আয়না ক্লায়েন্টের সাথে আলাপ শেষ করে মাহিরের পাশে সবে মাত্র যেই বসেছে, তখনই কারেন্ট চলে গেল। আহমেদ নিবাসে আইপিএস আছে তবে কেউ চিলেকোঠায় লাইন দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
মৌসুম বিগড়েছে, অসহ্যকর ভ্যাপসা গরম টিকে থাকা মুসকিল হয়েছে। এরমধ্যে ঘনঘন লোডশেডিং জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে দিয়েছে।
আয়না হ্যান্ড ফ্যানটা মাহিরের মুখের কাছে ধরে রাখল। এরকম পরিস্থিতিতেও বেচারা ঘুমোতে পারছে। তার এডাপটেশন ক্ষমতা চমৎকার, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে কোনো অভিযোগ ছাড়া টিকিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আয়নাকে অভিযোগ করার সুযোগ ও দেয় না। কতদিন হয়েছে তাদের সংসারের? এরমধ্যে এই চিলেকোঠায় আয়নার সুবিধার জন্য ডজনখানেক জিনিস যুক্ত হয়েছে।
আয়না মাহিরের টি-শার্ট একটু টেনে নামিয়ে দিল। তাকে কতবার বলল খালি গায়ে বা না-হয় স্যান্ডো গেঞ্জি পড়ে থাকলেই তো হয়, কিন্তু এই প্রস্তাব শুনে ভদ্রলোক প্রথম কাশতে থাকলেন আর এরপর মৌনব্রত ধারণ করলেন। আয়না দু-তিনবার বলে থেমে গেল! কি আশ্চর্য! তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে আয়না যেন তাকে উন্মুক্ত দেখার জন্য বারবার বলছে!
কত্তো শখ! যেন আয়না আগে দেখেনি!
সে আর বলবে না। গরমে সিদ্ধ হলে ভালো হবে। আয়নার কি তাতে!
আয়না সিড়িতে ধুপধাপ হাঁটার শব্দ শুনতে পেল। মিনি আসছে, সাথে সম্ভবত দিনা।
মিনি এসে বলল, ভাইয়ার জন্য দিনা স্যুপ বানিয়ে এনেছে। চিকেন স্যুপ।
দিনা বলল, মাহির ভাই ঘুমাচ্ছে? দেখ আগে।
মিনি আয়নার দিকে তাকাল, সে উত্তরে বলল, হুম। রেখে যাও। উঠে গেলে সে খেতে পারবে। থ্যাঙ্কস দিনা।
দিনার মুখে কঠোরতা বাড়ল বৈ কমল না। সে ইতস্তত করে মিনির হাতে বাটি ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। ঘরে ঢোকার তার কোনো ইচ্ছে নেই।
ওর চলে যাওয়াতে মিনি কিছুক্ষণ শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুছিয়ে বসল। টেবিলের ওপর স্যুপের বাটিটা রেখে চেয়ারটা টেনে সে আয়নার গা ঘেঁষে বসল।
-বাহ! তোড়জোড় করে স্যুপ বানিয়ে দিনা তো ভেতরে আসার নামও করল না।
মিনি বিড়বিড় করে বলল, যেন নিজের সাথেই কথা বলছে।
আয়না কোনো মন্তব্য করল না। তার দৃষ্টি মাহিরের ওপর স্থির।
মিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, আবার পরক্ষণেই সোজা হয়ে বসল। মেয়েটা বড্ড অস্থির হয়ে আছে। নিজের জামার হাতা নিয়ে কিছুক্ষণ খুটখুট করার পর দ্বিধা কাটিয়ে বলেই ফেলল,
সত্যি বলছি ভাবী, আমি বড্ড টায়ার্ড।
আয়না ওর দিকে তাকাল, কী নিয়ে?
-সবকিছু নিয়ে!
মিনির উত্তর দিতে দেরি হলো না,
এই অ্যাডমিশন টেস্ট, কোচিং, এক্সাম আর সবার ওই একই প্রশ্ন কী পড়বে, কোথায় চান্স পাবে, ফিউচার প্ল্যান কী? এমনভাবে জিজ্ঞেস করে যেন আমি নিজেই সব জানি!
আয়না বাধা দিল না, ওকে বলতে দিল।
মিনি চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসল, আমি শুধু চাই এই সময়টা কোনোমতে পার হোক। এই প্রেশার আর নিতে পারছি না। লোকে বলে এরপর নাকি সব সহজ হয়ে যায়, শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়।
-তুমি কি সেটা বিশ্বাস করো?
আয়না নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
মিনি মুখটা একটু বাঁকাল, জানি না। তবে কিছু একটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। নাহলে পাগল হয়ে যাবো সত্যি! কেন যে বড় হতে চেতাম, স্কুলের লাইফটাই বেস্ট ছিল।
সে চুপ করে থেকে আবার বলল, গলার স্বর নিচু করল, দিনা নির্ঘাত পাবলিকে চান্স পাবে। দেখো!
ওর গলায় তীক্ষ্ণ নিশ্চয়তা ছিল।
-আর তুমি? - আয়না জানতে চাইল।
মিনি কাঁধ ঝাঁকাল ঠিকই, কিন্তু ওর চোখ জোড়া নিচে নেমে গেল, আমি পাব না। ন্যাশনালে পড়তে হবে মনে হয়৷ মা তো বলে রামিন ভাইয়ার মতো আমাকে প্রাইভেটে পড়াবে না।
উত্তরটা এত দ্রুত এল যে বোঝা যাচ্ছিল এটা ওর মনের গভীরে গেঁথে আছে।
-এটা তো জানাই কথা,
মিনি হালকা হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর বিষণ্ণতা ঢাকা পড়ল না,
দিনা সবসময়ই আমার চেয়ে বেটার ছিল। অনেক বেশি ফোকাসড। মাও সেটা জানে। মা'র কথা বলার ধরন দেখলেই সেটা বোঝা যায়।
আয়না অস্বীকার করল না, আবার সমর্থনও করল না।
মিনি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সামনের দিকে ঝুঁকে এল। দুহাতে মুখ ঢেকে বলল, মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু শুরু হওয়ার আগেই আমি সবার থেকে পিছিয়ে পড়েছি।
কিছুক্ষণ পর আয়না খুব শান্ত গলায় বলল,
তুমি কি নিজের জন্য পড়াশোনা করছো, নাকি সবার জন্য?
মিনি ভ্রু কুঁচকাল, মানে?
-মানে হচ্ছে, তুমি কি নিজের কোনো লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছো, নাকি কেবল অন্যদের প্রত্যাশা মেটানোর চেষ্টা করছো?
মিনি সাথে সাথে উত্তর দিতে পারল না। আয়না কোনো জোর দিল না ওর ওপর, কেবল ধীরস্থিরভাবে বলে চলল,
কারণ তুমি যদি কেবল অন্য কারো সাকসেস-এর সংজ্ঞার পেছনে ছোটো, তবে জীবনটা সবসময়ই ভারী মনে হবে। মনে হবে কেউ তোমাকে পেছন থেকে জোর করে ঠেলছে।
কিন্তু তোমার নিজের যদি কিছু পাওয়ার ইচ্ছে থাকে, সেটা যতই ছোট হোক বা নড়বড়ে হোক তখন শ্রমটা আর বোঝা মনে হয় না। কষ্ট তখনো হয়, কিন্তু সেটা তোমাকে দমিয়ে দেয় না।
মিনি এবার আয়নার দিকে সরাসরি তাকাল,
আমি আসলে কী চাই, সেটাই আমি জানি না ভাবী।
সে অকপটে স্বীকার করল।
-তাতে কোনো সমস্যা নেই। জীবনের সবকিছু এখনই গুছিয়ে ফেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
মিনি একটু ম্লান হাসল। বাকি সবাইকে দেখে তো মনে হয় ওরা সব জানে।
-অভিনয় ছাড়া কেউ কিছুই জানে না, সবাই চলার পথে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এমন ভাব করতে পছন্দ করে যে সবকিছু তার পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে।
আয়না খুব সহজভাবে বলল।
কথাটা মিনাকে একটু থমকে দিল। আয়না একটু নরম স্বরে যোগ করল,
নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করো। ওদের জন্য নয়, নিজের জন্য। যাতে পরে রেজাল্ট যাই হোক না কেন, নিজেকে এই প্রশ্নটা করতে না হয় যে আমি কি আরেকটু চেষ্টা করতে পারতাম না?
