বিধ্বস্ত শরীরে কাজলী ঘরের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে মূর্তির মতো বসে আছে। বিলের পাড় থেকে অন্ধকারে জঙ্গলে ঢুকতেই সাহেব চাচা কোথা থেকে যেন এসে খপ করে হাতটা ধরে ফেললেন। কোনো কথা না বাড়িয়ে টেনে নিয়ে পূর্ব দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ঘন জঙ্গলটা পেরিয়ে মানুষজন আছে এমন একটা চেনা পাকা রাস্তায় কাজলীকে তুলে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “সোজা বাড়ি যা কাজলী, পেছন ফিরবি না।”
তিনি নিজে সঙ্গে আসেননি। ঝিলপাড় বস্তির রাতের পাহারাদার তিনি; নুন আনতে পান্তা ফুরানো এক গরিব মানুষ। কাজলীর সঙ্গে তাকে দেখলে কাশেম মিয়ার রক্তচক্ষু আর ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে। চাকরিটা চলে যাবার ভয়েই তিনি আড়ালে থেকে গেলেন।
ঘরে ফিরেও কাজলীর কপালে শান্তি জুটল না। তাকে দেখেই বিছানা থেকে নেমে জোহরা বেগম মেয়েকে আরও এক দফা চড়-চাপড় মেরে বসলেন। এরপর নিজের অসুস্থ, দুর্বল শরীরটা নিয়েই শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে কোমড়ে বেঁধে ঘর থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলেন। গন্তব্য আলাউদ্দিন সওদাগরের বাড়ি।
ঝিলপাড় বস্তিতে একশো এগারোটা ঘর। তার মধ্যে কাঁচা টিন আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে বানানো আশিটা ঘরই আলাউদ্দিন সওদাগরের। প্রতি ব্লকে বিশটি করে ঘর। সেখানে গাদাগাদি করে বাস করে বিশটি পরিবার। প্রায় একশো মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের চাকা ঘোরে মাত্র দুটি নোংরা, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট আর একটিমাত্র টিউবওয়েলকে কেন্দ্র করে। ভোরের আলো ফুটতেই এক বালতি পানির জন্য শুরু হয়ে যায় তৃষ্ণার্ত মানুষদের চুলোচুলি। টয়লেটের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত মানুষগুলোর সাধারণ আলাপচারিতাও মুহূর্তের মধ্যে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। চারপাশ ভারী হয়ে থাকে টয়লেটের অসহ্য দুর্গন্ধে।
এই আশিটা ঘর ছাড়া বাকি একত্রিশটা ঘর উঠেছে অন্য চারজন খুদে মালিকের জমিতে। তাই এলাকার যেকোনো বড় সালিশ-নালিশ কিংবা মারামারিতে আলাউদ্দিন সওদাগরই প্রধান বিচারক। তার মুখের কথাই এখানে আইন।
টিনের ঘরগুলোর বাইরেও বস্তির এক মাথায় চারটা ইট-সিমেন্টের পাকা চুনকাম করা ভাড়াটিয়া বাসা আছে। দুই রুম, একটা বাথরুম আর ছোট একটা ড্রয়িংরুমের একটিতেই বাস করে আশিকরা।
আশিকের বাপ কাশেম মিয়া হলো এই বস্তির স্বঘোষিত সর্দার। আলাউদ্দিন সওদাগর মাসে বড়জোর এক-আধবার আসেন ভাড়া তুলতে। বাকিটা সময় পুরো বস্তির ওপর রাজত্ব চালায় কাশেম মিয়া। বস্তির যত জুয়াড়ি আর নেশাখোর বখাটে আছে সবাই নিজেদের আখের গোছাতে কাশেম মিয়ার চামচাগিরি করে বেড়ায়। ফলে কাশেম মিয়ার ক্ষমতার দাপট এখানে আকাশছোঁয়া।
তাদের মতো অভিভাবকহীন তিনটে নারীর পক্ষে কাশেম মিয়ার সঙ্গে পেরে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজলীর একটা ফেসবুক পোস্টের কারণে তার ছেলে লাপাত্তা। ছেলের অপমানের প্রতিশোধ নিতে হাড়ে বজ্জাত লোকটা যেকোনো মুহূর্তে তাদের ওপর চড়াও হবে, জোহরা বেগম তা খুব ভালো করেই জানেন। এই মুহূর্তে ঘটনাটি চারদিকে ভাইরাল বলে লোকলজ্জার ভয়ে সরাসরি বাড়িতে হামলা করতে পারছে না, কিন্তু কতক্ষণ এই লোকলজ্জার ভয় থাকবে?
কাশেম মিয়ার ক্ষোভ থেকে, আসন্ন চোরাগোপ্তা হামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে, নিরুপায় হয়ে জোহরা রাতেই ছুটে গেছেন আলাউদ্দিন সওদাগরের পায়ের কাছে একটু নিরাপত্তা ভিক্ষা করতে।
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ মারিয়ামের চোখে পড়ল দুপুরে আসা পুলিশ কর্মকর্তার আপলোড করা একটা ভিডিও। সেখানে বেশ জোর গলায় দাবি করা হচ্ছে, কাজলীকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, মূল অভিযুক্ত আশিক এখন পলাতক। কাজলীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। আশিককে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
ভিডিওর নিচে লাভ রিয়্যাক্টের বন্যা। কমেন্ট বক্সে পুলিশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। মুঠোফোনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া কোনো নারীর পাশে এভাবে পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে…এমন ঘটনা তো বিরল! মারিয়াম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই অনলাইন জগৎটা সত্যিই বড় মেকি! পুলিশ আদতে কোনো নিরাপত্তাই দেয়নি। যদি দিত, তবে আজ তাদের দরজায় দুটো বড় বড় তালা ঝুলিয়ে ঘরের কোণে এভাবে ভয়ে সেঁধিয়ে থাকতে হতো না। সে ভালো করেই জানে, দিনকয়েক পর এই উন্মাদনা ঠিক থিতিয়ে আসবে। এখন যারা ক্ষোভ দেখাচ্ছে, তারা বড়জোড় আর কয়েকটা কমেন্ট করবে, ভিডিওটা শেয়ার দেবে। ব্যস, এইটুকুই! তারপর সবাই সব ভুলে যাবে।
আশিকও আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে। ওরকম সাইকোপ্যাথ ছেলেরা প্রতিশোধ না নিয়ে থামে না। যেভাবে হোক প্রতিশোধ নিবে৷ ভাবতেই মারিয়ামের শরীরটা কেমন গুলিয়ে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করল।
রাত তখন এগারোটা। দরজায় খটখট শব্দ হতেই চমকে উঠল মারিয়াম। ভয়ার্ত কণ্ঠে শুধাল, “কে?”
ওপাশ থেকে জোহরার কণ্ঠ ভেসে এল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মারিয়াম হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তালাটা খুলে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করল, “মালিক কী কইল আম্মা?”
“কাইল সকাল দশটায় উনার বাড়িত সালিশ বসব। একটা সমাধান কইরা দিব।”
বলেই জোহরা আড়চোখে ঘরের কোণে বসে থাকা কাজলীর দিকে তাকালেন। দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে কাজলী জড় পদার্থের মতো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ের চামড়ায় চ্যালাকাঠের আঘাতের কালশিটে দাগ, কিছু কিছু জায়গায় জমাট বেঁধে আছে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। জোহরা এক পলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিলেন। হাতমুখ ধুয়ে মারিয়ামকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন।
একটিবারের জন্যও কাজলীকে বললেন না, “কাজলী, আয় দুটো ভাত খা।”
সারারাত ধরে কাজলী ঈশানের নম্বরে অনবরত কল করে গেল। এরই মধ্যে চোখে পড়ল, আশিকের মতোই কিছু বিকৃত মানসিকতার ছেলে তার ফেসবুকের পুরনো ছবিগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে নোংরা নোংরা কমেন্ট করছে। তাদের দাবি, মেয়েরা এভাবে খোলামেলা থাকলে, পর্দা না করলে ছেলেরা তো বাজে প্রস্তাব দেবেই! অথচ কাজলীর পোশাকের কোথাও কোনো অশালীনতা ছিল না। তার বুক থেকে কখনো ওড়না সরেনি। কিন্তু সমাজের চোখে দোষটা ওই পোশাকেরই! আশিকের মতো অপরাধীদের যেন কোনো দোষই নেই। খাবার খোলা রাখলে মাছিতো ভনভন করবেই। কী নিষ্ঠুর তাদের কুযুক্তি!
