আয়নার আলমারিতে নিজের কাপড় রাখতে বেশি সময় লাগল না। মাহির তাকে সেখানের অর্ধেকের চেয়ে বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, তাও আয়নার সব সুটকেস খালি হয়নি।
এই আলমারিতে মাহিরের সব জামা-কাপড় ইবা কিভাবে এঁটেছে তাও এক বিষ্ময়কর ব্যাপার। ঘরটায় আসবাবপত্র একদম সীমিত। একটা ওয়ারড্রব বা বড়ো আলমারি ছাড়া কিছুতেই সুটকেস খালি হবে না, কিছু কাপড় ওখানেই রাখতে হবে। আয়নার তাতে অসুবিধা নেই। সে সেভাবেই সাজিয়ে রাখল।
মাহির ঔষধ এনে কিছুক্ষণ তার আশেপাশে ঘুরঘুর করে নিচে চলে গেছে। সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া খোলামেলা ঘরটা তার কাছে আজ হুট করে বেশ সংকীর্ণ মনে হচ্ছে। তার কারণ কি তবে এই বিশেষ নারীর উপস্থিতি?
এতসব মাহির ভাবতে পারেনি, তার আগেই নিচে থেকে জরুরি তলব এসেছে। নিশ্চয়ই বড়ো চাচা বাড়িতে ফিরে সব জানতে পেরেছে। মাহির জানে বড়ো চাচা তাকে কি বলতে পারে। মনসুর আলম ভদ্রলোকটি খুবই নরম প্রকৃতির নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। রব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক ও সমস্যা জর্জরিত হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে হয়েছে তাকে।
অন্যদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে মনসুর আলম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাও মাহিরকে কড়া স্বরে বললেন,
আই'ম ভেরি ডিজাপয়েন্টেড মাহির। এসব তোকে মানায়? কাউকে পছন্দ করে রাখলে বলতে পারতি। এটলিস্ট আমাকে বলতি। এভাবে ইডিয়েটের মতো হুট করে বিয়ে করে বউ এনে হাজির করা তোর সাথে যায়? ভাইবোনরা কি শিখবে?
মাহির মনে মনে প্রমোদ গুনল। সে পুরো ঘটনা বড়ো চাচাকে আবার শুনালো। মনসুর আলম নড়েচড়ে বসলেন। অযথা এতো বিস্তারিত গল্প বানিয়ে বলার মতো ছেলে মাহির না৷
-এ তো খুবই ড্রামাটিক ব্যাপার-স্যাপার বাপ।
-আমার লাইফ কবে সরল ছিল?
-তাও ঠিক৷ জীবন অনেক সময় করণ জোহারের মুভির চেয়েও বেশি নাটকীয় হয়। এখন কি করবি ভেবেছিস? আমার পরিচিত উকিল-
-বাড়িতে নিয়ে এসেছি যেহেতু সংসার করব বলেই এনেছি। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন তিনি আমার স্ত্রী, আমার দায়িত্ব।
-কি বলছিস! মেয়েটা তো তেমন এডুকেটেড ও না! অথচ তোর কি চমৎকার সব রেজাল্ট। ক্যারিয়ার মাত্র শুরু করলি। এরকম গ্যাপ নিয়ে মানসিকতা না মিললে কিন্তু মহাবিপদ। দীর্ঘ মেয়াদে এমন সংসার গলার কাঁটায় পরিনত হয়।
-আমি কথা দিয়েছি চাচা। নিজের মুখের কথার মান না রাখলে, নিজের সাথেই আজীবন চোখ মেলাতে পারব না।
আইরিন জাহান সরকার ভবিষ্যতে আমার গলার মালা হবে নাকি কাঁটা জানি না৷ কিন্তু আমার পরিচয়ে থাকবে এটা নিশ্চিত।
মনসুর আলম গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, না জানি না বাপ। বাড়ির মহিলারা কেউই তো খুশি না। ওদের পক্ষেও অনেক যুক্তি আছে। তুই তাহলে ওকে ভালো মতো সবার মন জুগিয়ে চলার কথা বলে দে। এই বাড়িতে থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। ইভেন ফর মি। হাহাহা!
মাহিরের হাসি পেল না। বড়ো চাচার সামনে সে যতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলেছে, মনে ঠিক ততটাই দোটানায় আছে। এই বাড়িতে, বাড়ির মানুষগুলোকে নিয়ে তাদের দাম্পত্যের আদৌ কোনো ভবিষ্যৎ আছে?
—————
মিনি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, এটা কি?
আয়না বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে বলল, আমার রেডিও।
-এ-তো অনেক পুরনো। চেনাই যায় না। এটা দিয়ে তুমি গান শুনো ভাবী? ফোনেই তো শোনা যায়!
-আমার এটাই পছন্দ। নবটা ঘুরাও তো।
মিনি আয়নার কথা মতো করতেই পুরনো দিনের উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেনের গান বেজে উঠল। আয়না গুনগুন করতে করতে ঘরটা পরিস্কার করতে লাগল।
-তুমি গান গাও ভাবী?
-উহু গলায় জড়তা আছে। মোটেও সুরেলা কণ্ঠ নয়।
-কে বলেছে এমনটা?
-সবাই বলেছে।
-হায় খোদা! মুখের ওপর? তাও তুমি গাও?
-নিজের ইচ্ছে হলে গুনগুন করি। সবারটা ধরতে যাবে কে?
মিনি নতুন ভাবীর পরিপাটি কাজ দেখে। তার আরো কিছুক্ষণ গল্প করতে খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু মা যদি জানতে পারলে তাহলে আর তাকে আস্ত রাখবে না। এতো রাগ হতে মা'কে কখনো দেখেনি মিনি। এবার তো কেউ তার সামনে কোনো কথা বলার সাহসও পাচ্ছে না। নতুন ভাবীর নিচে নামাও নিষেধ। মিনির মায়া লাগে। প্রেম করলেও কি এতো বড়ো দোষ হয় নাকি? মিনির সাথে যদি তার শ্বশুরবাড়িতে এমন করে তবে সেতো দুঃখেই মরে যাবে!
-মাহির ভাইয়া আবার গেলো কোথায়?
-আমাকে বলে যায় নি।
-সত্যি?
-মিথ্যে বলার প্রয়োজন দেখছি না তো।
মিনি খুব ইতস্তত করে বলল, একটা কথা বলি? রাগ করবে না তো?
-করার মতো হলে করবো। আগে থেকে কিছু বলতে পারছি না।
-তাহলে বলব না।
-ঠিক আছে।
-আচ্ছা শুনো শুনো! তোমরা সত্যি একে অপরকে আগে থেকে চিনতে না? বলো না আমাকে? আমি কাউকে বলব না। প্রমিস!
-চিনতাম না।
-আগে থেকে তবে পছন্দ করতে না?
-না বাবা! না। করতাম না।
মিনি ভেবে বলল, এখন? এখন করো?
আয়না থমকে বলল, না।
মিনি বিরক্ত হয়ে বলল, ইউ আর টিজিং মি! এটা কোনো কথা? কেন করবে না? মাহির ভাইয়া ইজ আ জেন্টেলম্যান!
-তাই বুঝি?
-অবশ্যই। তুমি খুব লাকি।
আয়না রেডিওর ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে বলল, তা দেখা যাবে।
—————
পায়ে ঘন করে আলতা দেওয়া আয়নার ছোটবেলার স্বভাব। বালিকা বয়সে সে আলতা দিয়ে হাতে-পায়ে বিভিন্ন নকশা রাঙিয়ে মিষ্টি স্বরে বলল, আমি কোনো কাজ করতে পারব না দাদী, আলতা পরেছি তো।
তখন তার দাদী রেগে খেঁকিয়ে উঠতেন। আলতার সৌন্দর্য দুধে ফুটে। শুভ্র তনুর ত্বকে আবিরের মতো গাঢ় লাল কেমন সুন্দর জ্বলজ্বল করে! মেয়ের রূপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আয়নার কি তেমন রূপবতী নাকি! তার কি দরকার এসব করার?
তিনি কটাক্ষ করে বলতেন,
এহ্ ফুলবিবি সেজে বইসা আছে আলতা পইরা। কেমন বেতচ্ছিরি লাগতেছে ছ্যা!
এক সময়ে গিয়ে আয়না সেসব কথা মোটেও গায়ে মাখাতো না। তার সুন্দর লাগে, তাতেই হবে। তাই মাহিরকে পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে খুব বিচলিত হলো না। তবুর হাতটা কাঁপল সামান্য। দক্ষ কারুকাজ কিছুটা হোঁচট খেল।
মাহির হঠাৎ বিড়বিড় করে বলল, মাটির পুতুল!
আয়না গম্ভীর স্বরে বলল, কি বললে?
-না কিছু না!
-মাত্রই তো শুনলাম আমি? তোমার জন্য আমার ফোকাস নষ্ট হলো।
মাহির এবার বেশ থতমত খেয়ে গেল। নিজের ভুল ঢাকতে তাড়াতাড়ি আমতা আমতা করে বলল,
না মানে... ছোটবেলায় মেলায় যেতাম না? সেখানে একবার দেখেছিলাম আর কি রোদে পোড়া উজ্জ্বল তামাটে রঙের মাটির টেপা পুতুলগুলো সারি সারি সাজানো থাকত। আগুনের তাপে পোড়া সেই সোনাঝরা রঙ, আর গায়ে লাল রঙের নিখুঁত আলপনা। মানে হঠাৎ করে তোমার এই পায়ের আলতা পড়া দেখে হুট করে ওই মেলার কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক তেমনই... মানে, একদম ওমন অদ্ভুত একটা মায়া লেগে থাকত পুতুলগুলোর গায়ে। অন্য কিছু না কিন্তু!
আয়না মাথা নিচু করল। চুল দিয়ে তার আরক্ত মুখ ঢেকে গেল। খানিকটা আলতা পড়ে সব একাকার হলো! আয়না রুষ্ট হয়ে বলল, সব তোমার জন্য!
হতভম্ব মাহির বলল, আমি কি করলাম?
-ডিস্ট্র্যাক্ট!
-কত দূরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। কথাও তো বলছিলাম না। দিস ইজ আনফেয়ার!
-কোথায় দূরে! আর এসব আলতা পরা পুতুল, মায়া এইসব বলতে গেলে কেন? দেখো আমার সব আলতা পড়ে গেল।
মাহির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, জ্বি, আমার অপরাধ হয়েছে। এসো, হাত ধরে উঠে এসো।
আয়না মাহিরের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। অতিরিক্ত করে লোকটা! সে হাত তো ধরলোই না। প্রায় দৌড়ে ছাদ পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো। মাহির তাকিয়ে রইল তার ফেলে যাওয়া অরুণাভ পদচিহ্নের দিকে।
—————
মিনিকে অবাক করে দিয়ে সন্ধ্যার দিকে আয়না নিচে নামল। মিনির হাতে তখন আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি। সে বই রেখে আয়নার দিকে এগিয়ে গেলো। ফিসফিস করে বলল, ভাবী! তুমি নেমে এলে কেন?
আয়না শান্ত স্বরে বলল, চা খাবো। ওপরে কোনো স্টোভ বা হিটার থাকলে আসতে হতো না।
মিনি বলল, আমি ভালো চা বানাতে পারি জানো? মশলা চা। দাঁড়াও চুলোয় পানি বসাই।
আয়না বুঝতে পারল এই মেয়েটার মুখে কোনো জড়তা নেই। যেকোনো টপিকের কথার ঝুড়ি তৈরি থাকে। প্রথমদিকে চিলেকোঠায় কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করতে করতেই কথার খই ফুটছিল। আয়নার কথার পিঠে স্বভাবসুলভ অল্প কথায় সে মোটেও দমে না, বরং উৎসাহ নিয়ে ভাব জমানোর চেষ্টা করতে থাকে।
আয়না ধবধবে পরিষ্কাট রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখে।
মিনি বলে, জিনিসপত্র ওলট-পালট হলে মা যে কি রাগ করে! রান্নঘরের সব তার পাই টু পাই হিসেবের। এদিক-সেদিক হলেই টের পেয়ে যায়।
আয়না বলল, বেশ ইন্টারেস্টিং তো!
-সত্যি বললাম।
-মানলাম।
মিনি এক কাপ চা আয়নাকে দেয়। তারপর চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকে। আয়না চুমুক দিয়ে বলে, আসলেই ভালো হয়েছে।
-এই চা-টা তুমি বুড়ির ঘরে দিয়ে আসো না? আমার বান্ধবী ফোন দিচ্ছে। নিশ্চয়ই ওর হতচ্ছাড়া বয়ফ্রেন্ডটা কোনো অকাজ করেছে।
আয়না নিঃশ্বাস ফেলে বলে, দাও দিয়ে আসি।
সাহেরা বানু বিছানার ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে তসবি গুনছিলেন। আয়না চা নিয়ে ঢুকতেই তিনি বাঁকা চোখে তাকালেন। তার মনোক্ষুণ্ণ ভাব এখনো দূর হয়নি। এ পর্যন্ত মাহির একবারও তার ঘরে আসে নাই। বড়ো বউ ও চোটপাট দেখাচ্ছে।
তিনি তসবি রেখে বলল, তোমারে কামকাজ দিলো আবার কে? তুমি উপরেই থাকো। ঘুরাফিরা করো, আরাম করো। পাকঘরে যাইতে হইবো না।
আয়না স্পষ্ট স্বরে বলল, আমি রান্নাঘরে যাইনি তো। মিনারা চা ধরিয়ে দিয়ে বলল নিয়ে আসতে, তার অন্য কাজ আছে।
সাহেরা বানু রূঢ় স্বরে বললেন, মিনি বদটার আবার কাম কি! সারাদিন মোবাইলে হাহা হিহি কইরা বেড়ায়। ফাজিলের ফাজিল।
আয়না চা এগিয়ে দিয়ে বলল, খেয়ে দেখুন তো। চিনি ঠিক আছে?
সাহেরা বানু চা মুখে দিয়ে বললেন, কই চিনি দিছে? মিষ্টি হয় নাই।
আপনার ডায়েবিটিস তো বেশি শুনলাম। তাই হয়তো কম দিয়েছে।
-সব মাতব্বর আমার ঘরে এসে হাজির হইছে। যাও তো নাতবৌ তুমি যাও।
আয়না দরজা ভিজিয়ে চলে এলো। সে পুরো দোতালায় একবার চোখ বোলালো। তেমন সাড়াশব্দ নেই, ছিমছাম। বড়ো চাচা ও চাচী নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে রেখেছেন। মিনি কলে বান্ধবীদের সাথে গল্প করছে। আর ছেলেটা একদম ঘর থেকে বের হয়নি।
আয়না উপরে মাহিরের ঘরে উঠে কিছুক্ষণ কুলসুম বেগমের সাথে কথা বলল। তিনি ইতিমধ্যে মেয়েকে চারবার কল দিয়েছে। দুশ্চিন্তায় বুক হাসফাস করছে। আয়নাকে পেয়ে পইপই করে বাধ্য হয়ে চলার কথা বুঝিয়ে দিলেন। আয়না ভাইবোনের সাথে অল্প করে কথা বলল। সবার খোঁজ-খবর নিলো।
খুব আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তার নিশিখালির জন্য খারাপ লাগছে। সামান্য হলেও লাগছে। এই বিশাল কনক্রিটের দেয়াল মোটেই স্বস্তি দিচ্ছে না।
অস্বস্তি হওয়ার আরো অনেক কারণ আছে। এই অনিশ্চিত জীবনযাপনের মধ্যে একটা ঘটনা তাকে মনে মনে তটস্থ রেখেছে। যতই সে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় ততই ব্যাপারটা পিছাতে থাকে। বিয়ে হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকটা রাত পার হয়ে গেছে। পরিস্থিতির চাপে হোক বা নিশিখালির সেই চরম অনিশ্চয়তার কারণে, তারা দুজনে এক বিছানা ভাগ করলেও তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য কাঁচের দেয়াল রয়ে গেছে। স্বামী হিসেবে মাহিরও এখন পর্যন্ত শারীরিক ঘনিষ্ঠতার কোনো ইঙ্গিত বা ন্যূনতম কোনো তাগিদ দেখায়নি।
আয়নার মাথায় বিয়ে নিয়ে সিনেমাটিক কোনো নাটুকে চিন্তা কাজ করে না। সিনেমার পর্দায় দেখা সেই সব দম্পতি যারা বিয়ের পর একে অপরকে না ছোঁয়ার শপথ করে আলাদা বালিশ নিয়ে যুদ্ধ করে, তাদের আচরণ আয়নার কাছে সবসময়ই চরম অপরিণত আর শিশুসুলভ মনে হয়েছে।
আয়না অতি-আবেগপ্রবণ মেয়ে নয়। শরীরকে সে এমন কোনো পবিত্র বেদিতে বসিয়ে রাখেনি যে তাতে কারো ছোঁয়া পড়লে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। সে জানে, অসময়ে আর অদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাদের বিয়েটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিয়ে মানেই কিছু জাগতিক দায়বদ্ধতা। সে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল যে তাকে তার বৈবাহিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটা এই নড়বড়ে সম্পর্কের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর সে তা মেনে নিতে দ্বিধাবোধ মোটেই করবে না।
কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে মাহিরকে নিয়ে।
মাহিরের এ নিয়ে নির্লিপ্ততা আর নিস্পৃহ ব্যবহার আয়নাকে এখন তটস্থ করে তুলছে। মাহির যখন গভীর রাতে তার পাশেই নিঃশব্দে শুয়ে থাকে, তখন আয়নার প্রতিটা মুহূর্ত মনে হয়, এই বুঝি একটা হাত তার দিকে এগিয়ে আসবে, এই বুঝি তাকে কাছে টানবে! কিন্তু না। এরকমভাবে কতক্ষণই বা আর থাকা যায়! বাকি সবকিছু তে তো তার আচরণ স্বাভাবিক। মাহির কি তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর দ্বিধা কাজ করছে?
মাহিরের এই আনপ্রেডিক্টেবল আচরণ আয়নার কাছে এক বড় ধাঁধা। সে বুঝতে পারছে না মাহির কি তার সম্মতির অপেক্ষা করছে, নাকি মাহির নিজেই এই সম্পর্কটাকে শুধু এক ধরণের সমাজসেবার কাজ হিসেবে দেখছে।
যদি মাহির সরাসরি কোনো দাবি করত, আয়না হয়তো সেটাকে সহজভাবে নিতে পারত। কিন্তু এই যে মাহির কোনো শব্দ না করে তার প্রতিটি প্রয়োজনের খেয়াল রাখছে অথচ স্বামী হিসেবে ন্যূনতম কোনো দাবি তুলছে না এই ব্যাপারটাই আয়নাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করছে। সে নিজেকে প্রস্তুত করে রাখলেও অন্য পক্ষ যখন নীরব থাকে, তখন সেই নীরবতাটাই একটা প্রকাণ্ড প্রশ্নের মতো তাকে তাড়া করে ফেরে।
মাহির যখন ঘরে ফিরল আয়না ততক্ষণে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। মাহির বাইরে বেরিয়েছিল, তারপর দোতালায় বেশ সময় ধরে ছিল।
সে ঘরে ঢুকে আয়নার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল না, বরং টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বলল,
নিচে দাদীর প্রেশারটা একটু বেড়ে গেছে, ডাক্তার এসেছিল। বাড়ির সবাই এখন একটু টেনশনে আছে। তোমাকে হয়তো আরও কয়েকটা দিন এভাবেই একাকী কাটাতে হবে। মিনি আসবে যদিও, তবে সে বেশ ছোট ও অবুঝ। বড়ো চাচীর মন-মেজাজ এখন একদম ভালো না, আমি জানি। এসব নিয়ে আমি লজ্জিত। তবে তুমি একটু ধৈর্য নিয়ে থেকো আয়না। আমি চেষ্টা করছি সবকিছু স্বাভাবিক করার। ঘরের অনেক কিছুই পুরনো। কাল নতুন আলমারির অর্ডার দোকানে ঠিক করে দেব, তোমার সব কাপড় ওখানে রাখা যাবে। আর পড়ার টেবিলটা যদি তোমার জানালার ওপাশে সরাতে হয়, বলো আমি সরিয়ে দেব। কেমন? তোমার যা প্রয়োজন আমাকে সরাসরি বলবে। প্লিজ?
আয়না মাহিরের দিকে তাকাল। তার প্রতিটি শব্দে দায়িত্ব আছে, কিন্তু কোনো অধিকার নেই। মাহির কেবল জানতে চায় তার কোনো কিছু লাগবে কি না, সে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে কি না। মাহির একবারও তার চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো দাবি তুলছে না, কোনো নিবিড় মুহূর্তের আবদারের সূচনা করছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কি তবে শুধু আয়না ভাবছে! কি মহা যন্ত্রণা!
তবে সেটা পুরোপুরি সত্য নয়। শান্তশিষ্ট, ন্যায়বান ও ধৈর্যের প্রতীক মাহির আহমেদ যদিও কথা বলছে খুব ধীরস্থিরভাবে, কিন্তু তার হাতের আঙুলগুলো কাঠের টেবিলের ওপর অকারণে নড়ছে। সে হয়তো নিজেকে একদম স্বাভাবিক দেখাতে চাচ্ছে, কিন্তু তার প্রতিটি নড়াচড়ায় এক ধরণের আড়ষ্টতা স্পষ্ট।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘরটা বাইরের জগতটা ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় ভরে উঠল। মাহির আলমারি থেকে নিজের জন্য একটি চাদর বের করে নিল। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়বে? সারাদিন অনেক ধকল গেছে।
আয়না বলল, হ্যাঁ। শুয়ে পড়ছি আমি।
-আলো নিভিয়ে দিলাম, গুড নাইট।
-গুড নাইট!
মাহির তারপরেও অন্ধকারে বেশখানিকটা সময় অকারণেই হাঁটাহাঁটি করল। পানি খেল পরপর কয়েক গ্লাস। ক্লান্তির সাথে আর না পেরে সে যখন খাটের অন্যপাশে এসে শুতে গেল, তখন সে এক মুহূর্তের জন্য থামল।
খাটে শোয়ার পর মাহির প্রথমবার বুঝতে পারল তার ব্যাচেলর জীবনের এই সিঙ্গল খাটটি আসলে তাদের দুজনের জন্য খুবই ছোট।
একটু নড়াচড়া করলেই গায়ে গা লেগে যাচ্ছে। আয়না বুঝতে পারল মাহির নিজেকে গুটিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু বিছানার সীমানা এতটাই সংকীর্ণ যে মাহিরের শরীরের উত্তাপ আয়না স্পষ্ট টের পাচ্ছিল। আয়না দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে স্থির হয়ে শুয়ে ছিল, কিন্তু তার ভেতরের তটস্থ ভাবটা ফিরে এসেছে।
হঠাৎ পাশ ফিরতে গিয়ে দুজনই একসাথে নড়ে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তারা মুখোমুখি হয়ে গেল। অন্ধকার ঘরে আয়না দেখল মাহিরের চোখ তার খুব কাছে। তাদের নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। মাহিরের সেই শান্ত চোখে গভীর দ্বিধা আর অজানা চাঞ্চল্য। আয়না পাথরের মতো জমে গেল। মাহিরও তার জায়গায় স্থির হয়ে রইল।
মাহিরের কাঁধের সাথে আয়নার কাঁধ লেগে আছে। এই স্পর্শটুকু কারো কোনো পরিকল্পিত ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা। মাহির খুব ধীরে নিজের নিশ্বাস প্রশমিত করার চেষ্টা করল। মাহির তার থেকে যতটা সম্মানজনক দূরে থাকতে চাইছে, এই ছোট বিছানাটি তাদের ততটাই কাছাকাছি ঠেলে দিচ্ছে।
মাহির খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, সরি... খাটটা আসলে একটু বেশি ছোট হয়ে গেছে। তবে এটাও অর্ডার দিয়ে আসব। সময় লাগবে যদিও কিন্তু তাও….
-এসবের প্রয়োজন নেই তো এখন। যা করার ধীরে ধীরে করো। কোনো তাড়া নেই।
-অবশ্যই অবশ্যই। গুড নাইট।
আয়না কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলার কাছে কী যেন একটা আটকে গেল। মাহির সোজা হয়ে অ্যাটেনশন পজিশনে স্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইল। মনে হলো পুরো ঘরে শুধু তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আয়না বুঝতে পারে মাহির নিজেকে যতটা কঠিন আর উদাসীন দেখাতে চায়, তার ভেতরটা আসলে ততটাই সংবেদনশীল।
-আসলে কাল থেকে অফিসে যেতে হবে। আর কত ছুটি নিবো বলো? ফোনের পর ফোন আসছে। তাই খুব ভোরে আমার উঠতে হবে। তবে তোমার কোনো চিন্তা নেই আমি…..
-মাহির?
-হুম বলো? ও ঘুমাবে তুমি তাই না? সরি। আই মিন গুড নাইট!
-পঞ্চাশবার গুডনাইট বলা বন্ধ করো।
-সরি। আমি তাহলে এখন একটু…
-এটাও বলা বন্ধ। তুমি কি ফ্লোরে শুতে চাও?
মাহির হতবাক হয়ে বলল, মানে?
-না যেভাবে অর্ধেক শরীর বিছানার বাইরে রেখে শুয়ে আছো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে মাটিতে গড়াগড়ি করতে হবে ফর শিউর!
-আরে তেমন কিছুই হবে না। ডোন্ট ওর্যি! আমি কিন্তু…
আয়নার তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ঘুমাও মাহির। হ্যাভ সাম স্লিপ। ইউ ডিসার্ভ ইট!
·
·
·
চলবে……………………………………………………