মিনি মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। আয়নার কথাগুলো ওর মাথায় ঘুরছে।
-অন্তত তখন আক্ষেপ থাকবে না, সে বিড়বিড় করল।
যেমনটা আয়নার আছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা না দিতে পারার আক্ষেপ। জীবনের মোড় ঘোরাতে ব্যর্থ হওয়ার আক্ষেপ। গভীর রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্টেশনে ধরা পরার আক্ষেপ। রফিক সরকারের অহংকারের সামনে হেরে যাওয়ার আক্ষেপ।
মিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল, যেন মনের কোনো ভার নামিয়ে দিল। তারপর ওর চোখ গেল মাহিরের প্লাস্টার করা হাতের ওপর।
-ভাইয়ার হাতটা কেমন সাদা ম্যাড়ম্যাড়ে দেখাচ্ছে।
আয়না কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিনা টেবিল থেকে কয়েকটা কলম টেনে নিল।
-একটু সুন্দর করে দিই!
মিনি তড়িঘড়ি করে মাহিরের হাতটা সাবধানে ধরল।
সে প্লাস্টারের ওপর ছোট ছোট নকশা করতে শুরু করল।
-দেখো? এখন হাতটার একটা পার্সোনালিটি তৈরি হয়েছে।
সে তৃপ্তির সাথে বলল।
আয়না তাকিয়ে দেখছিল, ওর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে। নিশিখালিতে ফেলে আসা কাসিফ, কামিণীর জন্য মন ভার হয়। কতদিন তাদের সাথে দেখা হয় না!
মিনি এবার মাহিরের কবজির কাছে একটা ছোট কার্টুন মুখ আঁকল, ভাবী তুমি একটা হার্ট এঁকে দাও। সাইন করে দাও।
আয়না কোনো উত্তর দিল না। ঠিক তখনই বিছানায় মাহির একটু নড়ে উঠল।
প্রথমে সামান্য ভ্রু কুঁচকাল সে, তারপর কাঁধটা একটু নাড়াল। শারীরিক অস্বস্তিতে ঘুমটা হালকা হয়ে আসছে।
মিনি থেমে গেল, ভাইয়া কি জেগে গেল?
আয়না মাথা নাড়ল না ঠিকই, কিন্তু তার নজর এখন মাহিরের ওপর। মাহির ধীরে ধীরে মাথাটা ঘোরাল। তারপর অবচেতনভাবেই সে বিছানার যে পাশে আয়না বসে আছে, সেদিকে সামান্য ঘেঁষে এল।
ওর বাম হাতটা খুবই সহজাতভাবে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল, যেন অন্ধকারে কিছু একটা খুঁজছে। একবার একটু থামল, তারপর আবার এগোতে লাগল যতক্ষণ না সে আয়নাকে খুঁজে পেল।
আয়না একদম স্থির হয়ে গেল। মাহিরের হাতটা এসে থামল আয়নার কোলের ওপর। তপ্ত আর ভারী একটা স্পর্শ।
এই স্পর্শটুকুই যথেষ্ট ছিল।
মাহিরের নিঃশ্বাস আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। ওর মুখের সেই চিন্তিত রেখাগুলো মিলিয়ে গেল। সে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল।
মুহূর্তের জন্য ঘরটা যেন নিথর হয়ে গেল। মিনি প্রথমে হাতের দিকে তাকাল, তারপর আয়নার দিকে। ওর মুখে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল।
সে ফিসফিস করে আয়নার কাছে ঝুঁকে এল, বাহ! ভাইয়া তো ঘুমেও জানে ঠিক কোথায় হাত রাখতে হয়!
আয়না ওকে একটা কড়া চোখে তাকাল, মিনি!
মিনি হাসি চেপে ফিসফিস করল, কী? সরিয়ে দেব হাতটা?
-না।
আয়না খুব দ্রুত উত্তর দিল, তারপরই নজর সরিয়ে নিল। মিনার হাসিটা এবার চওড়া হলো,
ও আচ্ছা!
আয়নার পিঠ শক্ত হয়ে গেছে। সে সোজাসুজি সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নিচের দিকে তাকানো বারণ।
-চুপ কর! সে বিড়বিড় করে বলল।
-আমি তো কিছুই বলছি না।
মিনি উত্তর দিল, যদিও ওর চোখের চাউনি অন্য কথাই বলছে।
আয়না মাহিরের হাতটা সরাল না। সে শুধু স্থির হয়ে বসে রইল। সে কেমন অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইল।
মাহির আবার নড়ে উঠল। মাহিরের চোখের পাতা কাঁপল। সে চোখ দুটো সামান্য মেলল, ওর দৃষ্টি তখনো কিছুটা ঝাপসা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে হয়তো বুঝতেই পারল না যে সে কোথায় আছে।
তারপর ওর নজর স্থির হলো।
আয়নার ওপর।ঠিক তার পাশেই আয়না বসে আছে।
মাহিরের চেহারার প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই নরম হয়ে এল। আর চোখে ফুটে উঠল শান্ত, ক্লান্ত উষ্ণতা। ওর ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসির রেখা দেখা দিল।
হ্যালো ম্যাম! - সে ঘুম জড়ানো নিচু স্বরে বলল।
ওর বলার ধরনটা ছিল অন্যরম,আয়না সাথে সাথে নড়েচড়ে বসল। কে জানে হুট করে কি বলে ফেলে! একদম সটান হয়ে বসে সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল, মিনি পেছনে আছে। ও এতক্ষণ তোমার কাছে বসে ছিল।
কথাটা উত্তরের চেয়ে সতর্কবাণী হিসেবেই বেশি শোনাল। মিনির চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বড় বড় হয়ে গেল পরক্ষণেই সে বেশ মজা পেয়ে চোখ সরু করে তাকাল।
-ও আচ্ছা?
সে টেনে টেনে বলল। তারপর মাথাটা একবার মাহিরের দিকে, একবার আয়নার দিকে ঘুরিয়ে মুচকি হাসল, আমি কি এখন ভান করব যে আমি কিছুই শুনিনি?
আয়না ওকে একটা কড়া চোখে তাকাল।
মাহির একবার চোখের পাতা ফেলে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তার মুখে এক পলকের জন্য মজার একটা আভা খেলে গেল ঠিকই, কিন্তু সে মিনির কথার কোনো উত্তর দিল না। বদলে সে একটু নড়েচড়ে শোয়ার চেষ্টা করল। ওইটুকু নড়াচড়াতেই চোট পাওয়া জায়গাগুলোতে টান পড়ায় তার মুখটা একটু কুঁচকে উঠল।
মিনি বেশ হাসিখুশি গলায় মাহিরের প্লাস্টার করা হাতটা খপ করে ধরে ফেলল, যাই হোক, দেখো আমি কী করেছি!
সে হাতটা বেশ গর্বের সাথে উঁচিয়ে ধরল।একদম ধবধবে সাদা সাধারণ প্লাস্টারটা এখন হরেক রকমের ছোট ছোট নকশায় ভরে গেছে ফুল, প্রজাপতি, আঁকাবাঁকা লুপ আর ছোট ছোট গোল্লা। কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নেই, সবকিছু একটার ওপর আরেকটা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
সহজ কথায় বললে, পুরো জিনিসটা একটা জগাখিচুড়ি।
-তোমার বোরিং প্লাস্টারটাকে এখন একটা সুন্দর ক্যানভাস বানিয়ে দিয়েছি, কেমন হয়েছে?
মাহির সেদিকে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল না সে কী ভাবছে। তারপর ধীরে ধীরে বিরক্তি আর কৌতুক মেশানো অভিব্যক্তি ওর মুখে থিতু হলো।
-তুই তো বেশ ভালোই আঁকিস।
মিনা যেন হাতে স্বর্গ পেল, আমি জানতাম!
তারপর আবার অনর্গল বলে চলল, সেবার রামিন ভাইয়ার প্লাস্টারে যখন এমন এঁকেছিলাম? মনে আছে? কী রাগটাই না করল! পুরো এক সপ্তাহ আমার জীবন ও অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল।
তুমি একদম সেরা বড় ভাই।
সে মাহিরের হাতটা সাবধানে আগের জায়গায় নামিয়ে রাখল এবং হাই তুলে একটু আরমোড়া ভাঙল।
আমি একটু নিচে গিয়ে দেখে আসি মা ডাকছে কি না, সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, যদিও ওর চোখের কোণে দুষ্টুমির ঝিলিক।
তারপর আর কাউকে থামানোর সুযোগ না দিয়েই চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মাহির একটু সময় নিয়ে নিজেকে বালিশের সাথে ঠেস দিয়ে সোজা করে বসার চেষ্টা করল। তার মুখে একবার ব্যথার ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু সেটা সে মুখ ফুটে বলল না। তার বদলে সে টেবিলের ওপর থাকা ছোট রিচার্জেবল ফ্যানটার দিকে হাত বাড়াল।
খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে ফ্যানটা আয়নার দিকে একটু ঘুরিয়ে দিল।
তারপর সে আবার শান্ত হয়ে হেলান দিয়ে বসল, যেন কিছুই হয়নি। আয়না খেয়াল করল। কিন্তু সে কোনো মন্তব্য করল না।
মাহির আবার নিজের প্লাস্টারের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল আয়নার দিকে।
-এটা কি তোমাদের আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল?
আয়না সামান্য ভ্রু কুঁচকাল, না।
ছোট্ট একটা বিরতি।
মাহির হাতটা একটু উঁচিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। তুমি কিছু লিখলে না কেন? নাহলে তো ক্যানভাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আয়না একটু ইতস্তত করল।
-তুমি চাইছো আমি কিছু আঁকি?
সে কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়ে জিজ্ঞেস করল। মাহির এক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপরই চোখ সরিয়ে নিল যেন হুট করে সে সচেতন হয়ে উঠেছে।
-জ্বি, যা খুশি। তোমার যা ইচ্ছে হয়।
আয়না এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর খুব ধীরে সে উঠে দাঁড়াল এবং মিনা যে কলমটা ফেলে গেছে সেটার দিকে হাত বাড়াল।
খুব সাবধানে সে মাহিরের হাতটা নিজের হাতের ওপর নিল। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে প্লাস্টারের একদম এক কোণায় ছোট করে কিছু একটা লিখল।
ওর নিজের নাম। আয়না।
খুব সাধারণ, পরিচ্ছন্ন আর সাদামাটা গোটা গোটা অক্ষরে। লেখা শেষ হতেই সে প্রায় সাথে সাথে হাতটা ছেড়ে দিল।
মাহির সেদিকে তাকাল।
তার মুখে আবার সেই সুন্দর ম্লান হাসির রেখা দেখা দিল।
—————
তোমাকে না ভিতরে যেতে বললাম? হাতের প্লাস্টারটা যদি ভিজে মাহির আহমেদ! আমি কি তোমার কাছে সাহায্য চেয়েছি?
-আমি বোরড হচ্ছি শুয়ে শুয়ে আয়না। তুমি সুবর্ণা এক্সপ্রেসের মতো ছুটে বেড়াচ্ছো, দশ মিনিট পাশে শান্ত হয়ে বসবে তার ঠিক নেই। সেলফোন ও নেই, ল্যাপটপ ধরা নিষেধ। এভাবে বেকার থাকা যায়?
-একটা মানুষ একদিন ও রেস্ট নিতে পারে না! কি আশ্চর্য! এখনো রোদে দাঁড়িয়ে রইল কেন?
আয়না পিছনে ফিরে ধোয়া কাপড়গুলো চিপে, ঝারা দিয়ে ছাদের কাপড় শুকানোর তারে মেলে দেয়। কড়া রোদ উঠেছে, আশেপাশে একদম তাকানো যাচ্ছে না। গরমের তাপে সিমেন্টেের ঢালাই করা মেঝে একদম তেতে আছে।
মাহির বার কয়েক ডাকল। আয়না সাড়া দিল না, তাও যদি লোকটা ঘরে ফিরে! হুট করে চুলে পানির ঝাপটা লাগতেই সে পিছনে ফিরে তাকাল। হতভম্ব হয়ে দেখল মাহির নিচু হয়ে বালতি থেকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে তার দিকে!
আয়নাকে দেখল ভদ্রলোকের মুখোশধারী মাহির আহমেদের ছেলেখেলা। চোখে তার দুষ্টুমি ও প্রশ্রয় চিকমিক করছে। আয়নাকে নাজেহাল করার শপথ নিয়েছে।
মাহির খুব গর্ব করে বলল, তোমারকে বাগে পাওয়ার জন্য এক হাত-ই যথেষ্ট।
আয়না বিস্ময় কাটিয়ে যেই না প্রতিশোধ নিতে যাবে ওমনি শত্রু প্লাস্টার দেখিয়ে বলল, ভিজে গেলে কি হবে বলো তো?
আয়না থমকালো, সাথে সাথে মাহির আরো পানি ছিটিয়ে তাকে ভিজিয়ে দিল। আয়না কোমড়ে হাত দিয়ে বলল, মাহির! তোমার একদিন কি আমার!
আয়না নিজে টেরই পেল না কখন সে তার পিছনে শোধবোধ ভুলে দৌড়াতে শুরু করল। কে দেখছে, কি ভাবছে সে চিন্তা তার মাথায় এলো না। এভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয়াবহতাও বিচলিত করল না। তার মন পুরেটাই এই মানুষের ওপর স্থির হলো৷ এতোটা আকৃষ্ট করে ফেলেছে সে তাকে! মাহির ও কম না। দুষ্টুমি করতে চাইলে সেটাতেও সে সেরা!
চোট পেয়েও লাভ হলো না, আয়না কোনোমতেই তার হাত থেকে পানির উৎস কেড়ে নিতে পারল না।
তবে মাহির একসময় থামল। সে থামল আয়নার প্রাণখোলা হাসির স্বাদ নিতে, মেলে দেওয়া কাপড়ের আড়ালে নাদান স্ত্রীকে আড়াল করে স্বামীত্ব ফলাতে। কয়েক মুহুর্তের জন্য শুধু! ওইটুকুই তো আয়নাকে অস্থির করে তুলল। অসুস্থ স্বামীকে বেচারি কিছু বলতে পারে না। অধর মুক্ত করে বদ পুরুষের বুকে চাপড় মেরে বলে, একদম বেশি বেশি!
মাহির ব্যথাতুর ভঙ্গিতে সরে আসে, তার মুখে তৃপ্ত হাসি। আয়না রাগে দাত কিড়মিড় করতে থাকে। মাহির একটা ওড়না টেনে ওকে জড়িয়ে নিজে ভেতরে চলে যায়। এরচেয়ে বেশি আয়নাকে ঘাঁটালে নির্ঘাত বিপদে পড়তে হবে তাকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………