চিরকুটটা পড়ে নাদভি কান্না আটকে রাখতে পারল না। এমনটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। একবারের জন্যও বুঝতে পারেনি এমন কিছু ঘটতে চলেছে। কাল রাতেও না। ঘড়ির কাঁটায় এখন দুপুর ২টা। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে কী হয়েছে। বোঝার জন্য ওই চিরকুটটাই যথেষ্ট। তবুও, তবুও সে পুরো বাসা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল। কোথাও লগ্ন বা লগ্নর কোনো জিনিস নেই। ফোনে পাবে না জেনেও ফোন করল। নম্বরটা বন্ধ।
চোখ মুছে নাদভি বেরিয়ে পড়ল। সোজা অফিসে চলে গেল। তাদের টিম লিডারের কাছে জানতে চাইল লগ্ন চাকরি ছেড়ে দিয়েছে কি না। তিনি অবাক হলেন। লগ্ন কেন চাকরি ছাড়বে। সবাই নাদভির উদ্ভ্রান্ত অবস্থা দেখে জানতে চাইল কী হয়েছে। কিন্তু নাদভি কাউকে কিছু বলতে পারল না। সে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে। উদ্ভ্রান্তের মতো সে পুরো মিসিসাগা চক্কর দিতে লাগল। কোথাও নেই লগ্ন। কোথাও নেই! বিকেলবেলা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছিল নাদভি। তখন অফিস থেকে টিম লিডারের ফোন এলো, ‘এই নাদভি, লগ্ন তো আসলেই চাকরি ছেড়েছে। এইমাত্র খবর পেলাম। ঘটনা কী বলো তো? হয়েছেটা কী?’
নাদভি কিছু না বলে ফোন রেখে দিলো। এবার সে সরাসরি লগ্ন বাবাকে কল দিলো।
‘হ্যালো।’
‘আংকেল আমি নাদভি। নাদভি আহমেদ।’
আতিকুর রহমান চমকে উঠলেন। এরপর কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে কেন ফোন করেছ?’
‘আংকেল প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। আপনি ছাড়া এখন আর কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারবে না।’
আতিকুর রহমান রেগে গেলেন।
‘তোমার কি লজ্জা নেই? আমি কেন তোমাকে সাহায্য করব?’
‘কারণ গতকাল আপনার মেয়ে আমাকে বিয়ে করেছে। সত্যিকারের বিয়ে। আজ সকালে সে উধাও। ঠিক যেমনটা আমি করেছিলাম তার সাথে। কিন্তু আংকেল এবারের বিয়েটা তো সত্যিকারের বিয়ে ছিল।’
‘তুমি মিথ্যে বলছ। আমার মেয়ে আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করবে কেন?’
নাদভির গলা ধরে এলো। সে বলল, ‘সে বলেছিল আপনাকে জানালে আপনি এ বিয়ে হতে দেবেন না। পরে আপনাকে জানাবে। আমি আপনাকে এক্ষুনি ছবি পাঠাচ্ছি, দেখুন।’
আতিকুর রহমান কিছুই বুঝতে পারছেন না। জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের আবার দেখা হলো কোথায়?’
‘কানাডায় আমরা একই অফিসে একই টিমে কাজ করতাম। দেখা হওয়ার পর আমি যা করেছি তার জন্য ওর কাছে ক্ষমা চাই। ও ক্ষমা করে দেয়। তারপরই আমরা বিয়ে করি।’
‘তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি হয়েও থাকে তবুও আমার কিছু করার নেই। কারণ মেয়ে এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আর এসবের জন্য তুমিই দায়ী। তুমি যা করে গেছ এরপর ও এই দেশে টিকতে পারেনি। আমার মেয়ে আমার থেকে দূরে চলে গেছে শুধু তোমার জন্য। আমার মেয়ে যখন ক্ষমা করেনি, আমি তোমাকে কখনোই ক্ষমা করব না। সাহায্য করা তো অনেক দূরের কথা।’
আতিকুর রহমান ফোন রেখে দিলেন। নাদভির শেষ আশাটাও শেষ। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। শেষবার এমন কষ্ট হয়েছিল মাকে হারিয়ে। তবে তার কারো ওপর অভিযোগ নেই। একটা মানুষ একের পর এক পাপ করে বেড়াবে। এরপর হুট করে সব মুছে ফেলে ভালোবাসার মানুষের সাথে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে চাইবে, প্রকৃতি তা মেনে নেবে কেন?
নাদভি ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলাতে চাইল। নিজেই নিজের চুল টেনে ছিঁড়ল! তারপর ফুটপাতে বসে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
—————
লগ্ন কাঁদছিল ফ্লাইটে বসে। নতুন দেশে নতুন জীবনের সূচনা করতে যাচ্ছে। সে জানে না কী তার ভবিষ্যৎ। শুধু জানে আজ সে অনেক সুখী মানুষ। গত ৩-৪ বছর ধরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা উত্তপ্ত লগ্ন আজ নিভেছে। হয়তো সে যা করেছে সেটাও ঠিক নয়, তবে সে এতে শান্তি পেয়েছে। জীবন তো একটাই। শান্তির চেয়ে বড় আর কী আছে?
বাড়তি পাওনা হিসেবে সে উপলব্ধি করতে পারছে নাদভির সেই কথাটা, ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিয়ে দূরে সরে যেতে গেলে নিজেকেও তারচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয়!
হ্যাঁ, নাদভিকে সে ভালোবাসে। এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসে। নাদভির সাথে কাটানো প্রতিটি রঙিন মুহূর্ত সে মনের মণিকোঠায় যত্ন করে রাখবে। কিন্তু নাদভিকে সে বিশ্বাস করতে পারে না, সম্মান করতে পারে না। নাদভি তারই মতো আরো অনেকগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে জেনে তার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মানও আসে না। যাকে বিশ্বাস করা যায় না, সম্মান করা যায় না তার সাথে আর যাই হোক, জীবন কাটানো যায় না। তা সে যত ভালোবাসার মানুষই হোক। ভালোবাসা মানুষের একটা অনুভূতি, সে অনুভূতি দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু মানুষের দুর্বল হতে নেই।
·
·
·
সমাপ্ত.........................................................................