হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ১৪ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          আইরিনের সাথে আজকের দিনে কুলসুম বেগম কি কথা বলবেন ভেবে পান না। মেয়ের সাথে শুধু এই বিষয়েই তার আজন্মের জড়তা। এতোদিন হয়ে গেল একবার ও মেয়ে তার বাপের সাথে কথা বলতে রাজি হলো না।

 যতবার তিনি নামটা উচ্চারণ করেছেন ততবারই মেয়েটা কল কেটে দিয়েছে। রফিক সরকারের সাথে কামিনীর ও খুব স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক নেই। মার বা গালাগাল কম খায়নি। কিন্তু বাবার প্রতি সেরকম আক্রোশ ধরে রাখতে পারে না, ভালো ব্যবহার করলেই নত হয়ে যায়। কিন্তু বড়ো মেয়ের রাগ, জেদ, বিদ্বেষ আকাশস্পর্শী। তিনি আয়নার দাদী শাশুড়ীর সাথে কয়েকবার কুশল বিনিময় করেছেন। এক পর্যায়ে বৃদ্ধা মেয়ের চালচলনের পাশাপাশি নাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তখনই কুলসুম বেগম বুঝতে পারেন যে আইরিন নামটা সেখানে তার নতুন জীবনে স্থান পায়নি। সেখানে সে শুধু আয়না। 

এই আইরিন নাম ব্যবহার করতে বলার এখতিয়ার তার নেই। আইরিন নাম রফিক সরকারের মায়ের দেওয়া। আয়না নামটা আইনুন নাহার তার একমাত্র মেয়েকে ভালোবেসে দিয়েছিলেন। মেয়েকে চেয়েছেন আয়নার মতো স্বচ্ছ, সত্য ও অটল। আঘাতে আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড হলেও আয়না নিজের ধর্ম হারায় না। অটল থেকে সত্য প্রতিবিম্বিত করে।

আয়নার কাছে তার চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই। কুলসুম বেগম তাই মুখ ফুটে আজকের দিনে কি কি হবে তা বলতে পারলেন না। আয়না নিজেও জানে আইনুন নাহারের মৃত্যু বার্ষিকী নিয়ে রফিক সরকারের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। তিনি গ্রামের বাৎসরিক উরুসের আয়োজন দেখে বেড়াচ্ছেন।

কুলসুম বেগমের মাঝে মাঝে নিজেকে অপরাধী লাগে। আয়নার মায়ের মৃত্যুর চার মাসের মাথায় তাকে প্রথম দেখতে এসে পছন্দ করেন রফিক সরকার, এবং সেরাতেই কবুল পড়িয়ে নিয়ে যান। দরিদ্র পরিবারের জন্য এতো ভালো ঘর আর বর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো ছিল। প্রথম পক্ষের একটা মেয়ে থাকা কোনো ব্যাপার ছিল না। কুলসুম বেগমের খোদা সাক্ষী তিনি একদিনের জন্যেও আয়নার সাথে কামিনীর কোনো তফাৎ করেননি। আজীবন চেষ্টা করেছেন যেন কেউ জানতেই না পারে যে আয়না তার গর্ভস্থ সন্তান নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার ঘরেই ছিল পক্ষপাতের দৃষ্টান্ত। 

এমনিতেও কুলসুম বেগম জানেন, আয়নাকে জন্ম দেওয়া তার সাধ্যি ছিল না। কঠিন মার খেয়েও যখন এইটুকুন মেয়ে পলকহীনভাবে চোখে চোখ রাখতো তখন তার বুক হুহু করে উঠতো। এতো জেদ, এতো দুঃসাহস! কিভাবে নিজেকে পিছুটান হতে মুক্ত রাখে সে!

আয়না তার ধ্যান ভাঙিয়ে বলে, আর কিছু বলবা? 

-না। তুই ভালো মতো খাওয়া দাওয়া করিস। জামাইয়ের খেয়াল রাখিস। যত্ন-আত্তি করিস। তর্ক করবি না মোটেও। 

-যতটুকু করার তা করবো। 

-কথাবার্তা ঠিক করে বলবি। নরম সুরে না বললে সবাই তো অহংকারী বলবে। মানুষের মনে মায়া জন্মাবে না। 

-দয়া মায়ার প্রয়োজন নেই তো আমার। আর আমি ভালো ব্যবহারই করি। 

-তাইলে দাদী শাশুড়ী এমন কথা বললো কেন? নরম হ মা। অন্যসব কাম-কাজ বন্ধ কর। মন জয় করার দিকে মনোযোগ দে। যা যেরকম পছন্দ করে সেমনে কর।

-তুমি করতে পেরেছিলা মন জয়? পছন্দ করেই তো এনেছিল? এখনো তো কথা শোনানো বন্ধ করে নাই। শুনো যাদের পছন্দ করার নিয়ত নেই তাদের কাজের মাধ্যমে জান দিলেও পছন্দ করবে না। দোষ খুঁজে পাবে।

-এত জ্ঞানী কথা শুনতে চাই নাই। অন্য বাড়ি গেলে সব মেয়েরই একটু ছাড় দিতে হয়রে মা।

-তুমি ফোন রাখো। স্বামী সেবা করো যাও।

-জামাই কই? 

-অফিসে। আসলে কথা বইলো। তবে দরকার কি?

-এতো গা-ছাড়া হইলে হয়? তুই কি আমারে পাগল বানায় দিবি!

—————

আয়নার ফোনে মাহিরের কল এল। অফিসের ব্যস্ত সময়ে মাহির সাধারণত ফোন করে না, করলেও কথা হয় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। আয়নার খোঁজ-খবর নেওয়ার পর নিজের গরজে কতটুকুই আর ফোনালাপ এগিয়ে নেওয়া যায়?

 কিন্তু আজ মাহিরের গলার স্বরে এক ধরনের দ্বিধা এবং তাড়া অনুভব করল আয়না।

​-আয়না, একটা ছোট কাজ করে দিতে পারবে?
  মাহির কিছুটা কুণ্ঠিত হয়ে শুরু করল।

মাহিরের মতো তুচ্ছ বিষয়েও ব্যাপক স্বাবলম্বী ব্যক্তির মুখে এ কথা শুনে ​আয়না একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 
কী কাজ? বলো।

​-আসলে ম্যানেজার খুব হুট করেই একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমাকে এখনই অফিসের কাজে বরিশালের দিকে রওনা দিতে হচ্ছে। জরুরি সাইট ভিজিট। আমি বাড়ি আসছি, কিন্তু হাতে একদম সময় নেই। বাস ধরার জন্য সাথে সাথেই আবার বের হতে হবে। তুমি কি আমার একটা ট্রাভেল ব্যাগ গুছিয়ে দিতে পারবে? আমি এসেই শুধু ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যাব।

​আয়না সামান্য সময় নিয়ে বলল, আচ্ছা, আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।

​ফোন রেখে দিয়ে আয়না কিছুক্ষণ আলমারির সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিয়ে হওয়ার পর এই প্রথম সে মাহিরের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিচ্ছে, একা হাতে মাহিরের ব্যাগ গুছাচ্ছে। কাজটা শুনতে খুব সাধারণ হলেও, একজন নতুন বিবাহিত স্ত্রীর কাছে এই প্রথমবার স্বামীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র স্পর্শ করা এবং গুছিয়ে দেওয়ার মধ্যে হয়তো আনন্দ ও যত্ন কাজ করে, তবে এইক্ষেত্রে মেয়েটা আয়না হওয়ায় তার মধ্যে কাজ করছে জড়তা।

​সে আলমারি খুলে মাহিরের ট্র্যাভেল ব্যাগটা বের করল। প্রথমে সে তার ইস্ত্রি করা শার্টগুলোর দিকে হাত বাড়াল। মাহির নিজেই রাতের বেলা এ কাজগুলো করে। মাহিরের গায়ের সেই চেনা পারফিউমের হালকা ঘ্রাণ নাকে এল।
আয়না খুব সাবধানে শার্টগুলো ভাজ করল যেন একটা ভাঁজও নষ্ট না হয়। শার্টের সাথে মিলিয়ে প্যান্ট আর অফিসের প্রয়োজনীয় কিছু ফরমাল পোশাক সে ব্যাগের একপাশে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখল।

​কাপড় গোছানো শেষ করে আয়না মাহিরের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত জিনিসের দিকে মনোযোগ দিল। কতদিন থাকতে হবে কে জানে? কিছুই তো সে জিজ্ঞেস করল না।
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে মাহিরের শেভিং কিট, টুথব্রাশ আর চিরুনি বের করে আনল। এই ছোট ছোট জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করার সময় আয়না এক ধরনের সূক্ষ্ম কৌতূহল অনুভব করল। প্রতিদিন সকালে মাহিরকে পরিপাটি হয়ে বের হতে দেখে সে, কিন্তু আজ তার ব্যবহৃত জিনিসগুলোর সান্নিধ্যে এসে মাহিরের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট টুকরোগুলো তার কাছে নতুন করে ধরা দিতে থাকে।

​একটি ছোট পাউচ ব্যাগে ওষুধ আর রুমাল রাখার সময় আয়না দেখল মাহিরের ড্রয়ারের পিছনের পাশে পুরনো একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি রাখা। সেদিকে তাকিয়ে তার হাতটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মানুষগুলোকে সে চেনে না।! 

হয়তো এটি মাহিরের বাবা-মায়ের ছবি। মাহিরের বাল্যকালের নীরব সাক্ষী। আয়না ছবিটি হাতে তুলে নিল না, কিন্তু তার মনে এক গভীর ভাবনার উদ্রেক হলো। মানুষটাকে সে যতটা গম্ভীর ভাবে, তার আড়ালে হয়তো এমন অনেক ছোট ছোট গল্প লুকিয়ে আছে যা সে এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। 

​ব্যাগ গুছানোর প্রতিটি মুহূর্তে আয়না অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে দিয়ে যায়। তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল। এটি কেবল একটি ঘরোয়া কাজ নয়, বরং দম্পতির মধ্যে তৈরি হওয়া এক ধরনের অলিখিত ঘনিষ্ঠতা।

​সে বাড়তি একজোড়া জুতো এবং চার্জারও ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। ব্যাগটা চেইন দিয়ে আটকানোর পর আয়নার মনে হলো, এমন ক্ষুদ্র কাজের মধ্য দিয়ে সে মাহিরের জীবনের একটা অংশে অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছে। এত দিন তাদের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল, তার আয়ুকাল বেশিদিন হবে না।

—————

বিকেলের দিকে আহমেদ নিবাসে চা-নাস্তার চিরাচরিত ব্যস্ততা থাকে। ডাইনিং সংলগ্ন বসার ঘরে পরিবারের সবাই একে একে জড়ো হচ্ছে। রামিনকে এরকম উপলক্ষ্য ছাড়া খুব একটা বের হতে দেখা যায় না। শারমিন আরা ম্যাগাজিন নিয়ে বসেন আর মনসুর আলম শব্দহীন টেলিভিশনে মগ্ন হোন। দিনা মিনি আসলে কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দ আর হালকা গল্পগুজবে ঘরটা সজীব হয়। নিচে দরজার পাশেই আয়নার গুছিয়ে দেওয়া ট্রাভেল ব্যাগটা রাখা আছে, মাহির এলেই যেন চট করে ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

​মাহির যখন ঘরে ঢুকল, তার চোখেমুখে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ও গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া স্পষ্ট। অফিসের পলিটিক্স ব্যাপারটাও জটিল হয়। নবীনদের ওপর অপ্রিয় কাজগুলোই বেশি চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার সাথেও তেমন হয় না তো?

 তবে তাড়াহুড়ো থাকলেও সে বড়দের প্রতি সৌজন্য ভোলেনি। সে প্রথমে এগিয়ে গিয়ে কদমবুসি করে দাদী আর চাচার দোয়া নিল। চাচীর সাথেও কুশল বিনিময় করল কিছুক্ষণ, পায়ে হাত দেওয়া শারমিন আরার পছন্দ না। তিনি বেশিক্ষণ কথাও বললেন না। 

এরপর মাহিরের উৎসুক দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো আয়নার ওপর। পরিবারের সবার উপস্থিতিতে তাদের কথোপকথন হলো বেশ সংক্ষিপ্ত এবং আড়ষ্ট, কিন্তু সেখানে স্নিগ্ধ যত্ন লুকিয়ে ছিল।