সকালে হঠাৎ এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে কাজলীর ঘুম ভেঙে গেল। আতঙ্কে ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠল। ক্লান্তিতে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। উঠে গিয়ে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেল। ক্ষুধায় পেটটা জ্বলছে। খাবারের আশায় রান্নাঘরে গিয়ে ঢাকনা তুলে দেখল, এক লোকমা ভাতও অবশিষ্ট নেই।
দুনিয়ার তাবৎ অভিমান, ক্ষোভ আর কষ্ট নিয়ে কাজলীর কাজল-কালো চোখ দুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়া অবস্থায় সে বিছানায় পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা নিজের মা আর বোনের দিকে তাকাল।
বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জোর করে কয়েক ঝাপটা পানি দিয়ে ঝটপট দাঁত ব্রাশ করে কিছু খুচরো টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল খাবারের খোঁজে৷ ঠিক বাইরে, একদম কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট। নাম তার সাতকাহন। এই নামকরণের পেছনে সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত উপন্যাস সাতকাহনের কোনো ভূমিকা নেই। এর আসল কারণ রেস্টুরেন্ট মালিকের ছয় মেয়ে আর এক ছেলে। সাত সন্তানের সাতটি গল্পকে এক সুতোয় বাঁধতেই তিনি ভালোবেসে দোকানটার নাম রেখেছেন সাতকাহন। ভোর থেকে এখানে সব ধরনের গরম গরম নাস্তা পাওয়া যায়।
কাজলী ভেতরে গিয়ে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বলল, “দুটো পরোটা আর একটা ডিম ভাজি দিয়েন।”
“খাবেন নাকি নিয়া যাইবেন?”
“নিয়া যাব।”
খাবার প্যাকেট হয়ে আসার পর সে যখন বিল মেটাতে ক্যাশ-কাউন্টারে গেল, কাউন্টারে বসা ইউসুফ কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। কাজলীর দিকে না তাকিয়ে, মাথাটা নিচু রেখে বলল, “টাকা লাগবে না।”
কাজলী ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কেন লাগবে না? আমি কি এখানে বিনামূল্যে দান খয়রাত নিতে আসছি, নাকি কোনো অনাথ আশ্রমে আসছি যে আমাকে দয়া করে বিনা পয়সায় খাবার দেওয়া হচ্ছে?”
ইউসুফ মাথা তুলল না। সামনের হিসাবের খাতায় কলম চালাতে চালাতে বলল, “জ্বি, আসলে আমরা আজ ডিসকাউন্ট দিচ্ছি। স্পেশাল ছাড়।”
“কীসের স্পেশাল ছাড়? পঞ্চাশ টাকার নাস্তায় আবার কীসের ছাড়?”
ইউসুফ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে খাতার পাতায় হাবিজাবি কী যেন আঁকল। তারপর আমতা আমতা করে মনগড়া অজুহাত দিয়ে বলল, “আসলে... আজ সকালের খাবারটা আমরা সবাইকে ফ্রি খাওয়াচ্ছি।”
কাজলী আর কথা বলার আগ্রহ পেল না।
“এই নিন, টাকা রাখুন।”
বলেই কাজলী যখন পঞ্চাশ টাকার নোটটা কাউন্টারে বাড়িয়ে দিল, ইউসুফ তখন নিচ থেকে একটা ছোট সাদা পলিথিন ব্যাগ চট করে ওর দিকে এগিয়ে দিল। কাজলী আবারও ভ্রু নাচিয়ে শুধাল, “এটা কী?”
“গরুর গোশত। পরোটার সঙ্গে ফ্রি দিচ্ছি।”
কাজলীর মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে আর কথা না বাড়িয়ে 'ঠাস' করে নোটটা কাউন্টারের ওপর আছড়ে ফেলে বলল, “নিজের ফ্রি গরুর গোশত নিজের কাছেই রাখেন!”
বলেই ও দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। ইউসুফ চট করে মাথা তুলল। এক জীবনের জমানো সবটুকু প্রেম, সবটুকু মুগ্ধতা, সবটুকু আকুলতা চোখে মেখে সে কাজলীর হেঁটে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। সকালের রোদে কাজলীর পিঠ ছুঁয়ে থাকা মাঝারি দৈর্ঘ্যের হালকা ঢেউখেলানো চুলগুলোর দোলা দেখল৷ পরক্ষণেই দুই হাত দিয়ে নিজের দুটো হাঁটু শক্ত করে চেপে ধরল। কাজলী সামনে এসে দাঁড়ালেই তার বুকের ভেতর সুনামি বয়ে যায়। হাঁটু দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করে।
ইউসুফ নিজের ধড়ফড় করতে থাকা বুকটাকে শান্ত করার জন্য গুনগুন করতে করতে লিখল,
প্রেম করেনি আদম হাওয়া, লাগেনি আদমের চাওয়া
আদম লাইগা ঘুরল হাওয়া
ইচ্ছে ছিল মাবুদের,
হাওয়া ছিল আদমের নসিবে।
“তুই আদম না, আর ও হাওয়া না! এইভাবে দূর থেইকা গান গাইয়া আর হাঁটু কাঁপাইয়া চললে জীবনেও ওরে পাইবি না। কয়দিন পর জামাই আইসা তুইলা নিয়া গেলে তখন বুঝবি। কাইন্দাও কূল পাবি না। তার কয়দিন পর ওর বাচ্চা আইসা তোরে বলব, 'ইউসুফ মামা, ইউসুফ মামা, আমারে একটা পরোটা দেন তো! বেশি কইরা তেল দিয়া মুচমুচে কইরা ভাজবেন কিন্তু!”
ইউসুফ মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল জামিলকে। তার গোপন প্রণয়ের খবর একমাত্র জামিলই জানে। তা-ও সে নিজে মুখ ফুটে বলেনি। জামিল চোরের মতো তার গোপন ডায়েরি পড়ে জেনেছে। নয়তো জামিলের কী সাধ্য! ইউসুফের মতো অন্তর্মুখী, লাজুক, খোলসবন্দী একটা ছেলের ভেতরের খবর টেনে বের করার ক্ষমতা এই তল্লাটের কারও নেই।
ইউসুফের বিশ্বাস, তার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে মহাবিশ্বের নিয়মে কাজলী একদিন তারই হবে। তাছাড়া ও যে চেষ্টা করেনি, তা নয়। বহুবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিহার্সাল দিয়ে কাজলীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবারই কাজলী সামনে আসামাত্রই তার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেছে। হাঁটু দুটো থরথর করে কেঁপেছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, জিভে যেন পাথর চেপে বসেছে। আগে তো সে কাজলীর সামনে গেলে একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের করতে পারত না, রোবটের মতো দাঁড়িয়ে থাকত। এখন অন্তত মাথা নিচু করে হলেও এই যে দুটো মিথ্যা আর ওজর মিলিয়ে টুকটাক কথা বলতে পারছে এটাই বা তার জন্য কম কীসের!
গরম গরম মুচমুচে পরোটাটা ছিঁড়ে মুখে দিতেই কাজলীর শরীরটা নিমেষে চাঙ্গা হয়ে গেল মজাদার স্বাদে। সত্যি, সাতকাহন রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ এককথায় দুর্দান্ত, এত মজার নাস্তা এই পুরো এলাকায় আর কোথাও পাওয়া যায় না।
সাতকাহনের মালিক একটা ছেলে পাবার লোভে বছরের পর বছর ধরে বাচ্চা নিয়ে গেছেন।
অতি আদরে ছেলেমেয়েরা উচ্ছনে গিয়ে লাফাঙ্গা হয়… না হয় এক্কেবারে মেরুদণ্ডহীন গোবেচারা বনে যায়। ছয় বোন আর বাবা-মায়ের অতিরিক্ত আদিখ্যেতায় পিষ্ট হয়ে ইউসুফ হয়েছে দ্বিতীয় দলের। পুরোদস্তুর এক মেরুদণ্ডহীন, ভিতু ছেলে। তার জীবনের ভালো-মন্দ, ওঠাবসা সবটাই মা আর বোনেরা ঠিক করে দেয়। অবস্থা এমন যে, ওদের অনুমতি ছাড়া ইউসুফ শ্বাসও নেয় না। কারো সাথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সাহস ওর নেই। অচেনা কোনো মানুষের সাথে কথোপকথন এগিয়ে নিতে পারে না। একটু গলা উঁচিয়ে যে কারও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, সেই জোরটুকু ওর কণ্ঠনালীতেই তৈরি হয়নি।
ভীষণ ইমোশনাল আর অতিরিক্ত সেনসিটিভ একটা ছেলে। এই তো কিছুদিন আগের কথা৷ খালি বাড়িতে ইউসুফের ছোট বোনের যখন প্রসববেদনা (ডেলিভারি পেইন) উঠেছিল, তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনো তাগিদই ইউসুফের ভেতর দেখা যায়নি। উল্টো বোনের কষ্ট দেখে নিজেও কাঁদতে বসেছিল!
দাদি এসে যখন ধমক দিয়ে বলল, “গাধার বাচ্চা, কান্নাকাটি থামায়া আগে ওরে হাসপাতালে নিয়া যা।”
তখন গিয়ে ছেলেটার হুঁশ ফিরেছিল। তাড়াহুড়ো করে গাড়ির চাবি খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকবার পা ফসকে পড়ে গিয়েছিল৷ ভয়ে ওর বোন আর ওরে কোলেই উঠল না। নিজেই কষ্ট করে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছিল৷
তার ওপর পরে ঢিলাঢালা শার্ট-প্যান্ট। মা আর বোনেরা মিলে ওর হাত আর গলায় তাবিজে-কবজে ভরিয়ে রেখেছে। যেন তাদের চাঁদের টুকরো, রাজপুত্তুর ভাইয়ের ওপর দুনিয়ার কারো কুদৃষ্টি না লাগে! মানুষের নজর লেগে নাকি তাদের আদরের ভাইয়ের কঠিন অসুখ হয়ে যাবে। আর এই মেরুদণ্ডহীনটাও সারাক্ষণ ওইসব জবরজং কবজ ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এমন একটা ভিতু আর ঠুঁটো জগন্নাথ ছেলের প্রেমে দুনিয়ার কোন মেয়ে পড়বে? হয়তো বাসর রাতেও বউয়ের ঘরে ঢোকার আগে সে মা আর বোনদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসবে! ভবিষ্যতে কখনো যদি বউয়ের ওপর কোনো অন্যায় বা অত্যাচারও হয়, এই ছেলে জীবনেও মাথা তুলে কিংবা গলা উঁচিয়ে একটা প্রতিবাদী শব্দও উচ্চারণ করতে পারবে না!
অবশ্য ইউসুফের যে একদমই কোনো ভালো গুণ নেই, তা কিন্তু নয়। পরোপকারে তার জুড়ি মেলা ভার, আর পড়াশোনায় সে বরাবরই তুখোড়। স্কুল থেকে কলেজ, প্রতিটা পরীক্ষায় সে সব সময় ফার্স্ট হয়েছে। কখনো সেকেন্ড হওয়ার রেকর্ড তার নেই। গানের গলাটাও মাশআল্লাহ্ চমৎকার। দেখতে-শুনতেও ভালো, লম্বা। কিন্তু ওই যে জবরজং পোশাক-আশাক আর সারাক্ষণ মাটির দিকে মাথা নিচু করে কুঁজো হয়ে থাকার স্বভাবের কারণে তাকে কেমন হাবাগোবা, হাবাগোবা লাগে। কোনো পুরুষালি ভাব বা ‘ম্যানলি’ ব্যাপারই নেই ওর মধ্যে।
এ বছরই ওর মাস্টার্স শেষ হবে। তবে চাকরি-বাকরি করবে বলে মনে হয় না। শেষমেশ বাপের ওই ব্যবসাই দেখবে। ঝিলপাড় বস্তিরই দশটা ঘর ওদের, এলাকায় মুদির দোকান আছে চারটা, আর সাতকাহন তো আছেই। ওখানে সারাক্ষণ কাস্টমারের ভিড় থাকে। নিজেদের একটা মাথা উঁচু করা পাঁচ তলা বাড়িও আছে। সবই ইউসুফ পাবে৷ ওর সারাদিনের রুটিন হলো, হয় সে পড়ার বইয়ে মুখ গুঁজে থাকবে, না হয় রেস্টুরেন্টের ক্যাশে বসে রোবটের মতো টাকা গুনবে।
আগে কাজলীর সঙ্গে একদমই কথা বলত না। লুকিয়ে দেখত৷ নানাভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করত। যেদিন থেকে শুনেছে কাজলীর বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেদিন থেকে কথা বলতে শুরু করেছে৷ তবে সামনে এলেই চোরের মতো উল্টাপাল্টা কথা বলে। এমন ছেলেকে টাকাপয়সা কিংবা মেধার জন্য অন্য মেয়েরা পছন্দ করতে পারে৷ কিন্তু কাজলীর মতো একজন লড়াকু ও সংগ্রামী মেয়ে সঙ্গে এমন গোবেচারা, খোকা টাইপ পুরুষ মোটেও মানানসই নয়। আর এই কারণেই বোধহয়, এতগুলো বছর পাশাপাশি কেটে যাওয়ার পরও ইউসুফের জন্য কাজলীর মনে বিন্দুমাত্র প্রেমের উদয় হয়নি।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল দশটা বাজতেই জোহরা বেগম কাজলীকে নিয়ে সওদাগরের বাড়ির দিকে রওনা হলেন। কাজলীর সেখানে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কেবল মায়ের সাথে তর্কে জড়ানোর মতো মানসিক কিংবা শারীরিক শক্তি অবশিষ্ট নেই বলেই ও মাকে যন্ত্রচালিতের মতো অনুসরণ করছে।
ও খুব ভালো করেই জানে, ওই বাড়িতে কোনো ন্যায়বিচার হবে না, কোনো দিন হয়নি।
এই তো মাস পাঁচেক আগের ঘটনা, আশিকের ছোট ভাই আসিফ বস্তির একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে তাকে গর্ভবতী বানিয়ে পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। মেয়েটা বিয়ের জন্য জোরাজোরি করতেই তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। আসিফ আর তার মা মিলে মেয়েটাকে বেদড়ক মারধর করে। ঠিক তার পরের দিন সকালে ঘরের আড়ার সাথে মেয়েটার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। মেয়েটা আসলেই আত্মহত্যা করেছিল নাকি আসিফ তাকে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, সেই রহস্য আজও মেলেনি। পুরো বস্তির মানুষ ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিল।একমাত্র কাজলীই আরও দু-তিনজনকে সাথে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু আলাউদ্দিন সওদাগরের সরাসরি হস্তক্ষেপে এবং টাকার জোরে পুরো ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে যায়।
শুধু আশিকের পরিবারই নয়, বস্তিতে এমন আরও বেশ কিছু দাপুটে ও উশৃঙ্খল পরিবারের দৌরাত্ম্য আছে। যে যত বেশি আলাউদ্দিন সওদাগর কিংবা তার বিশ্বস্ত অনুচর কাশেম মিয়াকে তোষামোদি করতে পারে, তার তত বেশি দাপট থাকে বস্তিতে।
তারা ক্ষমতার দম্ভে যা ইচ্ছা তা-ই করে বেড়ায়; যখন-তখন এর ওর ওপর চড়াও হয়। লোক দেখানো বিচারের আয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু কোনো অপরাধেরই সুষ্ঠু মীমাংসা হয় না।
বস্তির ভেতরে প্রকাশ্যেই চলে জুয়া আর বাজি ধরে ক্যারাম খেলার আসর। এমনকি গোপনে, রাতের অন্ধকারে খারাপ মেয়েমানুষও আনা হয়। নারী ব্যবসার মূল আস্তানা হলো ঝিলমিল আপার ঘর। ঝিলমিল আপার একটা পানের দোকান আছে৷ গোলগাল, বেশ মোটাসোটা আর ফর্সা চেহারার মহিলা তিনি। নাভি দেখিয়ে পুরো পাড়াময় ঘুরে বেড়ানোই তার স্বভাব।
সওদাগরের আলিশান বাড়ির উঠোনে পা দিতেই কাজলীর চোখে পড়ল কাশেম মিয়া আর তার উগ্র স্বভাবের বউকে। এক কোণে পানের বাটা নিয়ে বসে আছে ঝিলমিল আপাও। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বস্তির ক্যারাম বোর্ড আর জুয়ার দোকানের মালিক। তাদের আত্মবিশ্বাসী, কদর্য চাহনি দেখেই কাজলী মনে মনে আরও নিশ্চিত হলো, এখানে কোনো বিচার হবে না, কখনোই হবে না! সব দোষ ঘুরেফিরে শেষমেশ তারই ঘাড়ে চাপানো হবে।
কাজলী ভেতরের বারান্দার দিকে এগোচ্ছিল, তখনই চোখ গেল আলাউদ্দিন সওদাগরের উচ্ছন্নে যাওয়া, নেশাখোর ছেলে রুমেলের দিকে। সে জানালার পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। কাজলীর সাথে চোখাচোখি হতেই রুমেল কেমন করে যেন হাসল। শিষ বাজাল। কাজলীর বুকের ভেতরটা আতঙ্কে একদম দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ভয়ে যেন হৃৎপিণ্ডটা চিপকে এল। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, আশিক এই বাড়ির ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে! রুমেলই তাকে লুকিয়ে রেখেছে।
কাজলীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের আভাস কখনো ভুল হয় না, আজও হবে না। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে কাজলী চট করে ওড়নার আড়াল থেকে ফোনটা বের করল। মারিয়ামকে দ্রুত একটা টেক্সট লিখল,
‘আপা, সওদাগর বাড়িতে আশিক লুকিয়ে আছে। আমি বিশ মিনিটের মধ্যে না বেরোলে’
“এই মেয়ে! ফোন রাখো!”
আলাউদ্দিনের মেঘগম্ভীর ধমকে চমকে উঠল কাজলী। ভয়ে তার হাত কেঁপে উঠল। হাতের অসতর্ক ছোঁয়ায়, অর্ধেক টাইপ করা অসমাপ্ত মেসেজটুকুই মারিয়ামের হোয়াটসএপে সেন্ড হয়ে গেল!
·
·
·
চলবে……………………………………………………