লগ্ন আজ থেকে আবার অফিসে যাবে। অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিচে নামতেই দেখে নাদভির গাড়ি। লগ্নকে দেখেই সে গাড়ি থেকে নেমে এলো।
লগ্ন ধমকে বলল, ‘এখানে কী চাই?’
নাদভি বলল, ‘না মানে, খবর পেলাম আজ থেকে তুমি অফিস করবে। এত স্নো পড়ছে। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে যেতে তো তুমি জমে যাবে। তাই ভাবলাম আমি তো যাচ্ছিই, আমি নিয়ে যাই।’
লগ্ন চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার ব্যাপারে এত ভাবতে বলেছে কে তোমাকে? আমি বাসেই যাব। দেখি স্নো আমার কী করতে পারে!’
লগ্ন হনহন করে হেঁটে চলে গেল। নাদভি পেছন পেছন এলো কিছুক্ষণ।
একসময় লগ্ন পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘আমার পেছন পেছন এলে আজকেই চাকরি ছেড়ে দেব। দুনিয়ায় চাকরির অভাব নেই।’
এবার আর সাথে সাথে গেল না নাদভি। লগ্নকে সে ভয় পায়!
—————
অফিস শেষ করে লগ্ন একটা শপিং মলে গেল। এটা তার খুবই পছন্দের জায়গা। মন ভালো না থাকলে মাঝেমাঝে এখানে এসে বসে থাকে। মানুষ দেখে।
লগ্ন যখন একা একা বসে মানুষের কাজকর্ম দেখছিল তখনই পাশে এসে দাঁড়াল নাদভি। তাকে দেখেই লগ্নর মাথা গরম হয়ে গেল। কিন্তু সে এখন শান্ত থাকতে চায়। তাই কিছু বলল না।
নাদভি বলল, ‘তোমার সাথে কিছুক্ষণ বসতে পারি?’
লগ্ন ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘ফলো করতে করতে তো এসেই পড়েছ। এখন যে বড় অনুমতির ধার ধারছো? ফলো করার আগে অনুমতি নিয়েছিলে?’
নাদভি কিছু বলল না। বসলোও না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। গা জ্বলে গেল লগ্নর।
সে বলল, ‘ঢঙে মরে যাচ্ছে! বসো।’
নাদভি এবার বসলো। কিন্তু তেমন কিছু বলল না।
লগ্নই জিজ্ঞেস করল, ‘কেন এসেছো? কী বলতে?’
নাদভি মাথা নেড়ে বলল, ‘তেমন কিছু না। শুধু তোমার সাথে কিছুক্ষণ বসব বলে এলাম।
লগ্ন এবার নাদভির দিকে ফিরে বসলো।
তারপর বলল, ‘এই তোমার মত এতবড় একটা ক্রিমিনাল দেশ ছাড়লো কীভাবে আমাকে বলো তো? কোথাও আটকালে না?’
নাদভি মাথা নিচু করে বলল, ‘যা করেছি সব ফেক আইডেন্টিটি দিয়ে করেছি। তাই সমস্যা হয়নি।’
‘নকল বিয়ে ছাড়া আর কী কী করেছো একটু শুনি তো। অনেক শখ জেগেছে আজ সবকিছু জানার।
নাদভির মন প্রচণ্ড খারাপ। শুরু থেকেই সে অপরাধবোধে ভুগছে। এখন আরো খারাপ লাগছে।
সে বলল, ‘মানুষের বাড়িঘরে চুরি করেছি কয়েকবার। একবার এটিএম বুথের টাকাও চুরি করেছি। সেবার এত ইফোর্ট দিয়েছি, এত রিস্ক নিয়েছি, কিন্তু মেশিনে টাকা ছিল খুবই কম।’
লগ্ন বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, ‘আল্লাহর বিচার আল্লাহ করে।’
নাদভি বলল, ‘সেতো অবশ্যই। তা না হলে আমার মা হয়তো বাঁচতেন। সব অবৈধ টাকা ঢেলেছি বলেই হয়তো দ্রুত আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন।’
এ কথায় লগ্নর হঠাৎ খারাপ লাগলো। কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়, তবে সে এভাবে বলতে চায়নি। এবার গলা নরম করে বলল, ‘অন্যভাবে চেষ্টা করলে না কেন?’
নাদভি এবার লগ্নর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কি মনে হয় আমি অন্য কোন ভাবে চেষ্টা করিনি? যখন চাকরি পাইনি, এমন কোন কাজ নেই যা করিনি। কিন্তু এত পরিশ্রম করেও মাসে যে টাকা আমি পেতাম তাতে মায়ের এক সপ্তাহ চিকিৎসা হতো না। আমার চোখের সামনে দিন দিন তার অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। অসহায় চোখে চেয়ে দেখা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। তখনই ওই অন্ধকার জগত আমাকে পথ দেখায়। অন্ধকার জগতে অন্ধকার কাজ করেই আমি সেই পরিমাণ টাকা পেতাম, যে পরিমাণ টাকা মায়ের চিকিৎসার জন্য দরকার হতো।’
লগ্ন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো, ‘ভয় হতো না?’
নাদভি অবলীলায় বলল, ‘নাহ। ডেসপারেট হয়ে গিয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকে মায়ের খুব পাগল ছিলাম। একমাত্র সন্তান ছিলাম বলে মাও আমাকে ছাড়া দু’চোখে কিছু দেখতেন না।’
লগ্ন প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বলল, ‘চলো হাঁটি। বসতে আর ভালো লাগছে না।’
প্রায় সব দোকানে ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল চলছে। লগ্ন ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো কোথায় কতটা সেল দিচ্ছে। তার একটা উইন্টার জ্যাকেট কেনা দরকার।
নাদভি বলল, ‘রাতের খাবার একসঙ্গে খাই?’
‘বাঙালি বসতে দিলে খেতে চায় এই কথা প্রমাণ করতে চাইছো?’
নাদভি হাসলো। লগ্ন আরো কয়েকটা দোকান ঘুরতেই ৫০% সেলে ভালো একটা উইন্টার জ্যাকেট পেয়ে গেলো। সেটা কিনে নিলো। এরপর চোখে পড়লো চকোলেটের দোকানে বিশাল সেল চলছে। সেখান থেকে কিছু চকোলেট কিনে নিল। নাদভিকে খেতে সাধলে সে চকোলেটটা হাতে নিয়ে বলল, ‘তুমি দিলে বলে খাচ্ছি, কিন্তু আমি আসলে চকোলেট খাই না।’
লগ্ন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার এতশত খারাপ কাজের মধ্যে কি মানুষ খুন ছিল একটাও?’
‘না।’
‘কিন্তু পারবে নিশ্চয়ই। যে মানুষ চকোলেট খায় না, সে মানুষও খুন করতে পারবে অবলীলায়।’
নাদভি হেসে বলল, ‘চকোলেট একটা অস্বাস্থ্যকর খাবার। অনেকেই খায় না। আর অস্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়াটাই ভালো।’
এরমধ্যেই একটা বাঙালি খাবারের দোকান চোখে পড়ল যেখানে ফুচকা পাওয়া যায়। লগ্ন বলল, ‘চলো আরেকটা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাই।’
নাদভি হেসে দিল। লগ্ন দোকানের সামনে গিয়ে অর্ডার দিয়ে বলল, ‘এই অস্বাস্থ্যকর কিন্তু সেরা খাবারটা খাও তো?’
নাদভি গম্ভীর গলায় বলল, ‘খাই না। কিন্তু তুমি বললে বিষও খেয়ে নেব।’
লগ্ন নাদভির চোখে চেয়ে বলল, ‘এভাবে বলো না, সত্যি সত্যি বিষ খাইয়ে দিতে পারি।’
নাদভি ঘাড় নেড়ে বলল, ‘সত্যি সত্যিই দিতে পারো। আপত্তি নেই।’
এরমধ্যে ফুচকা এসে গেল। লগ্নর ফুচকা খাওয়া দেখে নাদভি অবাক হয়ে গেল। এতবড় ফুচকা পুরোটা একসাথে মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে খাচ্ছে। কেউ এত উপভোগ করে একটা খাবার খায় কীভাবে? নাদভি যদি আগেই লগ্নর প্রেমে না পড়ে যেত তাহলে আজ ওর ফুচকা খাওয়া দেখে নির্ঘাৎ প্রেমে পড়ত!
·
·
·
চলবে..........................................................................