধ-কলা দিয়ে যেন বিষধর সাপ পুষেছিল এতদিন। এই মেয়েটার জন্য কী না করেছে সে! সম্মান দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে, আপন করে নিয়েছে।
আর সেই মেয়েই আজ তার সংসারের ভেতরে ঢুকে তার স্বামীটাকেই চুরি করতে চাইছে।

দুই বছর আগে খুলনায় প্রথম দেখা হয়েছিল সিনথিয়ার সঙ্গে। এক বান্ধবীর বাড়ির পার্টিতে। সেদিন মেয়েটা মাত্র ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছে। প্রথম দেখাতেই চোখ আটকে গিয়েছিল জবার। মায়াময় চেহারা। কথা বলার ভঙ্গি এত কোমল, এত মিষ্টি, যেন শব্দ দিয়ে মানুষকে বশ করতে জানে।

লোকমুখে একটা কথা আছে, চরিত্রহীন মানুষের কথাবার্তা নাকি খুব মিষ্টি হয়।সিনথিয়াকে দেখলে কথাটার সত্যতা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। যেমন সুন্দর তার চেহারা,
তেমনই মন ভোলানো তার হাসি।

কালো দীঘল চোখ, ঘন পাপড়ি, নিখুঁত ভ্রু, গোলাপি ঠোঁট, হাসলেই গালে ছোট্ট টোল পড়ে। দুধে-আলতা গায়ের রঙের সেই মেয়েটাকে যেন সৃষ্টিকর্তা সময় নিয়ে এঁকেছেন। আর হয়তো সেই অপূর্ব সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল তার ভেতরের কুৎসিত মানুষটা।

তারপর একদিন এই শহরে আবার দেখা।
হঠাৎ, অপ্রস্তুত এক বিকেলে। জবাই নিজে সিনথিয়াকে নিয়ে গিয়েছিল কফিশপে।
ওকে নিজের ছোটোবোনের মতোই মনে হয়েছিল ওর। কথা বলতে বলতে জবা জানতে পারল সিনথিয়া টিউশনি করায়।
কিন্তু নতুন শহরে এসে ঠিকমতো কিছু জোগাড় করতে পারছে না।

সেদিন জবা মায়া নিয়েই বলেছিল,
'আমার মেয়েকে পড়াবে?'
সিনথিয়ার চোখ চকচক করে উঠেছিল। খুশি হয়ে বলেছিল,
'তাহলে তো খুব ভালো হয় আপু।'
জবা হাসতে হাসতে বলেছিল,
'তুমি শুধু ওকে পড়াবে না, এই বাড়িতে সব সুবিধাও পাবে।'
সেদিন হয়তো জবা বুঝতেই পারেনি, ও নিজ হাতে নিজের জীবনে বিপদ ডেকে আনছে। জবা বলল,
'সেলারি কত চাও বলো?'
'নার্সারির বাচ্চার আর কত সেলারি চাইব? দুই হাজার দিতে পারবেন?'
'ওকে। তাহলে তুমি শুক্রবার আমার বাসায় এসো। তখন জারার সাথেও কথা বলবে। জারার বাবাও শুক্রবার থাকে। তার সাথেও কথা বলতে পারবে।'
'আচ্ছা আপু।'
'আচ্ছা আমি তবে চলি।'

শুক্রবার বিকেলে সিনথিয়া যখন প্রথম জবার বাড়িতে ঢুকল, ও যেন কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতা ভুলে গেল। এত বড়, এত রাজকীয় বাড়ি ও আগে কখনও কাছ থেকে দেখেনি। লন্ডন কিংবা স্কটল্যান্ডে হলে এ বাড়িকে ক্যাসেল বলে চালিয়ে দেওয়া যেত।
চারপাশে অভিজাত্যের ছাপ। প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা আসবাবপত্রে। যেন কোনো শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে আঁকা রাজপ্রাসাদ।

সাধারণ একটা শাড়ি পরে তাকে স্বাগত জানিয়েছিল জবা। শাড়িটা সাধারণ হলেও,
তার ভেতরের আভিজাত্য লুকোনোর উপায় ছিল না। সিনথিয়া যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছিল। ঘোর কাটল জবার ডাকে,
'আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?'
'জি না। আপনি তো গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।'
জবা মৃদু হাসল।
'এখন থেকে রোজ এই গাড়িই তোমাকে নিয়ে আসবে। তুমি এখানে একজন পূর্ণাঙ্গ টিচারের সম্মান পাবে।'
সিনথিয়া মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ঠিক তখনই
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল ইরফান।
কালো টি-শার্ট, ট্রাউজার, পরিপাটি চেহারা
দূর থেকে যেন সিনেমার কোনো চরিত্র।ইরফানকে দেখতে অনেকটা টম ক্রুজের মতো লাগছিল। লম্বা, ফর্সা, ক্লিন সেইভ করা দাড়ি নীলচে হয়ে আছে। দাঁড়িতে একটা টোল। এত সুন্দর লাগছিল ওকে যে সিনথিয়া মনে মনে বলল,
'একজন পুরুষ এত সুন্দরও হতে পারে?হ্যাজবেন্ড হলে এমন হতে হয়, নয়তো শালার কামলাদের মতো দেখতে ওগুলো স্বামী হিসাবে মানাও কঠিন।'

ইরফান এসে জবার পাশে দাঁড়াল।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
'হেই সুইটহার্ট। কী করছো?'
'জারার নতুন টিচারের সঙ্গে কথা বলছি।'
ইরফান এবার তাকাল সিনথিয়ার দিকে।
হালকা হাসল।
'হ্যালো মিস।'
সেই হাসিটুকুই যথেষ্ট ছিল। সিনথিয়া বুঝতে পারেনি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইরফানের চোখে সে হয়ে উঠেছে নতুন শিকার। ইরফান বলল,
'জারা কোথায়?'
জবা বলল,
'কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ করে বাবা এসেছিলেন। জারা তার সাথে গেছে। এক্ষুনি চলে আসবে।'
ইরফান বলল,
'তো মিস সিনথিয়া আপনি কী করেন?'
'অনার্স করছি।'
'কোন ইয়ার?'
'সেকেন্ড ইয়ার। খুলনা থেকে ট্রান্সফার হয়ে এসেছি।'

'বাহ্। আপনার বাড়ি খুলনায়?'
'জি না। আমার জন্ম এখানেই। এখানেই বড়ো হয়েছি। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার পর বাবার ট্রান্সফার হয়। সো আমাদেরও বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়। ওখানে ইন্টার শেষ করেছি। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। ফাস্ট ইয়ার শেষ হওয়ার আগেই বাবার আবার বদলী হলো। আমি খালার বাসায় থেকে পরীক্ষা দিয়েছি। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা শেষে এখানে বদলী হয়ে এসেছি।'
'বাহ বেশ।'

তখন জারা আসল। জারা এসে সিনথিয়াকে দেখে সালাম করল।
'আসসালামু আলাইকুল ম্যাম।'
'ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো তুমি?'
'ভালো। আপনি?'
'খুব ভালো। তোমার পুরো নাম কি?'
'জারা ইরফান চৌধুরী।'
'বাহ। সুন্দর নাম।'

সিনথিয়া জবাকে বলল,
'আপু, আজ থেকেই কী ওকে পড়াব?'
'তোমার ইচ্ছা।'
'তাহলে কাল থেকে শুরু করি? আজ ওর স্কুল ডায়রিটা আমাকে দিন। আমি কয়েকটা পেপারের ছবি তুলে নিয়ে যাই। ওদের স্কুলের পড়ার ধরণ দেখি। তাতে আমি ওর পড়ার ধাচ কিছুটা আইডিয়া করে বাসায় বসে খানিক হোম ওয়ার্ক করে আসব।'
'ওকে। দ্যাট'স গুড। ওয়েট আমি নিয়ে আসছি।'

জবা চলে যেতেই ইরফান বলল,
'ইফ ইউ ডোন্ড মাইন্ড, একটা কথা বলি?'
'শিওর '
'আপনি দেখতে ভয়ংকর সুন্দর।'

সিনথিয়া লাজুক হেসে। কানের পাশে পড়ে থাকা কয়েকগাছা চুল কানের পিছনে গুজে বলল,
'ধন্যবাদ। আপনিও কিন্তু দেখতে মাশাআল্লাহ। দেখলে মনে হয় না এক বাচ্চার বাবা।'
ওরা দুজনেই লাজুক হাসল।

রাত দশটা।
বারান্দার ইজি চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে আছে ইরফান। চারপাশে নীরবতা। দূরে শহরের ক্ষীণ আলো জ্বলছে। কিন্তু তার চোখে ভাসছে শুধু একটাই মুখ। সিনথিয়া।
তার সৌন্দর্য, তার চোখ, তার হাসি। প্রথম দেখাতেই ইরফান তাকে নিজের টার্গেট বানিয়ে ফেলেছে। মনে মনে বলল,
'এমন সুন্দরীকে ছোঁয়া ছাড়া জীবনই বৃথা।'
ঠিক তখনই কপালে উষ্ণ এক স্পর্শ পেশে
চোখ খুলল ইরফান। দেখল ভালোবাসা ভরা চোখে তাকিয়ে আছে জবা ওর দিকে। জবা ওর ঠোঁটে আলতো চুমু এঁকে বলল,
'কী ভাবছো জান?'
ইরফান এক মুহূর্তে নিজের মুখোশ পরে নিল।
জবাকে টেনে কোলে বসিয়ে গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
'তুমি ছাড়া আর কাকে নিয়ে ভাবব?'

জবা হেসে উঠল। নিঃশর্ত বিশ্বাসে ভরা সেই হাসি। তারপর ইরফানের চুল টেনে মাথা তুলে ওর কণ্ঠনালিতে চুমু এঁকে আদুরে গলায় বলল,
'আমি ছাড়া কারও কথা ভাবতেও যেও না।'
'যদি ভাবি?'

জবা ইরফানের গলায় জোরে কামড় বসাল। ইরফান অভিনয় করে কেঁপে উঠল। জবা বলল,
'একদম কাঁচা খেয়ে ফেলব।'
'ওকে খাও। এখনই খাও। আই ক্যান্ট কন্ট্রোল মাইসেলফ। হয় তুমি আমাকে খাও নাহয় আমায় তোমাকে খেতে দাও।'

জবা হাসল। ভালোবাসা আর ভরসা মেশানো লাজুক হাসি। ওদের হাসি, খুনসুটি, ভালোবাসা, সবকিছু এত সত্যি লাগছিল।
শুধু একজন ছাড়া। ইরফান। কারণ সেই মানুষটার চোখে তখনও ভাসছে অন্য এক নারীর মুখ।

—————

ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। জবা ড্রয়িং রুমে বসে কোরআন তেলায়ত করছে। পাশেই জারাও সিপারা পড়ছে। জবা খুব ফ্যাশন সচেতন, স্বাধীনতাকামী নারী হলেও ও নিজ ধর্মকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। আল্লাহর প্রতি ওর অগাত বিশ্বাস। ও সবসময় বলে ওর এত সুখ মহান রব দান করেছেন। তাই তার শুকরিয়া আদায় করা জরুরি। 

ইরফান নামাজ রোজা তেমন করে না৷ অনেকটা নাস্তিক টাইপ৷ মাঝে মাঝে মন চাইলে জুম্মাবারে মসজিদে যায় নয়তো বাড়ি বসে নামাজ পড়ে না। জবা ওকে এত বোঝায় ও তাও শোনে না। ইরফান অবশ্য ইচ্ছা করেই নামাজ রোজা করে না। ওর ধারণা নামাজ রোজা করলে ও যে খারাপ কাজ গুলো করছে তা করতে পারবে না। ইরফানের আসল রূপ আর উদ্দেশ্য থেকে জবা একদমই অবগত ছিল না তখন।

জারাকে সিপারা পড়ায় সহায়তা করছিল এক মধ্যবয়স্ক মহিলা খাদিজা৷ তিনি হাফেজা। জবার বাড়ির আশ্রিতা তিনি৷ পরিস্থিতি তাকে আশ্রিতা করেছে। জীবনের ঝড়ে ভেসে এসে আজ তিনি জবার আশ্রয়ে। তিনি অনেক সুন্দর কোরআন তেলায়ত করেন। যার কারণে জবা তাকে অনুরোধ করেছে জারাকে কোরআন পড়া শেখাতে। সে যখন জারাকে কোরআন পড়া শেখায় তখন জবাও পড়ে। জবার ভুল হলে তিনি শুধরে দেন।

পড়া শেষে জবা বলল,
'খাদিজা আপা৷ জারার টিচার কদিন যাবত জারাকে পড়াচ্ছে। মেয়েটাকে কেমন মনে হয় আপনার?'
'দেখতে অতি সুন্দরী মাশাআল্লাহ। জারাকে খুব সুন্দর বুঝিয়ে গুছিয়ে পড়ায়। আমার তো তাকে ভালোই লাগছে।'
'যাক আপনার ভালো লাগলে সে নিশ্চয়ই ভালো মানুষ।'

'এটা কোনো কথা না জবা। আমার ভালো লাগার মানুষই যে ভালো হবে তেমন তো কথা নেই। মহানবীর চাচাদের কি তার ভালো লাগল না? লাগত, কিন্তু তারা কিন্তু তার বিপক্ষে ছিল।'

জবা হেসে বলল,
'আপা আপনি কত জ্ঞানী।'
'না সোনা। আমি জ্ঞানী না। তবে তুমি মানুষ চেনার চেষ্টা করবে।'
'জি আচ্ছা।'

—————

সিনথিয়া আজ পড়াতে আসল সন্ধ্যা নাগাদ। তখন খাদিজা, জারা বা জবা কেউ বাড়িতে ছিল না। ইরফান একা কেবল একা বাড়িতে। ইরফান ইচ্ছা করেই বাড়িতে একা থাকল। জবা ইরফানকে আগেই বলেছিল সিনথিয়াকে কল করে বলতে যে আজ জারা পড়বে না, কিন্তু ইরফান ইচ্ছা করে তা বলেনি। আজ সিনথিয়াকে নিজের ফাঁদে ফেলার প্রথম টোপটা ফেলবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp