প্রেমান্বেষা - পর্ব ৪২ - সারা মেহেক - ধারাবাহিক গল্প


          মখমলের ছোট্ট বক্সে ডায়মন্ডের নোসপিন দেখে অবাক হলো নীলিমা। বিস্ময়ে তার চোখের তারা বড় হয়ে এলো। কণ্ঠে বিপুল বিস্ময় নিয়ে শুধালো,
" এটা আমার জন্য!?"

স্মরণ ভেবেছিলো একটু সিরিয়াস গোছের উত্তর দিবে। কিন্তু নীলিমার এহেন প্রশ্ন শুনে সে সিরিয়াস হওয়ার বদলে সরু চোখে চেয়ে বললো,
" না, আমার দ্বিতীয় বউয়ের জন্য।"

স্মরণের জবাবে বিস্মিত নীলিমা মুহূর্তেই ফুলে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে স্মরণের বাহুতে একটা কিল মে' রে বললো,
" একদম মে' রে ফেলবো আপনাকে। বিয়ের রাতেই দ্বিতীয় বউয়ের কথা! সাহস কত আপনার!"

" তুমি দেখি বিশাল ডেঞ্জারাস একটা মেয়ে! কথায় কথায় শুধু মে' রে ফেলতে চাও আমাকে!"

নীলিমা ভেঙচি কাটলো। বললো,
" আপনিও যে উল্টাপাল্টা কথা বলেন! তাই তো আমি মুহূর্তের মধ্যেই মা' র্ডা' রা' র হয়ে যাই!"
বলেই নীলিমা সরু চোখে চেয়ে রইলো। পরমুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে বললো,
" আচ্ছা, এসব কথা বাদ দিন। আগে বলুন এটা কিসের নোসপিন? দেখে তো ডায়মন্ড মনে হচ্ছে। "

স্মরণও স্বাভাবিক হয়ে এলো। বললো,
" ডায়মন্ড মনে হলে ডায়মন্ডই।"

নীলিমা যেনো আকাশ থেকে পড়লো। বললো,
" ডায়মন্ড! এত রেখে ডায়মন্ডের নোসপিন এনেছেন! এত দামী! "

স্মরণ হেসে বললো,
" বউ হয়েছো। এই একটু আধটু দামী জিনিস দেয়াই যায়।"

" এটা কিনলেন কবে? "

" ঢাকা থেকে আসার সময় কিনে এনেছি।"

নীলিমা একটুখানি লাজুক মুচকি হাসলো। বললো,
" বাহ! এত কনফিডেন্স কোথায় পান শুনি? আমাদের যে বিয়ে হবেই এটা জানতেন আগে? জানতেন না তো। যদি বিয়ে না হতো তাহলে তো গচ্চা যেতো এটা।"

স্মরণ একটু ভাবসাব নিয়ে বললো,
" বিয়ে না হলেও তোমাকেই দিতাম এটা। ভবিষ্যতে তোমার বাচ্চাদের মামু হয়ে তাদেরকে আমার আর তোমার অপূর্ণ প্রেমকাহিনী শোনাতাম। "

হাসলো নীলিমা। স্মরণের হাত থেকে নোসপিনটা নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখলো। নোসপিনের ডিজাইনটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে তার। এক পর্যায়ে সে বক্স থেকে বের করে হাতে নিয়ে দেখলো। কিছুক্ষণ দেখার পর অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" কিন্তু আমার যে নাক ফুটো নেই। "

নীলিমার কথায় স্মরণের হাসিখুশী মুহূর্তটুকুয় ভাটা পড়লো। এ কি বলছে নীলিমা! নাকফুটা নেই মানে কি! তার জানামতে প্রতিটি মেয়েরই নাকফুটা থাকে। অতি সাধারণ একটি বিষয়। অথচ এখানে তার বউয়ের নাকফুটো নেই! স্মরণ বিস্মিত ও ব্যথিত গলায় বললো,
" তোমার নাকফুটো নেই নীলিমা! কি বলো! এটা তো মেয়েদের জন্য কমন একট বিষয়। যেমনটা কান ফুটো থাকে!"

নীলিমাও একটু কষ্ট পেলো। স্মরণের কথার প্রত্যুত্তরে বললো,
" কমন ঠিক আছে। কিন্তু আমার নেই। আর কখনও কি আমার নাকে নোসপিন দেখেছেন আপনি? তাহলে শুধু শুধু আনতে গেলেন কেনো?"

" প্রেমের আগে কি তোমাকে ওভাবে দেখেছি নাকি! দেখলে তো টের পেতাম যে নোসপিন পরেছো কি না। "

" আচ্ছা, তা দেখেননি ঠিক আছে। কিন্তু নোসপিন আনার আগে একটাবার জিজ্ঞেস তো করে নিবেন!"

" তখন কি আর গিফট থাকতো বলো!"
বলেই সে উঠে দাঁড়ালো। ইশ, সুন্দর মিষ্টি মুহূর্তটুকু এভাবেই নষ্ট হয়ে গেলো। নীলিমাকে আর কিছু না বলে সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। এদিকে নীলিমার মনটাও খারাপ হয়ে গেলো। কে জানতো স্মরণ বিয়ের রাতে তাকে নোসপিন গিফট করবে! জানলে আগেই নাক ফুটিয়ে রাখতো। যেখানে সে মিলি বেগমকে বহু আগেই জানিয়ে রেখেছিলো যে সে কখনও নাক ফুটো করবে না। এটা তার তীব্র অপছন্দের। অথচ আজ এ মুহূর্তে নাকফুটো না থাকায় তার ভীষণ আফসোস হচ্ছে। ভীষণ আফসোস........

*********

স্মরণের ঘুম ভেঙেছে একটু দেরিতে। আরোও দেরিতে তার ঘুমটা ভাঙতো, যদি না জানালা দিয়ে উঠোনে হওয়া হইহট্টগোলের আওয়াজ পেতো। সে আধো আধো চোখে জানালা পেরিয়ে দেখলো, উঠোনের আমগাছ তলায় বাড়ির প্রায় সমস্ত মহিলা সদস্যগণ জড়ো হয়ে আছে। হঠাৎ এত সদস্যদকে একত্রে দেখে তার কৌতূহল জাগলো। সে শোয়া থেকে উঠে কোনোমতে দাঁত মেজে উঠোনে গেলো। গিয়ে দেখলো নীলিমা তার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর আসমানী বেগম দাঁড়িয়ে আছে নীলিমার সামনে। আশেপাশে মিলি বেগম, লিলি বেগম, নাজমা বেগম ও মাসুমা বেগম দাঁড়িয়ে আছে। নওরীন ও রাফাও আছে তাদের সাথে। তাদের দিকে এগুতে এগুতে স্মরণ শুনতে পেলো মিলি বেগম নাজমা বেগমকে বলছেন,
" মেয়ে তো কখনও নাক ফুটো করতে চায়নি ভাবী। ওর এসব ভালো লাগতো না। কিন্তু সকালে হুট করে এসেই বললো নাক ফুটো করবে। অনেক ভেবেও পেলাম না ওর এই নাক ফুটো করার রহস্য।"

রাফা এবার বললো,
" নিশ্চিত স্মরণ ভাই খুঁচিয়েছে নীলুকে। নাহলে বিয়ের পরেরদিনই নাক ফুটো করতে চায় কে!"

আসমানী বেগম এবার একটু ধমকে উঠলেন। হাতে কলম নিয়ে বললেন,
" মুখডারে একটু ক্ষান্ত দে তোরা। আমার নাতনিডা কি পরিমান ডরায় আছে দেহোস না তোরা? ইট সাহসও তো দিবার পারিস!"
বলে তিনি কলম দিয়ে যে জায়গায় নাক ফুটো করবেন ঠিক সে জায়গায় একটা দাগ দিলেন। নীলিমা বেশ ভয়ে আছে এ নিয়ে। সেই ছোটবেলায়,যখন ভালো মতো বুদ্ধিশুদ্ধিও হয়নি তখন তার কান ফুটো করা হয়েছিলো। আর এই বয়সে এসে স্মরণের জন্য নাক ফুটো করছে সে! সামান্য ইনজেকশনে যে ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠে, সে মেয়ে যে স্বেচ্ছায় নাক ফুটো করতে চাইছে এতেই অবাক হয়ে গিয়েছে মিলি বেগম ও নওরীন। নীলিমাকে হাজারবার জিজ্ঞেস করেও মুখ দিয়ে বের করানো গেলো না যে স্মরণের নোসপিন গিফট করায় সে নাক ফুটো করতে চাইছে। উল্টো সবাইকে বলেছে যে, বিয়ের পর প্রত্যেক মেয়েরই নাক ফুটো থাকা উচিত। এজন্যই সে এই পদক্ষেপটা নিয়েছে। 

স্মরণ নীলিমার এ কান্ড শুনে অবাক হলো। সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি মেয়েটা পরেরদিন সকালে উঠে শুধুমাত্র তার জন্য নাক ফুটো করতে বসে যাবে। কি অদ্ভুত মেয়েটা! এই ভাবতে ভাবতে সে গিয়ে আসমানী বেগমের ঠিক পিছে দাঁড়ালো। আসমানী বেগম তখন মনোযোগ দিয়ে গরম সুঁইয়ে সুতো পুড়ছেন। আর নীলিমা আতঙ্কিত চাহনিতে তা দেখছে। আগামী কয়েক মিনিটের মাঝে এই সুঁই যে তার নাকে গিয়ে কামড় বসাবে, তা ভাবতেই সমস্ত গা শিউরে উঠে তার। 
স্মরণ গিয়ে আসমানী বেগমের পিছে দাঁড়িয়ে নীলিমার দিকে চাইলো। নীলিমাকে চোখের ইশারায়, ভ্রু'র নাচনে নীরবে শুধালো,
" এসব কি করছো নীলিমা! ব্যাথা পাবে না?"

নীলিমা নিজের মাঝে ভয় ও আতঙ্ক নিয়েও স্মরণকে চোখের ইশারায় ভরসা দিলো,
" কিচ্ছু হবে না আমার। "

নিজেকে আশ্বস্ত করার বদলে স্মরণকে আশ্বাস দিলো নীলিমা। আর এরই মাঝে তার কাঁধ চেপে ধরলেন আসমানী বেগম। সুঁইটা নিয়ে গেলেন নীলিমার একদম নাকের কাছে। অকস্মাৎ সুঁই দেখে ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করলো নীলিমা। চুপসে গিয়ে দিলো এক চিৎকার। নাতনির আকস্মিক এ চিৎকারে আসমানী বেগম চমকে উঠলেন৷ মনে হলো এই বুঝি তার পরাণ পাখি এই উড়াল দিলো বলে! নীলিমাকে ছেড়ে তিনি ভয়ে বুক চেপে বললেন,
" আল্লাহ আল্লাহ! এত জোর চিল্লাইতাছোস ক্যান? মাইরা ফ্যালাইবি নাকি আমারে!"

আসমানী বেগম ও নীলিমার এ কান্ডে উপস্থিত সকলে হেসে উঠলো। ঠোঁট টিপে হাসলো স্মরণও। তার এ হাসিতে অভিমানে ঠোঁট উল্টালো নীলিমা। মুহূর্তেই হাসি চেপে ধরলো স্মরণ। ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে নীলিমাকে দেখালো, সে হাসি বন্ধ রেখেছে। 

লিলি বেগম এবার বললেন,
" নাকে হাত দেয়ার আগেই অত জোরে চিল্লালি কেন রে নীলু? এত ভয় পেলে নাক ফুটো করা বাদ রাখ। "

নীলিমা সাথে সাথে সাহসী গলায় বলে বসলো,
" না না খালামনি। আমি নাক ফুটো করবো। এভাবে সুঁই দেখলে একটু ভয় তো লাগবেই তাই না!"

" দেখ, আবারো চিন্তা কর। এখনও কিছু হয়নি কিন্তু। আর স্মরণ! কেমন স্বামী রে তুই! বউ নাক ফুটো করছে,কষ্ট সহ্য করছে আর তুই কি না একটু সাহসও জোগাতে পারছিস না! কেমন স্বামীর জাত তুই?"

স্মরণের স্বপক্ষের সাফাই গাইবার আগেই নওরীন তার পক্ষে সাফাই গেয়ে বললো,
" কি বলো খালামনি..... স্মরণ কি সাধেই নানির পিছনে দাঁড়িয়ে আছে! ওখানে দাঁড়িয়ে চোখের ইশারায় দুজন কথা বলছে। চোখে মনে হয় কম দেখো তুমি। "

এই কথোপকথন আরেকটু যাবার আগেই আসমানী বেগম তাতে বিরামচিহ্ন বসালেন। অকপট ক্রোধ দেখিয়ে বললেন,
" তোগোর প্রেম পিরিতির কিচ্ছা এহন পানিত ফ্যাল। কাজ করবার দে আমারে।"
বলে তিনি ফের নীলিমাকে চেপে ধরলেন। এতক্ষণ স্মরণের সামনে সাহসিকতার পরিচয় দিলেও নীলিমা আবারো ভয়ে চুপসে এলো এবং এ ভয়ের অনুভূতির কোনো রাখ-ঢাক রইলো না এবার৷ আসমানী বেগম যতবার সুঁই নিয়ে এগিয়ে আসছেন, নীলিমা ততবার হাত ঠেকিয়ে বলছে একটু সময় দিতে। দুজনের এই ঠেলাঠেলিতে মিলি বেগম এবার চরম বিরক্ত হয়ে মেয়ের মাথায় একটা গাট্টা মে' রে বললেন,
" নাক ফুটো করলে কর। অত ঢঙ করিস কেনো? মানুষের কি আর কাজ কাম নেই? আম্মা, তুমি দাও তো সুঁচ ঢুকিয়ে। ওর এই নাটক সারাদিনই চলতে থাকবে। "

নাজমা বেগম ছেলের বউকে সাহস জোগালেন। বললেন,
" তোর শখ করছে নাক ফুটানোর। একটু তো ব্যাথা সহ্যই করতে হবে তাই না? দাঁতে দাঁত চেপে, হাতের মুঠো শক্ত করে রাখবি। ব্যাথা কম মনে হবে তখন। যত দেরি করবি ততই মনে হবে ব্যাথা বাড়ছে। তাই দেরি করিস না মা। জলদি কাজ করতে দে। তোকে সাহস দেয়ার জন্যই আমরা এখানে আসছি। আমাদেরও তো কাজ আছে তাই না?"
বলেই তিনি খানিক এগিয়ে এসে ছেলের বাহুতে চাপড় মে' রে বললেন,
"আর তুই সার্কাস দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস এখানে? খুব তো কাল বিয়ে বিয়ে করলি। আর আজ বউয়ের কঠিন সময়েও একটু পাশে থাকতে পারিস না! নির্লজ্জ স্বামী একটা!"

স্মরণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো মায়ের দিকে। বললো,
" আমি কি করলাম আবার! আমি তো এখানে দাঁড়িয়েই আছি!"

" শুধু দাঁড়িয়েই থাক। নাটক দেখতে আসছিস এখানে? নীলিমার সামনে গিয়ে দাঁড়া! এখনও যদি এসব শিখিয়ে দিতে হয় তাহলে বিয়ে করলি কেনো?"

স্মরণ প্রত্যুত্তর করলো না। চাচি,ফুপু এমনকি নতুন বউয়ের সামনে তার ইজ্জতের দফারফা করে ছেড়েছে তার মা। এমন অপমান কি সহ্য করা যায়!

স্মরণ এগিয়ে নীলিমার পাশে দাঁড়ালো। নীলিমা বড় বড় শ্বাস টেনে বুকে সাহস জোগালো। আসমানী বেগমকে ফের এগিয়ে আসতে দেখে খিঁচে চোখ বন্ধ করলো। মুহূর্তেই দাঁতে দাঁত চেপে হাত মুঠো করলো। বদ্ধ চোখে অনুভব করলো স্মরণ তার ডান হাত ধরেছে। একটু আশ্বস্ত হলো সে। অতঃপর আসমানী বেগম 'বিসমিল্লাহ' বলে নীলিমার নাকে সুঁই ফোটালো। মুহূর্তেই সজোরে চিৎকার দিয়ে স্মরণের হাতটা খামচে ধরলো সে। একদিকে নীলিমা নাকের ব্যাথার চিৎকার দিলো। অন্যদিকে নীলিমার নখের আঁচড়ে, হাতের চাপে চিৎকার দিলো স্মরণ।

দিনে দুপুরে নব দম্পতির এই চিৎকারে মাথায় হাত উঠলো সকলের।
.
.
.
চলবে......................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp