বজ্রমেঘ - পর্ব ২০ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প


          আপাত শান্ত প্রকৃতিতে ছুটছে জীপ। চারপাশ ধূ ধূ করছে সবুজে মোড়া অরণ্য। কালরাত্রির রূপ আজ সকালে নেই কোথাও। তবে নিজের কাছে নিজেরই ভীষণ ঠুনকো লাগছিল ওর। এভাবে নিজের সাথে হেরে যাওয়াটা ওর বড্ডই অপছন্দ। তার উপর বুঝতে পারছে এই ইহজন্মেও হুডহীন জীপের আরোহী হিসেবে সে যোগ্য যাত্রী নয়। অসহ্য এক পীড়ায় চোখ-মুখ কুঁচকে হাতদুটো শক্ত করল শেহজানা আলম। ডানপাশে যে পুরুষটি এখন মনোযোগ সহকারে জীপ চালনায় সদা সাবধানী হয়ে আছে, ওর দিকে তাকায়নি তেমন। তবে ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অনুমান করতে পারছে, একজোড়া নীল আসমানী চক্ষু ওর দিকে পড়ছে সাবধানে। বুঝে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে পাশে বসা এই রমণীর আসলে চাপা সমস্যাটা কোথায়। নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বসে থাকা শাওলিন এখনো একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেনি, বুঝতে দেয়নি নিজের অসহযোগ আচরণ। তবু একটা পর্যায়ে ডানপাশ থেকে দানবীয় এক বজ্রকঠিন স্বর শুনে শিউরে উঠল ও, লোকটা ওর নাম বিকৃত করে ডেকে উঠেছে! 

  - শাওলিন আলম? 

চট করে ডানে ঘুরে শেহজানা আলম! নিজের নীরব চক্ষু প্রশ্ন মাখিয়ে তুলে। নাম বিকৃত করে ডাকল কেন? মধ্য নামটা ঠিক থাকলেও শেষের অংশটা আগে কেন? এ কেমন দূর্বিচার? লোকটার শীতল ব্যক্তিত্বের জন্য হোক, বা তার গোপন সত্তার জন্য, শাওলিন রূঢ়ভাবে কথাটা বলল না। নিজের কঠিনচিত্ত আবরণকে শান্ত প্রতিপন্ন করে নিরুত্তাপ সুরে বলল, 

  - কিছু বলছেন আপনি? 

  - হ্যাঁ। আমার মনে হচ্ছে আর্মি এসকোর্ট মিস যাবে। এভাবে ওভারটেক করে তোমার বিপত্তি বাড়াতে চাচ্ছি না। জীপটাকে হাই-স্পিড না রাখলে এসকোর্ট লাইনে পৌঁছুনো সম্ভব না। তাই.. 

কথাটা অর্ধসমাপ্ত করে একটা প্রশ্ন জাগালো সুদর্শন শান্ত-অটল লোকটা। ডানহাতে এখনো দামাল ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ঘুরছে, বাঁহাতে যখন-তখন টেনে ধরছে লোহার মতো শক্ত থ্রটল। জীপটা তার কাছে এতোটাই সহজ, এ যেন ছোটবেলার কোনো খেলার গাড়ি। যাকে সে যখন-তখন সপ্রতিভ আয়ত্তাধীনে রাখতে পারে। বুক ভেদ করে ক্ষুদ্র এক শ্বাস ছেড়ে বাঁপাশে তাকাল শাওলিন। ওর খেয়াল রইল না পাশের পুরুষটা ওর চিরচেনা নামটাকে এক লহমায় বদলে দিয়েছে; আর রদবদলের জন্য কড়া কিছু কথা বলাটা আবশ্যক ছিল। এমন সময় জীপটা আচানক বাঁক নিতে থাকলে প্রচণ্ড গতির দরুন তালটা হারাল শাওলিন। প্রায় ছিঁটকে পড়বার আগ মুহুর্তে খামচে ধরল কিছু। ক্ষিপ্রভাবে বসিয়ে দিল জোরালো চাপ! আকস্মিক ভয়ে বুকের ভেতরটা ধড়ফড় ধড়ফড় করে উঠলেও ডানে তাকাল ও। ঠিক তখনই চোখদুটো বিস্ফোরিত হয়ে গেল! ও খামচে ধরতে গিয়ে কী ধরেছে? সবুজ শার্টে ঢাকা বলিষ্ঠ হাত? লোকটা ওর দিকে শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে কিছুই বলল না। বরং, পরিস্থিতি উপলব্ধি করেই যেন ওর দিকে স্বাভাবিক স্বস্তিটুকু ছেড়ে দিল, 

  - ভালোভাবে হাত রাখো। তোমার জন্য জার্নিটা কঠিন দেখছি। তোমার বন্ধুরা বৈসাবি অনুষ্ঠান পর্যন্ত খালিহাতে ব্যালেন্স করে পৌঁছেছে। ওরা মনে হয় এসবে অভ্যস্ত।

শাওলিন সম্মতি জানিয়ে বলল, 

  - ওদের ট্যূর নিয়ে ঝামেলা নেই। বান্দরবান থেকে রাঙামাটি সবখানে ঘুরে অভ্যস্ত। পাহাড়ে চলার বাহন, লেগুনার মতো দেখতে কিছুটা, চান্দের গাড়িতে করে ওরা গাড়ির সিলিংয়ে বসেও অভিজ্ঞতা নিয়েছে। 

  - বেশ। ওরা চমৎকার অ্যাডজাস্টমেন্টে অভ্যস্ত আছে। তবে তোমার বেলায় প্রোফাইল সামান্য বিগড়ানো দেখতে পাচ্ছি। লং ডিসট্যান্স হিসেবে এটাই প্রথম? 

  - আমার জীবনে এই প্রথম। 

কথাটা বলার পর অদ্ভুত ভাবে বিমর্ষ দেখাল ওকে। যেন প্রথম ভ্রমণ শেষ ভ্রমণে রূপ নিতে চলেছে। এখান থেকে ফেরার পর জীবনটা কেমন হবে, কোথায় যাবে, এ নিয়ে কোনো আগাম আভাস পায়নি। অস্বস্তিকর কয়েকটা সেকেণ্ড পেরোনোর পর পাশ থেকে আবারও স্বাভাবিক শান্তকণ্ঠটা বলে উঠল, 

  - তোমাকে ইন্ট্রোভার্ট মনে হয়েছিল। কিন্তু তুমি ইন্ট্রোভার্ট নও। পরিস্থিতি মিল রেখে কথাবার্তা স্বাভাবিক বলতে জানো। 

নিজের সম্বন্ধে সরল তথ্যটা শুনতেই পাশ ফিরল শাওলিন। প্রশ্ন আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে কথাটার নিগূঢ় মানেটা বুঝতে চাইল। কিন্তু না, লোকটার কথার মর্ম বোঝা গেল না। শোয়েব তাকাল একঝলক ওর মুখে, ওই একপলকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নির্ভীক শঠতায় বলে উঠল, 

  - প্রোফেসর সেগুফতা জামান মির্জা তোমাকে অপছন্দ করেন। এর পেছনে সোজাসাপ্টা কারণ কী? আমি তোমার মাঝে বেয়াদবির গুণবৈশিষ্ট্য দেখিনি, যা সত্য আমার কাছে। আমার কাছে নিঃসংকোচে কারণটা বলা যাবে? 

নিশানা বিদ্ধ তীড়ের মতো কথাগুলো ছুঁড়ছিল ভদ্রলোক। সেই তীড়ের তীক্ষ্মতা স্পষ্ট জবানে নির্দেশ ছোঁড়ার মতো কঠোর। একবুক গম্ভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের নরম অধরে জিভ ছোঁয়ালো শাওলিন। কিছুটা শান্ত, কিছুটা সুস্থির হয়ে কথাটুকু বলল, 

  - আমি পুরোপুরি একজন বাইরের লোক। কাল-পরশুই এখান থেকে বিদায় নেবো। আমার কথায় যুক্তি থাকবে একটা, দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে ভিন্ন। নিশ্চয়ই আমার চিন্তার সাথে অপর মানুষের মিল হবে না একটুও। ভুল ধারণা জন্মানোর জন্য আমি দায়ী থাকতে চাই না। প্রথমে স্বজন ব্যক্তির কথা শোনা হোক। তারপর আমি বলব। 

  - কিন্তু তোমারটাই আমি শুনব। বলো। 

এক মুহুর্তের জন্য কেঁপে উঠল বুকটা! অদ্ভুত আশ্চর্যে কিছুক্ষণ তাকাল ও। বলাটার ভেতর কোনো চাপ, জোর, হক ছিল কিনা বুঝতে পারল না শাওলিন। নিজের অপারগতা নিয়ে চুপ হয়ে থাকলে পাশ থেকে আবারও বলে উঠল লোকটা, 

  - স্বজনপ্রীতি আমার কাছে নেই। এ ধরণের গর্হিত কাজ বাস্তবিক পছন্দ না। ভুল হলে দুপক্ষের হবে। হয়ত একপক্ষের কম, অন্যপক্ষের বেশি। ডিফেণ্ড করতে গিয়ে নিরপেক্ষ মানুষকে বারবার অপমান করব, এরকম কীটের মতো জ্ঞান আমার নেই। আমি শুধু কারণটা জানতে চাইছি ইয়াং লেডি। তুমি তার বরাবর বয়সি কেউ নও; যার জন্য তোমার প্রতি ক্ষোভ জন্মাবে। ইয়্যু আর বেয়ারলি আপ টু হার নিইস। 

শেষ বাক্যটা অনুবাদ করে ঘোর লজ্জায় আরক্ত হয় শাওলিন! হাঁটুর বয়সি কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করেছে, যেন ওর বয়স অনুর্ধ্ব আঠারো। বালিকা বয়সি ষোল সতেরোর মতো। কিন্তু সত্যি নয় আসলে। আঠারো বসন্ত পার করে এখন সংখ্যাটা উনিশ। উনিশ শেষ হতে আরো কিছুদিন বাকি। মাথা নাড়িয়ে সম্মতির ভঙ্গিতে কথাগুলো গুছাল ও। সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে গিয়ে চোখ নিচু করল,  

  - আমার ডান পায়ে সমস্যা হয়েছিল। একটা জায়গায় দুটো মাঝারি সেলাইয়ের দাগ। আড়াই মাস বাসাবন্দি ছিলাম আমি। আরো দুটো মাস স্বাভাবিক হাঁটাচলার জন্য। আমার বাসায় সদস্য সংখ্যা দুই। কখনো আমার ভাবী কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি পেলে সংখ্যাটা দাঁড়াতো তিন। ওই সাড়ে চারটে মাস আমার জন্য কেমন ছিল, আমি এটা জীবনেও বুঝিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু শুধু এটা জানাতে চাই, আমার মনোবল অক্ষত ছিল না। চার মাস আমার জন্য চার যুগ ছিল। একেকটা মুহুর্ত আমার দেয়ালে তাকিয়ে বহুকষ্টেই কাটত। আমি ক্যাম্পাসের কিছু বড় বড় আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক জনবলে বিরাট সেমিনার, এরকম আরো কিছু আয়োজন। সবখান থেকে আমার নাম কাটা পড়ল। আমি সোশ্যাল সাইটে অন্তর্ভুক্ত নই। আমার কাছে ওসব বস্তু কখনোই টানেনি। আজও না। ফলে অন্যদের মতো স্ক্রিন টাইমিং বলতে আমার কিছুই ছিল না। আমার সময় কেটেছে বই পড়ে। সমস্তই একাডেমিক তথ্যবহুল। আমি উপন্যাসপ্রেমি নই। যখন নিজেকে ধীরে ধীরে গুছিয়ে আবার একটু নতুন করে শুরু করলাম, তখন মনে হল এবার ঘাটতিটা পূরণ করতে পারব। কিন্তু তখনই টের পেলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চরম উপহারটা আমার তখনো বাকি। 

এটুকু বলতেই চোখের কাছে হাতের উলটো পিঠ ছোঁয়াল শাওলিন। ওর কোলে থাকা বাঁহাত থরথর করে কাঁপছে। না জানি কথাগুলো বলতে গিয়ে কতটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একবার ইচ্ছে করল হাতটাকে খামচে ধরতে, তার মুঠোর মধ্যে ওই কাঁপুনিটুকু থামিয়ে দিতে! কিন্তু এমন নিষিদ্ধ চাওয়াটা সংযত করল শোয়েব। মনকে শেকল পড়িয়ে স্থির রইল সে। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে একটু স্বাভাবিক হয়ে শেষ কথাটা বলল শাওলিন, 

  - প্রোফেসর সেগুফতা জামান একজন চোর। উনি অন্যের জিনিসকে কীভাবে নিজের বলে চালাতে হয় এটুকু জানেন। কীভাবে অন্যের সম্পদকে নিজের বলে গলাবাজি করতে হয়, সেটাও জানেন। নিজেকে সৎ যোগ্য বানিয়ে, অন্যকে কীভাবে বলির শিকার বানাতে খুব ভালোভাবে পারেন। প্রয়োজন পড়লে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাষায় অপমান করতে ছাড়েন না। আর উনার মতো নিকৃষ্ট মানুষগুলোই পার পেয়ে যায়! উনার কথাতেই অথরিটিরা উঠে-বসে এবং আদেশ শোনায়। উনি একজন চরম বেয়াদব। উনার কারণে ভুক্তভোগী সেই মেয়েটা ভার্সিটি ছেড়ে দেয়। কারণ, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণগুলো আগেই ঢেকে দেয়া হয়েছে। প্রমাণের বিপরীত অপমান আর সহনীয় নয়। মেয়েটার শুধু একটাই দোষ ছিল, ও আদিবাসী। ও আমাদের মতো শহুরে নয়, গ্রামেরও নয়। ও ছিল শুধুই দরিদ্র আদিবাসী। এমন অমানবিক বৈষম্যতা একজন জ্ঞানের কাণ্ডারীর কাছে মানায় না। অভদ্র, নিচুশ্রেণীর মহিলাটা তাই-ই করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেদিন বৈষম্যতাকে প্রাধান্য দিতেই ওর পক্ষ কথা বলা প্রত্যেককে দু মাসের সাসপেনশন দিয়েছিল। বরখাস্তে খাতায় ছিলাম আমিও। কারণ, আমি ওর সত্যিটুকু জানি। আজও সেই সত্যতার প্রমাণ দেয়া যায়নি। কিন্তু মিথ্যুক ব্যক্তি নিঃসংকোচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

পুরো কথা শোনার পর থমথম করছিল শোয়েবের কাট কাট মুখ। কখন যে জীপটাকে পরিস্থিতি বুঝে থামিয়ে ফেলেছে টের পায়নি শাওলিন। যখন নিচু করা লাল দুটো চোখ উপরে তুলল, তখন দেখতে পেল ওর দিকেই স্থিরবিদ্ধ তাকিয়ে আছে বন কর্মী। জীপটা রাস্তা ছাড়িয়ে একটু জায়গামতো স্থানে স্থির। পকেট থেকে সাদা, পরিচ্ছন্ন ভাঁজ করা একটি রুমাল বের করল শোয়েব। ফরসা মোলায়েম মুখে লালচে মেদুর আভা ছড়ানো। যেন দুধে একফোঁটা সিঁদুর দিলে যেমন লালচে হয়ে ওঠে, যেমন স্নিগ্ধ একটা লাল আভা রঙটাকে আদুরে করে দেয়, তেমনি দেখাচ্ছিল মেয়েটার স্নিগ্ধ আদুরে মুখ। রুমাল ওর দিকে বাড়িয়ে দিতেই জোরালো দমটা ছাড়তে ছাড়তে বলল, 

  - তোমার কাছে অনেক গল্প আছে। গল্পগুলো শুনতে চাইব। আরেকটু সময় করে শুনতে হবে আমাকে, তবে ভ্যালিতে আজ পৌঁছুনো গেল না। এসকোর্ট টাইম ওভা . . 

কথাটা বলতে দেরি, হঠাৎ ধাম করে বিকট তীব্র আওয়াজ হলো! ধাতব ইস্পাতে সাংঘাতিক বারি লাগায় চূর্ণবিচূর্ণ হলো জীপের কাঁচ। মুহুর্তের মধ্যে ব্যাপারটা কী ঘটল, তা আর অনুমান করা যাচ্ছে না। শুধু তরল কিছুতে মেখে যাচ্ছে হাত। চোখের সামনে সমস্ত কিছু ঘোর আঁধার। 

—————

কাঁচা আম কেটে কুচি কুচি করা হয়েছে। লবণ, মরিচ, বিট লবণ ও কাসুন্দি মাখানো হচ্ছে আমগুলোতে। স্টিলে বড় একটা বোল জোগাড় করেছে গাইড ছোকরাটা। সেই বোলে রসালো করে মাখানো হচ্ছে কাঁচা আম। সবার জিভে যেন পানি চলে এসেছে। কতক্ষণ এক খাবলা মুখে পুড়ে সবাই। গাইড ছোকরাটা দুটো শুকনো মরিচ সেখানে ডলে দিতেই অধৈর্য হয়ে চিৎকার ছুঁড়ল তাহিয়া, 

  - এই শামীম! থামো তো। হয়েছে আর মাখাতে হবে না। দাও দেখি একটু তালুতে। আরে, কিপ্টেমি করছ কেন? বেশি করে দাও! 

তাহিয়ার অনৈতিক চাহিদা দেখে ফুঁসে উঠল মিথিলা। মুখ ঝামটি দিয়ে কঠিন এক ধমক লাগিয়ে বলল, 

  - তাহিয়া! অতোখানি করে নিবে না! এদিকে আমরা সবাই বসে আছি। খাবলা খাবলা নিতে গিয়ে তুমি আমার উপর অবিচার করে দিচ্ছ! 

কথাটা ছিল মূলত একটা ফাঁদ। ফন্দিফিকির করে বোলের দিকে কঠিন ছোবল মেরে এক খাবলা আমভর্তা তুলে নিল। আশপাশ থেকে হৈ হৈ করে উঠল আম বিদ্রোহীরা! শ্রেষ্ঠা চোখ-মুখ কুঁচকে কঠিনভাবে ফুঁসে উঠল, গরম গলায় লাভা উদগীরণ করে বলল, 

  - আপনি কতখানি খাবলা মারলেন আপু! এতোগুলো মানুষ, এতোগুলো মুখ! সবার ভাগে তো এখন টোক্কা টোক্কা পড়বে। 

শ্রেষ্ঠাকে সম্মতি জানিয়ে বাহুবলী ভঙ্গিতে গর্জন ছুঁড়ল নাযীফ। গরমে ঘামসিক্ত মুখটা বাঁয়ে একটু কাত করতেই টিশার্টের হাতায় মুখ ডলতে ডলতে বলল, 

  - আপনারা দুজন হচ্ছেন লর্ড ক্লাইভের বংশধর। উপরে ফিটফাট শিক্ষিত, কিন্তু ভেতরে একটা খাঁটি চোর। বাটপারিটা কী করলেন বলেন দেখি? এতোগুলো আম নিয়ে আসলাম, আপনারা হাঁভাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন? সমান সমান করে সবার কলাপাতায় দিবেন না? 

গাইড ছেলেটা শয়তানি হাসি দিয়ে খোঁচালো, 

  - ভাই, আপনে কী কলাপাতা ধুইছিলেন? 

কথাটা বলতে দেরি, বেচারি মিথিলার খাবার আঁটকে গেল। গলা দিয়ে আর নিচে নামল না। একবার নিষ্পলক দৃষ্টি তাহিয়া আর অধরার দিকে ফেলল, পরক্ষণে থমকানো দৃষ্টিযুগল শামীম আর নাযীফের দিকে। নাযীফ হাত উঁচিয়ে জবরদস্ত একখানা থাপ্পড় মারার ভঙ্গিতে শামীমকে শাষিয়ে বলল, 

  - ব্যাডা তুই চুপ থাক! গাইডের নামে গুণ্ডামি লাগিয়ে রাখছিস! তোকে যে আদর করে বললাম, যা ভাই, দুটো বড় দেখে আম পেড়ে নিয়ে আয়। তুই ওইসময় কী রিপ্লায়টা দিলি? উল্টাপাল্টা কথা বললে এমন থাপ্পড় দিব, তখন মুখ দিয়ে হাসবি না, পেছন দিয়ে হাসবি। 

নাযীফের শাষাণিতে একটু যেন স্বস্তি পেল মিথিলা। কিন্তু ওর ক্ষণিকের সেই হতভম্ব মূর্তিটা দেখে হো হো করে অট্টহাস্য বাকিরা। একমাত্র নিঃশব্দ জীব হিসেবে শান্ত রয়েছে সেগুফতা জামান। চোখে কালো রোদচশমা পড়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে সে। ভাবভঙ্গি এমন, যেন এখানকার নারী সংসদীয় কোনো নেত্রী। পেছন থেকে অসহ্যকর শব্দে মুখ বিকৃত করল সেগুফতা। মাথা খানিকটা পিছু ঘুরিয়ে জোর গলাতে বলে উঠল, 

  - তোমরা একটু চুপ করবে? এরকম চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছ? শান্ত হও। চুপচাপ বসো। এভাবে ছোটলোকদের মতো শব্দ করে কেউ? কেমন শোনা যাচ্ছে? 

কয়টা কড়া কথা শুনিয়ে সামনে ফিরল সেগুফতা। ডানপাশে শোয়েবের বিশ্বস্ত এক ড্রাইভার। একটা কাজে ক'দিনের জন্য রাঙামাটি গিয়েছিল, আপাতত জরুরি খবরে ফিরে এসেছে সে। নাম মোশাররফ। মোশাররফের আগে-পিছে আর কিছু আছে কিনা তা আজও জানা যায়নি। কুস্তি পলোয়ানদের মতো পেটানো শরীর তার, রোদে পোড়া গায়ের রঙ, পড়নে সবসময় কালো পোশাক থাকে। ঠোঁটের উপর পুরু একটা গোফ। জীপগাড়িটা চমৎকার ড্রাইভ করে ভ্যালিতে ঢুকে পড়েছে সদ্য। হেলিপ্যাড এরিয়াটা ছাড়িয়ে এবার আরেকটু উপরের দিকে উঠছে ওরা। অবশেষে নির্দিষ্ট একটা রেসোর্টের সামনে থামতেই জীপ থেকে একে একে নামল। চোখ তুললেই ওরা বুঝল, ওদের সামনে একটি কাঠ নির্মিত অপূর্ব রেসোর্ট। যার নাম 'মেঘপুঞ্জি'। 

—————

ঝাপসা কালো ভাব কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ঘোলাটে অবসন্নতা দূরীভূত হচ্ছে ওর। কুয়াশার মতো আবছায়া জগতটা পরিষ্কার ফুটতেই চোখে টপ করে কী পড়ল। এরপরই অনুভব করল বরফের তীক্ষ্ম স্পর্শ। চোখের বন্ধ পল্লবে খোঁচা দিল আরেক ফোঁটা। মাথা মৃদু ঝাড়া দিয়ে চোখ টেনে খুলল শাওলিন। চারপাশটা অনুমান করার জন্য ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল। এমন সময় টের পেল, ওর হাতে আঠালো কিছু লেগে আছে। চটচট করছে তালুটা। ডানহাতটা চোখের সমুখে আনতেই লালবর্ণের তরলটা চিনতে পারল ও। শিউরে উঠতেই অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠল! হাতে . . হাতে তাজা রক্ত? ইয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন! বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল ওর। ডানদিকে মাথাটা আস্তে আস্তে ধীরলয়ে ঘুরাল শাওলিন। যে দৃশ্য দেখতে পেল, তাতে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে গেল ওর! পিলে চমকানো ভয়ে কেঁপে উঠেছে অন্তর। জীপটা ব্যালেন্স হারিয়ে রাস্তার বাঁদিকে সরে গেছে, বাঁপাশটায় ঘন জঙ্গল। একযোগে ভুতুড়ে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। চারপাশটা কবরের মতো স্তব্ধ! আকাশ ভয়ংকর কালো। প্রতিটা কোণা কোণা ঢেকে আছে নিকষ অমাবস্যায়। ডানে ঝুঁকে দুহাতে মুখটা নিজের দিকে ঘুরাল ও। ভ্রুঁটা কেটে সেখান থেকে টলটল করে ঝরছে রক্ত। সেই রক্তপাতের দৃশ্য দেখে শাওলিন আশপাশে রুমাল জাতীয় কিছু খুঁজল। কিন্তু পেল না কিছুই। বাঁহাতে পরনের ওড়নাটা টান দিয়ে সেটাই একমুঠ করে ক্ষতস্থানে চেপে ধরল। ধীরস্বরে ডাকতে লাগল ও, 

  - শুনতে পাচ্ছেন? কথা বলুন। কষ্ট করে একবার জবাব দিন। 

এবার কর্ণগোচরে ধীরে ধীরে কথাটুকু প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় সচল হলো। ঠোঁটদ্বয় কিছুটা মুক্ত শ্বাসে নড়ে উঠলে, ক্ষুদ্র জানান দিল কর্তব্য-কঠিন মানুষটা, 

  - বেঁচে আছি...

ওইটুকু উত্তর শুনে চোখ বুজে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল শাওলিন। যেন বুকের উপর থেকে ভারিক্কি চিন্তার খণ্ডটা সরে গেছে। ওড়নাটা তখনো লোকটার ভ্রুঁতে চেপে রেখেছে ও। কণ্ঠে স্বস্তি নিয়ে বলল, 

  - আল্লাহর অশেষ কৃপায় কিছু হয়নি। সব ঠিক আছে। আর কোথাও গুরুতর আঘাত লেগেছে? 

চোখের আবেগ-বর্জিত চাহনি কেমন অভেদ্য ঠেকছে শাওলিনের। শাওলিন তখনো জানে না, ওই প্রত্যক্ষ-বৎ চোখদুটো কী বিষয়ে জরিপ করে যাচ্ছে। শুধু মনে মনে খচখচ করে উঠল, এভাবে এই লোকটা কী দেখছে? কী পরোখ করছে? শাওলিন ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে যাবে, ঠিক তখনই হেঁচকা টানে দৈহিক ভারসাম্য হারাল ও। আকস্মিক এমন কাণ্ডে প্রচণ্ড ভড়কে গেলে থমকে গেল শাওলিন। কী হলো নিজের সাথে তখনো বুঝতে পারেনি। হঠাৎ টের পেল, ও নিজের সিটে নেই! অজ্ঞাত কিছুর তপ্তশ্বাস ডান কানের কাছে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর দম আঁটকে ব্যাপারটা একটু একটু করে বুঝতে চেষ্টা করল শাওলিন। মাথাটা ধীরে ধীরে নীচু থেকে সোজা করতেই থমকে তাকাল ও। মুখের অত্যন্ত বিপদসীমার কাছে আরেকটি মুখ। চকচকে নীল চোখ ওর কৃষ্ণ চোখে বিদ্ধ, নাকে নাক স্পর্শ করছে, শাওলিনের ওষ্ঠযুগলে অবিরাম তপ্তশ্বাস পড়ছে। ঠিক সে সময়ই অত্যন্ত সংকীর্ণতায় বলে উঠল শোয়েব, 

  - নড়ো না। 

কথাটা শেষ করতে দেরি, তার সঙ্গে সঙ্গে শাওলিন অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটতে দেখল। বাঁহাতের বজ্রমুষ্টিতে একটা ধারালো ছুরি। কখন যে ছুরিটা সিটের নিচ থেকে তুলে নিয়েছে তা ও টের পায়নি। ছুরিটা বাঁদিক বরাবর তাক করতেই ক্ষীপ্র গতিতে নিক্ষেপ করল। শাওলিন দেখল বাঁদিকে যে গাছটার সঙ্গে জীপটা ঘেঁষে আছে, সেখানে কালো কুচকুচে বিষাক্ত একটি সাপ। বতর্মানে সেটা মাথায় ছুরিবিদ্ধ হয়ে ছটফট করে দাপাচ্ছে। দৃশ্যটা এমন লোমহর্ষক যে, আর তাকাতে পারল না ও। নিস্তেজে শাওলিন চোখ বন্ধ করলে দুর্বল, ধীরস্বরে বলল, 

  - মনে হচ্ছে আপনারও আমার মতো অদৃষ্ট খারাপ। চোখের পলক ফেলতেই বিপদ উপস্থিত। আপাতত এমন জায়গায় যাওয়া হোক, যেখানে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত।  

—————

সুদূর-বিসর্পী নিবিড়-শ্যাম বনানী। গাছের পাতা পাতা চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোয়ারা। মাটি থেকে ভেসে উঠছে প্রাঞ্জল মিঠে গন্ধ। বাতাসে হরেক ফুলের মন বিবশ করা সুঘ্রাণ। দমকা বাতাসের জোরে নীড় বাঁধা কোনো পাখি কিচকিচ করে ওঠে। আশু প্রকৃতির দূর্যোগ ঘনানো বিকেলে এ ঝড়ো উৎপাত তাদের পছন্দ না। গাছের মগডাল থেকে কা কা করছে বন নিবাসী কাক। তার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে ছোট্ট পাখি কাকাতুয়া। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে সরু পথটা সাবধানে ডিঙালো শাওলিন, চোখদুটো প্রতিক্ষণে অনুসরণ করে যাচ্ছে সামনে চলমান দুটি পা। কাদা মাটি ও পিচ্ছিল শ্যাওলা পেরিয়ে অবশেষে একটা গেট দেখতে পেল ও। গেটের কাছে হলুদাভ আলোর বিকিরণ। কেউ ছাতা মাথায় আরেক হাতে হারিকেন উঁচিয়ে রেখেছে, সেই পথে অগ্রসর হয়ে বন কর্মকর্তাটি বলল, 

  - রাতের খাবার এখানেই করুন। সকালের দিকে আমি বেরোব। পেছনে একজন অতিথি এসেছে। ওর ঘরটা দেখিয়ে দিন। 

কথাটা বলে সারতেই ভারি পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকে যায় বনকর্মী। কোনো এক অদ্ভুত বিচিত্র ঘটনায় লোকটা ভুলেও ওর দিকে তাকাচ্ছে না। কেন যেন ওর মনে হলো, ওর কাছ থেকে দৃষ্টি বাঁচাচ্ছে সে। কোনো এক অজানিত কারণে বৃষ্টি নামার পর থেকে দৃষ্টি আড়াল করছে। বৃদ্ধ লোকটার দেখানো পথে একটা ঘরে পৌঁছুল শাওলিন। ভেতরে একটা হারিকেন জ্বালিয়ে লোকটা ঝটপট অন্য কাজে ছুটল। এই ফরেস্ট বাংলোটা কাঠ দিয়ে বানানো। চমৎকার একটা কাঠস্পর্শী সুগন্ধ বাতাসে জড়িয়ে মিলিয়ে আছে। ঘরটা ছোট্ট, উষ্ণ এবং আরামদায়ক। হিমস্পর্শী বৃষ্টিতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা শাওলিন দরজা চাপিয়ে গায়ের ওড়না সরাল। ওমনেই সামনের আয়নায় তাকিয়ে বিস্ময়ে থমথম করল মুখ! বুঝতে পারল সমস্যাটা কোনদিকে! কী সর্বনাশটাই করেছে আজ! কোন কুক্ষণে পড়তে গেল হালকা নীল জামাটা! হারিকেনের হলুভ আভায় দুটো লাল রক্তিম গাল পরিস্ফুটিত হয়ে ফুটছিল। লাল-হলুদের আভায় ভীষণ সম্মোহনী ছড়াচ্ছিল। এমন সময় বন্ধ দরজায় ঠকঠক হতেই ওপাশ থেকে সদর্প কণ্ঠটা বলে উঠল, 

  - একসেট পোশাক আছে। তোমার বন্ধু ভুলবশত ফেলে যায়। ভেজা পোশাকটা পাল্টে নাও। ডাইনিং টেবিলে খাবার খেতে যাবে। 

কানদুটো ঝিমঝিম করছিল ওর। একটা ভয়, একটা কাঁটা মনে চিড়বিড় করছিল। অতঃপর পাতলা ওড়নাটা ফের গায়ে চড়িয়ে দরজাটা খুলে দিল শাওলিন। বাইরে তাকাতেই বুঝল, আবারও ফাঁকা! লোকটা কাজ খতম করেই চলে গেছে। চোখদুটো নিচে ফেলতেই দেখল একটা কালো রঙের শপিং ব্যাগ রাখা। ব্যাগটা ওর কাছে চেনা ঠেকল। কোথায় দেখেছিল? স্পষ্ট মনে করতে পারছে না ও। শর্ট টাইম মেমোরি লস সমস্যাটা এতো বেড়েছে! অসহ্য! ব্যাগটা তুলে দরজা আঁটকে ভেতরে ঢোকে শাওলিন। হারিকেনটা ছোট্ট একটা টেবিলের ওপর রেখে ব্যাগটাকে বিছানায় উপুড় করে। ওমনেই ফস করে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী একটি শাড়ি বেরিয়ে এল। যার রঙটা দুটো চমৎকার রঙের মিশেলে। বসন্তের বাসন্তি রঙ এবং লাল বর্ণ পাড়!
.
.
.
চলবে.......................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp