কামিনী - পর্ব ১৯ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প


          তিরতির করে বাতাস বইছে কক্ষটিতে। মৃদু সমীরণে শরীরটা শিরশির করছে রানির। সাথে বিরক্তি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। 
 রানি ধাক্কা দিলেন হ্যাভেনকে। হেমলক রানিকে আটকানোর চেষ্টা করতেই রানি এবার রণমূর্তি ধারণ করলেন। হেমলকের গলাতে চেপে ধরলেন। এত রাগ তিনি সচারাচর দেখান না বললেই চলে।
 "আমার তলোয়ার আপনার কাছে রেখে ভেবেছেন আমি দুর্বল? আমার শক্তি কি কেবলই তলোয়ার? রানি কামিনীকাঞ্চনকে তাহলে আপনার জানাই হয়নি।"

এত শক্তভাবে গলা চেপে ধরায় হেমলক পিয়ার্স থতমত খেলেন। সাথে দমও প্রায় আটকে আসছিলো তার। 
 রানি ছেড়ে দিলেন তাকে। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। হ্যাভেন পেছন থেকে বার কয়েক অস্পষ্ট স্বরে ডাকলেও রানি ফিরে তাকালেন না। 

বাহিরে আসতেই দেখলেন এখনো দাঁড়িয়ে আছেন সকলে। কৌতূহলী দৃষ্টি সকলের। যেন অপেক্ষাতেই ছিলেন কখন কক্ষ ছেড়ে বের হবেন কেউ। 
রানি কামিনীকে বের হতে দেখেই রানি ইথুন এগিয়ে এলেন। রানির হাতটি চেপে ধরে বড়ো চিন্তিত কণ্ঠে শুধালেন, "রাজা কথা বলেছেন তো? কিছু বলেছেন?"

 রানির মুখ চোখ তখনও শক্ত। কিন্তু তিনি ইথুনের প্রতি নির্মম হতে পারলেন না। তাই কাঠিন্যতা বজায় রেখেই, ধীরে-স্থিরে হাতটি সরিয়ে ফেলতে ফেলতে বললেন, 
"কেবল কথা নয়, তিনি লম্পটতাও দেখাতে ভুল করেননি।"

রানির খোলামেলা ভাষা এবং আচরণে উপস্থিত সকলে হতবিহ্বল হলেন। রাজমাতা প্রাচী বেশি রুষ্ট কণ্ঠে বললেন, "কী ভাষার ব্যবহার করছেন আপনি, রানি কামিনী? স্থান, কাল, পাত্র দেখে কথা বলার সহবতটুকু আপনার নেই?"

 "না, নেই।" 
রানি যে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তা তার অঙ্গভঙ্গি এবং কথার কঠোরতাতেই আঁচ করা গেলো। কিন্তু সেই ক্ষুব্ধতাকে বিশেষ পরোয়া করল না রাজকন্যা লিলি। সে ভ্রাতার হয়ে প্রতিবাদ করে উঠল, "সহবত নেই তা আপনার আচরণেই পরিলক্ষিত। তাই বলে আমার ভ্রাতার সম্বন্ধে কটুক্তি করবেন?"

"কটুক্তি! সত্য শোনার কিংবা মানার সৎসাহসটুকু তোমাদের রাজপ্রাসাদের কারো আয়ত্তে নেই দেখে আমি হতাশ হলাম। তোমার ভ্রাতার এই উন্মাদপনা নিশ্চয় আমার কাছে হেরেই? রাজ্যবাসীর সামনে একজন রানির কাছে হেরে যাওয়ার ব্যথা বোধহয় সহ্য করতে পারেননি, তাই না? অথচ দেখো, এই উন্মাদ অবস্থাতেও একটি নারী শরীর দেখে ঝাপিয়ে পড়তে মোটেও ভুল করেননি। আজই তোমার ভ্রাতার প্রাণ যেত। কেবল আমার রাজ্যের বিধান অনুযায়ী কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন প্রাণীর প্রতি নির্মম বিচার কার্যকর নয় বলেই আমি তলোয়ার উঠিয়ে তোমার ভ্রাতার গলদেশ এফোড় ওফোড় করিনি। দ্বিতীয়বার প্রাণ ভিক্ষে দিয়ে গেলাম। রানি কামিনীকাঞ্চন সব করলেও নিজের তৈরি করা বিধান নিজে না কখনো অমান্য করেছেন আর না কাউকে করতে দিয়েছেন।"

 নিজের প্রীতিময় ভ্রাতার সম্পর্কে এমন বাক্য লিলির সহ্য হলো না। সে নিজের তলোয়ারটি তুলে নিয়ে তারস্বরে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
"আপনার এত বড়ো সাহস! ক্যামিলাস রাজ্যে দাঁড়িয়ে সেই রাজ্যের রাজাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছেন! আপনার গর্দান নিয়ে নিবো আমি এখুনি।"

সবটুকু পরিস্থিতি এতক্ষণ হাতের মুঠোয় থাকলেও তা এবার রানির সহ্য সীমানার বাহিরে চলে গেলো। তিনি এতক্ষণ নিজেকে যতটুকু ধাতস্থ করা যায় চেষ্টা করে ছিলেন। কিন্তু রাজকন্যা লিলির এমন দুঃসাহসিকতায় তার সমস্ত ধৈর্য্য খসে পড়ল অবেলার পাতার মতন।
 রানি প্রাচীরের সাথে থাকে একটি তলোয়ার তুলে নিয়েই আচমকা লিলির হাতটিতে আঘাত করলেন। কেবল কি আঘাত? না। হাতটা প্রায় আলাদা হয়ে ঝুলে গেলো কনুইয়ের দিক থেকে। 
 রানি তা দেখে অমানবিক কণ্ঠে দম্ভের হাসি হেসে, তাচ্ছিল্য স্বরে বললেন,
"তোমাকে সেদিন আমার প্রাণ ভিক্ষে দেওয়াটা ছিলো চরম ভুল। এবং রানি কামিনী নিজের ভুল শুধরে নিতে এক বিন্দুও সময় নেন না। ভিক্ষে তাকেই করা উচিত যে দান পাওয়ার যোগ্য। তুমি আদতে সেটার যোগ্যই ছিলে না।"
 

 ব্যাপারটা এত আকষ্মিক ছিলো যে লিলি চিৎকারটুকু দেওয়ার কথা ভুলে গেলো। এবং যখন ভীষণ যন্ত্রণায় তার কলিজা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো তখন সে গগণ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকারের ধ্বনিতে বোধহয় প্রাসাদটা অব্দি কেঁপে উঠল। 
রানি সেই আর্তনাদকে তোয়াক্কা করলেন না, না দেখালেন কিঞ্চিৎ মায়া। বরং বুক উঁচু করে এগিয়ে যেতে লাগলেন সামনের দিকে। যেন নৈরাজ্যের আকুতি অথবা নিঃশব্দের পিছুটান তার জন্য নয়। রানি কামিনীর জন্য কেবল এগিয়ে যাওয়া। সমস্ত আর্তনাদ, আকুতি পায়ে মর্দন করে গন্তব্যে পৌঁছানোর নামই হয়তো- কামিনী।

লিলির চিৎকারে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন হেমলক পিয়ার্স। ঠিক বেরিয়ে নয়, ছুটেই এলেন। রাজমাতা প্রাচী রানি কামিনীকে আটকানোর আদেশ দিলেও হেমলক পিয়ার্স সেই আদেশের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। কারণ সকলের রানি কামিনীকাঞ্চনকে চিনতে ভুল হলেও, ভুল হয়নি তার। এখানে রানিকে আটক করা মানেই বিভিন্ন রাজ্যের সাথে ক্যামিলাস রাজ্যের যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া। যেই রাজ্যের রাজাই এখন প্রায় উন্মাদ, সে রাজ্যের জন্য যে-কোনো ঝামেলাই এখন পায়ে শেকল বাঁধার মতন।

 রানি যখন রাজপ্রাসাদ থেকে প্রায় বেড়িয়ে যাবেন তখন চোখ পড়ল প্রাসাদের একদম পেছন দিকে একটি অগোছালো কক্ষের দিকে। কক্ষটির কপাট সামান্য খোলা বলে একটি লাল রঙের তৈলচিত্র বেশ অস্বচ্ছ ভাবে রানির চোখে লাগলো। তৈলচিত্রটির ভেতর একটি মেয়েলি অবয়ব সুস্পষ্ট। মেয়েটির খোলা পিঠ, ধনুকের মতো বাঁকিয়ে আছে কোমল নরম দেহটি। পিঠের কোণায় কৃত্রিম তিলটি অব্দি এত জীবন্ত এবং আকর্ষণীয় লাগলো যে রানি চোখ ফেরাতে পারলেন না। এমন অদ্ভুত সুন্দর চিত্র এর আগে কখনো দেখেছেন বলেও মনে হয় না। 
চিত্রটির নিচে লিখা ছোটো শব্দটি দেখে রানির চোখ-মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো। চিত্রশিল্পী— হেমলক পিয়ার্স! 
 হেমলক পিয়ার্স তবে চিত্রশিল্পী? এজন্য নামটা শোনা শোনা লেগেছিলো। বর্তমানের বহুল আলোচিত চিত্রশিল্পীর নামই তো ছিলো এটা। তবে এ-ই রাজা হ্যাভেনের ভ্রাতা হেমলক পিয়ার্সই কি সেই শিল্পী? 
 রানি আর অপেক্ষা করলেন না। রাজপ্রাসাদে তিনি অবচেতন অবস্থাতে প্রবেশ করলেও বের হলেন বুক উঁচিয়ে। রাজকীয় ভাবে। নেই কোনো ভয়, শঙ্কা কিংবা সংশয়। 
 

 ২৯.....

দিবার শুভারম্ভ ঘটবে কেবল। পাতা পত্তর ভেদ করে ভাণুর সদ্য উদিত কিরণ বিন্দু ছড়িয়ে পড়েছে ধরণীতে। অম্বরের কোণে আঁচল পেতে নববধূর মতন বসে আছে ধূসর কমলা রঙটি। সদ্য ফুটন্ত পুষ্পের সতেজ ঘ্রাণ অগ্রহায়ণের বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। 
রানি ফিরে এলেন নিজের রাজপ্রাসাদে। দীর্ঘ এতটা প্রহর নিজের প্রাসাদের বাহিরে থাকার মতন অদম্য যাতনা আর কিছুতেই তিনি বোধ করেন না। 

কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীরা। রানিকে ঘোড়া সমেত দেখে তাদের কৌতূহলের অন্ত রইল না। পরশুদিন বিকেলে যে রানি বের হলেন, এলেন মাত্র সবে! এই মানুষটা কোথায় চলে যায় কে জানে? একটি পুরো রাজ্যের ভার তার রাজ আসনে গুটিয়ে রেখেই মাঝে মাঝে মিলিয়ে যান। কোনো ভীতি নেই মানুষটার। তাকে ছাড়া রাজ্যে যদি হঠাৎ দূর্দশা কিংবা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যায় তখন কী হবে?

 রানি যখন বিশাল কপাট দিয়ে ঢুকলেন তখন প্রত্যেক প্রহরীর মাথা নেমে এলো। রানির ক্লান্ত মুখ। ধিক্ ধিক্ জ্বলছে চোখের মণিগুলো। রানি ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ানোর আগেই দেখলেন একটি পা হাঁটু ভাঁজ করে তার ঝুলন্ত পায়ের কাছটাতে রাখা।
ভালো করে তাকাতেই তিনি দেখলেন সেনাপতি হ্যাব্রো এসেছে। গত সাতদিন পর আজকেই তার রাজপ্রাসাদে ফিরে আসার কথা ছিলো কিন্তু তাই বলে এই প্রত্যুষেই আসবে? লোকটার কি বিশ্রাম একটুও ভালো লাগে না?
রানি সেনাপতির হাঁটুতে পা রেখেই নামলেন। গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন, 
"কখন এসেছো?"

হ্যাব্রোর মাথা নত তবে মাটি থেকে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। নত মস্তকে কুর্নিশ করে অতঃপর উত্তর দিলো,
"আরও কিছুক্ষণ আগেই।"

 "এই প্রভাতে আসার কী প্রয়োজন ছিলো? রাজাকার্য তো শুরু হয় আরও খানিকটা পরে!"

 "এখানে এসে শ্বাস না নিলে শান্তি পাচ্ছিলাম না।"
হ্যাব্রোর কী অকপটে, মায়াময় স্বীকারোক্তি! 
রানি তপ্ত শ্বাস ফেললেন। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিজের জীবনে এই হ্যাব্রো নামক মানুষটাকে পেয়ে তিনি মাঝে মাঝে নিজেই নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারেন না। এতটা আদৌ প্রাপ্ত তিনি? প্রশ্ন করে করে হয়রান। কিন্তু দেবতা তার উত্তর দেন না।

"হ্যাব্রো, ফ্রেয়াকে ডেকে বলো আমি এসেছি। স্নানাগারের ব্যবস্থা করতে। রান্নার ঠাকুরকে বলো রান্না বসাতে। আজ রাজকার্যের আগেই আমি আহার করবো।"

 "আপনার স্নানাগার তৈরি, রানি। রান্নার ঠাকুরও রান্না করছেন।" 
হ্যাব্রোর কথায় বিস্মিত হলেন রানি, "স্নানাগার তৈরি? রান্নাও হচ্ছে? কে নির্দেশ দিয়েছে?"

 "আমি।"

 "তুমি? কিন্তু তুমি কীভাবে জানলে আমি এখনই পৌঁছাবো?"
হ্যাব্রো জবাব দিলো না। তার আগেই ফ্রেয়া এসে জানালো স্নানের কুসুম গরম জলে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো হয়েছে। রানি এখন স্নানে নামলে আরাম বোধ করবেন। 
 রানিও তাই আর উত্তরের আশা করলেন না। চলে গেলেন গন্তব্যে। হ্যাব্রো সেই প্রস্থানের পথে দৃষ্টি রেখে তপ্ত শ্বাস ফেলল। 

৩০....

 একটি সুন্দর, সাজানো বাগান। প্রজাপতিদের মেলা বসেছে সেই বাগানে। খিলখিল হাসি শোনা যাচ্ছে বাগানটিতে। একটি ছোটো বাচ্চা ছুটে বেড়াচ্ছে সেখানটায়। অথচ হুট করেই সেই সুন্দর দৃশ্যের বদল ঘটলো।
  বাগানের আলো হারিয়ে গেলো আকস্মিক। চারপাশ নিমজ্জিত হলো গাঢ় অন্ধকারে। বাচ্চাটি দেখতে পেলো একটি নারী রুনুঝুনু পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন বাগানটি দিয়ে। বাচ্চাটিও অন্ধকার থেকে বাঁচার আকুলতায় সেই নারীটির পিছু নেয়। কত দানবীয় হাত মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরতে চায় অথচ মেয়েটি থামে না। ধস্তাধস্তি করে কেবল এগিয়ে যায়। এবং এই এগিয়ে যাওয়ায় তার দেহের ভেতর পড়ে ভীষণ আঘাতের চিহ্ন।
 সেই কোমলমতি নারীর পেছন পেছন দৌড়াতে গিয়ে মেয়েটি আবিষ্কার করে একটি বাঁশির সুর শোনা যাচ্ছে। মোহনীয় সেই সুর উন্মাদনা সৃষ্টি করে প্রকৃতিতে। মেয়েটির মনে হয় আর কয়েক পা গেলেই আলোর সান্নিধ্য পাবে সে। কিন্তু তার আর কয়েক পা এগিয়ে যাওয়া হয় না। এর আগেই রানির ঘুম ভেঙে যায়। নিদ্রার ঘোর কেটে যায় আচমকা।
 রানি অস্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে শুরু করেন। নিদ্রায় যেই স্বপ্ন ঘোর তৈরি হয়েছিলো তা মস্তিষ্কে তখনও জীবন্ত। রানি দেখেন, তিনি তখনো স্নানাগারে। কুসুম গরম জলে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন। মাথার নিচে একটি নরম বালিশ দিয়ে গৃহতলে মাথাটা এলিয়ে রেখেছেন।

রানির নিদ্রা হালকা হয়। জল দিয়ে ধুয়ে নেয় চোখ-মুখ। এই স্বপ্নটি তিনি আজ নতুন দেখেননি। বহু বছর যাবতই দেখে আসছেন। বেশ কিছু দিন পর পরই তিনি স্বপ্নটি দেখেন। তিনি বুঝতে পারেন না এই স্বপ্নের অর্থ কী! ছোটো মেয়েটিই বা কেন অন্ধকারে আটকে যায়? কে-ইবা স্বপ্নে দেখা সেই সুন্দর দেহের নারীটি? 
 নিজের প্রশ্নের উত্তর আর কি অন্য কারো কাছে পাওয়া যাবে? মোটেও নয়। তাই রানি হতাশ হন৷ তিনি যে-ই স্বপ্ন প্রতিবার দেখেন তার উত্তর নিশ্চয় কেবল নিজের কাছেই আছে। অথচ তার মতন ধূর্ত মানুষ সেই উত্তর আজও খুঁজে বের করতে পারেননি। 
অবশেষে তিনি ঠিক করলেন রাজ গ্রহাচার্যের কাছে যাবেন। নিশ্চয় কোনো একটি কারণ ঠিক বের করতে পারবেন। 

স্নানাগার আজ ফাঁকা। ফ্রেয়াকেও বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন রানি। তখনই হ্যাব্রোর কণ্ঠস্বর পাওয়া যায়। ভারিক্কি স্বরে বলল, "আসবো, রানি?"

রানি অনুমতি দিলেন। 
 বরাবরের মতনই হ্যাব্রো এসে দাঁড়ালো অনেকটা দূরে। মাথা নত। 

 "দু'টো সংবাদ আসছে, রানি।"

রানি তখন জলে পা নাড়াচ্ছেন। চোখ না ঘুরিয়েই জলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"কী সংবাদ?"

 "রাজ্যবাসীর ভেতরে একটি সংক্রামিত রোগ দেখা দিয়েছে। রাজ বৈদ্য জানালেন এই রোগটি নতুন। অপরিচিত।"

রানি কিছুটা বিচলিত হলেন, "রোগ? কী রোগ? কোথা থেকে আগমন? কেউ জানায়নি কেন আমাকে? কবে থেকে সৃষ্টি?"

 "রাজ্যের পশ্চিম দিকের একটি গ্রামে একজনের হয়েছিলো। এরপর এটি ছড়িয়ে মোট গ্রামের পঁচিশ জনকে আক্রান্ত করেছে। গত চারদিনে আগেই খোঁজ এসেছিলো। আমি মহা মন্ত্রীকে জানিয়েও ছিলাম।"

"রাজ বৈদ্যকে বলো সেই গ্রামে যেতে। এভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ল তো রাজ্যের জন্য ঝুঁকি সাথে আমার প্রজাদের জন্য। রাজ বৈদ্য না পারলে অন্য রাজ্যের বৈদ্যদেরও আনার ব্যবস্থা করো।"

হ্যাব্রো আজ্ঞা মেনে নিলো। বলল, "ঠিক আছে।"
 কথা শেষ করেই হ্যাব্রো চলে যেতে নিলে রানি শুধালেন,
"দ্বিতীয় সংবাদটি তো এখনো দিলে না, হ্যাব্রো!"

রানির চোখে মুখে খটকা। সংবাদ ভুলে যাওয়ার মতন মানুষ তো সেনাপতি নয়।
সেনাপতি দাঁড়ালো। কিছুটা বিচলিত দেখালো তাকে। সংশয় ভরা কণ্ঠে বলল,
"আপনার সখী- যামিনীর খোঁজে পাঠিয়ে ছিলাম গুপ্তচরকে। সে জানালো, যেই জঙ্গলে যামিনীকে রেখে আসা হয়েছে সেখানে তিনি নেই। এমনকি জঙ্গলের কোথাও নেই।"

 রানির পা নাড়ানো থেমে গেলো। দূরন্ত গতিতে ফিরে তাকালেন তিনি পেছনে। হ্যাব্রোর চোখে চোখও পড়ল তার। কিন্তু তিনি কিছু বলতে পারলেন না। সখী সাতদিনেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো বিষয়টা যেন তার কাছে ধাক্কার মতন ছিলো। এই জীবনে তো তার সখী ছাড়া কেউ নেই। সখী সেটা জানেও। তাহলে গেলো কোথাও? 
কেনই-বা গেলো? না-কি কোনো হিংস্র জীবজন্তু সখীকে ছিঁড়ে ফেলল! 
·
·
·
চলবে...................................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp