রাত তখন বেশ গভীর। আহমেদ নিবাসের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে, বেশিরভাগ মানুষই নিজ নিজ রুমে ঘুমোতে গিয়েছে। আয়না তার চিলেকোঠা ঘরে একা বসে কিছু কাজ করছিল, কিন্তু তার মন ছিল বিক্ষিপ্ত।
গত কয়েক ঘণ্টা ধরে সে মাহিরের ফোনের অপেক্ষায় ছিল, অথচ নিজে থেকে ফোন করার মতো সাহস বা মানসিক প্রস্তুতি কোনোটিই সে সঞ্চয় করতে পারছিল না। ভদ্রলোকের তো উচিত ছিল তাকে সেখানে পৌঁছে একবার কল করা। এই তার ম্যাচুয়রিটি!
প্রত্যাশা, আর নিজের এই দ্বিধার ওপর অহেতুক বিরক্তি সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটা তার বেশ অস্থিরতায় কেটেছে। তাই যখন হুট করে ফোনটা বেজে উঠল এবং স্ক্রিনে মাহিরের নাম ফুটে উঠল, আয়না মুহূর্তকাল সময় নষ্ট না করে ফোনটা রিসিভ করল। নিজের এই দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় সে নিজেও খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করল। কেমন লাগামহীন কাজকর্ম হয়ে যাচ্ছে তার!
আয়না কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নির্লিপ্ত রাখার চেষ্টা করে বলল, হ্যালো?
ওপাশ থেকে মাহিরের গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সেখানে শ্রান্তি মেশানো প্রশান্তি।
-জেগে আছো? আমি ভাবলাম হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছ।
-না সজাগ ছিল।
-ঘুম আসছিল না?
-না, না। কিছু কাজ বাকি ছিল। তোমার পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?
আয়না খুব মেপে মেপে প্রশ্ন করল।
মাহির বলল,
পৌঁছেছি। কাজটা বেশ ঝক্কির ছিল, সারাদিন সাইট ভিজিট আর লোকেশন রেকি করে এই কিছুক্ষণ আগে হোটেলে ফিরলাম। স্থানীয়দের সাথে হুট করে এসে কাজ করা বেশ মুশকিল। তুমি কেমন আছো আয়না? বাড়ির সবাই ঠিকঠাক আছে? শক্ত করে ছাদের জানালা বন্ধ করা হয় তো? রামিনকে বলে দিয়েছিলাম আমি। বেশি ঠান্ডা লাগলে আলমারি থেকে আরেকটা কম্বল নামিয়ে নিবে। বাড়িতে সব ঠিকঠাক তো?
আয়না রামিনের ব্যাপারে কিছু বলল না। ঝামেলা করে লাভ নেই। সে শান্ত স্বরে উত্তর দিল, আমি ভালো আছি। দিন অন্যদিনের মতোই কাটল। বিশেষ কিছু না।
মাহির আজ শুধু কুশল বিনিময়েই থামতে চাচ্ছিল না। সে তার বরিশাল ভ্রমণের বর্ণনা দিতে শুরু করল,
জানো আয়না, এই শহরটা অদ্ভুত রকমের সুন্দর। আমি যেখানে আছি তার ঠিক পাশেই একটা বিশাল দিঘি। জানলা খুললেই কুয়াশার চাদরে ঢাকা জলরাশি দেখা যায়। আজ ফেরার পথে একটা জরাজীর্ণ জমিদার বাড়ি দেখলাম। কোনো একদিন তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে হবে। তোমার হয়তো এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব পছন্দ হবে।
আয়না মনযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনছিল। সে শত মাইল দূরে থেকেও নিজের বিছানায় শুয়ে মাহিরের বর্ণনা কল্পনা করতে লাগল।
মাহির আবার বলতে লাগল,
এখানকার বাতাসে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আছে ঠিক যেমনটা তুমি নিশিখালির কথা বলতে। সুযোগ পেলে তোমাকে নিয়ে একবার ঘুরে যাব, নদীতে বোটিং করার সুবিধা আছে, রেস্ট হাউজ আছে। তুমি তো নদী আর নির্জনতা খুব ভালোবাসো, তাই না?
মাহির খুব স্বাভাবিকভাবেই আয়নাকে তার ভবিষ্যত দিনগুলোর প্রতিটি ফ্রেমে জড়িয়ে নিচ্ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, অনিশ্চিয়তা নেই।
তার এই সহজ অধিকারবোধ আয়নার দীর্ঘদিনের লালিত মানসিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রতিজ্ঞাকে বারবার আঘাত করছিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুটা সতর্ক ভঙ্গিতে বলল,
এত কাজের মধ্যে এসব ভবিষ্যত ঘোরার পরিকল্পনা না করে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে একটু খেয়াল রাখা বেটার। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া ও রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে সেটা ইনশিওর করার চেষ্টা করো।
মাহির ওপাশ থেকে হালকা হাসল। এমন ফরমাল ইমেইলের ভাষায় কোনো মেয়ে তার স্বামীকে নিজের প্রতি খেয়াল রাখা বলার কথা বিরল! আয়না বলে কথা। মুখ ফুটে বলেছে এই তো ঢের!
-হচ্ছে, তবে বাড়ি ফেরার তাড়াটা আজ একটু বেশিই কাজ করছে। আচ্ছা আয়না বাড়িতে কি আসলেই সব ঠিক আছে? সত্যি করে বলো তো, কোনো ঝামেলা হয়নি তো?
আয়না এবার সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল,
মিনি কি তোমাকে আগেই সব বলে দিয়েছে?
মাহির একটু সময় নিয়ে স্বীকার করল,
হ্যাঁ, বিকেলে ওর সাথে কথা হয়েছে। সেতো খুব এক্সাইটেড! বলল তুমি নাকি আজ রান্নাঘরে বেশ একটা রাজত্ব কায়েম করেছ।
আয়না শান্ত দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,
তেমনটা বললে বাড়াবাড়ি হবে, তবে যা করেছি ওটা আমার প্রয়োজন ছিল। আমি জানি তোমার চাচী আর দিনা আমাকে অপছন্দ করে, আমার রান্না করা খাবারও স্পর্শ করেননি। ওনারা বেশ বিরক্ত। কিন্তু চাচা আর মিনি, দাদী খেয়েছেন, উনারা প্রশংসাও করেছেন।
ফোনের ওপাশে মাহিরের নিশ্বাস ফেলার শব্দ পাওয়া গেল। সে কিছুটা কুণ্ঠিত হয়ে বলল, আমি জানি চাচী একটু কঠিন মানুষ। তাও আমার অবর্তমানে তোমাকে এভাবে অস্বস্তিতে পরতে হবে বুঝতে পারিনি।
আয়না মাহিরের এই দ্বিধাটুকু থামিয়ে দিয়ে খুব ধীর স্থিরভাবে বলল,
শোনো মাহির, তোমাকে আমার জন্য এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। এগুলো পরিবারের ভেতরের ছোটখাটো বিষয়, আমি নিজেই সামলে নিতে পারব।
মাহির অবাক হয়ে বলল, নিজে সামলাবে মানে? আমি চাই না তুমি আর অপদস্থ হও।
আয়না সহজ গলায় বলল,
আমি চাই না তুমি আমার পক্ষ নিয়ে কারো সাথে তর্কে জড়াও কিংবা মাঝখানে পড়ে নিজের শান্তি নষ্ট করো। তুমি এসবে জড়ালে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তোমার চাচী এবং আমার... আমাদের দুজনেরই এই সমস্যাগুলো নিজেদের মতো করে কাটিয়ে উঠতে হবে। পরিস্থিতি যদি কখনো সত্যি হাতের বাইরে চলে যায় এবং আমার তোমার সাহায্যের প্রয়োজন হয় তবে আমি নিজেই তোমাকে জানাব। ততক্ষণ পর্যন্ত এসব নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।
মাহির কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল। আয়নার এই প্রবল ব্যক্তিত্ব আর স্পষ্টবাদিতা সবসময়ই তাকে দোলাচলে ফেলে দেয়। সে প্রত্যাশা করেছিল আর পাঁচটা মেয়ের মতো আয়না হয়তো নালিশ করবে, তার কাছে সাহায্য চাইবে। কিন্তু আয়না বুঝিয়ে দিল, সে নিজের সুরক্ষা দিতে নিজেই সক্ষম। এই স্বনির্ভরতা মাহিরকে যেমন নিশ্চিন্ত করল, অন্যদিকে এক বিচিত্র একাকীত্বেও ফেলে দিল।
কোনো উত্তর না পেয়ে আয়না নিজেই কথা ঘুরিয়ে দিল, বরিশাল থেকে ফিরবে কবে?
-আরও দিন দুয়েক লাগবে। আচ্ছা, ফেরার সময় তোমার জন্য কী নিয়ে আসব বলো তো?
মাহিরের গলায় আবার উষ্ণতা ফিরে এল।
-কিছু আনার প্রয়োজন নেই।
আয়না দ্রুত উত্তর দিল।
মাহির মৃদু হেসে বলল, বাজে কথা বোলো না। আমি গৌরনদী থেকে তোমার জন্য মিষ্টি দই নিয়ে আসব। এখানকার দই খুব বিখ্যাত।
তারপর একটু থেমে খুব নিচু স্বরে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, তুমি কি মিষ্টি খুব পছন্দ করো? আমি নিশ্চিত তুমি করো!
আয়না বেশ অবাক হয়ে বলল, কীভাবে জানলে? তোমাকে কে বলেছে?
মাহির হাসতে হাসতে উত্তর দিল, আমি কামিনীর কাছ থেকে জেনেছি। ও বলল তুমি নাকি সুযোগ পেলেই তোমার নানারবাড়ি গিয়ে পায়েস আর মিষ্টি খেতে, তাদের জন্যও নিয়ে আসতে।
আয়না কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার গাল দুটো যেন হুট করে একটু গরম হয়ে উঠল। তার অতি ব্যক্তিগত ছোট অভ্যাসগুলো মাহির এভাবে খুঁজে বের করেছে ভেবে সে অদ্ভুত আড়ষ্টতা অনুভব করল। কিছুক্ষণ পর সে প্রায় ফিসফিস করে উত্তর দিল, হ্যাঁ... করি।
ফোনের ওপাশ থেকেও আয়না মাহিরের সেই নীরব বিজয়ের আনন্দটুকু অনুভব করতে পারছিল। পরবর্তী কয়েক মুহূর্ত তারা দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলল না। নীরবতাটাই যেন আজ অনেক বেশি বাচাল হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে তাদের কথোপকথনটি শেষ হয়ে এল, কিন্তু ফোন রাখার দীর্ঘ সময় পরেও আয়নার ঘরে প্রশান্তির রেশ রয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, মাহিরের এই অনুপস্থিতি তাকে যতটুকু শান্তি দেওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অস্থিরতা দিয়ে যাচ্ছে।
—————
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় হেলান দিয়ে সাহের বানু গজগজ করে বললেন,
তোমার নিরামিষ রান্ধা হয় নাই নাতবৌ। তাড়াহুড়া করলে খাবার স্বাদ হয় না কইলাম। মাছ-মাংসের চেয়ে নিরামিষ স্বাদ বেশি হইতে পারে যদি সঠিক রান্ধন জানা থাকে। শুনো আমি শিখায় দেই।
আগে সরিষার তেল একটু ধোঁয়া ওঠা পর্যন্ত গরম করবা, তারপর তেজপাতা আর জিরা তেলে ভেজে নিবা। পেঁয়াজ একরঙা করে ভাঁজবা। ধীরে ধীরে নাইলে একবারে সবকিছু দিয়ে দিলে স্বাদ আসে না। এরপর আদা-রসুন বাটা দিয়ে নাড়তে থাকবা যতক্ষণ না কাঁচা গন্ধ চইলা যায়। হলুদ, জিরে, ধনে সব অল্প অল্প পানি দিয়ে ধৈর্য ধরে ভুনা করবা, তেল ছেড়ে না গেলে আসল স্বাদটা ঘরে আসে না।
আলু দেওয়ার আগে হালকা ভেজে নিবা। শক্ত সবজি আগে, নরমগুলো পরে দিবা। খবরদার নুন দিলে সঙ্গে সঙ্গে নামাবা না। একটু সময় লাগবো, যাতে ভেতরে ঢুকে বসে। পানি দরকার হলে একবারে ঢালবা না, অল্প অল্প করে দিবা নাইলে দেখবা ঝোল আলাদা, মশলা আলাদা! শেষে কাঁচা মরিচ চিরে, এক ফোঁটা সরিষার তেল বা সামান্য ঘি দিয়ে ঢেকে পাঁচ মিনিট দমে রাখবা এই দমটাই নিরামিষের প্রাণ৷ এরপর দেখবা স্বাদ কারে কয়!
মিনা দাদীর মতো পান মুখে দিয়ে হেসে বলল, কিভাবে এতো কিছু মনে রাখো তোমরা? আমি তো একদম পারব না।
-ওইতো শাশুড়ী যখন ঠেঙাবে তখন সবই পারবা। এখন তো মজায় থাকো বাপের ঘরে।
আয়না অন্যমনস্ক হয়ে নিজের চুলে বেণী করছিল৷ হঠাৎ সে প্রশ্ন করল, আপনার নাতির কি পছন্দ খেতে?
সাহেরা বানু মুখ বাকিয়ে বলল, তা তো তোমার জানার কথা! আমি বলমু ক্যান? সোয়ামীরে জিগাও না ক্যান?
আয়নার মনে হলো কৌতুহল থেকে হুট করে প্রশ্ন করে ভুল করেছে। মাহিরকে নিজে থেকে এমন প্রশ্ন করা তার পক্ষে অস্বস্তিকর, নিজে থেকে জানালে ভিন্ন কথা। কিন্তু তার পাঁচটা কথার মধ্যে সাড়ে চারটা হয় অন্যদের নিয়ে।
সাহেরা বানু কিছুক্ষণ আজকালের মেয়েদের বকলেন। তারপর মিনাকে বললেন, এই তুই ভাবীরে কইয়া দিতে পারোস না?
মিনা বলল, কি বলব? নিজেই তো জানিনা।
-ভাই কি খায় না খায় জানোস না?
-না তো। শুক্রবার ছাড়া কখন খায় তাইতো জানিনা। সবই খায় বোধ-হয়। রায়হান আর রামিন ভাইয়া তো মনমতো না হলে চিল্লাপাল্লা করে কান ঝালাপালা করে দেয়। আবার রান্না করা লাগে মার। মাহির ভাইয়াকে তো কোনোদিন টু শব্দ করতে দেখিনি। আর তুমি আমাকে কি বলো বুড়ি! তুমি আদরের নাতির খোঁজ রাখো না?
সাহেরা বানু নিজেই আকাশ-পাতাল ভেবে উত্তর পাচ্ছেন না। বাকিদের সব মনে থাকলেও মাহিরের কিছু তেমন মাথায় নেই। তিনি বললেন, খায় মুরগী-সবজি সব খায়! তোমার কপাল ভালা, সোয়ামির কোনো বাছবিচার নাই।
আয়না মনমতো উত্তর পেল না, প্রশ্ন বেড়ে গেল।
সাহেরা বানু মিনাকে ধমকে বললেন, আর তুই আদরের নাতি আদরের নাতি এইসব বারবার সবার সামনে কস ক্যান? মানুষের যে মুখ কালা হয় দেখোস না? খালি আগুন লাগাস!
-তো মিথ্যা নাকি? সবাই জানে ছোট চাচ্চু তোমার প্রিয় ছেলে ছিল, একটু দূরে গেলেই চোখে হারাতে। তার জন্যই তো মাহির ভাইয়াকে কাছে রেখেছিলে।
সাহেরা বানু নিশ্চুপ হয়ে যায়। মৃতপুত্রের নাম মাত্রই তার হৃদয়ে বিষাদ জন্ম দেয়।
—————
বিকেলের ম্লান আলোয় আহমেদ নিবাসের গেটে যখন মাহিরেকে নিয়ে সিএনজি এসে থামল, আয়নার বুকের ভেতরটা এক অজানা সংকেতে কেঁপে উঠল। কেউ তাকে বলেনি, কোনো হর্ন শোনেনি সে, তবুও এক অদ্ভুত ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে জানান দিল মাহির এসেছে। হাতের কাজ রেখে কি মনে করে সে ছুটে এলো চিলেকোঠা থেকে ছাদের কিনারে, যেখানে পুরোনো কার্নিশের আড়ালে নিজেকে আড়াল করা যায়।
নিচে মাহির সিএনজি থেকে নামছে। পরনে আসমানী রংয়ের শার্ট, হাতে কয়েকটা ব্যাগ। সে রহিমন বুয়ার সাথে স্বাভাবিক স্বরে কথা বলছে, ব্যাগগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে।
আয়না পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মাত্র কয়েকটা দিন, অথচ তার মনে হলো মাহির যেন কত যুগ পর ঘরে ফিরল। মাহিরের প্রতিটি ছোট গতিবিধি, তার কথা বলার ভঙ্গি, সবই আজ আয়নার কাছে নতুন এক ব্যাকুলতা নিয়ে ধরা দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, কেন এই মানুষটার ফিরে আসা তার বুকের ভেতর এক ভারী পাথরের মতো চেপে বসছে।
মাহির কথা বলা থামিয়ে একদম স্থির হয়ে গেল। কোনো কারণ ছাড়াই সে ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি ছাদের দিকে তাকালো। আয়নার নিশ্বাস যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। মাহিরের দৃষ্টিতে গভীর নিরীক্ষণ আর আয়নার চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার তীব্র বিড়ম্বনা। আয়না তড়িৎবেগে পিছিয়ে এল। নিজের ওপরই চরম বিরক্তি দানা বাঁধল তার! এই চপলতা, এই কিশোরীসুলভ কৌতূহল তো তার স্বভাব নয়! কেন সে এমন অপরিচিত কাঁচা কাজ করল?
ড্রয়িং রুমে মাহির সবার জন্য আনা ছোটখাটো উপহার বিলি করছে। ছোটদের হাসাহাসি, গল্পগুজব আর কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দে বাড়িটা সজীব হয়ে উঠেছে। দিনা মাহির এসেছে শুনে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। তার মুখাবয়বের কাঠিন্য খানিকটা কমেছে।
আয়না নিচে নেমে সেই ভিড়ে গেল না। সে দূর থেকে একবার আড়চোখে মাহিরের ক্লান্ত কিন্তু উজ্জ্বল মুখটা দেখল, তারপর নিজের কাজে মন দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
খানিক বাদে মাহিরের ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে এল ড্রয়িং রুম থেকে, একটু চা পাওয়া যাবে?
প্রশ্নটা সাধারণ, কারো নাম ধরে নয়। আয়না যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে কথাটি স্পষ্ট শুনতে পেল। তার পা দুটো একবার নড়েও উঠল৷ নিজে গিয়ে চা দিয়ে আসবে কি না, সেই চিরন্তন দোটানায় সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অপিরিচিত অবাধ্য আবেগকে শাসন করল সে। গলা চড়িয়ে ডাকল, মিনা! চা নিয়ে যাও তো ভাইয়ার কাছে।
দিনা উঠে এলো, আমাকে দিন, আমি দিয়ে আসছি।
তার বোধ হয় আয়নার বানানো চা পছন্দ হলো না। সে তাতে নতুন করে পাউডার মিল্ক এড করে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে নিয়ে গেল।
ও পাশ থেকে মাহিরের আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। মিনা হাসতে হাসতে এসে বলল, ভাইয়া একটা মজার গল্প শোনাচ্ছে। ওখানে কি হয়েছিল জানো? তুমি আসলে বলবে বলেছে। আসোনা ভাবী?
-এখন না৷ তোমরা শোনো যাও।
আয়নার কণ্ঠস্বর ছিল একদম স্বাভাবিক, নিয়ন্ত্রিত। সে কোনোভাবেই নিজেকে এই দৃশ্যে জড়াতে চাইল না। আয়না নিজেকে ব্যস্ত রাখল রান্নাঘরের কাজে।
আরো কিছুক্ষণ পর মাহির নিজেই রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। আয়না তখন ধোয়া সবজিগুলো ঝুড়িতে সাজিয়ে রাখছিল। মাহিরের ভরাট ডাক এল, আয়না!
আয়না একটু চমকে উঠে তাকালো, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে পাথরের মতো স্থির করে নিল, হ্যাঁ?
মাহির খুব সরাসরি প্রশ্ন করল, আমার সেই মেরুন টি-শার্টটা কোথায়?
প্রশ্নটা নিতান্তই তুচ্ছ। মাহির চাইলে নিজেই খুঁজে নিতে পারত। আয়না চোখের পলক না ফেলে উত্তর দিল, হ্যাঁঙ্গারে আছে। আলমারির ডান দিকে।
-পাচ্ছিনা তো৷
-বিছানার পাশে বাকিগুলো আছে। সব ধোয়া ও আয়রন করা।
সে একবারও মাহিরের চোখের দিকে তাকালো না। উত্তর দিয়েই সে আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তাদের মাঝখানের অদৃশ্য সুতোটি সে ছিঁড়ে ফেলেছে। মাহির কয়েক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, হয়তো আরও কিছু শোনার বা দেখার অপেক্ষায়। কিন্তু যখন আয়নার দিক থেকে কোনো সাড়া মিলল না, সে নিঃশব্দে সেখান থেকে প্রস্থান করল।
এর পরের কয়েক ঘণ্টা আয়নার জন্য এক বিড়ম্বনার নাম হয়ে দাঁড়ালো। সে যেখানেই যাচ্ছে, মাহির কোনো না কোনো ছুতায় সেখানে হাজির হচ্ছে। আয়না ড্রয়িং রুমে গেলে মাহির সেখানে আসে। সে বারান্দায় দাঁড়ালে কিছুক্ষণ পর মাহিরকেও সেখানে দেখা যায়। এসব যে কাকতালীয় নয়, তা আয়নার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে এড়ালো না। মাহির সুযোগ খুঁজছে কথা বলার, আর আয়না ততবারই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে।
মাঝে মাঝে তাদের চোখাচোখি হচ্ছে, আর সেই প্রতিবারই এক দীর্ঘ মৌনতা তাদের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আয়না বুঝতে পারছে মাহির কথা বলতে চায়, সে নিজেও কি চায় না? বুকের ভেতর সেই চিনচিনে ব্যথা আর ছটফটানি তো তাকে এক মুহূর্ত শান্তি দিচ্ছে না। তবুও সে এগোতে পারছে না। এক অদ্ভুত অস্বস্তি, তীব্র লজ্জা আর নাম না জানা এক গুমোট আবেগ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
মাহির যতবার কাছে আসতে চাইছে, আয়না ততবারই কোনো তুচ্ছ কাজের বাহানায় নিজেকে অন্য ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। সে মাহিরকে অবজ্ঞা করছে না, বরং নিজেকে সামলাতে পারছে না। মাহিরের এই প্রখর উপস্থিতির সামনে সে বড্ড বেশি অসহায় বোধ করছে।
কিন্তু রাতে তো আর নিচে অপেক্ষা করা যায় না। এমনিতেই আজকে অনেক থেকেছে। মাহির উপরে চলে গিয়েছে আরো আগেই। আর কোন সারা শব্দ নেই তার। এতেও কেন যেন আয়না আরো সঙ্কিত হয়ে পড়ল।
মাহির ফোনে কথা বলতে বলতে পুরো ঘরে পায়চারি করছিল। আয়না ঘরে আসলেও তার দিকে তাকালো না। আয়না বিছানার অগোছালো কাপড়গুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকালো, তারপর সেগুলো আবার ভাঁজ করার জন্য হাত বাড়ালো। তখনই পিছন থেকে ক্ষিপ্র গতিতে তাকে টেনে ধরল মাহির
-ডিড ইউ মিস মি অ্যাট অল? হুম? ছয় ঘন্টা সতেরো মিনিট হয়েছে আমি বাড়িতে ফিরেছি, এর মাঝে ছয় মিনিট ও ঠিকমতো তোমার দর্শন পাইনি। হুম? অন্য সময় চিলেকোঠা থেকে পা বের হয় না, আজ দেখছি পুরো বাড়ি টইটই করে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে। এই যে আমি বারবার খবর পাঠাচ্ছি, আশেপাশে ঘুরঘুর করছি একদম গায়ে লাগছে না তাই না?
আয়না উত্তর দিবে কি, মাহিরের বেসামাল আচরণে তার স্বর রুদ্ধ হয়েছে আগেই! তাকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে রেখেছে লোকটা। এক তিল পরিমান দুরত্ব নেই।
মাহির তার চিবুক আয়নার কাঁধের ওপর আলতো করে নামিয়ে রাখল। তার গরম নিশ্বাস আয়নার ঘাড়ের খোলা অংশে এসে পড়ছে, তাতে মেয়েটির অস্বস্তি জলের মতো স্পষ্ট। তা হোক! এর চেয়ে দ্বিগুণ শাস্তির যোগ্য সে।
মাহির এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে রইল। সে যখন প্রথমবার আয়নাকে নিজের কাছে দেখেছিল, সেই দিন থেকেই আয়নার গায়ের এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস তাকে নেশার মতো আচ্ছন্ন করে রাখত। কোনো কৃত্রিম পারফিউম যে নয় তা সে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে।
বরং এক আদিম সুগন্ধ যা কেবল আয়নারই একান্ত।
মাহির আয়নার ঘাড়ের সেই অবাধ্য চুলগুলোর মাঝে ডুবে গেল। অত সহবতের ধার ধরতে ইচ্ছে করল না।
তার মনে হলো, গত দিনগুলোর অমানুষিক ক্লান্তি এই এক নিমেষেই মুছে যাচ্ছে। সে যখন নিশ্বাস নিচ্ছে, আয়নার মাদকতাময় ঘ্রাণ তার ফুসফুস ছাড়িয়ে সরাসরি রক্তে গিয়ে মিশছে। এই মুহূর্তে মাহির কাছে স্ত্রীর সুবাসটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
আয়না স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার ভেতরটা ঝড়ের মতো কাঁপছে। মাহির দুই হাত যখন তার কোমরে শক্ত হয়ে বসল, তখন বাইরের অসময়ের বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ তার কানে আর পৌঁছাচ্ছিল না। তার নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি এতই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, আয়নার মনে হয় মাহির বুকের ওপর দিয়ে সেই শব্দটা হয়তো পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সে অনুভব করে মাহির শরীরের তপ্ত উষ্মা। মাহিরের বুকটা যখন তার পিঠের সাথে একদম মিশে গেল, আয়না টের পেল শুধু তার নিজের নয়, মাহির হৃদপিণ্ডটাও সমান তালে, খুব দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। দুজনের হৃতস্পন্দন যেন একে অপরের সাথে পাল্লা দিচ্ছে কে কার চেয়ে বেশি ব্যাকুল, তারই এক নীরব প্রতিযোগিতা।
-কথা নেই কেন?
আয়না উত্তর দিতে চাইল, তার ঠোঁট দুটো একবার কেঁপেও উঠল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোলো না। তার সমস্ত কথা যেন গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আটকে গেছে। মাহির তপ্ত নিশ্বাস তখন তার কানের লতিতে এক অসহ্য অস্থিরতা তৈরি করছে।
তারপরও আয়না নিচু স্বরে ভাঙা গলায় বলল, আমি তো দিনার হাত দিয়ে তোমার চা পাঠিয়েছিলাম। পাওনি?
মাহির একটুও নড়ল না। তার চিবুক তখনও আয়নার কাঁধের ওপর স্থির। সে মৃদু হেসে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যার তপ্ত পরশ আয়নার ঘাড়ে শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে গেল। মাহির খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, তুমি কি সত্যিই মনে করো আমি মিনার হাতে চা চেয়েছিলাম আমি? হুম?
আয়না এবার আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। মাহিরের এই সরাসরি আক্রমণ তার বুদ্ধিকে যেন লোপ পাইয়ে দিচ্ছে। সে আমতা আমতা করে আবার এক অহেতুক অজুহাত দাঁড় করাল।
মাহির মেয়েটার বিপত্তিতে শুধু হাসল। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল এক গভীর মুগ্ধতা। মাহি তার মুখটা আয়নার কানের আরও কাছে নিয়ে এলো, এতটাই কাছে যে নিজেকে সামলানোর জন্য আয়নাকে তার শার্ট খামচে ধরতে হলো।
-বাহ্!
মাহি ফিসফিস করে বলল, আমার স্ত্রী তো দেখছি খুব বুদ্ধিমতী। ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া, চা পাঠানো, সবজি কেনা সংসারের সবই করতে পারে। শুধু যার সাথে সংসার করা, তার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা সত্যি কথা সে বলতে পারে না।
মাহি তার এক হাত আয়নার কোমরের ওপর দিয়ে সরিয়ে নিয়ে এসে তার চিবুকটা আলতো করে ধরল এবং তাকে নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করল। আয়না এখন মাহিরের একদম মুখোমুখি, যদিও তার চোখ দুটো তখনও নিচের দিকে নিবদ্ধ।
-বাহ আইরিন জাহান সরকার লজ্জাও পেতে পারে! এতো সৌভাগ্য আমার! দেখি দেখি? এই মাহেন্দ্রক্ষণ এর সাক্ষী হয়ে নিজেকে ধন্য করি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………