​মাহির আয়নার কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, রাতে ঘুমানোর আগে জানলাগুলো ভালো করে আটকে দিও। একা যদি ভয় লাগে, তবে মিনা বা দিনাকে উপরে ডেকে নিও। আমি বলে দিয়েছি আগেই। সংকোচ করো না।

​মাহিরের এই অপ্রত্যাশিত উদ্বেগে আয়না কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জমা ছিল। হয়তো সে বলতে চেয়েছিল বরিশালের রাস্তা এখন কেমন, সাথে আর কে যাবে কিংবা ফিরতে কতদিন লাগবে। কিন্তু গলার কাছে কথাগুলো দলা পাকিয়ে গেল, কিছুই বের হলো না। 
সে শুধু নিচু স্বরে এটুকুই বলতে পারল, তুমিও নিজের খেয়াল রেখো।

​খুব সাধারণ এই বাক্যটি মাহিরের মুখে এক চিলতে প্রশান্তি এনে দিল। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নিতে চাইলে, আয়না হঠাৎ তাকে বাধা দিয়ে বসল।

​-খালি পেটে বাড়ি লং জার্নির জন্য বের হবে না। কিছু খেয়ে নাও।

 আয়নার স্বরে এক ধরণের মৃদু জোর ছিল। মাহির এধরণের প্রথাগত কথা তার মুখে আশা করেনি।

​মাহির একটু ইতস্তত করে বসল। আয়না চা ঢালতে গিয়ে দেখল টি-পট একদম খালি। সামান্য লজ্জিত হয়ে সে দ্রুত বলল, 
টি-পটে চা শেষ হয়ে গেছে, আমি পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ চা করে আনছি। তুমি একটু বসো।

​মাহির হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল, সময়টা যেন মনে মনে হিসেব করে নিল সে। তারপর কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, 
পাঁচ মিনিট হাতে আছে কি না নিশ্চিত নই। বাস মিস হয়ে যেতে পারে।

​আয়না ওমনি চুপ হয়ে গেল। তার মনে হলো মাহিরকে অহেতুক আটকে সে হয়তো ভুল করেছে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মাহির হঠাৎ আয়নার হাতে থাকা অর্ধেক কাপ চায়ের দিকে হাত বাড়াল। আয়না কিছু বোঝার আগেই সে কাপটি হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল।

​আয়না বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে বলে উঠল, আরে! ওটা তো আমার এঁটো চা!

​মাহির কাপে চুমুক দিয়েই নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, আমি জানি।

​আয়না আরও বেশি হকচকিয়ে গেল। সে দ্রুত বলতে লাগল, 
কিন্তু চা তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে! তুমি বসো, আমি চট করে গরম চা এনে দিচ্ছি।

​মাহির হালকা একটু হাসল। তার সেই হাসিতে শান্ত দখলদারিত্ব ছিল। সে কাপের বাকি চা টুকু শেষ করে বলল, ঠিক আছে, এই চা-টাই পারফেক্ট ছিল।

​চা শেষ করে সে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ব্যাগের হ্যান্ডেলটা ধরল। আর কোনো কথা না বলে সে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।

 আয়না সেখানেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ব্যবহৃত কাপ থেকে মাহিরের চা খাওয়ার এই অতি সাধারণ অথচ গভীর ব্যক্তিগত মুহূর্তটি তাকে ভেতরে ভেতরে নাড়া দিয়ে গেল। এই ছোট অকৃত্রিম ঘনিষ্ঠতা তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।

—————

রাত বাড়ার সাথে সাথে আহমেদ নিবাসের প্রতিটি ঘর নিস্তব্ধ হয়ে এল। বাড়ির সবাই একে একে নিজ নিজ ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। চিলেকোঠার এই ঘরটিতে আয়না আজ একা। মিনু নিজেই আয়নার সাথে থাকতে চেয়েছিল তবে এতে শারমিন আরার অসন্তোষ স্পষ্ট ছিল। এ নিয়ে আয়না কোনো ঝামেলা চায়নি।

চারদিকের পরিচিত নিস্তব্ধতা আজ কেন জানি তার কাছে অন্যরকম মনে হচ্ছে। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আরো অনেক আগে থেকেই সে নিজের মনে খুব পরিষ্কার একটা ছক এঁকে নিয়েছিল। সে স্থির করেছিল, নিজের দায়িত্বগুলো সততার সাথে পালন করবে। মাহিরের প্রতি সম্মান বজায় রাখবে এবং একটি মার্জিত দূরত্ব বজায় রেখে সংসার করবে, এর বেশি কিছু নয়।

 ভালোবাসা, আবেগীয় নির্ভরতা বা মায়ার টানকে সে তার এই পরিকল্পনার সীমানার বাইরে রেখেছিল। আয়না বিশ্বাস করে, আবেগ মানুষকে দুর্বল করে দেয় এবং সেই দুর্বলতাই এক সময় অনিবার্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে, আবেগ বা প্রতিশ্রুতি সব সময় স্থায়ী হয় না। তাই সে চেয়েছিল নিজের মনকে সুরক্ষিত রাখতে, যাতে পরবর্তীতে কোনো আঘাতে তাকে রক্তাক্ত হতে না হয়।

​কিন্তু আজ এই নিঝুম ঘরে একা শুয়ে আয়না ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, তার সেই সুনিপুণভাবে তৈরি করা দেয়ালটি কোথাও একটা ধসে পড়তে শুরু করেছে। কখন আর কীভাবে মাহিরের নিঃশব্দ যত্নগুলো তার মনের গভীরে ঢুকে পড়েছে, সে টেরই পায়নি।

​বিছানায় শুয়ে সে অবচেতনভাবেই মাহিরের অনুপস্থিতি অনুভব করছে। ভদ্রলোকের রাতের ছোট ছোট রুটিনগুলো এখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে মাহির একবার ছাদে বা নিচের উঠানে যেত সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখতে। ঘরে ফিরে সে প্রতিটি জানালা পরীক্ষা করত, ঠান্ডা বাতাস আটকানোর জন্য পর্দার ফাঁকে ভারী কাপড় গুঁজে দিত। কোনো বাড়তি কথা না বলে, কোনো কৃতজ্ঞতার আশা না রেখেই সে চা বানিয়ে দিতো ও মশারি টানাত। এই কাজগুলো সে এমনভাবে করত যেন এগুলো তার স্বভাবজাত অংশ, কোনো মহত্ত্ব জাহির করার বিষয় নয়।

​আজ সেই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো মাহিরের অনুপস্থিতিতে অনেক বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। সিঙ্গেল বিছানাটা আজ তার কাছে বেশ বড় মনে হচ্ছে। পাশের খালি জায়গাটুকু বিষাদ ও নিঃসঙ্গতা বয়ে আনছে, যেখানে গত কয়েক দিন মাহিরের শরীরের একটা স্থির উষ্ণ উপস্থিতি থাকত। আয়নার মনে পড়ল মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে কখনো সখনো মাহিরের হাতটা তার হাতের ওপর বা কাঁধের কাছে আলতো করে এসে পড়ত। একটা হাত চলে যেত উদরে। সংবিৎ পাওয়া মাত্র ভদ্রলোক হাত সড়িয়ে নিতো ঠিকই তবে নিজের সময়ানুযায়ী। 

অনাকাঙ্ক্ষিত সেই স্পর্শগুলো তখন তাকে বিরক্ত করত কিংবা সে সেগুলোকে উপেক্ষা করত। কিন্তু আজ রাতে বারবার সেই শূন্য জায়গাটুকুর দিকে তাকাতে গিয়ে তার ভেতরটা হু হু করে উঠছে।

​আয়না নিজেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু নিজের কাছেই আজ সে ধরা পড়ে যাচ্ছে। এই শূন্যতা, এই খচখচানি তাকে অস্থির করে তুলছে। সে বুঝতে পারছে যে বিয়ের শুরুতে সে নিজেকে যে দূরত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা আজ আর আগের মতো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। মাহির কেবল তার স্বামী হিসেবে নয়, বরং তার অভ্যাসের এক বিশাল অংশ জুড়ে জায়গা করে নিয়েছে। যা এই রজনীর দূরত্ব তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

—————

পরদিন সকালে আয়না তার ছাদমুখী জানালার ধারে বসেছিল, এমন সময় নিচের রাস্তা থেকে সবজিওয়ালার চেনা হাঁকডাক তার কানে এল। হুট করেই তার মনে হলো রাতের রান্নার জন্য কিছু তাজা সবজি কিনে রাখলে মন্দ হয় না। কতদিন সে মনমতো কিছু রান্না করে না। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য এইটুকু করা তার প্রয়োজন। বাড়ির বাইরে পা রাখা প্রয়োজন।

 সাধারণ চিন্তাটুকু নিয়েই সে ঘর থেকে বের হয়ে এল এবং ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
​আয়না দোতলার ল্যান্ডিংয়ে এসে পৌঁছাল, তখন একদম অপ্রত্যাশিতভাবে তার সামনে এসে পড়ল রামিন। রামিন তখন কেবল শর্টস পরে বেশ ক্যাজুয়ালভাবে নিজের ঘরের সামনের বারান্দার দিকে যাচ্ছিল। বাড়িতে সচরাচর নিজের বোনরা ছাড়া আর কেউ থাকে না বলে সে এভাবেই অভ্যস্ত।

 কিন্তু হুট করে আয়নাকে সামনে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার চোখেমুখে এক তীব্র অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে উল্টো দিকে ঘুরে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল এবং সজোরে দরজা আটকে দিল।

​ঘরের ভেতর ঢোকার পর রামিনের সেই লজ্জাটুকু মুহূর্তেই বিরত্তিতে রূপান্তরিত হলো। কয়েক দিন আগেই মাহির তাকে খুব আলাদা করে বুঝিয়েছিল যে এখন বাড়িতে তাদের বোনরা ছাড়াও অন্য একজন নারী থাকেন। তাই রামিন যেন বাড়ির ভেতর চলাফেরার সময় পোশাক-আশাকের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকে, যাতে বাড়ির নতুন বউয়ের কোনো অস্বস্তি না হয়। মাহির কথাগুলো খুব মার্জিতভাবে বলেছিল, কিন্তু চাচাতো ভাইয়ের সেই উপদেশ রামিনকে এখন ভেতরে ভেতরে খচখচ করছে।

​রামিনের এই বিরক্তি কেবল আজকের এই ঘটনা কেন্দ্র করে নয়; বরং বেশ কিছুদিন ধরেই তার ভেতর একটা ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। মাহির ভাইয়ের বিয়ের পর থেকেই তাদের মা, শারমিন আরা সারাক্ষণ এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ও অতৃপ্তির মধ্যে থাকছেন। রামিনের মা যখন বিরক্ত থাকেন, তখন পুরো বাড়ির পরিবেশই অসহ্য হয়ে ওঠে।

 ইদানীং তিনি রামিনের ওপর বেশ চড়াও হচ্ছেন। সারাক্ষণ তাকে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা, পড়াশোনায় সিরিয়াস হওয়া এবং জীবনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ রামিন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা দিয়েছে, বয়স তার মাত্র ১৯ কি ২০। এই বয়সে জীবন নিয়ে গভীর চিন্তা বা দায়িত্বের পাহাড় তার কাছে এক বড় বোঝা মনে হয়। যখনই সে তার ভবিষ্যৎ বা পরিবারের প্রত্যাশার কথা ভাবে, তখনই এক ধরনের দিশেহারা বোধ তাকে গ্রাস করে। এই অস্থিরতা থেকে বাঁচতেই সে সারাদিন পিসিতে গেম খেলে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে চায়। তার মনের এক কোণে মাহিরের প্রতিও একটা প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষ কাজ করে। তার মাঝে মাঝে মনে হয়, তাদের পারিবারিক সম্পদগুলো যদি আজও অক্ষত থাকতো তবে তার জীবনটা অনেক বেশি সহজ ও আরামদায়ক হতো। এই বয়সোচিত দ্বন্দ আর অযৌক্তিক ভাবনাগুলো রামিনের তরুণ মনে অনবরত ঘুরপাক খেতে থাকে। তার কিছুই ভালো লাগে না এখন আর!

​ আয়না সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। সে বড় গেট খুলে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো সবজিওয়ালার কাছে গেল। ঝুড়ি থেকে বেছে বেছে সে কিছু টাটকা সবজি আলাদা করতে লাগল। তার পরনের ফিরোজা রংয়ের সুতি শাড়িটা বিকেলের মৃদু বাতাসে হালকা উড়ছিল। সবজি বাছাইয়ের ফাঁকে সে একটু সময় নিয়ে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করল। আহমেদ নিবাসের এই কলোনির সরু রাস্তাটা এখন কর্মব্যস্ততায় বেশ সচল। 

​আয়নাকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশের দালানের কয়েকজন নারী তাকে সম্ভাষণ জানাতে এগিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে একজন আবার তাদেরই বাড়ির নিচতলার ভাড়াটে। তাঁরা বেশ আন্তরিকতার সাথে আয়নার সাথে আলাপ জুড়ে দিলেন।
-মাহিরের বউ না? কেমন আছ? তোমাকে তো দেখাই যায় না! বের টের হও না বুঝি? এই এলাকায় মানিয়ে নিতে কি খুব সমস্যা হচ্ছে?

তাদের মধ্যে একজন বেশ বন্ধুসুলভ গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

​আয়না মৃদু হেসে খুব শান্তভাবে তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগল। কথাগুলো ছিল খুবই সাধারণ আবহাওয়ার হালচাল কিংবা এলাকার পরিবেশ নিয়ে টুকটাক আলাপ। তবুও এই ছোট কথোপকথনগুলো আয়নার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে অনুভব করল, নিশিখালির সেই অবারিত মাঠের তুলনায় এই শহুরে জীবন অনেকটা ঘিঞ্জি হলেও এখানকার মানুষের ভেতরেও একটা অলিখিত সমাজ আছে। আয়না ধীরে ধীরে এই নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে পরিচিত করে তুলল।

সবজিগুলো হাতে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে আয়না সরাসরি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরে তখন বেশ কর্মব্যস্ততা চলছে চুলা জ্বালিয়ে রহিমন বুয়া কিছু একটা কষাতে ব্যস্ত। মিনি কিচেন কাউন্টারের এক কোণে বসে পড়া ফাঁকি দিয়ে তার সাথে আড্ডা দিচ্ছে আর ডাইনিং টেবিলের ধারে বই সামনে নিয়ে বসে আছে দিনা।

আয়না ভেতরে পা রাখতেই তিনজনই একসাথে মুখ তুলে তাকাল। তাদের চোখেমুখে বিস্ময় স্পষ্ট। বিয়ের প্রথম কয়েকটা দিন আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার্থে আয়না একবার-আধবার এখানে এলেও, বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় তারপর থেকে সে নিজেকে এই অংশ থেকে সরিয়েই রেখেছিল। পুরো বাড়িতে এটি এক অলিখিত নিয়ম যে রান্নাঘর মানেই শারমিন আরার একচ্ছত্র এলাকা সেই সীমানার কথা পরিবারের সবাই কোনো আলোচনা ছাড়াই মেনে চলে।

​কিন্তু আজ আয়না কারো অনুমতির তোয়াক্কা করল না, এমনকি আগে থেকে কাউকে কিছু জানানোর প্রয়োজনও বোধ করল না। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবজিগুলো কাউন্টারের ওপর রাখল, কলের নিচে একে একে সেগুলো ধুয়ে নিল এবং তারপর বটি নিয়ে কাটতে বসে গেল।
​রহিমন বুয়া হাতের খুন্তি থামিয়ে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আয়নার দিকে তাকাল। সে নিচু স্বরে সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করল, নয়া বউ, আপনি একী করতেছেন?

​পানির ঝাপটায় সবজি ধুতে ধুতে আয়না নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, আমি এগুলো রান্না করব বুয়া। গত কয়েকদিন ধরে নিজের পছন্দের কয়েকটা পদের কথা খুব মনে পড়ছিল। নিচে যখন দেখলাম সবজিগুলো খুব টাটকা, তখন ভাবলাম নিজেই রেঁধে নেই।

​রহিমন বুয়া মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। গত কয়েকদিনে সে নতুন বউকে দেখেছে খুব শান্ত, গম্ভীর আর কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা একজন মানুষ হিসেবে। আয়নার চেহারায় সবসময় একটা তীক্ষ্ণ ও সংহত ভাব থাকলেও প্রতিবাদ না করায় বুয়া ভেবেছিল মেয়েটি হয়তো নরম প্রকৃতির। দয়া হয়েছিল তখন!

কিন্তু আজ সে দেখল আয়নার কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত দৃঢ়তা। বুয়া মনে মনে ভাবল, শারমিন আরা এটা কোনোভাবেই ভালোভাবে নেবেন না। নতুন বউ তাঁর একদম অপছন্দ। তার রান্নাঘরে ঢুকে মর্জি মতো খাবার রাঁধছে, এটা ভাবলেই একটা ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে বলল, কিন্তু ভাবী! এইসব শাক তো তারা খাবে না লাগে। 

-আমি খাই, আমার পছন্দ।

-আপনের মতো তারা ঝাল ও খাইতে পারে না।

-কম ঝাল দিব, সমস্যা নেই।

-তাও তো খাবে মনে হয় না আমার। তাদের অনেক বাছবিচার আছে।

-তাহলে আপনি তাদের জন্য যা খায় তাই রাঁধুন। অনেক সময় আছে।

​ঠিক সেই মুহূর্তে দিনা তার পড়ার বইটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। সে আয়নার কাছে এগিয়ে আসতেই তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। দিনার এই ভঙ্গিটা দেখতে অনেকটা শারমিন আরার ছোট সংস্করণের মতো।

​সে সোজাসুজি কর্কশ স্বরে বলল, আপনার রান্নার কোনো দরকার নেই। অযথা এই ঝামেলা করার তো কোনো মানে হয় না। বুয়ার রান্না তো ভালো। এতদিন খেতে তো কোনো সমস্যা হয়নি। আজ কি হলো?

​আয়না সবজি কাটা বন্ধ না করেই খুব সাধারণভাবে জবাব দিল, আমার রান্না করতে ইচ্ছে করছে।

​দিনা বিরক্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
আপনি বুঝতে পারছেন না এমন তো নয়। মা এটা মোটেও পছন্দ করবেন না। কেন শুধু শুধু ওনাকে রাগানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন? আপনাকে রান্না করতে হচ্ছে না, এটা তো আপনার জন্য ভালোই। এসব অযথা না করে খুশি থাকা উচিত।

​আয়না এক সেকেন্ডের জন্য হাত থামাল, দিনার কথাগুলো যেন মনে মনে ওজন করল সে। তারপর বলল, সেটা ভেবে আমি দেখব।

​আয়নার এই উত্তর দিনাকে আশ্বস্ত করার বদলে আরও বেশি বিভ্রান্ত করে তুলল। সে কোনোভাবেই আশা করেনি আয়না এমন আচরণ করবে। এতদিন পর্যন্ত তাকে মনে হয়েছিল খুব সতর্ক, যেন এই পরিবারের সবার সাথে মেপে মেপে পা ফেলছে। অথচ এখন হঠাতই সে এক নীরব আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করছে। দিনা ভাবল, মাহির ভাইয়া কি যাওয়ার আগে ওকে আলাদা করে কিছু বলে গেছেন? কোনো সাহস বা বিশেষ কোনো অধিকার দিয়েছেন? কিন্তু সেই যুক্তিটাও পুরোপুরি ধোপে টিকছে না।

​ওদিকে ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে মিনি পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখেমুখে এক ধরণের গোপন উল্লাস। আয়নার এই নতুন রূপটা তার কাছে বেশ সতেজ মনে হচ্ছে। সে বেশ বুঝতে পারছে বাড়ির বাতাসে একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে এবং সে সেটা বেশ উপভোগই করছে।

​তবে দিনা হাল ছাড়ল না। সে শেষবারের মতো চেষ্টা করল।
​সে একটু কঠিন গলায় বলল, আপনি আসলেই এটা করতে যাচ্ছেন? জেনে শুনেও যে মা রাগ করবেন?

​আয়না থামল না। স্থির হাতে সবজি কাটতে কাটতে সে খুব শান্ত স্বরে বলল, তোমার মায়ের রাগের ব্যাপারে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।

​দিনা চোখের পলক ফেলল, কথাটি শুনে সে রীতিমতো চমকে গেছে।

​আয়না সবজি কাটা শেষ করে একবার দিনার দিকে তাকাল। তারপর আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বলল,

 আমি সারা জীবন নিজেকে নিজের ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখতে পারব না। তোমার মা এবং আমার - আমাদের দুজনেরই এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। আমাদের একসাথে থাকতে শেখাটা খুব জরুরি। নাহলে উনারই অস্বস্তি বাড়তে থাকবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp