রাতটা অদ্ভুত নীরব ছিল। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, আর বিশাল বাড়িটার করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক চাপা নিস্তব্ধতা। জবা ধীরে ধীরে ইরফানের স্ট্যাডি রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই থমকে গেল।
ইরফান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ আধবোজা। হাতে ধরা বইটা আঙুল ফসকে মেঝেতে পড়ে গেছে, অথচ সে যেন টেরই পায়নি। সামনে আধখালি হুইস্কির গ্লাস। টেবিলের উপর এলোমেলো কিছু ফাইল।
জবার বুকটা হালকা ধক করে উঠল।
ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
'নিশ্চয়ই টেনশনের কিছু হয়েছে। নয়তো এমনটা করত না। ওর হাত থেকে বই নিচে পড়ে গেছে। অথচ ও ভ্রুক্ষেপ করছে না? স্ট্রেঞ্জ! অথচ ইরফানের বই মানে ওর আলাদা আরেক দুনিয়া। অনেক বেশি চিন্তিত না থাকলে ও অ্যালকোহলও নেয় না। কী হয়েছে ওর?'
জবা ইরফানের কাছে গিয়ে বইটা তুলে টেবিলে রাখল। দ্যা অ্যালকেমিস্ট। এটা ইরফানের সবচেয়ে পছন্দের বই। কেন পছন্দ তা জবা জানে না। জবা ওকে ধরে বলল,
'রুমে চলো।'
ইরফান আধো নেশাগ্রস্ত চোখে তাকাল। তারপর শিশুর মতো অনুগত হয়ে জবার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। রুমে ঢুকতেই নেশা মেশানো ভারী কণ্ঠে বলল,
'অনেক দিন পর আজ কয়েক পেগ খেলাম। প্লিজ জান রাগ করো না। একটু টেনশন কমাতে চাইছিলাম।'
'কী হয়েছে বলো?'
ইরফান কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর মাথা নিচু করে বলল,
'আমার এত বছরের স্বপ্নের প্রজেক্টটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।'
'কেন?'
'মন্ত্রী সাহেব মোটা,অংকের টাকা ঘুষ চায়। যেটা দিতে চাইছি না। তাছাড়া এত টাকা ঘুষ দিলে আমি কাজ করব কি দিয়ে?
'কত চায়?'
ইরফান তিক্ত হেসে বলল,
'পাঁচ কোটি।'
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল জবা। তারপর ইরফানকে জড়িয়ে ধরে বলল,
'দুদিনের মাঝে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি প্লিজ টেনশন ফ্রি থাকো৷ মন্ত্রী সাহেবকে আমি সামলে নিব। ইউ জাস্ট রিলাক্স। '
কথাগুলো বললেও জবার চোখ তখন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে আটকে। চোখে ভয়ংকর ঠান্ডা এক ঝিলিক।
ও ধীরে ধীরে বলল,
'এ পৃথিবীতে আমি ব্যতিত তোমাকে কষ্ট দেওয়া অধিকার কারও নেই। ঐ দুই টাকার মন্ত্রীর সাহস কি করে হয় তোমার কাছে ঘুষ চাইবার৷ ও ভুলে গেছে তুমি জবা চৌধুরীর হ্যাজবেন্ড? ওকে শীঘ্রই আমি সেটা মনে করিয়ে দিব।'
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে বিপজ্জনক এক হাসি ফুটল ওর ঠোঁটে। বলল,
'ঘুষ ওর পাছায় না ভরছি তবে আমিও জবা চৌধুরী না।'
ইরফান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে সে আজও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কখনো মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল নারী, আবার কখনো মনে হয় ভয়ংকর কোনো ঝড়। জবা ইরফানের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
'ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার টেনশন কমানোর দায়িত্ব এখন আমার।'
ইরফান জবার কোমর জড়িয়ে বলল,
'তুমি এত সুন্দর কেন? এত সুন্দর করে কথা বলো কেন? তোমায় দেখলেই আমার নেশা লাগে। ঘোর লেগে যায়৷ এত কেন ভালোবাসি তোমায়?'
জবা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে ছিল মায়া, ছিল ক্লান্তি, ছিল অধিকারও।
'ইরফান, এখন ঘুমাও।'
ইরফান শিশুর মতো মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ দুষ্টু গলায় বলল,
'ঘুমানোর আগে বউয়ের ডিউটি পালন করি?'
'নো ইরফান। নেশা অবস্থায় তুমি জংলী হয়ে যাও। আমি অত ওয়াইল্ড লাভ নিতে পারি না।'
কিন্তু ইরফান শুনল না। ওর স্পর্শ ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠল। সাহসী, দাবিদার, উষ্ণ।
জবা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই পরিচিত আবেশ, সেই বহুদিনের চেনা ভালোবাসা ধীরে ধীরে ওকে দুর্বল করে দিল।
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল। আর ভিতরে দুটো মানুষ নিজেদের ঝড়ের কাছে হেরে যাচ্ছিল।
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।
সকালবেলা জারাকে স্কুলের জন্য তৈরি করার সময় জারা বলল,
'মা তোমার গলায়, গালে লাল দাগ কেন?'
জবা কী বলবে ভেবে পেল না। রাগী চোখে ইরফানের দিকে তাকাল। ইরফান কানে হাত দিয়ে ইশারায় বলল,
'সরি।'
জবা জোর করে স্বাভাবিক মুখে বলল,
'মা, কাল রাতে মশায় কামড় দিয়েছিল তাই।'
'মশা কি অনেক বড়ো ছিল?'
ইরফান হেসে ফেলল। জবা চোখ রাঙাতেই কাশি দিয়ে হাসি চাপল সে। জবা গম্ভীর মুখে বলল,
'হ্যাঁ মা অনেক বড়ো মশা।'
ইরফান জারাকে নিয়ে স্কুলে গেল। জবা গেল খাদিজার কাছে। খাদিজা তখন তসবিহ গুনছে। জবা তার কাছে গিয়ে বলল,
'আপা কি বেশি ব্যস্ত?'
'না। বসো জবা।'
কথাটা বলে জবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল খাদিজা। দুষ্টু স্বরে বলল,
'আমার ভাই বুঝি একটু বেশিই দুষ্টু।'
জবা হেসে বলল,
'আপনার ভাই দুষ্টু না বরং জংলী।'
দুজনেই হালকা হেসে উঠল। বলল,
'ভালো খুব ভালো। তা তুমি কিছু বলতে এসেছিলে?'
'আপা কিছু জানার ছিল?'
'হ্যাঁ বলো।'
'আপনার বিষয়ে আমি কখনো কিছু জানতে চাইনি। বলুন তো কেন?'.
'কেন?'
'কারণ ইরফান আপনাকে আপা ডাকে। মায়ের মতো সম্মান করে। যেখানে ও আপনাকে এত সম্মান করে সেখানে আপনার অতীত ঘেটে আমি আপনাকে ছোটো করতে চাইনি৷ তবে আপনার প্রতি আমি বেশ কৌতুহলী।'
'কেন?'
জবা কিছু সময় মৌন থেকে বলল,
'আপা গতকাল রাতে আপনার রুমে যে লোকটি ছিল, সে কে?'
খাজিদা বেশ চমকালো। চোখে মুখে ভয় আর আতঙ্ক ফুটে উঠল। যেন ভয়ে বেশ জমে গেল।'
তবে জবা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই আবার জিজ্ঞেস করল,
'কে ছিল আপা?'
খানিক অস্থিরতায় হরবর করে খাদিজা বলল,
'কোন লোক? কার কথা বলছো?
'কাল রাতে যে এসেছিল। হয়তো তখন তিনটা বাজে। তার মুখ ভর্তি দাঁড়ি৷ গায়ে কালো পাঞ্জাবি ছিলো। দাঁড়ির কারণে চেহারা স্পষ্ট দেখা যায়নি। সে আপনার রুম থেকে বের হয়ে আপনার রুমের পাশের বারান্দার দরজা দিয়ে চলে গেছে।'
'এসব তোমাকে কে বলেছে?'
জবা শান্ত কণ্ঠে বলল,
'কেউ বলেনি আপা। আমি নিজ চোখে দেখেছি। গতকাল রাতে তিনটার দিকে কিছু কাজে নিচে এসেছিলাম। তখনই আমি দেখেছি। লোকটা কে আপা? আমি আপনাকে খারাপ ভাবছি না। বা কোনো অপবাদও দিচ্ছি না। আপনি সত্যি বলুন আমি বিশ্বাস করে নিব। দয়া করে মিথ্যা গল্প বানাবেন না। কারণ এতদিনে আপনার আমাকে এতটুকু চেনার কথা যে, আমি তদন্ত না করে কোনো বিষয়ে হুট করে বিশ্বাস করি না। আপনার বলা কথার উপর বিষয়টা আমি খতিয়ে দেখব।'
খাদিজা কাঁপা কন্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল,
'সে আমার স্বামী।'
জবা অবাক হলেও শান্ত রইল৷ ওর বিস্ময় প্রকাশ করল না। জবা এমনই। ওর বিস্ময় কখনো প্রকাশ করে না। সবসময় কেমন ঠান্ডা মেজাজের থাকে। কঠিন থেকে কঠিনতম পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলে আসে৷ শীতল কণ্ঠে জবা জিজ্ঞেস করল,
'আপনার স্বামী তো মৃত ছিল তাহলে জীবিত হলো কী করে?'
'সে মৃত ছিল না, কিন্তু নিখোঁজ ছিল।'
'আপনিই বলেছিলেন সে মারা গেছে।'
'আসলে তার উপর ক্ষোভ থেকে আমি তখন সবাইকে বলতাম সে মৃত।'
'এটা কোনো কথা? রাগের কারণে আপনি একজন জীবিত মানুষকে সবার কাছে মৃত করে দিলেন?'
'আসলে তখন নিজের ভিতরে রাগটা এত বেশী ছিল যে কী বলেছি নিজেই বুঝতে পারিনি।'
'এখন কী রাগ নেই? রাগ নেই বলেই কি গভীর রাতে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছিল?'
খাদিজা কী বলবে ভেবে পেল না। অত্যান্ত লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
'সে আমাকে খুঁজতে খুঁজতে গ্রাম থেকে এখানে এসেছে। সে আবার আমাকে ফেরত নিতে চায়।'
'তো এ কথা তো দিনে এসেও বলা যেত। গভীর রাতে চোরের মতো এসে কেন বলতে হবে?'
খাদিজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন কী বলবে কথা খুঁজে পাচ্ছে না। জবা তার হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল,
'আপা আমাকে শুরু থেকে আপনার ঘটনা বলুন। কোনো সমস্যা থাকলে তা-ও বলুন। আমি আপনার সমস্যা সমাধানে সহায়তা করব।
খাদিজা ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল,
'আমি মস্ত বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কোনো পাপ করিনি। রাতে সে আসলেও আমি নোংরামি করিনি।
শান্ত স্থির কণ্ঠে বলল,
'পুরোটা বলুন।'
'আজ তোমাকে আমার জীবনের ঘটনা বলছি। কেন আমি আজ তোমার বাড়ির আশ্রিতা তা বলছি।'
'বলুন।'
'মাদ্রাসা থেকে এইচএসসি পাশ করার পর আমার বিয়ে হয়েছিল। আমার স্বামী মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। আমাদের সংসার বেশ ভালোই চলছিল। অনেক বছর এভাবে চলে গেল। আমি দুই সন্তানের জননী হলাম। আমার ছেলের নাম আলামিন আর মেয়ের নাম আয়েশা। আমার.....!
বাকিটা বলার আগেই হন্তদন্ত হয়ে ইরফান বাড়ির ভিতরে ঢুকে জবাকে ডাকতে লাগল।
'জবা....! জবা....!'
জবা দ্রুত বাইরে বের হয়ে বলল,
'কী হলো? এত জোরে ডাকছো কেন?'
'জান, তোমার ফোন কোথায়?'
'রুমে।'
'এটা কোনো কথা? তোমার বাবা তোমাকে বারবার কল দিয়ে পাচ্ছে না। আমি তোমাকে কল দিয়ে পাচ্ছি না। ঘরের ল্যান্ডলাইনে কল করে দেখি কল ডুকছে না।'
জবা খানিক চিন্তিত হয়ে বলল,
'কোনো সমস্যা ইরফান? ল্যান্ডলাইনের তার গতকাল ছিড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি জারাকে নিয়ে স্কুলে না গিয়ে ফিরে এলে যে।'
'জলদি তৈরি হও।'
'কেন?'
'তোমার ফুপু আম্মা মারা গেছেন।'
জবা কিছু সময় চুপ থেকে বলল,
'ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন। তোমাকে বলল?'
'তোমার ফুপাতো ভাই ইনান কল করে বলল।'
জবা খানিক সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
'ইনান তো এক নাম্বারের মিথ্যুক। ও যা বলে তার ৯৯.৯৯৯% মিথ্যা।'
ইরফান মুখ বোঁচা করে বলল,
'.০০১% তো সত্যি?"
'হ্যাঁ। তবে ওর কথা আলাদা। ওর মধ্যে সত্যির কিছু নেই।'
জবা ওর ফুপু হালিমা বেগমকে কল করল। কল কেউ রিসভ করল না। তারপর ওর ফুপাতো বোন হাফিজাকে কল করল। কল রিসিভ করে হাফিজা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
'জবা মা তো আর নাই।'
জবা নিশ্চিত হয়ে বলল,
'খবর সত্যি। চলো আমরা তৈরি হয়ে বের হই। আমাদের হয়তো ওখানে দুতিন দিন থাকতে হবে।'
ইরফান বলল,
'আমি তো থাকতে পারব না। আমার অফিসে এত এত কাজ।'
'ঠিক আছে তুমি চলে আসো। আপাতত যাই।'
জবা খাদিজাকে বাড়ির খেয়াল রাখতে বলে বের হলো।
—————
নিস্তরঙ্গ দিঘিতে ছোট্ট ঢিল পড়লেও অনেকক্ষণ ঢেউ ওঠে। হালিমা বেগমের মৃত্যুতে তার আপনজনদের মাঝে যতটা ঢেউ ওঠার কথা তা উঠল না। সবাই যেন মৃত্যুটাকে খুব স্বাভাবিক বহু প্রতিক্ষিত হিসাবেই মেনে নিয়েছে।
হালিমা বেগমের বড়ো মেয়ে হাফিজ একা ঘন্টা খানিক কেঁদেছিল। তাছাড়া কেউ চোখের পানি ফেলেছে বলে সন্দেহ।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো ইনানের অবস্থা দেখে। মনে হচ্ছে হালিমা বেগমের মৃত্যুতে বেশ উচ্ছ্বসিত সে। এর কারণটা অজানা। অথচ সে হালিমা বেগমের সবচেয়ে ছোটো সন্তান। ওকে হালিমা বেগম সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, আল্হাদ করতেন। অথচ সেই ছোটো ছেলে মায়ের মৃত্যুতে দু ফোটা চোখের জল তো ফেলছেই না বরং তার হাবভাবে মনে হচ্ছে সে খুব আনন্দিত। যেন কেউ মরে যাওয়া খুব আনন্দের বিষয়। অথবা মায়ের মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক।
মৃত্যু শোক এ বাড়িতে তেমন বিষন্নতা নামাতে না পারলেও, হালিমা বেগমের বড়ো ছেলের আগমনে পরিবেশ উৎসব মুখোর হলো। সবার মুখে মলিনতা, কান্নার ছাপ মুহূর্তেই যেন মুছে গেল।
হালিমা বেগমের বড়ো ছেলে ফারিস তিন বছর পর দেশে ফিরেছেন বাচ্চা নিয়ে। তিনি বিবাহিত নন, কিন্তু তার বাচ্চা আছে। বাচ্চাটা সে দত্তক নিয়েছে। বাচ্চা ছেলেটির বয়স সাত বছর। ফারিসের আগমনে হয়তো সবাই হালিমা বেগমের মৃত্যু ভুলে আনন্দ করছে।
ফারিস হালিমা বেগমের মেঝ সন্তান হলেও তার তিন পুত্রের মধ্যে সে বড়ো। সবচেয়ে বড়ো তার মেয়ে হাফিজা। দ্বিতীয় ফারিস, তৃতীয় ফরহাদ আর একেবারে ছোটো ইনান।
এরা তিন ভাই তিন পদের। একেকজনের নেচার স্বভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। হালিমা বেগমের সাথেও ওদের স্বভাবের কোনো মিল নেই৷ এমনকি হালিমা বেগমের স্বামীও তার মৃত্যুতে তেমন কষ্ট পাচ্ছে বলে মনে হয়। তিনি ভাবলেশহীন, কষ্টহীন হয়ে তার দাফনের ব্যবস্থা করেছেন।
নিজে তাকে কবরে নামিয়েছে। তার কবরে মাটি দিয়েছে৷ দাফনের পর তিনি অবশ্য অনেকক্ষণ কবরের পাশে বসে ছিল। এছাড়া তাকে কোনো কিছু করতে দেখা যায়নি। না চোখের জল ফেলেছে৷ না মুখ ভার করেছে। দিব্যি সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। নাস্তাপানি দিচ্ছে।
পরশু হালিমা বেগমের মৃত্যু উপলক্ষে বিশাল খাবার দাবারের আয়োজন করা হয়েছে। তিন হাজার মানুষের বাজেট। এখন বিষয়টা শোকের না হয়ে আনন্দের হয়ে গেছে। সবাই হাসি মজা করছে। জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করছে। প্রায় সব রুমেই গল্পের আসর বসানো।
জবা খানিক বিরক্ত এসবে। ভদ্রতার খাতিরে এ বাড়ি থেকে যেতেও পারছে না। তবে জারা বেশ খুশি। সে তার সমবয়সী অনেক বাচ্চা পেয়ে বেশ আনন্দে খেলাধুলা করছে।
—————
হালিমা বেগম মানুষ হিসাবে চমৎকার ছিলেন। ভীষণ আবেগি মানুষ ছিলেন। কথায় কথায় কান্না করা তার স্বভাব ছিল। কান্না করার উপরে সে অনায়াসে পিএইচডি করেছে। তার কান্না করার স্বভাব এতটাই ছিল যে তরকারিতে লবন হলেও সে কাঁদত। ভাত খেতে বসে তরকারি বেশি গরম হলেও সে কাঁদত। শিশুর মতো সরল মন ছিল তার৷
যদি যুক্ততর্কের কথা বলি, তাহলে হয়তো বলা যায়, হালিমা বেগম নিজেই সবার কান্না একা কেঁদেছেন৷ সে কারণে আজ তার মৃত্যুতে কাঁদার লোক নেই।
কথায় কথায় কান্না করা হালিমা বেগমের ছেলে মেয়েগুলো কেমন যেন হয়েছে! তারা সহজে কাঁদে না। কঠিন থেকে কঠিনতম ব্যথায়ও তারা কাঁদে না।
বিশেষ করে হালিমার বড়ো ছেলে ফারিস। তার মতো শক্ত মনের মানুষ জবা কখনো দেখেনি। সবসময় তার মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হয়ে থাকে। যেন তার সামনে যে আছে তাকে এক্ষুনি বকে দিবে। অথচ সে কাউকে বকে না। কাউকে ধমক দিয়ে কথা বলে না। সবসময় শান্ত স্বরে সবার সাথে কথা বলে। ধীরস্থির বুদ্ধিসম্পন্ন লোক সে।
—————
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে রোদ মরে গিয়ে কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে। বাগানের একপাশে বসে জবা চায়ে চুমুক দিচ্ছে। সামনে জারা সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে খেলছে।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে ফারিস তাকিয়ে আছে জবার দিকে। নিঃশব্দে। মুগ্ধ হয়ে।
জবার কারণেই ফারিস ওর মাকে ঘৃণা করত।
তার কারণেই ফারিসের জীবন থেকে জবা হারিয়ে গেছে। ফারিস যখন থেকে বুঝেছে ভালোবাসা কি তখন থেকে জবাকে ভালোবেসেছে৷ অথচ ওর মায়ের কারণে পাওয়া হলো না জবাকে।
দূর থেকে জবাকে দেখে ফারিস মনে মনে বলল,
'বয়সের ছাপ তোকে ছুঁয়ে দিতে পারেনি।
কমেনি তোর লাবন্যতা। তোকে দেখলে কে বলবে তুই এক বাচ্চার মা! আচ্ছা জবা, কখনো কি মনের কোনো কোণে আমার জন্য ভালোলাগা তৈরি হয়নি তোর?'
পরোক্ষণে নিজের প্রতি তাচ্ছিল্য হাসল ফারিস৷ ও তো কখনো জবাকে ওর মনের কথা বলেইনি৷ কখনোই বুঝতে দেয়নি ওর ভালোলাগা। এ পৃথিবীতে ফারিস একজনের কাছে নিজের মনের কথা বলতো সে ছিল ওর মা। সে সব জেনেও ফারিসের সাথে সবচেয়ে বড়ো বেইমানি করেছিল।
যতদিনে মায়ের চালাকি ধরতে পারত ততদিনে জবা ইরফানের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমনকি নিজে নিজে বিয়েও করে নিলো।
এটা ছিল ফারিসের জীবনের সবচেয়ে বড়ো গোপন কষ্ট৷ এ কষ্ট থেকে বাঁচতেই দেশ ছেড়েছিল ফারিস। কখনো বিয়ে করেনি আর তবে মনে মনে ভেবে রেখেছিল জবা যেদিন মা হবে সেদিন ফারিস বাবা হবে। সে কারণে যখন শুনেছিল জবা প্রেগন্যান্ট৷ ও দেশে চলে আসে। দেশে একটা বাচ্চা দত্তক নেওয়ার চেষ্টা করে।
জবার বেবি হওয়ার মাসখানিক আগে এক রাস্তার পাগলের বাচ্চা হয়। সেই বাচ্চা ছেলেটাকেই দত্তক নেয় ফারিস। জবার মেয়ের জন্ম তারিখ আর ফারিসের ছেলে ফিরনাসের জন্ম তারিখ একই রেখেছে ফারিস। এমনকি ফারিসের মায়ের নামের স্থানে জবার নাম দেওয়া আছে। সেটা এ পৃথিবীতে ফারিস ব্যতিত কেউ জানে না।
ফিরনাসের বয়স যখন চার বছর, তখন ওকে নিয়ে আবার পাড়ি জমায় দূর প্রবাসে। তারপর আর দেশে আসেনি। দেশের তেমন কারও সাথে যোগাযোগও ছিল না। ওর পরিবারের সাথে মাঝে মাঝে কথা হত। কিন্তু মুখ ফুটে কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করেনি জবা কেমন আছে। জবার সাথে কথাও বলেনি।
ফারিসের খুব ইচ্ছা করছে জবার কাছে গিয়ে ওর সাথে কথা বলতে। কিন্তু জবার সাথে অভিমানের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। ও নিজ থেকে কখনোই জবার সাথে কথা বলবে না।
দূর থেকে ফারিসকে দেখে জবা কাছে এসে বলল,
'কেমন আছেন ভাইয়া?'
ফারিস হালকা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ও হাসতে পারছে না। অদ্ভুত ভাবে ফারসি খুব ঘামছে। অথচ ওর খুব শীত করছে। যেন তরতর করে জ্বর বাড়ছে। অথচ এক মুহূর্ত আগেও ও সুস্থ ছিল। জবার সাথে কত বছর পর কথা হলো? হ্যাঁ চার বছর তিন মাস আট দিন। ফারিস যখন দেশ ছেড়েছিল তার মাস দেড়েক আগে জবার সাথে দেখা হয়েছিল। জবা তখন হেসে সুন্দর করে কথা বলেছিল।
সেদিনও ফারিসের গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল। সে জ্বর টাইফয়েড পর্যন্ত গড়িয়েছিল। জ্বরের ঘোরে ফারিস কেবল বারবার বলেছিল আমার এত বড়ো ক্ষতি কেন করলে মা? জবাকে কেন আমার হতে দিলে না?
ছেলের এহেন অবস্থা দেখে হালিমা বেগম ডুকরে কেঁদেছিলেন। তিনি সত্যিটা বলতে পারেনি ছেলেকে। সত্যিটা বললে তার ছেলে হয়তো আরও কষ্ট পেতো।
(আচ্ছা যদি জবা ফারিসের হতো তাহলে কাহিনিটা কেমন হতো? জবা নিশ্চয়ই একটা প্রতারকের কবলে পারত না?)
জবা আলত করে ফারিসের হাতে ধাক্কা দিয়ে বলল,
'কী হলো ফারিস ভাই? কথা বলছেন না কেন?'
ফারিস কী বলবে ভেবে পেল না। জবার এই হালকা স্পর্শ ওর শরীরে বিষের মতো দহন ছড়িয়ে দিয়েছে। ফারিসের সারা শরীর কাঁপতে লাগল। অস্বাভাবিক মাত্রায় শীত করতে লাগল। মনে হচ্ছে এখনই পড়ে যাবে।
জবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, অগোছালো পায়ে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যেতেই নিবে ওমনি জবা দুহাতে ঝাপটে ধরল ফারিসকে। ফারিসের মনে হলো এখনি দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে।
ফারিস বিড়বিড় করে বলল,
'জবা আমার শরীর প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। আমি রুমে যাব।'
'আমি ধরে নিয়ে যাই?'
ফারিস কঠিন চোখে তাকিয়ে কঠিনভাবে বলল,
'না '
ওর চোখের কাঠিন্যে উপেক্ষা করতে পারল না জবা। হাত ছেড়ে দিল। ফারিস এলোমেলো ভঙ্গিতে হেঁটে নিজের রুমে গিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। মনে মনে বলল,
'যখন থেকে মেয়েটাকে ভালোবাসা শুরু করেছি তখন থেকেই ওকে দেখলেই জ্বর আসার এ কি ভয়াবহ রোগ হয়েছে আমার?
—————
জবা আজ এসেছে মন্ত্রী সাহেবের বাড়িতে। জবাকে দেখে মন্ত্রী সাহেব ঘেম নেয়ে একাকার। জবা বেশ শান্ত ভঙ্গিতে তার সামনে বসল। জবার পরনে মিষ্টি কালারের এক রঙের জরজেট শাড়ি। পায়ে দামি হিল। জবা মন্ত্রী মহাদয় এহসান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
'আমাকে চিনতে পেরেছেন মন্ত্রী সাহেব?'
কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে এহসান সাহেব বলল,
'তোমাকে কীভাবে ভুলি মা!'
জবা পায়ের হিলটা খুলে ওর সামনে থাকা টি টেবিলে স্ব-জোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই টেবিলটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
জবা তবুও বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বসে বলল,
'ইরফান চৌধুরী আমার স্বামী। তার কাছে ঘুষ চাইবার আগে আমার কথা মনে পড়েনি আপনার?'
'আমি জানতাম না ইরফান চৌধুরী তোমার স্বামী।'
'এখন জেনেছেন?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে সে অনুসারে কাজ করুন। ভুলে যাবেন না আমি জয়নুল আবেদিন চৌধুরীর একমাত্র কন্যা জবা চৌধুরী। আমার এক কথায় আপনাকে মন্ত্রীত্ব থেকে সরানো একটা ফোনের ব্যাপার জাস্ট।'
জবা যেমন শান্ত ভঙ্গিতে এসেছিল। তেমন শান্ত ভঙ্গিতে চলে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………